হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৯
সাবা খান
চোখের পলকে কেটে গেছে প্রায় আট মাস। এই সময়টুকুতে কত সকাল এসেছে সোনালি আলো নিয়ে, কত সন্ধ্যা নেমেছে রক্তিম আভা মেখে। জীবনও ঠিক তেমনই নিজের নিয়মে এগিয়ে গেছে। অনেক ক্ষত শুকিয়ে এসেছে, অনেক স্মৃতি ধুলো জমে একটু মলিন হয়েছে। আর এই আট মাসে সবচেয়ে বেশি বদলেছে সানা। রমণীর উদরের ভেতর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে আরো দুটো ছোট্ট প্রাণ। আর আজ…আজ সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি চলে এসেছে। আজ সানার ডেলিভারির দিন। সকাল হতেই তাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর সেই সঙ্গে ব্ল্যাক ম্যানশন জুড়ে যেন ছোটখাটো ভূমিকম্প বয়ে গেছে। কিন্তু এখন..এখন পুরো ম্যানশন প্রায় ফাঁকা। সানার সাথে সাথে সবাই প্রায় চলে গেছে শুধুমাত্র ম্যানশনে রয়ে গেছে জ্যাক, ইবেলিনা, কাইলিন আর সিয়া।
ইবেলিনা অবশ্য যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তার নিজের অবস্থাও এখন বেশ নাজুক। আর মাত্র দুই কিংবা তিন সপ্তাহ তারপরই তারও মাতৃত্বের দিন। তাই জ্যাক কোনোভাবেই তাকে যেতে দেয়নি। উল্টো আরজেও কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে গেছে। ফলাফল, ইবেলিনা বাধ্য হয়েই ম্যানশনে রয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থায় রেগে আছে একজন সে হলো সিয়া।
রমণী নিজের রুমের বিছানার উপর দুই হাত গুটিয়ে বসে আছে । মুখ ফুলে যেন আধা কেজি, গোলগাল গাল দুটো টকটকে লাল, নাকের পাটাতন পর্যন্ত ফুলে আছে। ঠোঁট এমনভাবে বাঁকিয়ে রেখেছে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে অবিচার তার সাথেই হয়েছে। সকাল থেকে দুই দুইবার কাইলিন তাকে রাগিয়েছে। দুইবার! এত বড় অপরাধ ক্ষমা করার মতো মহৎ আত্মা সে নয়। তাই সে এখন প্রতিবাদ স্বরূপ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
এদিকে দরজার কপাটে দাঁড়িয়ে কাইলিন মেয়েটার রাগী মুখটা দেখে আর হাসি চেপে রাখতে পারছে না। সত্যি বলতে, তার ভীষণ ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে কামড়ে খেয়ে ফেলতে। এত কিউট হওয়া কি বৈধ?
ফোলা ফোলা গাল, ছোট্ট নাক আর রাগলে টমেটোর মতো লাল হয়ে যাওয়া মুখ। শুধু এক ফুট লম্বা হিল পরিয়ে দিলেই হবে আর কিছু দরকার নেই। সবকিছুই একদম পারফেক্ট। কাইলিন নিজের কক্ষে ঢুকে কবার্ট খুলে নিজের শার্ট বের করে পড়ে নিল। এখন তাকে হসপিটালে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি, তার টাই বাঁধা।
যদিও সত্যি বলতে তার টাই বাঁধতে কারও সাহায্য লাগে না। বরং চোখ বন্ধ করেও বাঁধতে পারে তবুও সে নিজের ইচ্ছায় এই দায়িত্বটা সিয়ার উপর চাপিয়ে দিয়েছে। তারপর থেকে নিয়ম হয়ে গেছে যাই হোক, ঝগড়া হোক, মান অভিমান হোক, কথা বন্ধ থাকুক তবুও কাইলিনের টাই সিয়াই বাঁধবে। এটা যেন অলিখিত আইন। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো সিয়াকে রাগানোর জন্য কাইলিন এই নিয়মটাকে ভীষণ উপভোগ করে।
আজও নিয়ম মাফিক টাই হাতে নিয়ে সে গলা খাঁকারি দিল দুইবার। রুমের ওপাশে বসে থাকা সিয়া সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল নিশ্চয়ই তাকে ডাকছে হাড়ে বজ্জাত লোকটা। সে নাক ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ায় তারপর ধুপধাপ কদম ফেলে কাইলিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে শুধালো,
—”কি?”
কাইলিন নিষ্পাপ মুখে টাই এগিয়ে দিয়ে বলে,
—”এটা”
সিয়া এমন একটা দৃষ্টি দিল যেন সুযোগ পেলে এই মুহূর্তেই তাকে চিবিয়ে খাবে। এক টানে টাইটা ছিনিয়ে নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে নিজের ছোট্ট টুলটার দিকে এগোতে গিয়ে থমকে গেল। টুলটা নেই, গায়েব। সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ সরু হয়ে গেল। রমণী খুব ভালো করে জানে এটা কে করেছে তাই দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
—”আমার টুলটা কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে?”
কাইলিন ভীষণ নিরীহ মুখ করে বলল,
—”কোন টুলের কথা বলা হচ্ছে?”
—”যেটার উপর দাঁড়িয়ে আমি টাই বাঁধি, সেটার কথা”
কাইলিন সাফ সাফ অস্বীকার করে,
—”ওটা আমি জানি না।”
সিয়া কোমরে হাত রেখে কাইলিনের সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
—”যে বলেছে ‘জানি না’ সে সরিয়েছে, তাই না?”
কাইলিন মনে মনে নিজের হাসি টাকে বহু কসরতে চেপে বলে,
—”যে দোষারোপ করছে, তার কাছে কী কোন প্রমাণ আছে?”
—”যেই মুখটা প্রমাণ চাইছে সেই মুখটাই প্রমাণ”
কাইলিন আর হাসি চাপাতে পারল না, হেসে ফেলল। আর সেই হাসিটাই সিয়ার রাগ আরও বাড়িয়ে দিল। সে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই কাইলিন হঠাৎ তার কোমর জড়িয়ে ধরে,
—”আহহহ…”
পরের মুহূর্তেই সিয়া নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করল। কাইলিন তাকে একটানে তুলে নিজের সমান উচ্চতায় এনে ধরে আছে। যেন সে কোনো তুলোর পুতুল। সিয়া হতভম্ব বনে গেল,
—”এবার বাঁধো”
সিয়া তেজী স্বরে চিৎকার করে,
—”আমাকে কোল থেকে নিচে নামানো হোক”
—”আগে আমার টাই বাঁধা হোক, নাহয় যেই পিচ্চি ফ্যান ফ্যান করছে তার মুক্তি নেই”
সিয়া বহু চেষ্টা করেও নিজেকে এক ইঞ্চি নাড়াতে পারল না ছুটাতো দূরের কথা। তাই হার মেনে বলল,
—”আমি পড়ে যাব”
—”অসম্ভব, আমি ধরে রেখেছি”
—”আপনি অসহ্যকর”
—”জানি”
সিয়া দাঁত কিড়মিড় করে বাধ্য হয়ে কাইলিনের কোলেই বসা অবস্থায় টাই বাঁধতে শুরু করল। কাইলিন নিচের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সিয়া সেটা দেখেই আরও ক্ষেপে যাচ্ছে। অবশেষে টাই বাঁধা শেষ শেষ হতেই রমণী ঠাস করে টাইটা এমন জোরে টান দিল যে কাইলিন প্রায় দম বন্ধ হয়ে কাশতে শুরু করল,
—”মেরে ফেলবে নাকি?”
সিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
—”ইচ্ছা তো করছে”
—”এত রাগ?”
—”আপনি সকাল থেকে দুইবার আমাকে রাগিয়েছেন”
কাইলিনের এবার ভীষণ মায়া হলো। সে কথা না বাড়িয়ে ঝুঁকে রমণীর কানের কাছে গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিস করে,
—”আচ্ছা, সরি বলছি। এখন একটা গুড বাই কিস করে দাও আমি বের হই”
—”আমি বিশ্বাস করি না।”
সিয়ার লজ্জা হলো। তাদের বিয়ের আট মাস ঘনিয়েছে অথচ সে এখনো ছোট ছোট বিষয় গুলোতে লজ্জাবতীর মতো মিইয়ে যায়। কাইলিন হঠাৎ ঝুঁকে সিয়ার কপালে আলতো একটা চুমু খেল। তারপর আবার একটা ছোট্ট চুমু দিল তার ঠোঁটের কোণে,
—”এবার রাগ কমেছে?”
সিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল,
—”একটুও না”
কিন্তু তার লাল হয়ে যাওয়া কান দুটো অন্য কথা বলছিল। কাইলিন মুচকি হাসল। তারপর আলতো করে তার কপালে হাত রেখে বলল,
—”আমি হাসপাতালে যাচ্ছি। ভালো মেয়ে হয়ে থাকবে”
সিয়া এবার নিচু স্বরে বলল,
—”বেবির খবর আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন”
—”প্রথম তোমাকেই বলব”
কাইলিন শেষবারের মতো তার মাথায় হাত বুলিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে আবারও কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে দুষ্ট হাসি টেনে পিছন ফিরে বলে,
—”আর হ্যাঁ, এখন হরলিক্স খেতে হবে না। আমি এসে খাওয়াব”
সে এক চোখ টিপ মেরে চলে গেল। এদিকে রমণী বুঝল না তার কথা, সে আবার কখন হরলিক্স খায়? পরমুহূর্তে ধরে ফেলল, কাইলিন আবার তার হাইট নিয়ে খোঁচা মেরেছে। সে হাত পা ঝাড়া দিয়ে চিৎকার করে,
—”তালগাছ, বদলোক..আজকে আসুক একবার”
ঢাকার অন্যতম অভিজাত ও আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র, “এবিকেয়ার হসপিটালের অষ্টম তলার একটি সম্পূর্ণ করিডোর আজ যেন অন্য এক আবহে আবদ্ধ। পুরো ফ্লোরজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। করিডোরের দুই পাশে কালো স্যুট পরা নিরাপত্তারক্ষীরা সতর্ক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও কোনো অচেনা মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। লিফটের সামনে আলাদা চেকপয়েন্ট, সিঁড়ির প্রবেশমুখেও পাহারা।
বাতাসে ভাসছে জীবাণুনাশকের গন্ধ, আর তার সঙ্গে মিশে আছে একদল মানুষের উদ্বেগ, প্রার্থনা আর প্রতীক্ষা।
সানাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অনেক আগেই আর তার অপেক্ষাতেই করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে আছে অস্থিরতা। কেউ চুপচাপ হাঁটছে, কেউ বারবার ঘড়ি দেখছে, কেউ আবার নীরবে প্রার্থনা করছে। কিন্তু তাদের সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্থির দুই মানব, আরজে আর এসপি। ঈশানী আর রিজভী এখনো এসে পৌঁছায়নি।
করিডোরের এক কোণায় রাখা ধূসর রঙের চেয়ারে বসে আছে এসপি। বাইরে থেকে তাকে যতটা স্বাভাবিক লাগছে, ভেতরে সে ঠিক ততটাই বিপর্যস্ত। তার দুই হাতের আঙুল একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িয়ে আছে। কখনো সেগুলো ঘষছে, কখনো আবার হাঁটুতে টোকা মারছে। এমনকি নিজের অজান্তেই কয়েক সেকেন্ড পরপর মাথা তুলে অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটার দিকে তাকিয়ে ফেলছে। তার পাশেই বসে আছে সানিতা। আর সে সানাকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে অবিরাম কেঁদেই চলেছে। একবার চোখ মুছে, দুই মিনিট পর আবার নাক টানে, আর সাথে চোখে পানিতো ফ্রী। এসপি মাঝে মধ্যে বুঝতে পারে না, মেয়েটা এত আবেগী কেন? কারো কিছু হলেই সানিতাকে কেঁদে কুটে বন্যা ভাসিয়ে ফেলতে হবে। এমনকি মুভি দেখার সময়ও। কোন সেড পার্ট আসলে নায়িকা কাঁদার আগে সানিতার চোখে জল।
এসপি প্রথমে ধৈর্য ধরেছিল। কিন্তু এখন তার নিজেরই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। সে পাশ ফিরে কটমট করে তাকিয়ে বলল,
—”তোর মতো ছিচকাঁদুনে আমি আমার লাইফেও দুটো দেখিনি”
সানিতা সঙ্গে সঙ্গে তার টি শার্টের হাতাতে নাক মুছে বলল,
—”তোমাকে কে বলেছে ছিচকাঁদুনে বিয়ে করতে? যখন সহ্য করতে পারছ না”
এসপি বিরক্ত মুখে একবার নিজের টি-শার্টের ভিজে অংশ টা দেখল যেখানে সানিতা গত একঘন্টা ধরে মুছতে মুছতে ভিজিয়ে ফেলেছে। তারপর বলল,
—”তুই এত ছিচকাঁদুনে, বিয়ের আগে বললি না কেন?”
—”তুমি আগে জেনে বিয়ে করলে না কেন?”
এসপি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—”তোর সাথে ঝগড়া করার কোনো মুড নেই আমার”
সানিতা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে প্রতুত্তর করে,
—”আমারও তোমার সাথে কথা বলার কোনো মুড নেই। একবার শুধু সানা সিসের বেবি হয়ে যাক, তারপর আমি সোজা চৌধুরী মহলে চলে যাব। থাকব না তোমার সাথে”
এসপি এবার হালকা ভ্রু তুলে শুধালো,
—”সেই ঘুরে ফিরে তো আমার বাড়িতেইই যাবি। এত বড় বড় করে বলছিস কেন?”
সানিতা রাগে ফুঁসতে লাগল। চোখদুটো বড় বড় করে এসপির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
—”যাব না আমি তোমার বাড়ি। আমি ফারুকী নিবাসে চলে যাব”
— “হ্যাঁ, সেই তো আমার মামার বাড়িতেই যাবি। তোর তো আর বাপের বাড়ি নাই। ঘুরে ফিরে আমার বাড়িতেই থাকবি তুই”
এসপি বাক্যটা শেষ হতে না হতেই সানিতার ছোট ছোট হাতের তিনটে সোজা আঘাত এসে পড়ল এসপির উরুতে।
—”অসভ্য, বেয়াদব, একদম কথা বলবা না আমার সাথে”
এই বলে আবারও তার টি-শার্টে নিজের নাকটা মুছে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এদিকে এসপিও মুখ গম্ভীর করে আবার সামনে তাকিয়ে বসল। মনে মনে অবশ্য হাসিও পাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই হাসি প্রকাশ করার সাহস তার নেই।
তবে এই পুরো করিডোরে যদি কাউকে দেখে মনে হয় তার পৃথিবীটা এখন বুকের ভেতর উল্টে যাচ্ছে তাহলে সে আরজে। আরজের জীবনে এমন অনেক রাত এসেছে, যখন মৃত্যুর ছায়া তার কাঁধ ছুঁয়ে চলে গেছে। এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন এক পলকের ভুল মানেই ছিল নিশ্চিত সমাপ্তি। অন্ধকারের গভীরতম গহ্বরে নেমে গিয়েও ফিরে এসেছে জীবিত মানুষের পৃথিবীতে। কিন্তু আজ..আজ সেই মানুষটাই হাসপাতালের একটি করিডোরে দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে উঠছে। যেন তার শরীরটা এখানে আছে, কিন্তু মনটা অপারেশন থিয়েটারের দরজার ওপারে, যেখানে আছে তার পৃথিবী, তার স্ত্রী, তার ভালোবাসা, তার রাজকন্যারা।
তার দুই হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ। আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে উঠেছে। চোয়াল এতটাই শক্ত হয়ে আছে যে দূর থেকে দেখলেও বোঝা যায়, সে নিজের সমস্ত অস্থিরতা দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না, একদমই পারছে না। কেননাডাক্তার শুরু থেকেই তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল,
“জমজ বাচ্চার ক্ষেত্রে সবসময় কিছু অতিরিক্ত ঝুঁকি থাকে”
এই বাক্যটাই গত কয়েক মাস ধরে আরজের বুকের মধ্যে বিষাক্ত কাঁটার মতো আটকে আছে। কয়েক মাস আগে পর্যন্ত সে প্রতিটা রাত সানার উদরের ওপর মাথা রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থাকত। বাচ্চাদের নড়াচড়া অনুভব করত। আর আজ, সেই ছোট্ট প্রাণগুলো পৃথিবীতে আসতে যাচ্ছে। কিন্তু তার বিনিময়ে যদি সানার কিছু হয়ে যায়?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই আরজের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেল।
করিডোরের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিজভী দূর থেকে বন্ধুকে দেখছিল। সে একটু আগেই এসেছে। রিজভী খুব ভালো করে জানে, তার বন্ধু টা উপরে যতটা শক্ত দেখায়, ভেতরে ঠিক ততটাই ভঙ্গুর হয়ে যায় যখন বিষয়টা সানাকে ঘিরে হয়। সানার জন্য আরজে নিজের জীবনও দ্বিতীয়বার ভাববে না। আর আজ, সেই সানাই অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে। আর বাহিরে সবাই নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে কখন অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলবে, কখন প্রথমবারের মতো শোনা যাবে নবজাতকের কান্না, কখন এই দীর্ঘ অস্থিরতার অবসান হবে।
আচমকা অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল। আর পরমুহূর্তেই ধীরে ধীরে খুলে গেল সেই নিষ্ঠুর দরজাটা। আরজের নজরে আসতেই এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে গেল। সবার আগে বেরিয়ে এলেন ডক্টর লুনা। আর তার কোলে একটা ছোট্ট গোলাপি কাপড়ে মোড়ানো নবজাতক। মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ডক্টর লুনার অধরে তৃপ্তির একটা হাসি খেলে গেল। তিনি বাচ্চাটাকে আলতো করে আরজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
—”মিস্টার জাওয়ান… কনগ্র্যাচুলেশন। ইয়োর বেবি”
বিপরীতে মানব স্থির হয়ে গেল। পাথরের মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। আর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রইল সেই ছোট্ট মুখটার উপর। এত ছোট, এত কোমল, এত নিখুঁত যেন সৃষ্টিকর্তার নিজের হাতে গড়া কোনো জান্নাতি ফুল। তারপর হঠাৎ বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। ক্ষুদ্র সেই কান্নার শব্দটা যেন সরাসরি এসে আঘাত করল আরজের হৃদয়ে। মুহূর্তেই তার ধ্যান ভেঙে গেল। সে তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তারপর মাথাটা ঝুঁকিয়ে ছোট্ট ললাটে একটা চুমু একে দিল। অতঃপর তার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বের হয় উষ্ণ কণ্ঠস্বর,
—”হুশশ… হুশশ, লিটল প্রিন্সেস হার্ট…ড্যাডি ইজ হিয়ার…ডোন্ট ক্রাই, মাই হার্ট…”
অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল ক্ষণিকে। যেন ছোট্ট প্রাণটা সেই কণ্ঠস্বর চিনে ফেলল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কান্নাটা থেমে তার বুকের সাথে মিশে গেল। আরজে ফের চোখ তুলে তাকাল বদ্ধ থিয়েটারের দরজার দিকে। এক লহমায় তার চিন্তা, তার সমস্ত অস্থিরতা আটকে গেল অপারেশন থিয়েটারের ওই ভারী দরজার ওপারে। হঠাৎ যেন সমস্ত আনন্দের মাঝেও বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে ডক্টর লুনার দিকে তাকিয়ে উদ্বেগের সহিত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল একনাগাড়ে,
—”মাই ওয়াইফ… হাউ ইজ শি?”
