এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪২
আসিফা খান
চারিপাশে খুশির আমেজ। নানান ফুলে সাজানো হয়েছে হোসেন বাড়ি। চারিপাশে আলোয় আলোয় আলোকিত। হাসির গুঞ্জন, ব্যাস্ততার বাণী, হরেক রকম খাবারের মৌ মৌ সুঘ্রাণে মাতোয়ারা চারি পাশ।। আজ ইয়ানা আর রিফাত এর রেশিপশন। শত বাঁধার অতিক্রম করে আজ এই সমাহার। বিশেষ আয়োজন। আজ আনন্দে আত্মহারা পরিবারের সবাই। তারাদের চাদরের তলে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষারত রিফাত। তর সইছে না তার। ইয়ানা কে দেখিনি দুই দিনের বেশি। দাদুর হুকুম ছিল, রেশিপশান এর আগে ইয়ানা কে সে দেখতে পারবে না। তাই দাদুর গিফট করা ফ্ল্যাটে থেকেছে রিফাত এত দিন।
খোলামেলা পরিবেশ। নজর ধাঁধানো ডেকোরেশন। স্টেজে দাড়িয়ে বাংবার হাত ঘড়ি দেখছে রিফাত। সাদা শার্ট, ডিপ সবুজ ব্লেজার সাথে প্যান্ট পরনে রিফাত এর। এক কথায় চমৎকার লাগছে তাকে। কোনো কল্পনার রাজ্যের পুরুষের ন্যায়। রিফাত এর আশেপাশে দাড়িয়ে আছে আহিল
,দানিশ,হাফিজ। রিফাত এবার উদ্বিগ্ন হয়ে মনে মনে সুধায়,,,,”অপেক্ষার প্রহরের সমাপ্তি করো ইয়ানা। আমি ভীষণ অধীর হচ্ছি।”
“ভাই সামনে তাকা।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
দানিশ এর কন্ঠ শুনে রিফাত সামনে তাকাতেই দেখলো তার মনের রানীর আগমনী দৃশ্য।। লাল কার্পেট এর উপর ধীর স্থির পদক্ষেপ তার। পরনে সাদা সবুজের মিশ্রণের ভারী গাউন, হিজাব এর উপর দিয়ে নেমে গেছে দোপাট্টা। হালকা সাজ তার,,অধরে লেপ্টে লাজুক হাসি। যেনো নমনীয় মেঘের টুকরো। রিফাত চোখের তৃষ্ণা নিবারণের চেষ্টায় মশগুল। তার হার্টবিট তেজী। কিছু দিনের দূরত্বে নাস্তানাবুদ তার অন্তর। আজ আসমানের চাঁদও যেনো ফিকে রিফাত এর উজ্জ্বল প্রেয়সীর কাছে। আগুন জ্বলছে দুই পাশেই। ইয়ানার ও অবস্থা একই রকম। ইয়ানার সঙ্গে হেঁটে আসছে আতিকা,আলেয়া, রুতবা। স্টেজে দাড়িয়ে থাকা বাকী পুরুষের নজর আপন প্রিয়তমা দের পানে স্থগিত। সান্নিধ্যে আসতেই রিফাত সদ্বংশীয় পুরুষের মত আপন হাত বাড়ায় তার প্রাণ এর চেয়ে সুন্দর প্রেয়সীর পানে। ইয়ানার হাত বাড়ানোর আগেই রুতবা বলে ওঠে,,,,
“না না দাভাই আজ এত সহজে তো ইয়ানা কে আপনার কাছে দেবো না।”
রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে। পাশ থেকে আলেয়া কোমড়ে হাত রেখে ভ্রু নাচিয়ে রিফাত কে বলে,,,”ইফ ইউ ওয়ান্ট আওয়ার সিস্টার,, পে আপ মিস্টার।”
আলেয়ার কথা উপস্থিত সবাই হেসে ফেলে। রিফাত মাথা ঝাকিয়ে বললো,,,”তো! কি লাগবে আপনাদের লেডিস।”
“বেশি না,,, ফিফটি থাউজেন্ড দিলেই হবে।”
আতিকার কথায় আহিল চোখ বড় বড় করে এগিয়ে এলো,,, আতিকার দিকে মিষ্টি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলে,,,”ম্যাডাম ৫০ হাজার কি গাছে ফলে!”
