Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ২৯

নিবৃতা পর্ব ২৯

নিবৃতা পর্ব ২৯
নেহার ছায়ালিপি

নীরব, শান্ত, ধীর স্বভাবের মানুষটি আজ ভিন্ন, রৌদ্র রূপ ধারন করেছে। সর্বদা সরলতায় মুড়িয়ে থাকা মুখের আদলে কেমন কাঠিন্যতার আভাস যেন। ডাগর ডাগর চোখের নরম দৃষ্টির বদলে চাপা ক্রোধের ঝিলিক উঠছে। উষ্ণ, কোমল অভিব্যক্তিতে সুপ্ত, উত্তপ্ত তেজ। স্বামীর বাধ্যগত স্ত্রীটি আজ তার নিয়ম ভেঙে হয়ে উঠেছিল বেপরোয়া, ক্ষিপ্ত। দু মানব মানবীর মাঝে চলা অঘোষিত, অদৃশ্য মানসিক বিগ্রহে আজ সে ছিল তেজস্বীনী, রণরঙ্গিণী। সর্বদা সম্মান দিয়ে চলা মানুষটির পরোয়া সে করে নি মোটেও। তার জন্য আজ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আপন মর্যাদাবোধ। শেষ পর্যন্ত, ধৈর্য চ্যূত হয়ে, অপর পক্ষে থেকে ক্রমাগত পাওয়া সেই বর্বর, শীতল আচরণের যোগ্য বলে নিজেকে আর মনে হয় নি। তাই তো কঠোর প্রতিবাদ করে, নিজের দুর্বল সত্তা থেকে সরে এসেছে৷ অন্তঃস্থলের কোন এক গুপ্ত গহ্বর থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করেছে, নিজের অদমনীয় মনোভাবকে।

মায়ের কাছ থেকে বকা খেয়ে ও রাগের আভাস পেয়ে, তানহা আর আগ বাড়িয়ে কথা বলার সাহস পায় নি। হঠাৎ করেই কোন মানুষ যদি তার স্বভাব সুলভ আচরণের বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে তার প্রভাব পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর বেশি পরে৷ সেভাবেই, তানহা জানে না, এই নতুন নিবৃতার সাথে কিরূপ ব্যবহার করা উচিত, নাইবা তাকে কিভাবে সহজ করার চেষ্টা করতে চাইলে, আদতেও কোন লাভ হবে কি না৷ এই যে হাসপাতাল থেকে, ওভাবে নিয়ে এলো, সারা রাস্তা কোন কথা বলে নি তানহার সাথে। চলন্ত গাড়ির গতি, স্বাভাবিক পর্যায়ের থেকে ছিল যথেষ্ট উঁচু। তানহার জন্য ভীতিকর না হলেও, পূর্বের নিবৃতার কাছে ভয়ংকর এক কান্ড তো অবশ্যই হতো। পুরোটা সময়, মুখে কুলুপ এঁটে চুপ থেকেছে। তানহা কিছু বললে, ঠিক মতো প্রত্যুত্তর অবদি করে নি। এরপর বাসায় আসার পর থেকে, এক মুহুর্তের জন্য ধীর স্থির হয় নি সে। কিছু না কিছু একটা নাড়াচাড়া করেছে, আর একটু পরপর আড়চোখে, দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখেছে। তানহা জানে না ঠিক কি হয়েছে, তবে বাবা মায়ের মাঝে যে কিছু একটা নিয়ে মনোমালিন্য হচ্ছে তা স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান। শুধুমাত্র সঠিক কারণটা জানতে পারলেই তো ও কিছু একটা করতে পারতো! গোমড়া মুখে, বসে থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ও। গালে, হাত ঠেকিয়ে, সম্মুখে তাকিয়ে দেখে যায় ও আম্মুকে। যে অযথাই তানহার গোছানো, পরিপাটি ড্রেসিং টেবিলকে আবারও গোছ গাছ করছে। তাও কেবলমাত্র নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য।