শি’স ওকে, রাইট?
ওর কোনো প্রবলেম হয়নি তো?
আই ওয়ান্ট টু সি হার… রাইট নাও।
শি ইজ নট ইন পেইন, রাইট?
ডক্টর, টেল মি দ্যাট শি’স ফাইন?”
সাধারণত যার কণ্ঠে সবসময় আদেশের সুর থাকে, সেই মানুষটার গলায় আজ উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। ডক্টর লুনা কয়েক মুহূর্ত আরজের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার অধৈর্যশীল প্রশ্নের বিপরীতে তিনি ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
—”রিল্যাক্স, মিস্টার জাওয়ান। সানা ইজ অলরাইট। মা এবং বেবি দুজনই স্টেবল। এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা ওকে বেডে ট্রান্সফার করে দেব। আপনার ওয়াইফ একদম ঠিক আছে”
কথাগুলো কর্ণপাত হতেই আরজে যেন দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার পর প্রথমবারের মতো শ্বাস নিতে পারল। সে চোখ বন্ধ করে গভীর একটা নিঃশ্বাস নিল। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা বুঝি এইমাত্র জিতে এসেছে। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে নিজের বুকে শুয়ে থাকা ছোট্ট শিশুটার কপালে ফের আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল স্নেহময় শান্ত এক হাসি। মানব ফিসফিস করে,
—”ইউর মম ডিড ইট, প্রিন্সেস। শি’স ফাইন। সি? আই টোল্ড ইউ, ইউর মম ইজ দ্য স্ট্রংগেস্ট ওম্যান ইন দিস ওয়ার্ল্ড”
বহুদিন পর হয়তো প্রথমবারের মতো আরজের হৃদয় থেকে এক বিশাল পাথর সরে গেল। হঠাৎ তার শরীর বেয়ে একটা অজানা অনুভূতি বয়ে গেল। এমন অনুভূতি সে আগে কখনো পায়নি, এমন না যে সে প্রথমবার বাবা হচ্ছে। কিন্তু, আরভি জন্মানোর সময় সে ছিল না। সন্তানকে প্রথমবার কোলে নেওয়ার অলৌকিক অনুভূতিটা তার ভাগ্যে জোটেনি। কিন্তু আজ…আজ সে সেই অনুভূতিটা নিজের প্রতিটা শিরা উপশিরায় অনুভব করছে। এ যেন পৃথিবীর কোনো অনুভূতির সাথেই তুলনীয় নয়। হাজারটা যুদ্ধ জেতার আনন্দও না, কোটি কোটি সম্পদের মালিক হওয়ার তৃপ্তিও না, এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। একটা হৃদয়ের ভেতর আরেকটা হৃদয়ের জন্ম নেওয়ার মুহূর্ত। আরজে নিচু হয়ে বাচ্চাটার কানের কাছে আজান দিল। তারপর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে মৃদু স্বরে আওড়াল,
—”হেই লিটল প্রিন্সেস হার্ট…তুমি তো জন্মের পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তোমার ড্যাডিকে জিম্মি করে ফেলেছো”
তার ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বের হয় তৃপ্তির হাসি। আজ সেই হাসিতে কোন কপটতা নেই, কোন অহংকার নেই, আছে শুধুই স্নেহ,
—”ইউ নো মাই হার্ট…হঠাৎ আজ মনে হচ্ছে, জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি, সমস্ত ক্ষত, সমস্ত হারানোর বিনিময়ে রব আমাকে একটা জান্নাতের টুকরো উপহার দিয়েছেন”
সে ধীরে ধীরে বাচ্চাটার ক্ষুদ্র আঙুলটা নিজের আঙুলের মধ্যে নিল। আর সেই ক্ষুদ্র হাতটা অদ্ভুত ভাবে তার আঙুল শক্ত করে ধরে। হয়তো এটাই পিতৃত্বের টান। আরজের ঠোঁটের হাসিটা আরো চওড়া হলো,
—”প্রিন্সেস, তোমার ড্যাডি এই মুহূর্তটার জন্য অনেক অপেক্ষা করেছে যদিও আমি ভীষণ অধৈর্যশীল। প্রিন্সেস হার্ট…তুমি দশ মাস তোমার মায়ের গর্ভে ছিলে। আর বাকি সারাটা জীবন থাকবে তোমার ড্যাডির হৃদয়ের সেই জায়গায়, যেখানে পৌঁছানোর অধিকার কারও নেই”
এতটুকু পর্যন্ত তার কণ্ঠ একেবারে শান্ত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা কঠোর হয়ে উঠল আর চোখে ফুটে উঠল এক অদম্য প্রতিজ্ঞা। ঠোঁটের উষ্ণ হাসিটা হঠাৎ তীর্যক বেঁকে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
—”আজ থেকে যে হাত তোমার দিকে ক্ষতির উদ্দেশ্যে বাড়বে। আই সোয়ার মাই হার্ট, সেটা দ্বিতীয়বার কিছু স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না। ইন মাই ওয়ার্ল্ড, প্রমিসেস আর ল। অ্যান্ড দিস ইজ ড্যাডিজ প্রমিস”
কথাগুলো শেষ করেই হঠাৎ তার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত আশঙ্কা এসে বুকের ভেতর খোঁচা দিতে শুরু করল। ঠিক তখনই কর্ণধার হলো পরিচিত কণ্ঠস্বর,
—”আরজে”
সে ঘুরে তাকাল আর নজরে আসে ঈশানী প্রায় দৌড়ে তার দিকে আসছে। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়া সত্ত্বেও নিজের কোনো খেয়াল নেই। তার পেছন পেছন ছুটে আসছে রিজভী। সে বারবার ঈশানীকে সতর্ক করছে,
—”ঈশু, আস্তে”
কে শুনে কার কথা। রমণী ধ্যানও দিল না বরং দৌড় অব্যাহত রেখে এক ঝটকায় আরজের সামনে দাঁড়িয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। তাকে মুখ ফুটে কিছু বলতে হলো না, তার মুখজুড়ে থাকা উচ্ছ্বাসই হাজারটা কথা বলে দিচ্ছে। আচমকা আরজের মস্তিষ্কে খেলে গেল আরেকটি কথা, আরেকটি হৃদস্পন্দন, আরেকটি প্রাণ, আরেকটি রাজকন্যা। সে নিঃশব্দে ঈশানীর বাড়িয়ে রাখা হাতে নিজের বুকের সবচেয়ে মূল্যবান ধনটাকে আলতো করে ঈশানীর কোলে তুলে দিল। ঈশানী বাচ্চাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই তার চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে রিজভীর দিকে তাকিয়ে বলে,
—”রিজভী দেখো না, কী কিউট। লাইক মাই কিউটি”
এদিকে আরজে সরাসরি নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল ডক্টর লুনার উপর। ডক্টর লুনা সেই দৃষ্টি দেখে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তার ভয়কে আরো একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে শ্রবণ হয় আরজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
—”মিসেস লুনা…আমার আরেকটা প্রিন্সেস কোথায়?”
