Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯
রুপান্জলি

জীবনে অর্ধেকটা সময় অপরিপক্কতা, অবহেলা কিংবা বেখেয়ালিপনায় কাটিয়ে দিলেও,, এই পর্যায়ে এসে অনেকটাই পরিপাটি হয়েছে অর্পনা। রেগুলার চুড়িদার কিংবা গাউনে নিজেকে সাজাচ্ছে,, আগ্রহ নিয়ে চুলের যত্ন করছে। না চাইতেও একজন পুরুষের সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হচ্ছে,, সে করতে না চাইলে পুরুষটা জোর করে করতে বাধ্য করছে। অর্পনা মাঝেমধ্যেই নিজেকে দেখে বড্ড অবাক হয়, আট মাস আগেও সে কতোটা অগোছালো, বোপোরোয়া ছিলো। কিন্তু এখন তার মাঝে কত্ত পরিবর্তন,, সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারেনা। আর এই সব পরিবর্তনের জন্য ক্রেডিট দেওয়ার হলে ঐ লোকটাকে দেওয়া উচিৎ ।

যে সর্বোসময় তার উপর একটার পর একটা হুকুম তামিল করে আর সেটা হাসিল করেই ক্ষান্ত হয়। এসব ভাবতে ভাবতে ড্রেসিঙের সামনে দাড়িয়ে চুল আচড়াচ্ছিলো অর্পনা,, আজ চারদিন পর বাহিরে পা রাখবে সে। অনেক কাঠ খর পোড়ানোর পর ভার্সিটি যাবার বিষয়টা নিয়ে দ্বীপকে রাজি করাতে পেরেছে অর্পনা। এমন নয় যে অধীক পতিভক্ততার কারনে অর্পনা দ্বীপের পারমিশন নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়েছিলো। মুলত,, মির্জা বাড়ির বাহিরে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে গার্ডদের উপস্থিতি নেই। অর্থ মন্ত্রীর বাড়ি বলে কথা। যিনি বাংলাদেশ অর্থনীতির ব্যাবস্থায় বহাল আছেন তাকে সরকার প্রদত্ত সিকিউরিটি দেওয়া হয়। সেই সাথে জোহান -বিহানের তামিল করা অসংখ্য গার্ড রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত বাড়ি পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে বাড়ির প্রতিটি মানুষের সেফ্টি নিশ্চিৎ করে। এই চারদিনে বহুবার বাহিরে বেরুনোর চেষ্ঠা করেছে অর্পনা কিন্তু গার্ডরা আটকে দিয়েছে,, দ্বীপের পারমিশন চেয়েছে। পারমিশন না থাকায় তাকে বাড়ি থেকে বেরুতে দেয়নি। সেজন্যই দ্বীপের পারমিশনটা খুব প্রয়োজন ছিলো নয়তো অর্পনা আপাতত দ্বীপের মর্জির ধার ধারতে নারাজ। অর্পনার ভাবনার মাঝেই আচমকা কোমরে টান পরলো আর কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজেকে দ্বীপের কোলে আবিস্কার করলো। আত্মা ছলকে উঠলো অর্পনার,, রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে দ্বীপের পরিপাটি করা শার্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললো — এই আপনি কি স্বাভাবিক মানুষের মতো নাম ধরে ডাকতে পারেন না? হুট হাট এমন টানাটানি করেন কেনো? খুবি বিরক্তকর, ট্রাস্ট মি।

,,,দ্বীপ কিছু বললো না, তার শক্ত পোক্ত একটা হাত অর্পনার পেট গলিয়ে পিঠে নিয়ে রাখলো,, অর্পনার ভিতরটা কেপে উঠলো, তবে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রান চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েটা। দ্বীপ গভীর দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকালো,, পরনে বাঙ্গি কালারের গাউন। হলুদ ফর্সা গায়ের রঙের সাথে এই রংটা একদম পারফ্যাক্ট ভাবে ম্যাচ খেয়েছে সাথে অসম্ভব সুন্দর ও লাগছে,, দ্বীপের চোখ জোড়া শীতলতায় ছেয়ে গেলো। মাশাল্লাহ!! তার বউয়ের সৌন্দর্য তাকে ঘায়েল করতে সক্ষম। এই সৌন্দর্যের মাঝে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে অর্পনার চুল। এই চুল মেঘের ঘনত্বকেও হাড় মানায়। যখনি চুলের ভাজে নজর আটকায় তখনি দ্বীপের হৃদয় থমকে যায়,, নজর স্থির হয়ে যায়, নিজেকে দূর্বল দূর্বল মনে হয়। আবারও দূর্বলতা ঝেকে ধরলো দ্বীপকে,, তার হৃদয়ে ঝড় ছুটছে,, ভিতরটা ভেঙে চুড়ে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। দ্বীপ শুকনো ঢোক গিললো,, পরপর ফোঁসফোঁস করতে থাকা অর্পনার জেদি নাকটায় ঠোঁট দাবিয়ে আলতো করে চুমু খেলো। দ্বীপের দৃষ্টি ভালো নয়,, সর্বনাশের লক্ষন। এরকম দৃষ্টি শক্ত পোক্ত অর্পনাকে গলিয়ে দিতে চাইছে। অর্পনা ঢোক গিলে নিজেকে ঠিক ঠাক করার আশায় দূরে সরতে চাইলে দ্বীপ তার বলিষ্ঠ হাত জোড়া দিয়ে ওকে নিজের সাথে আটকে রেখে মাদকিয় স্বরে বললো — ওমম!! নড়েনা, একটু দেখতে দাও।

