Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৩০

নিবৃতা পর্ব ৩০

নিবৃতা পর্ব ৩০
নেহার ছায়ালিপি

কাঙ্ক্ষিত ফ্লাইটটি ল্যান্ড হতেই, বিমানবন্দরের টার্মিনালের বাহিরে অপেক্ষারত মানুষদের মাঝে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পরলো। স্বজনদের সঙ্গ লাভ করার প্রতীক্ষায়, তাদের অন্তঃস্থল কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ঠোঁটের কোনে হাসি, চোখের কোন সিক্ত অনুভূতি সাজিয়ে, প্রত্যেকে তারা শেষ অধৈর্য মুহুর্তগুলো পার করছে। আপনজনের সান্নিধ্যের চাইতে, অন্য কোন বস্ত হৃদয়ে অধিক উষ্ণতা প্রদান করতে সক্ষম নয়। এই অনুভূতি, সবচাইতে ভিন্ন এবং মূল্যবান। ধীরে ধীরে সময় গড়ায়। ঠিক আধ ঘন্টার মাঝেই, আগত লোকজনের মাঝে, পরিচিত সেই চেহারাটি দেখতে পায় রত্না। সেই মুখটি, যাকে এই প্রথমবার, নিজের সম্মুখে, সশরীরে উপস্থিত দেখলো ও। আধুনিক প্রযুক্তির উপহারে পাওয়া সেই যান্ত্রিক বস্তুে জ্বলজ্বল করে উঠা সুদর্শন পুরুষটিকে, এই দূরে থেকেই দেখা হয়েছে, হাজার হাজার মাইল দুরত্বে অবস্থানকৃত এই মানুষটিকে নিজের সর্বস্ব দিয়ে চাওয়া হয়েছে এবং তার নামে কবুল বলা হয়েছিল। কাঁধে কালো ব্যাক প্যাক ঝোলানো, সাদা পোলো শার্ট, ঘিয়ে রঙা ডেনিম প্যান্ট পরিহিত, অত্যন্ত ফর্সা ত্বক ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী আটত্রিশের সুপুরুষটি, এগিয়ে আসছে নিকটে। উৎকৃষ্ট নিটোল, চওড়া অবয়ব তার, আসেপাশের সকলকে অদ্ভুত জাদুবলে, অদৃশ্য করে তুলেছে। রত্নার দৃষ্টিতে জাগতিক সবকিছুই ম্লান হয়ে এলো। স্বীয় পছন্দের উপর আরেক দফা গর্বে তার মস্তিষ্ক স্বস্তি পেলো। ঠোঁট ছুয়ে বেরিয়ে এলো দর্প মাখা হাসি। তবে ঠিক সে হাসিটাই, আগত মানুষটির কাছে বিষধর ঠেকলো। বিতৃষ্ণায় ঝাঁঝরা হলো অন্তর। চোখের ভাষা হয়ে এলো কঠোর, দুর্ভেদ্য! চোয়াল শক্ত রেখে সে, এগিয়ে এলো, স্থুল পায়ে।
রত্নার ঘোর তখনও কাটে নি। নির্নিমেষ চাহনি নিবদ্ধ রেখে, কোন এক অজানায় ভাবনা মত্ত ছিল ও, যা ভাঙে হঠাৎ শোনা অনমনীয় কন্ঠস্বরে।

– তুমি কেন এসেছ?
নিভান ওর দিকে তাকিয়ে অবদি নেই। দৃষ্টি, ঠিক এই বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে পরার মূল ফটকে। রত্না এই অবহেলা টুকুন সন্তর্পণে সয়ে নিলো। এতক্ষণ দ্বিধা কাজ না করলেও, এখনও অদৃশ্য এক অস্বস্তি কাবু করে নিচ্ছে ওকে ধীরে ধীরে। বিপরীত পার্শ্বে অবস্থান করা মানুষটার অভিব্যক্তি অদ্ভুত কোন এক কাঠিন্যতায় বিশেষায়িত। এতো বছরে প্রথম দেখা অথচ প্রথম বাক্যেই তার অনীহা প্রকাশ পেলো! রত্না সামান্য গলা পরিষ্কার করে বললো,
– মায়ের শরীর তেমন একটা ভালো নেই আজ। তোমার জন্য সকল আয়োজন করে এখন অসুস্থ হয়ে পরেছেন। তাই তাকে বাসায় রেখে, আমিই এসেছি।
– আমার মা বোনের চিন্তা তোমাকে মানায় না রত্না।
– অথচ বিগত কতগুলো বছর ধরে, তাদের দায়িত্ব আমার কাঁধেই।
– দায়িত্বকে, যে বোঝা মনে করে, সে ঠিক কতটা কর্তব্য পরায়ন ও নিষ্ঠাবান, সেটা বোঝার জন্য অন্তত আমাকে তো আর কোনকিছুই দেখার অপেক্ষা করতে হবে না।
নিভানের মতোন আপোষহীন ব্যক্তিত্বের পুরুষের সাথে, কথার জোরে রত্না কখনই পারবে না। এ খেলায় বারংবার মুখ থুবড়ে মাত পাবে ও। তাই কথা না বাড়িয়ে চুপ রইলো। সম্পর্কে তাদের এমনিই বড় এক চির ধরে গিয়েছে। এতে আরও ফাটল যোগ করা যাবে না।

