Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪০

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪০
ইসরাত জাহান দ্যুতি

দু’কাপ চা নিয়ে এসে রবিন টেবিলটার ওপর রাখতে রাখতে ইয়াসিফের মুখোমুখি বসা বিদেশিনীকে আড়চোখে দেখে নিলো ক’বার। ট্রে থেকে সল্টেড বিস্কিটের পিরিচটা রাখার সময় ইয়াসিফ হঠাৎ তার চোখের চাউনি লক্ষ করে শক্ত গলায় তখন আদেশ করল, ‘ওটা তাড়াতাড়ি রাখ আর ঘরে গিয়ে মেয়েটাকে পাহাড়া দে।’
শোনা মাত্রই তড়িঘড়ি করে খালি ট্রে নিয়ে একরকম দৌঁড় দিলো রবিন ঘরের পানে। চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিয়ে ইয়াসিফ অজ্ঞাত মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলেই সে চোখে অসহায়তা প্রকাশ করে বলল, ‘থ্যাঙ্ক য়্যু ভেরি মাচ ফর য়্যোর হসপিটালিটি। বাট আ’ম নট আর ইউজড টু ড্রিঙ্ক টি। তাছাড়া আমি এই মুহূর্তে কিছু মুখে দেওয়ারও অবস্থাতে নেই।’
ব্রিটিশ উচ্চারণভঙ্গিতে কথা শুনে প্রথমে ইয়াসিফ একটু ভাবনাগ্রস্ত হয়ে অনুমান করল মেয়েটি ব্রিটিশ অধিবাসী হবে হয়ত। কিন্তু শেষ কথায় তাকে অপরিপক্ক বাংলা বলতে দেখে বিস্ময়টুকু গিলে নিতে পারল না আর, ‘আপনি বাংলা বলতে জানেন! এটা ধারণা করিনি।’

-‘হ্যাঁ, আমি বাংলা বলতেও জানি আর বুঝতেও পারি। শুধু পড়তে পারি না। আর আমার বাংলা বলা খুব একটা সুন্দর হয় না।’
মেয়েটার বাধোবাধো বাংলা কথার ‘র’ এর উচ্চারণগুলোও ‘ড়’ এর মতো। তাতেই বোঝা গেল সে আসলেই পরিচ্ছন্ন বাংলা বলতে জানে না।
-‘আপনার নাম?’
-‘ফ্লোরেন্স মেহমুদ।’
-‘মাহমুদ? আপনার বাবা বাঙালি?’
-‘হ্যাঁ, আমার মমও জন্মসূত্রে বাঙালি।’
-‘আচ্ছা, আমার কাছে আপনার কী প্রয়োজন এবার বলুন তো।’

ফ্লোরেন্স নির্নিমেষ চোখে ইয়াসিফের ট্রিম করা দাড়ি ভর্তি শুভ্র, সুন্দর মুখটা দেখতে দেখতে ভারাক্রান্ত গলায় বলতে থাকল, ‘গত ছ’মাসে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে আপন দু’জন মানুষকে হারিয়েছি এ দেশে। একজন আমার মম, আরেকজন আমার লিটল সিস্টার। আমার মম আর ড্যাড বহু বছর ধরে সেপারেটেড। আমার সিস্টার ফ্লোরাকে নিয়ে ড্যাড আঠারো বছর যাবৎ দেশে থাকেন সিলেট জেলায়। আর আমি থাকি মমের সঙ্গে লন্ডন ক্যামডেন টাউনে। ফ্লোরা বছরের তিনটি মাস আমাদের সঙ্গে এসে থাকত। কিন্তু এবার ও ভিষণ বায়না ধরে মমকে আর আমাকে দেশে এসে ভ্যাকেশন কাটানোর জন্য। আমি একজন আর্কিটেক্ট। খুব বেশি লম্বা সময় ছুটি কাটানোর সুযোগ নেই আমার। তাই মম ছ’মাস আগে আমাকে রেখে চলে আসেন এখানে। আর আমার আসার কথা ছিল মাসখানিক আগে। হঠাৎ করে গত দু’মাস আগে মম নাকি নিখোঁজ হয়ে যান। আমাকে ড্যাড জানাননি তখন টেনশন দিতে চাননি বলে। নিজের মতো করে তিনি সাধ্যমতো খোঁজ নিতে থাকেন এই দুই মাস ধরে৷ দেশের বাইরে কোথাও যাননি মম। তার ফোনের লাস্ট লোকেশন দেখায় গাজীপুরের একটি জায়গায়। এরপর আর কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি।

