স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৮
সানজিদা আক্তার মুন্নী
সময়ের স্রোতে দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ছয়টি মাস। নাজহারের মাতৃত্বের এই বিষাক্ত যাত্রায় এখন সে সপ্তম মাসের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। হিসেব কষলে তার গর্ভকাল ছয় মাস তিন সপ্তাহ।দিন দুয়েক আগেই তৌসির তাকে নিয়ে গিয়েছিল নিজেদের হাসপাতালে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্দেশ্যে। হাসপাতালের প্রধান ও সর্বাধিক অভিজ্ঞ নারী চিকিৎসকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে শুরু থেকেই তার চিকিৎসা চলছে। অনাগত সন্তানের পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য আগে থেকেই তাঁকে নিযুক্ত করে রাখা হয়েছে, যাতে কোনোরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়। তবে এবারের পরীক্ষার দিনটি অন্যান্য সাধারণ দিনের তুলনায় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আল্ট্রাসাউন্ডের মনিটরে চোখ রাখতেই চিকিৎসক প্রায় আশি শতাংশ নিশ্চয়তা দিয়ে শোনালেন এক অভাবনীয় সংবাদ। নাজহার গর্ভে একটি বা দুটি নয়, একসঙ্গে তিনটি প্রাণ অর্থাৎ ট্রিপলেট বেড়ে উঠছে।
আলাদাভাবে, সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুরক্ষিত অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে খুদে প্রাণগুলো। মনিটরের ওপারে ভেসে ওঠা সেই ছোট্ট তিনটি অবয়ব নাজহা ও তৌসিরিও ভালো করেই দেখেছে। সংবাদটি প্রথমটায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও, নাজহাদের পারিবারিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এটি মোটেও বিস্ময়কর লাগে না। নাজহা এবং তার ভাই নিজেরাও যমজ ভাইবোন, একই গর্ভে একই দিনে পৃথিবীর আলো দেখেছিল তারা। শুধু তাই নয়, তাদের পরিবারে যমজ সন্তান হওয়ার এক জোরালো বংশগত ধারা যুগের পর যুগ ধরে প্রবহমান। তার চাচাদের মাঝেই তিনজন যমজ, তাদের প্রজন্মেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। বংশের প্রবীণরা প্রায়ই হাসতে হাসতে বলে থাকেন, তাদের পরিবারে যমজ সন্তান আসা এক প্রাকৃতিক নিয়ম। মূলত জিনের এই শক্তিশালী প্রভাবের কারণেই নাজহার কোলজুড়ে একসঙ্গে তিন সন্তানের আগমন প্রকৃতির এক সুন্দর ধারাবাহিকতা মাত্র, যা আল্লাহর অপার নিয়ামতের আরেকটি অনন্য নিদর্শন।
তবে এই অপরিসীম আনন্দ আর মুগ্ধতার ঠিক উল্টোপিঠেই রয়েছে নাজহার নিদারুণ শারীরিক যন্ত্রণার গল্প, যা বাইরে থেকে দেখে কেউ সঠিক অনুমান করতে পারবে না। মাত্র ছয় মাসের মাথায় এসেই তার শারীরিক পরিবর্তন এতটা প্রকট হয়ে উঠেছে যে, একনজরে দেখলে ঠিক নয় মাসের পূর্ণ গর্ভবতী বলে যে কারো ভ্রম হবেই। তার পেটটা ভারী হয়ে সামনের দিকে বেড়ে গেছে।ভারী শরীরটা টেনে এক কদম চলাও এখন তার জন্য পাহাড়সম কষ্টের। তীব্র কোমর আর পিঠের ব্যথায় নাজহা সার্বক্ষণিক কাতর হয়ে থাকে। সারাটা দিন কখনো বিছানায় হেলান দিয়ে, কখনো বা বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে কোনোরকমে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে সে। সামান্য একটু হাঁটলেই ভীষণভাবে হাঁপিয়ে ওঠে, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকে অসহায়ভাবে, মনে হয় শ্বাস বুঝি এখনই আটকে আসবে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা তো এখন তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো, তাই তৌসির আগে থেকেই নিচতলায় তাদের শোবার ঘরের ব্যবস্থা করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আর পা ফুলে ভারী হয়ে যাওয়ার অবর্ণনীয় অস্বস্তি। গভীর রাতেও বহুবার তাকে উঠতে হয়, ঘুম ভেঙে গেলে আবার চোখে ঘুম ফিরিয়ে আনা এখন তার জন্য এক যুদ্ধের সমান। তার পায়ের পাতা আর গোড়ালি ফুলে যায় মাঝেমধ্যে। আর তো আছে তার পেটের ভেতরের তিন খুদে প্রাণের কথা যাদের কথা আলাদা করে বলে শেষ করা যাবে না। তাদের অবিরত নড়াচড়া আর খুনসুটি এখন নাজহা এত স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারে যে মনে হয়, পেটের ভেতরে যেন তিনটি ছোট্ট প্রজাপতি একসঙ্গে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কখনো একজন পেটের একপাশে লাথি ছোঁড়ে,তাদের এই অবিশ্রান্ত কর্মব্যস্ততায় রাতে দু’দণ্ড শান্তিতে ঘুমানোও তার জন্য একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেকোনো একদিকে কাত হয়ে শুতে গেলেই মনে হয় ভেতরের ছোট্ট অতিথিরা প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তাই বারবার পাশ ফিরে শুতে হয় তাকে। বড্ড কষ্ট হয় নাজহার বড্ড বেশিই। অনেক সময় নীরবে কাঁদেও সে এই মাতৃত্বের যন্ত্রণায়।
{লেখিকার নোট : পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলতে চাই। গল্পের এই পর্যায়ে নাজহার ট্রিপলেট বা তিন সন্তান ধারণের বিষয়টি মোটেও কাল্পনিক বা অবাস্তব কোনো ঘটনা নয়। নাজহার পারিবারিক ইতিহাসের মতোই, আমার নিজের বংশেও এমন একাধিক যমজ সন্তানের নজির রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, বংশগত বা জেনেটিক কারণে এমন ঘটনা ঘটা পুরোপুরি স্বাভাবিক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। আশা করি, পাঠকেরা নাজহার এই কঠিন অথচ অপরূপ সুন্দর যাত্রায় তার পাশেই থাকবেন, তার আনন্দে আনন্দিত হবেন আর তার যন্ত্রণায় সমব্যথী হবেন।}
শিকদার বাড়ির প্রতিটি মানুষের মনোযোগের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নাজহা। তার পেটের ভার এতটাই বেড়ে গেছে যে কয়েক কদম হাঁটলেই তার শরীর কাঁপতে শুরু করে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে, কপালে জমে ওঠে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ইয়াদ আর ওয়াসেম বাড়ির কিছু জরুরি দলিলপত্র সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছুদিন আগেই ইন্ডিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। তৌসিরেরও তাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সে শেষ পর্যন্ত যেতে পারেনি। আর তৌসিরের অনুপস্থিতির কারণেই অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আপাতত থমকে আছে, যেগুলো তাকে ছাড়া এগিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। তৌসিররা এটাও জেনেছে তালুকদার বাড়ির মানুষজন আন্দাজের ওপর ভর করেই ধরে নিয়েছিল যে তৌসিরি তামিল থেকে এসেছে এবং তারা এটা এমনি খললি কে বলেছে কারণ অনেক টাকা খলিলের থেকে নিয়েছে এতদিন হয়ে যাচ্ছে কাজ হচ্ছে না। তাই বলেছিল তারা এটা। এই বাড়ির কেউই তাদের কে বলেনি। নাজহা বলেনি কিছুই। কিন্তু আফসোস এই সত্যি এখন জেনে কোনো লাভ হয়নি! যা ধ্বংস হওয়ার হয়ে গেছে এতদিনে।
চারপাশের পরিস্থিতি এখন শান্ত রূপ ধারণ করেছে, তালুকদার বাড়ির সবাই মাস্টার চাচ্চুকেও এখন মৃত বলেই মেনে নিয়েছে, কারণ এতদিনেও তার কোনো খোঁজখবর মেলেনি। আগেই বলেছি তালুকদার বংশের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন যে এই বংশের অনেক সন্তানই এভাবে গুম হয়ে মারা গেছে, নাই হয়ে গেছে। তাই একটি মৃত্যুর ঘটনা তাদের মনে খুব একটা গভীর রেখাপাত করতে পারেনি, কারণ তাদের বংশধরের কোনো অভাব নেই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বংশলতিকা শাখা-প্রশাখা মেলে বিস্তৃত হয়ে আছে। তবে মাস্টার চাচ্চুর অনুপস্থিতি এবার তাদের বাড়ির প্রতিটি কোণায় শূন্যতা তৈরি করেছে বটে। সবার ভেতরটা মাঝেমধ্যেই খাঁ খাঁ করে ওঠে।
বাইরের এই আপাত নীরবতার মাঝেও একটি জায়গায় সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি, বরং দিন দিন তা আরও জটিল হয়ে উঠছে। আর সেই জায়গাটি হলো তৌসির এবং নাজহার সম্পর্ক। নাজহা এখন আর তৌসিরের সাথে একটি কথাও বলে না, এমনকি ভুলে কখনো তার দিকে ফিরেও তাকায় না। আর যদি কখনো ঘটনাক্রমে দুজনের চোখাচোখি হয়েও যায়, তখন নাজহার দৃষ্টিতে তীব্র ঘৃণা আর বুকের গহীনে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা ক্ষোভ ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। আর তার সেই দৃষ্টি তৌসিরের বুকে শত শত সূচ ফোটায়, তৌসির বেশ ভালো করে বুঝতে পারে প্রতিটি চাহনিতে নাজহা তাকে নিঃশব্দে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে।
এখন সময় সন্ধ্যা ছয়টা রান্নাঘরে সিমরান চুলায় চা বসিয়েছে। নাজহা ধীর পায়ে হেটে পেটের ভার সামলে সামলে রান্নাঘরে এসে একটি চেয়ারে বসেছে। আর ইকরা নাজহার ফুলে ওঠা পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার চোখেমুখে উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি নেই, খুশিতে চকচক করতে থাকা মুখ নিয়ে ইকরা নাজহার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “যদি সত্যিই তিনটে বেবি হয়, ভাই বিশ্বাস কর, এটা এই পরিবারের জন্য একটা বিশাল রেকর্ড হয়ে যাবে!”
