আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি
রোজকার মতো আজ আর ইয়াসিফ ভোরবেলা বাইরে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করে এসে ঘুমিয়ে পড়েনি। খুব জলদিই ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে নিতে হবে তাকে। আজই ঢাকা ফিরবে সে। তাওসিফ দেশে ফিরেছে চারদিন হলো। গতকাল নাওফিলের বাসায় এসেছে সে। এ তাগিদেই তাড়াহুড়ো করে সব গোছগাছ করছে সে বাইরে থেকে ফিরেই। আপাতত যে দু’টো অপারেশনের জন্য রাঙামাটি আসা, সে দু’টো অপরাশেনই সাকসেস। তবে এখানে তাকে আবারও ফিরতে হবে বলে মনে হচ্ছে। যত সব সন্ত্রাসদের সকল অন্যায় কাজ চলেই তো এদিকে। প্রথম অপারেশনটা ছিল অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ আর ইয়াবাসহ একটি সন্ত্রাস দলকে হাতেনাতে ধরা। সে দলটিতে এগারোজনই ছিল নারী সন্ত্রাস। যাদেরকে রাঙামাটি থানা থেকে ঢাকা উত্তরা থানাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আজই।
কাপড় গোছানোর ফাঁকে টেবিল এলার্ম ঘড়িতে সময় দেখল ইয়াসিফ সকাল সাড়ে সাতটা। মেরিনা এখনও অবধি ঘুম থেকে জাগেনি। রোজ বাইরে থেকে দৌঁড়ে এসে ওকে ডেকে তুলতে হয় ইয়াসিফকেই। মেয়েটার বেলা করে ঘুমানোর স্বভাব। সকাল করে উঠতে বললেও উঠতে সে পারে না, না কি ইচ্ছা করেই ওঠে না কে জানে! তাই গত সাতদিনে ওকে রোজ সকালে ডেকে তোলা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়াসিফের— মেরিনাকে নাশতা তৈরির জন্য ডেকে তুলে তারপর সে ঘরে আসে।
কথা ছিল রান্নার হাত ভালো হলে ওকে কাজে রাখা হবে৷ সে হিসেবেই মেরিনা ইয়াসিফের বাংলোতে থেকে যেতে পেরেছে। কেয়ারটেকারকে বাংলোর সামনের ছোট্ট যে ঘরটাতে থাকতে দেওয়া হত, সেখানে এখন মেরিনা থাকে৷ আর কেয়ারটেকার ছেলেটা থাকে বাংলোর বসার ঘরের সোফায়, আবার কখনও মেঝেতেও বিছানা করে থাকে। একটা মেয়েকে ঘরের বাইরে একাকী থাকতে দেওয়ার মতো অবিবেচক কাজটা অবশ্য ইয়াসিফ এমনি এমনি করেনি। কারণটা জানাতে মেরিনাকে নিয়ে আসার দ্বিতীয় দিনের সন্ধ্যার গল্পটা বলা যাক।
পায়ের জন্য ইয়াসিফ সেদিন প্রায় সারাদিনই ঘরে শুয়ে বসে কাটিয়েছে। বিকালবেলা বাংলোর মালিক তাকে দেখতে আসলে লোকটির সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে সে বাসার বাইরে যায়। পাহাড়ি এলাকার নৈসর্গিক বিকালটা অসুস্থ শরীরকেও চনমনে করে দেয় বলেই ইয়াসিফ পায়ে ব্যথা নিয়েও বাইরে হেঁটে বেড়ায় কতক্ষণ। সন্ধ্যার সময় হাতে পাকা পেঁপে নিয়ে বাসায় ফিরে মেরিনাকে বলে, ‘একটা কেটে তুই খা। আরেকটা কেটে আমার ঘরে নিয়ে আয়।’
