এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ১৯
আসিফা খান
আজ একটাও ক্লাস বাঙ্ক করেনি ইয়ানা আর আতিকা। দীর্ঘ সময় ক্লাসে মুসগুল থাকার কারণে দুই জনেই বেশ ক্লান্ত। তৃতীয় সেমিস্টার এর পরীক্ষা ও এগিয়ে আসছে।। সময় ভীষণ চঞ্চল,,,কেমন জানি কিশোরী চরিত্রের ন্যায় খোশমেজাজে ছুটে চলেছে।। এদিকে প্রিয় বান্ধবীর মেজাজ ও আজ কাল বেশ উড়ন্ত,,, ইয়ানার চোখ ফাঁকি যাচ্ছে না আতিকার পরিবর্তিত চিত্ত। মেয়েটার গাল দুটো সর্বক্ষণ কেমন লাল হয়ে থাকে,,,চোখে মুখে কেমেন অস্থির ভাব,,আজ সারাটা ক্লাস জুড়ে তার কালো কালির কলমের খাপ মুখে নিয়ে কামরিয়েছে মেয়েটা। কিছু বললেই কেমন লাজুক ভঙ্গিতে কথা বলছে সে। ইয়ানার সন্দেহ হচ্ছে,,,হয়েছে কি মেয়েটার?,,,কৌতূহল জন্মাচ্ছে শুধু প্রশ্ন করছে না।।,,,
ফোন আলাপ শেষে এগিয়ে এলো আতিকা। ইয়ানা চোখ ছোটো ছোটো করে বললো,,,,”কি ব্যাপার বলতো,,,ফোনে আজ কাল একটু বেশিই ব্যাস্ত থাকিস। অন লাইন থাকিস সর্বসময়,,,চোখে মুখে ও কেমন লাজুক ভাব। এই তুই আবার লুকিয়ে বিয়ে টিয়ে করেনিস নী তো?”
অত্যাধিক সংশয় প্রকাশ করে কথা গুলি বললো ইয়ানা।। আতিকা চোখ দুটো পিটপিট করলো,,,এদিক ওদিক তাকিয়ে নার্ভাস হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। ইয়ানা ছোটো ছোটো চোখ করে পরখ করলো সবটা।।,,,আতিকা আমতা স্বরে বলল,,,”রে না না ,,,পাগল নাকি! তুই জেরোকম ভাবছিস ওরকম না নয়!’
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“তাহলে কিরকম?”
“ধুর,,,আচ্ছা শোন,,,মা ফোন করেছিলো,,,বললো আজ বাড়িতে জলদি ফিরতে,,,কারণ বললো না।।”
ইয়ানা রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে বললো,,,”এখনি চলে যাবি?”
“হুঁ,,,,ইনু।,,,,তোকে কি রিফাত দাভাই নিতে আসবে?”
