নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৯
আশিকা আক্তার সোহাগী
পৃথিবীতে মেধার জোরে বিখ্যাত কোন কিছু আবিস্কার হয়নি।হয়েছে কৌতুহলী মস্তিস্কের কৌতুহলের জন্য।দেখা যায় ,বড় বড় বিজ্ঞানী সবাই প্রচন্ড কৌতুহলী ছিলেন।এবং তাদের পাঠ্যগত মেধার অবস্থা আহামরিও ছিলো না।
জিয়ানারও যেকোন বিষয় একবার মাথায় ঢুকলে সেটার বিষয়ে কৌতুহল থাকে আকাশচুম্বী। ছোট থেকেই ডানপিঠে হওয়াই ডর ভয় অন্যদের তুলনায় কম।বাঘ ঘুমালে নাক ডাকে কিনা এমন কৌতুহল জাগলে সে বাঘের খাঁচায় ঢুকে যাবে অনায়াসে। সেখানে নিবিড় আর কি? তাই তো সুবোধ বালিকার মতো নিবিড়ের কমান্ড মেনে পেছন পেছন ফ্ল্যাটে ঢুকে।তার এখন নিবিড়কে জানার কৌতুহল।একবার মনে হয় এই লোক আগাগোড়া ভণ্ড।আবার মনে হয় না অতটাও খারাপ না।চাইল্ডহুড ট্রমায় এমন হয়েছে।সেই ট্রমাটা আসলে সত্যি কিনা এটা জানার তার যত কৌতূহল।ভাবতে ভাবতে ফ্ল্যাটে ডুকে নিবিড়ের পেছন পেছন। মাথা নিচু থাকায় নিবিড় যে সামনে ছিলো সেটা দেখেনি। তাই নিবিড়ের বুকে ঠেস লাগে যখন ,তখন মাথা উঁচু করে পিটপিট করে তাকায়।বেশ শক্ত কামড় দিয়েছিলো।একসাথে বাম পাশের দুইঠোটই কেটে গেছে।
-ওভার থিংকিং শেষ?
জিয়ানা হাত উঠিয়ে ঠোঁটের কাটা জায়গায় ছুঁয়ে বলে,
-আপনি এত অদ্ভুত কেন?কত গুলা মানুষের ক্ষতি হয়েছে জানেন?
-জ্বি জানি।রেজাউলের খাস লোকদের সব লুট হয়েছে।সাধারণ পাবলিকের কিছু হয়নি।তোমার অনুসন্ধান ফেইল করেছে এইবার।
-বাজারের একঢালা লুটপাট হয়েছে। আমি নিজ চক্ষে দেখেছি।
-হ্যাঁ কিছু সাধারণ জনগণের ক্ষতি না হলে ব্যাপারটা সন্দেহ জনক হয়ে যাবে না?
-তাহলে বলুন স্বাধীনতা ,গনতান্ত্র এসব ভোগাস সব?
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-হ্যাঁ সেটাই। এই দেশের জনগন মনে করে স্বাধীনতা হচ্ছে ছেলের হাতের মোয়া কিংবা গাছের পাকা ফল। রাজনীতিবিদিরা পেরে তাদের হাতে দিবে আর তারা সেটা ঘরে বসে উপভোগ করবে।দেশের স্বার্থে কতজন রাস্তায় নামে? অন্যানের বিরুদ্ধে কতজন প্রতিবাদ করে? নিজের কাজ সবার আগে দ্রুত হাসিলের জন্য ঘুষ কারা দেয়? বাচ্চা স্কুলে ভর্তি থেকে চাকরি পাওয়ার জন্য ,এমনকি সামান্য ট্রেইনের টিকিটের জন্যও লবিং করা এই দেশের মানুষের স্বভাব। এখানে প্রতিটা মানুষ অসৎ।
-ঠিক ঠিক। সব মাছে গু খায় নাম হয় মাগুরের।তেমনই প্রতিটা মানুষই অপরাধী নাম রাজনীতিবিদদের। তবে পার্সেন্ট ধরে কথা বলুন সুখ।দেশে যদি একজনও ইমানদার লোক থাকে আর আপনি তাকে সবার মাঝে ফেলেন।পাপটা আপনার খাতাতেই লেখা হবে।সামনে থেকে সরু খাম্বা লোক।
বলে হাত দিয়ে সরিয়ে ভেতরে ঢুকে জিয়ানা।নিবিড় হুডির টুপি ধরে টেনে কাছে বলে,
-আগে হিসাব চুকাও?
-কিসের হিসাব?
-টইটই করে কোথায় কোথায় ঘুরেছো? সজল তোমাকে খুজে পায় নাই কেন?মেহেদীর সাথে এত দূর একা গেছো কেন?কাল বস্তিতে সারারাত ছিলা কেন? পার্টিতে ওমন ড্রেস পড়েছিলা কেন?ওয়েটার অনেক হ্যান্ডসাম? তাকে চোখ মারা?নিজের চোখমুখের দশা এমন কেন?
-আরে থামেন থামেন। এত প্রশ্ন একবারে করলে উত্তর দিবো কিভাবে? যান আগে অয়েন্টমেন্ট লাগান ঠোঁটে। আর আমার ক্ষুধাও লাগছে।আপনার পিপির পার্টিতে ভুজুংভাজুং খাবারে আমার পেট ভরেনি।
-পিপি?
-আপনার পরকীয়া প্রেমিকা। আপনি এখন বিবাহিত না? বিবাহিত হয়ে প্রেম করলে তাকে পরকীয়া বলে।
-খরগোশের মতো বউ থাকতে আমি প্রেম করতে যাবো কোন দুঃখে?
জিয়ানা নিজের দাঁতে হাত দিয়ে বলে,
-আমার দাঁত ব্যালেন্সড আছে। খরগোস হতে যাবো কোন দুঃখে?
নিবির নিজের দুইহাতে জিয়ানার দুই গাল আজলায় দিয়ে বলে ,
-চোখ গুলা যে খরগোশের মতো তার বেলায়?