– এসো।
সম্মুখে এগিয়ে যাওয়া নিভানের ছোট্ট ডাকে, রত্না পিছু ঘুরে চাইলো। বিরোধিতা না করে, চললো ওর সঙ্গে। উবারে, দু’জন পাশাপাশি বসলেও, তাদের মাঝে অবস্থান ছিল গাঢ় শীতলতার। বিবাহ জীবনে প্রথমবার হওয়া সাক্ষাতে, এই দম্পতির মধ্যে কোনরূপ উচ্ছলতা প্রকাশ পেলো না। বরঞ্চ দুরে থাকার চেয়েও, কাছে আসায়, তাদের মাঝে এক অদৃশ্য দুরত্ব দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করছিলো। যা হয় আর কখনও মিটবে না। জানালা ঘেষে, চুপচাপ বসে থাকা রত্নার মনটা ধীরে ধীরে ভেঙে আসছিলো। অনেক না বলা শব্দের আঘাত পরছিল শক্ত মনে। শুষ্ক চোখ ভিজে যাচ্ছিলো নীরবে, অথচ নিভান ছিল সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ! নিবেশিত দৃষ্টি, কাঁচের জানালার বাহিরে। বহু বছর পর, আপন দেশের নতুন রূপের সাথে পরিচয় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল মনের মাঝে।
– চলে এসেছি।
উবার থেমে যেতেই রত্না নিজেকে সামলে নেয়। চালকের কথায় অবাকও হয়েছে ও। বাসায় পৌছতে এখনও অনেক দেরী। তাহলে এখানে কেন এলো তারা?

– নেমে এসো।
জায়গাটি হলো, ধানমন্ডি লেক। সকাল বেলা বিধায়, লোকজনের ভিড় যথেষ্ট কম এখানে। নতুবা সবসময়ই বেশ জমজমাট থাকে স্থানটি। মিঠা মিঠা রোদের ছটা চারিপাশে। থেমে থেমে পাখিদের মিষ্টি ডাক ভেসে বেড়াচ্ছে। সদ্য কেটে যাওয়া শীতকলীন সময়ের ফলে হ্রদের পানি সামান্য কমে এসেছে। আসেপাশে বড় বড় বৃক্ষরাজির সমাহার। বেশ সময় নিয়ে, নিভান চারপাশটা হেঁটে হেঁটে পরোখ করলো। ছোট সেতুটির রেলিঙে হাত ঠেকিয়ে, দু চোখ বুজে টেনে নিলো এক খোলা শ্বাস! বাহিরি দেশে, প্রযুক্তির তুমুল অগ্রগতি থাকলেও, নিজ দেশের মাটির সুঘ্রাণ সেখানে পাওয়া যায় না। এ দেশের বাতাসের যে মমতা রয়েছে, আপন আপন অনুভূতি রয়েছে, সেগুলো ভিনদেশে কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না৷ তাই তো নাড়ীর টান সহজে ছুটে না মানুষের। দিনশেষে, মানসিক স্বস্তি পেতো, ছুটে আসতেই হয় এখানে। উজ্জল রোদ্দুরের কিরণে, নিভানের শুভ্র সুদর্শন মুখটা জ্বলজ্বল করছিল। অনতি দূরে দাড়িয়েই, ওকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছিল রত্না। মনে হচ্ছে এ দেখার কোন শেষ নেই৷ তবে, আগে এই চেহারার সাথে আরেকজনের সংযোগ খুঁজে পেলেও, আজ তাদের দুই ভাইবোনকে একে অপরের প্রতিচ্ছবিই মনে হচ্ছে রত্নার কাছে। কি ভীষন সাদৃশ্যতা!