রিফাত এর নাম শুনেই বুকটা হাকুপাকু করে উঠলো ইয়ানার। চিত্ত আকুল হলো কেমন।। হলদে শুভ্র চেহারায় একটা মোহনীয় ভাব স্পষ্ট হলো। লোকটার তার প্রতি সেবা, যত্ন, তিক্ত মুহূর্তে তার পাশে দাড়ানো, তাকে মনোবল দেয়া আর তো আর তার জন্য নিজের ক্রুদ্ধ রূপ জাহির করতে ও দ্বিধা বোধ করেনি লোক টা। এই কয়েক দিনে রিফাত এর প্রতি আলাদা এক প্রকার অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। হৃদ মাঝারে কেমন নড়বড়ে পরিবেশের আবির্ভাব ঘটেছে।।,,, আতিকার করা প্রশ্ন মাথা নাড়ালো,,,লোকটা কে তো আজ সকালে চোখেই দেখিনি,,,তাহলে কি আজ রিফাত তাকে নিতে আসবে না। মনটা খারাপ হলো,,ঠোঁট উল্টে বললো,,,
“জানিনা,,,আজ সকালে তো ওনার সাথে দেখাই হয়নি।। ”
“তাহলে ,,,,ফোন করে জিজ্ঞাসা কর।”
“আব,,,না না,,,ফোন করবো না।”(অস্থির হয়ে বললো ইয়ানা)
“তবে আর কি,,,,অপেক্ষা কর,,,যদি না আসে তাহলে একাই চলে যাস।,,,আচ্ছা আমি গেলাম,,,বাই।”
আতিকা বিদায় নিল। ইয়ানা ফোন বের করে সময় দেখে নিলো,,,তাদের ছুটি হয়েছে মাত্র পনেরো মিনিট। রিফাত এর জন্য অপেক্ষা করতে মন চাইছে,,,অন্তর বলছে সে আসবে।। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে গেটের কাছে দাড়ালো। আশে পাশে ব্যাস্ত ছাত্র ছাত্রী দের সমাবেশ। নিজ নিজ কর্মে নিয়োজিত ইনসান কূল।। ইয়ানা চোখ ঘুরালো,,,কলেজের দেওয়াল এর সাথে লাগুয়া বেশ কিছু গোলাপ গাছ আছে,,, ইয়ানার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো ফুটন্ত লাল গোলাপ। এগিয়ে গেলো,,,হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলো সেই রক্তিম ফুল। নিচের ঠোঁট কামড়িয়ে চারিদিক পরখ করে টুক করে ছিঁড়ে ফেললো সেই গোলাপ। মনটা নেচে উঠল,,,ফুল যে তার ভীষণ প্রিয়।,,, নাক ডুবিয়ে সুবাস নিলো,জুড়িয়ে গেল অন্তর।।,,,
“হেই,,, ক্যান উই টক?”
অচেনা আওয়াজে চমকে উঠলো ইয়ানা। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে ফিরে দেখলো,,,কলেজের ফরমাল পোশাকে,এক কাধে ব্যাগ ঝুলানো এক ছেলে।। দেখে বুঝল ছেলেটি তার ক্লাস মেট নয়,আর না তার চেনা কেও।,,ইয়ানা ভ্রু কুঁচকে বললো,,
“আমি কি আপনাকে চিনি?”
ছেলেটা হেসেই জবাব দিলো,,”জি না,,,আমি ফর্থ ইয়ার,,সিনিয়র তোমার।। আসলে কিছু কথা ছিলো,,,”
ইয়ানা অত্যাধিক স্বাভাবিক ভাবে বললো,,,”জি বলুন।”
“উমম,,,এখানে না। যদি কিছু মনে না করো তাহলে সামনের ক্যাফে তে বসে কথা বলতে পারি,,,প্লিজ। ”
ইয়ানা এবার কিছু টা কঠিন হয়ে অন্য দিকে ফিরে বলে,,,,”সরি,,,যা বলার এখানেই বলুন,,,নাহলে থাক।”