নাজহা ইকরার এই উচ্ছ্বাসপূর্ণ কথার কোনো জবাব দেয় না। তার নিরাসক্ত এবং প্রাণহীন চোখ দুটো ইকরার মুখের ওপর স্থির হয়ে থাকে, তার এই চোখের চাহনিতে আনন্দ বলে কোনো অনুভূতির অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। খুব ধীর গলায় সে ইকরা জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা ইকরা আপু, আমি বাঁচব তো? ওদের মুখ দেখার সাধ্য কি আমার আদৌ হবে? নাকি আমি মারা যাব? সেদিন তো ডাক্তার স্পষ্টই বলেছে আমার অনেক ঝুঁকি।”
ইকরা নাজহার এমন হতাশাজনক আর হৃদয়বিদারক কথা শুনে মৃদু ধমক দিয়ে ওঠে, “দূর! কী বলিস এসব আজেবাজে কথা? তুই বাঁচবি, ওদের নিয়েই তুই খুব সুন্দরভাবে বাঁচবি। তুই একটু ভেবে দেখ, তোর আর তৌসির ভাইয়ের সাথে তিনটে ফুটফুটে সন্তান হবে, কত সুন্দর একটা সংসার হবে তোদের।”
নাজহা তার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই, আছে শুধু এক অসীম যন্ত্রণার ছায়া। একবুক চাপা কষ্ট নিয়ে সে বলে, “আমি তো বাঁচতেই চাই না ইকরা আপু। আর সুন্দর সংসার? কার সাথে করব আমি সেই সংসার? নিজের সন্তানের খুনির সাথে কি কখনো সুন্দর সংসার হয়, তুমিই বলো তো?”
ইকরা মুহূর্তেই বুঝতে পারে নাজহার ভেতরের ক্ষত কতটা গভীর, কতটা রক্তাক্ত। সেই ক্ষত এমন এক ক্ষত যা সময়ের প্রলেপেও সম্ভবত কোনোদিন শুকাবে না। সে আর কথা বাড়ায় না, স্নেহে নাজহার কোমর জড়িয়ে ধরে। নাজহার ফোলা পেটে নিজের মাথাটি আলতো করে রেখে মলিন এবং ভেজা গলায় সে বলে, “এসব বলিস না বোন। দেখিস, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
নাজহা ইকরার মাথায় হাত রাখে, ধীরে ধীরে তার চুলে আঙুল চালাতে থাকে। তার গলাটা অভিমানে আর জমে থাকা কষ্টে থরথর করে কেঁপে ওঠে “আমি যদি মারা যাই, আমার জন্য অন্তত এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলো তুমি আর সিমরান। কারণ আমার আপন বলতে এই বিশাল দুনিয়ায় আর কেউ নেই। আমি সবার কাছে স্বার্থের সঙ্গী মাত্র।”
চা-পর্ব শেষ করে ইকরা আর সিমরানের সাথে আরও কিছুক্ষণ এলোমেলো গল্প করে নাজহা ধীর পায়ে নিজের ঘরে ফিরে আসে। বিছানায় বসে সে নিজের মা আর ভাইকে ফোন করে। অনেকদিন পর তাদের গলা শুনে তার বুকটা কিছুটা হালকা হয়ে আসে। তাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর তার মনটা কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। ফোনটা রাখার পর সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে, তারপর ধীর পায়ে ঘরের কোণে রাখা আয়নাটার সামনে এগিয়ে যায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে দেখে, চুলগুলো ভীষণ এলোমেলো হয়ে আছে, কপালের ওপর কয়েক গোছা চুল এসে পড়েছে। তার মনে হয় এই এলোমেলো কেশতরঙ্গগুলো তার একটু আঁচড়ানো দরকার।
ঠিক সেই মুহূর্তেই তৌসির নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করে। তার কোমরে লুঙ্গি গোঁজা, গায়ে কোনো জামা নেই। প্রচণ্ড গরমে তার কপাল আর গাল ঘামে চিকচিক করছে, চুলগুলো ঘামে কপালের সাথে লেপটে আছে। ইদানীং গরমের তীব্রতা অসহ্য এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, এখন তো সিলিং ফ্যানের বাতাসেও আগুনের আঁচ মিশে থাকে। তৌসির ধীর পায়ে হেঁটে নাজহার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ায়। এরপর সে তার দুই হাত দিয়ে নাজহার তলপেটে আলতো করে ধরে পেটের ভারটা সামান্য উঁচু করে দেয়। সাথে সাথেই নাজহার পুরো শরীর জুড়ে আরামের স্রোত বয়ে যায়, এতে তার মনে হয় কেউ তার কাঁধ থেকে একটা বড় পাথরের বোঝা সরিয়ে নিয়েছে। পেটের এই তীব্র ভার তার ক্লান্ত এবং ভগ্ন শরীর আর কোনোভাবেই বইতে পারছিল না।
নাজহা কোনো প্রতিবাদ না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এমন ঘটনা এটিই প্রথম নয়, বরং প্রতিদিনই এমন কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। তৌসির এখন প্রায় সবসময়ই তার খেয়াল রাখে, সে নাজহার হাত, পা এবং কোমর অতি যত্নে ম্যাসাজ করে দেয়। পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে হাতের আঙুল পর্যন্ত একটি একটি করে টিপে দেয়, যাতে নাজহার শরীরের ক্লান্তি কিছুটা হলেও কমে। নাজহা যদি নিজে থেকে চুল না আঁচড়ায়, সে নিজ হাতে তার চুল আঁচড়ে দেয়। নাজহা ভাত খেতে না চাইলে সে নিজের হাতে অন্য কোনো খাবার বানিয়ে এনে তার সামনে ধরে, যে তৌসির এত কিপ্টে এত কিপ্টে, এক টাকা খরচ করতেও যে দশবার ভাবে, সেই তৌসির এখন নাজহার জন্য আইসক্রিম আর ঠান্ডা পানীয় কিনে এনে ফ্রিজে রাখে।
অবশ্য তৌসিরকে একা সব কিছু করতে হয় না। শয়তান বিবিজান এখন নাজহার সব ধরনের আবদার মেটাতে দিনরাত ব্যস্ত থাকেন। শুধু পারেন না নাজহাকে মাথায় তুলে নাচতে, বাড়ির সবাই নাজহার সেবায় পুরোপুরি নিয়োজিত হয়ে পড়েছেন। রাত বারোটা কি একটা, যখনই হোক না কেন, বিবিজান, দাদাজান কিংবা তৌসিরের মা ও চাচী নাজহাকে এটা সেটা খাওয়াতে চলে আসেন। তাদের চোখেমুখে সবসময়ই ব্যাকুলতা লেগে রয়, কারণ নাজহার যে একটু অযত্ন হলেই মহাবিপদ ঘটে যাবে। তিনটি সন্তান হবে শুনে বিবিজান আনন্দে আরও বেশি উতলা হয়ে উঠেছেন, তার চোখে ফুটে উঠেছে নতুন প্রজন্মকে দেখার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই তো একটু আগেই তিনি নিজের হাতে আইসক্রিম, আচার, বাদাম, পেয়ারা আর কমলা একটি ট্রেতে সাজিয়ে দিয়ে গেছেন।