– এখানে আসার কারণ কি নিভান?
ঝলমলে আকাশ পানে মুখ রেখেই নিভান নির্লিপ্ত স্বরে বললো,
– কেন? বিরক্ত হচ্ছো কি?
– বিরক্ত হওয়া উচিত না বলছো? সেই কখন থেকে, কোন কিছু না বলে চুপ করে আছো।
– আমি তো ভেবেছিলাম, আমার সাথে সময় কাটানো, তোমার অনেকগুলোর ইচ্ছেদের মধ্য অন্যতম একটি।
নিভানের কথার ভাব স্পষ্ট নয়। রত্নাকে এক রাশ জড়তারা ঘিরে ফেললো। ওর আসলে ঠিক কেমন লাগছে, সেটা নিজেও নয়তো বলে প্রকাশ করতে পারবে না। হয়তো এক চাপা ভয়। নিভানের মতো পুরুষ, ভাবনা চিন্তা ছাড়া কোন ধরনের কথা বলে না৷ সেদিনের হুমকিটা আজও ওর মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এজন্যই তো শান্তি মিলছে না কোনভাবেই। রত্নাকে চিে থাকতে দেখে নিভান শ্লেষাত্মক হাসলো। অতঃপর ঘুরে গিয়ে, অর্ধস্বচ্ছ জলরাশি থেকে সামান্য দূরে, একটি গাছের নিচে, ইট, সিমেন্টের বাধাই করা জায়গার উপর গিয়ে নিভান বসলো। পাশের খালি জায়গাটি হাত দিয়ে চাপড়ে দিয়ে বললো,
– এখানে বসো।
গম্ভীর সেই কন্ঠস্বর, বিনা অবজ্ঞায় মানলো রত্না। মনটা অযথাই কেন থেকে, বেশ অস্থির হয়ে উঠছে ক্রমশ!

একমাত্র বাবা, এবং ফুফুর পরিবার ছাড়া, এই ছোট জীবনে তানহা আর কোন আপনজনের সাথে পরিচিত হয় নি৷ সে শুনেছে, ওর দাদা, চাচা, ছোট ফুফুসহ আরও অনেকেই রয়েছে৷ তারা সকলেই একসাথে থাকেন৷ কিন্তু সেখানে তার বাবার মতো একা মানুষের জায়গা হয় নি। কারণ কিছুটা স্পষ্ট থেকে অস্পষ্ট। তাও যতটুকু শোনা হয়েছিলো, তার অধিকাংশই ওর ফুফাতো বোনদের কাছ থেকে। বাবা এ বিষয়ে কখনই ওর সম্মুখে মুখ খুলেন নি৷ তানহাও কেন যেন জিজ্ঞাসা করে নি কিছুই। হয়তো সবার সবকিছু জানতে নেই৷ তানহা তো এভাবেই ভালো আছে৷ এরপর সৌভাগ্যক্রমে পেলো তার আম্মুকে, সাথে মিললো নানু আর মামি। আর আজ, সেই দলে আরও একজনের আগমন ঘটছে। উনি নাকি তানহার মামা হন। তার সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্যই তো এখন সকল আয়োজন চলছে। তাবিব এবং তানহা তৈরী হয়ে বসলে থাকলেও, নিবৃতার ছোটাছুটি থামে নি।

নিভানের সাথে ছোটবেলায় বেশ সখ্যতা থাকলেও, সেগুলোর কিছুই মনে নেই নিবৃতার৷ এরপর যখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল, তখম নিভানের উপস্থিতি ছিল না ওর চারপাশের গণ্ডীতে। বাবার আদেশে, ভিনদেশে, নিভান তখন একা থাকায় অভ্যস্ত হচ্ছিলো। মাঝখানে যোগাযোগ অবস্থার উন্নতি হলেও, দূরে থাকা মানুষটার সাথে তেমন একটা সহজ হতে পারে নি নিবৃতা। কিন্তু সবকিছুকে এক পাশে রেখে, ও জানে, মানে এবং বুঝেও যে নিভানের অবস্থান ওর জীবনে ঠিক কতটুকু। ছোটবেলায়, সেই পাশবিক দৃশ্যখানি সচক্ষে স্পষ্ট দেখলেও, বড় হয়ে এর পেছনের কারনটা উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় নি ওর। ভাইয়ের কাছে ওর গুরুত্ব যে ঠিক কতটা সেটা ও বুঝতে পেরেছে। ওর জন্য করা বাবা, ভাইয়ের সকল ত্যাগ তিতিক্ষা সম্পর্কে ও অবগত। তবে সব যে নিজ থেকেই বোধদয়ে এসেছে তাও কিন্তু নয়। একজন ক্রমাগত পেছন থেকে ওকে খুঁচিয়ে গিয়েছে। অবশ্য মানুষটাকে নিবৃতা কখনও দোষ দেয় না। সে হয়তো তার জায়গা ঠিকই করেছে। বোকা, নির্বোধ নিবৃতা আর কতই বা অন্যের কষ্টের কারণ হতো?