“ইয়ানা,,,,প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো,,,আসলে আমি একটু ইন্ট্রোভার্ট।।সবার সামনে কথা বলতে হেজিটেট ফিল হয়। প্রমিজ,,,বেশি সময় নেবো না তোমার,,,না করো না প্লিজ।।”
ছেলেটার বিনোনমূলক কথা শুনে ইয়ানার একটু ভাবনা হয়।ছেলেটা তার নাম ও জানে,,হয়তো সত্যিই জরুরি কিছু,,, চোখ যায় রাস্তার ওপারে,,,ছোট্ট একটা ক্যাফে,,যা ভরপুর থাকে কলেজের ছাত্র ছাত্রী দ্বারা। ইয়ানা ছোট্ট একটি শাস ফেলে,,,রিফাত ও এখনও এসে পৌঁছায়নি। মোনে মোনে ভাবলো ,,,ছেলেটির বক্তব্য শুনেই আবারও এসে এখানেই দাড়াবে। অপেক্ষা করবে রিফাত এর জন্য।
“যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন,,,”
“কিছু ওডার দি?,,,তারপর নাহয়,,,,”
“জ্বী না,,,আমি খেতে আসিনি। আপনার বক্তব্য রাখেন,,,সেটাই শুনার জন্য এসেছি।”
ছেলেটি ইয়ানার দৃঢ় বাক্যে হাসলো।। তরপর বুকের ফুলিয়ে শাস টানলো,,,নার্ভাস লাগছে ভীষন,,,জীবনের নব অনুভুতির স্বীকারোক্তি অত্যাধিক কঠিন।,,, ইয়ানা তার কথা শোনার অপেক্ষায় আছে দেখে ছেলেটি সময় নষ্ঠ করলো না,,,অত্যন্ত নমনীয় সুরে বলল,,,
“আমার নাম,,,আরহান। কিসে পরি তাহ আগেই জানিয়েছি।। প্রায় ছয় মাস আগে আমি তোমায় দেখি,,,আর দেখতেই সর্বনাশ ঘটে আমার। যেটা থেকে নিজেকে এতদিন দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম তাতেই জড়িয়ে পড়লাম। বলতে পারো,, লাভ এ্যন ফ্রাস্ট সাইড,,, হয়েছিল তোমায় দেখে।। অনেক চেষ্টা করেছি তোমায় ভালো না বাসার,,,কিন্তু আমি ব্যার্থ।। ,,,ইয়ানা আমি তোমায় ভালোবাসি,,,আমায় ফিরিয়ে দিও না,,,সময় নাও উত্তর দেওয়ার ,,,আমি অপেক্ষায় থাকবো।”
ইয়ানার শান্ত মনোভাব। হৃদয় অস্পষ্ট কায়া। মস্তিষ্ক ভোম। ভালোবাসা শব্দ আনমনে আলোড়নে ভেসে উঠলো রিফাত এর চেহারা।। চমকে উঠলো চিত্ত।। ছেলেটির আকুল দৃষ্টি ইয়ানা তে স্তব্ধ।। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল ইয়ানা। ছেলেটির দিকে না তাকিয়েই বললো,,,
“অপেক্ষায় মানুষ তখন থাকে যখন সামনের মানুষ টির দিক থেকে সূক্ষ্ম আশার দেখা মেলে,শব্দে হোক কিংবা নিঃশব্দে।।,,,আপনার অনুভূতিকে সম্মান জানাই,,,কিন্তু আমি আপনাকে কোনো আশায় রাখবো না। আমার উত্তর বুঝেছেন অবশ্যই।। ”
কথাটি বলেই ইয়ানা উঠে দাড়ালো,,,ব্যাগ কাধে নিয়ে পা বাড়ালো। কিন্তু ছেলেটির কথায় পা জোড়া থেমে গেল,,,
“অন্যকেও আছে নাকি জীবনে,,,মনের ঠিকানায় তার বসবাস?”
ইয়ানা ফিছলে হাসলো,,ঘুরে তাকিয়ে বললো,,,”মনের ঠিকানা তার নামেই,,,আত্মা ,হৃদয় দুটোই তার।”
“খুব ভালোবাসো বিএফ কে?”