নাজহার এসবের কিছুই খেতে ইচ্ছে করে না। খাবার দেখলেই তার গা গুলিয়ে ওঠে, পেটের ভেতরটা মোচড় দেয়। কিন্তু তাও তাকে জোর করে খেতে হয়, সে একপ্রকার বাধ্য খেয়ে নেয়। মুখে সে যতই বলুক যে এই সন্তান সে চায় না, যতই অভিশাপ দিক, দিনশেষে সে একজন মা। আর একজন মায়ের ভেতরে যে মমতার ঝর্ণা প্রবাহিত হয়, তা কোনো রাগ-অভিমান দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। সে কখনোই চায় না তার কোনো অবহেলার কারণে গর্ভের এই সন্তানগুলো প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিক, কিংবা তাদের কোনো ধরনের শারীরিক ক্ষতি হোক। তাই বাধ্য হয়েই সে গলায় খাবার ঠেসে ঢোকায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাজহা হঠাৎ এক ঝটকায় তৌসিরের হাতটা সরিয়ে দেয়। ভাবলেশহীন কণ্ঠে সে বলে, “হাত সরান।”
তৌসির কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে কিছুটা পিছিয়ে যায় নাজহার থেকে। তার চোখে ফুটে ওঠে এক ধরনের চাপা বেদনা, কিন্তু সে সেই বেদনা প্রকাশ করার সাহস পায় না। নাজহা খুব ধীরে ধীরে, পেটের ভার সামলাতে সামলাতে সামনে থাকা টুলটার ওপর বসে পড়ে। এই মুহূর্তে তার জন্য সোজা হয়ে বসাও বড্ড কষ্টের কাজ। তৌসির নাজহার হাত থেকে চিরুনিটা নিজের হাতে তুলে নেয় এবং খুব ধীরে ধীরে নাজহার এলোমেলো চুলগুলো আঁচড়ে দিতে শুরু করে। নাজহা এবারও কিছু বলে না, একদম মূর্তির মতো চুপচাপ বসে থাকে। আগের নাজহা হলে হয়তো জেদ দেখাতো, ছিটকে সরে যেতো তৌসিরের কাছ থেকে, রাগে চিৎকার করে উঠত। কিন্তু এখন আর তার সেই শক্তিটুকু অবশিষ্ট নেই, সামান্য নড়াচড়াতেই সে ভীষণভাবে হাঁপিয়ে যায়, বুকের ভেতর হাঁপরের মতো ওঠানামা করতে থাকে। নাজহার প্রায়শই মনে হয়, সে হয়তো আর বাঁচবে না। এই বয়সে গর্ভধারণ, তার ওপর আবার একসঙ্গে তিনটি সন্তান, তার এই ভগ্ন এবং দুর্বল শরীর আর কোনোভাবেই এই অসহ্য ধকল নিতে পারছে না। শরীর যেমন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে, মনটাও তেমন পুরোপুরি মরে গেছে। ভেতরে একটা শূন্যতা, একটা মরুভূমির মতো শুকনো অনুভূতি তাকে দিনরাত গ্রাস করে রাখে। হঠাৎ ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে নাজহা তৌসির কে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে, “আমি যদি এই পাপগুলোকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাই, তাহলে আমার জানাজায় আপনি কোনোভাবেই সামিল হবেন না তৌসির শিকদার।”
কথাটা শুনে তৌসিরের ভেতরটা প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে, মনে হয় তার কেউ তার বুকের ঠিক মাঝখানে ধারালো ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। এই নিয়ে ঠিক সাতবার নাজহা এই একই কথা উচ্চারণ করল। প্রতিবার এই কথা শোনার পর তৌসিরের ভেতরের মানুষটি সপ্রায় একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকে। তৌসির কোনো উত্তর দেয় না মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, তার হাতের চিরুনিটাও থেমে গেছে। তার এই নীরবতা দেখে নাজহা আবারও কঠিন এবং নির্মম গলায় বলে ওঠে, “আমি আপনাকে নিষেধ করলাম তৌসির শিকদার। আমার জানাজায় আপনি সামিল হবেন না, আমার কবরের এক মুঠো মাটিও আপনি ছুঁয়ে দেখবেন না। যদি এরপরও আপনি এমন কিছু করেন, মনে রাখবেন আমার রুহ আপনাকে আজীবন অভিশাপ দিয়ে যাবে।”
তৌসিরের আঙুলের ডগাগুলো থরথর করে কাঁপতে শুরু করে এ কথা শুনে। তার বুকের ঠিক ভেতরটায় সজোরে মোচড় দিয়ে ওঠে ওর মনে হয় কেউ বোধহয় ওর ফুসফুসটা চেপে ধরছে। তৌসির নিজের অসহ্য কষ্টটা গলার কাছে আটকে রেখে খুব ধীরে ভাঙা গলায় কোনোমতে উত্তর দেয়, “আচ্ছা।”
তৌসিরের মুখে এই সম্মতিসূচক ছোট্ট শব্দটি শুনে নাজহা হাসে। যেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, কোনো উষ্ণতা নেই, আছে শুধু এক বিকৃত তৃপ্তি। তৌসির খুব যত্ন করে, প্রতিটি চুল গুনে গুনে, নাজহার চুলগুলো সুন্দর করে বেঁধে দেয়। এরপর সে আস্তে করে হাঁটু গেড়ে নাজহার পায়ের কাছে বসে পড়ে। নাজহার ফুলে থাকা পেটে আদরে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় সে, এমনটা করল ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণগুলোকে সে নিঃশব্দে কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তারপর নাজহার পেটে কান পেতে চোখ বুজে দীর্ঘক্ষণ ধরে নিজের সন্তানদের অস্তিত্ব অনুভব করার চেষ্টা করতে থাকে তৌসির। সে শুনতে পাচ্ছে একটু হলেও শুনতে পাচ্ছে তাদের ছোট্ট ছোট্ট হৃৎস্পন্দন, সে অনুভব করতে পাচ্ছে তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নড়াচড়া। নাজহা তৌসিরের এই আবেগঘন মুহূর্তটি দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে, “আমি এখনো দিনরাত দোয়া করি, এরা যেন এই পেটেই মারা যায়। এরা এত সুস্থ কেন? এরা এখনো মরছে না কেন?”