জিয়ানা কপাল ভাজ করে বলে,
-আজাইরা। আমার চোখ নরমাল। আপনারও এমনই।
নিবিড় ছেড়ে দেয় জিয়ানাকে।তার এই মেয়ের সান্নিধ্যে আসলেই উল্টাপাল্টা চিন্তা ঘুরে মাথায়।নিজেকে নিজেই চিনতে পারে না।না তার কঠিন তাপস্য করতে হবে।নারী জাতি হচ্ছে পৃথিবী ধ্বংসের কারন। এদের ছলনায় পড়ে রথি মহারথিও ধ্বংস হয়েছে।পুরা টয় নগরী ধ্বংসের কারন একজন নারী।
ভেতর যেতে যেতে বলে ,
-ফ্রেশ হয়ে নাও।খাবার অর্ডার করছি আমি।
নিবিড় ওয়াশরুমে ঢুকলে জিয়ানা উঁকি মেরে দেখে ফটাফট নিজের কাজে লেগে পড়ে।বেটার চোখে যে কামনা সেটা তো আন্ধাও বলতে পারবে।কথায় কথায় চিপকা চিপকি করা আজ বের করবে।আজ তো নিবিড়কে নাকানি চুবানি খাওয়াবেই।মনে মনে ভেবে ,হোঁ হা হা করে হেঁসে নেয়।
আধাঘন্টা পর নিবিড় বের হয় ওয়াশরুম থেকে।শাওয়ার নিয়ে সে সপ্তাহে তিনদিন স্টিম বাথ নেয়।তাই আজ দেরি। কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। ব্ল্যাক আউট হওয়ার কথা না। এপার্টমেন্টে জেনারেটর আছে।সুইচবোর্ডের লাল আলোতে বুঝলো জিয়ানা ইচ্ছা করে অফ করে রেখেছে।তাই গর্জে উঠলো জিয়ানা বলে।পরমুহূর্তেই লাইটার জ্বালানোর শব্দ হলো, একটা ক্যান্ডেল জ্বলে উঠলো রুমের একসাইডে।ক্যান্ডেলের আলোয় ভেসে উঠলো একজোড়া লাল টকটকে অধর।
নিগুঢ় ক্যাটকেটে অন্ধকারের মাঝে একছটা আলোর পুলের মাঝে লাল টকটকে ঠোঁট জুড়া কোন সদ্যফোটা পদ্মের চেয়ে কম লাগছে না নিবিড়ের কাছে। এটা কোন মানবী হতেই পারে না।এতো সাক্ষাৎ মায়াবী নারী। ম্যাগনেটিক পাওয়ার আছে যার।নিবিড়ের শরীর আত্মা সমগ্র টেনে নিচ্ছে নিজের কাছে।না এই হবে হইতো একশো আফ্রোদিতি দেবির পূর্ণ ভার্সন।না না ক্লিওপ্লেট্রাও এর ধারে কাছে নেয়।পৃথিবীতে যত কবিতা সব এই রক্তকরবী অধরের জন্যই রচিত।যত মানব সন্নাস হয়েছে সবাই একে পাবে না বলেই সন্ন্যাসী জীবন বেছে নিয়েছে।
এই লোচনে চেয়ে চেয়ে নিবিড় তো পলিটিক্স ছেড়ে হিমালয়ে বসে শায়োরী লিখতে পারবে বছরের পর বছর।এই তো তার নীতিহীন জীবনের একছত্র নীতির আলো।কে বলে নিবিড়ের কেউ নেই? এইতো নিবিড়ের মহামূল্যবান পরশপাথর। যার ছোঁয়ায় কঠিন পাথুরে জীবনে শীতল ঝর্ণার আগমন ঘটেছে।তীব্র শীতের পর নরম বসন্তের ফুল ফুটেছে।যার অবাধ্যতায় ভন্ডুল হয়ে যায় অলিখিত প্রটোকল। যার খিলখিল শব্দে হাজার ময়ূরী পেক্ষম তুলে নৃত্য করে।যার সংস্পর্শে দুদন্ড শান্তি মেলে অশান্ত অসুখের জীবনে।
জিয়ানা হেলেদুলে এগিয়ে এলো নিবিড়ের কাছে।নিবিড়ের চোখেমুখে একরাশ মুগ্ধতা।যাক প্ল্যান কাজে দিয়েছে। জিয়ানা মনে মনে ভাবে,বেটা তোকে খু*ন করবো কামনার বিষে।তাছাড়া সত্যি সত্যি নিবিড়ের নারী ঘটিত ফোবিয়া যদি থাকেও আজ প্রমাণ হয়ে যাবে।সেইফটির জন্য একটা কাটা চামচ কোমড়ে গুজে রেখেছে।ঘাড়ে গেথে দিবে বেশি বাড়াবাড়ি করলে।
নিবিড়ের ঘোর কাটানোর জন্য জিয়ানা শিস বাজায়।পরক্ষণেই মনে পড়ে “এই যা পরিবেশটাকেই ঘেটে দিলাম।কই আমি হেলেদুলে ন্যাকুর পার্ট প্লে করবো তানা। বখাটেদের মতো শিস দিতাম? ছ্যাহ।জিয়ানা তুই নিজেই নিজের বড় শত্রু।
নিবিড় ঘোর কাটে তবে মন্ত্রপুতের ন্যায় এগিয়ে এসে আজলায় ভরে জিয়ানার মুখ উপরে উঠায়।মুগ্ধ নয়নে জিজ্ঞেস করে ,
-শাস্তি সব মাফ করবো যদি একটা প্রশ্নের উত্তর দাও?
-গো এহেড।
-এই সাজের অন্যকোন উদ্দেশ্য আছে?নাকি আমার জন্যই সেজেছো?
জিয়ানা থতমত খেয়ে আইডাই করে বলে,
-অন্য উদ্দেশ্য থাকবে কেনো? আপনার জন্যই..
-রিয়েলি? রিগ্রেট করবে নাতো?
