হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২২
সাবা খান
রাতের গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে জাওয়ান ম্যানশনের বেজমেন্ট। মাটি কাঁপানো গুলির শব্দ, ধোঁয়ার তীব্র গন্ধ আর রক্তের গন্ধে পুরো জায়গাটা যেন এক নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মৃতদেহ তাদের মধ্যে কেউ ইন্টারপোল অফিসার, কেউ সারহাদের গার্ড, আবার কেউ সোফিয়ার আলফা টিমের সদস্য। দেয়ালের গায়ে ছিটকে থাকা রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে গেছে, আর মাঝেমধ্যে কোথাও কোথাও আহতদের কাতর শব্দ সেই নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছে।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে সোফিয়া জাওয়ান। তার হাতে ধরা বন্দুকটা সোজা তাক করা সারহাদের দিকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার নিজের মাথায় ঠেকানো হয় আরেকটা ঠান্ডা বন্দুকের নল। সে পিছনে থাকা ব্যক্তিকে দেখে থমকে যায়। অবিশ্বাসের সুরে ফিসফিস করে বের হয় একটা নাম,
–“জিহাদ…”
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জিহাদের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা শীতল ঠান্ডা হাসি। না সে চোখ নামায়, না তার হাত কাঁপছে। সোফিয়া এক পলক তাকিয়েই সব বুঝে যায়, এই হাসি, এই দৃষ্টি, এটা বিশ্বাসঘাতকের। তার চোখের মণি সংকুচিত হয়ে আসে। সে এখনো নিজের বিস্মিত নয়ন জোড়া কে বিশ্বাস করাতে পারছে না এমনটা জিহাদ করতে পারে।
হ্যাঁ, সেটা জিহাদই ছিল, যে সারহাদকে এই বেজমেন্টের প্রতিটা দরজার পাসওয়ার্ড দিয়েছে। যে তার আশেপাশে থেকে বছরের পর বছর তারই ছায়া হয়ে ছিল। সারহাদ তাকে পাঠিয়েছে, প্রথমে সোফিয়ার বিশ্বাস অর্জন করতে। যদিও সোফিয়া কাউকে এত সহজে বিশ্বাস করে না তবুও জিহাদ আব্বাসের ভাই বলে তার উপর কোন দ্বিধা ছিল না। যাকে সোফিয়া নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষ ভাবত সেই মানুষটাই আজ তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। এক মুহূর্তের জন্যও সে কিছু বলতে পারে না। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট নড়ে,
–“তুই…?”
সোফিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশ থেকে একটা চিৎকার ভেসে আসে,
–“জিহাদ, তুই কী করছিস এসব?”
আব্বাসের চোখ রক্তিম, মুখে অবিশ্বাস আর রাগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে জিহাদের দিকে তাকিয়ে দন্ত চেপে বলে,
–“তুই লেডির দিকে বন্দুক তুলেছিস?
তুই কি ভুলে গেছিস আমরা কার অধীনে কাজ করি?
আমাদের পরিবারের শিক্ষা?
আমাদের বাবার কথা?”
জিহাদ তার কথার তোয়াক্কা না করে এখনো বন্দুক টা ঠেকিয়ে রেখেছে। জিহাদ রাগে থরথর করে কেঁপে আরো জোরে ধমকে উঠে,
–“জিহাদ….আমাদের বাবা শিখিয়েছিল?
যার আশ্রয়ে থাকবি, তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকবি। আর তুই… তুই আজ সেই মানুষটার দিকেই বন্দুক তাক করেছিস?”
জিহাদের চোখে তখন আগুন জ্বলছে, হঠাৎ সে গর্জে ওঠে,
–“আমি কিছুই ভুলে যাইনি, ভাই। আমি ঠিকই মনে রেখেছি, আমাদের বাবা কী শিখিয়েছিল। আর সেই কারণেই আজ আমি বন্দুক তুলেছি”
সে আরও এক ধাপ এগিয়ে আসে, বন্দুকের নল আরও শক্ত করে চেপে ধরে সোফিয়ার মাথায়,
–“কারণ, আমি বাবার শিক্ষার দিকে নয়। আমি আমাদের বাবার খুনির দিকে বন্দুক তাক করে আছি”
তার কণ্ঠ থেকে বাক্যটা নিঃসৃত হওয়া মাত্রই মুহূর্তেই চারপাশ যেন থেমে যায়। আব্বাস স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। সে চোখ বড় করে বলে,
–‘কি… কী বলছিস তুই?”
–“এই মহিলা, এই সোফিয়া জাওয়ান আমাদের বাবাকে মেরেছে, ভাই। আর আমি এটাও জানি, তুই জেনেও চুপ করে ছিলি। তুই জানিস, তবুও তার দাসত্বের কবলে থেকেছিস বছরের পর বছর”
আব্বাস মাথা নাড়িয়ে আর কিছু বলার আগে জিহাদ ফের বিষাক্ত শীতলতায় বলে,
–“আজ আমি কিছুই শুনব না, আজ শুধু হিসাব হবে, বছরের পর বছর জমে থাকা প্রতিটা রক্তের হিসাব”
সোফিয়া এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল দুই ভাইয়ের বাকবিতন্ড। তার চোখে বিস্ময় ধীরে ধীরে বদলে যায় ঠান্ডা ক্রোধে। ঠোঁটের কোণে আবার সেই পুরনো হাসি ফুটে ওঠে। সে ফিসফিস করে বলে,
–“ইমপ্রেসিভ, জিহাদ। এতদিনে আসল মুখটা দেখালি। তোমরা ভাবছো সোফিয়াকে এভাবে হারানো যাবে?”
