নীতিহীন রাজ পর্ব ৫০
আশিকা আক্তার সোহাগী
“যে ভালোবাসা না চাইতেও পাওয়া যায় ,সেই ভালোবাসার কোন মূল্য থাকে না “- হুমায়ুন আহমেদ।
জিয়ানার মাথায় তখন থেকে এই কথাটা চক্কর কাটছে।আবেগের ঠেলায় ভন্ডনেতাকে তো ভালোবাসি বলেই দিয়েছে কিন্তু সেতো ভালোবাসা চায়নি।এখন তো জিয়ানার দাম কমে যাবে। চিন্তায় সে নখ কামড়াচ্ছে।নিবিড় এম্বুলেন্সের বেডে শুয়ে তখন থেকে দেখে যাচ্ছে জিয়ানার গোমড়া মুখে বসে থাকা।তার জেদের কাছে হেরে রোগী সেজে এখন নিবিড়কে হসপিটালের যেতে হচ্ছে।নিবিড় হাত বাড়িয়ে জিয়ানার হাত সরিয়ে দেয় মুখ থেকে ।কিন্তু সে আবার তুলে। তাই এইবার হাত চেপে ধরে রেখেছে।জিয়ানা ভ্রু কুচকে বলে,
-দেখুন রোগী রোগীর মতো থাকুন।আমাকে আমার কাজ করতে দিন।
-জিয়ানা নোংরামু আমার একদম পছন্দ না।এইসব ব্যাড হেবিট বাদ দিতে হবে।
-কাল থেকে দিবোনি।আজ টেনশনে আছি।ছাড়ুন তো।
-কিসের টেনশন?
-আমি আপনাকে প্রতিদিন ভালোবাসতে পারবো না সরি।
-ভালোবাসা কি প্যারাসিটামল? দুইবেলা খেলেই আর লাগে না?
-হুম ওইরকমই। ব্যাথা উঠলে যেমন পেইন কিলার লাগে তেমনি ভালোবাসা দরকার পড়লে ভালোবাসা দিতে হয়।নাহলে দাম থাকে না।
নিবিড় মুচকি হাঁসে জিয়ানার বোকা বোকা কথায়।আর ভাবে ,প্রেমে পড়লে বোকারা হয় বুদ্ধিমান আর বুদ্ধিমানরা হয় বোকা” আসলেই এটা সত্যি।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-উফ হাত ছাড়ুন ব্যাথা লাগছে।
বলে কাকিয়ে উঠে জিয়ানা।নিবিড় হাতের দিকে তাকিয়ে ঝটপট উঠে বসে। আবার দুইহাত নিজের দিকে টেনে নিয়ে অবাক চোখে তাকায় জিয়ানার দিকে। দুইহাতের কবজিতেই লাল হয়ে ফোসকা পড়ে গেছে।বেডরুমের লাইট অফ থাকায় আগে বুঝা যায়নি।গাড়ির ঝকঝকে আলোয় যা স্পষ্ট। জিয়ানা নিবিড়ের চাহনি বুঝতে পেরে বলে,
-পাগলামি করে না বাঁধলে এমন হতো না।আগুনে পুড়ে বাঁধন খুলেছি।এটা তেমন কিছু না।
বলে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বোকা হাঁসে।নিবিড়ের চাহনি নরম হয়। জিয়ানার কোমরে ধরে একটান দিয়ে নিজের কোলে এনে বসিয়ে জড়িয়ে ধরে বাহুতে মাথা ঠেকায়।জিয়ানার স্পর্শে অদ্ভুত এক আড়াম নিবিড়ের শরীর ময় তিড়তিড় করে ছড়িয়ে যায় । চোখ মুদে অতন্ত্য বিনয়ের সাথে বলে ,
-আ’ম এক্সট্রিমলি সরি জিয়ানা।তুমি আমার সামনে ওইভাবে আর এসো না। আই কুডন্ট কন্ট্রোল মাইসেল্ফ।
-খু*ন করার জন্য কন্ট্রোল করতে পারেন না?
নিবিড় হেঁসে জিয়ানার নরম হাত নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,
-তোমার ভয় লাগে না মেয়ে?
-না।তবে সুড়সুড়ি লাগে। আচ্ছা আপনি রোগী না আমি? ঠেসে কোলে বসিয়ে রেখেছেন কেন? আমি কি বাচ্চা?
-সুড়সুড়ি ছাড়া আর কিছু লাগে না? আর আমার তুলনায় তো তুমি বাচ্চাই।এই যে এখন ইচ্ছা হচ্ছে রসগুল্লার মতো টুপ করে গিলে ফেলি তোমাকে।
গাল ধরে বলে নিবিড়।
-ওয়েট আপনিও কি ক্যানিবাল?
-হুম জিয়ানা ইটার। গাড়িতেই আমার রোমান্স করতে ইচ্ছা হচ্ছে।
বলে আর একটু চেপে ধরে জিয়ানাকে।জিয়ানা হাত ছাড়িয়ে ছিটে বসতে বসতে বলে ,
-হুম মাঝপথে আবার খু*ন করতেও ইচ্ছা হবে।
তারপর কথা ঘুরানোর জন্য জিজ্ঞেস করে
-আচ্ছা আপনি আবার ওই শাকচুন্নির রুহানীর কাছে যাবেন নাতো?
-ওয়ান টাইম ইউজড জিনিস দ্বিতীয়বার ব্যবহার করলে নিজেরই ময়লা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।ওয়েট তুমি এটা কি পড়েছো?
নিচের দিকে চোখ যেতেই ধমকিয়ে বলে উঠে নিবিড়। জিয়ানাও নিচে তাকিয়ে বলে,
-আমি ভেবেছি আপনি কমছে কম ছয়মাস শ্বশুরবাড়ি থাকবেন।তাই সব কাপড়চোপড় নিয়ে কাল মেসে উঠেছিলাম। আপনার ফ্ল্যাটে আপাতত আমার কিছুই নাই পড়ার মতো।তাই আপনার শার্ট পড়েছি। প্যাটিকোর্টের সাথে এটা নতুন স্টাইল।সাদা শার্ট লাল প্যাটিকোর্ট।খাটি পহেলা বৈশাখের ভাইব।
বলে আঠাশ দাঁত বের করে হাঁসে জিয়ানা।
-আমার ড্রেস কিভাবে বদলিয়েছো?