আতিকা খানিক লজ্জা পেলেও গোঁ বজায় রেখে সেও টান টান হয়ে বললো,,,” না স্যার,,, টাকা গাছে ফলে না,,এতটুকুও কি আপনি জানেন না!”
হাফিজ পাশ আহিল এর কাধে হাত রেখে দুঃখী কন্ঠে বললো,,,” যাহ,,,তোমার বউও আজ পাল্টি খেলো কিনা!”
“এটা মেয়েদের জন্মগত অভ্যাস রং বদলানো।”
দানিশ এর এহেন টিপ্পনীতে ক্ষেপে ওঠে রুতবা,,,”কিই,,কি বললে!”
শুরু হলো তর্ক। কথার মার প্যাচ। এদিকে রিফাত অতিষ্ঠ হচ্ছে। ইয়ানা ঠোঁট ফুলিয়ে তার দিকে তাকাতেই রিফাত এক ধমক দিলো আপন বালক দের। তার ইয়ানা অমূল্য পঞ্চাশ হাজার তার কাছে অতি মূল্যহীন ঠেকছে এই মুহূর্তে। রিফাত ফোন বের করলো। এত বড় এমাউন্ট এখন তার পকেটে নেই,,, দিতে গেলে মুঠোফোনের ইন্টারনেট সাইটের মাধ্যমে দিতে হবে।ফোন কিছু একটা করে তাহ রুতবা কে দেখিয়ে বললো,,,
“আশা করি এবার আপনারা আমার বউ কে আমার হাতে তুলে দেবেন।”
রুতবা দেখে রিফাত তার একাউন্ট এ পঞ্চাশ হাজার পাঠিয়ে তার ডিটেলস দেখাচ্ছে। তাহ দেখে রুতবা বেশ শব্দ করে হাসে। অতঃপর ইয়ানার নরম তুলতুলে হাত রিফাতের প্রশস্ত হাতের সমর্পিত করে বলে,,,”নিন আপনার বউ।”
রিফাত বেশ শক্ত করে ইয়ানার হাত চেপে ধরে। ইয়ানা কে স্টেজে উঠতে সাহায্য করে সে। বধূ রূপে ইয়ানার ঘায়েল করা দৃষ্টিতে রিফাত এর ঊরু ঊরু অবস্থা। চোখের এক যুগ তৃষ্ণা নিয়ে যখন রিফাত ইয়ানার পানে তাকিয়ে সেই সময় ইয়ানা লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,,,”এই ভাবে তাকাবেন না প্লিজ।”
“কেনো?”
“সবাই আছে,,,”
“পরিচিত মানুষ,পরিচিত হাসবেন্ড তার পরেও এত লজ্জা আসে কোথা থেকে!?”
ইয়ানা এবার তাকায় রিফাত এর পানে। তার বিচক্ষণ স্বামী। তাদের কিছুটা দুর থেকে তাকিয়ে দেখছে পৃথিবীর অনন্য মানবী,,,যাদের মস্তিষ্কের ভাবনা চিন্তা আল্লাহতালা তাদের হৃদয়ের মাঝেই আবদ্ধ করে রেখেছে। ইয়াসমিন বেগম এর আঁখির কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু জল। বাবা হারা মেয়ের প্রতি তার সমস্ত চিন্তা থেকে যেনো আজ তিনি মুক্ত হলেন। আল্লাহ কাছে যেতেও তার কোনো সমস্যা নেই। আল্লাহ তার প্রতি যে অশেষ কৃপা করেছেন তাহ বুঝি মৃত্যুতেও শোধ করা যায়? নাহ যায় না। তিনি কিছু কেড়ে নিলে তার চেয়ে হাজার গুন বেশি ফিরিয়ে দেন। স্বামীর মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ভেঙ্গে পড়া নারী আজ সকাল সুখের অধিকারী। মিসেস আসফিয়া আপন বোনের সহিত দাড়ালেন। রক্তের টানে দূর থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছে বনের সুখের মাঝে দুঃখ তাইতো নিজেই এগিয়ে এলেন।
“আজ সুখের দিনেও বুঝি কেউ কাঁদে?”
