কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৪
হামিদা আক্তার ইভা
তাহসিন দাঁড়িয়ে আছে ফরাজী বাড়ির সামনে।খানিকক্ষণ আগে সওদাগর বাড়ি থেকে মানুষ এসেছিলেন।জানতে চাইছেন তারা কবে ফিরবে বাড়ি।তাহসিন স্পষ্ট কিছু বলেনি,তবে বেশিদিন সে এখানে থাকবে না।ফিরোজা বেগমের মৃ’ত্যুর আজ ৪দিন।কাল মধুর বিয়ে ওয়াহিদের সাথে।মধুকে বিয়ে নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে আপত্তি করেনি।বাবা যেখানে রাজী,সেখানে তার কথা বলার কিছু নেই।
তাহসিন বাড়ির ভেতর ঢুকতেই ওয়াহিদ পুকুর পাড় থেকে বলল,
“এইযে দুলাভাই!এইদিকে আসেন।”
তাহসিন কপাল কুঁচকে গিয়ে সিঁড়িতে বসল।ওয়াহিদ বলল,
“কাল এত ভয় পেয়েছিলাম জানেন?”
তাহসিন বলল,
“কীসের ভয়?”
“আরে ওইযে ঢাকা গেলাম না?সুখী মেয়েটা এত ডেঞ্জারাস।আমার মতো ভোলা-ভালা ছেলেকে পেয়ে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলছিল।”
“কী বলছিল?”
ওয়াহিদ শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে একবার ঘরের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আরে ওইযে,বুঝতে পারছেন না?”
“আপনার তো লজ্জা হওয়া উচিত।আমার শালির হবু জামাইকে অন্য এক নারী ছুঁয়েছে।”
ওয়াহিদ হতভম্ব হয়ে বলল,
“পাগল?আমাকে ছুঁবে কেন?আমি তো তার ধারের কাছেও যাইনি।”
“কী করে বিশ্বাস করি?”
“বিশ্বাস না করার কী আছে?”
“প্রমাণ আছে,আপনি যে কিছু করেননি?”
ওয়াহিদ মুখ কালো করে বলল,
“আমি ভালো ছেলে।বউকে ছাড়া কারোর দিকে নজর দেই না।”
“তাহলে তো আপনার নজর খারাপ।”
“আশ্চর্য!নজর খারাপ হবে কেন?”
তাহসিন লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“কারণ আপনি এখনও অবিবাহিত।আমার শালি এখনও আপনার বউ হয়নি।”
ওয়াহিদ বিরক্ত হয়ে দাঁত চেপে বসে রইল।তখন ফাহাদ গুটি গুটি পায়ে ওদের নিকট এগিয়ে এসে বলল,
“ওও দুলাবাই!”
তাহসিন পাশে তাকায়।ফাহাদের ঘুমঘুম মুখ দেখে কাছে টেনে কোলে বসায়।ফাহাদ তাহসিনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে,
“মা কুই?আমি মা যামু।”
তাহসিন ফাহাদের গাল টেনে দিয়ে বলে,
“মা আছে তো!তোমার আম্মা চাঁদের বুড়ির দেশে গেছে।”
ফাহাদ অবাক হয়ে বলে,
“তাই?আমারে নিলু না কেন?”
“তোমার জন্য উপহার আনতে গেছে সে।”
“সুত্যি?”
তাহসিন মাথা নাড়ায়।ওয়াহিদ তাকিয়ে থাকে বাচ্চাটার দিকে।বাচ্চাটা জানেও না তার মা আর নেই।কী অদ্ভুত দুনিয়ার নিয়ম।
বাড়ির পেছনে ময়ূরীদের একটা ছোট সবজি বাগান আছে।ফিরোজা বেগম কাঁচা সবজির বাগান করেছিলেন।মধু আর ময়ূরী সেখানেই এসেছে খানিকক্ষণ আগে।এখান থেকে তাহসিনদের দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।দুই বোনের মুখে একটা কথাও নেই।এই চারদিনে দুটো কথা মুখ ফুটে তারা বলেছে কিনা সন্দেহ।নীরবতা ভেঙে ময়ূরী বলল,
“তুই কী আব্বাকে রেখে মামার বাড়ি যাবি?”
মধু বলল,
“উনার তো কাজ শেষ হয়নি।সে অব্দি হয়তো এখানেই থাকতে হবে।”
“তাহলে আব্বার কী হবে?আব্বা এখানে একা কী করে থাকবে?”
