কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৫
হামিদা আক্তার ইভা
হট্টগোলের শব্দ শুনে তৎক্ষণাৎ ড্রয়িংরুমে হাজির হয় বাড়ির প্রত্যেকে।তাহসিন দৌঁড়ে এসে ময়ূরীর হাত থেকে ব’টি নামিয়ে নিতে চাইলে ময়ূরী দিতে চায় না।রজনী বেগম ধমকে উঠেন তাকে।তাহসিন পেছন থেকে ঝাঁপটে ধরে দূরে সরিয়ে নিয়ে বলে,
“হচ্ছে কী ময়ূরী?কী করছো এসব?”
চম্পা তখন চোখ ভর্তি পানি নিয়ে হাত উচিয়ে বলে,
“আপনার বউ আমার হাত পু’ড়ায় দিছে।”
তাহসিন নীরব চোখে ময়ূরীকে দেখে।শান্ত গলায় বলে,
“কী হয়েছে?উনি যা বলছেন এসব সত্য?”
রজনী বেগম তাহসিনের নরম গলা শুনে বলেন,
“তোমার বউরে মানুষ করো।এইডা কোনো কাম হইলো?হাতে তো পুরা ফোসকা পইড়া গেল।”
ময়ূরী এবার বিরক্ত হয়ে বলল,
“সত্য জানলে শুধু হাত নয়,উনাকে আগুনে জ্বা’লাতে ইচ্ছে করবে।”
“কইবা তো হইছে কী?নাটক করতাছ কেন?”
ময়ূরী রান্নাঘরের বাইরে তাকাল।বাড়ি ভর্তি মানুষ তাকিয়ে আছে তার দিকে।মেয়েটা আঁচল টেনে তাহসিনের দিকে একটু গুটিয়ে এসে বলল,
“আপনারা সবাই জানতে চান না,পুতুল কেন এই বাড়িতে আসলে এত কান্না করে?কেন এত ভয় তার মনে?এই উনিই পুতুলকে ভয় দেখায়।সেদিন নূপুরের গায়ে হলুদের দিন উনিই পুতুলকে মেরেছিলেন।”
ময়ূরীর কথা শুনে সকলেই হতবাক।রজনী বেগম চোখ বড় বড় করে ফেলেছেন।রান্না ঘরের বাইরে অরুণিমা বেগম কিছুটা উচ্চস্বরে বললেন,
“যা বলছো ভেবে বলছো তো?”
তৎক্ষণাৎ চম্পা গলা ছেড়ে বলে,
“আমি কী নতুন কাজ করি এই বাড়ি?আমি কেন পুতুলরে মারতে যামু?ছোট বউ এমন মিথ্যা অপবাদ দিতাছে কেন?”
ময়ূরী চোখ পাকিয়ে বলল,
“আর একটা বাজে কথা বললে মুখ ভে’ঙে ফেলব এবার।”
এক ষোড়শী বধূর এমন আচরণ যেন অবিশ্বাস্য।রজনী বেগম বললেন,
“কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে?”
“পুতুল নিজে আমাকে বলেছে।তা-ছাড়া আমি নিজের চোখে দেখেছি উনি পুতুলের সাথে বাজে ব্যবহার করেন।এসবের জন্য পুতুল উনার ধারের কাছে আসতে চায় না।”
চম্পা চেয়েও যেন কথা বলতে পারছে না।হাতের যন্ত্রণায় ছটফট করে।তাহসিন চোখ তুলে এবার তাকাল চম্পার দিকে।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আফিয়াকে বলল,
“ভাবি,পুতুলকে একটু নিয়ে আসুন।”
আফিয়া দৌঁড়ে গেলে তাহসিন ময়ূরীকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে।বাড়িতে তখন পুরুষদের মধ্যে তাহসিন আর রুহুল উপস্থিত।শান্তা এক কোনায় গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ভয়ে তার শরীর কাঁপছে।আফিয়া খানিক্ষণ পর পুতুলকে নিয়ে এলে তাহসিন তাকে কোলে নেয়।পুতুল ললিপপ খাচ্ছিল।সে ভীতু চোখে একবার চম্পার দিকে তাকিয়ে বাবার দিকে তাকাল।তাহসিন আদুরে গলায় বলল,
“আম্মা!আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?উত্তর দেবেন আপনি?”