জিয়ানা মনে মনে ভাবে দূর ব্যাটা এগুলা কথা ছাড়। জিয়ানা এগিয়ে এসে নিবিড়ের উন্মুক্ত বুকে তর্জনী আঙুল দিয়ে আকুলিবিকুলি করে। হটনেস ব্যাটার সেন্ট পার্সেন্ট মনে মনে বললেও মুখে বলে,
-আপনি আমার স্ত্রী ,দুত্তেরিকি আমি আপনার স্ত্রী। আমার উপর আপনার পূর্ণ হক আছে।এখানে রিগ্রেটের কি আছে? এসকেপিস্টের মতো আমি ভাবতে পারি না নিশ্চয়?
নিবিড় একেবারেই লেপ্টে যায় জিয়ানার সাথে।দুইহাত জিয়ানার উন্মুক কোমড়ে রাখে।তার নজর জিয়ানার চেহারাময় ছুটে চলছে।জিয়ানা মাথা তুলে বলে,
-এইভাবে তাকাবেন না কাবলিওয়ালা। আপনার এই ধারালো চাহনিতে একটা নারী হৃদয়ের জন্য মারাত্মক যন্ত্রণার। হায় মারজাবা।
বলে মাথা ঠেকায় নিবিড়ের বুকে।
-এক্টিংয়ে তুমি একেবারেই কাচা জিয়ানা।
বলে কোমড় থেকে টান দিয়ে কাটাচামচ বের করে ফ্লোরে ফেলে দেয়।তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
-সেই প্রকৃত পুরুষ যে নিজের তীব্র কামবোধকে দাবিয়ে রাখতে পারে। নিজের চাহিদাকে যেকোন মাধ্যমে মিটানো পুরুষত্ব নয়। সেটা পশুত্ব। কারণ পশুরও কোন বাচবিচার কিংবা আবেগ বিবেক নেই। বুঝেছো? আমাকে অন্য কারো সাথে ঘুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। তোমাকে আমার নিজ স্বার্থেই প্রয়োজন।আমার মনের আর শরীরের শান্তি তোমাতেই নিহিত। তারমানে এই নয় যে ছলনা করবে আমার সাথে।বের হউ রুম থেকে এক্ষুণি। আউট!!
বলে টেনে রুম থেকে বের করে দিয়ে মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয়।জিয়ানা বেক্কেল হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবে। এটা কি হলো? ঘোল খাওয়াতে যেয়ে নিজেই ঘোল খেয়ে ঢোল হয়ে গেলো।যাহ শ্লা।চতুর মানুষের সাথে পেরে উঠা কঠিন।একজন মতিনইন্না মার্কা জামাই পেতো,সারাদিন নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতো জিয়ানা।দরজায় নক করে বলে,
-ওই ব্যাটা বদ।কি এক্টিং করেছি হ্যা? এই ঘরে আপনি ছাড়া আর কে আছে? জ্বীনের জন্য সেজেছি নাকি? ফালতু আদমী কাহিকে।নিজেই এসে চুম্মাচাটি করবে আমি গেলেই দোষ।কাটাচামচ রেখেছি কন্ট্রোল করার জন্য। আপনার স্প্রিরিট ব্রেকার হিসেবে।ভারি ট্রাক রাস্তায় চললে যেমন স্প্রিরিট ব্রেকার দিলে রাস্তার ক্ষতি কম হয়। তেমন এই কাটা চামচ আমার ক্ষতি আটকাতে সাহায্য করতো। ভণ্ড লোক।ভালোর কাল নাই তাই না? আমার কাপড়-চোপড় গুলা দেন। এই সং সেজে আর বসে থাকা পসিবল না।
নিবিড়ের রাগ কমে আসে জিয়ানার উল্টাপাল্টা লজিক শুনে।কিন্তু দরজা খুলে না।এদিকে জিয়ানা বসে থাকতে থাকতে সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘন্টা খানেক পর নিবিড় বের হয় রুম থেকে।এখনো লাইট অন করেনি। সেই মোমটা এখনো টিমটিম করে দ্রুতি ছড়াচ্ছে টি-টেবিলের একপাশে।নিচে একটা পাটের গ্লাস হোল্ডার দেয়া।জিয়ানার আক্কেল দেখে অবাক হয় নিবিড়।মোমটা প্রায় শেষের পথে আর মিনিট খানেক পরেই আগুন লেগে যেতো হোল্ডারে।
টিভিতে ডরিমন চলছে ,নবিতা ডরিমনকে চিপকে ধরে বড় বড় মুখে কি যেনো বলছে।টিভির আলো সোফায় আধো আলো আধো ছায়ায় জিয়ানাকে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট।শাড়ি গায়ে কম ফ্লোরে বেশি পড়ে আছে।টিভি আর মোমের আলোয় ঘুমন্ত জিয়ানাকে অপার্থিব লাগছে।নিবিড় নিজের অজান্তের এগিয়ে যায়।কাছে গিয়ে এলোমেলো হয়ে আসে ভেতর আর বাহির।লিপষ্টিক লেপ্টে এপাশ থেকে ওপাশ। স্লিভলেস ব্লাউজে উন্মুক্ত বিউটিবন আর ক্লিভেজ যেনো সাক্ষাৎ সর্বনাশ নিবিড়ের জন্য।আর তার নিচেই নিবিড়ের দূর্বলতা সেই কালো তিল।যেটা ঝলঝল করছে ফর্সা ত্বকে।
নিবিড় ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে আস্তে আওড়ালো,
“কামনা,বাসনা,ইচ্ছে ও আশা
বাড়তেই পারে ,বাড়লে পিপাসা
সেরকমই ,ঘটে যাচ্ছে সকলেরই জীবনে…
নয় প্রতিকার,নয় প্রতিরোধ
নিভৃতে মন, স্বাধীন অবোধ
মন চায় ,এই শরীরটা যাক স্বপনে।
– সুবীর সেনগুপ্ত”