-কেচি দিয়ে সব কেটে তারপর নাঙ্গু করে।
বলেই খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো জিয়ানা।নিবিড় বিরক্ত হতে চেয়েও হয় না।কিভাবে সহিজেই সবকিছু বলা যায় ,তা এই মেয়ের কাছ থেকে শেখা উচিত।নিবিড় আবার প্রশ্ন করে ,
-নিশ্চয় লাইট অফ ছিলো?
-জ্বি না।লাইট ক্যামেরা তারপর একশন হয়েছে।ফিকার নট বেশি কিছু দেখি নাই, একটা মরা টাকি ছাড়া।
বলে মুখ ধরে আবার হাঁসে জিয়ানা।নিবিড় বেক্কেল হয়ে যায় এমন ঠোঁট কাটা মেয়ের কথা শুনে।কিন্তু নিবিড় সে পুরুষ তো মানুষ ,লজ্জায় ফেলতে হলে সেই ফেলবে।তাই জিয়ানার কানে কানে কিছু একটা বলে।আর জিয়ানার কথা বলা বন্ধ হয়ে চোখ বড় বড় করে বেশ জোরেই বলে উঠে,
-টাকি মাছ কোনদিন বোয়াল মাছ হয়? বাপ জন্মেও শুনিনি।
নিবিড় ফট করে জিয়ানার মুখ চেপে ধরে বলে,
-মাইক এনে দেই এনাউন্সমেন্ট করে দাও। নিশ্চিত ড্রাইভার শুনেছে।
আচম্বিতে জিয়ানা নিবিড়ের হাত ধরে সরিয়ে দিয়ে এম্বুলেন্সের জানালার দিকে ঝুকে তাকায়।ত্রিশ সেকেন্ড পর চিল্লিয়ে উঠে গাড়ির উপরে হাত দিয়ে ভারি দিয়ে বলে,
-গাড়িটা থামান।তাড়াতাড়ি থামান।
ড্রাইভার থামায় গাড়ি।জিয়ানা নিবিড়কে বলে ,
-আপনি যান হসপিটালে।আমি একটু পর আসছি।
নিবিড় টেনে ধরে জিজ্ঞেস করে ,
-এই মাঝ রাস্তায় এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছো? থা*প্পড় খেতে না চাইলে চুপচাপ সাথে চলো।
-আপনার বিল্ডিংয়ের মিরালকে দেখলাম একটা সাদা চামড়ার ছেলের সাথে হেটে ওই গলিতে ঢুকতে।এখন রাত বাজে প্রায় দশটা। এত রাতে একটা মেয়ে বাহিরে ঘুরছে ,নিশ্চয়ই বিষয়টা স্বাভাবিক না?
-তুমি ওর লোকাল গার্জিয়ান না জিয়ানা।আজকালকার মেয়েরা অনেক সেয়ানা।দেখা যাবে লিভ ইন শুরু করেছে।
-অদ্ভুত কথা বলইলেন নাতো সুখ।পাশের এলাকায় মা থাকে আর ও এই এলাকায় লিভ ইন করবে? যতই আধুনিক হোক আমাদের মা বাবারা এই বিষয়ে সিরিয়াস।মিরালের মায়ের নাম্বার আছে আপনার কাছে?
নিবিড় কাধ নাচিয়ে বলে ,
-নেই তবে কালেক্ট করতে পারবো ওয়েট।
বলে বিল্ডিংয়ের ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে নাম্বার চায়।মিনিট খানেক পরেই নাম্বার এলে জিয়ানা কল দিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
-আন্টি মিরাল কি বাসায়?
ওপাশ থেকে কি বললো শুনা গেলো না। জিয়ানা নিজের ফোন বের করে বলে
-ওর নাম্বারটা দেন।
মিরালের ফোন সুইচড অফ।জিয়ানা বলে,
-বলেছে বান্ধুবির বাসায় থাকবে আজ।কিন্তু এখানে বন্ধু নিয়ে ঘুরছে।সেটাও আবার এত রাতে।
-বললাম না সেয়ানা মেয়ে।ইচড়ে পাকা। এই ড্রাইভার সাহেব গাড়ি ছাড়ুন।শহরটা ঘুরে আমার ফ্ল্যাটে দিয়ে আসুন।বউকে নিয়ে একটা অভিনব লং ড্রাইভ হলো।
বলে নিবিড় আবার সিটে শুয়ে পড়ে। জিয়ানা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেছে।হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠে বলে,
-সুখ। একটা ঝামেলা আছে এখানে।মিরাল যেই ছেলেটার সাথে ছিলো আমি এই ছেলেটাকে কলেজ স্ট্রিটের গার্ল কলেজের অনেক মেয়ের সাথে দেখেছি।আমার ভুল হতেই পারে না।একজনই এই লোক।আর হ্যাঁ মিরাল বলেছে তার বয়ফ্রেন্ড কোরিয়ান।আপনি বুঝতে পারছেন?
নিবিড় মাথা নাড়ায় সে আপাতত এই ভেজাল নিতে চাচ্ছে না। তাই বুঝার নূন্যতম ইচ্ছাও নেই।জিয়ানা আবার বলে,
-আপনার না ফ্রেম দরকার? আমি আপনাকে টাটকা একটা ফ্রেম দিতে পারবো?গত কয়েক মাসে কতগুলা মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে? বেশ অনেক গুলা না? মেয়েগুলার নিখোঁজ মামলা কেনো আগায় না? এরা প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যায়। তাই তো?চিরকোট লিখে রেখে নিরুদ্দেশ হয় সবাই।
এবার আসুন আসল ঘটনায় ,সহজ করে শুরু থেকে বলি,দক্ষিন এশিয়ার সব দেশ সহ এই দেশেরও অধিকাংশ টিনএজ মেয়েদের বর্তমানে একটা ফ্যাসিনেশিনের নাম হচ্ছে কে-পপ। কোরিয়ান ইন্ডাস্ট্রি। এখন টিনএজের যে ফ্যান্টাসি সেটা তো জানেনই।ডিভাইসের উপর ভিত্তি করে এই মেয়ে গুলা ক্রেজি ফ্যান।এদের আবার আলাদা ফেনবেজের নাম আছে।সে সব থাক।
কিছুদিন আগে ময়মনসিংহের দুইটা অল্পবয়সী মেয়ে বাড়ি থেকে গোল্ড আর টাকা নিয়ে পালিয়ে ঢাকা চলে আসে।কারণ তারা কোরিয়ায় যাবে।
আর ইউ এবল টু ক্যাচ হোয়াট আই উইল সে নেক্সট?