কথাগুলো তৌসিরের বুকে ধারালো তীরের মতো বিদ্ধ হয়, তার বুকটা অসহ্য ব্যথায় ফেটে যেতে চায়। কিন্তু সে একেবারেই নিরুপায়, তার কিছুই বলার নেই। নাজহার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো কোনো মুখ তার অবশিষ্ট নেই। সে খুব ভালো করেই জানে, সে নিজে একজন পাপী, এক জঘন্য অপরাধী। আজ তার সেই পাপের মাশুলই এই সব কিছু। জীবনের সব ভুল হয়তো তারই ছিল, প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নিষ্ঠুর কাজ আজ ফিরে এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। তৌসির নীরবে মাথা নিচু করে নাজহার পেটে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার হাতের প্রতিটি স্পর্শে লুকিয়ে আছে এক অনুতপ্ত পিতার নিঃশব্দ ক্ষমা প্রার্থনা। নাজহা তৌসির কে ক্লান্ত এবং হাঁপানো গলায় বলে, “আমি ভীষণ হাঁপিয়ে যাই। কয়েক কদম হাঁটতে পারি না, হাঁপিয়ে যাই। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে আমার। শুধু ওয়াশরুমে যেতে মন চায়। আমি বাঁচব না, আপনার এই সন্তানদের জন্য আমি কিছুতেই বাঁচব না।”
তৌসির নাজহাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে এত বেশি অস্থির হতে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে নাজহার পিঠে নিজের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে সান্ত্বনার সুরে বলে, “নাজহা, শান্ত হ। আমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছি তোর এই যন্ত্রণা। আমি যদি আগে থেকে একটুও জানতাম যে পরিস্থিতি এরকম হবে তিনটে আমানাত চলে আসবে, তাহলে আমি নিজেই নষ্ট করিয়ে নিতাম। কিন্তু এখন আমি কী করব বল তো? এগুলো আল্লাহর দান, আল্লাহ নিজে থেকে দিয়ে দিয়েছেন। এখন এই দান ফেরানো তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
নাজহা তৌসিরের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, মনে হচ্ছে এই কথাগুলো তার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
রাত এখন ঠিক একটা। বোধহয় ঘড়ির কাঁটাটা থেমে গেছে এই মুহূর্তটাতে, মনে হয় সময় নিজেই দম বন্ধ করে দেখছে একটা ভাঙা মানুষকে। চারপাশে এমন এক নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, যে মনে হবে রাত নিজেই কান পেতে শুনছে একটি বিধ্বস্ত মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের ভেতর জমে থাকা না-বলা কথাগুলো। আকাশটা আজ বেশ ভারী, মেঘহীন অথচ অন্ধকার। চাঁদটাও আজ আড়ালে হয়তো সেও দেখতে চায়নি এই দৃশ্য।
শিকদার বাড়ির ছাদে একা বসে আছে তৌসির। একদম একা, নিঃশব্দে, পৃথিবীর সব মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো। তার পিঠ ঠেকে আছে পুরোনো ইটের রেলিংয়ে, যে রেলিংয়ের গায়ে শ্যাওলা জমেছে বছরের পর বছর, ঠিক যেমন তার বুকে জমেছে কষ্টের পরত। পা দুটো ছড়ানো সিমেন্টের ঠান্ডা মেঝেতে সেই ঠান্ডা তার পায়ের তলা দিয়ে উঠে আসছে মেরুদণ্ড বেয়ে, অথচ সে টের পাচ্ছে না। কারণ ভেতরের শীত বাইরের শীতকে ছাপিয়ে গেছে অনেক আগেই।
তৌসিরের চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। জীবনের জটিল সমীকরণগুলো মেলাতে গিয়ে সে বারবার হেরে যাচ্ছে, তালগোল পাকিয়ে ফেলছে সবকিছু। প্রতিটি যোগ-বিয়োগের শেষে, প্রতিটি ভুল হিসাবের শেষে দাঁড়িয়ে থাকে একটাই উত্তর, শূন্য। নিরেট, নিষ্ঠুর, নির্লজ্জ এক শূন্য।
হাতে তার মদের বোতল। অথচ একসময় এই জিনিসের ছায়াও মাড়াত না সে। এখন প্রতিটি রাতে এই তরল বিষ গিলে গিলে নিজেকে ভোলায়, ভোলাতে চায়। তার মনে হয়, এই তরলের প্রতি ঢোকের সঙ্গে একটু একটু করে স্মৃতি ধুয়ে যাবে, বোতলের তলানির সঙ্গে মুছে যাবে অতীতের প্রতিটি রক্তাক্ত ছবি। কিন্তু স্মৃতি বড় নাছোড়বান্দা, বড় নির্দয়। প্রতিটি চুমুকের সঙ্গে সে আরও জোরে ফিরে আসে, আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে মনে হয় মদ আসলে স্মৃতির সার, ভোলানোর নয় বরং মনে করিয়ে দেওয়ার ওষুধ। গ্লাসে থাকা শেষ চুমুকটুকু গলায় ঢেলে, যন্ত্রণায় কাতর ঝাপসা চোখে তৌসির গলা চড়িয়ে গাইতে শুরু করে এক ভাঙা সুরে,
তারে ধরতে পারলে মনোবেড়ি,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি,
দিতাম পাখির পায়।
কেমনে আসে যায়?
খাঁচার ভেতর অচিন পাখি,
কেমনে আসে যায়?
আটকুঠুরি নয় দরজা আঁটা,
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা।
আটকুঠুরি নয় দরজা আঁটা,
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা।
তার উপরে সদর কোঠা,
তার উপরে সদর কোঠা,
আয়না মহল তায়।
কেমনে আসে যায়?
সেদিন তৌসির চাইলেই নাজহার মাস্টার চাচ্চুকে বাঁচাতে পারত। ইচ্ছে হলে এক ইশারায় সব থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু সে বাঁচায়নি। মারতেও সে চায়নি, না সে, না ওয়াসেম, না ইয়াদ। তিনজনের কেউই সেদিন উনার রক্ত দেখতে চায়নি। কিন্তু না চাওয়া সত্ত্বেও তৌসিরকে মারতে হয়েছে উনাকে। সে বাধ্য ছিল, আর এই বাধ্যতার কারণ বিবিজান।
বিবিজানের কথা মানে আদেশ, অলঙ্ঘনীয় আদেশ, যে আদেশের সামনে যুক্তি দাঁড়ায় না, ভালোবাসা দাঁড়ায় না, এমনকি বিবেকও মাথা নিচু করে সরে যায়। এমন নয় যে সে বিবিজানকে ভালোবেসে তাই বাধ্য। তৌসির ভয়ে বাধ্য। এমন এক ভয়, যা তার রক্তের ভেতর মিশে গেছে, হাড়ের ভেতর বাসা বেঁধেছে, শ্বাসের সঙ্গে ভেতরে-বাইরে যাতায়াত করে। এই ভয় শুধু মৃত্যুর ভয় নয় এই ভয় নিজের প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয়, জীবন্ত নরক দেখার ভয়।
বিবিজান কোনো সাধারণ মানুষ নন। তিনি কালো জাদুর সর্দার, তন্ত্র-মন্ত্রের অন্ধকার রাজ্যের নিরঙ্কুশ শাসক। জিন দিয়ে সব করেন উনি। শক্তিশালী জিন পালন করেন তিনি, এমনভাবে পালন করেন, যেমনভাবে খামারিরা পশু পালন করে। তৌসির কি এতই বোকা যে সামান্য কারণে নাজহার সামনে তার মাস্টার চাচ্চুকে মেরে ফেলবে? না, সে এতটা নির্বোধ নয়। আগেই আঁচ করেছিল, হয়তো নাজহা গাদ্দারি করবে কিন্তু তাতে তৌসিরের কিছু যায়-আসে না, কারণ নাজহার সব দোষ তার কাছে আগেভাগেই মাফ। প্রতিটি অপরাধ, প্রতিটি অবিশ্বাস, প্রতিটি ঘৃণার দৃষ্টি, প্রতিটি না-বলা অভিশাপ, সব তার কাছে মাফ। মাফ, মাফ আর মাফ।