অশ্রু সিক্ত নয়নে হেসে ফেললেন ইয়াসমিন বেগম চোখের পানি আড়ালে মুছে কিঞ্চিত ঠোঁট নাড়িয়ে বললেন,,,”সুখের তেজে চোখ ভিজে গেছে। আজ উনি হলে কি যে খুশি হতেন আল্লাহ জানে।”
“তোর উনি হলে তোর সুখের ভাগ কমে যেনো তখন সুখের ঠেলায় আর কাঁদদে পারতিস!?”
দুই জনের হাসলো এই কথায়। মিসেস আসফিয়া আবার বললেন,,,”ইয়ানার জন্য তুইই ওর বাবা তুইই ওর মা। তোর মনের মধ্যে গেঁথে যে মানুষ সে ঠিকই তোর খুশি উপলব্ধি করতে পারছে।”
“বাবা হওয়ার কর্তব্য পালন করতে পারলাম আর কই! আমার যে সে সামর্থ্য নেই।”
“বাজে বকা বন্ধ কর। নিজের সঞ্চয়ের সবটা দিয়েছিস তুই,,,রিফাত এর হাজার বারণ তুই শুনিসনি।”
“ছেলেটা কে আমি চিনি,,,জোর করেছি তাই নিয়েছে নাহলে ওর কথাই শেষ হতো।”
এইবার দুইজনেই স্টেজের দিকে তাকালো। নজর ভরে দেখলো দুই হাস্যোজ্বল দুই নর নারীকে। চিত্ত ঠান্ডা হয় দুই মায়ের। কেমন হেসে কথা বলছে সবার সাথে,ক্যামেরা ম্যান বন্দী করছে সেই সব মুহূর্ত তার আলোকচিত্রগ্রহণযন্ত্রে।
“মাশা- আল্লাহ যেনো কারোর নজর না লাগুক। সব সময় যেনো তারা এমনি থাকে,,,ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।”
“আমীন।”
ইয়াসমিন বেগম এবং মিসেস আসফিয়া এগিয়ে যায় স্টেজের দিকে। মায়েদের আসতে দেখে রিফাত এগিয়ে এসে দুই মা কে হাত বাড়িয়ে স্টেজে উঠতে সাহায্য করে।। ইয়াসমিন বেগম নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে একটা দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়ির বক্স বের করে অতঃপর সেটা থেকে ঘড়ি বের করে রিফাতের হাতে পরিয়ে দিতে দিতে বলে,,,
“এটা তোমার শশুর আব্বুর তরফ থেকে। ইয়ানা যখন পেটে ছিল তখন তার ইচ্ছা পোষণ করে বলেছিল,,,মেয়ের বরকে একটা দামি ঘড়ি গিফট করবো, যেন সময়ের সাথে সাথে আমাদের মেয়ের প্রতি তার দায়িত্ব, ভালোবাসা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়।”
রিফাত শোনে সবটা। বিষাদে চেয়ে যায় হৃদয়। রাজকীয় সোফায় বসে থাকা ইয়ানা মায়ের কথায় ফুপিয়ে উঠে। কান্নার শব্দে চমকে উঠে রিফাত।এগিয়ে যেতেও থেমে যায়।নিজেকে সংযত করে ইয়াসমিন বেগম এর দিকে তাকিয়ে আশ্বাস কন্ঠে বলে,,,”কখনোই এই ভরসার ভাঙ্গন ঘটবে না খালামা। আমার সবটা শুধু ওর জন্য।”
মিসেস আসফিয়া ইয়ানার পাশে বসে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলে,,,”কাজল ঘেঁটে যাবে,,,রিফাত ভুত ভেবে পালাবে তখন ভালো লাগবে?”