এরপর ড্যাড বাধ্য হয়ে গত পনেরোদিন আগে আমাকে সবটা জানান। আমি তখন অফিস থেকে এত বেশি কাজের প্রেশারে ছিলাম, কাজ শেষ না করা অবধি তারা আমাকে ছুটিও দিতে নারাজ ছিল। যার জন্য আসতে আসতে বড্ড দেরি হয়ে গেল। আর এরই মাঝে আমার ছোট্ট বোনটাও ক’জন বন্ধুকে নিয়ে যতগুলো পর্যটন স্থান আছে সব জায়গায় মমকে খুঁজতে বের হয়। মমের বেশি পছন্দের স্থান ছিল এই রাঙামাটি। কিন্তু এখানে আসার পর হঠাৎ ফ্লোরার সঙ্গে কিছুদিন যোগাযোগ করতে পারছিলাম না কেউ-ই। তারপর গত পরশুদিন ওর এক বন্ধুর ভাইয়ের থেকে জানতে পারলাম অবৈধ অস্ত্র আর মাদকদ্রব্যের চোরাচালানের সঙ্গে ও আর ওর বন্ধুরা জড়িত, এ সন্দেহে ওদেরকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে এখান থেকে। পুলিশ ফ্লোরাকে সন্ত্রাসীও ভেবে নিয়েছে। ওর কাছে নাকি কীসব অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া গেছে। কিন্তু আমার বোন এমন নয়। ও খুব চঞ্চল হলেও প্রচণ্ড ইনোসেন্ট একটা মেয়ে। ওর বন্ধুরাও খারাপ নয়। সবাই খুব ভালো পরিবারের সন্তান। কিন্তু ওদেরকে পুলিশ কীভাবে সন্দেহ করে অ্যারেস্ট করল সেটাই বুঝতে পারছি না।’

মনে পড়ল ইয়াসিফের সেই প্রথম অপারেশনটার কথা। ওই অপারেশনে যে ক’জন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের কাছেই অনেকরকম অস্ত্র ছিল। তাদের মধ্যে তিনজন মেয়ে আর দুজন ছেলে ছিল নেশারত অবস্থায়। বাকিরা পুলিশদের সঙ্গে গোলাগুলি করতে নামলেও ওই পাঁচজন অস্ত্র আর ইয়াবাগুলো নিয়ে ঢুলতে ঢুলতেই পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল।
ওই ছেলে-মেয়েগুলোর কথা ভাবতে ভাবতেই ইয়াসিফ হঠাৎ অন্য কিছু একটা ভেবে অকস্মাৎ গম্ভীর, কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল ফ্লোরেন্সকে, ‘কিন্তু আমার কাছে কেন এসেছেন? আমি আপনাকে কীভাবে হেল্প করতে পারি আপনার মম আর সিস্টারকে খুঁজে পেতে?’
-‘আমি এখানের থানার এসপির কাছে গিয়েছিলাম দেখা করতে। কিন্তু তিনি থানাতে ছিলেন না। কোনোভাবেই তার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। তখন ওখানের সার্জন আমাকে আপনার অ্যাড্রেস দিলো আর বলল, আপনার সঙ্গে দেখা করে আপনাকেই সবটা বলতে।’
ইয়াসিফ শানিত চোখে ফ্লোরেন্সের দিকে চেয়ে কথাগুলো শুনল, তারপর বলল, ‘আপনার বোন আর তার বন্ধুদের ফটো থাকলে দেখান তো।’
ফ্লোরেন্স যেন এই কথাটিরই অপেক্ষাতে ছিল। সে চকিতেই ফোনটা থেকে ওদের দু’টো গ্রুপ ফটো বের করে দেখাতে থাকল ইয়াসিফকে।