জিহাদও নিজের ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,
–“না, মিসেস সোফিয়া জাওয়ান, আপনার খেলা শেষ অন্যভাবে”
সে একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে,
–“আপনি এতক্ষণ ধরে যে ডাটা আমাকে দিয়ে ক্লিয়ার করাচ্ছিলেন, সেই সবকিছু আমি ইন্টারন্যাশনাল হাইকোর্টে আপলোড করে দিয়েছি”
বাক্যটুকু শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই এক মুহূর্তে সোফিয়ার মুখের রঙ উড়ে যায়। তার মাথায় যেন বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানে। বিস্ময়ের মিশেলে ঠোঁট থেকে বের হয়,
–“কি…?”
জিহাদ অন্য হাতে গুনে গুনে বলতে থাকে,
–“আপনার সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, অফশোর ফান্ড, ক্রিপ্টো ওয়ালেট, সব লেনদেন, মানি লন্ডারিং, নেটওয়ার্ক, ফেক এনজিও, আন্ডারগ্রাউন্ড ফার্মা ফান্ডিং, মানব পাচার, ড্রাগ ট্রায়াল, অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার হিসাব সব জমা হয়েছে হাইকোর্টে”
প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিঁধছে সোফিয়ার ভেতরে। সে দু কদম পিছিয়ে ফিসফিস করে,
–“না…না, এটা অসম্ভব”
ততক্ষণে সোফিয়ার আলফা টিম বন্দুক তোলে জিহাদের দিকে। কিন্তু জিহাদ গর্জে ওঠে,
–“এক ইঞ্চিও নড়বি না কেউ। নাহলে এখানেই ওর মাথা উড়িয়ে দেব”
তার এমন হুমকির বিপরীতেও আলফা সেনাদের কেউ বন্দুক নামায় না। কারণ তারা শুধু একজনের কথা মানে। আর সেটা হলো সোফিয়া। এদিকে চারদিক থেকে লাল লেজার লাইট এসে পড়েছে সোফিয়ার শরীরে। ইন্টারপোল অফিসার, সারহাদের গার্ড সবাই ঘিরে ফেলেছে তাকে। সোফিয়া ধীরে ধীরে চারদিকে তাকায় নজরে আসে মৃতদেহ, রক্ত, হারানো সাম্রাজ্য।
ব্যস কয়েক মুহূর্ত, তারপর তার ঠোঁটের কোণে আবারও ফুটে ওঠে সেই বাঁকা হাসি। মনে মনে ভাবে, এদের মতো হাঁটুর বয়সী ছেলেরা ভাবছে তারা এত সহজে সোফিয়াকে হারাতে পারবে। আরে যার মৃত্যুর ভয় নেই, তার কিসে ভয়?
তারা কল্পনাও করতে পারবেনা সোফিয়া কতদূর যেতে পারে। সোফিয়া সবার অগোছরে এক পা, দুপা করে পিছিয়ে যাচ্ছে সেফ জোনের দিকে। উদ্দেশ্য হলো, একটু দূরে একটা হিডেন বক্স আছে যেখানে গিয়ে তার হাতে থাকা সিলভার রিংটা চাপলেই সেটা বেরিয়ে আসবে। আর সাথে সাথে কাঁচের বক্সটা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে। আর পর মুহুর্তেই সম্পূর্ণ জায়গাটাকে ব্লাস্ট করে দিবে সে। তার এই সিক্রেট বাঙ্কারের চারদিকে অসংখ্য বোম ফিট করা। সে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে মনে মনে বলে,
–“সোফিয়াকে হারানো এত সহজ না”
দূর থেকে সারহাদ তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখ সরু হয়ে আসে। সোফিয়ার ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসি দেখে সে বুঝতে পারে, এই মহিলা এখনো কিছু ভাবছে। সারহাদ ধীরে ঘাড় নাড়িয়ে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জিহাদ কে ইশারা করে। মুহূর্তে সে ইশারা বুঝে জিহাদ ঝুঁকে পড়ে সোফিয়ার কানে,
–“ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন মিসেস সোফিয়া, আপনি আমাকে যে কাচের বক্সটা দিয়েছিলেন ইকবাল জাওয়ানের ডেড বডির”
ইকবাল জাওয়ানের নামটা শুনতেই সোফিয়ার পুরো শরীর জমে যায়। তার চোখ বড় হয়ে যায়। জিহাদ ফের বলে,
–“কোথায় রেখেছি জানেন?”
জিহাদ বলতে দেরি কিন্তু সোফিয়া পাগলের মতো জিহাদের কলার চেপে ধরতে দেরি হয়নি। সে চিৎকার করে ওঠে,
–“কোথায় রেখেছিস ইকবাল কে?
বল.. বল কোথায় রেখেছিস? ইকবাল কোথায়?”
একটু আগেও সোফিয়ার ঠোঁটে যেই ক্রুর হাসি ছিল এখন সেখানটা আতঙ্ক গ্রাস করে নিয়েছে। তার চোখে এখন আর ক্ষমতা নেই, শুধু উন্মাদনা। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছে। সে আবারও চিৎকার করে,
–“ওর কিছু হলে আমি…আমি তোকে….”