প্রশ্নটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই যেন চারপাশের বাতাসটুকু থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগেও ডক্টর লুনার ঠোঁটে যে হাসিটুকু ছিল, সেটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। তিনি চোখ নামিয়ে নিলেন। তারপর খুব দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজের ভয়টাকে গলাধঃকরণ করে নিচু স্বরে বললেন,
—”উই আর সরি, মিস্টার জাওয়ান… আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম, পরিস্থিতিটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল…”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আরজের চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেল। ডক্টর লিনা কথাটার অর্থ মস্তিষ্কে বোধগম্য হতেই সে এক ঝটকায় কোমড়ে গুঁজে রাখা পিস্তল টা বের করে পর মুহূর্তে তার নল ঠেকিয়ে দিল ডক্টর লুনার ললাটে। বিপরীতে ডক্টর আতঙ্কিত হয়ে দু কদম পিছিয়ে যান। আরজে গান লোড করতে করতে আওড়ায়,
—”হাউ ডেয়ার ইউ টু……”
আরজে বাক্যটা সম্পন্ন করার আগেই অপারেশন থিয়েটারের দরজা আবার খুলে গেল। একজন নার্স ধীরে ধীরে বাইরে এসে তার সামনে দাঁড়ায়, কোলে আরেকটি শিশু নিয়ে। সাদা কাপড়ে মোড়ানো ক্ষুদ্র এক অস্তিত্ব যার পুরো শরীর টা নীল হয়ে জমাট বেঁধে আছে হয়তো কোন আঘাত পেয়ে। ডক্টর লুনা নিজের ভয়টাকে চেপে ফিসফিস স্বরে বললেন,
—”ইউর সেকেন্ড বেবি…”
মুহূর্তেই যেন পৃথিবীটা আরজের চোখের সামনে থমকে গেল। হাতে লোড করা গানটা শব্দ করে মেঝেতে গড়াগড়ি খেল কিন্তু সেই আওয়াজ আর তার কানে পৌঁছাল না। একটু আগের হিংস্রতা সব মিলিয়ে গেল শুধু ভ্রুক্ষেপহীন তাকিয়ে থাকল তার আরেকটা রাজকন্যার দিকে। অবিশ্বাসে জমে যাওয়া পাথরের মূর্তির ন্যায় স্থির সে। তারপর ধীরে ধীরে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। মনে হচ্ছে মেঝেটা পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। তার সামনে যে ছোট্ট শিশুটি শুয়ে আছে, তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে গভীর কোনো ঘুমে আচ্ছন্ন, এতটাই শান্ত, এতটাই নিশ্চুপ যেন পৃথিবীর কোনো শব্দই তাকে আর জাগাতে পারবে না। নার্স শিশুটিকে ভয়ে ভয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিল। আরজে হাত বাড়াতে গিয়েও থেমে গেল। তার আঙুল কাঁপছে। মনে হচ্ছে শরীরের সমস্ত শক্তি কোথাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে শিশুটিকে নিজের বুকে তুলে নিল, খুব যত্ন করে, খুব সাবধানে। যেন সামান্য অসতর্কতায় ভেঙে যাবে তার পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ধীরে ধীরে সে কাছের একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। তারপর দীর্ঘক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল শিশুটার দিকে। একসময় ঝুঁকে ছোট্ট কপালটায় একটা চুমু খেয়ে আওড়ায়,
—”হেই প্রিন্সেস…লুক অ্যাট মি, বেবি। তুমি তোমার ড্যাডিকে দেখবে না? হেই প্রিন্সেস…লুক ড্যাডি ইজ হিয়ার। একবার চোখ খোলে দেখো, আমি তোমাকে দেখব, তুমি আমাকে দেখবে… তারপর চাইলে আবার ঘুমিয়ে যেও”
নাহ, বাচ্চাটা তার কথা শুনল না। খুলল না তার ঘুমন্ত নিষ্পাপ নেত্রপল্লব। আরজের ধৈর্য হারিও গেছে। সে এবার রুক্ষ স্বরে আদেশ ছুঁড়ে,
—”প্রিন্সেস হার্ট… আমি শেষবারের মতো তোমাকে বলছি, ওপেন ইয়োর আইস। আজ পর্যন্ত কেউ তোমার ড্যাডির কথা অমান্য করার সাহস দেখায়নি। তুমিও করবে না… রাইট?”
আরজে এই বলে অপেক্ষা করল তার উত্তরের জন্য। কিন্তু কেটে গেল কিছুপল এভাবেই বিপক্ষে কোনো সাড়া আর এলো না। শুধু নীরবতা, এক ভয়ংকর নীরবতা চারদিকে। আরজের কঠোর কণ্ঠস্বর দমে গেল। সে মাথা নিচু করে শান্ত স্বরে আওড়ায়,
—”ড্যাডিকে এত বড় শাস্তিটা দিলে কেন, প্রিন্সেস?
আমি কি এতটাই খারাপ ছিলাম? হয়তো… হয়তো এটা আমার প্রাপ্য। হয়তো রব আমাকে বুঝিয়ে দিলেন… পৃথিবীতে এত মানুষের বুক খালি করার পর আমার অধিকার ছিল না দুইটা ফুলকে একসাথে আগলে রাখার। তাই একজনকে তিনি নিজের কাছে রেখে দিলেন…”
অবাধ্য চোখ আর বাঁধ মানল না। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল শিশুটার ছোট্ট হাতের উপর। আরজে তড়িঘড়ি করে সেটা মুছে দিল। যেন তার রাজকন্যার কোনো কষ্ট না হয়। সে শিশুটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিল। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে ধরে রাখবে, যেন ছেড়ে দিলেই সে আরও দূরে চলে যাবে। তার বুকের ভেতরটা তখন শূন্যতায় ভরে যাচ্ছে। যে মানুষ মৃত্যুকে চোখে চোখ রেখে উপহাস করতে পারে, সেই মানুষটিই আজ নিজের অস্তিত্বের মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না। সে আবারও কপালে চুমু খেয়ে বলল,
—”ঘুমাও, প্রিন্সেস…অনেক শান্তিতে ঘুমাও। ওই পারে কোনো একদিন আবার আমাদের দেখা হবে। তখন ড্যাডি তোমাকে আর কোথাও যেতে দেবে না”
কথাগুলো বলেই সে চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত শিশুটাকে বুকে আগলে রইল। তারপর আরজে নিজের রাজকন্যাকে বুকে আগলে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেল হসপিটালের বাইরে। পেছনে রয়ে গেল সবার অশ্রু ভেজা দৃষ্টি।
একটু আগেও যে করিডোরটা উৎকণ্ঠা, প্রার্থনা আর অস্থির পায়চারিতে মুখর ছিল, এখন সেই করিডোরের বুকে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। এমন নিস্তব্ধতা, যেন কেউ হঠাৎ করে সমস্ত শব্দকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে। আনন্দ এসেছে ঠিকই কিন্তু তার হাত ধরে এসেছে এক টুকরো গভীর শোকও। একটি প্রাণ পৃথিবীতে এসেছে আর একটি প্রাণ পৃথিবীর আলো না দেখেই ফিরে গেছে। এই সংবাদটার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না, কেউ না।
অপারেশন থিয়েটারের দরজাটা এখনো বন্ধ। সানাকে এখনো রিকভারি ইউনিটে রাখা হয়েছে। আরজে সেই আধাঘণ্টা আগে হাসপাতালের বাইরে চলে গিয়েছিল নিজের হারিয়ে যাওয়া কন্যাটিকে নিয়ে। ঐ মুহূর্তে কেউ তাকে আটকায়নি বা বলা যেতে পারে কেউ সাহসও করেনি। আর এখন ফিরে এসে সে একই জায়গায় বসে আছে। বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে রেখেছে নিজের বেঁচে থাকা ছোট্ট রাজকন্যাটাকে। যেন পৃথিবীর সমস্ত বিপদ থেকে তাকে আড়াল করে রাখতে চায়। যেন তাকে আর এক মুহূর্তের জন্যও নিজের কাছ থেকে দূরে সরাতে রাজি নয়। মুখভঙ্গি পাথরের ন্যায় কিন্তু সেই পাথরের ভেতরে যে কী পরিমাণ ঝড় বইছে, তা বোঝার জন্য তার চোখ দুটো একবার দেখাই যথেষ্ট। সে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে। আর সেই দৃষ্টিতে কী আছে, তা বুঝার ক্ষমতা কারো নেই।
এদিকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এসপির হাত নিশপিশ করছে। সে বারবার আরজের কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছে। একবার শুধু কোলে নিতে পারলেই হয়, একবার। কিন্তু আরজের চেহারা দেখে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। সানিতা একবার চেষ্টা করেছিল। ফলাফল?
আরজে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল যে সে দ্বিতীয়বার আর সাহস করেনি। এসপি অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর উচ্চারণ করল,
—”যা হবে দেখা যাবে, শালার কোমরে যেতেতু বন্দুক নেই তাই গুলি মারতে পারবে না, এতটুকু শিউর”
সে ধীরে ধীরে হেঁটে আরজের সামনে এসে দাঁড়াল। আরজে একবার চোখ তুলে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আবারও দরজার দিকে তাকায়। এসপি কিছু না বলে শুধু দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিল। স্পষ্ট ইশারা, বাচ্চাটাকে চাই। আরজে একবার এসপির হাতের বিরক্তিকর দৃষ্টি ছুঁড়ে তারপর নিজের বুকে থাকা ছোট্ট মেয়েটাকে আরো একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। যেন কেউ তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে এসেছে। এসপি দাঁত চেপে বিরক্ত স্বরে বলল,
—”শালা… তোর বউকে কোলে নিতে চাইছি আমি”
আরজে কিছু বলার আগেই হঠাৎ অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে ডক্টর লুনা বেরিয়ে এলেন। আরজে মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। তার সমস্ত মনোযোগ এখন চলে গেল দরজার দিকে। সে কথা না বাড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে মেয়েটাকে এসপির হাতে তুলে দিল। তারপর কয়েক কদম এগিয়েও আবার ফিরে এসে এসপির সামনে দাঁড়িয়ে দন্ত পাটি পিষে তর্জনী উঁচিয়ে সতর্ক করল,
—”আমি যদি দেখি তুই ওকে চুমু খেয়েছিস, তাহলে তোর মুখে আমি গুলি চালাব”
এই বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সোজা সানার কেবিনের দিকে চলে গেল। এখন তাকে সানাকে সামলাতে হবে। কারণ সে জানে না মেয়েটা কীভাবে এই সংবাদটা নেবে। সে জানে না সানা কাঁদবে, চিৎকার করবে, নাকি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। কিন্তু একটা বিষয় সে নিশ্চিত জানে, এই মুহূর্তে সে সানাকে একা ছাড়বে না, কখনোই না।
আরজে চলে যেতেই এসপি কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিচে তাকিয়ে নিজের কোলে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
—”দেখেছো, তোর ড্যাডটা কেমন?