“আন্টি মা,,,”
কান্নার মাঝেও অভিযোগের সুর ইয়ানার। ইয়াসমিন বেগম এগিয়ে মেয়ের কপালে চুমু এঁকে বলে,,,”কাদে না মা,,,বাবা মা না থাকলেও তাদের ভালোসাবা থেকে আল্লাহ কখনোই বঞ্চিত করে না। তাদের দোয়া,ভালোবাসা ছায়ার মতো পাশে থাকে।”
ইয়ানা মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে।কিছুক্ষন চুপ থেকে মাথা তুলে মিষ্টি করে হেসে আবদার করে বলে,,,”তোমার সাথে ছবি তুলবো।”
“তুলবো,,,”
তারপর শুরু হলো মা মেয়ের ছবি তোমার পর্ব। তারপর সবাই এক সাথে। সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করে সবাই।এদিকে ইব্রাহিম বেগম তার ডাইরি এবং কলম নিয়ে বসেছে কোলাহলের এক কোণে। যখনই কোন সুন্দরী কম বয়সি মেয়েদের দেখে তখনই তাকে ডেকে ইন্টারভিউ নিচ্ছে। নানান রকম প্রশ্নের মাঝে তাদের নাম্বার চেয়ে নিচ্ছে। এক নাতির দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হলেন তিনি কিন্তু তার কাঁধে রয়েছে আর এক নাতি হাফিজ। দুই নাতকে কখনো তিনি আলাদা চোখে দেখেননি। রিফাতের প্রতি তার ভালোবাসা অন্যরকম কারণ প্রথম দাদু হবার স্বাদ রিফাত, কিন্তু হাফিজের প্রতি তার যে ভালোবাসা কম তাই কিন্তু একদমই নয়।।
“তোমার নাম কি মামনি।”
“জ্বী রায়মা।”
“বাহ্ বাহ্ ভালো নাম,,,কিসে পড় তুমি।”
“জ্বী নাইন এ,,”
ইব্রাহিম সাহেব এবার কিছুটা চশমা নামিয়ে ভালো করে মেয়েটার দিকে তাকালেন,,নাইন পড়ুয়া মেয়ে তো তাকে মনে হচ্ছে না। প্রশ্ন টা করেই ফেললেন,,,”কিন্তু মামনি তোমায় দেখে তো নাইন এর শিক্ষার্থী লাগছেনা!”
“আসলে আমি,,,নাইনে তিন বার ফেল এই নিয়ে চতুর্থ বার পড়ছি এবার নিশ্চয়ই আমি পাশ হয়ে যাব।”
সুন্দরী মেয়ের মুখে এই কথা শুনে ইব্রাহিম সাহেব ভ্যাবাচেকা খেলেন,,,”হুর হুর,,,কি আজব। যাও যাও তুমি,,, ফেলটুশ।”
মেয়েটা মুখ ভাঙিয়ে চলে গেলো। পাশ থেকে স্বশব্দে কারোর হাসির আওয়াজ পাওয়া গেলো। ইব্রাহিম সাহেব পিছে ঘুরতেই দেখলো হাফিজ পেট চেপে হাসছে। ঢুলু কদমে এগিয়ে এসে দাদুর পাশের চিয়ারে ধপ করে বসে বললো,,,”এই বয়সে এসেও দাদু! ইশ দাদী নিশ্চই উপর থেকে তোমায় গরম চোখে দেখছে।। দেখা হলেই খুন্তি পেটা।”
“চুপ,,চুপ কর হতরছারা। মেয়ে দেখছি তোর জন্য,,,তোর বয়সে আফতাব আমার কোলে ছিলো আর তোর বাপ তোর দাদির পেটে।”
“আল্লাহ,,,কি ফাস্ট ছিলে তুমি দাদু,,, নটি বয়।”
“দূর হো,,,পাজি ছেলে।”
হাফিজ বুঝি থামে! সে দাদু কে খোঁচাতে আরো নিচু কন্ঠে বলে,,,”তাহ দুই ছেলের পর থেমে গেলে কেনো! এখনও যা তোমার দম তাতে মনে হয় ডজন খানেক ছেলে মেয়ে তোমার জন্য ডাল ভাত।”
দাদু তেতে উঠল। নাতির পিঠে দিলো এক চাপড়। জ্বলে উঠলো সেথায়। হাফিজ ককিয়ে ওঠে,,,বলে,,,”আঃ দাদু,,,এরকম মারলে তো বিয়ে হওয়ার আগেই আমি শেষ।”
দাদু এবার কিছু একটা ভাবলেন,,,অতঃপর হাফিজ এর কান টেনে বললেন,,,”কেউ আছে তোর!থাকলে বল বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হই আমি।”
হাফিজ এবার কিঞ্চিৎ হাসলো। দূরে সামিয়ার সাথে খেলায় মত্ত আলেয়ার দিকে চেয়ে থেকেই বললো,,,”আছে একটা দুষ্টু,,,বলবো সময় হলে। আপাতত নিজের জন্য খোঁজো কাওকে পছন্দ হলে আমায় বলো আমি দায়িত্ব নিয়ে তোমার দ্বিতীয় বিয়ে দেবো।”
কথাটি বলেই চোখ টিপ মারল হাফিজ। দৌড়ে পালালো সেখান থেকে।এদিকে আতিকা ভিডিও করছে আশেপাশের হুট করেই ক্যামেরার সামনে আহিল কে দেখে চমকে উঠে ফোন নামায়। ভ্রু কুঁচকে বলে,,,
“এই ভাবে ভূতের মত কেউ আসে?”