জিহাদ তাকে থামিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে,
–“পেতে চাইলে… সারেন্ডার করুন”
এক মুহূর্ত সোফিয়া তার চোখের দিকে তাকায় যেন কিছু বুঝার চেষ্টা করছে পর মুহূর্তে এক সেকেন্ড দেরি করে না সোফিয়া হাত উঁচিয়ে ইশারা করতেই আলফা টিম একে একে বন্দুক নামিয়ে ফেলে। ইন্টারপোল অফিসাররা এগিয়ে এসে হাতকড়া বের করে। অফিসার দের চোখে এখনো ভয়, কেননা তারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না সোফিয়া এত সহজে হার মেনে নিবে। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে সোফিয়া নিজেই হাত বাড়িয়ে দেয়। তার চোখে ভয়, কিন্তু সেটা নিজের জন্য নয় “ইকবাল জাওয়ানের জন্য”
একজন মহিলা অফিসার ভয়ে ভয়ে তাকে হ্যান্ডক্রাফ পরায়। সোফিয়া শেষবার জিহাদের দিকে তাকিয়ে দন্ত চেপে বলে,
–“ইকবাল… কোথায়?”
জিহাদ কিছু না বলে শুধু চোখ দিয়ে ইশারা করে সামনে যেতে। সোফিয়া বুঝে যায়, সে এখন বলবে না তাই সে সামনে এগিয়ে যায় কয়েক কদম, তখনই হঠাৎ পিছন থেকে আসে জিহাদের কণ্ঠস্বর,
–“মিসেস সোফিয়া জাওয়ান…”
সোফিয়া থেমে পিছনে ফিরে তাকায়, মনে মনে ভাবছে, হয়ত এখন ইকবালের কথা বলবে। তাই সে ধীরে ঘুরে তাকায় নজরে আসে জিহাদের চোখে জমে থাকা বছরের পর বছর রাগ, ঘৃণা, প্রতিশোধ। সে ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
–“গো টু হেল উইথ ইয়োর হাসবেন্ড…”
আর এক ন্যানো সেকেন্ড দেরি না করে সে ট্রিগার চাপে পরপর দুবার। আর সাথে সাথে দুইটা গুলি বেড়িয়ে যায় তার বন্দুক থেকে। কিন্তু সেগুলো সোফিয়াকে স্পর্শ করার আগেই সামনে দাঁড়িয়ে যায় এক মানব তাকে রক্ষার খাতিরে। আর সাথে সাথে সেই বুলেট দুটি বিঁধে যায় মানবের চওড়া বুকে।
বেজমেন্টে যেখানে কিছুক্ষণ আগেও গুলির শব্দ, চিৎকার, আর মৃত্যুর আর্তনাদে কেঁপে উঠছিল চারপাশ এখন যেন হঠাৎই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেছে। ভাঙা কাঁচ, ছিটকে পড়া অস্ত্র, আর নিভে যাওয়া জীবনের চিহ্ন সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটা যেন একটা দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠেছে। আর এই দুঃস্বপ্নের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে জিহাদ। তার চোখ এখনও বিস্ফোরিত, বিশ্বাস করতে পারছে না তার নিজের ভাই আব্বাস এভাবে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে গুলিটা নিজের বুকে নেবে।
এক মুহূর্তে তার শরীর যেন পাথর হয়ে যায়। হাত থেকে বন্দুকটা কখন নিচে পড়ে গেছে, সে নিজেও টের পায় না। সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে অদ্ভুত এক শূন্য দৃষ্টিতে।পরমুহূর্তেই ধপ করে পড়ে যেতে থাকা আব্বাসের শরীরটা মাটিতে পড়ার আগেই জিহাদ ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে বসে পড়ে সে। ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলতে থাকে,
–“ভাই.. ভাই চোখ খোলো। প্লিজ…প্লিজ চোখ খোল”
সে আব্বাসের দুই গালে চাপড় দিতে থাকে,
–“তুমি এটা কি করলে? কেন করলে? কেন একটা খুনিকে বাঁচালে কেন? বাবার খুনিকে বাঁচালে কেন বলো?”
জিহাদের মতো পুরুষটার চোখ দিয়ে গরগর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে তার ভাইয়ের জন্য। বিপরীতে আব্বাসের বুক দ্রুত উঠানামা করছে। শ্বাসগুলো ভাঙা, কাঁপা কাঁপা। সে বহু কসরতে চোখ তুলে তাকায় জিহাদের দিকে। তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। মৃদু কাঁপা কণ্ঠে আওড়ায়,
–“ক..কারণ… আমরা… আমরা আরব…”
এটুকু বলেই থেমে যায় সে। শব্দ গুলো কেমন আটকে আসছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার তবুও জোর করে বলে,
–“আমাদের বাবা… শেষ নিঃশ্বাসের আগ পর্যন্ত বলেছিল…শত্রু হোক বা বন্ধু, আমরা… বিশ্বাসঘাতকতা করবো না। এটাই বাবার শিক্ষা”
জিহাদের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে ভাইয়ের আদলে। সে ভাঙা স্বরে বলতে থাকে,
–“চুপ করো, এসব বলবে না। তুমি ঠিক হয়ে যাবে.. আমি আছি… আমি আছি ভাই…’
আব্বাসের মুখ দিয়ে রক্তের স্রোত বের হচ্ছে। সে ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে কষ্ট করে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“না… সময় শেষ… জিহাদ। তুই… ঠিক পথেই ছিলি…বাবার খুনির বিচার… করিস”
আব্বাস বড় বড় শ্বাস টেনে নিচ্ছে,
–“আর…ভাইকে… ক্ষমা করে দিস”
–“না, না… চুপ করো। আমি তোমার কিছু হতে দেব না, ডাক্তার.. কেউ ডাক্তার আনো”
জিহাদ চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু তার চিৎকারে কেউ এগিয়ে আসে না। আব্বাস বহু চেষ্টা করে হাত উঁচিয়ে শেষ বারের মতো ভাইয়ের চোখ মুছে দিতে পারল না তার আগেই একটা দীর্ঘ শ্বাস, আর তারপর সবকিছু থেমে যায়। আব্বাসের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে। একটু উপরে তোলা হাতটা মেঝেতে গড়াগড়ি খায়। জিহাদ কাঁপা কণ্ঠে ডাকে,
–“ভাই…?”
