নীতিহীন রাজ পর্ব ৫১
আশিকা আক্তার সোহাগী
৫মাস পর…
“পৃথিবীতে কোন মানুষই অসুন্দর না ,যদি সে মানুষ হয়।ঠিক তেমনই কোন মানুষও মেধাহীন না ,যদি সে মানুষ হয়”- আব্দুল কাফি
এই বায়ো দিয়ে একটা ফেসবুজ পেইজে নিবিড় স্টক করে চলেছে অনেকক্ষণ। নাইন পয়েন্ট ফোর কে মেম্বার গ্রুপটাতে।গত কয়েকদিন থেকে কড়া সমালোচনা করা হচ্ছে তার নামে এই গ্রুপে।প্রতিটা পোষ্ট ধুমিয়ে লাইক শেয়ার কমেন্টস চলছে।নিবিড় উপনির্বাচনের জন্য স্থানীয় জাতীয় নির্বাচনের নমিনেশন পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে।যদিও গতমাস গুলোতে তার কার্যক্রম ছিলো চোখে লাগার মতো।
তৃতীয় লিঙ্গদের জন্য একটা পারিবারিক কারখানায় চাকরির বিশেষ কোঠার ব্যবস্থা , সাভারের প্রতিটা পতিতা পল্লীর নারীদের জন্য স্বাধীন জীবনের ব্যবস্থা করেছে।মানে এখানে জোর করে কাউকে আটকে রাখতে পারবে না।তারাই থাকবে যারা স্বইচ্ছায় থাকতে চায়।
তাছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লুটপাটের ক্ষতি পূরণ সহ মোটা অংকের একটা টাকা ক্যাম্পাসের মেধাবী ফান্টে দান করেছে।
নারী প্রাচার কারী গ্রুপকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের কাছে দিয়েছে।বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি করেছে টানা কয়েক সপ্তাহ। সাভারে যে অংশ গুলা বন অধিদপ্তরের আন্ডারে ছিলো কিন্তু স্থানীয়রা জোর জবর্দস্তি দখল করে চাষবাস করছিলো , নিবিড় সেগুলো উদ্ধার করেছে।
এককথায় সে এখন জন দরদী নেতা বনে গেছে।
কিন্তু তবুও এই গ্রুপ তার পেছনে পড়ে আছে।ক্রিটিসিজম চলছে তো চলছেই।রেজাউল সরকারের রেজিমের ব্যাপার গুলা ওপেন সিক্রেট এটাতে বিশেষ কোন অসুবিধা নিবিড়ের না হলেও ,তার নিজের বিষয়ে এমন সব গোপন কথা ফাঁস হয় এখানে ,যা তার জন্য হানিকারক। নির্বাচনের আছে আর মাত্র মাসখানেক। এই হয়রানি আর নেয়া যাচ্ছে না।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বেশ করা তদন্ত করে অদ্ভুত তথ্য বের হয়েছে।এই গ্রুপের আইডি গুলো যে সিম দিয়ে ওপেন করা হয়েছে সবগুলাই মৃত্যু মানুষের নামে রেজিষ্ট্রেশন করা।মানে কেউ জেনে বুঝেই মৃত্য মানুষের এনআইডি কার্ড কালেক্ট করে সেগুলা ব্যবহার করছে।
সন্দেহ কেবল একজনের দিকেই যায়।এমন প্যাচানো বুদ্ধি কেবল এই এলাকায় তার বউ ছাড়া কারো মাথাতেই আসতে পারে না। কিন্তু জিয়ানাকে কড়া পাহাড়ায় রেখেছে। তবুও এই মেয়ের ভরসা নেই।
নূরম্যানসনের লিগাল মালকিন এখন জিয়ানা। শুধু নীলকে এখনো মামুন ইসলামের হাত থেকে ছাড়াতে পারছে না বলেই জিয়ানাকে নিয়ে উঠতে পারছে সেখানে।তবে এখন সময় হয়ে গেছে। মেসে থেকে যতই পাহাড়ায় রাখুক এই মেয়ে তো বশ মানবে না।পাখিকে এবার বাসায় ডিমের তা দিতে বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে।এবং সেটা আজই।