“উম হুঁ,,,স্বামী।।”
চলে গেল ইয়ানা। ছেলেটির চিবুক ঝুঁকে আছে,,,মনের কোণে ব্যাথা অনুভব করতে পারছে।প্রথম অনুরাগের অনুভূতি এতটা বেদনা দায়ক জানলে এই অনুভূতি হতে সে সীমাহীন দূরত্ব বজায় রাখত।চোখের কোনে বারিকনা জমাট বেঁধেছে। বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যাথাটা ক্রমশ বাড়ছে। মেয়েটা বিবাহিত,,,কারোর অর্ধাঙ্গিনী কথা ভেবেই ধপ করে বসে পড়লো চিয়ারে।
“আরে দাদুভাই,,,তুমি এই সময়। আচ্ছা এসেছো তখন ভালই,,,একসাথে দুপুরে খাবো।”
“না,,,খিদে নেই।”
গম্ভীর স্বরে কথাটি বলেই গটগট আওয়াজে সিড়ি বেয়ে চলে গেল নিজ রুমে রিফাত।। এদিকে ইব্রাহিম সাহেব ইয়ানার কথা জিজ্ঞাসা করবে তার সুযোগই পেলেন না তিনি।।,,,
রুমে এসে ধারাম করে দরজা বন্ধ করে। কাঠের টি টেবিলে সজোরে এক লাথি মারে। নিজের রাগ কিছুতেই সংবরণ করতে পারছে না রিফাত।। অস্থির মন ভাব রিফাতের।। দুই হাত দিয়ে মাথার পিছনে চুল খামচিয়ে ধরে রুম জুড়ে পায়চারি করছে।। ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। কঠিন চেহারা।,,,কপালের রগ গুলি অস্বাভাবিক। শরীরের প্রত্যেক শিরায় উপশিরায় যেনো জোশ খেলে যাচ্ছে।। মনে পড়ছে কাঁচ এর মোটা দেওয়াল এর ওই পাশে ইয়ানার সাথে এক ছেলের দৃশ্য। ইয়ানার হাতে ছিল এক লাল গোলাপ যা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না ছেলেটির মনোভাব ইয়ানার ক্ষেত্রে কি!
রিফাত এর ব্যাকুল অন্তর। ইয়ানা কে শুধুই তার দায়িত্ব ভাবা মন টা এখন যেনো কোথায় গায়েব।।
রিফাত নিজেকে সংযত রাখতে সিগারেট ধরায়,,,এক ,দুটো ,তিনটে। হয়তো তার থেকেও বেশী। বিষাদ ধোঁয়া উড়িয়ে দিচ্ছে শুদ্ধ বাতাসে। নিজেকে একপ্রকার উন্মাদ মনে হচ্ছে। অত্যাধিক খাপ ছাড়া লাগছে।। মোনে হচ্ছে,,,মেয়েটা যা ইচ্ছে করুন তাতে তার কি,,,মেয়েটা তো মাত্র তার দায়িত্ব!,,,কিন্তু অন্য দিকেই অন্তর বিদ্রোহ করে বলছে,,,ইয়ানা শুধুই তোর রিফাত,তোর বউ,তোর সম্মান তার সমস্তটা জুড়ে শুধুই তুই থাকবি।,,, ইয়ানার জীবনে অন্য কোন পুরুষের অস্তিত্ব,কথাটি ভেবেই রিফাত হোসেন চমকিয়ে উঠলো,বুক খাঁ খাঁ করছে। রক্ত যেনো ফুটছে তার।। সময় গড়ালো,,,ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চললো আপন গতিতে।
“আপনি কখন এলেন,,,,জানেন আপনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে শেষে আমি অটো করেই এসে পড়েছি। ফোন করিনি ভেবেছি আপনি ব্যাস্ত।”
কাধের ব্যাগ সোফায় রেখে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে কথা গুলি বললো ইয়ানা।রিফাত কে দেখে সেও কিছুটা বিস্মিত হয়েছে। ক্যাফে থেকে বেড়িয়েও রিফাত এর জন্য অপেক্ষা করেছিল সে। কিন্তু শেষে হতাশ হয়ে নিজেই এসে পড়েছে।। বাড়িতে প্রবেশ করতেই দাদু বললো রিফাত এসেছে,রুমে আছে। কথাটি শুনেই বুকটা চঞ্চল হলো,,, এক প্রকার দৌড়িয়ে রুমে প্রবেশ করলো সে।
ইয়ানার আওয়াজ কর্ণ সীমানায় ঠেকতেই রিফাত চোখ বুজে দাতে দাঁত পিষে বললো,,,”এত দেরি হলো কেনো ফিরতে?”