বিপরীতে কোন কোনো সাড়া নেই। জিহাদের কণ্ঠস্বর থেকে শব্দ বেরুচ্ছে না তারপরও বলে,
–“ভাই… উঠে বস… প্লিজ…”
পরমুহূর্তেই সে ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
–“তুই আমাকে একা রেখে গেলি কেন? কেন গেলি? আমাকে অনাথ করে দিলি কেন?
একটা খুনির জন্য? একটা বিশ্বাসঘাতকের জন্য?”
তার কান্না পুরো বেজমেন্টে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবারও ফিরে আসে তার কানে,
–“আমি তোকে হারাতে চাইনি ভাই। আমি তো শুধু ন্যায় চাইছিলাম। তাহলে তুই কেন… তুই কেন বিশ্বস্ততা বেছে নিলি আমার উপর?”
সে নিজের ভাইয়ের নিথর দেহ টাকে আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
–“তুই চলে গেলে আমি কার জন্য বাঁচবো?
আমি কার ভাই থাকবো এখন?”
এক ভাইয়ের জন্য আরেক ভাইয়ের বুক ফাটা আর্তনাদে চারপাশ কেঁপে ওঠে। অন্যদিকে সারহাদ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একবার জিহাদের দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে শুধু তার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে চলে যায়।
এদিকে আব্বাসের নিথর দেহ টার দিকে তাকিয়ে সোফিয়ার নিষ্প্রাণ চোখজোড়া থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে অজান্তে। হয়তো আব্বাস তার পুরো জীবনের একমাত্র বিশস্ত কর্মী ছিল বলে এছাড়া সবাই তো তাকে ধোঁকাই দিয়েছে। ইন্টারপোল অফিসাররা তাকে শক্তভাবে ঘিরে ফেলেছে। তার দুই হাতে হাতকড়া। চারদিক থেকে লাল লেজার পয়েন্ট করা সোফিয়ার উপর। তার আলফা টিমকেও একে একে নিরস্ত্র করে ফেলা হয়েছে। সোফিয়াকে ঘিরে আছে স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল ইউনিট, বডি আর্মার, হেলমেট, হাই ক্যালিবার রাইফেল। কারণ তারা জানে, এই নারী শুধু একজন অপরাধী না, সে একটা সাম্রাজ্য।
সোফিয়াকে এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায়। বেজমেন্ট থেকে বের করার সময় তার সামনে, পিছনে, পাশে সবদিকে অস্ত্র তাক করা। উপরে অপেক্ষা করছে বিশেষ সিকিউরিটি হেলিকপ্টার। তার ওঠার আগেই পুরো এলাকা সিল করা হয়েছে। যদিও জাওয়ান ম্যানশনের চারদিকে কোন বসতবাড়ি নেই তারপরও সাবধানতার বশে আশেপাশের সব নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আকাশে চক্কর দিচ্ছে আরও হেলিকপ্টার, নিচে সাঁজোয়া গাড়ি। একটা মুহূর্তের জন্যও তাকে একা রাখা হচ্ছে না। কারণ, সে পালালে, পুরো সিস্টেম কেঁপে উঠবে। সোফিয়া একবার এসব দেখে বাঁকা হেসে গাড়িতে উঠে মনে মনে ভাবে, সে না চাইলে তারা এখান থেকে তার চুল টাও নিয়ে যেতে পারতো না।
এদিকে বেজমেন্টের গভীর অন্ধকার সেলগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। লোহার দরজা খুলতেই একে একে বেরিয়ে আসে বন্দী মানুষগুলো। কেউ কাঁদছে, কেউ আলো দেখে চোখ ঢেকে ফেলছে, কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না, তারা মুক্তি পেয়েছে। একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন শেষ হলো আজ। আর ওপরে যে ম্যানশন একসময় ক্ষমতা, ভয়, আর বিলাসিতার প্রতীক ছিল আজ সেটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় ঝাড়বাতি গুলো নিভে গেছে।
ফাঁকা করিডোরে শুধু বাতাসের শব্দ। দরজাগুলো বন্ধ, কোনো কণ্ঠ নেই, কোনো হাসি নেই শুধু এক ভয়ংকর শূন্যতা। যেন পুরো প্রাসাদটাও নিজেই তার পাপের ভারে নুয়ে পড়েছে। আর নিচে বেজমেন্টের এক কোণে বসে আছে জিহাদ, ভাইয়ের নিথর দেহ বুকে জড়িয়ে। তার কান্না থেমে গেছে কিন্তু চোখ দুটো থামছে না। তারা তাদের মতো করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
আজকের রাতটা অস্বাভাবিক শান্ত। সেই রাতের বুক ছিঁড়ে শহরের আরেক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে ব্ল্যাক ম্যানশন। যে প্রাসাদ দিনের বেলায় শক্তি, প্রভাব আর ভয়ের প্রতীক, সেই প্রাসাদ রাতের আঁধারে যেন একদম অন্য রূপ ধারণ করেছে। ম্যানশনের চারপাশে টহল দিচ্ছে সশস্ত্র গার্ডরা। তাদের চোখে সতর্কতা, হাতে আধুনিক অস্ত্র।
ভিতরে লম্বা করিডোরগুলো আধো আলোয় ঢাকা। আরজে আর সানা কিয়ৎক্ষণ আগে এসেছে, রিজভী আর ঈশানীও এসেছে। সানিতা এখনো হসপিটালে আছে আর সিয়া তার সাথে। এসপি জ্যাক কে নিয়ে হসপিটালে গেছে। জ্যাকের অবস্থা অনেক খারাপ।