মধু উত্তর দিতে পারল না।চুপটি করে বসে রইল।কয়েকদিনেই দুই বোনের বেহাল অবস্থা হয়েছে।কেনোই বা হবে না?নিজেদের যত্ন নেয়ার সময়টুকু তাদের আছে?মা থাকলে বোধহয় এসব কিছুই হত না।
চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।মেম্বার বাড়ির উঠোনে চলছে বাড়ির মানুষদের সাথে আলাপ-আলোচনা।হঠাৎ বাড়ির দরজায় কড়া শব্দ হলো।রাজুর আম্মা গিয়ে দরজা খুলে দিতেই কপাল কুঁচকে এলো মেম্বারের।বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওয়াহিদ,তাহসিন এবং আরও একজন অফিসার।মেম্বার উঠে দাঁড়ালেন।তাহসিনরা প্রবেশ করল ভেতরে।রাজু দাঁত চেপে চেয়ারে বসে আছে।
“কী ব্যাপার তাহসিন?পুলিশ নিয়ে হঠাৎ আমার বাড়িতে?”
তাহসিন মৃদু হেসে এগিয়ে এলো।বসল ওয়াহিদ আর সেই অফিসারকে নিয়ে।বলল,
“অফিসারের কাজ ছিল আপনার সাথে।”
“কী কাজ?”
ওয়াহিদ বলল,
“আপনার নামে বেশ কিছু রিপোর্ট আছে।”
মেম্বার মুখ গম্ভীর করে বললেন,
“যেমন?”
“গ্রামের উন্নয়নের জন্য এখন অব্দি প্রায় কয়েক কোটি খানিক টাকা এসেছে সরকার থেকে।গ্রামের উন্নয়ন তো হয়নি,উল্টো গরিব মানুষদের জায়গা-জমি দখল করার অভিযোগ আছে আপনার উপর।”
মেম্বার মেকি হাসলেন।বললেন,
“উন্নয়নের কাজ দেখার দায়িত্ব আমার,করার নয়।”
ওয়াহিদ একটু ঝুঁকে এসও ফিসফিস করে বলল,
“কিন্তু টাকা তো আপনার পকেটেও এসেছে মেম্বার সাহেব।”
“আপনি আপনার সীমা ছাড়াচ্ছেন অফিসার।”
চিৎকার করে উঠলেন মেম্বার।তাহসিন ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে কপাল চুলকাল।ওয়াহিদ শান্ত গলায় বলল,
“১৯টা পরিবারের সকল জায়গা-জমি নিজের নামে করেছেন।ভুল বললাম?”
মেম্বার রেগে গিয়ে ওয়াহিদের শার্টের কলার ধরে বিশ্রী ভাষায় গালাগালি শুরু করলেন।ওয়াহিদ সাথে সাথে কাছে রাখা ব ন্দু ক মেম্বারের কপালে ঠেকিয়ে বলল,
“বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না।আমার কাছে অনুমতি আছে একদম উপরে পাঠিয়ে দেয়ার।”
মেম্বার শুকনো ঢোক গিলে ছেড়ে দিলেন ওয়াহিদকে।রাজুর আগে থেকেই রাগ ওয়াহিদের উপর।এখন যেন দ্বিগুণ হলো সেটা।সে কিছুটা রুষ্ট গলায় বলল,
“আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে?”
অন্য অফিসার হাতে রাখা ফাইল এগিয়ে দিল।রাজু সেটা হাতে নিতেই কিছুটা ঘাবড়ে গেল।তৎক্ষণাৎ ওয়াহিদ মেম্বারকে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে বের হয় বাড়ি থেকে।তাহসিন রাজুর ঘাড়ে হাত রেখে নিচু গলায় বলে,
“সাবধানে থেকো রাজু।এমন দিন আবার তোমার না আসে।”
মেম্বারকে থানায় এনে কাজ হলো না।ওয়াহিদ আশ্চর্য হচ্ছে সিনিয়র অফিসারদের কাজ দেখে।খানিকক্ষণ আগেই মেম্বার থানা থেকে বের হয়েছেন।বেরিয়ে যাওয়ার আগে অবশ্য হুমকিও দিয়েছেন তাকে।থানায় বারে বারে “নওমান তাহির” নামটা উচ্চারিত হচ্ছিল।মেম্বার ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এই নওমান নামের নতুন অফিসারটা ঠিক কে হতে পারে।এর আগেও তিনি এই নাম শুনেছেন।তখন প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি সময়।বড় বাজারের রিকশার গোডাউনে সামনা-সামনি বসে আছে মেম্বার এবং এক মধ্যবয়স্ক লোক।পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রাজু।
অপর পাশের লোকটা ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট রেখে বললেন,
“আমার স্বর্ণের পাচার প্রায় বন্ধের পথে মেম্বার।তুমি থাকতে এসব হচ্ছে কী করে?”
