Home কি করিলে বলো পাইবো তোমারে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৪

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৪

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৪
মুনমুন বুড়ি

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে বলা হলেও বর্তমান দুনিয়ায় পশুর থেকেও ভয়ংকর হলো মানুষ। সেটার একটা ঝলক হচ্ছে এই ফার্ম হাউজ। চারিদিক মেয়েদের কান্নার আওয়াজ, হাহাকার, আর্তনাদ। এখানে প্রায় বিশজনের মতো মেয়ে রয়েছে। সবাইকে এখন তুলে আনা হয়েছে নিষিদ্ধ জগতের মনোরঞ্জনের মাধ্যম বানানোর জন্য। এখনে আনা প্রত্যেকটি মেয়ের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হতে পারত। প্রত্যেকটি মেয়েই কারো না কারো মেয়ে, কারো বোন। মেয়েগুলোর বয়স কতই বা হবে বেশি হলে সর্বোচ্চ বিশ। অথচ এই ফুলের মতো মেয়েদের কাল ইতালি পাচার করা হবে। জীবিত থাকতেই নরক যন্ত্রণা ভোগ করানো হবে তাদের।

চারিদিক কান্নার আওয়াজে মিহি চোখ মুখ কুচকে ফেলে। আস্তে আস্তে পিটপিট করে চোখ খুলতেই পুনরায় দ্রুত চোখ বন্ধ করে ফেলে মিহি। মাথাটা প্রচন্ড ধরে আছে ওর দুহাতে মাথা চেপে ধরে, আস্তে আস্তে চোখ খুলে মিহি। চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখছে কিন্তঙ কিছুই মনে পড়ছে না মিহির। মেঝেতে ভর দিয়ে উঠে বসে ও। উঠে বসতেই সামনে জড়সড় হয়ে বসে থাকা অনেকগুলো মেয়ে চোখে পড়ে ওর। সবারই চোখে মুখে আতঙ্ক, কেউ কান্না করছে কেউ মিহির দিকে তাকিয়ে আছে। মিহি কিছুক্ষণ মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে, ওদের দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যেই আস্তে আস্তে সমস্ত ঘটনা মনে পড়তে থাকে ওর। সমস্ত ঘটনা মনে পড়ার পর চারিদিকে চোখ বুলায় মিহি, সামনে থাকা মেয়েগুলোকে কয়েকবার পর্যবেক্ষণ করেই পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারে মিহি। পুরো ঘটনা বুঝার সাথে সাথেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকে ও

-এটা কোথায়? এটা কোথায় এনেছে আমাকে? কেউ আছে কি? দয়া করে আমাকে বাঁচান। কেউ আছে? প্লিজ হেল্প!
মিহির চিৎকার শুনে বাইরে থেকে দুইজন কালো পোশাকধারী লোক দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। দুইজন লোককে দেখতে অসুরের চেয়ে কম মনে হচ্ছে না। বিশাল লম্বা দেহ, সাথে কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। পোশাক থেকে গায়ের রঙ আলাদা করার উপায় নেই। এই অশুভ দৈত্যের মতো লোকদুটো মিহির সামনে এসে হাটী গেঢ়ে বসে বলে:
-কি সমস্যা? এত চেচামেচি কেন? কি চাই?
মিহি ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বলল:
আপনারা কে? আমাকে কেন এখন নিয়ে এসেছেন?
কেন নিয়ে এসেছি সেটা একটু পরে বুঝতে পারবি। এখন চুপচাপ থাক।
মিহি লোকদের কথা শুনে চিৎকার করতে করে বলে:
আমাকে ছেড়ে দিন না হলে ভালো হবে না কিন্তু।
মিহির কথা শুনে লোকগুলো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।

ঠিক তখনি দরজা খুলে যায়। পিছনে থেকে বুটের আওয়াজ শোনা যায়। কেউ একজন এইদিকে আসছে লোকটা যত কাছে আসছে তত মেয়েগুলোর কান্নার আওয়াজ বেড়ে যাচ্ছে। মিহি দেখতে পাচ্ছে না লোকটাকে, সামনে থাকা লোকদের জন্য । লোকটা কাছে আসতেই সামনে থাকা দুইজন দূরে সরে দাঁড়ায়। লোকটা আস্তে আস্তে মিহির সামনে এসে দাঁড়ায়। লোকটার চেহারা এবার পুরোপুরি স্পষ্ট হয় মিহির কাছে। লম্বায় প্রায় ছয় ফুট হবে। উজ্জ্বল ফর্সা গায়ের রঙ, বাম চোখের উপরে কাটা দাগ। চুলগুলো পিছুনে পোনি স্টাইলে বেঁধে আছে। সব থেকে বিষ্ময়কর জিনিস হলো এই লোকের চোখ। লোকটার চোখের মনি দুইটা ভিন্ন রকম। বাম চোখের মণি বাদামী, ডান চোখের মণি ধূসর রঙের।

“রিকার্ডো অ্যালভার্ট”
পুরো আন্ডারওয়াল্ডে “Death hell” নামে পরিচিত। এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা রিকার্ডো করে নি । খুন, গুম, নারী পাচার, ধর্ষণ, স্মাগলিং সবই রিকার্ডোর নামের সাথে জুড়ে আছে। রিকার্ডো মিহিকে কয়েকবার আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলে
-সেই একটা জিনিস এনেছিস। এমন আগুন সুন্দরী মেয়ে আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।
কথাগুলো বলেই লোভাতুর নজরে মিহিকে দেখতে থাকে রিকার্ডো। মিহি নিজের ওপর এমন নোংরা দৃষ্টি দেখে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। মিহিকে এমন গুটিয়ে যেতে দেখে রিকার্ডো মিহির সামনে হাটু গেঢ়ে বসে বলে:
-কি হলো বিউটিফুল লেডি। আমাকে ভয়ে পাচ্ছো নাকি?
মিহি মাথা নিচু করে ফুপিয়ে উঠে। মিহিকে কান্না করতে দেখে রিকার্ডো মিহির গাল ধরতেই যাবে, তখনি কেউ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে হাপাতে হাপাতে বলে:

-বস, ইভান স্যার আসছেন।
মূহূর্তেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় রিকার্ডো। লোকটাকে কিছু বলার আগেই কিছু দেখে থেমে যায় রিকার্ডো।
দরজার দুই পাশে সারি সারি গার্ড হাতে বন্দুক নিয়ে প্রবেশ করছে। তাদের দেখে বোঝা যাচ্ছে মালিকের সুরক্ষায় কতটা তৎপর তারা। রিকার্ডো আরো কিছু ভাববে, এর পূর্বেই সেখানে কেউ এসে উপস্থিত হয়। তার আগমনে চারপাশ থমথমে হয়ে ওঠে, নেমে আসে শুনশান নীরবতা। দরজার অপর পাশে লম্বা, সুঠাম দেহের ওভারকোট পরিহিত কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের জন্য তাকে পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না, শুধু আপছা আলোয় তার অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। এক পা এক পা করে সেই অবয়ব এগিয়ে আসছে দুই সাড়ি গার্ডের মধ্য দিয়ে। মিহির কাছে আসতেই সে মিহিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে। রিকার্ডো হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেও লোকটি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, শেষমেশ অপমানে হাত নামিয়ে নেয় রিকার্ডো। এতক্ষণে লোকটি মুখ থেকে মাস্ক সরিয়ে ফেলে, তখনই দেখা যায় তার সুদর্শন মুখশ্রী। ধারালো ব্লেডের মতো চোয়াল, তীক্ষ্ণ বাদামী চোখের দৃষ্টি যেন কাউকে ওই চোখের ধারায় ঘায়েল করার ক্ষমতা রাখে। স্টাইলিশ সিল্কি চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করা।

“ইভান স্ট্রোন” তীক্ষ্ম ধূর্ত বুদ্ধিমত্তার জন্য বেশ পরিচিত। বড় বড় মাফিয়া গ্যাংস্টারদের কৌশলে ঘোল খাওয়ানোর ক্ষমতা রাখে এই লোক। তার অন্যতম ক্ষমতা হলো “হিপনোটাইজিং পাওয়ার” যা যেকোনো মানুষকে বস করার ক্ষমতা রাখে। ইভানকে দেখে মিহি হতভম্ব হয়ে যায়, অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে:
-অভ্র ভাইয়া।
মূহূর্তেই রিকার্ডো এবং ইভান মিহির দিকে তাকাল। মিহিকে ইভান এর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিকার্ডো ব্রু কুচকে জিগ্গাসা করে
-মি ইভান আর ইউ টু অলরেডি অ্যাকুয়েন্টেড?
ইভান মিহির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে

-হু ইজ সি?
মিহি ইভান এর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল
-আপনি আমার সাথে মজা করছেন? চিনতে পারছেন না আমাকে মানে কি?
রিকার্ডো মিহির কথা শুনে বলছ উঠে
-এই মেয়ে সাট দ্যা হেল আপ তুমি জানো কার সাথে কথা বলছো ? গলা নামিয়ে নাহলে এখানে তোমার লাশ পড়বে।
-আমি কেন চুপ থাকবো অভ্র ভাইয়া আপনি চুপ করে কেন আছেন? বলুন ওনাদের আমি আপনার বউ আমাদের বিয়ে হয়েছে ।
মূহূর্তেই চারিপাশে শুনশান নীরবতা নেমে আসে কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। রিকার্ডো বলে ওঠে
-মি ইভান হোয়াট ডিড সি সে?
ইভান কোনো কথার উত্তর না দিয়ে মিহির দিকে এক পা এগিয়ে মিহির সামনে হাটু গেঢ়ে বসে। মিহি ইভানকে দেখে কিছু বলার চেষ্টা করল, কিন্তু ইভান মিহির মুখ চেপে ধরে বলে:

-ডু ইউ নো মি?
মিহি চেয়েও কিছু বলতে পারল না, কিছুক্ষণ পর পুতুলের মতো ডানে বামে মাথা নাড়ায়, যার অর্থ “না, আমি আপনাকে আগে থেকে চিনি না।”
– দ্যান হোয়ায় আর ইউ লায়িং?
এই কথা বলেই ইভান মিহির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। মিহি বলে ওঠে:
– আমি নিজেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলেছি।
এই কথা শুনে ইভান বসা থেকে দাঁড়িয়ে রিকার্ডোর দিকে তাকিয়ে বলে:
– ক্লিয়ার?
রিকার্ডো সন্তুষ্টিজনক হাসে। ইভান গম্ভীর কণ্ঠে বলে:

– তাহলে তোমার পরের প্ল্যান কি?
– মেয়েগুলোকে কাল ইতালি পাচার করব কিন্তু
ইভান রিকার্ডোর কথায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়:
– কিন্তু কি?
রিকার্ডো মিহিকে ইশারা করে বলে:

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৩

– এই মেয়েটাকে এক রাত আমার কাছে রাখতে চাই।
রিকার্ডোর কথা শুনে ইভানের অভিব্যক্তি বোঝা গেল না, তাকে স্বাভাবিকই লাগছে, কিন্তু গাঢ়ের রগগুলো আচানক ফুলে উঠেছে। ইভান মিহির দিকে একবার তাকিয়ে বলে:
-ওকে

কি করিলে বলো পাইবো তোমারে পর্ব ১৫