পুতুল মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আচ্ছা।”
তাহসিন চম্পাকে দেখিয়ে বলে,
“আপনাকে কী উনি বকেন?আপনাকে সে মারে?”
পুতুল ভিতু হয়ে ময়ূরীর দিকে তাকায়।ভয়ে চোখে পানি চলে এসেছে।ময়ূরী বলল,
“তুমি না লক্ষ্মী?বাবা যা জিজ্ঞেস করছে বলে দাও।আমায় না বলেছ তুমি?”
পুতুল বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মিনমিন করে বলে,
“খুব মারে।কত ব্যথা পাই আমি।একদিন আমাকে লাঠি দিয়ে মেরেছিল বাবা।”
তাহসিনের চোখ জ্বলে উঠল রাগে।রজনী বেগম সঙ্গে সঙ্গে চড় মেরে বসলেন চম্পার গালে।চম্পা কিছু বলার আগেই রজনী বেগম চিৎকার করে বললেন,
“তুই কাজের মাইয়া হইয়া আমার পুতুলরে মারছ?তাই তো কই ওয় বাড়ি আইতে চায় না কেন।”
বলতে বলতে তিনি আরেকটা চড় মারলেন একই গালে।গলা চওড়া করে রমজান সওদাগরকে এখনই উপস্থিত হতে বললেন বাড়িতে।ময়ূরী এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সামনে।শক্ত গলায় বলল,
“আমি বলেছিলাম না,যেদিন ধরব সেইদিন তার হাত ভে’ঙে ফেলব?”
চম্পার গলার জোর তবুও কমল না।চওড়া কণ্ঠে বলল,
“আপনাগো বাড়ি ছাড়া করমু আমি।কত সাহস এই মাইয়ার।আমার গায়ে হাত তোলে।”
রজনী বেগম হতবাক হয়ে বললেন,
“তোর সাহস কত বড় মা গি?তুই কোন সাহসে গলা তুইলা কথা কস?”
“আমি এই বাড়ির বউ।আপনার ছোট পোলার বিয়া করা বউ আমি।বুঝেন না কথা?”
মুহূর্তেই পুরো ড্রয়িংরুম স্তব্ধ হয়ে এলো এই একটি বাক্যে।কনকের মা কথা খানা শুনেই বসে পড়লেন সোফায়।রজনী বেগম হায় হায় করতে করতে মুখে আঁচল চাপলেন।ময়ূরী বাকরুদ্ধ।রমজান সওদাগর আবার বিয়ে করেছেন অন্যত্রে?আবার একই বাড়িতে দুই বউ নিয়ে সংসার করছে,কেউ সেটা বুঝতেই পারেনি।ময়ূরীর হঠাৎ মনে হলো বিয়ের পর ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর সে মধ্যরাতে নিচে নেমেছিল।তাহসিনের জন্য খাবার আনতে গিয়ে চম্পার ঘর থেকে আপত্তিকর কিছু কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছিল কানে।মনের ভুল মনে করলেও আজ ঘৃণায় শরীর গুলিয়ে আসছে তার।শেষে এক কাজের মেয়েকে ছোট চাচা শ্বশুর বিয়ে করেছেন?
নিস্তব্ধতা এমনভাবে নেমে এসেছে যে, শ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।চম্পার কথাটা যেন বজ্রাঘাত হয়ে আছড়ে পড়েছে সবার মাথায়।তাহসিন ধীরে ধীরে পুতুলকে নামিয়ে দিয়ে কুসুমকে বলল পুতুলকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে।কুসুম বাবার দ্বিতীয় বিয়ের সংবাদ শুনে যেতে চাইল না।তাহসিন ধমক দিয়ে বলল,
“বললাম না উপরে যেতে?কানের নিচে দিতে হবে এখন?”