মেম্বার বললেন,
“গ্রামে নতুন নতুন অফিসার এসেছে শুনেছি।তাদের মধ্যে “নওমান তাহির” নামের অফিসারটার কারণেই এসব হচ্ছে।”
লোকটা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“নওমান তাহির?কে সে?তার জন্য আমার লস হয়েই যাচ্ছে।”
নওমান তাহির নামটা শুনে লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে বাতাসে মিশে গেল।রাজু লক্ষ্য করল,লোকটার চোখে একরাশ বিরক্তি জমে উঠেছে।
“খোঁজ নিয়েছ?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।
মেম্বার মাথা নাড়লেন,
“পুরোপুরি না।শুধু জানি সদ্য পোস্টিং।চুপচাপ টাইপের,কিন্তু হাত শক্ত।”
লোকটা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“এই চুপচাপ লোকগুলোকেই বেশি ভয় লাগে।বেশি কথা বলে না,কাজটা ঠিকই করে ফেলে।”
রাজু আর চুপ থাকতে পারল না।সে এগিয়ে এসে বলল,
“চাচা,আপনি চিন্তা করবেন না।এসআই কে আমি দেখে নিচ্ছি।”
“খোঁজ নাও সে কে?নতুন অফিসার এসেছে অথচ আমি চিনি না?”
আগামীকাল থেকে ময়ূরীর টেস্ট পরীক্ষা।বোরহান সওদাগর স্কুলে গিয়ে কথা বলে এসেছেন।ক্ষমতা দেখিয়ে ময়ূরীর পরীক্ষা বাতিল করেছেন।সে টেস্ট ব্যতীত এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।সব কিছুই চলছিল নিজ নিয়মে।ময়ূরী বিছানা করছিল ঘুমানোর জন্য।মধুর বিয়েটা হয়ে গেলেই হয়তো আবার তাকে ফিরতে হবে শ্বশুর বাড়ি।তাহসিন বলেছে সে ফিরে যাবে ঢাকা কিছুদিন পরেই।পুতুলকে এবার ময়ূরীর সাথে রেখে যাবে।তার এসএসসি শেষ হলে তাদের ঢাকা নিয়ে যাবে সাথে করে।
দরজায় শব্দ হলো হঠাৎ।ময়ূরী পিছু ফিরে দেখল,তাহসিন দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।
“বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
তাহসিন দরজা চাপিয়ে ভেতরে এলো।বসল বিছানায়।ময়ূরী বলল,
“আপনার কাজ হয়েছে?”
“কিছু এখনও বাকি আছে।”
“তারপরই বুঝি চলে যাবেন?”
“যেতে তো হবেই।আমার কাজ আছে না?কাজ না করলে সংসার চলবে কী দিয়ে?”
ময়ূরী তার পাশে বসল।বসে তাহসিনের একহাত মুঠোয় নিয়ে বলল,
“কী দরকার বলুন না?কোনো সাধারণ কাজ করা যায় না?আমার ভয় হয় আপনাকে নিয়ে।”
তাহসিন হেসে বাচ্চা বউয়ের মাথায় হাত রেখে বলে,
“আমার কিছু হবে না।শোনো মেয়ে,তোমার সাথে আমার সংসার শুরুই হলো সবে।বাকি জীবনটা তো এখনও পড়ে আছে।আমাদের ছোট একটা সংসার সাজানো এখনও বাকি।”
ময়ূরী মলিন হেসে বলল,
“যদি সেই সুযোগ না হয়?”
“হবে!সব হবে।”
তাহসিনের ছোট্ট একটা সংসার বউ-বাচ্চা নিয়ে।যেখানে ভালোবাসার সাথে নরম স্পর্শের মতো শান্তিও আছে।নিজের হাঁটু সমান এক কিশোরীকে বিয়ে করে প্রথমে আফসোস থাকলেও এখন মনে হচ্ছে সে সঠিক মানুষকেই কবুল করেছিল।যার কোনো চাহিদা নেই,আকাঙ্ক্ষা নেই,শুধু আছে একটুখানি ভালোবাসায় মুড়িয়ে থাকার ইচ্ছে।ওইটুকু দেয়ার সামর্থ তাহসিনের আছে।
ময়ূরীর চুল এলোমেলো দেখে তাহসিন বলল,
“এবার একটু নিজের দিকে নজর দাও।কী হাল হয়েছে তোমার দেখেছ?”
বলতে বলতে সে চিরুনি নিয়ে এসে বসল পাশে।ময়ূরী পা উঠিয়ে হাঁটু জড়িয়ে উল্টো ঘুরে বসল।সে জানে এখন তাহসিন খুব যত্ন করে অযত্নে পড়ে থাকা চুল গুলো যত্ন করে আঁচড়ে দিবে।তারপর সুন্দর করে বেণী গেঁথে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলবে,
“তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।”
হলোও তাই।আজ অনেকদিন পর ময়ূরী আলতো হাসল।এই মানুষটাকে বিয়ে করে একটা সময় অভিমান করে কারোর সাথে কথা বলেনি।জোর করে বিয়ে দিয়েছিল বলে আম্মা-আব্বার সাথেও রাগ করেছিল।কিন্তু আল্লাহ যে তার কপালে এমন একজন স্বামী লিখে রেখেছিলেন,সেটা সে কল্পনাও করেনি।
তাহসিন তখন ময়ূরীর ঠিক পেছনে।সে অনুভব করছিল কিশোরীকে।ময়ূরীর কথায় কিছুটা কপাল কুঁচকে এলো,
“আপনার কাজ শেষ হলে আপনি ঢাকায় চলে গেলে আমি থাকব কোথায়?”