মেরিনা ওর সুতি শাড়ির আঁচলে সর্বদা মুখের পোড়া ভাগটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। ওর ভাবনা, ওর অমন বিভৎস মুখটা দেখতে মানুষ শুধু ভয়ই পাবে না, সঙ্গে তাদের ঘৃণাও হবে৷ মূলত এমন ব্যবহারই সে মানুষের কাছে পেয়ে এসেছে বলেই জানায় ইয়াসিফকে৷ কিন্তু ইয়াসিফ প্রথম দিনই বলে দিয়েছিল, ওকে মুখ ঢেকে চলাফেরা করার প্রয়োজন নেই। সে কথা ওকে অগ্রাহ্য করতে দেখেই ইয়াসিফ ধমকে বলে তখন, ‘তোকে না বলেছি মুখ ঢেকেঢুকে না রাখতে? তুই কি পর্দা করিস যে মুখ ঢেকে চলবি?’ বলেই সে ঘরে চলে যায়।
কিন্তু এই স্বাভাবিক কথাটাকে জটিল অর্থবোধক করে ভেবে নেয় মেরিনা। সে পেঁপে কেটে যখন ইয়াসিফের ঘরে যায় তখন তার পরনে সুতি শাড়ি বদলে দেখা যায় ফিনফিনে সাদা রঙা জর্জেট শাড়ি আর লাল ব্লাউজ৷ বলা বাহুল্য, তার লাস্যময়ী আর মেদশূন্য শরীরের সৌন্দর্য দেখে ইয়াসিফের কামজ প্রেমে বুকের গভীরে হানা দিয়েছিল কয়েক লহমায়। কাছে এসে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে পেঁপের বাটিটা ইয়াসিফের হাতে তুলে দেবার সময় আলগোছে জড়িয়ে রাখা বুকের আঁচলটাও পড়ে যায় তখন মেরিনার। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইয়াসিফকে ডাকতে ডাকতে শোবার ঘরের দরজায় কেয়ারটেকার ছেলেটা এসে দাঁড়ায়৷ ওদের দু’জনকে কাছাকাছি অমন চিত্রে দেখে ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখ করে অপরাধী মনোভাব নিয়ে এক ছুটে চলে যায় সেখান থেকে। পরবর্তীতে মেরিনাকে শিকার হতে হয়েছিল ইয়াসিফের অকথ্য গালি-গালাজের। সেই সাথে ওকে হুমকিও পেতে হয়েছিল— যদি নিজের সেই পুরোনো পতিতা বৃত্তির মানসিকতা বদলাতে না পারে সে তবে ইয়াসিফের কাছে ওর কোনো ঠাঁই মিলবে না, গলা ধাক্কে ওকে বের করে দেওয়া হবে। কিন্তু বিপরীতে দেখা গিয়েছিল মেরিনার অপ্রত্যাশিত অভিব্যক্তি। কাঁদতে কাঁদতে ইয়াসিফকে হীনমনা পুরুষের কাতারে ফেলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, ‘আমার বিচ্ছিরি চেহারা দেইখা আফনেরও অই মর্দাগো লাহানই ঘিন্নাপিত হইতাছে, তাই না?’
-‘কয়লা ধুলেও যে ময়লা যায় না, তা আমার ভুলে যাওয়া উচিত হয়নি। তুই তোর সব কিছু নিয়ে এক্ষুনি আমার বাসা থেকে বিদায় হ। যা বের হ!’ সাংঘাতিক রাগের বশবর্তী হয়ে বলেছিল ইয়াসিফ।
-‘ময়লা ক্যামনে যাইব? আফনেই কি ভুলতি পারছেন আমি বেই*শ্যা না? ভুললি তো আমারে তুই মুই কইরা ডাকতেন না। অপরিচিত অন্য মাইয়াগো কি আর এইরাম কইরা ডাকতেন?’
-‘আমি জীবনেও কোনো পতিতাকে সম্মান দিয়ে ডাকিনি আর ডাকবও না। জোর করে পতিতা পেশাকে বয়ে নিয়ে চলা মেয়েরা সুযোগ পেলেই একটা সাধারণ জীবন পেতে চায়। তাদেরকে মিনিমাম রেসপেক্টটুকু দেওয়া যায়। কিন্তু তোর মতো মেয়েকে না। তুই তো মুক্তি পেয়েও নিজের নষ্ট মন বদলাসনি। তুই আমার হাতে এখন মারধোর খেতে না চাইলে আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ, যাহ!’