প্রায় শেষ রাতের দিকে বাথরুমের দরজা খুলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে আরজে। তার শরীর থেকে এখনও গরম পানির হালকা বাষ্প উঠছে। চুল ভেজা, কাঁধে পানি গড়িয়ে পড়ছে। দুই দিনের টানা যুদ্ধ, দৌড়ঝাঁপ, রক্ত আর মৃত্যুর মধ্যে ডুবে থাকার পর এই গভীর রাতে শাওয়ারটা যেন তার জন্য একমাত্র স্বস্তি ছিল। হাতে থাকা তোয়াল দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে সে সামনে এগোয়। আর তখনই তার দৃষ্টি থেমে যায় যেখানে বেডের উপর শুয়ে আছে তার দুইটা পৃথিবী, সানা আর আরভি।
দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। সানার এক হাত শক্ত করে জড়িয়ে আছে আরভির শরীরের চারপাশে যেন এখনও ছেলেকে হারানোর ভয়টা তার ভিতরে রয়ে গেছে। আরভি ছোট্ট করে গুটিসুটি মেরে মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে। তার নিঃশ্বাস ধীর, শান্ত। এই দৃশ্যটা দেখা মাত্রই আরজে থমকে দাঁড়িয়ে যায়। তার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন একটা চাপা ব্যথা আর স্বস্তি একসাথে খেলে যায়। একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। সে কিয়ৎক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে তোয়ালটা পাশে রেখে সে বেডের দিকে এগিয়ে যায়। খুব আস্তে করে পা ফেলছে যেন তাদের ঘুম না ভাঙে। আরজে একটু ঝুঁকে সানার কপালে আলতো করে একটা চুমু খায়। তারপর আরভির ছোট্ট কপালে। তারপর ধীরে ধীরে কম্ফর্টারটা টেনে দুজনকে ভালো করে ঢেকে দেয়। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে
শুধু তাকিয়ে থাকে তাদের দিকে। তারপর খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“তোমরা জানো না… তোমরা দুজন আমার কাছে কি…”
আরজে আলগোছে সানার কপালে পড়ে থাকা অগোচরেই বেবি হেয়ার গুলোকে সড়িয়ে ফের ফিসফিসায়,
–“এই স্বার্থপর পৃথিবীতে যদি আমার কোনো দুর্বলতা থাকে, সেটা তোমরা। আর যদি কোনো শক্তি থাকে, সেটাও তোমরা। আর এই পৃথিবীতে আমার যদি কিছু থাকে সেটাও তোমরাই। বাকিটা সব মরীচিকা”
আরজে সানার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে আওড়ায়,
–“মাই লাভ, তুমি না থাকলে আমি অনেক আগেই একটা দানব হয়ে যেতাম। সেই অন্ধকারে গড়ে ওঠা রনোতে হারিয়ে যেতাম”
তার ঠোঁটে হালকা তিক্ত হাসি ফুটিয়ে ফের বলে,
–“আমি সেই দানব হতে পারি যাকে সবাই আমাকে ভয় পায়। কি আশ্চর্য তাই না, এই দানবটারও একটা ঘর আছে, আর সেই ঘরটা”
আরজে একটু ঝুঁকে আবারও সানার কপালে চুমু খেয়ে তদর সারা আদলে হাত বুলিয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে শুধায়,
–“তোদের কেউ ছুঁতে পারবে, এই চিন্তাটাই আমাকে পাগল করে দেয়, একদম উন্মাদ। আই প্রমিজড্ ইউ ওয়াইফি, যতদিন আমি বেঁচে আছি, আর কেউ তোমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবে না ছোঁয়া তো দূরের কথা”
হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। তার কণ্ঠস্বর বদলে যায় সাথে সাথে। গম্ভীর স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
–“আর যে তাকাবে, তার চোখ থাকবে না। যে ছুঁতে চাইবে, তার হাত থাকবে না। যারা চেষ্টা করবে, তাদের অস্তিত্বই থাকবে না”
আবারও সে আরভির কপালে চুমু দিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই শান্ত মুহূর্তটা যেন সে নিজের মধ্যে গেঁথে নিতে চায়। তারপর ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার চোখের সেই কোমলতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জায়গা নেয় পরিচিত ঠান্ডা কঠোরতা। সে কবার্ট খুলে একটা কালো হুডি বের করে পরে। হুডটা মাথার উপর টেনে তারপর একটা কালো মাস্ক মুখে লাগিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। সে শেষবারের মতো পিছনে তাকায় বেডে শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা সানা আর আরভির দিকে। তার চোখে আবার এক মুহূর্তের জন্য নরমতা ফিরে আসে। কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“ফ্যামিলি মিনস্ নাথিং টু মি,
ইউ আর মাই ওয়ার্ল্ড, মাই অনলি ট্রুথ”
তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। রাতের অন্ধকার তাকে গিলে ফেলে। তার গন্তব্য একটাই,
“সোফিয়া জাওয়ান”
অস্বাভাবিক নীরব রাতে শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেই হাই সিকিউরিটি কারাগার “টাইটান ভল্ট প্রিজন” যেন কোনো সাধারণ কারাগার নয়, একটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো প্রস্তুত। কেননা এটার চারদিকটা ঘিরে রেখেছে বহুস্তরের নিরাপত্তা বলয়। প্রথম সারিতে আছে সশস্ত্র পুলিশ ইউনিট, প্রতিটা গার্ডের হাতে অটোমেটিক রাইফেল, চোখে নাইট ভিশন গগলস।
