চড়ুইপাখির অভিমান পর্ব ১৪

চড়ুইপাখির অভিমান পর্ব ১৪
লেখনীতে- নন্দিনী নীলা

কোরবানির ঈদ! আর মাত্র চারদিন দিন পর। বিয়ের পর এই প্রথম ঈদ আমার ও আপুর। এবার আমার আপুকে ছাড়া একা ঈদ করতে হবে মনটা ভার। আপু শশুর বাড়ি নতুন মানুষ জন নিয়ে দিনটা পার করবে আর আমি বাসায় আব্বু আম্মুর সাথে। আপুর মতো যে আমাকে শশুর বাড়ি যেতে হয়নি তাই আমি স্বস্তি পাচ্ছি। কারণ আপুর মতো আমাকে যদি স্পর্শরা নিয়ে যেতো তাহলে আমাকে বাবা মাকে ছাড়া ঈদ করতে হতো আর আমি খুব কষ্ট পেতাম।
আপুর সাথে দিনরাত ফোনে কথা বলা হয়। তার মনটাও খারাপ কিন্তু কিছু করার নাই। বাবা আমাকে আর আপুর জন্য সেম দুই রঙের থ্রি পিস এনে দিয়েছে‌। শাশুড়ি মা দুইটা শাড়ি দিয়েছে একটা পড়ে ঈদের দিন তার বাসায় যেতে হবে‌।
আমি আমতা আমতা করে রাজী হয়েছি।

রাতে একটা টেক্সট করলাম স্পর্শকে। তিনি ফোন দিল আমাকে একটু আধটু কথা হয় এখন আগের মতো আর ইগনোর করে না।
আমি ফোন রিসিভ করেই সালাম দিলাম। উনি বলল, ‘ শাড়ি পছন্দ হয়েছে?’
আমি বললাম, ‘ আপনি পছন্দ করেছেন?’
‘ না আম্মুর পছন্দ। সব সময় আমি পছন্দ করি এজন্য এবারের আর আমাকে পছন্দ করতে দেয়নি।’
‘ ওহ খুব সুন্দর হয়েছে। আম্মুর পছন্দ তো খুব সুন্দর।’
‘ আমার পছন্দ করা জিনিস সুন্দর না?”
‘ ভালোই কিন্তু আম্মুর পছন্দ বেশি সুন্দর।’
‘ তাই। আমার পছন্দের জিনিস পছন্দ না হলে ও তোমার সেসব পরতেই হবে। ‘
‘ আপনার পছন্দ খারাপ হলেও আমি পরতাম‌ই। কারণ আপনি মানুষটাই আমার খুব প্রিয়। তাই আপনার সব জিনিস আমার কাছে খুবই স্পেশাল।’
কথা বলার পর আমি চুপ মেরে ছিলাম। স্পর্শ কে এই ভাবে প্রিয় বলে দিলাম। কথার তালে তালে। স্পর্শ যে আমার মুখে এসব শুনে খুশির জোয়ারে ভাসতেছে আমি জানি। স্পর্শ আর কথা বলছে না আমি আমতা আমতা করে নিশ্চুপ আছি। হঠাৎ টুং টুং আওয়াজ হয়ে কলটা কেটে গেল আমি বোকার মতো তাকিয়ে র‌ইলাম। এটা কি হলো আমার এতো আবেগ মাখা কথা শুনে উনি কিছু না বলেই কল কেটে দিল।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আমি রাগ করার টাইম পেলাম না তার আগেই টুং করে মেসেজ এলো স্পর্শের নাম্বার থেকে। আমি ওপেন করে দেখি,
‘ এতো আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা দেখিয়ে আর কখনো আমার সাথে কথা বলবে না। আমি এসব সহ্য করতে পারিনা। মন চাই ছুটে গিয়ে তোমাকে বুকের মধ্যে ঝাপটে ধরি। কিন্তু সেসব এই মুহূর্তে অসম্ভব। আমি বাধা।তাই আমাকে কন্ট্রোল লেস করবে না। যত ভালোবাসা, সব আমার কাছে এসে দেখাবে, বলবে, আমি অনুভব করবো, আমাকে ছটফট করতে হবে না!’
আমি জল ভরা দৃষ্টিতে লেখা গুলো পরলাম। স্পর্শের কষ্ট গুলো যেন আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আমি তার ভালোবাসার গভীরতা যেন অনুভব করতে পারলাম।