ঘর কাঁপিয়ে দেওয়া ইয়াসিফের প্রকাণ্ড ধমকে মেরিনা ভালোই ভয় পেয়েছিল সেদিন। তারপর ইয়াসিফের পা জড়িয়ে ধরে বসে থেকে অনেক কান্নাকাটির পর মাফও আদায় করে নিয়েছিল সে। কিন্তু এরপর ইয়াসিফ আর ঝুঁকি নেয়নি। দিনের বেলা মেরিনার রান্নার সময়টুকুতে সে ঘরে থাকে না৷ রান্নার সময়টুকু ছাড়া মেরিনাও ইয়াসিফের আশেপাশে আর থাকতে পারে না।
সব কিছু গুছিয়ে ইয়াসিফ ঘর থেকে বেরিয়েই আজ মেরিনাকে রান্নাঘরে দেখতে পেল এক অদ্ভুত দৃশ্যে। প্রশস্ত নিতম্বটা অস্বাভাবিক উঁচু করে ঝুঁকে আছে সে কেবিনেটের ওপর। গুনগুন করে গান গাইছে আর উঁচু করে রাখা নিতম্ব এদিক ওদিকে দোলাচ্ছে, সেই সঙ্গে পেঁয়াজও কুচি করে চলেছে মনোযোগীভাবেই। পেছন থেকে ওকে এতখানিই হাস্যকর দেখাচ্ছে যে, ইয়াসিফ মুখ চেপে ধরে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে আসে। তারপর হাসতে থাকে পেট ফাটা হাসি। হাসি শেষে সে ঘরের বাইরে আসতেই এবার দেখল মেরিনা কফি মেকারে কফি তৈরি করছে। বসার ঘরের সঙ্গেই রান্নাঘর সংযুক্ত বিধায় ইয়াসিফ সোফাতে বসে ওকে সুন্দরভাবে কফি তৈরি করা দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করে উঠল, ‘তোদের তল্লাটে সর্দারনী কফি খেত না কি, মেরিনা?’
সহসা প্রশ্নটায় মেরিনা হালকা চমকে হাতের কাজও থমকে গেল ওর। ইয়াসিফ কখন এসে বসেছে ও টেরই পায়নি।
-‘কী কন, স্যার? সর্দারনী মা*গী ছয়বেলা মুকের মইদ্দে পান হান্দাইয়েই বাঁচত না! হেই আবার কোফি খাইব? তয় বড়ো বড়ো কাস্টুমার আইলি তাগো লগে বইসা চা, সেভেনআপ গিলবার দ্যাখতাম।’ কাজের ফাঁকেই বলে গেল মেরিনা
-‘তাহলে কি তোর কাস্টোমার তোর ঘরে এসে কফি খেতে চাইত? তাও আবার কফিমেকারে করা কফি?’
চোখের তারা কেঁপে উঠল এবার ওর। চঞ্চল চোখদুটোই ইয়াসিফের দিকে চেয়ে মুহূর্তেই জবাব দিলো, ‘অরা তো আমারে খাইতে আসত, স্যার৷ এইসব কোফি টোফি খাইবার চাইব ক্যা?’
-‘তাহলে তুই কফি রেডি করা কী করে জানলি কফিমেকারে?’
-‘অ এই কতা! আমি তো এইরাম কফি কতবার বানাইছি যাগো বাইত কাম করতাম৷ তাগো বাইত আছিল এই ম্যাশিন।’
-‘ও আচ্ছা।’ ইয়াসিফ সোফা ছেড়ে উঠে এলো তখন রান্নাঘরে। কফির মগটা নিজেই তুলে নিয়ে মেরিনার পাশে এসে দাঁড়াল৷ কেবিনেটে রান্নার জন্য কেটে রাখা সকল সবজি তরকারি পর্যবেক্ষণ করতে করতে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তুই যখন কাজ করেছিস তখন তোর বয়স চৌদ্দ ছিল।’
-‘না না পুনারো।’
-‘পনেরো? আচ্ছা পনেরো। ওখানে কাজ করেছিলি প্রায় নয়-দশ মাস। এখন তোর বয়স কত হবে? পঁচিশ প্লাস।’
-‘এহ্ স্যার অত না! মোটে বিশ।’
-‘মোটে বিশ? সত্যি বললি?’
-‘ হ স্যার। মিথ্যা কমু ক্যা?’