বিশাল বড়ো অ্যাপার্টমেন্টটাই যেন দু’টি চড়ুই পাখির কিচির-মিচির সংসার চলে। কখনও মাছ বাজারে, কাচা সবজির বাজারে না যাওয়া নাওফিল সংসারের একমাত্র কর্তা হিসেবে সাপ্তাহিক বাজারটা করতে যায় নিজেই। ছোটো মাছ, বড়ো মাছ, সবরকম মাছ এনে যখন একত্রে দীধিতির হাতে ধরিয়ে দিয়ে একের পর এক খাবারের পদ বলতে থাকে দুপুরের জন্য, তখন দীধিতিও ত্যক্তবিরক্ত কর্ত্রীর মতো চেঁচামেচি শুরু করে বেহিসাবি স্বামীর ওপর। দুজন মানুষের জন্য রোজ দুপুরে সর্বোচ্চ তিন থেকে চার পদের ভাজি তরকারিই যথেষ্ট। সেখানে নাওফিলের চাহিদা থাকে তার চেয়েও দ্বিগুণ। এরপর একগাদা মাছ একা কেটে-কুটে রাখাটাও খুব পীড়াদায়ক দীধিতির জন্য। সেটা নাওফিল কি বুঝতে পারে না? এ নিয়েও কর্তার ওপর চোটপাট চলে কর্ত্রীর। তবে কর্তা পুরুষ কিন্তু মোটেও কর্ত্রীর মুখে মুখে তর্কে যায় না। নিরীহ মুখটি করে রান্নাঘরে মাছ কুটতে থাকা বউটির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখভঙ্গিতে থাকে অপরাধবোধ। যেন এমন ভুল দ্বিতীয়বার আর করবে না সে। কিন্তু পরবর্তী শুক্রবারেই ওই নিরীহ পুরুষ আবারও এক ব্যাগ ভর্তি মাছ নিয়ে হাজির হয়। আর আহ্লাদিত গলায় বলে দীধিতিকে, ‘এমন সাগরের তাজা মাছ আর নদীর মিঠা পানির মাছ সব সময়ই পাওয়া যায় না গো, বিদেশিনি বধূ।’ এসব কথায় কি আর চিঁড়ে ভেজে? দীধিতি চোটপাট করতে করতেই বাজারের ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে চলে যায় তখন।

এসবের মাঝে আরও একটি নিত্য গল্প যোগ হয়েছে ওদের চড়ুই সংসারে। শেখ পরিবারের একমাত্র নাতবউ এখন দীধিতিই। ওই পরিবার থেকে তাকে এখন অবধি গ্রহণ করে না নিলেও তার যে অনেক কর্তব্য রয়েছে তা সে ইয়াসিফের সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই সে কর্তব্য পালনের যথাযথ চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত৷ জাকির শেখকে পাঁচদিন পূর্বেই কল করেছিল সে। তিনি রিসিভ করলে দীধিতি নিজের পরিচয় দেওয়ার পর কোনো কথায় বলেননি। তবুও জড়তা ভেঙে সাহস নিয়ে দীধিতি তাকে বলেছিল নিজের ছেলের বাড়িতে এসে থাকতে। জবাবে হ্যাঁ বা না কিছুই বলেননি তিনি। বিনাবাক্যে কলটা কেটে দেন। কষ্ট পেলেও দীধিতি থেমে থাকেনি৷ মাহতাব শেখ আর তার স্ত্রী জান্নাতির সঙ্গেও কথা বলতে চেষ্টা করেছে সে প্রতিদিন। ব্যস্ত মানুষ মাহতাব শেখ ক’বার সময় নিয়ে নাতবউয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বললেও জান্নাতি বেগম ফোনের ওপাশ থেকেই যেন দীধিতিকে চুলির মুঠি ধরে চপেটাঘাত করেছেন— তার নাতিকে নিয়ে আলাদা সংসার পাতবার দোষে। অমন উগ্র আচরণের শিকার এর আগে দীধিতি কখনই হয়নি। নাওফিলের আড়ালে সেদিন কান্নাকাটি করেছিল সে খুব৷ নাওফিলকে বলতেও পারেনি দাদীশাশুড়ির অমন কঠিন রূপের কথা। তবে ওই পরিবারের একজন মানুষের কোমল আচরণ পেয়েছে দীধিতি৷ খুশি, যিনি নাওফিলের বড়োচাচি হলেও নাওফিলের থেকে আম্মু সম্বোধনটাই সব সময় প্রত্যাশা করেন। নিঃসন্তান ওই ব্যক্তিটি নাওফিলকে বুকের সমস্ত স্নেহ মমতার উজাড় করে দিতে চান। কিন্তু নাওফিল তা গ্রহণ করতে যে কখনই আগ্রহী হয়নি৷ সেই মানুষটির সঙ্গে দীধিতির রোজ এ-বেলা আর ও-বেলা কথা হয়। তার থেকেই জানতে পেরেছে সে, নাওফিলের পছন্দ আর অপছন্দের খাবার সম্পর্কে। বউ আর শাশুড়ির সম্পর্কটা তাদের খু্বই মিষ্টি।