নিবিড় নিজেকে টেনেও সরাতে পারে না এই গভীর খাত থেকে।নিজের দূর্বল মূহুর্তে মানুষ সব ফালতু লজিক দাঁড় করায়।নিবিড়ও সেটাই করলো। তার স্ত্রী জিয়ানা। তাকে দেখার আর ছুঁয়ার সম্পুর্ন অধিকার তার আছে।আগে কখনো কোন নারীর প্রতি এই অনুভূতি আসেনি।জৈবিক চাহিদাহীন তো আর সে না।নিজের পুরুষগত জ্বীনের যে একটা আকাঙ্খা সেটা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই।তাই আর কালক্ষেপ না করে এগিয়ে যায়। আর তড়িৎ-গতিতে জিয়ানার নেকে মুখ গুজে দিয়ে শ্বাস টেনে নিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।জিয়ানার ঘুমের দফারফা।
-ওই মা।
বলে চিল্লিয়ে উঠলে নিবিড় মুখ তুলে বলে,
-আই কোডন’ট ওনার ইউ টু নাইট।এন্ড ফর দ্যাট আম নট সরি এট অল জিয়নকাঠি। আমার কোন দোষ নেই তুমি নিজের ট্র্যাপে নিজে পড়েছো।
ঘুমুঘুমু কন্ঠে জিয়ানা বলে,
-কে যেনো বলল, যে পুরুষ নিজের কাম..উম্মম…
নিবিড় জিয়ানার কথা বালতি বন্ধ করে দিলো পরমুহূর্তেই। হাতরে টিভির রিমোট খুজে অনুমানেই বন্ধ করে দিলো।কিন্তু ভুল বাটনে চাপ লেগে টিভি হোল্ড হয়ে গেলো।অধৈর্য্য নিবিড় ছুড়ে মারে রিমোট। নবিতা আর ডরিমন অবাক তাকিয়ে টিভির স্কিনে।
জিয়ানার নড়াচড়ায় নিবিড় বিরক্ত হয়। শাড়ির আঁচল টেনে নামিয়ে হাত পিছমোড়া করে বেধে দেয় সেটা দিয়ে ।জিয়ানা চিল্লাচিল্লি থামিয়ে অবাক হয়ে যায় নিবিড়ের উদ্ভট আচরণে। নিবিড়ের পাগলামি বাড়তে থাকে ,সেটা জিয়ানা না থামাতে পারে আর না বাধা দিতে পারে।হাত বাধায় নড়াচড়াও করতে পারছে না। উন্মাদ নিবিড় পাগলামির শেষ সীমানায় এসে একটানে জিয়ানার ব্লাউজ খুলে নেয়।
জিয়ানা রাগে অপমানে কাপতে থাকে।তারপর নিজের ডান পায়ের সর্বশক্তি দিয়ে নিবিড়ের বুক বরাবর লাত্থি দিয়ে ফেলে দিয়ে চিল্লিয়ে বলে উঠে,
-জানুয়ারের বাচ্চা।স্বামী বলে কি সব জায়েজ? একদম কাছে আসবি না।খবরদার। ৫০০টাকা দিলেই নিজের চাহিদা মিটাতে পারবি এমন পল্লির অভাব নেই।সেখানে যা।আমি জিয়ানা,ভালোবাসার অধিকার ছাড়া আমার একটা পশমের ছুঁয়াও তুই পাবি না।মরে যাবো তবুও তোর ভোগের বস্তু হবো না।
অপরদিকে নিবিড় ফ্লোরে পড়ে উন্মুক্ত জিয়ানাকে দেখে আর পাশের গ্লাস হোল্ডারের দাউদাউ করে জ্বলে উঠা আগুন দেখে। আচম্বিতে স্নায়ুতন্ত্রে প্রচন্ড চাপ অনুভূত হয়।তার চোখে ভেসে উঠে একুশ বছরের আগের ঘটনা ,
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার রাস্তায় পানি খাওয়ার পর নিবিড়ের যখন বোধ হলো ,অদ্ভুত অচেনা পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করে । সেখানে সবাই অদ্ভুত পোশাক পড়া। এরমাঝে একদল লাশবাহী কাফিন আনে। সেটা থেকে এমন পঁচা গন্ধ আসছে যা থেকে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসে।পাশে ফিরে দেখে তার অন্য ভাইয়্যেরা অচেতন হয়ে পড়ে আছে।তাদের সবারই হাত পা বাধা।মাঝ বরাবর একটা কুৎসিত কালো স্তম্বের মতো একটা শিং ওয়ালা মুর্তি।যার শরীরের নিম্নভাগ লাল কাপড় দিয়ে ঢাকা।এরমাঝে অনেক গুলা অল্পবয়সী মেয়ে আনলো আরেকদল।মেয়েগুলোতে লাল রংয়ে অদ্ভুত ভাবে সাজানো।মনে হচ্ছে রক্তে গোসল করানো হচ্ছে।সবাই ঝিমাচ্ছে।
একজন বয়স্ক লোক একটা শামুকে করে পানীয় এনে প্রতিটা মেয়েকেই খাইয়ে দিলো। এরপর মেয়ে গুলা উন্মাদের মতো নাচা শুরু করে।আর নিজের শরীরের কাপড় খুলতে লাগলো।ছোট নিবিড় চোখ বন্ধ করে ফেলে।কিন্তু তাদের চিৎকারে বারবার চোখ খুলে আর ঘটনা দেখতে থাকে।ভয়ে কবিতরের বাচ্চার মতো কাপতে থাকে ছোট শরীর।নীলুফার শিখানো দোয়া দুরুদ আজ কিছুই মনে পড়ছে না।তবুও আয়াতুল কুরসী পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মাঝামাঝি গিয়ে ভুল হয়।
এরমাঝে মেয়ে গুলার হাতে একপ্রকার কালো ফুলের মালা দেয়া হলো। তারা নেচে নেচে সেই মালা কুৎসিত মুর্তিটাকে পড়িয়ে দেয়।তারপর আলখাল্লা পড়া লোক সবাই হাত ধরাধরি করে মেয়ে গুলোকে মাঝখানে রেখে বিভিন্ন মন্ত্র পড়া শুরু করে।