– দাও, আমি হেল্প করি। তাহলে তাড়াতাড়ি গোছানো হয়ে যাবে।
একদম সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে আসা, নিবৃতার নিজস্ব পরী! কি সুন্দর লাগছে দেখতে! নিবৃতা দোয়া পড়ে মেয়েকে আগলে নেয় তৎক্ষনাৎ। মিষ্টি করে হেসে বলে,
– অনেক সুন্দর লাগছে! মাশাল্লাহ আমার ঝিলমিলটা!
খুশির উজ্জ্বলতায় তানহা শ্যাম বর্নের মুখটা চিকচিক করে উঠলো। গাল ভরে হেসে উঠলো তৎক্ষনাৎ।
– থ্যাঙ্ক ইউ! কিন্তু আমাকে একা সুন্দর লাগলে চলবে? মেয়ের মাকে দেখতে হবে না!
নিবৃতা বোকার মতোন তাকিয়ে থেকে বলে,
– মেয়ের মাকে আবার কে দেখবে?
– একদম টিপিক্যাল বাঙালী গৃহিণী হয়ে গিয়েছ!
– এতে খারাপ কি?
তানহা হাঁপ ছেড়ে বললো,
– খারাপ থাকবে কেন? তাই বলে স্মার্ট লাগতে হবে না?

নিবৃতা মুখ কুঁচকে খাবার গোছানোতে মনোযোগ দেয়। ওর মাকে বলে রেখেছে, আজ দুপুরের খাবারের আয়োজন নিবৃতা করবে। কারণ রত্না একয়দিন বাসায় ছিল না। ভাইয়ের সাথে রাগ করে, ক’দিন আগে সে তার বাবার বাসায় চলে গিয়েছিল। তাই এই দায়িত্বটা নিবৃতাই নিয়ে নিয়েছে। নিভানের সব পছন্দের পদগুলো নিজ হাতে, যত্ন সহকারে রান্না করেছে ও। সেগুলোই এখন বাক্সে ভরে নিচ্ছে। নিবৃতা কাজ করতে করতেই বললো,
– ওসব স্মার্টনেস দিয়ে আমার কি হবে? ওসব বয়স পাড় করে চলে এসেছি আমি।
তানহা ভীষন অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
– তুমি কি ছাব্বিশ বছর বয়সেই বুড়ি হতে চাচ্ছো?
– হলে সমস্যা কোথায়?
তানহা আফসোসের সুরে বললো,

– তুমি বোন তো এ কয়দিন আবার বেচারা বাবাকে দেখতেই পারছো না। এখন তোমার ভাইটাও আজ এসে তার ছাব্বিশ বছরের বুড়ি বোনকে দেখে, আমার বাবাকে দোষারোপ করে বলবে, ‘ আমার বোনকে অকালে বৃদ্ধা বানাতেই কি তোমার কাছে বিয়ে দিয়েছিলাম ডাক্তার তানজীব সারোয়ার? এ অন্যায় আমি মানি না। আমার বোনকে এক্ষণই ফেরত দাও! ‘
নাটকীয় স্বরে কথাটা বলে, তানহা নিজেই হেসে ফেললো! অথচ নিবৃতা তখন বিস্ময়ে তাকিয়ে! মজার ছলে হলেও, তানহা ভুল বলে নি৷ নিভান এমনিতেই নিবৃতা আর তাবিবের বিয়ে নিয়ে খুশি ছিল না। এমনকি, এখনও সে এ বিষয়ে সহজ হতে পারে নি৷ তাই, তাকে কোনভাবেই এবার অভিযোগের সুযোগ দেওয়া যাবে না৷ নিবৃতা সুখে আছে, ভালো আছে! এই সত্যটাই তো তুলে ধরতে হবে৷ ও মাথা নাড়লো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো,
– আচ্ছা ঠিক আছে৷ তুমিই ঠিক। ভালোমতোই তৈরী হবো।
তানহা দন্ত কপাটি মেলে বিরাট এক হাসি দিয়ে বললো,
– গুড!

– একদম বাবার মতো হয়েছ! তোমাদের দু’জনের যুক্তির সামনে, এই বোকা আমিটা কিছুই না।
নিজ কক্ষের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মা মেয়ের খুনসুটি উপভোগ করছিল তাবিব৷ মুখে ঝুলন্ত মিষ্টি হাসি৷ এই সংসারের প্রাণ সঞ্চারিনী এই দুই নারী, তাবিবের জীবনের সবকিছু। অথচ হয়তো, অতি শীঘ্রই এ দু’জন থেকেই ওকে দূরে সরে যেতে হবে। সবসময় এমনটাই তো হয়। প্রথমে কয়েক মুহুর্তের মূল্যবান প্রাপ্তি লাভ করিয়ে দিয়ে লোভ ধরিয়ে দিবে, এরপর সব থাকতেও, দিনশেষে তাবিবকে একাই হয়ে যেতে হয়৷ আপনজনের ভিড়ে ঠেলে, ও হয়ে পরে রিক্ত, শূন্য!