বাসায় আসার পর, রাগ কিছুটা কমে আসলে, নিবৃতার বুঝে আসে যে তাবিবকে, ওভাবে একা ফেলে রেখে আসা ওর মোটেও উচিত হয় নি। আর আসেপাশে পরিচিত কেউ যদি বিষয়টা দেখে থাকে, তাহলে তো তাবিবের জন্য বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তাই তো এখন, সেগুলো উপলব্ধি করতে পেরে মনে শান্তি মিলছে না। কিন্তু নিজ থেকে, কল করে তাবিবের খবরাখবর নেওয়ার জন্যও নিজেকে মানাতে পারছে না। মানসিক এক টানাপোড়েনের মাঝে দোদুল্যমান ও। পর মুহুর্তে, মস্তিষ্ক বলে, তাবিব একজন সবল, বুদ্ধিমান, সুপুরুষ। নিজেকে সবকিছুতেই সেরা মনে করে। তার তো কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই। একদিন গাড়ি ছাড়া বাসায় পৌছতে কি-ই বা কষ্ট করতে হবে? এসব দু’রকম ভাবনায় যখন ও ক্লান্ত, তখন নজর পরে মেয়ের উপর। শুকনো মুখে, গালে হাত দিয়ে, কেমন অন্যমনস্ক দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে। নিবৃতার বাদবাকি রাগ টুকুনও তখন বিগলিত বরফের মতো গলে পানি হয়ে গেলো। তার মেয়েটার সাথে আজ কর্কশ আচরণ করে ফেলেছে। নিজেকে দোষী মনে হলো। যেখানে তানহা ছিল ওর কাছে সবার আগে, সেখানে ও, তাবিবের সাথে হওয়া সামান্য ঝামেলার জন্য নিয়ে ভেবে নেয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এটা কিভাবে হলো? নিজের পরিস্থিতিতে চোখ পরতেই, মুখটা থমথমে হয়ে এলো ওর। সবকিছু কেমন ঘোলাটে ও নিয়ন্ত্রণহীন লাগছে। চিন্তায় কপালে জড়ো হওয়া বিন্দু বিন্দু ঘাম কনা, ওড়নায় মুছে ও মেয়ের কাছে গেলো। নীরবে পাশে বসে, মাথায় নরম হাত বুলিয়ে বললো,

– মন খারাপ করেছ?
তানহা ছিল গভীর ধ্যানে মত্ত। বাবা মায়ের সমস্যা সমাধানের কৌশল উদ্ভাবন করায় ছিল সমস্ত মনোযোগ। নিবৃতার ভাঙা গলা কানে আসতেই দৃষ্টি উঁচু করে তাকালো। অতঃপর তড়িৎ মাথা নাড়িয়ে বললো,
– নাহ তো। রাগ করবো কেন?
– ঐ যে বেশি বকে ফেললাম তখন।
তানহা বোকা বোকা চোখে চেয়ে থেকো হঠাৎই হেসে উঠে।
– ওটাকে বেশি বকা বলে?
– বলে না?
– আমি আসলেই ভুল করেছিলাম। প্রথমে ভাবি নি। পরে পার্কিং লটে গিয়ে, আমার নিজেরই ভয় লেগেছিল। তাই তো দ্রুত হাঁটছিলাম।
তানহার সরল, মিষ্টি কন্ঠে নিবৃতা হাসলো। তার মেয়ের মনে কোন খেদ নেই। সব একদম স্বচ্ছ, পরিষ্কার।
– তারপরও আবার সরি।
নিবৃতার বাহু জড়িয়ে তাতে মুখ ডুবিয়ে তানহা বললো,