পরবর্তী ঘটনা দেখে নিবিড়ের স্নায়ুতে প্রেসার শুরু হয়। মনে হয় মানুষ জন্ম ভুল। মানুষের কাজ এতটা জঘন্য কি করে হতে পারে।নারী মানেই কি নোংরামি? সেই পানি পান করানো বৃদ্ধ কুৎসিত মুর্তির নিম্নাংশের কাপড় সরিয়ে দেয়।সেখান থেকে উন্মুক্ত হয় লম্বা পুং-জনন চিহ্ন। সেটা অত্যাধিক ধারালো।প্রতিটা মেয়েকেই স্বইচ্ছায় কুৎসিত মুর্তির সাথে সঙ্গম করে ততক্ষন ,যতক্ষন না হেমোরেজিক শক হয়ে সে মারা যায়।নিবিড়ের বমি শুরু হয়।বমি করতে করতে সেন্স হারায় কয়েক দফায়।প্রতিবার সেন্স ফিরে মেয়েদের আর্তচিৎকারে।
এরপর একেবারে সেন্স আসে রাতের শেষ প্রহরে।তাদেরকে পানি দিয়ে সেন্স আনানো হয়।তাকিয়ে দেখে তাদেরকে হাটু গেড়ে বসানো হয়েছে সেই কুৎসিত মুর্তিটার সামনে। সামনে বড় খর্বকায় দা হাতে একজন বিশাল দেহী কালো লোক।পাশে মেহেদী আর তার পাশে জনি কাঁদছে।যে কাঁদে তাকে এসে চাবুক দিয়ে মারা হয় পিঠে।রাফিন দুইবার পানি খাবো বলে। কিন্তু কেউ পানি দেয়নি। একজন এসে খুটিয়ে খুটিয়ে তাদের সারাশরীর দেখে যায়।তারপর হলুদের গুড়ার মতো ঝাঁঝালো কিছু একটা তাদের সারা শরীরে মাখানো হয়।
নিবিড় বুঝে তাদেরকে বলি দেয়া হচ্ছে।একবার নীলুফা তাকে গল্প বলেছিলো ” যা হয় তা মঙ্গলের জন্য হয় বলায় এক পন্ডিতের জেল হয়। কারণ রাজার আঙুল কেটে গেলে সেই পন্ডিত এই কথা বলেছিলো।কয়েকবছর পর সেই রাজা বনে শিকারে গেলে ,জঙ্গলিরা তাকে আটকায় আর বলির জন্য শোলে চড়ায়।পরে রাজার আঙুল নেই বলে বলি দেয়নি।তাই ছেড়ে দেয়।”
নিবিড়ের মনে পড়ে কিছুদিন আগে পাড়ায় খেলতে গিয়ে তারা সবাই পাশের এলাকার ছেলেদের সাথে মারা*মারি করেছে।এতে সবাই কম বেশি আহতও হয়েছে। শুধু রনি পালিয়ে আসায় সে অক্ষত।
নিবিড় মাথা ঝুকিয়েই বলে,
“আমরা সবাই আহত।আমার ডান পায়ের উরুতে ঝিনুক দিয়ে কাটা ,মেহেদির বা হাতের নখ উঠানো। রাফিনদার বাহুতে কামড়ের ক্ষত ,জনি ভাইয়ের ব্রু কাটা। আমরা সবাই অসুস্থ। ”
বৃদ্ধালোকটা এগিয়ে এসে ওদের সামনে বসে বলে,
-তাহলে তো কার্য সম্পুর্ন হবে না। সুস্থ স্বাভাবিক লেজ ছাড়া পাঠা লাগবে।এরা সবাই অসুস্থ।
আরেকজন এগিয়ে এসে বলে,
-একটা বলি না দিতে পারলে আবার একবছরের অপেক্ষা। আবার মেয়ে যোগাড়।
বৃদ্ধ বলে এদের মাঝে একজনের নাম বলে নাই এই ছেলে। নিবিড়কে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে কে কে অসুস্থ? নিবিড় আগায় না।রনি এবার শব্দ করে কেঁদে দেয়।কারণ সে নিজেই নিবিড়ের সাথে সবচেয়ে বেশি খারাপ ব্যবহার করেছে।তার ধারণা তার নাম ইচ্ছা করেই বলে নাই নিবিড়। চিল্লিয়ে বলে উঠে,
-তুই আমার নাম ইচ্ছা করে বলিস নাই নিবিড় তাই না? তুই এত স্বার্থপর? এখন যে এরা আমাকে মেরে ফেলবে।
নিবিড় কথা বলতে পারে না।এমন মুহূর্তে সে যে ওই টুকু চিন্তা করে বলতে পেরেছে এটাই তো অনেক ছিলো।মেহেদী ,রাফিন সহ সবাই অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নিবিড়ের দিকে।
তারপর যখন রনিকে টেনে সামনে নেয়,মেহেদী জনি আর রাফিন সবাই কেঁদে উঠে শব্দ করে।একমাত্র নিবিড় স্তব্দ হয়ে বসে ছিলো।
তাদের সামনেই রনিকে এককোপে বলি দেয়।সেই রক্ত ছিটকে আসে তাদের চোখে মুখে। সবাই সেন্স হারায় কিন্তু নিবিড় স্তব্দ হয়ে বসেই থাকে। বহুক্ষণ পর ঢলে পড়ে মাটিতে।”
সেই মুর্তির সামনে মর্শাল আর এখানে পাটের গ্লাসহোল্ডারের আগুন। পাশে উন্মুক্ত জিয়ানা।যে নিজের হাটু দিয়ে নিজেকে ডাকার চেষ্টা করছে।
এমন দৃশ্যে নিবিড় নিজের মস্তিস্কের স্থিতিশীলতা হারায়।সে ফিরে যায় সেই সময়ে।সেই নোংরা মেয়েগুলার কাছে।আজ নিবিড়ের হাত উন্মুক্ত। সে একাই শেষ করে দিবে সব গুলা নোংরা মেয়েকে।এগিয়ে গিয়ে গপ করে গলা টিপে ধরে জিয়ানার। পেছনে হেলে পা সোজা হয়ে যায় জিয়ানার। হাত বাধা থাকায় নিবিড়ের সুবিধা হয়।হাতের চাপ বাড়ায় নিবিড়।জিয়ানার চোখ বড় হতে হতে উল্টে যায়। জিহ্বা বের হয়ে আসতে চায়।দুই পায়ের উপর নিবিড় বসা তাই সেটাও নড়াচড়া করতে পারছে না।নিশ্বাস যখন প্রায় শেষ। জিয়ানা ভাবে এই পর্যন্তই ছিলো বুঝি তার জীবন?