ইয়ানা হাসি হাসি মুখেই জবাব দিলো,,”বললাম না,,আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
রিফাত জোরে রেলিংএ আঘাত করলো।তত্পর তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে ইয়ানার দুই বাহু সজোরে চেপে ধরলো।। ইয়ানা ঘাবড়িয়ে গেল,,রিফাত এর রক্তবর্ণ চোখে চোখ পড়তেই পুরো শরীর শিউরে উঠলো। লোকটার দেহ থেকে কেমন উষ্ণ বাতাস নির্গত হচ্ছে। ইয়ানা কিছুই উপলব্ধি করতে পারলো না।,,,রিফাত হিশহিসিয়ে বললো,,,
“আচ্ছা,,,আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে তাহলে ক্যাফের মধ্যে প্রেম আলাপ কে চালাচ্ছিল?”
“প্রেম আলাপ?!”
ইয়ানা বিস্ময় এর চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো। লোকটা বলছে কি?,,তার মানে রিফাত তাকে আনতে গিয়েছিল।। ইয়ানা ঠোঁট চেপে ধরলো,,ব্যাথা অনুভব করছে বাহুতে।। রিফাত এর ভুল ভাঙ্গতে ইয়ানা কাপা কন্ঠে বলল,,,
“ক কি বলছেন আ আপনি?,,,ভুল ভাবছেন। সেরকম ক কিছুই না।”
হাতের দৃঢ়তা বাড়লো,,,যেনো এবার ইয়ানার নরম চামড়া ভেদ করে রিফাত এর আঙ্গুল প্রবেশ করবে মেয়েটার মাংসে। ইয়ানা কে টেনে আরো কাছে নিয়ে আসলো। ইয়ানা চোখ মুখ খিচে রইলো,,,গলা ভারী হয়ে আসছে।।,,
“আমি ভুল ভাবছি তাই না!,,,নিজের চোখে দেখেছি তোমাকে ছেলেটির সাথে।। এই,,,কলেজে কি করতে যাও ,,,প্রেম লীলা চালাতে?,,,মেরে ফেলবো ইয়ানা,,,আমার সন্মান নিয়ে ছেরখানি করলে আমার থেকে খারাপ কেও হবে না।”
“ব্যাথা পাচ্ছি,,,ছাড়ুন আমায়,,,লাগছে।”
“লাগছে তো আমার,,,,একদম এইখানে(বুকের বা পাশে তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে আঘাত করে),,,,”
ইয়ানা এবার হুর হুর করে কেঁদে ফেললো। রিফাত এর কঠিন কথা তার ছোট্ট হৃদয় কে নাড়িয়ে দিয়েছে। সে তো কিছুই করেনি,,,রিফাত একটাবার ও তাকে সুযোগ দিচ্ছে না নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার।।,,,ফুপিয়ে কাদঁছে ইয়ানা। রিফাত এবার কিছুটা শান্ত হয়,,,ছেড়ে দেয় ইয়ানার বাহু। মেয়েটার কান্না তার সহ্য হচ্ছে না,,,হাত মুঠি বদ্ধ করে জোরে প্রশ্বাস ছাড়ছে রিফাত।। রাগের বশে ইয়ানা কে বেশ কষ্ট দিয়ে ফেলেছে,,,।।,,,ইয়ানা এবার ফুপানো স্বরে বলতে থাকে,,,
“ভীষণ পচা আপনি,,,আমার কথা না শুনেই কি সব বলে গেলেন।।,,,আমি তো কিছুই করিনি,,,ছেলেটাই উবজে এসেছিল আমার কাছে,, ব বললো কি জানি কথা আছে আমার সাথে,,, আ আমি বললাম এখানেই বলতে,,, কি কিন্তু সে বললো ক্যাফে তে বসেই ব বলবে।(তারপর সমস্ত টা খুলে বললো ইয়ানা),,,আমি বললাম আমি বিবাহিত।।,,, তা তারপর আ আবার ,,, আপ আপনার জন্য অপেক্ষা করি,,, কি কিন্তু আপনি আসেন নী।”