স্পর্শের কথা ভাবতে ভাবতে আমি সারা রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারলাম না। সকালের দিকে আমার ঘুম চোখে নেমে এলো। সকালে ঘুম থেকে উঠতে আমার বেলা হয়ে গেল। এদিকে মায়ের ডাকা ডাকি চোখের ঘুম সব নিয়ে বিরক্ত হয়ে উঠলাম।
বিকেলে আমি পাশের বাড়ির ঝিনুক আপুর সাথে টেইলার্স এর দোকানে এলাম তার সাথে। বাসার সামনেই দোকান তিনি জামা বানাতে দিয়েছিল সেটা নেব আর আমি তার সাথেই ঘুরতে এসেছি। দোকান থেকে ফিরার সময় দেখা হলো এলাকার রিপন ভাইয়ের সাথে। তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমি দূর থেকে তার কালো মুখে সাদা দাঁত গুলো দেখতে পেলাম। গুঞ্জনের শুনেছি ঝিনুক আপুর সাথে নাকি তার প্রেম আছে। কতোটা সত্যি জানি না। ঝিনুক আপু আমার আপুর থেকেও অনেক বড় তাই তার সাথে আমার বন্ধুত্ব পূর্ণ কোন সম্পর্ক নাই। বড়র মতো সম্মান দিয়ে চলি এসব জিজ্ঞেস করার ও সাহস নাই‌। উনার যে রাগ আমি ক্লাস ফাইভে থাকতে উনার কাছে প্রাইভেট পরেছি। পড়া না পাড়লে খুব মারতো। সেই থেকে ভয় পাই।
রিপন ভাইয়ের দিকে একবার তাকালো ও না আপু আমি সিআইডির মতো দুজনকে লক্ষ্য করে বাসায় এলাম। আজকের বিহেভিয়ার দেখে মনৈ হচ্ছে রিপন ভাই ই আপুকে পছন্দ করে আপু করে না। কিন্তু আমি সবাইকে বলাবলি করতে দেখেছি কি মাখামাখি দুজন। ক‌ই আপু চোখ একবার তাকালো ও না।

আমি রাতে এসব নিয়ে পাঁচ বান্ধবী দের পারে আড্ডা দিলাম। আর একদিন ঈদের। সবাই গরু কিনে ফেলেছে আমাদেরটাও চলে এসেছে লাল রঙের গরু। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছি শুধু। গরুটার কাছে ঘেঁষতে পারিনি পারবো কি করে? সিং খাড়া করেই রাখে মনে হয় কাছে গেলেই গুতা মারবে। আমি আবার এই ভয় খুব পাই। স্পর্শ ও আমাকে কল করে তাদের কেনা গরু দেখালো পরদিন। দুইদিন আগেই আমাদের কোরবানির গরু কেনা হতে গেছে। স্পর্শদেরটা কেনা হয়েছে ঈদের আগের দিন। আমাদের ফ্ল্যাটের ও পাশের ফ্ল্যাটের সবাই সন্ধ্যার আগেই এসে আমাকে গুতাচ্ছে মেহেদী দিয়ে দিতে। প্রতিবার আপু আর আমি দুজনেই মিলে এই কাজ করি। এবার আমাকে একা করতে হবে। আমি অলস ভঙ্গিতে বসে আছি। ভাল্লাগছে না। আপুকে ভিডিও কল দিয়ে দেখলাম তিনিও এই কাজ‌ই করছে ননদ টনদ সবাইকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। আপু অনেক ভালো মেহেদী পড়াতে পারে আমি অতো সুন্দর করে পারিনা আপুর মতো। এবার আমাকে কে মেহেদি পরিয়ে দেবে‌। আপুর শাশুড়ি মা নাকি আপুকে বলেছে কাজ বাদ দিয়ে মেহেদী দিয়ে দিতে আপুও তাই করছে।