,,, অনুভুতির জোয়ারে থমকে গেলো অর্পনা,, দুদিনের ঝড় বাদলা শেষে আজ রোদ উঠেছে,, সেই রোদের ঝলকানি জানালার কাচ বেধ করে বলিষ্ঠবান পুরুষের গলদেশে আছড়ে পরছে। ধূসর রঙা চোখের মনিতে কিছু একটার উষ্কানি বিদ্বমান যেটাতে চোখ পরতেই অর্পনার হৃদপিণ্ড অশান্ত হলো,, হৃদ গহ্বরের উত্তল আন্দোলনের শব্দ বোধয় বুক ফুড়ে বাহিরে আসার পায়তারা করছে। সেই আন্দোলন লুকাতে আবারও উঠে যাওয়ার চেষ্টা করলো অর্পনা। এবারেও ব্যার্থ হলো সে,, দ্বীপ ওর মাথাটা টেনে বুকের কাছে রেখে নরম স্বরে বললো — নাও ইউর টার্ন,, এতোক্ষণ আমি তোমার শান্ত রুপ দেখে অশান্ত হয়েছি এখন তুমি আমার হৃদযন্ত্রের অশান্ত ধুকপুকানি শুনে নিজেকে অশান্ত করো।
,,, বলতে বলতে নিজের বলিষ্ঠ হাত জোড়া অর্পনার চুলের ভাজে চালিয়ে দিলো। চুল গুলো তিন ভাগে ভাগ করে নিজের তৈরি করা সূত্র মিলিয়ে মিলিয়ে একটার সাথে একটা প্যাচ দিতে লাগলো।

বহু কষ্টে ইউটিউব দেখে দেখে সে বেনি করা শিখেছে।গতকাল সকালে যখন অর্পনা বুকের উপর আড়াম করে ঘুমাচ্ছিলো তখন মোবাইল দেখতে দেখতে ওর কটা চুল নিয়ে বার বার বেনি করার চেষ্টা করেছিলো দ্বীপ। অনেকটা সময় চেষ্টা করার পর এক পর্যায়ে সফল হয়েছিলো। এখন সেভাবেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। দ্বীপ চায়না সে ছাড়া অন্য কেউ তার বউয়ের চুলের সৌন্দর্য দেখুক। তার বউয়ের মাঝে মুগ্ধতা খুজে পাক। যেই যেই বিষয়গুলো অর্পনাকে আকর্ষনীয় করে তুলে সবটাই যত্নের সহকারে ঢেকে দিবে সে। জীবনের ২২ টা বছর অগোছালো ভাবে কাটানোর পর হুট করেই নিজেকে পরিবর্তন করতে কষ্ট হবে অর্পনার, তাই ধীরে ধীরে ওকে পাল্টাতে চায় দ্বীপ। মেয়ে মানুষের এতোটা কাঠিনত্যটা মানায়না,, হ্য!! আত্মসম্মান থাকা উচিৎ কিন্তু পাথরের মতো জীবন মেয়েদের মানায়না। মেয়েরা হবে কোমল,,জেদ করবে,, বায়না করবে,, অভিমান করবে,, মনমাফিক কিছু না হলে কান্নাকাটি করবে। আর হাসবেন্ডের দায়িত্ব হলো ধৈর্যের সাথে সেসব সহ্য করা। দ্বীপ মনে মনে একটা বিরাট সিদ্ধান্ত নিয়েছে,, সে তার বউয়ের জীবনে প্রদীপের দৈত্য হতে চায়।

রুপকথার গল্পে প্রদীপের দৈত্য যেমন তার মালিকের সব আবদার পূরন করে,, দ্বীপ ও তার বউয়ের সকল আবদার পুরন করবে। বউকে একটা নরম বেস্টনিতে আবদ্ধ করবে। এতোটা আদর, এতোটা সুখ দিবে যে, সেই সুখের তারনায় অর্পনা তার অতিতের সব কষ্ট ভুলে যাবে। নিজের তৈরি করা শক্ত খোলস বেধ করে ভিতরের বাচ্চা অর্পনাটা বেড়িয়ে আসবে। দ্বীপের গলা জড়িয়ে বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠে নিজের সকল আবদারের ঝুড়ি মেলে ধরবে। সাইকোলজি বলে,, নারী দুটো সময়ে বাচ্চা রুপ ধারন করে। একটা সে যখন বয়সের ক্ষেত্রে বাচ্চা থাকে তখন,, আরেকটা বিয়ের পর। নারী বড়ো হওয়ার পর একমাত্র তার স্বামীর কাছে আদুরে হয়ে উঠে। নারী তার স্বামীকে এতোটাই ভরসা করে যতটা সে তার বাবাকেও করেনা। কিন্তু সেই জায়গায় পৌছাতে গেলে একজন হাসবেন্ডকে খুব ধৈর্যশীল হতে হয়। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে ওয়াইফকে এটা ফিল করাতে হয় যে,, সে তার উয়াইফের জীবনে এমন একটা মাধ্যম হয়ে এসেছে,, যেই মাধ্যমে চাইলেই নিজেকে ভেঙে চুরে বিলিন করা যায়। দ্বীপ তার বউয়ের সেই নির্ভর যোগ্য মাধ্যম হতে চায়। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় কাজ শেষ করে দম নিলো দ্বীপ,, বেনিটা ঠিকঠাক করতে করতে বললো — নাউ পারফেক্ট, আর কখনো এভাবে চুল খোলা রেখে বাহিরে যাবেনা।