তবে এবারের পরিকল্পনা সে নিজে থেকে করতে চায়নি। নাজহাকে নিজের অতীত বলতেও চায়নি, কিন্তু বিবিজান তাকে বাধ্য করেছেন। শাসিয়েছেন এক ঠান্ডা কণ্ঠে, যে কণ্ঠ শুনলে মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত নেমে যায়, “যদি নাজহার কারণে অবাধ্য হস, তাহলে নাজহাকে দুনিয়াতেই মৃত্যুর স্বাদ দেখানো হবে।” একটু এদিক-ওদিক হলেই শেষ।আগে শুধু ভালোবাসাই যথেষ্ট ছিল তৌসিরকে বশে রাখতে। কোনো ভয় দেখাতে হতো না। বিবিজান বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে আয়ত্তে রাখতেন। কিন্তু এখন বিয়ের পর নাজহা হাতিয়ার হয়ে গেছে বিবিজানের, সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হয়ে গেছে সে। নাজহা এখন আর শুধু তৌসিরের বউ নয়, সে তার দুর্বলতা, তার শৃঙ্খল, তার গলায় বাঁধা অদৃশ্য ফাঁস। বিয়ের পর থেকে যখন বিবিজান দেখলেন তৌসির নাজহার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখন থেকেই নাজহার ক্ষতির ভয় দেখিয়ে একের পর এক হুমকি দিতে থাকেন তাকে।
সেদিন আসলে তালহা ভাইকে মারতে বলেছেন বিবিজান। আদেশ ছিল স্পষ্ট আর পরিষ্কার তা হলো রক্ত চাই, এবং সেই রক্ত হতে হবে তালহার। কিন্তু তৌসির অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, অনেক কষ্টে মাস্টার চাচ্চুকে দিয়ে কাজ সারিয়েছে। কারণ সে জানে, তালহা ভাইয়ের জন্য নাজহা পাগল। সেই পাগলামি সে নিজের চোখে দেখেছে, বহুবার। নাজহার চোখের কোণে তালহার নাম শুনলেই যে আলো ফুটে ওঠে, ঠোঁটের কোণে অজান্তে যে হাসির রেখা ভেসে ওঠে, কথা বলার সময় গলার স্বরে যে কোমলতা আসে, সেটা তৌসির চিনতে পেরেছে। প্রথমবার চিনে বুকটা মুচড়ে উঠেছিল, কিন্তু পরে সে মেনে নিয়েছে। আর সেই পাগলামিতে সে কখনো ঈর্ষা দেখায়নি, কারণ সেই পাগলামিতে সে সম্মান দেখেছে, শ্রদ্ধা দেখেছে। কারণ সে জানে, ভালোবাসার ওপর কারো জোর চলে না, ভালোবাসা ঠিকানা বদলায় না আদেশে। সে কিছুতেই চায় না নাজহা তালহা ভাইয়ের লাশ দেখুক, কিছুতেই না। সেই দৃশ্যের কথা ভাবলেই তৌসিরের বুক কেঁপে ওঠে, কারণ সে জানে, সেদিন নাজহার ভেতরের মানুষটাও মরে যাবে। চোখের আলো নিভে যাবে চিরতরে, ঠোঁটের হাসি শুকিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। আর সেটা তৌসির সহ্য করতে পারবে না।
পুষ্প তো অনেক আগেই মারা গেছে। অনেক, অনেক আগে। কারণ বিবিজান পুষ্পকে গাদ্দার ধরে ফেলেছিলেন, আর তার মধ্যে নাযেম চাচা বিবিজানের অবাধ্য হয়েছিলেন বলে, পুষ্পকে কুঠুরিতে বন্দী করা হয়েছিল। আজ যে পুষ্প সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যে রান্নাঘরে হাসে বাড়ির সব কাজ সমলায়, যে নাযেম চাচার পাশে শোয়, সে আসলে একটা জিন। বিবিজানের পালা জিন, পুষ্পের রূপ ধরে রাখা একটা ছায়া, একটা প্রতারণা। যে একটা চলমান মিথ্যা হয়ে আছে।
বিবিজান ডাইনির চেয়েও ভয়াবহ। ডাইনির গল্পেও এমন নৃশংসতা থাকে না, রূপকথার সবচেয়ে কালো অধ্যায়েও এমন বর্বরতা লেখা হয়নি। পুষ্পকে অনেক বাজেভাবে তিনি মেরেছেন। কুঠির বন্দী পুষ্পের শরীরে পোকা বাসা বেঁধেছিল, জিন দিয়ে দিনের পর দিন তাকে ধর্ষণ করানো হয়েছিল। তার জ্যান্ত শরীরে পোকা কিলবিল করে নড়াচড়া করত, মাংস কুরে কুরে খেত, আর পুষ্প তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত। চিৎকার করার ক্ষমতা পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তার, গলায় জাদুর তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শেষে তার বুকের দুই স্তন পুড়িয়ে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।
আর এইসব দৃশ্য তৌসির নিজের চোখে দেখেছে। দেখতে বাধ্য করা হয়েছিল, কারণ বিবিজান চেয়েছিলেন তার চোখে এই দৃশ্য স্থায়ীভাবে গেঁথে দিতে, যাতে সে কোনোদিন অবাধ্য হওয়ার কথাও না ভাবে। সেই দিনের পর থেকে তার সাহস হয় না বিবিজানের অবাধ্য হওয়ার; রাতের পর রাত সেই দৃশ্য তার স্বপ্নে আসে, ঘুম ভেঙে যায় ঘামে ভিজে যায় শরীর।
কারণ সে জানে, অবাধ্য হলে নাজহার পরিণতিও ঠিক এমনই হবে, হয়তো এর চেয়েও ভয়ংকর, হয়তো আরও সৃজনশীল কোনো নৃশংসতা অপেক্ষা করবে নাজহার জন্য। তাই সে কুকুরের মতো বিবিজানের কথায় ওঠে আর বসে, লেজ গুটিয়ে আদেশ মানে, নিজের মনুষ্যত্বকে প্রতিদিন একটু একটু করে কবর দিতে দিতে, নিজের আত্মাকে প্রতিরাতে একটু একটু করে বিক্রি করতে করতে। মূলত তৌসিরের জীবন কখনোই ভালো কাটেনি, কখনোই না। ভালো বলে কোনো শব্দ তার অভিধানে কোনোদিন ছিল না। ছোটবেলায় বিবিজান তাকে নিয়ে আসার পর থেকে শুরু হয় অমানুষিক অত্যাচারের সেই কালো অধ্যায়, এমন এক অধ্যায়, যার পাতায় পাতায় শুধু রক্ত, পুঁজ আর কান্না। তাকে শক্তিশালী করার নাম করে জিনের মাধ্যমে তার শরীরে বিভিন্ন পশুর রক্ত ঢোকানো হতো। প্রতিটি রক্ত শরীরে ঢুকত আগুনের মতো জ্বলতে জ্বলতে, প্রতিটি ফোঁটা শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ত পোড়া যন্ত্রণা হয়ে। ছোট্ট তৌসিরের সারা শরীর ভরে যেত ঘা আর পুঁজে। ঘা-তে পোকা ধরত, সেগুলো থেকে পুঁজ ঝরত দিনরাত, সেই দুর্গন্ধে নিজের শরীরই সহ্য হতো না নিজের। দুই হাত বেঁধে কুঠুরিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো, পা মাটি থেকে আধ হাত উপরে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কখনো সারাদিন। কাঁধের জোড়া আলগা হয়ে যেত, হাতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেত, আঙুল নীল হয়ে যেত। ঘায়ে ভরা জায়গায় চাবুক মেরে তারপর লবণ লাগানো হতো, যাতে ব্যথা যেন কখনো না কমে, যেন ক্ষত কোনোদিন না শুকায়। হাত-পা ভেঙে দেওয়া হতো হাতুড়ির এক ঘায়ে, পরে জিনরা সেগুলো জোড়া লাগাত। এটাও ছিল জিনদের পরীক্ষা, কে কত নিখুঁতভাবে একটা মানুষের ভাঙা শরীর জোড়া দিতে পারে, কে কত দক্ষ কারিগর।