আমি কোন রকম ফুল পাতা দিয়ে কাজ শেষ করলাম। তারপর নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আপুর কল করে বললাম,
‘ এবার আমাকে কে মেহেদি পরিয়ে দেবে‌।’
আপু বলল, ‘ রেস্ট নিয়ে খাবার খা। তারপর আস্তে আস্তে দিয়ে ফেল।’
‘ আমি পারবো না। তুমি চলে আসো। আমাকে মেহেদী পরিয়ে দাও।’
‘ বাচ্চাদের মতো করিস কেন। আমি কি করে আসবো। আমি ঈদের তিনদিন পর আস্তে পারবো।এর আগে আসা সম্ভব না।’
‘ কেন?’
‘ নানা শশুরবাড়ি দাওয়াত সেখানে তারপর ফুফু শাশুড়ির বাড়ি।’
‘ আজব। আমরা কি কিছুই না তোমাদের আমাদের বাড়ি সবার পর কেন আসবে। এটা কেমন নিয়ে ওখানে কি পরে যাওয়া যাবে না। তুমি কালকেই বিকেলে চলে আসবা। ‘
‘ পারবো না রে। আমার হাতে কিছু নাই। এখন আমি তাদের বাড়ির ব‌উ তাদের সিদ্ধান্তের উপর আমি কথা বলতে পারবো না। তাদের কথাই আমাকে মানতে হবে আমি মানতে বাধ্য।’
‘ তোমার কোন মতামতের দরকার নাই। এটা কেমন নিয়ম। আমি তো কখনো এমনটা মানবো না। আমি সবার আগে আমার বাবার কাছে আসবো তারপর বাকি সব।’
‘ এটা করলে অশান্তি হবে। এখন বুঝবি না। শশুর বাড়ি একবার যাও তারপর বুঝবি। ‘
‘ এমন করলে আমি শশুর বাড়ি কোনদিন যাব না। ‘
‘ স্পর্শ কে ছাড়া থাকতে পারবি?’
‘ উনাকে ঘর জামাই করে রাখবো!’
‘ দুষ্টু বোন আমার।’

রাত ঠিক বারোটার সময় আমি স্পর্শকে কল করলাম। তিনি রিসিভ করলো তিনবারের বেলায়।
আমি কোন কথা না বলে আগে ‘ঈদ মোবারক’ বললাম। অনেক জোরে বলেছি।
এপাশে স্পর্শ কান থেকে ফোন সরিয়ে রেখেছে। কারণ আমি অনেক জোরে বলেছি তার কানে লেগেছে।
শান্ত হতেই স্পর্শ বলল,’ এতো জোরে কেউ বলে আমার কান মনে হয় ফেটে গেল।’
আমি আনন্দিত কন্ঠে বললাম, ‘ আমি আগে আপনাকে ঈদ মোবারক বলেছি।’

চড়ুইপাখির অভিমান পর্ব ১৩

স্পর্শ বলল, ‘ এতো তাড়াহুড়ো না করলে ও আমি তোমার আগে বলতাম না। তোমাকে আগে বলার সুযোগ দিতাম‌ই।’
আমি কপাল কুঁচকে বললাম, ‘ কেন?’
‘ কারণ আমি চাই তুমি সব কিছুতে ফার্স্ট থাকো!’ স্পর্শ নির্লিপ্ত গলায় বলল।
আমি চুপ করে ফোন কানে ধরে স্পর্শের কথা শুনছি। ওইভাবেই কখন ঘুমিয়ে পরেছি খেয়াল নেই।

চড়ুইপাখির অভিমান পর্ব ১৫