-না। এই সব আমি কিছুই জানি না।তুমি বলো।
-ওকে। এই যে তাদের মধ্যে একটা চরম ফ্যাসিনেশিন তৈরি হয়েছে এটা এখন একপ্রকার এক্সেসিভ ডিভোশনে পরিনত হয়েছে।এই সুযোগটাই নিচ্ছে একদল কালোবাজারি। এরা এদেশের উপজাতিদের মেকাপ করিয়ে আর কোরিয়ান ভাষা শিখিয়ে যদি সোসাল সাইটে ট্র্যাপে ফেলতে পারে।এবং এমনটাই হচ্ছে বলে একটা আর্টিকেলে আমি পেয়েছিলাম। তবে হাজার হাজার মেয়ে খুব সহজেই কোরিয়া যাওয়ার লোভে খুব সহজেই এদের হানি ট্যাপে পড়ে যাবে।আমি এবার নিশ্চিত এই রিসেন্ট মেয়ে গুলা এই চং ছোকরার হাতেই গায়েব হয়েছে।আমার কাছে এই একই ব্যাক্তির দুইটা মেয়ের সাথে ছবি আছে।
-ওয়েট ওয়েট।এটা যদি হয় আর মেয়েদের ব্ল্যাক মেইল কিংবা টাকা পয়সাই হাতাই তবে একেবারে গুম না করে ছেড়ে দেয়ার কথা।কিন্তু মেয়ে গুলা তো একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে।
-হুম হতেও তো পারে কেঁচো খুঁড়তে এনাকন্ডা বের হয়ে এলো।আপনার সার্চ করা স্যাটানিক গ্রুপটাও ইনভলভ থাকতে পারে। কারণ মেয়েগুলা সব ইয়াং। এখন মিরালকে খুজতে আমাকে যেতে দেন।
এম্বুলেন্সের দরজা খুলার শব্দে নিবিড় আর জিয়ানা দুইজনই তাকায়।মক্কু দরজা খুলে বলে,
-ভাই আপনারা কি যাবেন হাসপাতালে নাকি এখানেই রাত শেষ করবেন? কে রোগী কে অরোগী আমি তো বুঝতাছি না।আর জিয়ানা তুমি পাগলা বাবার তরিকা নিছো নাকি? এমন আজব বেশ কেন?
-ভাই একটা কাজ আছে। কয়েকটা পোলাপান ডাকেন। আপনাদের নাম কালকে সবার মুখে মুখে থাকবে।রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে যাবেন।
-তাতো আমরা এমনিতেই জনপ্রিয়।
-না আপনারা জনপ্রিয় হচ্ছেন কুখ্যাত কাজের জন্য। কিন্তু এখন থেকে সুখ্যাত কাজের জন্য হবে।
নিবিড় ততক্ষণে রাস্তায় নেমে গেছে।তার প্যান্টের ভেতর বেশ অস্বস্তি লাগছে।হাত দিয়ে প্যান্টের হিপ টেনে ঠিক করতে করতে বলে,
-আকাশ কই? ক্লাবে কে আছে এই মুহূর্তে? ট্র্যাক করা লাগবে একটা নাম্বার।
বলে জিয়ানার ফোন থেকে মিরালের নাম্বার নেয়।জিয়ানা এগিয়ে এসে বলে,
-ফোন তো সুইচড অফ।ট্র্যাক করবেন কিভাবে?
-“আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি সিস্টেম” নাম শুনেছো?
জিয়ানা কাধ নাচায় মানে শুনেনি।
-মানে ডেটা ইউজারস।গুগল ,ইন্সট্রা ,ফেসবুক,গুগল ম্যাপ, হোয়াটঅ্যাপ,ক্রোম এককথায় যত ডেটা ইউজড হয় সেটা দিয়ে সুক্ষ্মভাবে খুজে বের করা যাবে।ফোন অফ থাকলেও।তুমি যেখানেই লুকিয়ে থাকো সিস্টেম খুব সহজেই তোমার তথ্য দিয়ে দিতে পারবে।তুমি কার সাথে যোগাযোগ করেছো সে কোথায় ,কখন কি ডেটা ইউজড করেছে।এভ্রিথিং। এই জন্য আমরা আসলে ডেটার কাছে জিম্মি।মানুষ যে ভয় পায় না রোবটিং দুনিয়া হয়ে যাবে?রোবট মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে?যদি হয় তবে এটাই হবে এর প্রথম ধাপ।
-ঠিক আছে আমি এইসব ডিভাইস অত কিছু বুঝি না।ওর অবস্থান বের করুন।আমার ধারণা সেন্ট পার্সেন্ট না হলেও এইট্টি পার্সেন্ট সত্যি হবে।আর আপনি গাড়িতে উঠুন।অনেক দুর্বল দেখাচ্ছে আপনাকে।
-এর আগেও আমার এমন কয়েকবার হয়েছে জিয়ানা। নাথিং সিরিয়াস। আমার যে ডাক্তার উনি বসেন বনানী। কাল বা পরশু উনার কাছে যাবো।
জিয়ানা হাত বাড়িয়ে বলে ,
-ছুঁয়ে বলুন।আর শুনোন ছুঁয়ে মিথ্যা বললে যাকে ছুঁয়া হয় সে ইয়াক্কা বুলবুল হয়ে যায়।
নিবিড় মক্কুকে কি করতে হবে ইন্সট্রাকশন দেয়।ফলে মক্কু সাইডে গিয়ে নিজের ফোন বের করে কাজে লেগে পড়ে।আর নিবিড় জিয়ানার হাতের বাহু ধরে টেনে গাড়ির কাছে এনে বলে,
-তোমার ভাষা একজন বখাটেদের চেয়ে কম কিছু না। এভাবে কোন পাগলও বাহিরে আসবে না।তোমার মাথায় গন্ডগোল আছে জিয়ানা।আর আমাকে কি পড়িয়েছো কেমন অস্বস্তি লাগছে?