“আমার বাড়ি কী তোমার বাড়ি নয়?তুমি তোমার বাড়ি থাকবে।”
“ওই বাড়ি আমি থাকব কী করে?”
“কেন পারবে না?”
“সব জানার পর কেউ আমার সাথে ভালো ব্যবহার করবে?”
তাহসিন মৃদু হেসে বলল,
“ভয় পাচ্ছ পাখি?জীবন পাড়ি দিতে গেলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়,লড়াই করতে হয়।”
“আপন মানুষের সাথে লড়াই করব কেমন করে?”
তাহসিন চুপ রইল।
বাইরে বাতাসের ঝড় বইছে।বাতাসের প্রখরতা তখন তীব্র।ওয়াহিদ এই গ্রামে ট্রান্সফার হয়েছিল ৩টা কেস সমাধান করতে।ইতোমধ্যে তার সব গুলো কাজই সম্পূর্ণ হয়েছে।কিন্তু ঢাকা থেকে নতুন SB টিম আসাতে তাকে তাদের সঙ্গ দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।এই কাজ গুলোও আশা করা যায় খুব শীঘ্রই শেষ হবে।
সে বাড়ির বাইরে চুপচাপ বসেছিল।খানিকক্ষণ আগেই বক্কর ফরাজীর সাথে তার কথা হয়েছে।মানুষটা একদম ভেঙে পড়েছেন।সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।আগামীকাল তার বিয়ে।মধুমিতা তার হবে।মুচকি হাসল সে।তখন মধু গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে গাছের নিচে ব্রেঞ্চে বসল তার পাশে।ওয়াহিদের ঘরের সামনে এই গাছটা।ওয়াহিদ এত রাতে মধুকে জাগ্রত দেখে বলল,
“জেগে আছিস যে?কাল না তুই বউ সাজবি?না ঘুমালে সুন্দর লাগবে?”
মধু কপাল কুঁচকে বলল,
“সাজতে যাব কেন?”
“আমার বউ সাজবি না?”
“কে সাজিয়ে দিবে?”
ওয়াহিদ লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“বিয়ের পর আমি সাজিয়ে দিব।যত্ন করব,ভালোবাসব,খাইয়ে দিব,ঘুম পাড়িয়ে দিব।”
“এইটুকুই?”
“আরও কিছু চাই?”
মধু হেসে মাথা নাড়ল।বলল,
“যদি আমাদের সংসার না হয়?”
“কেন হবে না?সংসার করার জন্যই তো তোকে বিয়ে করছি।”
মধু পা উঠিয়ে বসল সেখানে।হাঁটুতে মাথা রেখে নরম গলায় বলল,
“আমার মধ্যে আহামরি কিছু নেই।বাকিদের মতোই সাধারণ এক নারী।আপনি আমায় ভালো কেন বেসেছেন সেটাও আমি জানি না।তবে আপনার জানা উচিত আমি কেমন।আপনার মতো একজন মানুষের সাথে আমার যায়?”
“কেন যায় না?”
“আপনার আম্মা কিন্তু নারাজ হয়েছেন।”
“সে আমি বুঝে নিব।”
“পরে কিন্তু আমায় ছাড়তে পারবেন না।”
“ছাড়তে চাইও না।”
সেইরাতে তাদের মধ্যে এইটুকুই কথা হয়েছে।যখন মধ্যরাত হলো,পুরো গ্রাম মৃ’ত মানুষের মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল,তখন মধুর গোঙানোর হালকা শব্দ শোনা গেল বাড়ির গেটের কাছ থেকে।কয়েক জোড়া পায়ের মৃদু আওয়াজের সাথে সেই চাপা চিৎকার কারোর কান অব্দি পৌঁছাল না।কী হলো তার সাথে?কাদেরই বা পায়ের শব্দ ভেসে এলো সেখান থেকে?
গুনগুন করে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল মেম্বারের পুরনো বাড়ির পেছন থেকে।মেম্বারের একটা ছোট পুরনো দালান বাড়ি ছিল,যেটায় কেউ বসবাস করেন না।হলুদ লাইটের আপছা আলোয় মধুর মুখ বাঁধা অবয়ব দেখা যাচ্ছিল।সামনে রাজু চেয়ারে বসে সিগারেট ধরিয়েছে।পুলিশ আন্দাজ করতে পারবে বলে একটা বুদ্ধিও এঁটেছে মনে মনে।যাতে সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না।
রাজু মধুর ভীতু আঁখি পানে তাকিয়ে বলল,
“কাঁদছ কেন সোনা?কষ্ট হচ্ছে?”
মধু আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছোটার জন্য,কিন্তু তা সম্ভব নয়।রাজু একটু এগিয়ে এসে মধুর চোয়াল চেপে ধরে বলল,
“তোকে বিয়ে করে আনতে চেয়েছি না আমি?বল?তোর বাপ বারণ করল কেন?ওই পুলিশ,কু ত্তার বাচ্চার সাথে পিরিতে মজেছিস তুই?তোর বিয়ে করার এত শখ?”