তার পরের স্তরে ছিল মিলিটারি টহল, ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সাঁজোয়া গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে চারপাশে। আর সবচেয়ে ভেতরের বলয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট, ইন্টারপোল অফিসারদের স্পেশাল টিম, সাথে দিলরুবা খানমের নিজস্ব গোপন এজেন্ট বাহিনী এবং সারহাদের বিশেষ ট্রেইন্ড গার্ডরা। পুরো এলাকাজুড়ে কমিউনিকেশন জ্যামার বসানো মোবাইল, স্যাটেলাইট, রেডিও যার কারণে সিগন্যাল ঢুকতে বা বের হতে পারছে না।
কারণ সবাই জানে, সোফিয়া জাওয়ান শুধু একজন অপরাধী না, সে একটা সিস্টেম। তার একটা ইশারাই যথেষ্ট, পুরো পরিস্থিতি উল্টে দিতে। এখনো শহরের কেউই জানে না সোফিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দিলরুবা খানম বিষয় টাকে গোপন রেখেছেন যাতে তার সাথে যুক্ত সকল মন্ত্রী মিনিস্টার ও বড় বড় পর্যায়ের লোক গুলোর নাম বের করতে পারেন।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসে গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ। একটা কালো মার্সিডিজ ধীরে ধীরে গেটের সামনে এসে থামে। সকল গার্ড রা মুহুর্তে সতর্ক হয়ে যায়। তারা সবাই বন্দুক তাক করে সেদিকে। দরজা খুলে নেমে আসে এক মানব, কালো হুডি, মুখ প্রায় পুরো ঢাকা।
কিন্তু তার জ্বলজ্বল করা বাদামি চোখজোড়া যেন অন্ধকার চিরে আগুনের মতো জ্বলছে। এক মুহূর্তে তার দিকে তাকাতেই গার্ডরা নিজের অজান্তেই এক পা পেছনে সরে যায়। এ যেন কোনো মানুষ না একটা দানব এগিয়ে আসছে। তার পিছনেই তড়িঘড়ি করে নেমে আসে আরেকজন যাকে দেখা মাত্রই যেই পুলিশ সেনারা যারা অজ্ঞাত মানবের দিকে বন্দুক তুলেছে তারাই তড়িঘড়ি করে বন্দুক নামিয়ে স্যালুট দেয়, তিনি আর কেউ না দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান, মেজর জেনারেল রাশেদ মাহবুব। বাংলাদেশের পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার সম্মিলিত অপারেশনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি। গার্ডদের কেউ আর বাধা দেওয়ার সাহস পেল না। টাইটান ভল্ট প্রিজনের প্রধান ফটক খুলে যায় ধীরে ধীরে। ভেতরে প্রবেশ করে সেই মানব “আরজে”
ভেতরে ঢুকতেই নজরে আসে করিডোর জুড়ে
লোহার দরজা, ক্যামেরা, মোশন সেন্সর সবকিছু তার দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় সারহাদ চৌধুরী। দুজনের চোখাচোখি হয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই যেন হাজার যুদ্ধ হয়ে গেল। দুজনেই চোয়াল শক্ত করে চোখে আগুন নিয়ে একে অপরের দিকে তাকায়। আরজে এগিয়ে এসে সারহাদের কানের পাশে ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
–“তোর বাপ, ভবিষ্যৎ অনুমান করে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিল। নাহলে তোর অবস্থা তোর বাপের মতোই হতো, ওকে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য”
এক মুহূর্তের জন্য বাতাস থেমে যায়। সারহাদের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। সে ভালো করেই বুঝতে পারছে আরজে “ওকে” বলতে সানাকে বুঝিয়েছে। কিন্তু সে মুখে কিছু না বলে দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করে নেয়। আরজে সোজা এগিয়ে যায় তার পাশ কাটিয়ে। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কারাগারের জেলার, আর তার পাশেই মিসেস দিলরুবা খানম যে অগ্নি দৃষ্টিতে আরজের দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে বলেন,
–“এই মুহূর্তে সোফিয়ার সাথে কাউকে দেখা করার অনুমতি নেই”
জেলারও মাথা নাড়ে সম্মতি জানান তার কথায়। কিন্তু আরজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর জেনারেল রাশেদ মাহবুবের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখের ভাষা বদলে যায়। একটা নিঃশব্দ চাপ নেমে আসে সেখানে। দিলরুবা খানম ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নেন। জেলার চুপচাপ সরে দাঁড়ায়। আর আরজে অনুমতির তোয়াক্কা না করে হালকা করে বাঁকা হেসে মিসেস দিলরুবা খানমের দিকে তাকায়। বিপরীতে দিলরুবা খানম স্পষ্ট বুঝতে পারছে আরজে তাকে তিরস্কার করছে তবু্ও সে টু শব্দটি করতে পারে না। কেননা এখানে এই সম্পূর্ণ অপারেশন টা চালানোর অনুমতি দিয়েছে “রাশেদ মাহবুব” এখন তিনি উল্টে গেলে সব শেষ। তারপর আরজে এক পা, দুই পা করে এগিয়ে যায় কারাগারের সেই গভীর অন্ধকার সেলের দিকে যেখানে অপেক্ষা করছে,
“সোফিয়া জাওয়ান”