জিয়ানা এগিয়ে এসে বলে,
-দেখি কোথায়? প্যান্টের ভেতরে? এইজন্য এমন টানাটানি করছেন?
নিবিড় এক কদম পিছিয়ে গিয়ে বলে,
-দেখি মানে? ভেতরে সমস্যা।
-একবার দেখেই ফেলেছি এখন বারবার দেখলেও কিছুই হবে না।আমি মনে হয় সিস্টেমে ভুল করেছি।আপনার নতুন আন্ডারওয়্যার গুলা নিয়ে কনফিউজড ছিলাম।কোনটা সামনে আর কোনটা পেছনে বুঝি নাই।তাই ফুটা যেদিক সেটা পেছনে দিয়েছি।কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ফুটা আপনাদের সামনে প্রয়োজন।
-মাই ব্যাড।ক্রিপা করেছো অনেক।মুখের কি ভাষা তার। এই তোমার চেহারা এত ইনোসেন্ট মুখ এমন বেলেল্লা কেন?
-এই আপনি নিজে কি হুম? আপনি আমার চেয়ে চার কাঠি উপরে।কি করেছেন মনে নাই? আমি আপনার বিপদে সাহায্য করেছি।প্রথমবার একটু ভুল হতেই পারে। এত ক্যাচম্যাচ কইরেন নাতো।
-কিছু করতে দিয়েছো? জামাইয়ের বুকে লা*ত্থি দেয় বেয়াদব স্ত্রীলোক।
-আপনি যে আমার ব্লাউজ খুলে ফেলেছেন তার বেলাই?
নিবিড় আবার জিয়ানার মুখ চেপে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে বলে,
-আল্লাহর ওয়াস্তে তোমার মুখে ক্যাপাসিটর লাগাও।যখন তখন স্পিড বারিয়ে দাও কেন? তুমি আমার মান সম্মান সব ধুলায় মিশিয়ে দিবা দেখি।তোমার জন্য আমি নিজেই নিজেকে চিন্তে পারছি না।নিজে ফাতরা আমাকেও ফাতরা বানাচ্ছো?
জিয়ান হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলে,
-ফাতরা? সাউন্ডস গুড।এইতো আপনি আমার লাইনে চলে এসেছেন।
বলে নিবিড়ের ঘাড়ে টেপ করে বলে,
-সাব্বাস জিয়ানার উপযুক্ত বর।
নিবিড় কটমট করে তাকালেও তার রাগ আসে না।আসবে কি করে রাগ নিরাময়ের মেডিসিন যেখানে স্বয়ং উপস্থিত।
আকাশ অনেকদিন পর ফ্রি হওয়াই অলিগলিতে টইটই করে ঘুরছে।এলাকায় বেশ পরিচিত হওয়াই অনেকেই সালাম দিচ্ছে।সে এগুলা খুব উপভোগ করে। কলোনির গলিতে এসে স্বল্প পরিচিত একজনকে দেখে বাইক থামায়। মাথাায় আশিহাত ঘোমটা দিয়ে টুকুটুকু করে হেঁটে আসছে জিয়ানার ব্যাচমেট মিম।শ্যামারঙা মেয়েটার চেহারা বড্ড সরল।কিন্তু এত রাতে এই মেয়ে এমন নিস্তব্ধ গলিতে কি করছে।
আকাশ শিস বাজিয়ে তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।মিম থেমে তাকায় তার দিকে।আকাশ আঙুল দিয়ে ইশারা করে কাছে ডাকে। মিম আশেপাশে দেখে আস্তে-ধীরে কাছে এসে সালাম দেয় আকাশকে।
-এত রাতে কোন ভদ্রঘরের মেয়ে বাহিরে থাকে না।তোমাকে আমি আগাগোড়া ভদ্র ভেবেছিলাম।কি যেনো নাম?
-মিম।আমি প্রাইভেট পড়িয়ে আসলাম।আজ একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে। আমি খারাপ ঘরের মেয়ে না ভাইয়া।
-আমার বাপ তো এক বিয়ে করছে।মায়েরও একটাই বিয়ে।তাহলে তুমি কোত্থেকে উদয় হইলা?
মিমি আকশের কথা না বুঝে মাথা নিচু করেই থাকে।সে আছে ভয়ে। বাড়ির কাছে এসে এত রাতে কেউ যদি দেখে একটা ছেলের সাথে কথা বলতে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।তাই আদবের সাথেই বলে,
-ভাইয়া এখন যাই কেউ দেখে ফেললে খারাপ কথা রটাবে।আল্লাহ হাফেজ।
-হুম যাও।তবে মিম নামের মেয়ে গুলা উড়নচণ্ডী হয় তুমি এমন ভেজা বেড়াল কেন?