,,, অর্পনা কথা বাড়ালো না, জানতেও চাইলোনা বেনি করা কার থেকে শিখেছে কারন গতকাল ঘুম থেকে উঠে নিজের চুলে গুনে গুনে তেরোটা বেনি দেখে যা বুঝার তখনি বুঝে গিয়েছিলো। তাই আজ আর অবাক হয়নি,, সত্যি বলতে অর্পনা নিজেও বেনি করতে পারেনা। আগে সবসময় চুল এমনি ছেড়ে রাখতো নয়তো ঝুটি করে রাখতো। টিশার্ট -ট্রাউজারের সাথে ঐ হেয়ার স্টাইল গুলো এক্সিস্ট করতো তাই অন্য কোনোকিছু ট্রাই করার ইচ্ছা হয়নি কোনোদিন। এখন অবশ্য গার্ডার ইউজ করা হয় তবে বেনি করা হয়না। দ্বীপকে হাফ ছাড়তে দেখে অর্পনা বললো — কাজ শেষ? এবার উঠি, আমার লেইট হচ্ছে।
,,, দ্বীপ কিছু বললো না, কিছুক্ষণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অর্পনার একটা হাত টেনে মাথার উপরে রেখে নমনীয় স্বরে বললো — আমার মাথা ছুয়ে কসম করে বল, আমায় ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাবিনা!!
,,,হকচকিয়ে গেলো অর্পনা,, তারাহুরো করে হাত সরিয়ে নিয়ে বললো — পাগল আপনি? কসম কাটা শিরক। আপনি জানেন না?

দ্বীপ উত্তর করলোনা,, দু’হাতে অর্পনার গাল আকরে ধরে কপালে গাড়ো চুমু খেয়ে বললো — তুই আমার কাছে ততক্ষণ ই আদরের,, যতক্ষণ তুই আমার মাঝে আবদ্ধ থাকবি। আমি সব মেনে নিবো কিন্তু বিশ্বাস ঘাতগতা মানতে পারবোনা। তুই পালিয়ে গেলে তকে খুজে বের করা আহামরি কোনো ব্যাপার না বউ। তুই যদি মহাবিশ্বের এক প্রান্তে গিয়েও লুকিয়ে থাকিস সেখান থেকেও তকে ছিনিয়ে আনার ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু ছিনিয়ে আনার পর তর সাথে যা হবে তার জন্য আমাকে দায়ি করতে পারবিনা। আমি ভালো মানুষ নই অর্পন। এইযে তর সামনে একটা নরম সরম দ্বীপ মির্জা বসে আছে,, যাকে সর্বোক্ষন অবজ্ঞা করছিস, বেয়াদবি করছিস,, অবাধ্য হচ্ছিস কিন্তু তকে কিছুই বলছেনা,, সব কিছুতে তকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই দ্বীপ মির্জাটা ফেইক,, আমি এমন নয়,, রাজপথে খোজ নিলে তর আত্মা ছলকে উঠবে,, কলিজা থরথর করে কাপবে। আমি তকে সেই জঘন্য রুপ টা দেখাতে চাইনা। ভালো আছি ভালো থাকতে দিবি,, আমার লক্ষি বউ হয়ে থাকবি সবসময়।