গভীর নিরাপত্তায় ঘেরা সেই কারাগারের ভেতরের কক্ষটা অন্য সব কক্ষের মতো নয় এটা যেন বন্দিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বিলাসবহুল নিঃসঙ্গতা। দেয়ালে উষ্ণ আলো, কোণায় নীরব ক্যামেরা, চারদিকে শব্দরোধী কাঁচ তবু এই নীরবতার মাঝেই যেন চিৎকার করছে এক নারীর অস্থিরতা। সোফিয়া জাওয়ান বড় সোফাটায় বসে আছে। তার আঙুলগুলো বারবার একে অপরের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে, আবার ছুটে যাচ্ছে। ঠোঁট কাঁপছে, চোখ লালচে, সে একমনে বিড়বিড় করে বলেই যাচ্ছে,
–“ইকবাল… ইকবাল তুমি কোথায়? তোমার কিছু হয়নি তো? কেউ তোমার গায়ে হাত দিয়েছে? আমি কাউকে ছাড়বো না… কাউকে না”
ঠিক তখনই দরজার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে আরজে। সোফিয়ার এখনো তাকে খেয়াল করেনি তাকে। আরজে কিয়ৎকাল শুধু তাকিয়ে থাকলো গার দিকে। তার সেই চোখে রাগ নেই, ঘৃণা নেই, বরং একটা অদ্ভুত ক্লান্তি, কতগুলো অভিযোগ আর গভীর ভাঙন। সে খুব ভালো করেই জানে, সোফিয়া না চাইলে এখানে তাকে নিয়ে আসার সাধ্য কারো নেই আর সোফিয়া এখানে একটা কারণেই আসতে পারে সেটা হলো তার বাবা “ইকবাল জাওয়ান”। নিশ্চয় তাকে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে এত সহজে এখনে নিয়ে এসেছে। না হয় সোফিয়া চাইলে এই মুহূর্তেও বের হয়ে যেতে পারবে। আরজে তাকিয়ে থাকল তার জন্মদাত্রীর দিকে। সে জানে এই নারী শুধু একজন অপরাধী নয়, এই নারী তার মা। হাজারো কোটি পাপ করলেও সত্যটা কোনদিনও পরিবর্তন হবে না যে, এটাই তার জন্ম দেওয়া মা। কিন্তু এই মা-ই তাকে দানব বানিয়েছে।
হঠাৎ সোফিয়া মুখ তুলে তাকায়। আরজে কে দেখামাত্রই যেন পাগলের মতো দৌড়ে আসে তার দিকে। এক ন্যানো সেকেন্ড দেরি না করে এলোমেলো চিত্তে বলতে থাকে,
–“রনো… রনো ওরা তোমার ড্যাডকে নিয়ে গেছে। আমি জানি না কোথায় নিয়ে গেছে। তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও গিয়ে নিয়ে আসো তোমার ড্যাডকে আমার কাছে। প্লিজ… প্লিজ রনো… আমার ইকবালকে এনে দাও। ও অন্ধকারে একা থাকতে ভীষণ ভয় পায়। তুমিতো জানো, ওর প্রবিয়া আছে”
সোফিয়া আরজের গাল দু’হাতে ধরে, কাঁপতে কাঁপতে ফের বলে,
–“আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না, শুনছো?
আমি পারবো না, ওরা ওর কিছু করে ফেলবে। তুমি কিছু করো রনো, তুমি পারবে, তুমি সব পারবে”
আরজে চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তারপর হঠাৎ দুই হাতে সোফিয়ার বাহু চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে ওঠে গর্জে উঠে,
–“মম, স্টপ, প্লিজ… স্টপ ইট”
তার গর্জনে সাথে সাথে সোফিয়া থেমে যায়।চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। আরজের গলা ভারী হয়ে আসে,
–“এখানেই থেমে যাও মম। প্লিজ, তোমার এই পাগলামি বন্ধ করো”
আরজে একটু থেমে তারপর খুব নিচু স্বরে ধারালো কণ্ঠে বলে,
–“ড্যাডকে কেউ নিয়ে যায়নি, তুমি নিজেই তাকে শেষ করেছো….”
আরজে তার বাক্যটা সম্পন্ন করার আগেই সোফিয়া এক ঝটকা মেরে আরজের হাত সরিয়ে দেয়। বারবার মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,
–“না, না, না, তুমি মিথ্যে বলছো। ইকবাল বেঁচে আছে। ও এখানেই আছে, আমার কাছেই আছে, শুধু… শুধু ওর দেহটা, ওরা নিয়ে গেছে”
সে পিছিয়ে গিয়ে আবার সোফায় বসে মাথা নাড়তে থাকে অনবরত,
–“ওকে নিয়ে আসো, রনো তুমি নিয়ে আসো। আমি জানি তুমি পারবে”
আরজে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে হুডির টুপিটা খুলে ফেলে। তার চোখে তখন আর কোনো রাগ নেই, শুধু একটা ভাঙা সন্তানের অসহায়তা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। সোফিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বসে বলে,
–“মম… তুমি জানো তুমি কি চেয়েছিলে?”
বিপরীত পাশ থেকে নীরবতা কাটিয়ে কোন শব্দ এলো না, সোফিয়া চুপ একদম চুপ। আরজে তাকিয়ে থাকে তার চোখে,
–“তুমি ভালোবাসা চাওনি… তুমি চেয়েছিলে ক্ষমতা। তুমি মমতা ছেড়ে ক্ষমতার পিছনে দৌড়েছো। আর আজ দেখো, তোমার সেই ক্ষমতা তোমাকে কি দিয়েছে?
একটা ফাঁকা ঘর, চারপাশে বন্দুক, আর তোমার নিজের ছেলে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে তোমাকে থামতে বলছে। কেন তুমি মমতা চাইলে না মম?
জানো, ঐ সারহাদ কে আমার মাঝে মাঝে ভাগ্যবান মনে হয়। কেননা ওর মা একা হয়ে, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পুরো পৃথিবীর সাথে লড়ে গেছে। আর তুমি ক্ষমতার জন্য….”
সে একটু ঝুঁকে এসে বলে,
–“তুমি সব জিততে চেয়েছিলে মম… কিন্তু শেষে তুমি সব হারিয়েছো। ড্যাড, আমি, তুমি নিজেও…..”