পুরো পাগল তাই না?
শালা দশ বাচ্চার বাপ হয়ে গেলেও শুধরাবে না আর না আমার পিছু ছাড়বে আর না আমি ওর পিছু ছাড়ব”
এই বলে অতি যত্নের সহিত বাচ্চাটাকে বুকের সাথে আড়াআড়িভাবে ধরে একটা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। তারপর বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আলতো দোলাতে দোলাতে বলতে শুরু করল,
—”আচ্ছা বল তো, তোমাকে কী নামে ডাকব?
জুনিয়র কটকটি?
নাকি কটকটির বেটি বজ্রমালা…”
এটুকু বলে সে নিজেই মাথা নাড়ল। যেন কিছু একটা খাপছাড়া লাগছে? লাগছে তো। নামগুলো একেবারে যায় না এই কিউটের ডিব্বা টার সাথে। তাই ফের বলে,
—”না না না…এই নাম গুলো একটাও স্যুট করে না। আর তোমার ড্যাডি শুনতে পেলে বাডি আর পৃথিবীতেই থাকবে না। এবার বন্দুকের গুলি একটাও মাটিতে পড়বে না। আর তুমি তো একদম মিষ্টি একটা মার্শম্যালো। একদম সুইট, তাহলে তোমাকে সুইট কিডো বলি? হুম?”
সে নিজের এক ভ্রু নাচিয়ে এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছে যেন সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চা টা উত্তর দিবে। না, সেতো মুখ ফুটে কিছু বলতে পারবে না। তাই আঙুল বাড়িয়ে বাচ্চাটার ছোট্ট হাত স্পর্শ করে ফের নরম সুরে শুধালো,
—”সুইট কিডো…শোনো, আমি কিন্তু তোমার অফিসিয়াল বাডি”
তারপর হঠাৎ চারদিকে তাকিয়ে আরজে কে খুঁজল। আরজে নেই আশেপাশে, এটা নিশ্চিত হয়ে এসপি ঠোঁটে দুষ্ট হাসি ঝুলিয়ে আওড়ায়,
—”লিসেন কিডো। তুমি জানো, তোমার ড্যাডি অনেক ডেঞ্জারাস, তোমার আন্টিরাও ডেঞ্জারাস, তোমার গ্র্যান্ডমা হলে তো আরও ডেঞ্জারাস হতো। আর এতো সব ডেঞ্জারাস মানুষের শুধুমাত্র একজনই জেন্টেল আছে আছে। সেটা জানো কে? অবশ্যই তোমার বাডি। যদিও আমি নিজের তারিফ করতে পছন্দ করি না কিন্তু কিডো হিসাবে তোমাকে ফার্স্ট আমার নামটাই নিতপ হবে”
এই দৃশ্য টা ভাবতেই সে শব্দ করে হেসে দিল,
—”এন্ড ইউ নো, তখন জাওরার মুখটা দেখার মতো হবে যখন মেয়ের মুখে ড্যাডি না শুনে বাডি শুনবে…
ওকে কিডো, ডিল?”
বাচ্চাটা হাই তুলল। এসপির তা দৃষ্টিপাত হতেই সাথে সাথে উত্তেজিত স্বরে বলল,
—”সো, ডা…….”
এসপি নিজের বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারল না তার আগেই কোথা থেকে যেন ঝড়ের বেগে ছুটে এল সানিতা। সে এসে এসপির পাশেই ধপ করে বসে পড়ল। তারপর একদম সরাসরি দুই হাত বাড়িয়ে দিল। চোখে মুখে স্পষ্ট দাবি, বাচ্চা হস্তান্তর করতে হবে এখনই। এসপি একবার তার দিকে তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গম্ভীর গলায় শুধালো,
—”কে যেন বলেছিল বেবি হওয়ার পর বাপের বাড়ি চলে যাবে? তাহলে সে এখনো হাসপাতালে কেন?”
সানিতা চোখ রাঙাল। কিন্তু আজ ঝগড়া করার মুড নেই, একদমই নেই। রমণী এসপির হাত থেকে বাচ্চাটাকে নিতে নিতে বলল,
—”এইসব ঝগড়া তোলা থাকলো। ম্যানশনে ফিরে গিয়ে এর প্রতিশোধ আমি কড়ায়-গণ্ডায় নেব। একরত্তিও ছাড় দেব না তোমাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে না”
এই বলে সে সাবধানে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কোলে নিতেই বাচ্চাটা হঠাৎ কেঁদে উঠল। এসপি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
—”দেখেছিস, দেখেছিস। তোর কোলে গিয়েই কান্না করছে। তোকে একফোঁটাও পছন্দ হয়নি কিডোর। এর আগে তুই ওকে নিজের মতো ছিঁচকাদুনে বানিয়ে ফেলিস তার আগে দে আমার কাছে দে।
কিডো তার বাডিকে মিস করছে”
সানিতা চোখ পাকিয়ে তাকাল সাথে সাথে এসপির বাকি কথাটুকু গিলে ফেলল,
—”চুপ করো”
সে ধীরে ধীরে বাচ্চাটাকে দোলাতে দোলাতে বলে,
—”তুমি ভুলে গেছো আমিও এক বাচ্চার মা। বাচ্চাদের শান্ত করাতে আমিও জানি”
এসপি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ের সাথে তর্কে জেতা অসম্ভব। সে তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
—”আমার মেয়েটা কী করছে?”
—”নানুর সাথে খেলছে। একটু আগেই ভিডিও কলে কথা হয়েছে। তোমাকে খুঁজছিল, শুধু পাপা পাপা করছিল”
এসপি ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি টেনে কল লাগালো লিপি ফারুকীর নাম্বারে কল লাগলো তার অ্যাঞ্জেলের সাথে কথা বলতে।
রাত নেমেছে ব্ল্যাক ম্যানশনের উপর, কিন্তু সেই রাতের রং আজ অন্যরকম। যেন আকাশ নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না আজ তাকে শোকের কালো চাদর বিছাতে হবে, নাকি আনন্দের প্রদীপ জ্বালাতে হবে। ‘সৃষ্টির আনন্দ আর বিচ্ছেদের শোক’ দুই বিপরীত অনুভূতি যেন একই থালায় সাজিয়ে উপহার দিয়েছে নিয়তি। পুরো ম্যানশন আজ অদ্ভুত এক নীরবতায় ঢাকা। যে নীরবতায় মাঝে মাঝে নবজাতক শিশুর ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়, আবার ঠিক পরমুহূর্তেই বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের ভার অনুভূত হয়।
সন্ধ্যা থেকে একে একে সবাই সানার কাছে এসেছে। ইবেলিনা পর্যন্ত নিজের শারীরিক অবস্থার কথা ভুলে এসে কিছুক্ষণ বসে থেকেছে। প্রত্যেকে নিজেদের মতো করে তাকে সান্ত্বনা বানী শুনিয়েছে কিন্তু মাতৃমন কী সেই সান্ত্বনা শুনেছে? না, কোন ঔষধই মাতৃমনের ক্ষত সারাতে পারেনি, পারবেও না।
নিজেদের কক্ষের দরজার সামনে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। তার দৃষ্টি কক্ষের ভেতরে স্থির, কিন্তু মন যেন এখনো আটকে আছে সেই হসপিটালের কক্ষে। সানা জ্ঞান ফেরার পর কী ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি করেছিল, সেটা মনে পড়তেই তার বুকটা ভারী হয়ে উঠল। জ্ঞান ফিরেই সানা প্রথমে চারপাশে তাকিয়ে নিজের বাচ্চাদের খুঁজছিল তারপর যখন সত্যিটা উপলব্ধি করেছিল, তখন যেন পুরো পৃথিবীটাই ভেঙে পড়েছিল তার উপর। সে স্যালাইনের সুই ছিঁড়ে ফেলেছেল, মনিটরের তার ছিঁড়ে ফেলেছিল, হাসপাতালের কেবিনের টেবিল, ট্রে, ওষুধ যা সামনে পেয়েছে সব এলোমেলো করে দিয়েছিল। রমণী নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে কেঁদেছিল আর সাথে বারবার বলেছিল,
—”না, না, আমার দুটো বেবি ঠিক ছিল”
—”ডাক্তার মিথ্যা বলছে”
—”আমার দুইটা সোনামণি ছিল”
—”রানভীর, আমার বাচ্চাটাকে এনে দেন”
—”এসপি, আমার মেয়েকে এনে দেয়”
ঠিক যেমনটা হয়েছিল বহু বছর আগে…যখন তাকে মিথ্যা করে বলা হয়েছিল তার সন্তান বেঁচে নেই। আজও একই দৃশ্য, একই আর্তনাদ, একই অসহায়ত্ব পার্থক্য শুধু একটাই আজ সত্যিটা সত্যি ছিল। অনেক কষ্টে তাকে শান্ত করেছিল আরজে। অবশেষে যখন জীবিত শিশুটিকে তার বুকে দেওয়া হয়েছিল…সানা এক মুহূর্তে চুপ হয়ে গিয়েছিল, একদম নিশ্চুপ। যেন পৃথিবীর সমস্ত শব্দ হঠাৎ তার কানে পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু নিজের বুকের সঙ্গে শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল। কাউকে ছুঁতেও দেয়নি, এমনকি আরজেকেও না। শুধু একটা কথাই বলেছিল,
—”এখানে আমার দম বন্ধ লাগছে, আমাকে বাড়ি নিয়ে চলুন”
আরজেও বিপরীতে আর কোনো কথা বলেনি। তাকে নিয়ে চলে এসেছে নিজের ম্যানশনে, নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে। গভীর শ্বাস নিয়ে আরজে ধীরে ধীরে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল। রুমের মাঝখানে অবস্থিত কিং সাইজ বেডের উপর আধশোয়া অবস্থায় আছে সানা। তার কোলে ছোট্ট শিশুটি। আর রমণী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কোনো কথা নেই, কোনো হাসি নেই, কোনো অভিযোগও নেই। শুধু একরাশ ক্লান্তি, একরাশ শূন্যতা। আজ তার মুখে থাকার কথা ছিল মাতৃত্বের উজ্জ্বল আলো। অথচ সেখানে আছে গভীর বিষণ্ণতা।
অন্যদিকে আরভি বসে আছে শিশুটার পাশে। তার চোখে মুখে কৌতূহল আর আনন্দ। সে আলতো করে বাচ্চাটার ছোট্ট হাত ছুঁয়ে আবার ভয়ে সরিয়ে নিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন কাঁচের পুতুল। একটু জোরে ছুঁলেই ভেঙে যাবে। একদিনের ছোট্ট শিশুটাও আধো আধো চোখে তাকিয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। ঠিক তখনই আরভির নজর পড়ল আরজের দিকে। সে উজ্জ্বল মুখে বলে উঠল,
—”ড্যাড, এটা শুধু আমার লিটল সিস্টার, তাই না?”