ইয়ানার সমস্ত কথা শুনে রিফাত বাকরূদ্ধ। নিজের উপরই রাগ লাগছে। ইয়ানা কথা গুলো বলার সময় শত বার আটকিয়েছে,,, কাদদে কাদদে হিচকী উঠে গিয়েছে মেয়েটার। রিফাত বিমূঢ় হয়ে রইলো। রাগ মাথায় চাপলে কোনো দিকেই খেয়াল থাকে না তার। রিফাত এর বোঝা উচিত ছিল,ইয়ানা কে সে চেনে,জানে মেয়েটা উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তার পবিত্রতায় লাঞ্চন লাগানোর আগে রিফাত এর শত বার ভাবা উচিত ছিল,,, অত্যধিক পজেসিভনেস এর দরুন নিজের এরকম ব্যাবহারে বিরক্ত রিফাত।।ইয়ানা ঠোঁট ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কান্না করছে। বুকের মধ্যে যেনো কেও হাতুড়ি পেটাচ্ছে।।,,,রিফাত এবার ধির পায়ে এগিয়ে এলো,,,ইয়ানা কে ধরতে নিলেই সে দুই পা পিছিয়ে যায়। অভিমান হয়েছে রিফাত এর প্রতি। রিফাত এবার ঝট করে ইয়ানা কে কোলে তুলে নিলো,,,ইয়ানা মুচড়া মুচড়ি করেও লাভ হলো না।। সোফায় বসিয়ে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো,,,মেয়ের হিছকি বাড়ছে।
“পানি টা খাও।”
“খা..হিক… খাবো না….হিক।”
“ইয়ানা জেদ করোনা,,,পানি না খাও,,,”
“আদিক্ষেতা,,,হিক,,,খাবো না,,,হিক,,, ”
রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছাড়লো।। ইয়ানা কে এই মুহূর্তে একদম বাচ্চা লাগছে। রিফাত জোর করেই পানির গ্লাস ইয়ানার ঠোঁটে চেপে ধরলো,,,অনিচ্ছার সর্তেও পানিটা পুরোটাই শেষ করলো ইয়ানা।।,,,রিফাত মেয়েটার মুখ আলগোছে ছুয়ে দিলো,,,চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে,,,শান্ত কন্ঠে বলল,,,
“সরি বললে কাজ হবে?”
রিফাত এর কথা শুনে ইয়ানা আবার ও ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিলো। রাগ অভিযোগের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে অভিমান।।ইয়ানা তার ছোটো ছোটো হাতে ঘুষি দিতে লাগলো রিফাত এর প্রশস্ত বুকে।,,,
“খুব খুব খুব বাজে আপনি,,,,কিছু না জেনেই আমায় ভুল বুঝলেন। ব্যাথা দিলেন।,,, কত অপেক্ষা করেছি আমি আসেননি আপনি।।,,,কোনো কথা বলবো না আপনার সাথে,,,একদম না।”
ইয়ানার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো রিফাত।। এই ছোট্ট মানবী সত্যিই কিশোরী,,,অভিযোগের বন্যা বহিয়ে বলছে কথা বলবে না। রিফাত মাথা উচু করে একটা শাস ছাড়ে।।,,,ইয়ানা কে কাছে টেনে আনে,,, অশ্রুসিক্ত নয়নে নিজের আখিদ্বয় স্তব্ধ রেখে বলে,,,
“শুউউ,,,,কান্না থামাও।। দুঃখিত আমি,,,প্লিজ স্টপ ক্রাইং। আম সরি,,,”
“চলে যান,,,,,”
“আমার রুম এটা।”
“তাহেল আমিই চলে যাচ্ছি।”