– আবার কেন?
– তোমার রেজাল্টের ট্রিট মিস গেলো।
– আরেকদিন বের হবো। সমস্যা কি? তবে একটা জিনিস ভালোই হলো।
তানহার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নিবৃতা শুধায়,
– কি?
– সবসময় তো আর তুমি বাবার সাথে রাগ দেখাও না। তাই সেটা আজ ভালোই লাগলো।
কুটিকুটি হাসির শব্দ হলো। কেন যেন, নিবৃতাও নিঃশব্দে হেসে উঠলো।
– তা আমার বেচারা বাবা করেছে কি? জানতে পারি?
কি করেছেন? নিবৃতার কাছে ব্যাখা করার মতো নানান কারণ থাকলেও, এদের পেছনে কোন যৌক্তিকতা নেই হয়তো। সবই আপন মনের অনুভূতি। উদাস মনে বললো,
– তোমার বাবা সবসময়ই সঠিক। উনি কখনও কোন ভুল করেন না। হয়তো আমিই কোন দোষ করেছি।
– আমার আম্মুকে একদম কিছু বলবে না। সেও কোন দোষ করে না।
তানহার মৃদু প্রতিবাদে নিবৃতা হাসে৷
– রেস্টুরেন্টে গেলে আজ কি খেতে?
তানহা ভাবুক গলায় বললো,
– হুমমমমমমম, হয়তো চাইনিজ খেতাম।
– আচ্ছা।

ঘড়িড় কাটা তখন সাড়ে নয় পেরিয়েছে। তাবিব ধীর সুস্থেই, বাড়ি আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিবৃতাকে আপাতত ফাঁকি দেওয়াই ওর সমীচীন মনে হয়েছে৷ সেই অভিমানীর দৃষ্টিতে, দু নয়ন নিবদ্ধ করে, আপন প্রগাঢ় অনুভূতির দ্রহকে ও সামাল দিতে অপারগ হতো নচেৎ। সকাল থেকে, কিভাবে যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখছে সেটা কেবল একমাত্র তাবিব ও তার মালিকই জানেন৷ নীল বেদনায় ওর মন মস্তিষ্ক ধরাশায়ী। একটুখানি ছুয়ে দেওয়ার তাড়নায় ওর অস্তিত্ব কাঁপছে, সেই সরল মুখের আদলে, স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেওয়ার তৃষ্ণায় নিজেকে কাতর মনে হচ্ছে। তবুও ও, নিজেকে আটকাতে বাধ্য। আর কতই বা কষ্ট দেবে ওকে? এতোদিন অজ্ঞাত থাকলেও, আজ আর পরিস্থিতি এক নয়৷ ক্লান্ত লাগছে খুব। গলার কাছে, শার্টের কয়েকটা বোতাম খুলে, ও কলিং বেলে চাপ দেয়। কয়েক মুহুর্ত, পরপর ধুপধাপ পদ ধ্বনির আওয়াজ মিলে। বুক থেকে আরেকটা চাপা শ্বাস বেরোয়। সে আসে নি। হয়তো আর আসবেও না৷
– আসসালামু আলাইকুম বাবা।
তানহার চমৎকার কন্ঠস্বর। বাসায় আসলে, সবার আগে মেয়েকে সালাম দেওয়া শেখালেও তার সবসময় মনে থাকে না। আজ ছিল তাহলে, হয়তো এর পেছনে কোন কারণও আছে।
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম আমার মা।

তাবিব স্মিত হেসে ভেতরে আসতেই, নাসারন্ধ্রে সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ পৌছে যায়। মেয়ের খুশি হওয়ার কারনটা বুঝতে আর সময় লাগে না। তাবিব, আলগোছে মাথা নাড়িয়ে চলে যায় নিজের ঘরে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসতেই, তানহা নজরে আসে৷ হাতে ঠান্ডায় ভেজা গ্লাস। তাবিব কিছুক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে থেকে এগিয়ে গেলো।
– এটা খেয়ে মাথা ঠান্ডা করো এখন। আর পনের মিনিট লাগতে পারে খাবার হতে।
গ্লাস হাতে নিয়ে, স্বাভাবিক মুখে, তাবিব বসলো মেয়ের পাশে। এক চুমুক দিতেই বুঝলো, চেনা হাতের স্বাদ।
– তা, কেন মনে হলো যে আমার মাথা ঠান্ডা হওয়া প্রয়োজন?
– নাহলে কি আর আম্মুর কোন দোষ চোখে পরতো? মাথা গরম দেখেই তো সব সমস্যা।
তাবিব ভ্রু কুঁচকায়।