“এরকম হ্যান্ডসাম ভুত এর আগে দেখেছো?”
আতিকা ভেঙচি কেটে বললো,,,”কোথায় হ্যান্ডসাম! রিফাত ভাইজান কে ছাড়া তো আর কাউকে দেখছি না।”
“তাই না!!তাহলে চলো আরো কাছ থেকে দেখাই।”
আহিল আতিকার হাত টেনে নিয়ে গেল কিছুটা অন্ধকার এর দিকে। এই জায়গায় লাইটিং নেই বললেই চলে। আলোক রশ্মির ছিটে ফোঁটায় মৃদু উজ্জ্বল। আহিল দেখে পার্পেল ড্রেসে আতিকা কে একদম ল্যাভেন্ডার ফুল লাগছে। আহিল এর চোখ জুড়িয়ে এলো। হাতের মাঝে থাকা আতিকার হাত চেপে ধরে নিজের সান্নিধ্যে নিয়ে আসতেই আতিকা মৃদু স্বরে বলে,,,”ছাড়ুন কেউ দেখে ফেলবে।”
“ফেলুক। আমরা গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড না যে দেখে নিলে অসুবিধায় পড়ে যাব।”
আতিকা ঠোঁট গোল করে শাস ছাড়ে। মাথা উঠিয়ে আহিল এর চোখে গাঢ় দৃষ্টি মেলে বললো,,,”পাঁচ সেকেন্ড ভালো করে দেখে নিন”
আহিল ভ্রু কুঁচকে বলে,,,”মাত্র পাঁচ সেকেন্ড!”
“জ্বী,,,”
“বান্ধবীর বিয়ের জন্য বর কে পাত্তা দিচ্ছো না তো,,,সব সুধে আসলে অসুল করবো আমি।”
আতিকা ঠোঁট চেপে হাসে। অতঃপর সিরিয়াস ভঙ্গিমায় বলে,,, “আপনার পাঁচ সেকেন্ড শুরু”
আহিল এবার অস্থির হয়। কপাল ঘামে তার,,,প্রিয়তমার লিপস্টিকে সজ্জিত গোলাপের পাপড়ির ন্যায় অধর টানছে বিশাল। আহিল নজর বুলিয়ে দেখে তার চারিপাশ। মানুষের আনাগোনা নেই দেখেই হাতে চাঁদ পায়। হুট করেই আতিকার কোমর আঁকড়ে এগিয়ে যায় ঠোঁটের দিকে,,,আতিকা আহিল এর কর্ম বুঝেই আটকায়। চাহনি দৃঢ় করে বলে,,,
“আহিল এখন না।”
আহিল বুঝি শোনে তার কথা!! সে আপন মনে এগিয়ে যায়। আতিকা এবার আহিল এর মুখ চেপে ধরে তাকে দূরে ঠেলে দিতে দিতে বলে,,”আহিল প্লিজ,,, একটু বুঝুন। এটা ঠিক সময় নয়,,,প্লিজ।”
“জানো কতটা ধৈর্য নিয়ে দিন পার করেছি!”
“জানি আমি।”
“তাহলে বাঁধা কিসের?”