রাজু আশেপাশে চোখ বুলিয়ে পুরনো ছোট্ট টেবিলের উপরে ধারবিহীন ছু’রি পেয়ে সেটা নিয়ে নিকটে এগিয়ে এলো।ভয়ে মধুর শরীর অবশ হয়ে আসছে।গোঙানোর শব্দ পুরো ঘরটাকে মাতিয়ে রেখেছে।রাজু সেই ছু’রি টা মধুর হাতে দাবিয়ে দিতেই মেয়েটা ছটফট শুরু করল।হাত থেকে গল গল করে ঝরছে র ক্ত।রাজু দাঁত চেপে গালাগালি করছে বিশ্রী ভাষায়।মধুর মনে হলো রাজু একটা মানসিক রোগী।যা ইচ্ছে করছে সেটাই করছে।হাতের যন্ত্রণায় শরীর অবশ হয়ে আসছে তার।সে ভেবেছিল রাজু হয়তো খারাপ কিছু করবে তার সাথে,কিন্তু না!রাজুর কাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে সে নিজ হাতে খু ন করার জন্য এত আয়োজন করেছে।মেয়েটা ভীতু চোখে একবার ভাঙ্গা দরজার দিকে তাকাল।খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছটফট করতে শুরু করল।রাজু নিজের মাথার চুল টেনে ধরে চিৎকার করে বলল,
“তোর জন্য তোর ছোট বোন আমায় থাপ্পড় মেরেছিল।সব ভুলে গেছি ভেবেছিস?তোকে মেরে তারপর তোর বোনকে মারব।”
প্রায় সাথে সাথে রাজুর ডান পায়ের হাঁটু বরাবর দুটো গুলি লাগল।তীব্র শব্দে ভয়ে আঁতকে উঠল মধু।রাজু হাঁটু ভেঙে পড়ে যেতেই বাইরে থেকে ভাঙা দরজা ভেঙে ভেতরে এলো দুজন লোক।
রাজু হাঁটু ভেঙে মেঝেতে লুটিয়ে পড়তেই হাত থেকে ছু’রিটা ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল। যন্ত্রণায় আর আতঙ্কে তার চিৎকার পুরো দালান কাঁপিয়ে তুলল। ভাঙা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল দুজন অফিসার।
“হাত উপরে! নড়বি না!” অফিসারের গলা বজ্রের মতো গমগম করে উঠল।
রাজু ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। সঙ্গে সঙ্গে অন্য লোকটা এগিয়ে এসে মধুর কাছে ছুটে গেল। দ্রুত তার হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে বলল,
“ভয় পেয়ো না,মধুমিতা। আমরা এসে গেছি।”
মধুর চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। শরীরটা কাঁপছে অঝোরে। বাঁধন খুলতেই সে হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। র’ক্তে ভেজা হাতটা বুকে চেপে ধরে শুধু মাথা নাড়ল—বাঁচার ইশারায়।বাইরে থেকে আরও দুজন অফিসার আসতেই রাজু গলা ছেড়ে চিৎকার করার আগে টিম লিডার চোয়াল বরাবর থাপ্পড় মারতেই জ্ঞান হারাল সে।নওমান তাহির ছিল সে।
সে পকেট থেকে রুমাল বের করে তৎক্ষণাৎ তার হাতে বেঁধে ফেলে।মধু দুর্বল শরীরটা নিয়ে সামনের মানুষটার দিকে তাকায়।কম্পিত ঠোঁট নাড়িয়ে একটা বাক্য আওড়ায়।নওমান মাথা নাড়িয়ে আরেকজন অফিসারের সাহায্য নিয়ে ওকে নিয়ে বের হয় সেখান থেকে।
ফরাজী বাড়ি সাতসকালে এহেন ধরনের সংবাদ সবার কানে পৌঁছাতেই হতবাক সকলেই।মধু বাথরুমে যাওয়ার সময় এই ঘটনা ঘটেছে।ওয়াহিদের ঘুম ভাঙতেই সে প্রায় পাগল হয়ে হসপিটালে ছুটেছে সবাইকে নিয়ে।মধুকে বাড়ি নিয়ে আসা হলো বেশ বেলা হওয়ার পর।মধুর ঘরে তখন সবাই উপস্থিত।ইতোমধ্যে জানতে পারল রাজুকে এরেস্ট করা হয়েছে।মেম্বার সকাল সকালেই পাগল হয়েছেন ছেলেকে খুঁজে না পেয়ে।রাজুর সাহায্য সে দুজন করেছিল,তাদেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।সেখান থেকে কোনো ফোন কলও করা হয়নি।