– তোমার আমার বিয়ে কিভাবে হয়েছিল, মনে আছে রত্না?
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাকে কেও কিভাবে ভোলে? রত্না তো ভুলে নি৷ সব এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে, নিভান নামক এই পুরুষটিকে প্রথম দেখেছিল ও। ফেসবুক ফিডে আচমকাই, দেশে চলমান তৎকালীন সংকটাপন্ন পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তারিত পোস্ট সামনে এসেছিল৷ নিছক কৌতুহলবশই, সময় নিয়ে পুরো লেখাটা পড়েছিল রত্না। এরূপ স্বাধীনচেতা চিন্তাধারা ও ক্ষুরধার কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে, রত্নার জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সাথে অন্তঃপটে চলছিল দামামা। যা ও হাজার চেয়েও থামাতে পারে নি। সাথে পাল্টা ইন্ধন জোগাচ্ছিল ওর নিজেরই জেদি স্বভাব। একান্তই পেরে না ওঠায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই, নিভানের দোরে গিয়ে হাজির হয় ও৷ কথা না প্যাচিয়ে, সরাসরি মূল অংশে চলে আসে৷ ব্যক্ত করে মনের অবস্থা। বাস্তব বাদি নিভানের কাছে, ওসব তখন নিতান্তই ছেলে মানুষী ঠেকে। ও ভদ্র ভাষায় রত্নাকে মানা করে দেয়। তবে আবেগ তখন রত্নাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে নিয়েছে। ওকে কোনভাবেই বোঝাতে সক্ষম হয় নি নিভান। এগুলো ওর জন্য নতুনও ছিল না। তন্মধ্যে বিয়ের বয়সও পাড় হয়ে যাচ্ছিলো। বাসা থেকে রোজ রোজ মায়ের অভিযোগ শোনা, ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল৷ তবুও, কেন যেন নিজেকে সংসার নামক দ্বায়বদ্ধতার মাঝে আটকানোর সাহস হচ্ছিল না নিভানের৷ তাইতো রত্নাকে ক্রমাগত দূরে ঠেলছিল। কিন্তু ওর থেকে পাওয়া কঠোর ভাষায় প্রয়োগেও রত্না পিছুপা হলো না। প্রতিনিয়ত নিভানকে জ্বালাতন করেই যেতো। এর মধ্যে তখন দেশ থেকে, খবর আসে রত্না নামক এক মেয়ে ওর বাসায় গিয়ে উঠেছে। নিভানের উপর আরোপিত দোষ হলো, সে আর রত্না, বেশ কিছু সময় ধরে এক মানসিক বন্ধনে জড়িত, তবে এখন হঠাৎ করেই, নিভান তার সাথে যোগাযোগ রাখতে চাইছে না৷ নিজের নামে এরূপ মিথ্যে বলায় নিভানের ক্রোধ আকাশচুম্বী হয়। অথচ শিউলি তখন খুশি৷ অবশেষে ছেলের এক গতি হবে এই ভেবে, শিউলিও তখন নিভানকে নানান কায়দায় বোঝাতে থাকেন। মায়ের বিভিন্ন যুক্তিতে নিভণ তখন ধরাশায়ী। পাল্টা বিরোধ তখন ওর ভীষন নড়বড়ে। ওর মনেও ইচ্ছে জাগলো, কেউ যদি সত্যিই ওকে, এতোটা শুদ্ধ আবেগে, জড়িয়ে আগলে রাখতে পারে, তাহলে এতে মন্দ কিসের? ওদের ছোট পরিবারে নতুন সদস্যের সংযোজন ঘটলে কি ভালো হয় না? মানব মনের, ভালোবাসার প্রতি থাকা আজন্ম তৃষ্ণা তখন নিভানকেও পেয়ে বসলো।