,,, দ্বীপের নিরব হুমকিতে ভয় পেয়েছে অর্পনা তবে খুব একটা নয়। দ্বীপকে সে যতটা চিনেছে, এই লোক শুধু রাগ ই দেখাতে জানে। উনার দ্বারা কখনোই অর্পনা আঘাত পাবেনা,, এটুকু বিশ্বাস তার আছে। একটা নোট খাতা নিয়ে মাথার ঘোমটা ঠিকটাক করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো অর্পনা। ওর পিছু পিছু দ্বীপ ও আসছে, সে অর্পনাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে বিহানকে নিয়ে অফিসে চলে যাবে। আজ গোলসানে দুটো ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাইন্ট মিট আছে,, নয়তো অর্পনাকে ড্রপ করে দিয়ে তারপর অফিসে যেতো। শিরি বেয়ে নিচে নামতেই বিহান আর মেধাকে দেখা গেলো। মেধা টিফিন প্যাক করে বিহানকে ধরতে বলছে অথচ সে টিফিন বক্স না নিয়ে মেধাকে বিরক্ত করছে। বিহানের কান্ডে বিরক্ত হলো অর্পনা, পিন্চ করে কয়েকটা কথাও শুনালো। বিহান ও ছেরে দেওয়ার পাত্র নয়, সেও অর্পনার বিপরীতে সাত- আট টা কথা শুনিয়ে দিলো। এই পর্যায়ে এসে ওদের দুজনার কথোপকথনে ভাই বোন, ভাই বোন একটা ব্যাপার লক্ষ করা যায়। ভাই বোন যেমন একে অপরের পিছনে লেগে থাকে। এই মুহুর্তে বিহান আর অর্পনার সম্পর্কটা সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। গেইটের বাহিরে এসে অর্পনার জন্য নির্দিষ্ট করা গাড়ির ডোর খুলে দিয়ে অর্পনাকে কোমলভাবে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপ। চুলের ভাজে চুমু খেয়ে বললো– টেক কেয়ার বেবি। ভার্সিটি শেষে পছন্দসই ফোন কিনে নিবে,, আমি বিল প্যে করে দিয়েছি।রেস্টুরেন্ট বুক করা আছে ফ্রেন্ডদের নিয়ে যত খুশি ইনজয় করবে। আজকে আমার ফিরতে রাত হবে,, জানি টেনশন করবেনা তবে তোমার জন্য আমার টেনসন হবে। ফোন কিনার সাথে সাথে আমাকে টেক্সট পাঠাবে, কেমন?
,,,, অর্পনা কিছু বললো না, শায় ও জানালো না আবার মানাও করলো না। এই মুহুর্তে দ্বীপের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে নিজেকে আবারও মির্জাদের চার দেয়ালে বন্দি করা। এমনিতে মুখে যতই ফটর ফটর করুক না কেনো, সত্যি অর্থে মির্জাদের কাছে অর্পনা কিছুই না। দ্বীপ মির্জা চাইলেই তার জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে দিতে পারে। সেই এভিলিটি তার আছে,, যেটা আপাতত দ্বীপ করছেনা,, হয়তো বউ বলেই করছেনা।

,,, এভার কেয়ার হসপিটালের চতুর্থ তলার ৪০৮ নম্বর ক্যাবিনটা মৃধু অন্ধকারে আচ্ছাদিত৷ আদ্রিয়ান নিভু নিভু দৃষ্টিতে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছে। তখনি কাচের দরজা বেধ করে ক্যাবিনের ভিতরে ডুকলো এক রমনি। পরনে তার এক্সেল সাইজ টিশার্ট আর ট্রাউজার,, চুলগুলো অবাধেই ছড়িয়ে আছে পিঠ জুরে। আদ্রিয়ান ধ্যান মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে সেই রমনির পানে। রমনিটি ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের কাছে এগিয়ে এলো,, বেডের পাশে রাখা রেস্ট চেয়ারটায় জায়গা নিয়ে বসলো। হাত বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের চুলের ভাজে আঙুল চালাতেই আবেশে চোখ বুঝে নিলো আদ্রিয়ান। ঠোঁট নাড়িয়ে কাতর স্বরে উচ্চারণ করলো — জানেম!! এসেছো তুমি? আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো জানো? বুকে খুব ব্যাথা হচ্ছিলো,, মরে যাচ্ছিলাম আমি।

,,, অর্পনা সন্তর্পনে আদ্রিয়ানের ঠোঁটের ভাজে হাত রাখলো, কিছুটা শাসানো স্বরে বললো — এসব কথা আর কখনো বলবেন না আদি, আমার কষ্ট হয়। নিজের কি হাল করেছেন? দেখুন তো, , বিষয়টা আমার একটু ও পছন্দ হচ্ছেনা।
,,,আদ্রিয়ান হাসলো, অর্পনার হাতটা হাতের মুঠোয় নিয়ে চুমু খেলো। সাথে সাথে চোখ বেয়ে দুফোটা গরম জল গড়ালো। অর্পনা অন্য হাতে মুছে দিলো সেই চোখের পানি, আদ্রিয়ান চোখ মেলে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো — আমায় ছেড়ে যেওনাগো জানেম,, তোমায় ছাড়া মরে যাবো আমি।
,,, অর্পনা চেয়ে রইলো,,আদ্রিয়ান জলজল চোখে দেখছে তার জানেমকে। কতোগুলো দিন পর তার জানেম তার কাছে এলো,, আদ্রিয়ানের ইচ্ছা করছে জানেমকে বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখতে যেনো দ্বীপ মির্জা চাইলেও তার জানেমকে কেড়ে নিতে না পারে। আদ্রিয়ান ঢোক গিয়ে কিছুটা চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলো — জানেম!! তুমি যে এখানে এসেছো সেটা দ্বীপ মির্জা জানে? তুমি কি পালিয়ে এসেছো নাকি সে আসতে দিয়েছে? তুমি কি আবার ফিরে যাবে? থাকবেনা আমার পাশে? ভালোবাসবেনা আমায়?