তৌসির সবসময় বলে, “ওরা আমাকে নিজেদের মতো করে বড় করেছে।” এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য, প্রতিটি শব্দে সত্য, প্রতিটি বিরামচিহ্নে সত্য। এই যে তারা নিজের মতো করে বড় করতেন, নিজের মতো নির্যাতন করতেন। তবে এসবে তার বাবা-চাচারা জড়িত ছিলেন না সবই বিবিজান আর দাদাজানের কীর্তি। নাযেম আর মিনহাজের সঙ্গেও তিনি এসব করেছেন, কিন্তু তৌসিরের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি করতেন। কারণ সে ছিল প্রতিশোধের নেশা।
ভাবা যায়, একজন মানুষ কতটা পাষাণ হলে দশ বছরের একটা বাচ্চার পচা ঘা-ধরা চামড়া নখ দিয়ে খাবলে তুলতে পারে? কতটা নিষ্ঠুর হলে সেই বাচ্চার চোখের পানি দেখেও হাসতে পারে? আহা, তৌসিরের সেই চিৎকার, সেই অসহায় কান্না, “বিবিজান, ছেড়ে দাও, আর পারছি না, আমি মরে যাব”, কোনো পাথরকেও গলিয়ে দিত, কিন্তু বিবিজানের চোখে এক ফোঁটা পানিও আসত না। তার চোখ দুটো ছিল কাঁচের, যেখানে কোনো অনুভূতির প্রতিফলন পড়ত না। বিবিজান তার সঙ্গে যা করেছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন ভাষা সেখানে অপ্রতুল, শব্দ সেখানে দীন। মেরে আধমরা করা, নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরানো ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার, সবই ছিল তখন সকালের নাশতার মতোই স্বাভাবিক, রুটিনের অংশ। নিজের শরীরের চামড়া তুলে তাকে সেই ক্ষতের রক্ত চুষতে বাধ্য করতেন তিনি। অনেক সময় তৃষ্ণায় তৌসিরকে নিজের প্রস্রাব নিজে খেতে হয়েছে। অনেক সময় তো খাবারের নামে বিবিজান তাকে দিতেন পচা নাড়িভুঁড়ি, যা দেখলে পশুও মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা শুঁকলে বমি আসে। দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা হতো, যাতে ক্ষুধার জ্বালায় সে সব মেনে নিতে শেখে, যাতে পেটের আগুনে আত্মসম্মান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জিনদের দিয়ে তার শরীর আঁচড়ানো হতো, রক্ত খাওয়ানো হতো।
টানা এক-দুই বছর এই নির্যাতনের ভেতর দিয়ে তাকে বিবিজানের পূর্ণ বশে আনা হয়েছিল। দশ বছরের একটা বাচ্চা, যার এই বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, অথচ তখন সে শিখেছিল কীভাবে চিৎকার চাপতে হয়, কীভাবে চোখের পানি ফেলতে হয়, কীভাবে নিজের মৃত্যু কামনা করতে হয়।
তৌসির চাইলেই হয়তো বিবিজানকে মেরে ফেলতে পারত, পরে যখন সে বড় হয়েছে, ক্ষমতা পেয়েছে, তখন। কিন্তু সেই সময়ও সেটা অসম্ভব ছিল, কারণ আশ্রয় দরকার ছিল, প্রতিশোধ দরকার ছিল, আর সবার আগে দরকার ছিল সেই অন্ধকারের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছানো। শুধু গাছটা কাটলে হবে না, শেকড় উপড়াতে হবে। আর আজও সেই দুটোর জন্যই সে বাকরুদ্ধ আজও সে সেই দশ বছরের বাচ্চাটাই, যে কুঠুরির কোণে বসে কাঁদে, যে এখনো বিবিজানের পায়ের শব্দ শুনলে কেঁপে ওঠে।
তৌসির চায় না তার সন্তানও এই অভিশাপের ভেতর জন্ম নিক। চায় না, কিছুতেই চায় না। সন্তানের খবর যখন প্রথম কানে এল, তখন আনন্দ নয়, একটা ঠান্ডা আতঙ্ক তার বুকের ভেতর সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল, ফণা তুলে দাঁড়িয়ে গেল। বাবা হওয়ার যে কোমল অনুভূতি অন্য সব পুরুষের বুকে জাগে, তার বুকে সেই জায়গায় জেগে উঠল ভয়, এক অপার্থিব ভয়। তৌসির কোনোমতে কল্পনা করতে পারে না, তার ছেলে মেয়ে এই বাড়ির ছায়ায় বড় হচ্ছে, বিবিজানের কোলে বসে আছে, তার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখছে, তার হাত থেকে ভাত খাচ্ছে। এই ভাবনাটাই তৌসিরের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, শ্বাস ভারী করেছে, চোখে অন্ধকার নামিয়ে এনেছে। তৌসির এখন ভ্রম দেখে সে দেখতে পায়, তার ছোট্ট সন্তান কুঠুরিতে ঝুলছে, তার শরীরে পোকা ধরছে, তার শরীরে পশুর রক্ত ঢোকানো হচ্ছে, ঠিক যেমন তার সঙ্গে হয়েছিল। এই দৃশ্য তৌসিরকে পাগল করে দিচ্ছে। মাথা চড়া দিয়ে ওঠে যখনি এসব ভাবে। মাঝেমধ্যে মন চায় নাজহা কে পালিয়ে নিয়ে চলে যেতে কিন্তু তা অসম্ভব।
তবে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, যেটা থেকে আর ফেরার পথ নেই, যেটা থেকে পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। খলিলকে মেরেই বিবিজান আর দাদাজানকে সরিয়ে দেবে সে। এক কোপে এই কালো বংশের শেকড় উপড়ে ফেলবে, যে শেকড় বহু প্রজন্ম ধরে রক্ত শুষে নিয়েছে নিরীহ মানুষের। সে জানে, এর পরিণতিতে তাদের পোষা জিনগুলো তাকেও মেরে ফেলবে, ছিঁড়ে কুটিকুটি করবে তার শরীর, তার মাংস ছিন্নভিন্ন করে চারদিকে ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু তার কিছুই করার নেই। কারণ তৌসির যদি না মরে, তাহলে তার সন্তান আর নাজহা কখনোই ভালো থাকবে না। তাকে মরতেই হবে।
এই মৃত্যুটাই হবে নাহয় তার শেষ ভালোবাসার চিঠি, যেটা কোনোদিন নাজহার হাতে পৌঁছাবে না, কিন্তু তবু লেখা হবে, তার রক্ত দিয়ে লেখা হবে, তার প্রাণ দিয়ে লেখা হবে। আত্মত্যাগই তার শেষ ভালোবাসার ভাষা। শব্দে যা সে কোনোদিন নাজহাকে বলতে পারেনি, মৃত্যু দিয়ে সে তাই বলে যাবে।
ছোটবেলার সেই যন্ত্রণা পেরিয়ে তৌসির একসময় বড় হলো। দাপট পেয়েছিল, ক্ষমতা পেয়েছিল মানুষ তার নাম শুনলে চমকে উঠত, পথ ছেড়ে দিত। সব ঠিকঠাকই চলছিল, অন্তত বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো একটা স্বাভাবিক জীবন, একটা সফল মানুষের গল্প।
কিন্তু চব্বিশের দিকে, শেখ হাসিনার শাসনামলে, কোটা আন্দোলনের ঠিক দুই মাস আগে সে গুম হয়ে যায়। ঢাকার মিরপুরে এক কাজে গিয়েছিল, কাজ শেষ হতে না হতেই সাদা পোশাকে কয়েকজন তাকে গাড়িতে তুলে নেয়। চোখ বেঁধে ফেলা হয় কালো কাপড়ে, মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয় যাতে চিৎকার না করতে পারে। হাতে পরানো হয় শক্ত হাতকড়া, পায়ে শিকল। সেখান থেকেই তার ঠিকানা হয়ে যায় কুখ্যাত আয়নাঘরে। জানালাবিহীন কংক্রিটের কুঠুরিতে দিন-রাতের কোনো পার্থক্য বোঝার উপায় ছিল না তার। সময় সেখানে থেমে গিয়েছিল, অথবা পচে গিয়েছিল কোথাও এক কোণে। ঘড়ি ছিল না, ক্যালেন্ডার ছিল না, সূর্যের মুখ ছিল না, এমনকি নিজের নামও মাঝে মাঝে ভুলে যেত সে। হাই-স্পিড এক্সজস্ট ফ্যানের বিকট শব্দ মাথার ভেতর ঢুকে যেত, মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে কেঁপে কেঁপে উঠত মানসিক ভারসাম্য প্রায় ভেঙে দিয়েছিল সেই একটানা গর্জন। সেই শব্দ এখনো তার কানে বাজে, ঘুমের ভেতরও বাজে। তাকে ঘুমাতে দেওয়া হতো না চোখ বুজে এলেই গায়ে বরফশীতল পানি ছিটানো হতো,ওখানে ঘুম মানুষের জন্য বিলাসিতা ছিল বিশ্রাম একটা অপরাধ ছিল।
হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় চোখ বেঁধে সিলিংয়ের হুকে ঝুলিয়ে রাখা হতো কাঁধের জোড়া আলগা হয়ে যেত, হাত অসাড় হয়ে যেত, কিন্তু চিৎকার করার অনুমতি ছিল না। চিৎকার করলেই মুখে ভরে দেওয়া হতো নোংরা ন্যাকড়া। ভারী বুটের লাথি, পাইপের আঘাত, সংবেদনশীল অঙ্গে ইলেকট্রিক শক ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার, এক মুহূর্তের অবসর ছিল না। প্রশ্ন ছিল না, উত্তর ছিল না, শুধু ছিল ব্যথা আর ব্যথা, যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। আর এটাই আয়না ঘর। বিএনপি করার দোষী আর হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলার শাস্তি ছিল। ওখানে চব্বিশ ঘণ্টা লোহার হাতকড়া আর ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হতো, এমনকি টয়লেট বা ঘুমের সময়েও, যেন সে একটা পশু, যাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়া যাবে না, যাকে এক মুহূর্তের জন্য মানুষ ভাবা যাবে না। খাবার বলতে ছিল বাসি, পচা ভাত আর দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি, যা গিলতে গেলে বমি আসত, কিন্তু না গিললে মরে যেতে হতো। বেঁচে থাকতে হলে গিলতেই হতো সেই অপমান, সেই নরক।
কোটা আন্দোলনের পর কোনোভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে সে বাড়ি ফিরেছিল। ফিরেছিল ঠিকই, কিন্তু যে তৌসির ফিরেছিল, সে আর আগের তৌসির নয়। শরীরটা ফিরেছিল, ভেতরের মানুষটা সেই কংক্রিটের কুঠুরিতেই রয়ে গিয়েছিল।
তৌসির এবার সব ভাবনা ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। হাঁটু কাঁপছে তার, মাথা ঘুরছে কিন্তু তাও সে দাঁড়ায়। তার দাঁড়াতেই হবে, কারণ পড়ে গেলে আর উঠতে পারবে না পড়ে গেলে এই ছাদেই হয়তো ভোর হয়ে যাবে। সামনে রাখা গ্লাসের পানি দিয়ে কুলি করে মুখ ধোয়। মদের তেতো স্বাদ মুখ থেকে যাচ্ছে না। কুলি করা শেষে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। বর্তমানে তৌসির খুব অসহায়, খুবই অসহায়। তার নিজের গল্পের সবচেয়ে অসহায় প্রাণটাই সে, যে গল্পে সে নায়কও নয়, খলনায়কও নয়, শুধু একটা পিষে যাওয়া চরিত্র, যাকে কেউ মনে রাখবে না, যার জন্য কেউ কাঁদবে না, যার নাম কেউ মুখে আনবে না। জীবনে সে শুধু দুঃখই পেয়েছে ভালোবাসা পেলেও তা পেয়েছে কাঁটার মতো করে, যেটা ধরতে গেলেই হাত কেটে যায়, যেটা বুকে চেপে ধরলেই রক্ত ঝরে যায়। সুখ তার ভাগ্যে লেখা ছিল না, হবেও না। কারণ তৌসির জানে, খুব ভালো করেই জানে, এক নিষ্ঠুর সত্যের মতো সে জানে,”তৌসিররা কখনো সুখী হয় না। ভাগ্যের খাতায় তৌসিরদের জন্য কোনো সুখ লেখা থাকে না তাদের প্রাপ্তির ঝুলিতে থাকে শুধুই সুখী মানুষের মতো অভিনয় করার একটি সুন্দর সুখী মুখোশ।”
তৌসিরের নামের পাশে হয়তো নিয়তি কখনো ‘সুখ’ শব্দটি বসায়নি। তার ভাগ্যে শুধু একটি মুখোশি আছে যা বাইরে রঙিন, ভেতরে শূন্য পৃথিবী যাকে দেখে ‘সুখী’ বলে ভুল করে,অথচ সে নিজেই জানে সুখী থাকা আর সুখী দেখানোর মাঝে কতটা দূরত্ব।
ঘরে পা রাখতেই তৌসিরের চোখ আটকে যায় বিছানার দিকে। নাজহা বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে, যন্ত্রণায় তার সমস্ত মুখটা কুঁচকে গেছে। পায়ের ভেতর থেকে উঠে আসা তীব্র ব্যথায় সে ছটফট করছে, আঙুলগুলো বারবার মুঠো হয়ে যাচ্ছে আবার আলগা হয়ে আসছে। তৌসিরের বুকের ভেতরে এখন এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় বইছে, হাহাকারে দীর্ণ হয়ে যাচ্ছে তার সমস্ত সত্তা। তবু সে এক নিমেষে সবকিছু চেপে রাখে। ঠোঁটের কোণে কষ্টে ফুটিয়ে তোলে একটুখানি ম্লান হাসি, এই হাসিটুকুই তার শেষ আশ্রয়। ধীর, নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে গিয়ে সে বসে নাজহার পায়ের কাছে। তারপর অতি যত্নে নাজহার পা দুটি নিজের কোলে তুলে নেয়, তার পায়ের ক্লান্ত আঙুলে আস্তে আস্তে টিপে দিতে থাকে। আর্দ্র, ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে, “পায়ে খুব লাগছে রে?”
নাজহা কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে তৌসিরের ক্লান্ত, মলিন মুখখানির দিকে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাজহা শূন্য, নিস্পৃহ কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “কী হয়েছে আপনার? চোখ দুটো এমন লাল কেন? কাঁদছিলেন?”
নাজহার কণ্ঠের এই আকস্মিক নরম সুর তৌসিরের বুকে গিয়ে তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বিঁধে যায়। যে নাজহা এতদিন তাকে শুধু ঘৃণার আগুনে পুড়িয়েছে, সেই নাজহার গলায় হঠাৎ এতটুকু কোমলতা তার সহ্যের সীমা ভেঙে দিতে চায়। তাও সে নিজেকে সামলে নেয়। এক কৃত্রিম হাসির আড়ালে নিজের সমস্ত ক্লান্তি লুকিয়ে বলে, “কাঁদব কেন? এমনিতেই চোখ লাল হইয়া আছে।”
কিন্তু নাজহা তো দমে যাওয়ার মেয়ে নয়। তার ধারালো শব্দবাণ আবারও ছুটে আসে তৌসিরের দিকে। এক চাপা তিক্ততায় সে বলে ওঠে, “এখন তো আপনার আনন্দের সময়, তৌসির শিকদার। আপনার সন্তান পৃথিবীতে আসছে, আপনার জীবনের সমস্ত অপূর্ণতা পূর্ণ হতে চলেছে। তাহলে আপনার ভেতরে এত বিশৃঙ্খলা কেন? নাকি শেষ পর্যন্ত আমার অভিশাপই আপনাকে গ্রাস করল? যদি করে থাকে, তবে আলহামদুলিল্লাহ আর যদি না-ও লেগে থাকে, তবু আলহামদুলিল্লাহ।”
এই নির্মম কথাগুলো তৌসিরের সহ্যসীমা একেবারে ছাড়িয়ে যায়। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। আচমকা নাজহার পা দুটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের কাছে টেনে নেয়। অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে, রুদ্ধশ্বাসে কাঁপা গলায় বলে ওঠে, “নাজহা, আমি যদি মরে যাই, তুই আমার বাচ্চাদের আগলে রাখিস। ওরা আমার অস্তিত্ব বলে ওদের তুই শেষ করে দিস না আবার। অবুঝ বাচ্চাগুলোর তো কোনো দোষ নাই। আমি স্বীকার করছি, আমি অপরাধী। তোর নিষ্পাপ চাচাকে সন্দেহ করে আমি খুন করেছি, পাপ করেছি। কিন্তু আমার এই অনাগত সন্তানদের তো কোনো অপরাধ নাই। আমি মইরা গেলে ওদের বাঁচিয়ে রাখবি তো? বল না, রাখবি? আর যদি মেরেই ফেলিস, তবে ওদের আমার কবরের পাশেই শুইয়ে দিস। এর বাইরে তোকে আর কিছু বলার মুখ আমার নাই, নাজহা।”