মিম ফট করে চোখ উপরে তুলে। আকাশও মিমের চোখের দিকে তাকায়।এবং তার কাছে মনে হলো চোখ না যেনো স্বচ্ছ দিঘী।এবং চোখ থেকে নজর সরিয়ে বলে “যাও এখন”
হঠাৎ টান লাগে লম্বা বিনুনিতে।আৎকে পেছনে ফিরে দেখে আকাশ তার বিনুনি ধরে অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ,
-ওই মা এইটা কি অর্জিনাল চুল নাকি? তা চুলে কয় মন তেল ঢেলেছো? আমার হাত ভিজে গেছে তোমার চুলের তেলে।
মিম লজ্জা পায় আজকালকার কেউ চুলে তেল দিয়ে বাহিরে বের হয় না কিন্তু তার মা তেল দেয়া ছাড়া চুল রাখতে দেয় না।উনার ভাষ্যমতে তেল হচ্ছে চুলের খাদ্য।আমরা যেমন খাদ্য ছাড়া বাচি না তেমনই তেল ছাড়া চুলেরও প্রাণ থাকে না।এই তেলে চুবু চুবু চুল ডাকতেই আশিহাত ঘোমটা দিয়ে চলে মিম।
আকাশের হাত থেকে বিনুনি ছাড়িয়ে লজ্জায় হনহন করে প্রস্থান করে মিম।
আকাশ তেল ওয়ালা হাত নাকের কাছে নিয়ে শুকে বলে
-সুন্দর গন্ধ তো তেলের।এককথায় বঙ্গ ললনা এই মিম ডিম।
মাথা চুলকে বাইক স্টার্ট করবে তখন মক্কুর ফোন পায়। সেও সামনে এগিয়ে যায় কথা বলতে বলতে ব্লুটুথের সাহায্যে ।পেছন থেকে দুইজন মুরুব্বি দেখে বলে,
-মাহবুবের মাইয়া না এইটা?
দাঁতবিহীন পাশের মুরুব্বি বলে,
-হ মাহবুবের ছোট মাইয়া।
-আগে তো ভদ্র সভ্যই ভাবতাম আজ দেখলাম ঘোমটার নিচে শয়তান নাচে। ছ্যাহ ছ্যাহ..
একটা ফার্মেসী থেকে বার্নক্রিম কিনে এনে নিবিড় জিয়ানার হাতে আলতো স্পর্শে লাগিয়ে যাচ্ছে তখন থেকে।এমন আলতো স্পর্শে জিয়ানার ঘুমে ঝিমঝিম লেগে আসে।সেই অবস্থাতেই বলে,
-ব্রো? আপনি আমাকে এমন ন্যাকুদের মতো ট্রিট করলে আর একটা কিক আজ রাতেই খেয়ে ফেলতে পারেন।সহ্যের মা সীমা মরে গেছে।
নিবিড় কটমট করে তাকিয়ে বলে,
-একটা এক্সপেন্সিভ গিফট দিবো ভেবেছিলাম তোমাকে। কিন্তু তুমি তো বদলাবার না। মুখের এই ভাষার জন্য গিফট ক্যান্সেল।
-রাখুন আপনার এক্সপেন্সিভ গিফট।বস্তুগত কোন কিছুই আমি জিয়ানা পুছি না।যদি দিতেই হয় কথা দিন সৎ আদর্শবান একজন রাজনৈতিক পার্সন হয়ে দেখাবেন।
-বস্তুগত কোন গিফট কে বলেছে? তুমি তো একটা কঠিন পরিক্ষায় পাস করেছো তাই ভেবেছিলাম নিজেকে যে এত ছিন্নমূল মনে করো ,ভাবো পৃথিবীতে তু্মি একা ,কোন পিছুটান নেই। ভেবেছিলাম সেটা একতুড়িতেই বদলে দিবো।
জিয়ানা সোজা হয়ে বসে।কি বলে এই লোক। পূর্ণ দৃষ্টিতে নিবিড়ের দিকে তাকায় জিয়ানা।আর নিবিড়ও নিজের দৃষ্টি জিয়ানার চোখে স্থাপন করে। এতকাল নিবিড় কখনোই জিয়ানার চোখ পড়তে পারেনি কিন্তু আজ পারলো।এই প্রথম এই মেয়ের চোখে সে নিজের উপর ভরসা দেখলো।আকুলতা দেখলো।নরম কোমল ভালোবাসা দেখলো।নিবিড় নিচু হয়ে জিয়ানার হাতের পিঠে চুমু এঁকে বলে,
-জিয়নকাঠি। আমার ফোবিয়া আছে ঠিকই কিন্তু নারীঘটিত কোন সমস্যা নেই।তোমাকে দেখে আমার ফোবিয়া হয়নি হয়েছে আগুন দেখে। আমি একদম ক্যাপাবল তোমাকে সুখী রাখতে। এ যাবত কালে তিনবার এমন হলো।আর এই থেকে আমি নিশ্চিত একই সাথে সেদিনের ঘটনার দুই তিনটা জিনিস একসাথে হলে হইতো আমার এই ফোবিয়া উঠে।
এক,দাউ দাউ করা জ্বলা আগুন,
দুই ,আগুনের পাশে লাল রং
তিন,পরিবেশ।
তবে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি। আজকের ঘটনা ঘটার আর একটা কারণ হইতো তুমি রেগে চিল্লিয়ে কথা বলা। যদিও আমি নিশ্চিত না। কারণ বহুবছর থেকে সাইকাইট্রিসের কাছে যাওয়া হয়নি।লাষ্ট চার বছর আগে সজীব আর মক্কু নিয়ে গিয়েছিলো।নারীদের প্রতি এন্টিপ্যাথি আসলে এটা আমার ব্যাক্তিগত কারণ। আমি আমার লাইফে তুমি আসার আগে দুইজন নারীকে পেয়েছি।একজন ফু-আম্মু আর একজন মা। মা সম্পর্কে আমার ধারণা ইতিবাচক না। ইভেন ক্ষমতায় থাকা পুরুষদের প্রতি নারীদের যে লোভ সেটা সামনে থেকে দেখেছি বলেই নারী সমাজকে আমার অপছন্দ।সেটাও ব্যাক্তি বিশেষ। সবার ক্ষেত্রে না।
জিয়ানা ব্রু কুচকে প্রশ্ন করে ,
-তবে ফ্ল্যাটে যে বললেন দাম্পত্য সম্পর্ক ,বাচ্চাকাচ্চা হাবিজাবি এগুলা কি?
-এগুলা টেস্ট পেপারের কুয়েশ্চন। এবং তুমি পাস। এইজন্য আজ একটা কথা তোমাকে জানাতে চাই।যদি তুমি শান্ত মাথায় শুনো?