আরজে বিছানায় বসতে বসতে ভ্রু তুলে, ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ ফাঁক করে আওড়ায়,
—”নো, মাই বয়। ইটস জাস্ট ইটস মাই লিটল প্রিন্সেস হার্ট”
আরভির মুখ সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল। ছোট্ট মুখে বিরক্তি ফুটে ওঠল স্পষ্ট ভাবে। আরজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—”নো, ও আমার সিস্টার। ফার্স্ট মাই সিস্টার”
আরজেও সঙ্গে সঙ্গে তার মতো গম্ভীর স্বরে প্রতিবাদ করল,
—”ফার্স্ট মাই ডটার, আই হ্যাভ সিনিয়রিটি। ও আমার প্রিন্সেস হার্ট। তুমি পরে এসেছ”
আরভি কোমরে হাত রেখে একদম আরজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গরম নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
—”ড্যাড, আমি তোমার সঙ্গে ডিবেট করছি না। ও আমার সিস্টার, ফুল স্টপ। আরভির কোর্টে রায় হয়ে গেছে”
—”আরজে কোন কোর্ট বা রায়ের ধার ধারে না। আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। ও আমার প্রিন্সেস। তুমি শুধু ওর বড় ভাই। জাস্ট এ বডিগার্ড, আন্ডারস্ট্যান্ড?”
আরভি ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,
—”আমি বডিগার্ড না, বিগ ব্রো। ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট পার্সন”
আরজে একটানে তাকে বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে মাথা নাড়িয়ে বাক্য ছুঁড়ে,
—”রিজেক্টেড, তুমি এখনও ট্রেনিং পিরিয়ডে আছ”
এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক চলল দুই বাপ ব্যাটার মধ্যে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। তারপর আরভি বিরক্ত হয়ে আবার শিশুটার দিকে ফিরে গেল। সে গম্ভীর মুখে বাচ্চাটাকে বলল,
—”ইউ নো, লিটল সিস্টার…আম ওয়েটিং ফর ইউ আ লং টাইম। বাট তুমি শুধু ঘুমিয়েছো, সো ফ্রম টুডে…”
সে তর্জনী তুলে ধরে একটু চোখ রাঙিয়ে বলে,
—”নো মোর স্লিপিং অর…..”
আরভি তার অর্ধেক কথাতেই আটকে গেল কেননা ঠিক তখনই আরজে তার আঙুল নামিয়ে দিয়ে তাকে সতর্ক করে দিল,
—”নোপ রিশ, তুমি আমার প্রিন্সেস হার্টের সাথে গলা উঁচু করে কথা বলতে পারবে না। আর অর্ডার তো একদমই না”
—”ড্যাড, আমি তোমার প্রিন্সেসকে অর্ডার দিচ্ছি না। আমি আমার সিস্টারকে অর্ডার দিচ্ছি। বিগ ডিফারেন্স”
—”নো ডিফারেন্স, সেম পার্সন, সেম প্রিন্সেস এন্ড সেম রুলস। নো অর্ডার, নো লাউড ভয়েস, নো ফিঙ্গার পয়েন্টিং এলাউড। বুঝতে পেরেছ”
আরভি এবার সত্যিই ক্ষেপে গেল। সে চিৎকার করে ওঠে,
—”ড্যাডডডড”
আরজেও তার বিপরীতে কিছু বলতে যাবে কিন্তু এই পর্যায়ে এসে সানার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। একে তো মাথা ধকধক করছে, শরীরটা দুর্বল আর মনটা একদম ভাঙা কাঁচের সদৃশ। তার উপর বাপ ছেলের এই অনন্ত তর্ক। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা তুলেন এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল যে মুহূর্তে দুজনেই চুপ। রমণী দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলল,
—”আর একটা শব্দ হলে…তুই বাপ ছেলের কানের নিচে আমি এমন বাজান বাজাবো। তখন আর সিস্টার আর প্রিন্সেস বলার অবস্থাই থাকবে না, কথা কাটাকাটি তো দূর”
মুহূর্তে বিপরীতে দুই আল্লার বান্দা সানার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে তাকিয়ে একই সঙ্গে ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল,
—”হুশশশ, মাই বয়”
—”হুশশশ, মাই ড্যাড”
ঠিক তখনই শব্দ করে আরজের মুঠোফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে আর কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে ব্যালকনির গিয়ে ভালো করে দরজাটা লাগিয়ে দিল।
রাতের শীতল বাতাসে ব্যালকনি ঠান্ডা হয়ে থাকার কথা ছিল কিন্তু এই মুহূর্তে যেন তা বিপরীত হয়ে আছে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা আরজের গরম নিঃশ্বাসে মনে হচ্ছে সারা বেলকনিটা উত্তপ্ত হয়ে আছে। রাগে তার সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে। তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে নিবদ্ধ হচ্ছে মোবাইলের স্ক্রিনে জ্বলতে থাকা রিপোর্টের ওপর, ডিএনএ রিপোর্ট। রিপোর্টটা সে ইতিমধ্যে হয়তো পঞ্চাশবার পড়েছে, সাদা স্ক্রিনে কালো অক্ষরে এখনও একই শব্দ জ্বলছে,
“NOT MATCH”
লেখাটা পড়ে মনের কোণে এক টুকরো উৎফুল্লতা জেগে ওঠলেও রাগে আবার তা নিবে যাচ্ছে। সে ঐ মুহূর্তে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে বাচ্চাটার ডিএনএ টেস্টের জন্য পাঠায়। কিছু ল্যাবে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও বারো ঘন্টা লেগেছে রিপোর্ট আসতে। আরজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার হাতের শিরাগুলো ইতিমধ্যে ফুলে উঠেছে। নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর কোনো আগ্নেয়গিরি ফেটে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। ‘নট ম্যাচ’ কথাটার মানে মৃত অবস্থায় যেই শিশুটিকে তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, সে তার মেয়ে ছিল না, তার রক্ত ছিল না, তার প্রিন্সেস ছিল না।তাহলে…তার আসল মেয়েটা কোথায়?
কারা তাকে নিয়ে গেছে?
কিভাবে নিয়ে গেছে?
হসপিটালের মতো জায়গা থেকে?
ততাও আবার তার নাকের ডগার সামনে থেকে?
এই প্রশ্নগুলো মাথার ভেতরে এমনভাবে আঘাত করছিল যে আরজের মনে হচ্ছিল সে পাগল হয়ে যাবে। ঠিক তখনই ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো অভির কণ্ঠ,
—”স্যার… আমার মনে হচ্ছে এগুলো সব প্রি-প্ল্যান ছিল। না হলে ওই মৃত বাচ্চাটা কোথা থেকে আসবে? মানে….”
—”ড্যাম”
হঠাৎ পুরো ব্যালকনি কেঁপে উঠল আরজের গর্জনে। সে এত জোরে দেয়ালে ঘুষি মারল যেন কংক্রিট পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। কিন্তু তার ব্যথা অনুভব হচ্ছে না, একফোঁটাও না। ফোনের বিপরীতে থাকা অভিও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সে আরজের এই রাগটাকে ভীষণ ভয় পায়। অভি বুকের উপর হালকা চাপড় মেরে নিজেকে সামলাতেই আবারও তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে আরজের বজ্রস্বর,
—”আমি জাস্ট ওই ডাক্তারটাকে ফার্স্ট টাইম ট্রাস্ট করেছিলাম, আর ঐ ব্লাডি বিচ, বিশ্বাসঘাতক মহিলা”
প্রতিটা বাক্য উচ্চারণ করছে তার সাথে সাথে দেওয়ালে আঁচড়ে পরছে তার মুষ্টি। রক্ত এখন হাত বেয়ে ঝরছে।৷ কিন্তু তার চোখে শুধু আগুন। মনে মনে হাজার টা প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, এত সিকিউরিটির মধ্যে থেকে একটা বাচ্চা গায়েব হয়ে গেল?