,,,অর্পনা চেয়েই রইলো, কিছু বলেনা মেয়েটা। কিছু সময় পর ধীরে ধীরে আদ্রিয়ানের হাত থেকে হাত সরিয়ে নিলো। আদ্রিয়ানের ইচ্ছা করলো অর্পনার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে কিন্তু পারলোনা। শক্ত করে ধরলে যদি তার জানেম হাতে ব্যাথা পায়? সেদিন চোখের সামনে বার বার আঘাত পেতে দেখার পরেও ফিরে তাকায়নি সে,, এতোটাই জঘন্য ছিলো তার মনমানসিকতা। আর আজ জানেমের একটু ব্যাথা লাগবে বলে শক্ত করে হাত ধারার মতো সাহসটা পাচ্ছেনা। অর্পনা বসা থেকে উঠে দাড়ালো,, ওকে উঠতে দেখে আদ্রিয়ান ও উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু শক্তি পাচ্ছেনা। উঠতে গেলেই ঘাড়ের রগে টান লাগছে। অর্পনা ধীরে ধীরে পিছাতে লাগলো, ওকে পিছাতে দেখে আদ্রিয়ানের কপালে ভাজ পরলো। সে ঘাড়ের ব্যাথা ভুলে উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বললো — জানেম!! ও জানেম!! ওদিকে কোথায় যাচ্ছো? তুমি কি আমায় ছেড়ে চলে যাচ্ছো? জান!! ও জান!! জানরে,, যাসনা। মরে যাবোরে, আল্লাহ!! ওকে যেতে মানা করো কেউ,, জান!! অর্পনা!! জানেম!!

,,, অর্পনা শুনেনা, সে তার মতো করে পিছাতে লাগলো। আদ্রিয়ানের শ্বাসের গতি বাড়লো, মাথার পিছনে খুব ব্যাথা করছে,, গলার কয়েকটা রগ ছিড়ে যাবার মতো অনুভুত হচ্ছে। আদ্রিয়ান বিছানা হাতরাতে হাতরাতে কাপা কাপা শরীরে অর্পনার দিকে এগুনোর চেষ্ঠা চালাচ্ছে। অর্পনা পিছাতে পিছাতে ধীরে ধীরে বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেলো। আদ্রিয়ানের বুকটা ধ্বক করে উঠলো,, সে শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে বেড থেকে নামতে গিয়ে ধপ করে মেঝেতে পরে গেলো। শরীরের তীব্র ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো আদ্রিয়ান তবে সেসবো পাত্তা দিলোনা,, অর্পনার যাওয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে মাঝেতে চাপর মারতে মারতে হাওমাও করে কেদে উঠলো। কিছু পরার শব্দ হতেই দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো ইরা। আদ্রিয়ানকে এভাবে মেঝেতে পরে কাতরাতে দেখে দ্রুততার সাথে এগিয়ে এসে ঝাপ্টে ধরলো,, ইরাকে দেখে আদ্রিয়ান কাচের জানালার দিকে ইশারা করে বললো — ইরাদ!! আমার জানেম, আমার জানেম এসেছিলো। আবার চলে গেলো,, ওকে যেতে মানা করো, একবার ফিরতে বলো। আমি ওকে ছাড়া কিভাবে বাচবো সেটা বলে যেতে বলো। আমার জানেম, আমার অর্পনা,, আমার ভালোবাসা। ভালোবাসারে,, তুই ফিরে আয়,,

,,, ইরা ফুপিয়ে উঠলো,, একজন মানুষ কি করে একজনকে এতোটা ভালোবাসতে পারে? জানা নেই তার। আদ্রিয়ান চরিত্রটাকে সে অভিযোগ করতে চেয়েও করতে পারেনা। অতিতে সে যতটা অহংকারি ছিলো বর্তমানে সে তার চেয়েও শত গুন অসহায়। ইরার খুব ইচ্ছা করছে অর্পনার পায়ে ধরে বলতে যেনো আদির জীবনে ফিরে আসে। একটাবার ভালোবেসে সুযোগ দেয়। কিন্তু তাতো সম্ভব নয়, অর্পনা ভালো আছে,, সুখে আছে। জীবনে ২২ টা বছর পেরোনোর পর একটু সুখের মুখ দেখেছে মেয়েটা,, সে কোনোমতেই সেই সুখ নষ্ট করতে পারবেনা।ইরা শরীরের সর্বো শক্তি দিয়ে আদিকে উঠানোর ট্রাই করলো তবে ব্যার্থ হলো। এমন একজন বলিষ্ঠবান পুরুষকে তোলা তার একার পক্ষে সম্ভব না। ওর চেষ্ঠার মাঝেই আরেকটা হাত এসে আদ্রিয়ানকে ঝাপটে ধরলো। সিদ্ধার্থকে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো ইরা, দুজন মিলে টেনে উপরে তুলে দিলো। আদ্রিয়ান উন্মাদের মতে আচরণ করছে,, বার বার কাচের জানালার দিকে হাত বাড়িয়ে জানেম জানেম করে যাচ্ছে। নার্স দ্রুত ইনজেকশন রেডি করে আদ্রিয়ানের হাতে থাকা ক্যানেলুতে পুস করে দিলো। সময় পেরুলো কিছুটা, তরপাতে তরপাতে একটা সময় আদ্রিয়ান নিস্তেজ হয়ে পরলো। আদ্রিয়ান চোখ বুঝে নিতেই সিদ্ধার্থ ইরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো — আপনি কি শুধুই ভাইয়ার স্টুডেন্ট?