আজকে দুপুর থেকে বিশ্রামহীন দীধিতি রান্নাঘরে একের পর একে রান্নার আয়োজন করে চলেছে৷ গতকাল তাওসিফ রাতেরবেলা হুট করেই চলে এসেছে এখানে৷ আজ সকালে আবার কিরণও এসেছে হঠাৎ করেই। উপরন্তু রাতের বেলা নৈশভোজের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে তুষাদের আর তামান্নাদের। সৌরভও আসবে আজ প্রথম এখানে। ইয়াসিফেরও আসার কথা৷ তবে সে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। সকলের জন্য রান্নার আয়োজন তো আর একটুখানি নয়৷ ভাগ্যিস ঐশী প্রতিবেশী ছিল! তাই তো দুজন মিলে রান্নাবান্নাটা করে নিতে পারছে এক সঙ্গে।
সায়াহ্নের পূর্ব মুহূর্ত এখন। তাওসিফ আসরের ওয়াক্তে নাওফিলের সঙ্গে বাসার বাইরে গেছে। তাদের ফিরতে ফিরতে মাগরিব বাদ। এদিকে কিরণের হঠাৎ করেই দুপুরের পর জ্বর লেগে গেল কী করে যেন। ঐশী আসার আগ পর্যন্ত সে-ই দীধিতিকে একটু আধটু সহযোগিতা করে যাচ্ছিল। ঐশী আসতেই দীধিতি ওকে বলে, ‘ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে থাক। এখানে আর লাগবে না তোকে।’
কিরণও তখন চাইছিল বিছানায় গিয়ে একটু গা এলাতে। শরীরটার সঙ্গে মনটাও যে ওর বিমর্ষ। দীধিতি তা লক্ষ করেছে। কিন্তু কাজের চাপে বোনটার সঙ্গে একান্তে কথা বলার সুযোগটা এখনও হয়নি৷ তাছাড়া ঝুমুরের সঙ্গে দীধিতির কথা হয় না অনেকদিনই। সেখানে তিনি স্বেচ্ছায় কিরণকে তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন, যেটা অবশ্যই ভাবনার বিষয়। কিরণ সে সময় জিজ্ঞেস করে, ‘আপু, কোন রুমে যাব? আমার লাগেজ তো বোধ হয় লিভিংরুমে।’

-‘উপরের কোনো রুমেও থাকতে পারিস৷ আবার নিচে গেস্টরুমটাও ফাঁকাই আছে। লাগেজ থাক৷ আমি পরে তোর ঘরে গিয়ে রেখে আসব।’
এরপরই কিরণ সিঁড়ি চড়ে উপরে যাওয়ার আলসেমিতে নিচের গেস্টরুমে গিয়েই শুয়ে পড়ে। শোয়ার পরপরই গা কাঁপিয়ে জ্বরটা আরও বেশি বেড়ে যায় ওর। মাগরিবের আজান দিলে দীধিতিকে কল করে নাওফিল, ওকে নামাজ পড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। তার বউটা রান্নাবান্নাতে আর আদর-সোহাগে যত্নশীল হলেও নামাজ-কালামে নয়। এই ব্যাপারটার ক্ষেত্রে সে মনমর্জিতে চলে। যখন মন চায় তখন আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে মোনাজাত করবে হাপুসনয়নে। আবার যখন মন চাইবে না তখন নামাজের ধারেকাছেও যাবে না। তাই প্রতি ওয়াক্তেই নাওফিলকে তাগিদ দিতে হয় এ ব্যাপারে।

অতিথিদের আনাগোনা শুরু হলো মাগরিবের নামাজের পরই৷ ড্রয়িংরুমে ক’জন মেয়ের হইহট্টগোল এক রবে ভেসে বেড়াচ্ছে চারদিকে। কিরণ তখন জ্বরে কাতর হয়ে বেহুঁশ হওয়ার পথে। দীধিতি রান্নার কাছে দাঁড়িয়েই এক হাতে খুন্তি নাড়তে আরেক হাতে বান্ধবীদের আলিঙ্গন করতে ব্যস্ত। বোনের কথা নামাজ পড়ার পর খেয়াল হলেও দ্রুত রান্না শেষ করার তাগিদে বেমালুম ভুলে বসল সে।
মিনিট দশেক পরই তাওসিফ, নাওফিলের সঙ্গে তুষার, শিহাব, সবুজ আর রাতুল প্রবেশ করল বাসায়। রুমান চলে আসবে খাবার পর্ব শুরু হওয়ার আগেই৷ ওদিকে সৌরভও পথিমধ্যে। সারা ড্রয়িংরুমে গল্প আড্ডার হাট বসে গেল নিমিষেই। সবার মাঝে শুধু তুষারকে খুব ক্লান্ত দেখাল৷ তাকে সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকতে দেখে নাওফিল বলল, ‘তুই ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নিতে পারিস।’