– এটা কেমন কথা নিভান? ভোলার কি আছে?
– মনে থাকলে, কি আর আজ এমন আচরণ করতে তুমি?
– কি করেছি আমি? আমার দোষটা ঠিক কোথায়? আমাকে এমনভাবে দোষারোপ করছো, যেন আমি কোন আসামী! তোমার বড় কোন ক্ষতি করেছি!
রত্না ক্ষুব্ধ কন্ঠে মৃদু চেঁচিয়ে উঠেছে। নিভান তাতে গা ভাসালো না। দৃষ্টি সরিয়ে দূর অন্তরীক্ষে নিবদ্ধ করে বললো,
– আমি যখন তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম তখন সবার আগে বলেছিলাম,
‘ আমার পরিবার আমার জন্য সবার আগে। মা আর বোনকে সুখে রাখাই আমার মূল সংগ্রাম। তুমি যদি আমার আগে তাদের অগ্রাধিকার দাও, তাহলেই বুঝবো, আমার প্রতি থাকা তোমার ভালোবাসায় কোন খাদ নেই রত্না’।
আমি নিজের জন্য কিছুই চাই নি রত্না। শুধু মা আর নিবুর জন্য এক আপনজন চেয়েছিলাম। অথচ তুমি আমায় মিথ্যে আশ্বাস দিয়েছিলে। আমার সেই সামান্য চাওয়াটাও পুরন করতে পারলে না।
– পরিবার ভক্ত ছেলেরা কখনও ভালো স্বামী হতে পারে না নিভান। এই কথাটা তুমি প্রতি পদে পদে প্রমান করে এসেছ!
রত্নার ক্ষোভ ঝরা কন্ঠে আর অবাক হয় না নিভান। ওর যা বোঝার ছিল সেটা অনেক আগেই ওর বোধে চলে এসেছে। নতুন করে আর কিছুই জানার নেই।
– ভুল বলো নি৷ আমি অবশ্যই পরিবার ভক্ত এক ছেলে। আমার আব্বুর থেকেই শিখেছি, কিভাবে পরিবারকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হয়। আব্বুর শিক্ষা কিভাবে ভুলি?
– তোমার আব্বু বোধহয়, অন্যের মেয়ের জীবন নষ্ট করাও শিখিয়েছিলেন?
রাগের স্পর্শে রত্না, কি বলছে, সেটা ওর নিজেরও আয়ত্তে নেই এখন।
– মুখ সামলে কথা বলো।
– তুমি আমাকে সেই পরিস্থিতিতে আর রাখো নি!
নিভান এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কষ্ট কি রত্নার একার হচ্ছে?

– কোম্পানির সাথে আমি কন্ট্র্যাক্টে বাঁধা ছিলাম। এজন্য দেশে আসা মোটেও সম্ভব ছিল না। এ সত্য বারংবার বলার পরও তুমি আমাকে মিথ্যাবাদী বানিয়েছ। আমাকে আমারই পরিবার থেকে দূরে সরে আসার জন্য যতভাবে সম্ভব, ম্যানিপিউলেট করেছ। অথচ আমার মায়ের মতো মমতাময়ী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যেই ননদকে তোমার অসহ্য লাগে, গলার কাটা মনে হয়, ওর তো এই দুনিয়া, সমাজ সম্পর্কে তেমন কোন জ্ঞানই নেই। নির্বোধ একজন৷ এই নির্ঝঞ্ঝাট, অনাড়ম্বর সংসার পেয়েও তুমি আগলে রাখতে পারলে না রত্না।
নিভানের কন্ঠ বিষাদ মাখা। আফসোসে অন্তঃস্থল ক্লান্ত। এ সমস্ত অভিযোগের মুখে, রত্না নিরুত্তর রইলো।
– তোমার মাঝে মানবিকতার অভাব রত্না। ইউ ল্যাক হিউম্যান ইমপ্যাথি! শেষ পর্যন্ত কি করলে? ছলচাতুরী করে আমার বোনের বিয়ে দিলে একজন ডিভোর্সি লোকের কাছে, তাও ওর চরিত্রে দাগ লাগিয়ে। কিন্তু দেখো, এতে তোমার সামান্য অনুশোচনা অবদি নেই। নারী হয়ে অন্য নারীর ক্ষতি হওয়া তোমায় আঘাত করে না! এতোটা পাষাণ তুমি!
নিভানকে এতো শান্ত কণ্ঠে কথা বলতে খুব কমই শোনা যায়। স্বাভাবিক কথোপকথনেও ওর মাঝে থাকা গাম্ভীর্য ভাব বিপরীত পক্ষকে অস্বস্তি অনুভব করাতে পারে অথচ আজ, ওর মাঝে এক ভিন্ন স্থিরতা।

– আচ্ছা আমার পরিবারকে নাহয় বাদই দিলাম। তুমি তো আমাকে বিয়ে করেছিলে, ভালোবাসার কারণে তাই না? অথচ বলতে পারবে, এতোগুলা বছরে, সেই ভালোবাসা আমাকে কখনও অনুভব করিয়েছ কি তুমি? কখনও জানতে চেয়েছ আমি কেমন আছি? আমাকে দু চোখে শুধু দেখে গিয়েছ, কিন্তু মনের চোখ দিয়ে পড়তে পারো নি। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেও, আমার একাকিত্ব বুঝতে পারো নি তুমি। সম্পর্কে ভালো থাকা কি কখনও একপাক্ষিক হয়? তোমার জেদ, রাগ, আমার প্রতি থাকা অবিশ্বাস ও অগুনিত অভিযোগ, ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কটা গড়ে ওঠার আগেই শেষ করে দিয়েছে। সবসময় শুনে এসেছি, মনের মানুষের সাথে কথা বললে, সকল প্রকার অশান্তি কেটে যায়। অথচ ক্লান্ত দিনশেষে, আমি যখন তোমার দ্বারে পৌছাতাম, তখন নিজেকে আরও পরিশ্রান্ত লাগতো। তুমিই বলো, সব কি আমার একারই ভুল? আমি কি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি নি? আমার পরিবারের প্রতি থাকা তোমার সকল বিদ্বেষ মেনে নিয়ে, বারংবার বুঝিয়ে একাধিক সুযোগ কি আমি দেই নি তোমাকে?
রত্না আক্রোশ নিয়ে চায় নিভানের পানে। অনড় দৃষ্টি রেখে বলে,