– তোমার আম্মু আবার কি করেছে?
– আম্মু বললো, সে দোষ করেছে দেখেই তো তোমাদের ঝগড়া হচ্ছে।
তাবিবের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেলো নিমিষে। চুপ করে বসে থেকে এক সময় বললো,
– এগুলো নিয়ে তুমি বেশি ভেবো না। কোন সমস্যা হয় নি৷
তাবিবের ভারী স্বরে তানহা আর কিছু বললো না। মা সহজ সরল হলেও, বাবা পরিমাপ অনুযায়ী, যতটুকু বলা উচিত ততটুকুই জানানো শ্রেয় মনে করে।
– আচ্ছ। রেস্ট নাও৷ টেবিল সেট হলে আমি ডাকবো।
তানহা চলে যেতেই তাবিব গম্ভীর মুখে বসে রইলো। যে নিজেকে দোষী মনে করে এতো কষ্ট পাচ্ছে, তাকে কিভাবে ও সবটা বুঝাবে এখন? আদও সেই সুযোগ কি আর আছে?

মেয়েকে খুশি করতে, পুরো চাইনিজ প্ল্যাটারের আয়োজন করেছে নিবৃতা। রাইস, ভেজ, ফ্রাই সাথে আলাদা করে থাই স্যুপ। স্বাদে ভরপুর খাবারের ঘ্রানেই মন চাঙা হয়ে উঠে। তাবিব, শুষ্ক মনে এলেও, এখন কিছুটা হালকা লাগছে নিজেকে। সারাদিনের চাপা ক্ষুধা এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দুপুরেও ঠিকমতো খেতে পারে নি। সহজ ভাষায়, ইচ্ছেই করে নি তবে এখন আর সেই সুযোগ নেই৷ নিবৃতা, তার খাবারের সমাদর হতে দেখলে বেশ খুশি হয়৷ তাবিব নাহয় ওকে আজ খুশি করার জন্য হলেও বেশি করে খেলো! নিবৃতা এখনও এখানে আসে নি৷ তবে, তানহা থেমে নেই৷ মা’কে সাহায্য করার জন্য ওর হাত চলছে। গরম স্যুপ বাটিতে ঢালার জন্য এগোতেই তাবিব বিরোধ করলো।
– আমি দেখছি। বেশি গরম এটা।
– আচ্ছা।

বাবার বারণ মেনে, তানহা পিছু হটে গেলো। তাবিব খালি বাটিগুলো ভরতেই নিবৃতা এলো। হাতে একটি ট্রে। একদম স্বাভাবিক ওর ভঙ্গিমা। কোন জড়তা নেই৷ সাবলীল আচরণ। তবে তাবিবকে আজ নিবৃতা রোগ সংক্রমণ করেছে। নজর চুরির খেলায় আজ ও একমাত্র অংশীদার। পরপর নিবৃতা টেবিলে বসতেই, তাবিব চামচে হাত দিলো। কিন্তু ওকে, অবাক করে দিতে, নিবৃতা সুন্দর মতন, ওর সম্মুখ থেকে বাটিটা আস্তে করে টেনে নিলো নিজের দিকে। হতবিহ্বল তাবিব, মুক বনে রইলো কিয়ৎক্ষণ। এটা কি হলো? সন্ধ্যায় যেমন ওকে গাড়িতে তুলে নি, সেভাবে এখন ওর হাতের রান্নাও খেতে দেবে না? এই সুস্বাদু খাদ্যের আস্বাদন থেকে বঞ্চিত করবে? বোকাসোকা, সরল, নরম, মিষ্টি নিবৃতার এ কি হলো? অসহায়ত্বে ওর মুখটা ছোট হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ! বিরস বদনে চাইতেই দেখলো, ওর দিকে আরেকটা ট্রে ঠেলে দিয়েছে নিবৃতা। ছোট করে বললো,
– এটা মাশরুম ছাড়া।
তাবিব, তানহার পছন্দ, অপছন্দে বেশ মিল ও অমিল রয়েছে। মাশরুম তার মাঝে একটা। এবং এই বিষয়কে খেয়ালে রেখেশ রাগের মাঝেও নিবৃতা তাবিবের সুবিধার কথা ভুলে নি৷ তাবিব আপ্লুত হলো। কিছুক্ষণ কথাই বললো না৷ নিবৃতা কবে থেকে ওর সূক্ষ বিষয়েও এতো কড়া নজর রাখে? উষ্ণ হয়ে আসা মনে শুধু এতোটুকুই বলতে পারলো,
– ধন্যবাদ নিবেদিতা।
কিন্তু ওপর পাশ, আজ জবাবে মৌন। জড়তা কিংবা লাজে নয়৷ গোপন অভিমানে আজ তার মন সিক্ত।