যে এটা করেছে… সে জানত আরজে কীভাবে চিন্তা করে, সে জানত কোথায় ক্যামেরা আছে, সে জানত কোন রুটে যাওয়া যায়। তারপর আরজের চোখ দুটো সরু হয়ে এলো, এমন ক্ষমতা কার আছে? প্রশ্নটা কয়েক সেকেন্ড ভাবল। হঠাৎ একটাই নাম মাথায় ঝলসে উঠল,
‘সারহাদ চৌধুরী’
আরজে দাঁতে দাঁত চেপে অভিকে বলল,
—”অভি, সারহাদ কোথায়?”
ওপাশে দ্রুত কীবোর্ডের শব্দ শোনা গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর অভি বলল,
—”স্যার… সারহাদ ইতালিতে আছে। গত আট মাসে সে একবারও বাংলাদেশে আসেনি। শুধু আপনাদের বিয়েতে এসেছিল”
আরজে বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করল। তার কণ্ঠস্বর থেকে আবারও বেরিয়ে আসল বিরক্তিকর শব্দ,
—”ড্যাম ইট”
সে নিজের চুলে হাত চালিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডা স্বরে আওড়াল,
—”হসপিটালের সিসিটিভি?”
—”স্যার… আমি রিপোর্ট পাওয়ার সাথে সাথেই হ্যাক করার চেষ্টা করেছি। বাট অলরেডি কেউ ফুটেজগুলো টেম্পার করেছে”
—”কিহহ?”
—”জি স্যার, যে করেছে সে প্রফেশনাল। সবকিছু রিস্টোর করতে অন্তত ছয় ঘণ্টা লাগবে”
আরজের চোখের মণি ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে উঠল। আরেকবার, আবারও কেউ তার থেকে এক ধাপ এগিয়ে গেছে, আবারও। তার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। এই অতিরিক্ত রাগ, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা অতিরিক্ত চাপ ঠিক এই জিনিসগুলোই রনোকে জাগিয়ে তোলে। সে অনুভব করল বুকের ভেতরে বহুদিনের ঘুমন্ত অন্ধকারটা নড়ে উঠছে, ফিসফিস করছে, রক্ত চাইছে, ধ্বংস চাইছে। আরজে তৎক্ষণাৎ নিজের মাথা নিচু করে কয়েকবার জোরে জোরে দেয়ালে আঘাত করে বিড়বিড়ায়,
—”না, না, এখন না, কিছুতেই না”
আজ রনো বের হতে পারবে না। আজ তার মেয়েকে খুঁজে বের করতে হবে। আজ তার মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। কাঁপা হাতে সে পকেট থেকে রিজভীর দেওয়া ওষুধ বের করে একটা ক্যাপসুল মুখে ফুড়ে নিল। গত চার মাস, পুরো চার মাস এটা খেতে হয়নি। আজ আবার লাগল। ওষুধটা মুখে ফেলেই সে চোখ বন্ধ করল। ধীরে ধীরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনল।
কয়েক মিনিট পরে কক্ষে ফিরে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই থমকে গেল। বেডের ওপর শান্তভাবে ঘুমিয়ে আছে সানা। তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট শিশুকন্যা। আর একটু দূরে আরভিও ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা সম্পূর্ণ ছবি, একটা পরিবার, একটা পৃথিবী যেটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে এত বছর যুদ্ধ করেছে। আরজের ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে সানার ললাটে একটা দীর্ঘ চুমু এঁকে দিল, তারপর মেয়ের কপালে, তারপর আরভির। তার কল্পনায় থাকা সেই বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
—”তোমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাও। বাইরের পৃথিবীটা আমি দুহাতে সামলে নিবো। আমার আরেকটা পৃথিবী এখনও কোথাও আছে। আমি ওকে ফিরিয়ে আনব। যে-ই ওকে নিয়ে থাকুক…”
তার চোখে আবার সেই হিংস্রতার আগুন জ্বলসে উঠল। সে নিঃশব্দে বেড়িয়ে পড়ে কক্ষ থেকে।
দশ মিনিটের মধ্যে ব্ল্যাক ম্যানশনের কন্ট্রোল রুমে সবাই হাজির হলো। বহুদিন পর আবার সেই পুরোনো ঘরটাতে চারপাশে শত শত স্ক্রিন, লাইভ ফিড, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং, ডেটাবেস সব ফুটে ওঠেছে এবং এগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে আরজে। যার চোখে এখন আর কোনো পিতার কোমলতা নেই আছে শুধু শিকারির হিংস্রতা। আরজে কাইলিনের দিকে হীমধরা কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ে দিল,
—”কাই”
—”ইয়েস বস”
—”ডক্টর লুনা আর অপারেশনের সময় উপস্থিত থাকা প্রতিটা নার্সকে আধা ঘণ্টার মধ্যে আমার সামনে চাই। স্বেচ্ছায় আসলে ভালো, না এলে…”
তার কণ্ঠস্বর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। সে কাইলিনের দিকে তাকিয়ে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল যার অর্থ ভয়ংকর,
—”কী অবস্থায় আসবে সেটা তোমার ইচ্ছা”
কাইলিনের ঠোঁটে কুটিল হাসি ফুটে ওঠে,
—”আন্ডারস্টুড, বস”
এই বলে সে বেরিয়ে গেল। এবার আরজে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
—”জ্যাক, ব্ল্যাক হান্টারের সব ইউনিট অ্যাক্টিভ করো, রিজার্ভ ইউনিটও, স্লিপার সেল এভরিথিং। তালহা আদিলকে বলো প্রতিটা চেকপোস্ট থেকে শুরু করে বন্দর, প্রাইভেট জেট, কার্গো, অ্যাম্বুলেন্স সব থামিয়ে চেক করতে’
জ্যাক মাথা নাড়িয়ে তার কথায় সায় জানাল। আরজে ধীরে ধীরে সামনে ঝুঁকল স্কিন গুলোতে দৃষ্টিপাত করে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে দন্ত চেপে আওড়ায়,
—”এক ঘণ্টা, জাস্ট ওয়ান আওয়ার। এর মধ্যে আমি আমার প্রিন্সেসকে চাই। আর যদি না পাই…”
বাকি বাক্যটুকু আর বলল না। বলার দরকারও নেই কেননা তারপর কী হতে পারে সেটা তার ঠোঁটে ফুটে ওঠা ভয়ংকর হাসিটাই বলে দিচ্ছে।
আজ বহু দিন পরে আবারও ব্ল্যাক ম্যানশনের বিশাল লোহার গেট দিয়ে একটার পর একটা কালো গাড়ি করে বেরিয়ে গেল ব্ল্যাক হান্টারের পুরোনো দানবেরা। যারা বহুদিন শান্ত ছিল আজ আবার জেগে উঠেছে। আর তাদের সঙ্গে বেরিয়ে এলো সোফিয়ার বেঁচে থাকা আলফা সেনারাও। মুহূর্তের মধ্যে তারা শহরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
আকজের রাতটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। ঢাকার শহুরে কোলাহল অনেক দূরে কোথাও মিলিয়ে গেছে। রাস্তাগুলো ফাঁকা, বাতাসে অদ্ভুত এক শীতলতা। কিন্তু সেই শীতলতা একজন মানুষের ভেতরে জন্ম নেওয়া ঝড়কে একটুও শান্ত করতে পারছিল না।হাসপাতালের শেষ নিরাপত্তা বলয়টাও ভেঙে পড়েছে অনেকক্ষণ আগে। আরজে সানাকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর তার সঙ্গে থাকা সশস্ত্র গার্ড, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী, ব্ল্যাক হান্টারের সদস্য সবাই হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে হাসপাতালটা দুর্গের মতো সুরক্ষিত ছিল, এখন সেটার চারপাশে অদ্ভুত এক শূন্যতা। সেই শূন্যতার মধ্যেই হাসপাতালের পেছনের অন্ধকার গেট দিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলেন ডক্টর লুনা।
তার বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরা একটি ছোট্ট শিশু। ভয়ে তার হাত কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। অস্থির ভাবে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছেন তিনি। প্রতিটা ছায়া দেখে মনে হচ্ছে কেউ তাকে অনুসরণ করছে। প্রতিটা বাতাসের শব্দে মনে হচ্ছে মৃত্যুর পদধ্বনি হয়ে কানে বাজছে। কেননা তিনি জানেন, তার কোলে কার কার কলিজার টুকরো আছে।
হঠাৎ ভাবনা ছিঁড়ে একটা কালো এসইউভি শব্দ করে এসে তার সামনে থামল। ডক্টর লুনা আতঙ্কে দুই কদম পিছিয়ে গেলেন। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ আরও বেড়ে গেল। মনে মনে দোয়া পড়তে শুরু করলেন তিনি। হয়তো এটাই শেষ, হয়তো আরজের লোকেরা তাকে খুঁজে ফেলেছে, হয়তো আজ রাতেই সব শেষ হয়ে যাবে। ঠিক তখনই গাড়ির কালো কাঁচ ধীরে ধীরে নেমে এলো। ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
—”বস পাঠিয়েছে, গেট ইন দ্য কার”
কথাটা শুনতেই ডক্টর লুনার বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্কের একটা অংশ সরে গেল। তিনি বুঝে গেলেন কাকে বলা হচ্ছে ‘বস’। কোন প্রশ্ন না করেই তিনি তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়লেন। বাচ্চাটাকে আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন। তারপর পুরো রাস্তা জুড়ে ফিসফিস করে দোয়া-দুরুদ পড়তে লাগলেন।
হ্যাঁ, সবকিছু পরিকল্পিত ছিল, একদম শুরু থেকে গত ছয় মাস ধরে। মৃত শিশুটির ব্যবস্থা, অপারেশন থিয়েটারের ভেতরের মানুষ, সিসিটিভি ফুটেজ, হাসপাতালের নিরাপত্তা সব। প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা মুহূর্ত সবকিছু হিসাব করে সাজানো হয়েছিল। আর আজ সেই পরিকল্পনার শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে, অন্তত আপাতদৃষ্টিতে।
গাড়ির ভেতরে বসে ডক্টর লুনা কাঁপা গলায় শুধালেন,
—”আমার স্বামী আর ছেলে ঠিক আছে তো?”