অঘোষিত একটা কষ্ট হঠাৎ জিয়ানাকে ছেড়ে চলে গেল মনে হলো।আর দশটা মেয়ের মতো তার নসিবে স্বাভাবিক সংসারটাও নেই।মনের কথা মনে রেখেই বলে,
-বলুন।
-তোমার টুইন ব্রাদার জীবিত আছে।
এতক্ষণ যে জিয়ানা চোখ মুখ শক্ত হয়ে ছিলো সেটা ছেড়ে সোজা হয়ে গেলো। জিয়ানার বিয়ের দিন রাতে যখন জিয়াউলের কোলে শুয়ে ছিলো তখন জিয়াউল বলেছিলো,
-আম্মু তুই যে এতটা শান্ত থাকবি আর ভেতরে যে এতটা স্ট্রং সেটা আজ বুঝতে পেরেছি।আর একটা সত্যি কথা শুনবি?
জিয়ানা মাথা তুলে জিয়াউলের দিকে তাকিয়ে দেখে বলে,
-আর কত সত্যি জানার বাকি আব্বু?
-মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মানুষ প্রতিনিয়ত সত্যের মুখোমুখি হয়।আজকের চরম সত্যি কাল গিয়ে ঠুনকো মিথ্যা হতে এক লামহা লাগে না।
-সত্যিটা কি বলো আব্বু?
-তুই একা জন্মাসনি।তোর টুইন ভাইও হয়েছিলো। তোর পাঁচ মিনিটের বড়। কিন্তু অবস্থা খুবই শোচনীয় থাকায় আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়।হইতো সার্ভাইব করে নি তাই শুধু তোকে আমাদের কাছে পাঠিয়েছিলো সাগর আর নীলুফা।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জেগে উঠা একটা চমৎকার আশা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো সেদিন জিয়ানার।চোখের কোন হতে গড়িয়ে পড়া জল সীমানা পাড় হওয়ার আগেই মুছে নিয়েছিলো সংগোপনে।
সেই তিক্ত অনুভূতি আবারও যেনো মুখ থেকে গলা পর্যন্ত অনুভূত হলো জিয়ানার।জীবনের মার প্যাচে সে না অবাক হয় আর না হাপিয়ে উঠে।জন্মের বহু আগে থেকেই তার জীবনের জটিলতা শুরু। তাইতো এর কাফফারা বুঝি একজীবন দিয়েই দিতে হচ্ছে।
নিবিড় চেয়ে দেখে জিয়ানার বাকানো নেত্র থেকে গড়িয়ে পড়া মুক্তার ন্যায় জলকনা। হাত দিয়ে মুছে দুই গালে অধর ছুঁয়ে বলে,
-আমি জানি সে কোথায়। কিন্তু এখন সে যে অবস্থায় আছে তাকে তোমার সামনে আনা যাবে না।
-কি নাম?
-নীলয় ইয়াসীর।আমরা নীল ডাকতাম।তবে জানতাম না সে ফু-আম্মুর ছেলে। অনেক দিন পর আমি এবং নীল নিজেও জেনেছে।
-এখন সে কোথায় সুখ?
-আমাকে কয়েকটা মাস সময় দাও প্লিজ।তোমার হারানো সব ফিরিয়ে দিবো প্রমিজ।
জিয়ানা দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে বলে,
-আমাকে আশা দিয়েন না কাবলিওয়ালা। আমি এমনিতেই দিব্বি আছি।জিয়ানা বিন্দাস থাকে অলওয়েজ।তবে একটা কথা বলুন? নীল মানে আমার ভাইকে কি কেউ আটকিয়ে রেখেছে? সেতো আইসিইউতে ছিলো। আমরা জাানি বেঁচে নেই।তবে কি আম্মু আর আব্বুও আছেন?
নিবিড় মাথা নিচু করে বলে,
-আইসিইউ থেকেই চেয়ারম্যান সাহেব এনেছিলো।অনুরাধার মা পেলেপুষে বড় করেছে।আর তোমার আব্বু আম্মুর ব্যাপারটা এখনো ক্লিয়ারলি জানি না আমি।অনুমানের কথা আমি বলতে চাই না।খারাপ কিছুই ধরে রাখো।
-সুখ আমার খুবই আশাবাদী হতে ইচ্ছা হচ্ছে।আমি কোনকালেই আশাবাদী মানুষ না। কিন্তু আজকে খুবই লোভ হচ্ছে একবার হলেও সবাইকে দেখতে।ছাড়ুন সেসব কথা।
বলে দুই হাত দিয়ে দুইচোখ মুছে আবার বলে,
-মামুন ইসলাম জড়িত এইসবে তাই না?এই লোকটাকে আমি একদমই বুঝি না।উনার কোন ব্যাড রেকর্ড এখনো বের করতে পারিনি।এমনকি সরকারি কোন অনুদানের একটা কানাকড়িও নিজের কাজে লাগাননি।উনার আগের চরিত্র আর এখনকার চরিত্রে বিস্তার ফারাক।আমি তাই প্ল্যান করেছিলাম কাল নূরম্যানসনে যাবো। আমার কেনো জানি মনে হয় আপনাদের নূরম্যানসই সকল সমস্যা সমাধান।
নিবিড় মুগ্ধ চোখে দেখে মুহুর্তেই নিজেকে শক্ত খোলশে আবৃত করে নেয়ার অসাধারণ এক নারীকে।দুইহাত মেলে কাছে ডাকে জিয়ানাকে। জিয়ানা আসে না বরং কপালে ভাজ করে তাকিয়ে থাকে পিটপিট করে। তাই নিবিড়ই জিয়নার সিটে গিয়ে সাইড হাগ করে বলে,
-কাল যেয়ো না।তোমার ভাই আর দেনমোহরের নূরম্যানসন একবারে পেয়ে নিজের সম্পুর্ন অধিকার নিয়ে যাবে কুইনের মতো করে।অনেক কিছু আমি নিজেও জানি না। সেক্ষেত্রে তোমার সাহায্য লাগবে। করবে সাহায্য?