সোফিয়ার চোখে পানি এসে জমে, কিন্তু সে মাথা নাড়িয়ে আরজে কে থামিয়ে বলে,
–“না… না… আমি কিছু হারাইনি। আমার ইকবাল আছে। তুমি ওকে নিয়ে আসো”
আরজে চোখ বন্ধ করে ফেলে এক সেকেন্ড। তারপর আবার বলে,
–“এই সাম্রাজ্য, এই অন্ধকার, এই রক্ত, এগুলো কিছুই তোমাকে শান্তি দেয়নি মম। এখনও দেবে না। এখানেই থেমে যাও। প্লিজ আর এগিও না”
সোফিয়া হঠাৎ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
–“আমি থামবো না, আমি ইকবালকে নিয়ে আসবো। যারা ওকে ছুঁয়েছে তাদের সবাইকে মেরে ফেলবো”
তার চোখে আবার সেই পুরনো উন্মাদনা জ্বলে ওঠে। আরজে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। তারপর খুব শান্ত গলায় বলে,
–“কাল তোমাকে কোর্টে নেওয়া হবে। আমি সব ঠিক করে দেবো আর তোমাকে এখান থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দেবো। যেখানে তুমি আর কাউকে ক্ষতি করতে পারবে না… আর নিজেকেও না”
আরজে একটু থেমে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আওড়ায়,
–“এটাই আমার শেষ চেষ্টা, মম। তোমাকে বাঁচানোর”
বিপরীতে সোফিয়া কোনো প্রত্যুত্তর করে না। সে শুধু ফিসফিস করে,
–“ইকবাল… আমার ইকবাল…”
আরজে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। একবার শেষবারের মতো তাকায় তার মায়ের দিকে। তার চোখে তখন একসাথে ভালোবাসা, ঘৃণা, আর অসীম ক্লান্তি জমে আছে। তারপর সে ঘুরে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। পেছনে পড়ে থাকে একটা ভাঙা সাম্রাজ্যের রাণী,
আর এক মায়ের হারিয়ে যাওয়া বাস্তবতা।
ভারী কাঠের টেবিল, দেয়ালে আন্তর্জাতিক সংস্থার সিলমোহর, চারদিকে ফাইলের স্তূপ আর মাঝখানে বসে আছেন দিলরুবা খানম। তার চোখের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ স্পষ্ট। সে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টেবিলের ওপারে বসা আরজের দিকে যে হেলান দিয়ে বসে আছে চেয়ারে। মাথা সামান্য নিচু করে হাতের মুঠোফোনে সম্পূর্ণ ধ্যান তার। দিলরুবা খানম ফাইল খুলে তার সামনে রেখে রুক্ষ স্বরে বলে,
–“তুমি কি জানো, এই ফাইলটা কী?”
আরজের তরফ থেকে কোনো উত্তর আসে না। মিসেস দিলরুবা খানম দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
–“এটা সোফিয়া জাওয়ানের সম্পূর্ণ অপরাধের রেকর্ড। প্রতিটা অপারেশন, প্রতিটা ট্রানজ্যাকশন, প্রতিটা হত্যাকাণ্ড। আর প্রতিটা পেজে, তোমার নাম হাইলাইট করা,
“দ্য জেবি কিং”
আরজের আঙুল থামে না। আরজের এমন হেয়ালিপনা সহ্য হচ্ছে না বিপরীতের ভদ্রমহিলার। দিলরুবা খানমের চোখে রাগে জ্বলে ওঠে। তিনি ফাইলটা জোরে টেবিলে আছড়ে রেখে বলে,
–“আরজে, আমি তোমার সাথে কথা বলছি।
সোফিয়ার প্রতিটা কাজে তুমি ইনভলভড। মানি লন্ডারিং, আন্ডারওয়ার্ল্ড অপারেশন, ইলিগ্যাল ট্রায়াল, সবকিছুর সাথে তোমার কানেকশন আছে। আর আমি নিজে আই উইটনেস, সোফিয়া বেজমেন্ট থেকে সবটা সামলাতো আর তুমি বাহির থেকে”
আরজে ধীরে ধীরে স্ক্রল করছে এখনো, যেন শুনছেই না। দিলরুবা খানম গর্জে উঠে,
–“তুমি কি ভাবছো? তুমি আইনের বাইরে?
এবারও বিপরীত পাশ থেকে শুরুই নীরবতা ভেসে এলো। এই নীরবতাই যেন তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। দিলরুবা খানম দাঁড়িয়ে পড়েন,
–“তুমি বুঝতে পারছো তোমার পরিণতি কি হতে যাচ্ছে?
তোমার বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তোমাকে গ্রেফতার করা হবে, ট্রায়াল হবে… এবং আমি নিশ্চিত করবো, তুমি তোমার প্রতিটা অপরাধের শাস্তি পাও”
এই মুহূর্তে আরজের আঙুল থামে। কিন্তু সে এখনও মাথা তোলে না। দিলরুবা খানম দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে ওঠেন,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২১
–“আরজে, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট”
তার এই বাক্যটা বের হওয়ার পর আরজে ফোনটা নামিয়ে রাখে। এবার সে মাথা তোলে তাকায়। দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ে দিলরুবা খানমের চোখে। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে বাঁকা হাসি। আরজে কিছু না বলে হাতের ফোনটা এগিয়ে দেয় মিসেস দিলরুবা খানমের দিকে। দিলরুবা খানম ভ্রু কুচকে স্কিনে দেখা মাত্রই তার চেহারা টা ফ্যাকাশে হয়ে যায় এক মুহূর্তে। তিনি ধীরে ধীরে আবার চেয়ারে বসে পড়ে।