,,, সিদ্ধার্থের কথায় কান্না থেমে গেলো ইরার, সে চোখ মুছে মলিন স্বরে বললো — আপাততঃ!!
,,, সিদ্ধার্থ ঠোঁট বাকিয়ে ক্ষিন হাসলো, বললো — ভাইয়াকে ভালোবাসেন?
,,, ইরা কিছু বললো না,, সিদ্ধার্থ আবার বললো — ভাবছি ভাইয়া কিছুটা সুস্থ হলে ভাইয়াকে নিয়ে আমেরিকায় বেক করবো। মম ডেডের ও তাই ইচ্ছা। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ,, আমি বিডিতে এসেছি ই ভাইয়াকে ফিরিয়ে নিতে।
,,, বিনিময়ে ইরাও ক্ষিন হাসলো, উড়না দিয়ে ভালো মতো চোখ মুছে বললো — ভালোই হবে,, দূরে গেলে অর্পনাকে ভুলতে সহজ হবে।
,,, তাহলে আপনার ভালোবাসার কি হবে?
,,, আমি খ্রিস্টান!!
,,, কথাটা শুনে ভ্রু কুচকালো সিদ্ধার্থ, অবাক কন্ঠে সুধালো — বিষয়টা কি ভুলবসত হয়েছে নাকি ইচ্ছাকৃত? আগে থেকে ধর্মের বিষয়টায় ধারনা ছিলোনা?
,,, আদ্রিয়ানের দিকে একবার তাকালো ইরা, কিছুটা উদাস কন্ঠে সুধালো — কোনোটাই নয়,, সবটাই মায়া। মায়া থেকেই এতোটা পথ অতিক্রম করা।
,,, কতোটা ভালোবাসেন ভাইয়াকে?
,,,যতটা বাসলে নিজেকে বলি দেওয়া যায়।
,,, আর ধর্মকে?
,,, সেটাও!!
,,, ইরার উত্তর গুলো পছন্দ হলোনা সিদ্ধার্থের। সে বিরক্তিতে “চ” সূচক শব্দ করে বললো– এতোটাও বাসা উচিৎ নয়,, দাম পাবেন না। আমরা কাইসার রা কাউকে ভালোবাসিনা। বাসতে গেলেও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়,, যেমনটা অতিতে ফুপি আর বর্তমানে ভাইয়া হয়েছিলো। সেদিক থেকে ভাইয়া দ্বিতীয় বার একই ভুল করবেনা,, সুধরে যান।

,,,কথাটা বলে বাহিরে চলে গেলো সিদ্ধার্থ। ইরা ব্যাথিত মন নিয়ে রেস্ট চেয়ারের উপর বসে পরলো। আদ্রিয়ানের একটা হাত দুহাতের ভাজে নিয়ে তাতে কপাল ঠেকিয়ে প্রশ্ন করলো — আপনার আর আমার পথ এতো দূর্গম কেনো আদি? ভুলটা কোথায় ছিলো? আপনার প্রতি মায়া হওয়া? নাকি মায়া তৈরি হতে বাধ্য করা? আমিতো মায়ায় পরতো চাইনি,, আপনি বার বার আমার সামনে এসে মায়ায় পরতে বাধ্য করেছেন। এবার আমি আপনাকে ভালোবাসি,, মুল্য দিন। জীবনে একই ভুল বার বার করা ঠিক নয়,, আমার মতো করে আপনাকে কেউ ভালোবাসবেনা। আমি আপনার জন্য ধর্ম, পরিবার, এমনকি এই পৃথিবী, সবটা ছাড়তে রাজি। ফিরিয়ে দিবেন না।