মধু বসে ছিল বিছানায়।ওয়াহিদ ওর অন্যহাত শক্ত করে ধরে রেখেছে।সে পাগল হয়েছে এখনি সে মধুকে বিয়ে করবে।বক্কর আপত্তি করেননি বরং খুশি হয়েছেন এতে।ময়ূরীর মুখ থমথমে।কীযে হচ্ছে জীবনের সাথে কিছুই বুঝতে পারছে না।১১টার দিকে কাজী এলেন।মধু ঠোঁট উল্টে কেঁদে যাচ্ছে তখনও।তার গায়ে পুরনো একখানা শাড়ি জড়ানো ছিল।ওয়াহিদ বিয়ের আগে মধুর কাছে এলো।ঘরে ফাহাদ,পুতুল,ময়ূরী সবাই ছিল।সে সবাইকে উপেক্ষা করে মধুর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“তোকে আমার বউ সাজাব আজ।কাঁদবি না একদম।”
ওয়াহিদ লাল টুকটুকে একটা শাড়ি কিনে আনলেও মধু হাতের ব্যথায় সেটা পরতে পারল না।এতে অবশ্য ওয়াহিদের আফসোস নেই।সে তো আজ খুশি।ভীষণ খুশি প্রিয়সীকে নিজের করে নেবে বলে।খানিকক্ষণ পর বিয়ে সম্পূর্ণ হলো তাদের।বক্কর ওয়াহিদের হাত জোড়া চেপে ধরে খুব কাঁদলেন মেয়র জন্য।এইতো চেয়েছিলেন এক যোগ্য ছেলের হাতে মেয়েটাকে তুলে দেবেন।তাহসিন বাজারে গিয়ে মিষ্টি নিয়ে এলো।সওদাগর বাড়ির দারোয়ানের সাহায্যে সওদাগর বাড়িতেও মিষ্টি পাঠানো হলো।ময়ূরী আজ রান্না বসিয়েছে।মাটির চুলায় কখনও রান্না করেনি বলে বেশ কষ্ট হচ্ছে।ঘরে ওয়াহিদদের একা ছেড়ে দেয়া হয়েছে কথা বলার জন্য।পুতুল আর ফাহাদ বারান্দার চৌকিতে বসে খেলছে।তাহসিন বাইরে থেকে এসে ময়ূরীকে রান্না ঘরে দেখে কপাল কুঁচকে বলল,
“আমার বউ কী রান্না জানে?”
ময়ূরী বিরক্ত হয়ে বলল,
“চুপ করুন।আধ-ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছি,জ্বলছেই না।”
তাহসিন শার্টের হাতা গুটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে ময়ূরীর পাশে বসল।চুলায় আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে বলল,
“আমি থাকতে তোমার কষ্ট কিসের?”
ময়ূরী ঠোঁট চেপে তার কাণ্ড দেখল।ইতোমধ্যে মাংস রান্না শুরু করেছে তাহসিন।ময়ূরী পাশে বসে তাহসিনের শার্টের ঘ্রাণ শুকছিল মুচকি হেসে।তাহসিন হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে পাশে তাকায়।
“বেগম কী আমার প্রেমে পড়েছ?বসন্তের বাতাস লেগেছে অঙ্গে?”
লজ্জায় মেয়েটার গাল লাল হলো।
“বাজে কথা বলবেন না।যে কাজ করছেন সেটাই করুন।”
তাহসিন মিটমিট করে হাসল।বক্কর নিজের ঘরের ভেতর থেকে জানালা দিয়ে ছোট মেয়ের সংসার দেখছেন।ছোট্ট মেয়েটা আজ স্বামীর সংসার করছে।এক সন্তানের জননী হয়েছে।তিনি প্রাণ ভরে দেখে যাচ্ছেন তাদের।কী সুন্দর একটা চড়ুই পাখির ছোট সংসার হয়েছে।তাহসিন বুঝি বউকে খুব ভালোবাসে।এমন একজন স্বামী পাওয়া ভাগের ব্যাপার।
এদিকে ওয়াহিদ মধুর সাথে একা আছে ঘরে।মেয়েটার ভয়ে জ্বর এসেছে শরীরে।কেঁদেই যাচ্ছে সে।আজ কতটা ভয় পেয়েছিল সে।রাজু খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে না নিয়ে গেলেও খু ন তো করতে চেয়েছিল?তখন অফিসাররা না গেলে এতক্ষণ সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করত।ওয়াহিদের বুক ভার হয়ে আসছে মধুর এই অবস্থা দেখে।সে ফের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“সংসার করবি না?কেঁদে-কুটে এখনই সাগর বানিয়ে ফেললে বাকি জীবন কী করবি?”
মধু নাক টেনে বলল,
“আজ আমি ম রে গেলে সংসার করতেন কার সাথে?”
“তোর আত্মার সাথে।”
“রাগ হচ্ছে আমার,কথা কম বলুন।”
ওয়াহিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে পাশে রাখা একটা ছোট্ট নাম না জানা ফুলটা হাতে নিল।এটা পুতুল বাড়ির পেছন থেকে এনে তাকে দিয়েছিল।সেটা মধুর কানের কাছে গুঁজে দিতে দিতে বলল,
“আজ আমার আনন্দের দিন।তোকে আজ নিজের করে নিয়েছি আমি।এই সুখ কই রাখি বল তো?”