– ডোন্ট প্লে দ্যা ভিক্টিম কার্ড নিভান! এখন সব দ্বয়াভার আমার কাঁধে? সত্য তো এটাই যে তুমি আমাকে কখনও পছন্দ করো নি। নাহলে এতোগুলা বছর আমাকে নিজ থেকে দূরে রাখতে না। আমি বারবার আসতে চাওয়ার পরও এভাবে এড়িয়ে যেতে পারতে না।
– আমার মরহুম আব্বুর রেখে যাওয়া দায়িত্ব হলো আমার মা আর বোন। ছোট্ট একটা পরিবার! অল্প কিছু কর্তব্য! তবুও তুমি সেটা সহ্য করতে পারতে না। আমাকে নানানভাবে ব্রেইন ওয়াশ করার চেষ্টা করতে। নারী যেমন সৃষ্টিকারী তেমনই বিনাশিনী। তোমাকে কাছে নিয়ে আসলে, একসময় আমি ঠিকই আমার পরিবার থেকে দূরে সরে যেতাম রত্না। আ’ম নট সো নেইভ দ্যাট আই কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট!
নিভান সামান্য চেচিয়ে উঠলো শেষ কথায়। যে শক্ত রূপের সাথে রত্না পরিচিত, তা ফিরে আসতেই গুটিয়ে গেলো সে। মাথা নিচু করে বললো,
– আমি জানতাম, নিজেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করার জন্য তুমি এসবই করবে। গিল্টি ফিল করা থেকে বাঁচতে চাইছো যে!

– নিজের এই ম্যানিপিউল্যাটিভ সত্তা থেকে বেরিয়ে এসো। আজ কাজে দিবে না সেটা। ডোন্ট ইভেন ডেয়ার টু প্লে দ্যাট ডার্টি গেইম উইথ মি!
সহ্য হলো না রত্নার। আসন থেকে তড়িৎ উঠে, তেড়ে এলো নিভানের দিকে। গলার কাছটায়, সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পোলো শার্টের কলার আঁকড়ে ধরে, মৃদু চেঁচিয়ে উঠে বললো,
– তো কি করতো চাইছো তুমি, হ্যা? ছেড়ে দিবে আমাকে? এই রত্নাকে? এতোই সোজা মনে করেছ? আমার জীবনের এতগুলো বছর নষ্ট করে এখন নাটক করছো?
একবার শান্ত চোখে নিজের কলারের দিকে তাকায় নিভান। অতঃপর শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রত্নার দিকে। সেই চোখে হঠাৎ করেই জ্বলে উঠলো চাপা, ভয়ংকর এক ক্ষোভ!
– এই নিভান ফারুকী, তোমাকে কখনও এক বিন্দুও স্পর্শ করে নি। এখন সেজন্যই কি এতো তাড়া তোমার মাঝে? আমাকে বাধ্য করো না রত্না!
অপমানের জ্বলন্ত কয়লা যেন ঢালা হলো রত্নার দু কানে। ক্রোধে দন্ত কপাটি চেপে, হিসহিস করতে তৎক্ষনাৎ সরে এলো ও।
– নিভান!
রোষানলে মোড়া সেই কর্কশ ডাক! নিভান গায়ে মাখলো না। ধীর সুস্থে উঠে এলো সেখান থেকে। রত্নার মুখোমুখি দাড়িয়ে বললো,