,,, ভার্সিটির গেইট পেরিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে নজর ভুলিয়েও বন্ধুদের দেখা পেলোনা। সেই চিরোচারিত আড্ডা দেওয়া যায়গাটা শুন্য পরে আছে, কপালে ভাজ পরলো অর্পনার। কেউ কি আজ আসেনি? পরোক্ষনেই ক্যান্টিনের কথা মাথায় এলো। সবাই নিশ্চয়ই সেখানে আছে? ভেবেই পা বাড়ালো সেদিকে। ক্যান্টিনে যেতেই তিনজনার দেখা পেলো, পল্লব ফোন স্ক্রল করতে করতে চা খাচ্ছে,, অরুন চা হাতে বই পড়ছে, সে পড়ছে কম আড় চোখে রাত্রিকে দেখছে বেশি। খুব একটা মনোযোগ না দিলে অরুনের চাহনি ধরা সম্ভব না। রাত্রি চা হাতে উদাস ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে পুরো ক্যান্টিন খুজেও ইরাকে দেখতে পেলোনা। পল্লব ফোন স্ক্রল করতে করতে সামনের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই অর্পনাকে দেখতে পেলো। চোখ পরতেই থমকে গেলো পল্লব,, তার চোখের পলক পরছেনা,, এতোটাই বেখেয়ালি হয়েছে যে হাত ফসকে ফোনটা ঠাস করে টেবিলের উপর পরে গেলো। হাতে থাকা চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে বুকের বাম পাশে হাত রাখলো পল্লব,, হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি স্বাভাবিক দেখে বিরক্ত হলো । বুকে দু তিনটে চাপর মেরে বললো — শালার হৃদপিণ্ড, এতো সুন্দর রমনী দেখেও ধুকপুক করলিনা? তর দ্বারা প্রেম হলেও ভালোবাসা সম্ভব না। ছাগল!!

,,, ফোন পরার শব্দ হওয়ায় অরুন আর রাত্রি দুজনেই পল্লবের দিকে তাকিয়েছিলো। পল্লবের করা নাটক আর কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো রাত্রি। অরুন সরাসরি তাকালো রাত্রির দিকে,, বিষয়টা বুঝতে পেরে রাত্রির মুখটা মলিন করে অন্যদিকে মুখ ফিরালো। তাচ্ছিল্য হাসলো অরুন,,সে তাকিয়েছে বলে মুখ থেকে হাসি ফুরিয়েছে অথচ পল্লবের সাথে ঠিকি হাসছিলো। সব অন্যায় শুধু তার সাথেই ফরজ,, কালো তো, কালোদের সাথে হাসা যায়না,, কালোদের ভালোবাসা যায়না। অরুন নিজেও চোখ ফিরিয়ে নিয়ে অর্পনার দিকে তাকিয়ে এদিকে আসার জন্য ইশারা করলো,, ইশারা পেতেই অর্পনা দ্রততার সাথে এগিয়ে এলো। অর্পনাকে আসতে দেখে পল্লব টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিলো, নাটক করতে গিয়ে প্রানের চেয়েও প্রিয় ফোনটা ফেলে দিয়েছে। অর্পনা এগিয়ে এসে খালি চেয়ারটা টেনে বসে পরলো,, ওর পাশাপাশি অরুন বসেছে। অরুনের চোখ দুটো কেমন ফোলা ফোলা লাগছে,, কেদেছে নাকি ছেলেটা? রাত্রির ও একই অবস্থা। তার অনুপস্থিতিতে কি এমন হয়েছে যে দুজনার এই হাল হলো? অরুন অর্পনার দিকে একবার তাকিয়ে ক্যান্টিনে খাবার সার্ভ করা ছেলে মানে সজলকে ইশারায় আরও দুই কাপ চা দিতে বললো। পরপর চায়ের কাপে চুমুক বসিয়ে প্রশ্ন করলো — ঠিক আছিস? দ্বীপ মির্জা কিছু করেছে? খারাপ ব্যাবহার কিংবা মারধর?

,,, অর্পনা নাকোচ করে বললো — না!! উনি কাপুরুষ নন তবে উনার কর্মকান্ড আমার পছন্দ হচ্ছেনা। খুব ডিস্টার্ব ফিল করছি।
,,, অর্পনার কথাটা বোধঘম্য হলোনা কারোর,, পল্লব ভ্রু কুচকে বললো — যেমন?
,,, খুব এফোর্ট দিচ্ছে, আনলিমিটেড কেয়ার করছে। আই টুটাল্লি ডিস্টার্ব।
,,, রাত্রি বোধয় কথাটা শুনে খুশি হয়েছে, সে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললো– এটা তো খুব ভালো কথা,, তুই বিরক্ত হচ্ছিস কেনো? ভাইয়া বোধয় তকে একটু একটু করে ভালোবাসতে শিখছে। একদিন দেখবি, ভালোবেসে একদম বুকের ভিতর লুকিয়ে রাখবে তকে।
,,,অর্পনার কিছুটা অস্বস্তি হলো, বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে ভালো লাগছেনা। বন্ধুদের কাছে এসেছে মন ভালো করতে তাই মন খারাপ করা বিষয়গুলো এভোয়োট করতে বললো– ঐ আরকি!! বাদ দে ওসব, ইরা কোথায়? আসেনি?
,,, পল্লব বললো– কল দিয়েছিলাম, ও নাকি কোন পার্সোনাল কাজে বিজি আছে। আমাদের বন্ধুতে কত দূরত্ব বল, কেউ কারোর পারশোনাল ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করতে পারিনা। অথচ আমাদের উচিৎ ছিলো একে অপরকে খোলা বইয়ের মতো করে পড়তে পারা।