-‘না মেয়েরা তো আবার বয়স কমিয়ে বলতে পছন্দ করে৷ তার জন্যই আরকি। আচ্ছা তুই তো জীবনেও লেখাপড়া কিছু শিখিসনি। তো যে বাড়িতে কাজ করতি সেখানে তোকে ইনডাকশন কুকারে রান্না করতে দিত, ওভেনে খাবার গরম করতে দিত, কফিমেকারে কফি বানাতে দিত। সেটা পাঁচ বছর পরেও তুই কী সুন্দর করে মনে রেখেছিস। এক্সিলেন্ট মেমোরি তোর।’
-‘তো মনে থাকতে পারে না? অদ্ভুত!’ কিছুটা মেজাজহারা হলো মেরিনা।
প্রমিত ভাষার কথা শুনে ইয়াসিফ ওর প্রায় পিঠ ঘেঁষে দাঁড়াল মিটিমিটি হাসতে হাসতে, ‘আচ্ছা থাকতেই পারে। আমিও তো সেটাই বলছি৷ তুই রেগে যাচ্ছিস কেন?’
মেরিনা ইতস্তত ভাব নিয়ে একটু সরে দাঁড়াবার চাইল। ইয়াসিফ তা বুঝতে পেরে আরও ততই মিশে দাঁড়াল ওর শরীরের সঙ্গে। এর মাঝেই ওর মাথা থেকে কাপড়টা টেনে নামিয়ে দিলো আচমকা। কান, গাল আর গলার পোড়া অংশে সুক্ষ্মভাবে দেখতে দেখতে ওর গালের এবড়োখেবড়ো চামড়ায় আঙুল ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে শুধাল, ‘তুই ভীষণ যত্ন নিস তোর দেহের প্রতিটা খাঁজের ফ্যাট রিডিউসিংয়ের জন্য, তাই না রে?’
মৃদুস্বরে বলা ইয়াসিফের কথাগুলোর জবাব দিতে মেরিনা মুখ খুলতে গেলেই ইয়াসিফ ফের বলল, ‘এই কিচেনে প্রতিটা কাজ এত সুন্দর গুছিয়ে করিস যেন রোজ এরকম কিচেনেই রান্না করতে অভ্যস্ত তুই। সিরিয়াসলি আ’ম ইম্প্রেসড! আমাকে বিয়ে করবি, মেরিনা? তোকে নিয়ে এখানেই থেকে যাব আমি। আমার তোকে ভালো লেগে গেছে।’
-‘অ মোর আল্লাহ! এইডা আফনে কীরাম মশকরা করেন, স্যার?’ এক ঝটকায় ইয়াসিফের কাছ থেকে সরে এসে দাঁড়াল মেরিনা।
আকস্মিকভাবে ইয়াসিফও মেরিনার চিকন কোমর দু’হাতে চেপে ধরে এক টানে কাছে এনে দাঁড় করাল আবার, ‘তুই আমার চোখে তাকা। তাহলেই বুঝতে পারবি আমি মজা করছি না৷ তোকে রোজ শাড়ি পরে এই রান্নাঘরে বউদের মতো ঘুরে ঘুরে কাজ করতে দেখলে একটা লক্ষ্মী বউয়ের খুব অভাববোধ করি রে। তুই রাজি হয়ে যা। আজকেই এখানের পুলিশ সুপারকে ডেকে, কাজী ডেকে বিয়ে করে ফেলব আমরা।’
মেরিনা ড্যাবডেবে চোখে ইয়াসিফের দিকে চেয়ে ছিল এত সময়। অবিশ্বাস্য কথাগুলো শুনেই লজ্জায় হঠাৎ মুখ ঢেকে ফেলল সে, ‘ইস! আমি বিশ্বাসই করবার পারতাছি না।’
ভাবনাতীত তখন ইয়াসিফ ওর নাকের ডগায় চুমু খেয়ে বসল, ‘এবার বিশ্বাস হয়?’
মেরিনাকে কিয়ৎ কালের জন্য কিংকতর্ব্যবিমূঢ় দেখাল৷ ওর হতবাক নয়নজোড়াতে চোখ রেখেই ইয়াসিফ ওর পোড়া গালে আবারও আঙুল ছুঁইয়ে বলল, ‘আমি সার্জারি করাব তোর মুখের৷ তুই খুব হীনমন্যতায় ভুগিস এই মুখটার জন্য৷ আল্লাহর কাছে প্রে করিস তাই না? যদি এই মুখটা আবার আগের মতো হয়ে যেত!’
আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে ইয়াসিফ সে গালে এবার ঠোঁট ছোঁয়াতে মুখটা বাড়ালেই মেরিনা জড়তায় চোখ বুজে ফেলে৷ ইয়াসিফ তা দেখে মুচকি হেসে থেমে পড়েই ওর গালের পোড়া, অমসৃণ চামড়া আচম্বিতে এত নিষ্ঠুরভাবে দু’আঙুলে টান মারে যে, মেরিনা ব্যথায় একটু চেঁচিয়ে উঠে ইয়াসিফকে এক ধাক্কা দিয়ে বসে৷ গালে হাত দিয়ে সে টের পেল গালের মাঝ থেকে কিছুটা নকল চামড়া উঠে গেছে। রাগে দিশাহারা মেরিনা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল তখন ইয়াসিফের ওপর। ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তার নাক বরাবর ঘুষি দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত উঁচু করতেই ইয়াসিফ সে হাত মুহূর্তে ধরে ফেলে হালকা মোচড় দিয়ে ধরে ওকে কব্জা করে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও ছাড়ল না ইয়াসিফ, ‘বারো মিশেলে গ্রাম্য ভাষায় কথা বলার আগে কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে শোনানো উচিত ছিল তোমার৷ তাহলে তার থেকে ফিডব্যাক পেয়ে বুঝতে পারতে কত বড়ো আহাম্মক মার্কা মেয়ে তুমি৷ সময় নষ্ট না করে এবার বলে দাও হোয়াট’স য়্যোর আইডেন্টিটি?’
-‘বেয়াদব ছেলে, ছাড়ুন। তারপর বলছি।’
-‘আগে বলো। নইলে আরও জোরে ব্যথা দেব।’
-‘আ’ম আ জার্নালিস্ট।’
-‘কোন পত্রিকার? আসল নাম কী? আর আমার কাছে এই রূপে আসার কারণ কী?’
উত্তর পাওয়ার আগেই কেয়ারটেকার রবিন ঘরের সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি আরম্ভ করল ইয়াসিফকে। মেরিনার হাতটা ছেড়ে দিয়ে ওকে হুমকিস্বরূপ বলল তখন ইয়াসিফ, ‘আমার সকল প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে পালানোর চেষ্টা করবে না৷ আর মুখের এসব ফেক স্কিন তুলে ফেলে স্বরূপে আসো৷’
দরজাটা খোলায় ছিল। ইয়াসিফ বাইরে এলে রবিন জানাল, ‘এক বিদেশী মাইয়ে আপনার সাতে দেখা করতে আইছে, স্যার। বাগানে যাইয়া বইছে।’
-‘বিদেশী মেয়ে?’
-‘হ স্যার৷ আপনার মতো মেলা লম্বা, মেলা সাদা৷ মাথায় ক্যাপ। গায়ে প্যান্ট, গেঞ্জি পরা আর ঘাড়ে বড়ো ব্যাগ।’
-‘আচ্ছা, তুই একটু ঘরে গিয়ে বস তো। মেরিনা মেয়েটাকে চোখে চোখে রাখ।’
-‘ওকে স্যার।’
মনে ভারি কৌতূহল নিয়ে ইয়াসিফ বাগান এলো৷ কিন্তু সেখানে বসে থাকতে কাউকে দেখা গেল না। তবে রবিনের বর্ণনা মোতাবেক সত্যিই নিজের মতো প্রায় লম্বা একটি বিদেশী মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল ক’হাত দূরেই। চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে প্রকৃতির চির-হরিৎ সৌন্দর্য দেখছে হয়ত।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৩৮ (২)
-‘হু আর য়্যু, মিস? হোয়াট হেল্প ডু য়্যু ওয়ান্ট ফর মি?’
চকিতেই পিছু ফিরে তাকাল মেয়েটা। ইয়াসিফকে দেখে জলদি এগিয়ে এলো ওর কাছে। সাদা রঙা প্যান্ট আর কালো খয়েরীর মিশেলে টি শার্ট তার পরনে। মাথায় বাদামী আর কালো রঙা খোলা চুল কালো ক্যাপে ঢাকা কিছুটা৷ মুখে কালো মাস্কের কারণে ছোটো ছোটো চোখদুটো ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না। ইয়াসিফ বোধ হয় থমকাল সামান্য ওই চোখদুটো দেখেই। এই একই চোখ কতজনের হতে পারে?