“লিপস্টিক ঘেঁটে যাবে আমার।”
“ঘেঁটে লেগে যাক! লিপস্টিক পেটে যাবে তো আমার।”
আহিল এর অধর ছুঁই ছুঁই প্রিয়তমার অধরের সহিত। ঠিক সেই সময় আহিল এর বুকে ধাক্কা দেয় আতিকা। তার ভয় করছে,,যদি কেউ দেখে নেয় তাদের এই অবস্থায় তাহলে কি লজ্জায় না পড়বে তারা।
“আহিল লিভ,,,প্লিজ”
আহিল এবার এক ঝটকায় তাকে ছেড়ে দেয়। চোখে মুখে রাগ তার স্পষ্ট। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আতিকার দিকে তাকিয়ে বলে,,”ওকে ফাইন,,,করছি না কিছু। খুশি!”
আতিকা স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কি আহিল কে রাগিয়ে তুললো! আহিল চলে যেতে নিলেই তার হাত টেনে ধরে বলে,,,”আহিল,,,”
“ছাড়ো। পাঁচ সেকেন্ড অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। যাও,,,”
আতিকার চোখ ঠেলে পানি আসতে চায়। আহিল ওর হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে হন হন করে চলে গেলো।
“মিস সুন্দরী আপনার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে?”
অচেনা কারোর কণ্ঠে চেতনা ফেরে আলেয়ার। সে এতক্ষণ একধ্যানে কিছু ভাবছিল। কি ভাবছিল সেটা তার জানা নেই কিন্তু কারোর কন্ঠে সে প্রচুর চমকিত হয়েছে তাহ তার মুখভঙ্গিমা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। পিছন ফিরে তাকাতেই দেখা মিলল এক অচেনা যুবকের,, পরিপাটি ভাবে নিজেকে সাজানো শ্যামলা এক যুবক। তার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আলেয়া চেনার চেষ্টা করল মানুষটিকে কিন্তু তার মস্তিষ্কের কোন জায়গা থেকেই যুবকদের সনাক্ত মিলল না। তাই সে নিজেও হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে বলল,,,”জ্বী বলুন।”
যুবকটি যেন আলেয়ার এরকমই কোন এক কথার অপেক্ষায় ছিল। আলেয়ার দিকে আরো দুই কদম এগিয়ে এসে মাথা চুলকিয়ে ভীষণ গভীর ভাবে কিছু মনে করার চেষ্টার ভঙ্গিমা করে বললো,,,”মিস,,, হোয়াট,,!”
“আলেয়া।”
আলেয়া ঝটপট নিজের নাম বলল । যুবকটা এবার বিস্তার হাসলো। দাঁতের উপর দাঁত থাকার দরুন হাসিটা চমৎকার তার। আলেয়া শুধুই দেখল। ভালো লাগলো। কেন ভাল লাগল সেটা তার জানা নেই।হয়তো কিশোরী বয়স টাই এমন। হুট করেই অবাঞ্ছিত কিছু মনে ধরে যায়।
“আহ মিস আলেয়া,,,সুন্দর নাম।”
“আপনি কি আমায় চেনেন?”
“উম,,,চিনি আবার চিনি না। চিনতে কতক্ষন!”
“কিন্তু আমি অচেনা কারোর সাথে কথা বলি না,,, হাঁপানি রোগী জানতে পারলে আমায় বকা দেবে।”
আলেয়ার উদাস কণ্ঠ শুনে ছেলেটি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,,,”হাঁপানি রোগি আবার কে?”
“আমার চাচুর ছেলে।”
“ওহ! আমার নাম সাইফ শেখ। মাস্টার্স করছি. আর এক বছর বাকি কমপ্লিট হতে। বাদ বাকি ধীরে ধীরে কথা বলতে বলতে আমরা একে অপরকে জেনে যাব,, আপাতত এটুকুই ঠিক আছে তাই না!”
আলেয়া মুখ চেপে হাসলো তারপর বললো,,,”হুম,, কিন্তু আমরা একে অপরকে জেনে কি করব!”