মধু তাকাল তার দিকে।দুজনের চোখে চোখ পড়েছে।এতদিনের অদ্ভুত চাহনিটা আজ হালাল হয়েছে স্বামী-স্ত্রী নামক বন্ধন দিয়ে।ওয়াহিদ মুচকি হাসল।মধুর মাথার চুল ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“শোন,এবার আমার একটা সংসার চাই।সেই সংসারে শুধু আমাদের ভালোবাসা থাকবে।”
মধু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাসগুলো যেন একসাথে বেরোবার পথ খুঁজছে।
“আমি জানি না সংসার কীভাবে করতে হয়।”
ওয়াহিদ তার হাতটা নিজের বুকের উপর রাখল।
“সংসার জানলেই করতে হয় না। ইচ্ছে থাকলেই হয়। বাকি সব আমি শিখিয়ে দেব,ধীরে ধীরে।”
মধুর চোখ আবার ভিজে উঠল।
“আমি যদি মাঝপথে এসে থেমে যাই?”
“তাহলে আমি থাকব।” ওয়াহিদ নির্ভার কণ্ঠে বলল,
“তোর ভয় আমার বুকেই রাখবি। কাঁদতে চাইলে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদবি। সংসার মানেই তো দুজন মিলে বোঝা টানা।”
মধু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ওয়াহিদের বুকে মুখ লুকোল। কান্নাটা এবার শব্দহীন। ওয়াহিদ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তাকে—কোনো অধিকার দেখিয়ে নয়, বরং আগলে রাখার তাগিদে।
বাইরে দুপুরের আকাশ গাঢ় হয়ে এসেছে। রান্নাঘর থেকে মাংসের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাড়িতে। তাহসিন রান্না নামিয়ে হাত ধুতে ধুতে বলল,
“বউ, ডালটা নামিয়ে দাও। নইলে পুড়ে যাবে।”
ময়ূরী তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল।
“এইবার সত্যিই একটু ভয় পাচ্ছি। সবাই খাবে, যদি ভালো না হয়?”
তাহসিন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“ভালো না হলে আমিই দোষ নেব। বলব—আমি বানিয়েছি।”
ময়ূরী তাকিয়ে রইল তার দিকে। এই মানুষটা কী সহজে সব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে! মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস নামল—শান্তির।
দুপুরে সবাই একসাথে খেতে বসেছে। মধু খেতে পারছে না ঠিকঠাক। হাত ব্যথা, মনও ভার। বক্কর আলতো করে বললেন,
“খা মা। শক্ত হতে হবে তোকে।”
মধু মাথা নেড়ে একটু ভাত মুখে তুলল। ওয়াহিদ পাশে বসে খেয়াল রাখছে—কোথাও ব্যথা লাগছে কিনা।
তাদের বিয়ে হলো,সংসার শুরু হলো।ময়ূরীরও শ্বশুর বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো।সে চাইলেও আর এখানে থাকতে পারবে না।মধুর বিয়ের তিন দিনের মাথায় সে বাড়ি ছাড়ল।গেল তার শ্বশুর বাড়ি।মনটা বড্ড ভার।সেইদিন মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে ছুটে গিয়েছিল সে,আর আজ শান্ত নদীর মতো পা রেখেছে এই বাড়িতেই।সঙ্গে আজ ছোট ভাই নেই।মধু যতদিন আছে ততদিন সে ওই বাড়িতেই থাকবে।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ময়ূরীর সংসার জীবন আবার শুরু হলো।ব্যস্ত হলো শ্বশুর বাড়ি নিয়ে।নূপুরের বিদায়ের পর তারা ফের এসেছিল এই বাড়ি,তবে ময়ূরী ছিল না সেখানে উপস্থিত।সে দুপুরে গোসল সেরে মাথায় কাপড় দিয়ে আঁচলে ঘরের চাবি বেঁধে ছাদে এসেছিল প্রাণ খুলে শ্বাস নেয়ার জন্য।হাতিয়ে হাতিয়ে পুরো ছাদের গাছ গুলো দেখছিল।পেছন থেকে আফিয়া এসে বলল,
“মনটা এত উদাস কেন?”
ময়ূরী পিছু ফিরে আফিয়াকে দেখে বলল,
“জীবন বড্ড অদ্ভুত!কী করব বলো?”
“কী নিয়ে এত চিন্তা?”
“আব্বা তো একা হয়ে গেল ভাবি।আমার ভাইটা মা হারাল।আপার বিয়েটাও হয়ে গেল।এখন ও শ্বশুর বাড়ি চলে গেলে কী হবে?”