ইয়ানা নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাড়ালো,,,ধপ ধপ পা ফেলে দরজার কাছে এসে,,,রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার পূর্বে রিফাত এক ঝটকায় ইয়ানা কে ঘুরিয়ে পাশের দেওয়ালে ঠেসে ধরে। নিজের এক হাত দিয়ে ইয়ানার দুই হাত চেপে ধরলো।। অত্যধিক সান্নিধ্য মনেপ্রানে রিনঝিন শব্দ তুলছে ইয়ানার।। চারিদিকে ঘন বাতাস বয়ে চলেছে। রিফাত আরো কিছুটা ঝুঁকে আসে ইয়ানার সম্মুখে। নিজেকে কেমন খাপছাড়া লাগছে।। মেয়েটার সান্নিধ্যে অগ্রসর হবে না বলে নিজেকে পণ করে,,,কিন্তু সেই ওয়াদা নিজেই ভঙ্গ করে,,,এখন এই মুহূর্তে প্রচণ্ড আবেগ এসে ভিড় করেছে রিফাত এর হৃদয়ে।। এতো কিছুর মধ্যে কখন ইয়ানার মাথা হতে ওড়না সরে গিয়ে তার কেশ ঝোরে পড়েছে মুখের সামনে তাহ আন্দাজ করা গেলো না।।,,,রিফাত হাত উছিয়ে সামনে পড়া চুল আলতো হাতে ইয়ানার কানের পিছে গুজে দিতেই মেয়ে শিরশিরিয়ে কেপে ওঠে।,,,
“খবরদার এই রুম থেকে এক পাও রাখবে না তুমি।”
রিফাত এর কন্ঠ কঠিন,,,ইয়ানা ঢুক গিলে কিছু বলতে নিলেই রিফাত নিজের তর্জনী আঙ্গুল ইয়ানার অধর যুগলের মাঝ বরাবর রাখে। ইয়ানা জোরে শ্বাস ছাড়ে,, ধুক করে ওঠে অন্তর।।,,,রিফাত এবার অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং ভরাট স্বরে বলতে লাগলো,,,,
“মোনে রাখবে ইয়ানা শুধুই রিফাত এর। তার অন্তরে বাহিরে একমাত্র আমার বসবাস।। আমার সম্মানে,দায়িত্বে, কর্তব্যে তুমি জড়িত। তোমার সমস্তটা জুড়ে শুধুই আমি।।
এর পরে আর কোনো ছেলের আশেপাশে যেনো তোমায় না দেখি। নাহলে আমার থেকে খারাপ কেও হবে না। অ্যান্ড আই মিন ইট।”
ইয়ানা কে ছেড়ে দিয়ে রিফাত বেরিয়ে গেল রুম থেকে। আর ইয়ানা স্তব্ধ হইয়া ওখানেই দাড়িয়ে রইল। রিফাত কি বলে গেলো ওটা,,,ইয়ানা তো কবেই নিজের সর্বস্ব রিফাত এর নামে করে দিয়েছে। কিন্তু রিফাত,,,সেকি আদেও ইয়ানা কে নিজের অর্ধাঙ্গিনী ভাবে?,,,ইয়ানা চাইলেও কোনদিন নিজেকে রিফাত হতে সরিয়ে আনতে পারবে না। নিজের অস্তিত্ব থেকে কি কেও সরে আসতে পেরেছে?
বিছানায় শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে আতিকা। কলেজ থেকে এসেই মায়ের কাছে জানতে পারলো আজ নাকি তাকে দেখতে আসবে। আতিকা কথাটি শুনেই অত্যাধিক অবাক হয় সাথে মনে সৃষ্টি হয় বেদনা। মা কে নাচক করে এই সম্মন্ধে,,,কিন্তু তিনি আতিকার কথা মানতে নারাজ।।,,,তিনি বেরিয়ে যেতেই আতিকা ফোন করে আহিল কে,,,সমস্ত টা শোনার পর সে বলে,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ১৮
“Come on Atika,,, It’s normal. দেখতেই আসছে তোমাকে ,বিয়ে তো আর হয়ে যাচ্ছে না।Take it easy.”
আহিল এর এরকম হেয়ালি পূর্ণ কথায় আতিকা বিস্মিত হয়,,, কষ্ট যেনো শত গুণ বেড়ে যায় তার। ফোন কেটে দিয়েই বিছানায় শুয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে।