না সে ভালোবাসা পেলো আর না দিতে পারলো।মনের সুপ্ত একটা ইচ্ছা ছিলো সুখী যৌথ পরিবারের।সেটাও পাওয়া হলো না।একবার জানা হলো না সত্যিকারের ভালোবাসার স্বাদ কেমন। সত্যিকারের পরিবারে বেঁচে থাকা কেমন। একজন সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষের পাগলামীময় ভালোবাসা পেতে কেমন লাগে।এতিমখানা করা হলো না। এত না পাওয়া নিজেই বুঝি তার জীবন প্রদ্বীপ নিভে গেলো।হায় আল্লাহ তবে কেনই বা পাঠালে? তবে এই শেষ মুহূর্তে সেতো বলে যেতেই পারে সুখকে যে ,ছেলেদের নাকি প্রেমে পড়তে ৮সেকেন্ড লাগে আর মেয়েদের কমপক্ষে ১৫দিন।কিন্তু জিয়ানার লেগেছিলো ৪৮ঘন্টা।
এতকিছু বলার সময় নেই।জীবনের শেষ দম ফেলার আগে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলো,
-সুখ।ভালোবাসি আপনাকে।
নিবিড়ের হাত কেপে উঠে।বাস্তবে সে কোথায় আছে যখন বুঝতে পারে মস্তিস্ক আর নিতে পারে না।স্নায়ুগুলো একে অপরের থেকে যেনো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। তাদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলো পরক্ষণেই। শরীরে যেনো হাজার হাজার বৈদ্যুতিক শকড লাগলো। চোখমুখ উল্টে শরীরে প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে পড়ে যায় কাচের টেবিলের উপর।
ঝনঝন শব্দে কাচের টেবিল ভেঙে পড়ে নিবিড় সহ।
হঠাৎ প্রচন্ড চাপের ফলে তারপর আবার হঠাৎ গলা মুক্ত হওয়াই জিয়ানা প্রচন্ড কাশা শুরু করে। কাশতে কাশতে নজর পড়ে নিবিড়ের দিকে।কাচের টুকরার উপর পড়ে খিঁচুনি দিচ্ছে।মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ আর ফেনা বের হয়ে আসছে থেকে থেকে।দাড়িতে লেগে যাচ্ছে সেই ফেনা।লম্বা শক্ত শরীর বেকে আরও শক্ত দেখাচ্ছে। দুই পা মাটিতে ঘষে যাচ্ছে অনবরত।
জিয়ানা হুড়মুড় করে পড়ে সোফা থেকে।হাতের বাধন খুলার চেষ্টা করে ,কিন্তু পারে না।গলা ছেড়ে চিল্লিয়ে উঠে “সুখ” বলে।
জিয়ানার নিজেকে পাগল পাগল লাগে। তার কাছে মনে হচ্ছে নিবিড় মরে যাচ্ছে।হামাগুড়ি দিয়ে নিবিড়ের কাছে যায়।বুকের উপর মাথা রাখে। নিবিড়ের খিঁচুনিতে জিয়ানা সহ কেপে উঠে।জিয়ানা মুখের কাছে এগিয়ে যায় নিবিড়ের গালে কপালে চুমুতে ভরিয়ে দিতে দিতে বলে,
-আপনার বুকে লেগেছে সুখ? আমাকে মাফ করে দেন প্লিজ প্লিজ।আমি আপনাকে ভালোবাসি। আরও অনেক ভালোবাসবো প্রমিস।আল্লাহ সাহায্য করো।আমার সুখ মরে যাচ্ছে।
বলে সর্বশক্তি দিয়ে চিল্লিয়ে উঠে।
চোখের পানিতে নিবিড়ের মুখও ভিজে যায়। খিঁচুনি কমে না।আচম্বিতে জিয়ানার মনে পড়ে নীলুফার ডায়েরির কথা।মাইমুনার উন্মুক্ত শরীর দেখে সুখের খিঁচুনির কথা। তারমানে জিয়ানাকে দেখে এমন হয়েছে।সে তড়িৎ নিজের দিকে তাকায়।মোমের আগুনে পাটের হোল্ডার এখনো জ্বলছে।হেটে যেখানে গিয়ে উল্টা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বাধনের শাড়িতে আগুন লাগায়।আগুনের তাপে হাত পুড়ে যায় তবুও সরায় না। শাড়ি পুড়ে নরম হয়ে এলে একটানে খুলে ফেলে বাধন।টুকরা অংশ দিয়ে নিজেকে ঢেকে ফেলে তড়িৎ বেগে।
নিচের পেটিকোটের উপরের টুকুও খুলে ছুড়ে মারে দূরে। কাচ থেকে নিবিড়কে টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে নেয়।পুড়া হাতে মুখের ফেনা মুছে টেনে কাচ থেকে সরিয়ে এনে ফ্লোরে বামপাশ করে শুয়ে রাখে।দ্রুত রান্নাঘরে ঢুকে জগ ভরতি পানি এনে মুখেচোখে ছিটিয়ে দিতে থাকে। আর আলতো করে টেপ করতে থাকে গালে। নিবিড় প্রচন্ড ঘেমে গেছে।চোখের শুধু সাদা অংশ দেখা যাচ্ছে।