আফিয়া জোরপূর্বক হেসে বলল,
“আমিও তো বৃদ্ধ বাবাকে রেখে শ্বশুর বাড়ি এসেছিলাম বহু বছর আগে।আজ আব্বাও নেই,চিন্তাও নেই।”
“তোমার আব্বার কোনো খোঁজ তুমি পাওনি?”
“নিজ ইচ্ছায় হারিয়ে গেলে কী আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়?”
“দুঃখ পেয়ো না।যাকগে,তোমার খবর খানা বলো শুনি?”
দোলনায় দুই জা একসাথে বসল।আফিয়া বলল,
“আমার জীবন নিয়ে আর কিছু বলার নেই।তোমার খবর কী?কী করবে এরপর?”
ময়ূরীর কন্ঠে উদাসীনতা।সে বলল,
“পড়াশোনায় এবার মন দিতে হবে।আম্মা-আব্বার ইচ্ছাটা পূরণ করতে হবে।”
“আর সংসার?”
ময়ূরী ঠোঁট চেপে হালকা হাসল।তা দেখে আফিয়া ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“সংসার পুতুলের বাবার সাথে ভাগ করে নিয়েছি।অর্ধেক আমি করলে বাকি অর্ধেক তিনি করবেন।”
আফিয়া মৃদু হেসে ময়ূরীর দিকে তাকাল।
“আল্লাহ যাকে সহায় দেন, তার বোঝা হালকা হয়ে যায়।”
ময়ূরী দোলনার হাতলটা আলতো করে ধরে আকাশের দিকে তাকাল। বিকেলের রোদটা তখন নরম হয়ে এসেছে।
“জানি ভাবি,তবু বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগে। মা থাকলে সবকিছু সহজ মনে হত।”
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
“মা থাকেন না মানেই তো সব শেষ না। মায়েরা তো মাটির নিচে গিয়েও সন্তানের দোয়ায় বেঁচে থাকেন।”
ময়ূরীর চোখে জল জমল, কিন্তু সে ফেলল না।
“আমি শক্ত হতে চাই ভাবি। খুব শক্ত।”
“হবে।”আফিয়া দৃঢ় স্বরে বলল,
“কারণ তুমি ভেঙে পড়লে শুধু তুমি না—তোমার সংসার, তোমার মানুষগুলোও ভেঙে পড়বে।”
বাড়িটা আজ বেশ শান্ত।হিমি ঢাকায় চলে গেছে আদনানের সাথে।আদনানের ঢাকায় কাজ পড়ায় সে আর এখানে থাকতে পারেনি।এদিকে তাহসিন প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার।রান্না ঘরে গরম পানি দেয়া হয়েছে বিছানার চাদর ধুইয়ে দেয়ার জন্য।সেখানে পুতুল মায়ের আঁচল ধরে টোইটোই করছিল।ময়ূরী কোমরে আঁচল গুঁজে থালাবাসন ধুচ্ছিল।সেখানে চম্পা এলে পুতুল ভয়ে শিটিয়ে যায় ময়ূরীর শরীরের সাথে।ময়ূরী চোখ তুলে চম্পার দিকে তাকিয়ে ফের শান্ত হয়ে পুতুলকে বলে,
“মা,তোমার দাদির ঘরে গিয়ে দাদিকে একটু দেখে এসো যাও।”
পুতুল সময় নষ্ট না করে দৌঁড়ে যায় রান্না ঘর থেকে।ময়ূরী কাজ করতে করতে বলে,
“আপনার ব্যপারে তো জানাই হলো না কিছু।”
ময়ূরীর কথায় চম্পা ভ্রূ কুঁচকে তাকায়।ময়ূরী মুচকি হেসে একটু এগিয়ে এসে বলে,
“আপনি বয়সে আমার থেকে বেশ বড়।লজ্জা পাবেন না যেন গল্প করতে।”
চম্পা আশ্চর্য হয়ে বলে,
“কী সমস্যা তোমার?কী বলো এইসব?”
“ওমাহ!আজ কতদিন হলো এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছি,আপনার সাথে তো আমার বসে ভালো মন্দ দুটো কথাই হলো না এখন অব্দি।”
“আমার সাথে তোমার কী কথা?”
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৩
ময়ূরী আর একটু এগিয়ে এসে চম্পার ডান হাত হঠাৎ চেপে ধরে চুলায় গরম পানিতে চু’বিয়ে দিয়ে দাঁত চেপে বলল,
“এই একই প্রশ্ন আমারও।আপনার সমস্যা কী?পুতুলের পেছনে লেগেছেন কেন?”
গরম পানিতে হাত চে’পে ধরায় চম্পা ছটফটিয়ে উঠল ব্যথায়।জ্বলে মনে হচ্ছে চা’মড়া উঠে যাবে।সে গায়ের জোরে হাত উঠিয়ে নিলেও কুল পেল না।ময়ূরী নিচ থেকে ব’টি এনে গলার সামনে ধরে কিছুটা চওড়া গলায় বলল,
“আপনার কোন বাপ আজ আমার হাত থেকে আপনাকে বাঁচায় ডাকুন দেখি!”