জিয়ানা মাথা উপর নিচ করে জানায় সাহায্য করবে।
-গুড। ইয়ার চেইঞ্জ চলে এসেছে এইবার টানা পড়াশোনায় মন দাও। আমি এদিকটা গুছিয়ে নিয়েই উঠবো নূরম্যানসনে।ঠিক আছে?
-আমার এজেন্সি ঝামেলা করবে।কাল লেপটপে অনেক গুলা মেইল দেখেছি। সব কড়া থ্রেইট।
-ওদের ব্যবস্থা করবো আমি।শুধু তুমি না ইয়াং অনেকেই ওদের এইসব ট্র্যাপে পড়ে পড়ালেখা আর ক্যারিয়ার দুটোই ধ্বংস করেছে।
দরজায় মক্কু নক করে। নিবিড় খুলতে বলে,মক্কু গাড়িতে ঢুকে বলে ,
-মেয়েটা ৩৭মিনিট আগে যে নাম্বারের সাথে যোগাযোগ করেছে সেই নাম্বার সামনের বকুল সরণীর ৩ং রোডের সি ব্লকের ২ং বিল্ডিংয়ে দেখাচ্ছে।
নিবিড় ফোন বের করে থানায় কথা বলে জানায় ,তাদের ফোর্স লাগবে।উক্ত এড্রেসে কিছু অসামাজিক কাজ হচ্ছে এবং তার জানামতে নারী প্রচারকারীর একটা দল এটা।
থানা থেকে জানায় তারা আসছে।এদিকে জিয়ানা নিবিড়ের অভার সাইজ শার্ট গিট্টু দিয়ে আগেই রেডি।নিবিড় কুঞ্চিত ভ্রু সমেত প্রশ্ন করে ,
-আপনার এই অবস্থায় যাওয়া লাগবে না। গাড়িতে অপেক্ষা করো। পুলিশ আসলে আমরা এগোবো।
-মাথা খারাপ? এতক্ষণে মিরাল অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই আপনাদের চক্করে দেরি হয়ে গেছে। আর বাংলা সিনেমার মতোই পুলিশ অলওয়েজ দৃশ্যের শেষে এন্ট্রি নেয়।কুইক চলুন।
বলে সামনে হাটা ধরে। নিবিড়ও এগিয়ে এসে জিয়ানাকে আটকিয়ে বলে ,
-জিয়ানা বারাবাড়ি আমার পছন্দ না। তুমি এখন আমার বউ।যেনোতেনো ভাবে বাহিরে আসা যাবে না।একটু পরে এখানে হৈচৈ পড়ে যাবে। নানা জনে ভিডিও করবে।বুঝতে পেরেছো?
-আচ্ছা ওই সামনের গলিতে একটা বুটিক শপ আছে।ওইখান থেকে ড্রেস চেইঞ্জ করবো।টাকা নাই কিন্তু আমার কাছে।আ’ম এম্পটি।
বলে কাধ ঝাকায় জিয়ানা।নিবিড়ের এই প্রস্তাব পছন্দ হলো।তাই বলে,
-ওকে চলো তবে।মক্কু ছেলেরা কতদূর রে?
মক্কু এদের পেছন পেছনে আসছে। সে উত্তর দিলো ,
-কাছাকাছি ভাই।কিন্তু গিয়ে যদি দেখি কিছুই নাই। তবে একটা বেইজ্জতি কারবার হবে।
-বেইজ্জতি হবে না মক্কু ভাই।মিরাল সাথে আছে ছেলেটার। আমরা মিরালকে নিতে এসেছি বুঝাবো।
তিনজনই দ্রুত সামনে আগায়।
বিল্ডিংয়ের গেইটের কাছে এসে দেখে এটা একটা নতুন বিল্ডিং। এক ইউনিট কমপ্লিট। পাশের বাকি ইউনিটে কনষ্ট্রাকশনের কাজ চলছে।একজন বয়স্ক গার্ড বসে ঝিমাচ্ছে।জিয়ানা একটা কুর্তা আর সিন্ড্রেলা পাইজামা পড়েছে বুটিকের শপ থেকে।নিবিড় নিজে পছন্দ করে দিয়েছে।জিয়ানা লক্ষ্য করে নিবিড় খুব চুজি।কালার কম্বিনেশন আর ডিজাইন সেন্স চমৎকার। অথচ জিয়ানার হলেই হলো টাইপ।কি সুন্দর করে বিপরীত মানুষ টার সাথে সৃষ্টিকর্তা জুড়ে দেন সবাইকে।
গার্ডের কাছ থেকে তারা জানতে পারে চারজন বিদেশী ছেলে এখানের তিনতলায় ভাড়া থাকে।এরমাঝে দুইজন পার্মানেন্ট থাকে আর বাকি দুইজন মাঝেমধ্যে আসে।মেয়ে নিয়ে আসে কিনা জিজ্ঞেস করায় সে কাচুমাচু শুরু করলে ,নিবিড় এগিয়ে যায় চটকানা দিতে কিন্তু জিয়ানা তাকে থামিয়ে নিজেই প্রশ্ন করে ,
-আমাদের আত্মীয় একজন মেয়ে এখানের একটা ছেলের সাথে সন্ধ্যা থেকে নিখোঁজ। আমরা নিজেরাই খুঁজতে আসছি কারণ আগেই পুলিশি ঝামেলা যেতে চাচ্ছি না।আবার পুলিশ এলে আপনি নিজেও ফেঁসে যাবেন।সত্যি কথা বলুন?