মিনিট পাঁচেক পর নিবিড় শান্ত হয়ে আসে।জিয়ানা টেনে সরিয়ে আনে ভেজা জায়গা থেকে।হাতে ইতিমধ্যে ফুসকা পড়ে গেছে।সেসবে খেয়াল নেই তার।নিবিড়ের খিঁচুনি একেবারেই থেমে গেলেও জিয়ানার চোখের পানি পড়া থামে না।সে ভেবে পাচ্ছে না কি পরিমান কষ্ট হয় নিবিড়ের এই ফোবিয়ায়।এই লোক উপর দিয়ে দিব্যি সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করে। কখনো যে ডাক্তারের কাছেও যাইনি এটা স্পষ্ট। হাতের ব্যাথায় নিবিড়কে টানতে পারে না বেশি।তাই একটা টাওয়াল এনে ফ্লোরে বিছিয়ে দেয়।একপাশ করে পিঠের নিচ দিয়ে টাওয়াল ঢুকিয়ে দিয়ে আবার উপুড় করে দেয় নিবিড়কে।তারপর সেই টাওয়ালের সামনের খালি জায়গায় ধরে টেনে টেনে বেডরুমে নেয়।গায়ে মোটা ট্রি-শার্ট থাকায় পিঠে আঘাত পায়নি।তবে কানের নিচে আর হাতের কনুই থেকে রক্ত ঝরছে। জিয়ানা কয়েকবার চেষ্টা করে গায়ের কাপড় খুলার কিন্তু হাতের ব্যাথায় পারে না।তাই কিচেন থেকে কেচি এনে নিবিড়ের গায়ের কাপড়চোপড় সব কেটে সহজেই খুলে ফেলে। নরম একটা ভেজা কাপড় দিয়ে সারা শরীর স্পঞ্জ করে কয়েকবার। নিবিড় একেবারেই সেন্সলেসের মতো পড়ে আছে।
নিজের ফোন এনে কল করে মক্কুকে ,দ্রুত এম্বুলেন্স আনতে বলে।নিবিড়কে জামাকাপড় পড়িয়ে দেয়া শেষে নিজেও যখন চেইঞ্জ করার জন্য উঠবে হঠাৎ হাতে টান পড়ায় চোখমুখ কুচকে নেয় জিয়ানা।নিবিড় চোখ বন্ধ করেই জিয়ানাকে টেনে ধরেছে।
জিয়ানা হুড়মুড় করে বসে ঝুকে যায় নিবিড়ের মুখের কাছে।তারপর আলতো করে গালে হাত রেখে বলে,
-সুখ? সুখ? শুনতে পাচ্ছেন?
নিবিড় ছোট করে উত্তর দেয় “হুম”
জিয়ানা ঝুঁকেই জড়িয়ে ধরে নিবিড়কে।চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকে নিবিড়ের সারা মুখময়।তারপর বলে,
-মাফ করবেন প্লিজ। আমি অত জোরে কিক করতে চাইনি।আর জীবনেও মারবো না। প্রমিস।তবুও আপনি এমন করবেন না প্লিজ।
-তুমি ঠিক আছো? লাগেনি তো তোমার?
আস্তে করে প্রশ্ন করে নিবিড়।
-না। আমি একদম ঠিক আছি।
-মক্কুকে না করে দাও।আসতে হবে না।
-আপনি চুপ করে থাকুন।ঘুমানোর চেষ্টা করুন।রেষ্ট দরকার আপনার।
-প্লিজ। তুমি একটু কাছে আসো তাতেই হবে।
বজ্রকন্ঠ কেমন নেতিয়ে গেছে। বড্ড করুন শুনালো নিবিড়ের গলা।জিয়ানা সেই অবস্থাতেই গিয়ে আকড়ে ধরে নিবিড়কে।
দশ মিনিট পর নিবিড় একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে আসে।জিয়ানা বারান্দায় গিয়ে দেখে আসে এখনো আসেনি মক্কু।নিস্তব্ধ রাস্তা মরা সাপের মতো পরে আছে যেনো।বিপদে না পড়লে মানুষ বুঝতে পারে না ,সে কতটা অসহায়।
ভেতর থেকে নিবিড় মৃদ্যু শব্দ করে ডাক দেয় জিয়ানাকে।জিয়ানা দ্রুত পায়ে নিবিড়ের কাছে বসে ঝুকে গলা আর কপালে হাত দিয়ে দেখে ঘেমে যাচ্ছে কিনা।
নিবিড় জিয়ানার হাত নিজের হাতে নিয়ে টেনে নেয় কাছে।জিয়ানা হাতের ব্যাথা গিলে নেয় দাঁতে দাঁত চেপে।নিবিড় জিয়ানাকে পাশে শুইয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্টে। জিয়ানার বুকে মাথা রেখে বলে,
-আমি তোমাকে সুখী করতে পারবো না চাঁদ।আমার অতীত সেটা হতে দিবে না।কাল থেকে তুমি মুক্ত। আমার সাথে থাকলে নিশ্চিত মারা পরবে।
-পরেও এসব বলা যাবে সুখ।এখন রেষ্ট করুন।
-পরে না। আজই তোমাকে বলতে চাই।আমার তোমাকে চাই জিয়ানা।আমার একটা পরিবার চাই।আমার একটা শান্তির ঘর চাই।আমার একটা ব্যাক্তিগত মানুষ চাই।
-আমি আপনারই সুখ।আমরা ইহকাল আর পরকাল দুইজায়গাতেই একসাথে থাকবো ইনশাআল্লাহ।
-আমি স্বার্থপর না জিয়ানা।আমাকে ফু-আম্মু সব কিছু শিখিয়েছেন। কিন্তু ওই পরিবার কখনো আমাকে কাছে টেনে নেয়নি।ওরা কখনোই আমাকে ওদের কেউ ভাবেনি।
-আমি জানি আপনি স্বার্থপর নন।পরিস্থিতি মানুষকে অনেক জায়গায় দাঁড় করায় সুখ।পরিস্থিতির কারণ প্রচন্ড ভালো মানুষ মুহুর্তেই বদলে যায়।আপনি আমাকে ভরসা করুন। আমি আছি আপনার পাশে।
-তুমি শুনবে আমার কথা? ভুল বুঝবে নাতো?