নিজ রুমে, টেবিলে বসে, ল্যাপটপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঘাটাঘাটি করছিল তাবিব৷ নিভান যতই বলুক, নিবৃতার দায়িত্ব এখন ও-ই নিবে। ভালো ব্যবস্থা করবে, তাতে তাবিব তো আর হাতে হাত রেখে বসে থাকতে পারে না। দিনশেষে, ওর একটাই স্বপ্ন, নিবৃতার হাতটি ধরে, ও সকল পথ পাড়ি দিবে৷ তা সে যতই দুর্গম হোক না কেন৷ আর নিবৃতা ওকে প্রতাখ্যান করলেও, নিজ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতায়, ও যতটুকু পারবে, সাহায্য, এবং অংশীদারত্বের চেষ্টায় থাকবে। সে কাজ, চিন্তায় এতোটাই বুদ ছিল যে, পাশে অন্য কারও উপস্থিতি একটুও টের পেলো না। আর সেই, অমনোযোগীতা সেই মানুষটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে আহত করলো। নতুবা পূর্বে তো, সামান্যতেই নিবৃতাকে অনুভব করতে পারতো সে৷ হঠাৎ করেই টেবিলে টাস করে একটা শব্দ হলো। তাবিব ভড়কে গিয়ে তাকিয়ে দেখলো, পাশে নিবৃতা দাড়িয়ে। মাথার ঘোমটা একটু বেশিই লম্বা করে টানা৷ নত মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিছু না বলে, তাবিব টেবিলে তাকায়৷ নিবৃতার মোবাইল স্ক্রিন জ্বলজ্বল করছে সেখানে। প্রদর্শিত হয়ে আছে একটি ছবি৷ একটি বিজ্ঞাপন। মেয়েদের মিক্সড মার্শাল আর্টস শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠান। এই এলাকাতেই অবস্থিত। পুরোটা পড়ে, তাবিব বললো,

– তুমি ভর্তি হতে চাও? কারাতে, কুংফু, জুডো। এগুলো শিখবে?
নিবৃতা যেন কথা বলারও কিছু পেলো না। এই বয়সে এসে সে এগুলো শিখবে? লোকটার কি কোন ধ্যানই নেই এখন? কোনমতে বললো,
– ঝিলমিলের জন্য।
তাবিব থমকে গেলো কয়েক পলের জন্য। আগে যখন তানহাকে নিয়ে নিবৃতা এতো বাড়াবাড়ি করতো, তখন তাবিব সহজভাবে নিলেও, এখন এর পেছনের কারনটা উপলব্ধি করতে পারছে৷ তিক্ত বাস্তব, হুল হয়ে বুকের ভেতরে ফুটলো। চোখ বন্ধ করে, নিজেকে সামলে বললো,
– তুমিও শিখবে ওর সাথে?
– নাহ।
– আচ্ছা।