-জ্বে মাঝেমধ্যেই মাইয়া আনে এরা।
কাচুমাচু করে বলে গার্ড। মক্কু গার্ডের ফোন কেড়ে নেয় আর চেয়ারে রাখা গামছা দিয়ে হাত পিছমোড়া করে বেঁধে রাখে।কেননা তার মনে হচ্ছে এই বুড়ো নিজেও জড়িত এইসবে।পরে সিগনাল দিয়ে দিলে ঝামেলা হয়ে যাবে।গার্ডকে নিয়েই তারা উপরে যায়। ইতিমধ্যে ক্লাবের প্রায় বিশজন ছেলে এসে হাজির।
সবাই জিয়ানাকে একে একে সালাম দিলে জিয়ানা ধমকে বলে,
-একটা দল থেকে একজন সালাম দিলে সবার পক্ষে থেকেই দেয়া হয়। এখন সবাই কাজে লেগে পড়ুন।
ছেলেরা তিনভাগ হয় একভাগ নিচে দাঁড়ায়।একভাগ ছাদে উঠে যায় আর একভাগ সাইডের কাজ চলা ইউনিট দিয়ে তিনতলা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকে।
গার্ড দরজায় নক করে নিবিড়ের শিখানো কথা বলে “একটা মাইয়া আসছে আপনাদের সাথে দেখা করবে।”
ফট করে দরজা খুলার সাথে সাথেই মক্কু আর জিয়ানা ঢুকে যায় ভেতরে ।নিবিড় ঢুকে শেষে।লম্বা আর হ্যংলা আদলের উপজাতি চেহারার লোকটাকে জিয়ানা দেখেই চিনে ফেলে। পাশের রুম থেকে সিমিলার আর একজন বের হয় হাতে ছোট হ্যান্ড গান সমেত।নিবিড় পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা টিস্যুর প্যাকেট ছুড়ে মারে হাত বরাবর। তারপর ফট করে গিয়ে তাকে আটকিয়ে ফেলে।
ড্রয়িংরুম ফাকা একেবারে। একপাশে একটা ন্যাড়া তোশক বিছানো।সেটাতে আবার ছোপ ছোপ পানির দাগ।মনে হচ্ছে নিয়মিত কোন বাচ্চা সেখানে প্রস্রাব করে।
আর জিয়ানার কাছে মনে হলো তোশকটা চিৎকার করে বলছে”এই জানুয়ার গুলা কোনদিন আমাকে পরিস্কার করে না ,খাওয়া থেকে হাগা মুতা সব আমার উপরে বসেই করে।এদের ধরে আচ্ছা মতো ক্যালানি দে জিয়ানা।”
সিরিয়াস মুহূর্তে হাঁসি পাওয়ার বাতিক জিয়ানার নতুন না।ঠোঁট কামড়ে হাঁসি সংবরণ করে। দরজার পাশে দাড়ানো নকল কোরিয়ানের গায়ের রং এখন স্বাভাবিক বাঙালির মতোই। তাকে মক্কু ধরে রেখেছে।
জিয়ানা পাশের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে মিরাল সহ আর তিনটা মেয়ে গভীর নিদ্রায়। পাশে ইনজেকশন সহ কিসব মেডিসিন। এদের মাঝে একটা মেয়েকে জিয়ানা চিনে।জিয়াউলদের বিল্ডিংয়ের সেই মহিলার মেয়ে ,যে জিয়ানা আর জেনিকে অপদস্ত করেছিলো বিল্ডিংয়ের নিচে।জেনিকে চ*ড় মেরেছিলো।জিয়ানা তাদের দিকে এগিয়ে যায়।
নিবিড় শিস বাজালে ফ্ল্যাটে ক্লাবের ছেলেরা প্রবেশ করে। আর তারপর পর পরই পুলিশ।তিনটা রুম সার্চ করে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি।তবে একটা রুমে বিশাল বিশাল কার্টন ছিলো।ধারণা করা হয় এগুলার মধ্যেই মেয়েদের ভরে এরা এখান থেকে সরাতো।
অপরাধী দুইজনকে ধরা হয়।বাকিরা ছিলো না।এদের চক্র বেশ বড় এবং সারা দেশেই ছড়িয়ে আছে।মেয়েদেরকে পানি দিয়ে সেন্স ফেরানোর পরেই মিরাল জিয়ানাকে দেখে কেঁদে দেয়।
চারজন মেয়ের গার্জিয়ানদের নাম্বার নিয়ে পুলিশ তাদেরকে আসার জন্য বলে। সেই অপদস্তকারী মহিলা আজ তিনিদিন থেকে মেয়েকে খুঁজে শেষমেষ পেয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে।আর জিয়ানার কাছে ক্ষমাও চায়।জিয়ানা হাঁসি মুখে ক্ষমাও করে দেয়।
পুলিশ যেনো নিজে ক্রেডিট না নিতে পারে তাই আকাশ শুরু থেকেই ফেসবুক লাইভে ছিলো।প্যাকপ্যাক করে পুরা ক্রেডিট নিবিড়কে দিচ্ছে সে। এইজন্য পেছন থেকে দুইবার চাট্টিও খেয়েছে নিবিড়ের কাছ থেকে।
পুলিশের কাজ শেষ করে যখন সবাই নিচে নেমে আসে তখন ওসির ফোনে কল আসে “রেজাউল সরকার কিছুক্ষণ আগে হৃদযন্ত্র বন্ধ জনিত কারণে পরলোক গমন করেছেন”
তাই নিবিড় আর মক্কু পুলিশের সাথেই রওনা দেয় পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের দিকে।আকাশের উপর দ্বায়িত্ব পড়ে জিয়ানা আর মিরালকে পৌঁছে দেয়ার জন্য।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৪৯
ওসি শাহিন আলমের গাড়িতে করে নিবিড় যাচ্ছে রেজাউলের বাংলোতে। ওসি সাহেবের মুখ বেশ থমথমে দেখে নিবিড় প্রশ্ন করে ,
-ওসি সাহেবের হোম ডিস্ট্রিক্ট এলাকার জমির দাম কিরকম?
শাহিন আলমের থমথমে মুখ হঠাৎ সোনালী রোদের মতো চকচক করে উঠে আর সে উত্তর দেয়,
-খুব বেশি না ভাই।দুই কাঠার দাম ষাট সত্তরের মতো পড়বে।
নিবিড় মুচকি হাঁসে। কথায় আছে সব রসুনের এক মাথা।আর কোন শুয়রের কোন নোংরা পছন্দ সেটা নিবিড়ের জানা…