বলে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে জিয়ানাকে।
-বলুন।আমি আপনাকে বিশ্বাস করি সুখ।
নিবিড় লম্বা একটা শ্বাস টেনে সেই ঘটনাটা খুলে বলে।
ঘটনা শুনে জিয়ানার চোখের জলে ভিজে যায় নিবিড়ের চুল।
নিবিড় মুখ তুলে বলে ,
-আমি তোমাকে কাঁদতে দেখবো ভাবিনি জিয়ানা।আমার নামটাই শুধু সুখ।আমি কখনোই কারো সুখের কারণ হতে পারি না। তোমারও হবো না।তুমি সকালে চলে যেয়ো।তবে কোন পুরুষকে নিজের সাথে জড়াবে না।আমি সহ্য করতে পারবো না।
-যদি না যাই?
-এমন এক্সিডেন্ট যদি আবার হয়?
-আপনার পাশে তো অন্তত থাকবো। আপনার ট্রিটমেন্ট দরকার সুখ।
-এটার কোন ট্রিটমেন্ট নেই।অতীত নিশ্চয়ই মুছে ফেলা যায় না? সায়েন্স সেটা পারে না।
-না।তবে মেডিসিন ইজ দ্যা মাদার অফ দ্যা সায়েন্স। আপনাকে ট্রিটমেন্টের জন্য মেডিসিন নিতে হবে।আর হ্যাঁ অতীত হইতো মুছা যায় না তবে বর্তমানের সুখ স্মৃতি দিয়ে অনেক অনেক দূরে সরিয়ে রাখা যায়।
-বললাম না আমার জীবনে সুখ বলতে কোন কিছু নেই।
-আমি হবো সুখের সুখ।
-তুমি বাস্তববাদী একটা মেয়ে হয়ে ইমোশনাল কথা বলছো? আমি যদি কখনোই তোমাকে দাম্পত্য জীবনের সুখ দিতে না পারি?
-জেনে বুঝে যারা বিয়ে করে তারাও অনেক সময় নানান ক্রাইসিসের মাঝে পড়ে।আর দাম্পত্য বলতে আপনি আসলে কোন সুখকে মিন করছেন?ইন্টিমেট?
-হুম।যদি তোমাকে বেবি দিতে না পারি?
-আমি বিশ্বাস করি জীবনের সব রেডিমেড থাকে না।এমন কি কখনো এতটা আশাও রাখা উচিত না।এদেশে পাঁচ লাখের উপরে পথশিশু আছে।যাদের বাবা মা নেই।আমরা তাদের কিছু অংশের রেডিমেড বাবা মা হবো।
নিবিড় মাথা উঠিয়ে দেখে জিয়ানাকে। তারপর বলে,
-কেনো এত স্যাক্রিফাইস করবে আমার জন্য? আমাকে তো তুমি ভালোবাসো না? আমি প্রচন্ড খারাপ একটা লোক।একদম রক্ত থেকেই খারাপ।
জিয়ানা নিবিড়ের লম্বা চুলে নিজের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
-আমার নিজস্ব কিছু নীতি আছে কাবলিওয়ালা। সেই নীতির বহির্ভূত অনেক আচরণ আপনার মাঝে বিরাজমান। তবুও আমার মস্তিষ্কে এখন আপনার নামই বেশি চলে। আপনার ভণ্ডামির জন্য যেমন মারামারি করবো তেমন আপনার অতীতের জন্য আকড়েও ধরবো আপনাকে।
আজ থেকে কথা দিচ্ছি ,আমি আপনাকে ঠিক এতটা বিশ্বাস করতে চাই ,যতটা বিশ্বাস করলে আপনি নিজ মুখেও স্বীকার করলেন একশোটা খু*ন করেছেন কিন্তু আমি ততক্ষণ বিশ্বাস করবো না ,যতক্ষণ না সেই লাশ গুলা এসে বলে হ্যাঁ সুখ খু*নি।”
ঠিক এতটা ভরসা করতে চাই ,যতটা ভরসা করলে আপনি আমাকে বিষ দিলেন আর আমি হাঁসি মুখে পবিত্র পানি ভেবে খেয়ে নিলাম।
ঠিক এতটা ভালোবাসতে চাই ,যতটা ভালোবাসলে আপনার খারাপ স্মৃতি গুলা আমার ভালোবাসার স্রোতে ভেসে দূর বহুদূর চলে যাবে।
আমি আপনার ছাকনি হবো। স্বচ্ছ মিহি সুখ গুলো আপনার হবে। উপরের পড়ে থাকা কাকড় ময়লা দুঃখ গুলো আমি ধারণ করবো।
নিবিড়ের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। সে নিশ্চুপ ,নিস্তব্দ হয়ে অনুভব করে তার অর্ধাঙ্গিনীকে।এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে যেকোন মেয়ের পালিয়ে যাওয়ার কথা। একলামহায় সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা।সেখানে এই মেয়ে কথা দিচ্ছে ভালোবাসার?
নিবিড় জিজ্ঞেস করে ,
-কাল আবার যদি আমি এমন করি ,এমনটাও তো হতে পারে যে তুমি আমার হাতে খু*ন হলে তখন? আমাদের যে ভবিষ্যৎ নেই জিয়ানা।আমি ক্ষতিকর তোমার জন্য।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৮
-একজনের কাছে শুনেছিলাম ,যে ভবিষ্যতের চিন্তায় তুমি বিভোর সেই ভবিষ্যতে কি তুমি আছো? ” যেখানে কালকের দিনের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।কালকের কথাও পরে।যেখানে আগামী পাঁচ মিনিটের আয়ুর নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারবেন না ,সেখানে ভবিষ্যতের নিশ্চিয়তা আপনি কিভাবে দিবেন সুখ?তবে আমার নিশ্বাস যতদিন পড়বে ,সেটা ততদিন আপনার নামেই হবে।
নিবিড় জড়িয়ে ধরে বলে ,
-আমি তোমার এই বিশ্বাস আর ভরসার মর্যাদা রাখবো জিয়ানা।
দরজায় নক হয় তখনই…