“আই লাভ ইউর ইনোসেন্টনেস। গুড কোশ্চেন যে, আমরা একে অপরকে জেনে কি করব! উম,,, আমরা ঘুরতে যেতে পারি, কথা বলতে পারি, অনেক কিছু শেয়ার করতে পারি।”
“কিন্তু আমি তো হাঁপানি রোগীর সাথে ঘুরতে যাই, কথা শেয়ার করি, তার জন্য আমার অন্য কাউকে তো লাগবে না।”
“কিন্তু ও তোমার কাজিন,,, লাইফে এমন কাউকে দরকার যার সাথে তুমি জীবন কাটাতে পারবে।”
আলেয়া কথাটি শুনল। মনের কোন এক জায়গায় কথাটি তীব্রভাবে আঘাত করল। সামনের যুবকের সাথে তার কথা বলতে ভালো লাগছে। আলেয়া চাইছে এরপরেও যেন তার সাথে তার কথা হোক। কিন্তু এই অনুভূতি কেন! এই অনুভূতির নাম কি? আলেয়ার কাছে এটা একদম নব। এরকম কিছু অনুভব এর আগে সে করেনি।
“কি হচ্ছে এখানে।”
চিরচেনা কন্ঠ। সামনে তাকাতে দেখল হাফিজ দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার অস্বাভাবিক লাল। হাত কেমন কাপছে তার। আলেয়া গোপনে ঢোক চিপলো। কিছু বলার পূর্বেই সাইফ বলে উঠলো,,,
“উই আর জাস্ট টকিং। আপনি?”
“হাফিজ, হাফিজ হোসেন। আলেয়া আয় তো একটু আমার সাথে।”
সাইফ কে কিছু বলার সুযোগ পর্যন্ত দিল না হাফিজ। আলেয়ার হাত টেনে ধরে সে বড় বড় পা ফেলে নিয়ে গেল নিজের সাথে। হাফিজের কদমের সাথে কদম মেলাতে পারছে না আলেয়া সে এক প্রকার ছুটছে। কোনো এক ফাঁকা রুমে ঢুকে ধারাম করে দরজা দিলো হাফিজ,,আলেয়া কেপে উঠলো।
হাফিজ রক্ত লাল চোখের প্রখর চাহনি আলেয়ার দিকে নিক্ষেপ করে চিবিয়ে বললো,,
“বয়স বাড়ছে,, আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে! তা বলে যাচাই করবি না সামনের মানুষটা কে! সবার সাথে এরকম হেসে কথা বলতে হবে কেন? কেন সবাইকে নিজের নাম বলতে হবে?”
“এরকম করছ কেন তুমি হাঁপানি রোগী?”
“উত্তর দে,, ওরকম সুন্দর করে কথা বলছিলি কেন? তাকিয়ে -ছিলি কেন তুই তার দিকে!”
“ছেলেটা আগে কথা বলতে এসেছিল?”
“তুই বলতি না।”
“কেনো বলতাম না! আমার সব জিনিসের তোমার হস্তক্ষেপ কেন? তুমি কি কর আমি তো কখনো তোমাকে প্রশ্ন করি না!”
আলেয়ার কন্ঠ তেজী। আজ প্রথমবার হাফিজের সাথে সে জোরালো কন্ঠে কথা বলল। হাফিজ আলেয়ার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটা তাকে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। হাফিজ এবার কিছুটা নরম হলো,, আলেয়ার দিকে এগিয়ে তার স্নিগ্ধ চেহারার আদল নিজের দুই হাতের মাঝে নিয়ে বলল,,,
“তুই বুঝিস না কেন আল ু? কেন বুঝিস না তুই!”
“কি বুঝবো?”
“আমার মনের কথা, আমি কি চাই ,আমি কি ফিল করি, তুই কেন বুঝিস না তুই এতটাও অবুঝ নোস!”
“ছাড়ো আমাকে হাফিজ ভাই। আমার জীবনের মাঝে তুমি একটা দেওয়াল সৃষ্টি করেছ। আমি কোথাও যেতে পারবো না তোমায় না বলে, কারো সাথে কথা বলতে পারব না। কেন? কেন তুমি আমার সাথে এরকম করো ? আমার কি নিজের জীবন নেই! আমার কি কোন ইচ্ছা নেই! সব জিনিসে তোমার কেন হস্তক্ষেপ?”