অন্য সময় হলে, লোকটা নিবৃতাকে জোড়াজুড়ি করতো এর বিপরীতে। ওকে মানানোর জন্য, কিসব দুর্ভেদ্য যুক্তির বানে, নিবৃতার সকল অযুহাতকে অকেজো করে দিতো। অথচ আজ?
– আমি কাল গিয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসবো তাহলে।
– লাগবে না। আমি ঝিলমিলকে নিয়ে যাবো।
তাবিব চমকে তাকিয়ে বলে,
– পারবে তুমি?
– পারতে হবে।
শক্ত মুখে বলে, নিবৃতা চলে গেলো। ওর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা নিয়ে নিয়েছে। আর এখানে থেকে কি লাভ? মনের মাঝে লালন করে রাখা চাপা রাগটা আজ কোনভাবেই ওকে নত ও দুর্বল সাব্যস্থ করতে চাইছে না। কঠিন হবে জেনেও, তাবিবের সাহায্যকে অগ্রাহ্য করলো। তাবিব, চুপ করে থেকে একদম বিষাদ হাসে। চেয়ারে পীঠ এলিয়ে দিয়ে, দু হাতে দু চোখ আঁকড়ে ধরে, বিষন্ন গলায় বিড়বিড় করে বলে উঠে,
– এভাবেই হয়তো, একদিন এই তাবিবকে আর লাগবে না তোমার নিবেদিতা। তুমি নিজেই সব কাজে যথেষ্ট হবে। সত্যি বলছি, সেদিন আসলে, আমি খুশিই হবো। কিন্তু সেদিন হয়তো আমি তোমার সাথে থাকবো না।
কেউ শুনলো না হৃদয়ের সেই ব্যক্ত হাহাকার। অদৃশ্যের মতো শূন্যে মিলিয়ে গেলো তা এক সময়।

সকাল বেলায় আজ নিবৃতার ভীষন তাড়া। নতুন বছরে, তানহা আজ প্রথম স্কুলে যাবে। সাথে জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পা রাখবে। নবম শ্রেণীর পর থেকে, পড়ালেখার ঘাড় বাকানোর আর কোন সুযোগ নেই। ব্যস্ত হাত, পা চলছে একসাথে নানান কাজে। সেদিকে, তানহা ঘুমে দুলছে। ওর জেট ল্যাগ এখনও কাটে নি। বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এ নিয়ে। ওদিকে তাবিবও উঠে তৈরী হচ্ছে। তানহা, নিবৃতার সাথে সেও আজ যাবে৷ ছোট ছোট বিষয়কে গুরুত্ব দিলেই, সম্পর্কের মেল বন্ধন সুন্দর হয়। তবে, এই সাতসকালে, নিবৃতার মোবাইলে, ওর ভীষন পছন্দের কেউ একজনের বিশেষ বার্তা এলো। মানুষটার সাথে কলে, তেমন একটা কথা হয় না, নিবৃতার জড়তার কারণে। তবে চ্যাটে, সে নিয়ম করে নিবৃতার খোঁজ খবর রাখে। নিবৃতার আচরণ না চাইতেও নিস্পৃহ দেখালেও, তার দায়িত্বে কোন ত্রুটি নেই। হাতের কাজ থামিয়ে, নিবৃতা মোবাইল হাতে নিলো। পরপর বিস্ময়ে ঠোঁট কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে গেলো। কোনমতেই বিশ্বাস হলো না, আগত সেই খবরটি। দ্রুত কল লাগালো সে অন্য কাওকে। মাথায় ঘুরছে সেই একটি বাক্য,

নিবৃতা পর্ব ২৮

– নিবু, বড় ভাইয়া আসছি।
ডাইনিং এড়িয়ায়, নিবৃতার চঞ্চল অভিব্যক্তি নজরে আসতেই থামলো তাবিব। পরপর কানে এলো, নত কন্ঠস্বর।
– মা, বড় ভাইয়া কি সত্যিই আসছে?
হতভম্ব তাবিব। এতো দ্রুত? লোকটা তাকে আগাম বার্তা ছাড়াই এভাবে, পাহাড় কিনারায় ছুঁড়ে ফেললো? সময় কি তাহলে সত্যই আর নেই?

নিবৃতা পর্ব ৩০