কুসুম ভয়ে প্রস্থান করল।তাহসিন তাকাল চম্পার দিকে।দাঁত চেপে বলল,
“কী বললেন আপনি?আবার বলুন তো!”
চম্পা বলে,
“যা শুনছেন তাই।রমজান সওদাগর আমার স্বামী।বিয়া করছে দুই বছরের বেশি হইছে।এই বাড়িতে আমি এমনি এমনি থাকি?”
কনকের মা তখনও বসে আছেন,হাত-পা কাঁপছে।রজনী বেগম যেন হঠাৎ বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেন।চোখে পানি জমে উঠেছে।
“রমজান…রমজান এমন কাজ করবই না…”
ঠিক সেই সময় দরজায় ভারী পায়ের শব্দ।রমজান সওদাগর ঢুকেই থমকে গেলেন।ঘরের পরিবেশ বুঝতে তার এক সেকেন্ডও লাগল না।চম্পার ফোলা হাত,সবার দৃষ্টি,আর ময়ূরীর কাঠ হয়ে যাওয়া মুখ।
রজনী বেগম গলা কাঁপিয়ে বললেন,
“এই মাইয়া কী কয় রমজান?সত্যি কথা বল।”
রমজান সওদাগর প্রথমে চম্পার দিকে তাকালেন।তারপর চোখ নামিয়ে বললেন,
“আম্মা,একটু ভুল হয়েছে।”
এই একটি বাক্যেই যেন সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কনকের মা মুখে আঁচল চেপে কেঁদে উঠলেন শব্দ করে।তিনি চাইলেই স্বামীর উপর ঝাঁপিয়ে এসে ঝগড়া করতে পারবেন না।তাহসিন কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না।চাচা যে এমন একটা কাজ করবে,সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল।রজনী বেগম হঠাৎ ঠাস করে চড় মারলেন রমজান সওদাগরের গালে।
“কু ত্তার বাচ্চা!তোরে মানুষ করছি এডি করার লাইগা?একজন তো দুই বউ বিয়া কইরা বংশ খাইছেই,এহন তুই শুরু করলি?জানোয়ার,এমন একটা কাজ করতে তোর বুক কাঁপে নাই?পোলা-মাইয়ার কথা মনে আছিল না তোর?”
ময়ূরী পিছু হুটল।চোখ তুলে তাকাল তাহসিনের দিকে।কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এসেছে।আফিয়া,ময়ূরী দুজনেই লজ্জায় পড়ল এখানে।বাড়ির বউ তারা,আর বউ হয়ে চাচা শ্বশুরের এমন কান্ড মানা কষ্ট।
চম্পা রমজান সওদাগরকে হাত দেখিয়ে বলল,
“আপনারে আমি কতবার কইছি সবাইরে সত্যি বইলা দেন।”
রমজান সওদাগর চুপ রইলেন মায়ের কারণে।কনকের মা হায়হায় করে বললেন,
“শেষে মাহতাবের মতো আপনিও?আপনার বংশের র’ক্তে এই নোংরাম..”
তাহসিন থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ছোট আম্মা!ভালো করে কথা বলো।”
“কী কইতে কস আর?তোর চাচা আর ভাই তো তরই র’ক্ত।ওগো দোষ চোখে দেখস না তাহসিন?কয়দিন পর দেখমু তুইও আরেকটা বিয়া কইরা নিয়া আইছোস।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ৩৪
তাহসিন বেজায় বিরক্ত হলো।এমনিতেই তার রাগে শরীর জ্বলছে পুতুলের কথা শুনে,তার মধ্যে আবার নতুন কাহিনী।রজনী বেগম বোরহান সওদাগরকে খবর পাঠাতে বললেন।তিনি যেন শান্তি পাচ্ছেন না একদণ্ড।বাড়িতে একে একে সবাই উপস্থিত হলে একত্রিত হয়ে বসলেন সবাই।চম্পার হাতে শান্তা বরফ দিয়েছে।মেয়েটার চোখ জলে চিকচিক করছে।ময়ূরী সেদিকে তাকিয়ে বিরক্ত হলো খুব।শরীর ঘিনঘিন করছে তার।