,,,পল্লব কথাটা রাত্রির দিকে তাকিয়েই বলেছে,, পল্লব জানে রাত্রি অরুনকে ভালোবাসে কিন্তু কোনো একটা কারনে ওকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। রাত্রির কথায় যতটা বুঝেছে , সে অনুযায়ী রাত্রির পারশোনাল কোনো ইস্যু আছে, যা ওদের দুজনার মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করছে। সেই কারন খুজে বের করতে হবে, তারপর দুজনার মাঝে সবটা মিটমাট করে দিতে হবে। বন্ধু হিসেবে দুজন বন্ধুকে মিলিয়ে দেওয়া পল্লবের দায়িত্ব,, যতোই পিছনে লাগুকনা কেনো,, সে সর্বদাই চায় অরুন আর রাত্রি সুখে থাকুক। একলিস্ট তাদের ভালোবাসাটা পূর্নতা পাক। পল্লবকে এভাবে রাত্রির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুচকালো অর্পনা। পল্লবের সামনে চুটকি ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো — ওদের মাঝে কি হয়েছেরে? দুজনের চোখ মুখ ফোলা। দুজনের চোখ দেখে মনে হচ্ছে সারা রাত কেদেছে। কি ব্যাপার? আমি যাবার পর দুজন মিলে কি ইতিহাস রচনা করেছে?

,,, অর্পনার সোজা সাপ্টা কথায় ভরকে গেলো রাত্রি ,, সে যে রাতে কেদেছে সেটা সবার সামনে এভাবে উন্মুক্ত হয়ে যাবে ভাবতো পারেনি। রাত্রি এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজেকে ঠিক করতে চাইলো। অরুন তখনো বাকা চোখে রাত্রিকেই দেখছে। অর্পনার প্রশ্নের বিপরীতে পল্লব বললো — রাত্রি কোনো একটা কারন নিয়ে অরুনকে ইগনর করছে । এটা নিয়ে ওদের মাঝে টুকটাক ঝামেলা হয়েছে,, এই আরকি। আমি বুঝিনা ভাই,, একজনের প্রতি আরেকজনের কম্পলিকেজশন্স থাকলে আলোচনা করে মিটমাট করে নে। এখানে ইগনর, কান্নাকাটি এসব আসছে কত থেকে?
,,, অরুন হাতের চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললো — আলোচনা করে তো আর গায়ের কুৎসিত রং পরিবর্তন করা যায়না পল্লব। আমি তো কুৎসিত, আমার ভিতর বাহির সব নোংরা। ওর মতো সুন্দরীরা আমার মতো ছেলেদের গ্রহণ করবেনা, এটাই স্বাভাবিক।

,,, অরুনের বলা প্রতিটি কথা রাত্রির বুকে এসে লেগেছে। ভিতর থেকে কান্নারাবদলা পাকিয়ে আসছে,, নিজেকে সামলাতে না পেরে উঠে দাড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো — আমি ক্লাসে যাচ্ছি,, তরা সময় মতো চলে আসিস।
,,, রাত্রি চেয়ার ঠেলে বেরুতে যাবে তখনি সেখানে সজল দুকাপ চা নিয়ে হাজির হলো। অরুণের কি হলো কে জানে? সে রাত্রির দিকে তাকিয়ে ৎেকেই সেখান থেকে এক কাপ গরম চা নিয়ে হাতের উপর ঢেলে দিলো। অরুনের কান্ডে হকচকিয়ে গেলো সবাই,, অর্পনা কিছুটা আতঙ্কিত স্বরে বললো– অরুন!” এটা কেমন পাগলামি? দেখি, হাত এদিকে দে। সজল!! সজল!! এক লিটারের একটা পানির বোতল নিয়ে আসো,, কুই,,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৮

,,, অর্পনা কথা শেষ করতে পারেনি তার আগে রাত্রিও একই কাজ করলো। অরুনের দিকে তাকিয়ে অবশিষ্ট গরম চা নিজের হাতে ঢেলে দিতে নিতেই পল্লবের চোখে বিষয়টা ধরা পরলো, সাথে সাথে চায়ের কাপ ঝাড়া মেরে ফেলে দেওয়ার পরেও শেষ রক্ষা হলোনা। পল্লবের হাতে বেশিভাগ চা পরলেও কিছুটা চা ছিটকে রাত্রি হাতেও পরেছে। বিষয়টা এতো তারাতারি হয়েছে যে অর্পনা বাকরুদ্ধ হয়ে পরেছে। পল্লব তাড়াহুড়ো করে রাত্রির হাত আকরে ধরলো,, সজল এক লিটার পানি নিয়ে দৌড়ে এসেছে। এটা যে ক্যান্টিন সেটা মাথায় রাখলোনা কেউ,, পল্লব অরুন আর রাত্রির হাত একসাথে নিয়ে পানি ঢালতে লাগলো। পানি ঢালার সময় অরুন আর রাত্রির হাত একসাথে থাকায় দুজনেই দুজনের দিকে তাকালো। অরুনের চোখে প্রকাশিত অভিমান,, এই চোখে তাকাতে পারেনা রাত্রি,, খুব অপরাধ বোধ কাজ করে। কিন্তু কিছুই করার নেই, সব সমস্যার সমাধান হয়না,, থাকতে নেই৷

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৯ (২)