হাফিজের হাত এক ঝটকা সরিয়ে দিল। হাফিজ অবাক। কত বছর পর আলেয়া তাকে ভাই সম্বোধন করল।। আলেয়া আবারও তেজী কণ্ঠে বললো,,,
“প্লিজ আমাকে নিজের মতো ছেড়ে দাও।”
কথাটি বলেই আলেয়া দ্রুতবেগে কদম ফেলে কক্ষ ত্যাগ করল। এদিকে হাফিজ বিস্মিত নয়নে চেয়ে রইল আলেয়ার যাওয়ার পানে। বুকের ভেতর ভারী ভাব স্পষ্ট। আজ নিজেকে বড়ই অসহায় লাগছে,,,তার মনে হঠাৎ করে জন্ম নেওয়া অঙ্কুর এখন এক বিশাল গাছে পরিণত হয়েছে। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে সেই গাছের আগা কেউ কেটে ফেলার চেষ্টা করছে। আলেয়ার জন্য জন্ম নেওয়া এই তীব্র অনুভূতি যখন হাফিজ অনুভব করে তখন নিজেই অবাক হয়,,, ওই চঞ্চল, অনন্য মেয়েটাকে ভালোবাসার মতো দুঃসাহসিকতা করেছে হাফিজ নামক এই যুবক।
ইয়ানা কে উসখুস করতে দেখে রিফাত নিচু কন্ঠে বলল,,,”কি হয়েছে? খারাপ লাগছে?”
“পানি,,,”
রিফাত ঝটপট ওয়েটারকে ডেকে পানির গ্লাস নিল অতঃপর নিজ দায়িত্বে ইয়ানা কে খাওয়াতে সাহায্য করলো। পানি খেয়েই তৃপ্তি সহকারে ইয়ানা বললো,,”আরাম।”
“ক্লান্ত লাগছে ?”
“কিছুটা।”
রিফাত মুচকি হেসে ইয়ানার হাত ধরে বললো,,,”কারুর সৌন্দর্যের তেজে আমি ভস্ম হয়ে যাচ্ছি,,,কেউ কি তাহ বুঝতে পারছে!”
ইয়ানা ঠোঁট কামড়িয়ে হাসে। লাজ ভিড় করে তার মায়াবী অননে। রিফাত ধমক দিয়ে বললো,,,”ঠোঁট কামড়ানো বন্ধ করো স্টুপিড। সেডিউস করার চেষ্টা করছো আমাকে?”
ইয়ানা দ্রুত সচেতন হয়।আঁখি জোড়া বড়ো করে বলে,,,”মোটেও না।”
রিফাত ত্যাড়া ভাবে বলে,,,
“তুমি পারবেও না।”
“কিইই?”
“এই সে সেডিউস করতে,,,তার আগেই লজ্জায় আধমরা হবে তুমি।”
রিফাতের কন্ঠে দৃঢ়তা। কনফিডেন্টে ভরপুর রিফাতের সুর শুনে ইয়ানার গায়ে লাগলো। সে চাইলেই রিফাত কে সে কাবু করতে পারবে। কিন্তু সেই সুযোগ কখনোই হয়নি তার। বলা বাহুল্য রিফাত দেয়নি। নিজেই এগিয়ে এসেছে এবং ইয়ানা কেও টেনে এনেছে। ইয়ানা জেদী কন্ঠে বলল,,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪১
“আমি পারবো।”
“পারবে না।”
“যদি পারি”
“দেখা যাবে”
ইয়ানা চুপ রয়। কথায় না কাজ করে দেখানে। মনে মনে সংঘটিত এক পরিকল্পনা করে ইয়ানা। কুটিল হাসে আড়ালে। আজ রাতে যদি সে রিফাত কে নাকানি চুবানি না খাওয়াতে পারে তাহলে সেও রিফাত ইয়ানা হোসেন নয়। লজ্জার বিসর্জন দিলো মনের আড়ালে। ইয়ানা ভুলে যাইনি সেই রেস্টুরেন্ট এর কথা,,,আজ সুদে আসলে অশুল করবে সব।
ইয়ানা এক পলক রিফাত এর দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়ায়,,,,” আপনার করুন চেহারা দেখবো আজ রাতে,,,আমায় চ্যালেঞ্জ করা!”