কথাগুলো বলতে বলতে তৌসির নাজহার পা দুটি আঁকড়ে ধরে মাথা নিচু করে ফেলে। তার শক্তপোক্ত কাঁধ দুটো নিঃশব্দ কান্নায় কাঁপতে থাকে। এই অশ্রু তৌসির শিকদার নামের নিষ্ঠুর, দয়ামায়াহীন, পাষাণহৃদয় মানুষটার নয়। এ এক অসহায় পিতার বুকফাটা আর্তনাদ। এ সেই পিতার হাহাকার, যে পিতা জানে, তার রক্তে গড়া ছোট্ট ছোট্ট মুখগুলো হয়তো সে কোনোদিন দেখতেই পারবে না। যে পিতা জানে, “বাবা” ডাকটা শোনার আগেই হয়তো নিভে যাবে তার জীবনপ্রদীপ। যে পিতা জানে, তার সন্তানরা একদিন বড় হবে, কিন্তু তার কোলে চড়ে নয়, তার আঙুল ধরে হাঁটতে শিখে নয়, বরং তার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে।
এ সেই বাবার কান্না, যে বাবা কোনোদিন তার ছেলেমেয়েদের কপালে চুমু এঁকে দিতে পারবে না, প্রথম স্কুলের দিনে হাত ধরে পৌঁছে দিতে পারবে না, “মা” বলে মেয়েকে কোলে নিতে পারবে না, “বাবা” বলে ছেলেকে কাঁধে তুলতে পারবে না। এ সেই বাবার বুকভাঙা কান্না, যার সমস্ত স্বপ্ন, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা মৃত্যুর ঠান্ডা হাতের নিচে চাপা পড়তে চলেছে।
তৌসিরের এই অচেনা রূপ দেখে নাজহার বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। নাজহার গলার কাছে কী একটা প্রায় দলা পাকিয়ে ওঠে, তাও সে নিজের কাঁপা, অবাধ্য কণ্ঠস্বরকে কোনোমতে শক্ত করে বলে ওঠে, “আপনি মারা যাবেন মানে? তামাশা করছেন আমার সাথে? এ কেমন নিষ্ঠুর তামাশা, তৌসির শিকদার? আমার গর্ভে এই তিন তিনটে সন্তান সঁপে দিয়ে আপনি এখন মৃত্যুর কথা বলছেন? এত বড় অন্যায় কীভাবে করতে পারেন আপনি? মরার এত শখ যদি থাকত, আগে মরলেন না কেন? তাহলে তো এই অভাগী নাজহা এদের অনেক আগেই শেষ করে দিত। এখন মাঝপথে এসে, আমাকে এভাবে একা ফেলে নিজে দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন? বাহানা মারাচ্ছেন। শুনুন তৌসির শিকদার, ভালো করে শুনুন, এসব অজুহাত দিয়ে আপনি পার পাবেন না, কিছুতেই পাবেন না। আপনি এখন আর শুধু তৌসির শিকদার নন। আপনি এখন এই তিন সন্তানের বাবা, আমার বৈধ স্বামী। আপনি চলে গেলে আমি এই অনাগত সন্তানদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব? কার কাছে গিয়ে মাথা গুঁজব? কে আমাকে আশ্রয় দেবে, কে এদের বাবা ডাকার অধিকার দেবে?”
এতটুকু বলে নাজহা থামে। বুকের ভেতরটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তারপর সে নিজের ফুলা পেটের দিকে কাঁপা কাঁপা হাতে ইশারা করে বলে, “এই পেটের সন্তানগুলোর জন্য হলেও আপনাকে বাঁচতে হবে, তৌসির। ওরা এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি, ওদের বাবার মুখটাও দেখেনি, অথচ আপনি বাবা হওয়ার আগেই বাবাহীন করে দিতে চাইছেন ওদের? আর কত নিষ্ঠুর হবেন শুনি? পশু তো হয়ে গেছেন মানুষ রূপে, বাবা রূপে অন্তত বাহানা বানিয়ে পালানোর ধান্দা করিয়েন না।”
তৌসির একটা দীর্ঘ, তপ্ত, পোড়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সেই দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে গোটা জীবনের জমে থাকা সমস্ত আক্ষেপ, সমস্ত অনুতাপ, সমস্ত না-পাওয়ার বেদনা। ধীরে ধীরে সে মাথা তুলে তাকায় নাজহার রাগি আর যন্ত্রণাকাতর চোখের দিকে। অসীম আকুলতায় তৌসির ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসে নাজহার দিকে। অপার মমতায়, কাঁপা কাঁপা দুই হাতে সে আলতো করে জড়িয়ে ধরে নাজহার পেটটা, ঠিক তেমন করে যেমন করে মানুষ ছোঁয় কাচের তৈরি কোনো অমূল্য সম্পদ কে, যা একটু জোরে ছুঁলেই ভেঙে যাবে। তারপর সে কোণাকুণি হয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায়, এমন সতর্কতার সাথে, যাতে তার শরীরের বিন্দুমাত্র ভারও নাজহার ওপর গিয়ে না পড়ে।
আর তারপর তারপর এক উন্মাদের মতো, এক পাগলপ্রায় পিতার মতো সে বারবার চুমু খেতে থাকে নাজহার পেটে। প্রতিটা চুমুতে সে ঢেলে দিচ্ছে তার জীবনের সঞ্চিত সমস্ত স্নেহ, সমস্ত আদর, সমস্ত পিতৃত্ব। এই চুমুগুলোই তার পিতৃস্নেহের সাক্ষ্য, এই স্পর্শগুলোই হবে তার সন্তানদের প্রতি তার একমাত্র উত্তরাধিকার। তৌসিরের দুই চোখ বেয়ে অবিরাম, অশান্ত অশ্রুধারা ঝরে পড়তে থাকে ফোঁটায় ফোঁটায়। যা ভিজিয়ে দিতে থাকে নাজহার পেটের চারপাশের নরম ত্বক।
লোকে বলে, পুরুষমানুষ নাকি কাঁদে না। পুরুষের চোখে নাকি জল মানায় না। পুরুষ নাকি পাথরের মতো শক্ত, লোহার মতো অটল। কিন্তু সেই কঠিন পুরুষ যখন পিতা হয়ে ওঠে, যখন তার বুকের ভেতর জন্ম নেয় এক নতুন প্রাণের প্রতি অসীম মমতা, তখন সেই পাথরও মোমের মতো গলে যায়, সেই লোহাও জলের মতো তরল হয়ে যায়। এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায় সমস্ত পৌরুষের অহংকার, সমস্ত কঠোরতার মুখোশ।
তৌসির শিকদারের মতো নিষ্ঠুর, হিংস্র, ভয়ংকর মানুষটাও আজ নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে এক অসহায় পিতার রূপ ধারণ করে। তার একমাত্র যন্ত্রণা, একমাত্র দুঃসহ বেদনা, সে তার সন্তানদের বেশিদিন বুকে আগলে রাখতে পারবে না। সে হয়তো দেখে যেতে পারবে না তার রক্তে গড়া ছোট্ট হাতগুলো, ছোট্ট পায়ের প্রথম পদক্ষেপ, প্রথম হাসি, প্রথম কান্না। সে শুনে যেতে পারবে না তার কানে সবচেয়ে মধুর সেই “বাবা” ডাকটা। আর এই অসহ্য সত্যটাই আজ তৌসির শিকদার নামের দুর্ধর্ষ পুরুষটাকে এক নিঃস্ব, রিক্ত, ভেঙে পড়া পিতায় রূপান্তরিত করছে। তৌসির কাঁদছে নিজের নিকটে নিবিড় হয়ে আসা মৃত্যু নিয়ে আর নাজহা মনে মনে কাদঁছে তাদের একটা সুন্দর সংসার হয়েও হলো না ই যন্ত্রণায়।
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫৭
কেমন হয়েছে বলবেন? আর আপনারা তো রেসপন্স করেন না আগের মতো। যদি না করেন তাহলে অফ করে দিব হয়তো আমারো বিরক্ত লাগছে এ গল্প লিখতে লিখতে। তাই চলবে লিখলাম না। কারণ নিশ্চিত নই।