-‘আসলেই মাথাটা খুব ধরেছে৷ আমি তাহলে আধ ঘণ্টা একটু রেস্ট নিয়ে আসি।’
তুষার উঠে দাঁড়াতেই তাওসিফও বলে উঠল, ‘আমারও সারাদিনে আজ বিছানায় যাওয়া হয়নি। আমিও ঘণ্টাখানিকের মতো একটু ঘুমিয়ে আসি। তোরা বসে আড্ডা দে।’
-‘দাঁড়ান দাঁড়ান, তার আগে শরবত খেয়ে যান আপনারা।’
ট্রে হাতে রান্নাঘর থেকে শরবতের গ্লাসগুলো নিয়ে ছুটে আসতে দেখা গেল তখন দীধিতিকে। নাওফিল ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসে গৃহিণী বউটাকেই কথার ফাঁকে ফাঁকে দেখে যাচ্ছিল সে মুহূর্তে। সারাদিনে আগুনের কাছে থাকার ফলে শ্বেতবর্ণ ত্বকে রক্ত ছেয়ে গেছে তার বিদেশিনি বউটার। লাল টকটকে হয়ে আছে সারা মুখখানি। বড্ড মায়া হলো নাওফিলের তা দেখে। পুরোটা দিন বউটাকে আজ বাহুবন্দি করতে পারেনি সে। রাতেও আজ কখন পাবে কে জানে! ইদানিং বন্ধুদের সমাগম বাড়িতে তার মোটেও ভালো লাগে না এজন্যই। এরা এলেই মুখে হাসির সাইনবোর্ড টানিয়ে রাখলেও অন্তরে একেকজনের জন্য তুখোড় গালি-গালাজ চালায় সে। সেই গালি-গালাজের সেই গোলাবর্ষণ এখনও অব্যাহত।

লাইট নিভিয়ে রাখা ঘরটায় সামান্য আলোর ছটাও নেই। বিছানার এক কোনে রোগা পাতলা কিরণের গুটিয়ে রাখা কোমল দেহটা কম্বলের নিচে ঢাকা পড়া। একটুও বোঝার উপায় নেই এ বিছানায় কোনো মানবী শয্যারত। ভিড়িয়ে রাখা দরজাটা খুলেই হঠাৎ ক্লান্ত দেহের এক পুরুষ ঢুকে পড়ল ঘরটায়। ধবধবে সাদা চাদরের বিছানাটা ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝেও হাতছানি দিতে দেখা যাচ্ছে যেন। বিছানাতে গিয়েই গায়ের টি-শার্টটা গলা থেকে উগড়িয়ে নিয়ে পায়ের কাছে ফেলে দিলো সে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতো। এক পাশে জড়ো হয়ে থাকা কম্বলটার এক পাশ নিজের গায়ে টেনে নিয়ে পাশেই থাকা কোলবালিশটা বুকের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরতেই হাতের মাঝে তার দলিত হলো সুগোল, কোমল কোনো বস্তু বিশেষ৷ না, এটা ঠিক বস্তু নয়। নারীদেহের সব থেকে সংবেদনশীল একটি স্থান। এক লহমায় মস্তিষ্ক ধরে ফেলল তক্ষুনি, এই বিছানাতে সে বিনাও একজন নারী ঘুমিয়ে। তাকেই জড়িয়ে ধরেছে সে।

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৯

হুঁশ আর বেহুঁশের মাঝে বিচরণ করা কিরণ তখন ভারি বিপজ্জনক কাজ করে ফেলল চকিতেই। বক্ষ মাঝে থাকা পাশের পুরুষটির হাতটি আকস্মিক ওর তপ্ত হাতে ওই বক্ষ মধ্যেই চেপে ধরল, প্রলাপ করে বলে চলল, ‘আমি কি দেখতে সুন্দর নই…? আপুর মতো সুন্দর নই…? আমি কেন সুন্দর না? আমি কতটা সুন্দর হলে তুমি আমায় ভালোবাসবে…?

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৪১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here