সামনে বসে থাকা লোকটা রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকাল। তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
—”বস জানে।”
শুধু এইটুকুই, এর বেশি একটা বাক্যও অপচয় করল না। ডক্টর লুনাও আর কথা বললেন না বা তার সাহসও হলো না। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়ি এসে থামল একটা নির্জন জায়গায় যার চারপাশে ঘন অন্ধকার জঙ্গল আর অস্বাভাবিক নীরবতা। সামনের লোকটা দরজা খুলে দিল,
—”নেমে আসুন”
ডক্টর লুনা বাচ্চাটাকে বুকে আড়াল করে ধীরে ধীরে নেমে এলেন। তিনি নিজেও একজন মা। তবুও আজ নিজের সন্তান কে বাঁচাতে আরেকজনের সন্তান কেঁড়ে এনেছেন। এই অপরাধবোধ তার বিবেক কে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। লুনা নেমেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কেননা চারপাশে সারি সারি কালো গাড়ি। দশটা কি বারোটা হবে হয়তো তারও বেশি। সবগুলো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মাঝখানে একটা কালো মার্সিডিজ। তার সঙ্গে আসা লোকটা চোখ দিয়ে ইশারা করল সেই গাড়ির দিকে যেতে। ডক্টর লুনা শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন। গাড়ির সামনে দাঁড়াতেই কালো কাঁচটা নেমে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ঘন, তিক্ত, দমবন্ধ করা সিগারেটের ধোঁয়া।
ভিতর থেকে একটা হাত এগিয়ে এসে সিগারেটের শেষ অংশটা বাইরে ফেলে দিল।
তারপর একই হাত তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া ডক্টর লুনার দিকে মানে শিশুটিকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু ডক্টর লুনা বুকের মধ্যিখানে কিছুটা সাহস সঞ্চিত করে করে শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ভয়ে ভয়ে বললেন,
—”আগে আমার স্বামী আর ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তারপর এই বাচ্চা আপনাকে দেব”
তার বলা বাক্যটা ভিতরের ব্যক্তির শ্রবণ হতেই গাড়ির ভেতর থেকে চাপা হাসির শব্দ ভেসে এলো। লোকটার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠেছে। মনের গহীনে খেলে গেল তাচ্ছিল্যের বাক্য,
বোকা নারী, সে বুঝতেই পারছে না। যে মানুষ ব্ল্যাক হান্টারের চোখের সামনে থেকে একটা শিশু সরিয়ে আনতে পারে, সে চাইলে এই মুহূর্তে তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারে। ঠিক তখনই ডক্টর লুনা অনুভব করলেন তার মাথার পেছনে ঠান্ডা ধাতব কিছু ঠেকেছে। তিনি ঘুরে তাকালেন। আর সঙ্গে সঙ্গে তার সমস্ত সাহস মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। চারদিক থেকে সশস্ত্র গার্ড তাকে ঘিরে ফেলেছে। প্রতিটা রাইফেলের নল তার দিকেই তাক করা। তিনি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। তাড়াতাড়ি শিশুটিকে বাড়িয়ে দিলেন গাড়ির দিকে।
গাড়ির ভেতরে বসে থাকা ব্যক্তি শিশুটিকে এমন যত্নে গ্রহণ করল যেন সে কাঁচের পুতুল। যেন একটু অসাবধান হলেই ভেঙে যাবে। খুব আলতো করে, অসীম সতর্কতায় সে শিশুটিকে নিজের কোলে নিল। তারপর অনেকক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে। যেন পৃথিবীতে আর কিছু নেই শুধু সে আর শিশুটি। এদিকে ডক্টর লুনা আবার কাঁপা গলায় বললেন,
—”আমার স্বামী আর ছেলের কি হবে?
তুমি বলেছিলে বাচ্চাটাকে দিলেই ওই মাফিয়া আমার পরিবারকে ছেড়ে দেবে। তুমি জানো এই বাচ্চাটাকে এখানে আনার মানে কি? সিংহের গুহা থেকে শিকার ছিনিয়ে আনার মতো। ওই আরজে পাগলা কুকুরের মতো আমাকে খুঁজছে। এখন যদি….”
তার এক নিঃশ্বাসে বলা কথা শেষ হওয়ার আগেই গাড়ির ভেতরের মানুষটা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। অন্ধকার রাতের মধ্যে সেই হাসিটা যেন শীতল ছুরির মতো কেটে গেল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বাক্য ছুঁড়ে,
—”যদি সিংহের গুহার ভেতরেই বিশ্বাসঘাতক থাকে…তাহলে নেকড়েদের জন্য শিকার চুরি করা খুব কঠিন কাজ নয়”
ডক্টর লুনা থমকে গেলেন। তারপর আবার বললেন,
—”তুমি বলেছিলে আমার স্বামীকে ঋণ থেকে মুক্ত করবে। ওদের হাত থেকে বাঁচাবে”
লোকটা এবার বিরক্ত হয়ে তাকাল। কোন উত্তর দিল না বরং শুধু চোখ দিয়ে ইশারা করল। সঙ্গে সঙ্গে দুজন গার্ড এগিয়ে এসে ডক্টর লুনাকে অন্য একটা গাড়িতে তুলে নিল। ঠিক তখনই ডক্টর লুনাকে নিয়ে আসা লোকটা দ্রুত এগিয়ে এসে কিছুটা আতঙ্কিত স্বরে বলল,
—”বস…আরজে সব জেনে গেছে”
মুহূর্তে গাড়ির ভেতরের লোকটার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে একহাতে কপাল ঘষে ঠান্ডা স্বরে হিসহিসিয়ে উঠে,
—”এত তাড়াতাড়ি, কীভাবে?”
—”আই ডোন্ট নো বস। কিন্তু পুরো শহরে লোক নামিয়ে দিয়েছে। ব্ল্যাক হান্টারের সব ইউনিট রাস্তায়। তালহা আদিল সিআইডি আর পুলিশ নিয়ে নেমেছে। শহর কার্যত অবরুদ্ধ। আর তারা এই দিকেই আসছে”
কিছুক্ষণ নীরবতায় চেয়ে গেল চারপাশ। লোকটা চোখ বন্ধ করে কিছু একটা ভাবল। তারপর হঠাৎ তার সিগারেটে পোড়া ঠোঁটে আবারও সেই ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল,
—”জঙ্গলের দিকে চলো, হেলিকপ্টার প্রস্তুত?”
—”জি বস”
—”ইন্ডিয়া….?”
—”এভরিথিং রেডি বস, প্রাইভেট জেটও”
মুহূর্তেই লোকটার মুখ থেকে সব দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে গেল। সে আবার শিশুটার দিকে তাকাল। তার ছোট্ট মুখটা নিজের হাতের তালুতে আড়াল করে নিচু স্বরে ফিসফিস করে,
—”ফ্রম টুডে…ইউ আর মাইন, লিটল স্টাস। নো ওয়ান ক্যান টেক ইউ অ্যাওয়ে ফ্রম মি, মাই লিটল স্টার”
বিপরীতে নিষ্পাপ শিশুটি কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না। সে জানে না, তাকে ঘিরে ইতিমধ্যে একটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। একজন পিতা তার জন্য পুরো শহর জ্বালিয়ে দিতে প্রস্তুত। আর অন্য একজন মানুষ তাকে নিয়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পালিয়ে যেতে প্রস্তুত। লোকটা শিশুটির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩৮
—”ইট’স শো টাইম,
তারপর একহাতে বাচ্চাটাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে অন্য হাতল নিজেই স্টিয়ারিং ধরল শক্ত করে। পরমুহূর্তেই কালো মার্সিডিজটা অন্ধকার চিরে সামনে ছুটে গেল। আর তার পেছনে একসঙ্গে বারোটা কালো গাড়ি জঙ্গলের দিকে রাতের বুক চিরে এগিয়ে গেল, যেন মৃত্যুর এক বহর ছুটে চলেছে। আর ঠিক তাদের পেছনেই অদৃশ্য দূরত্বে, একজন পিতা এগিয়ে আসছে। নিজের হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যাকে ফিরিয়ে আনার জন্য।