– আমি তবুও, তোমাকে এক সুযোগ দেওয়ার ইচ্ছে নিয়েই দেশে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, তোমার ভুলগুলো তুলে ধরলে, শান্তভাবে বললে, তুমি বুঝতে পারবে। অথচ দেখো, বিন্দুমাত্র অনুশোচনা অবদি নেই তোমার মাঝে।
– আমি যা করেছি ভালোর জন্য করেছি। অনুশোচনা কেন থাকবে?
– যে ভালোতে অন্যের খারাপের সম্ভাবনা থাকে, সে ভালো করতে আমি শিখি নি।
– ওহ জাস্ট কাট দ্যা ক্র্যাপ!
– যাকে বাজে কথা বলছো, তারা হলো আমার পরিবার!
রত্না মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। এসব শুনতে শুনতে ও ক্লান্ত! কিন্তু তখনই কানে বাজে, বজ্র নিনাদী কন্ঠে ভয়াল কিছু শব্দ!
– আমি নিভান ফারুকী, তুমি, রত্না মাসুদকে আমার স্ত্রী হিসেবে মানি না। আমি তোমাকে তালাক দিলাম।
হতভম্ব হয়ে তাকায় রত্না। নিভান তখন নিশ্চল দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মুখের ভাব নিরেট, কঠোর! অনড় ভাব তার অবয়ব জুড়ে! বিস্ময়ের চূড়ায় পৌছে রত্না হঠাৎই শব্দ করে হেসে উঠলো। পরপর দু’হাতে তালি বাজিয়ে বললো,
– এভাবে বললে আর হয়ে গেলো? এতো সহজে আমাকে ছেড়ে দিতে পারবে বলে মনে হয় তোমার? আমি রত্না এতো সস্তা নই!
নিভান, পেছনে দু হাত বেঁধে, টান টান হয়ে, শিরদাঁড়া সোজা করে বললো,
– আমার মুখ্য স্বীকারেক্তি তেমাকে বুঝিয়ে দিলাম। তবে আমি এতোটাও নীতি বিবর্জিত নই৷ অবশ্যই সঠিক সময় এবং পরিস্থিতি সাপেক্ষে, আদালতে দেখা হবে আমাদের। তোমাকে তোমার প্রাপ্য সম্মানী থেকে আমি বঞ্চিত করবো না।

– তোমাকে আমি এতো সহজে ছাড়বো না নিভান!
– কি করবে?
রত্না এ পর্যায়ে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠে। কুটিল চোখে তাকিয়ে বলে,
– যে ভয়ে তুমি দেশ ছেড়েছিলে সেটা সত্য করে ছাড়বো আমি!
নিভান কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলো। মাথা নাড়িয়ে বললো,
– আর সেই তুমিই, আমাকে ভালোবাসো বলে দাবি করো।
– স্বার্থের উপরে কিছুই না।
নিভানের কন্ঠস্বর এবারে নেমে এলো৷ দৃষ্টি সরিয়ে হ্রদের পানিতে নিবদ্ধ করে বললো,
– আমি ভালোবাসার জন্য বিয়ে করেছিলাম। স্বার্থ নয়। এই স্বার্থের জন্যই তো মানুষ হারায়৷
– আমার কথাকে হালকায় নিবে না নিভান৷ এখনও সময় আছে, সব ঠিক করার।
– নিভান কাওকে ভয় পায় না রত্না। ডু এজ ইউ উইশ!
– এখন তোমার মা, বোনের দায়িত্ব নেই? তুমি জেলে পঁচে মরলে, কে দেখবে তাদের?
– সেই চিন্তা তোমার নয়।
– নিজের পায়ে আবারও কুড়াল মারলে নিভান। সময় ভিন্ন, তবে কারণটা ঠিক একই। সেই পরিবারই!
– পরিবারের উপরে কিছুই নেই। এবং আফসোস তুমি সেটা বুঝলে না কারণ আমার পরিবারকে কখনও আপন ভাবো নি তুমি।
– জাস্ট গো টু হেল!

বিকৃত মুখে, চপল পায়ে প্রস্থান নিলো রত্না। উত্তপ্ত পরিবেশ নীরবতায় নেমে এলো সহসা। ধীরে ধীরে নিভানের নিরেট অবকাঠামো নুইয়ে এলো। অন্তঃস্থল চিরে আসা দীর্ঘশ্বাসে কাবু হলো মন মস্তিষ্ক। ক্লান্ত পায়ে, হেটে আবারও বসে পরলো ছায়ার নিচে। চুপচাপ বসে থাকলো একাকিত্বে ডুবে। নানান ভাবনায় মত্ত হয়ে। মাথার উপর খাড়াভাবে কিরণ দেওয়া সূর্যটাও একসময় হেলে পরলো৷ অতঃপর নিশ্চল নিভানকে টলাতে তখন কল এলো শিউলির।

নিবৃতা পর্ব ২৯

– বাবা, কোথায় তুই? আমরা সবাই সে কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি।
বাসার কথা সবেমাত্র খেয়ালে এলো নিভানের! বেখেয়ালি হওয়ায়, নিজের উপর ওঠা রাগকে চেপে বললো,
– সরি মা। আমি এখনই আসছি।
উঠে এলো নিভানকে। পাশে রাখা সুটকেস দুটো দু হাতে নিয়ে প্রস্থান নিলো এখান থেকে। ওর জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে রইলো এই স্থানটি, যেখানে জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্কের ইতি টেনেছে আজ।

নিবৃতা পর্ব ৩১