এমিনিতেই জিয়ানা পাঁচ মাস থেকে এড়িয়ে চলছে নিবিড়কে।নিবিড়ও নমিনেশনের জন্য প্রচন্ড ব্যাস্ত থাকায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেনি তার দিকে। দুইদিন ছলাকলা করে ফ্ল্যাটে এনেছিলো। মন আর শরীর দুইটাই ঠান্ডা করতে কিন্তু উল্টা মেরেধরে চলে গেছে। কাছেই ঘেঁষতে দেয়নি। কি হয়েছে কে জানে নিবিড়কে দেখলেই ছ্যাত করে উঠে।সেই ছ্যাত করা চাহনী দেখলেও নিবিড়ের প্রেম প্রেম পায়।
কিছুদিন আগে জিয়ানা রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের সাথে ভিজেছিলো। সেই ভিডিও তালহা নিবিড়কে পাঠায়।রাগে শরীর রি রি করে উঠে ,রাস্তায় দাঁড়িয়ে লম্ফঝম্প করে বৃষ্টিতে ভেজা দেখে।যেকোন ছেলের জন্য এই দৃশ্য অতি আকর্ষণীয়। এই মেয়ে কি বুঝে না।তাই সরাসরি জিয়ানার মেসে চলে যায় নিবিড় সেদিন।উদ্দেশ্য ছিলো একটা রামধমক সাথে আলতো থা*প্পড় মারবে একটা মাষ্ট। কিন্তু গিয়ে দেখে বারবার হাঁচি দিচ্ছে।নিবিড়কে দেখেই ফাষ্টক্লাস একটা হাঁসি দিয়ে বলেছিলো,
“কাবলিওয়ালা বৃষ্টিতে ভেজার ভিডিও টা আমাকেও সেন্ড করিয়েন তো”
তালহা সামনের বিল্ডিংয়ের করিডোর থেকে ভিডিও করেছে তবুও এই মেয়ে বুঝতে পেরেছে।নিবিড় কোন ভাবেই না রাগ আর না বিরক্ত হতে পারে জিয়ানার সাথে।চোখ সহ ঠোঁটের হাঁসি দেখে নিবিড়ের ভেতরের সব গোলমাল হয়ে যায়।রাগের কারনটা পর্যন্ত জোলো হয়ে যায়।নিবিড়ের তখন মনটা খুব করে চায় টুপ করে একটা চুমু দিতে। কিন্তু এতবার রিজেক্টেড হয়েছে তাই মাসখানেক থেকে নিজেকে সংবরণ করে চলছে।
পাঁচ মাস ধরে ডাক্তারের কাউন্সিলিং করছে নিবিড়।তিন সপ্তাহ পর পর একটা করে সেশন চলে।তিনবারের সময় জিয়ানাকে নিয়ে যেতে হয়।ডাক্তার একান্তে জিয়ানার সাথে কথা বলেছে কিছুক্ষন।কি বলেছে কে জানে তবে বের হয়ে নিবিড়কে জানায়,
-ডাক্তার বলেছে আপনি আমার জন্য হানিকারক। দুই ফিট দূরে থাকবেন অলওয়েজ।
নিবিড় বিশ্বাস করেনি।কারণ ডাক্তার তাকে বলেছে স্ত্রীর সাথে বেশি বেশি মেলামেশা করতে। তবুও ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলো ,
-আপনি আমার স্ত্রীকে দূরে থাকতে বলেছেন?
জবাবে ডাক্তার অট্টহাসি দিয়ে বলেছে,
-দেখুন মিষ্টার নিবিড় আপনাদের হাজবেন্ড ওয়াইফের স্টুপিট ঝগড়ায় আমার মতো নিরীহ মানুষকে জড়াবেন না।নিজের আমল নামায় সার্চ করে দেখুন কোথায় কোন ভুল করেছেন?
সেই থেকে নিবিড় খোঁজে চলেছে ভুলটা কোথায়?আজও পেলো না।তবে আর পাড়া যাচ্ছে না।প্রায় বছর হয়ে এলো বিয়ে করেছে এখনো বউকে কাছে পায়নি এটা শুনলে তার নিজেকেই ভোট দিতে ইচ্ছা হয় না। আর পাবলিক কি ভাববে?
সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিয়ের যা যা লাগে আজ কিনে ফেলবে।মক্কু আর জেনিকে সাথে নিয়ে যাবে মার্কেটে।আগেরবার প্রচুর নাকানিচুবানি খেয়েছে।তাছাড়া এতদিন কিপ্টা শুনে শুনে নিবিড়ের কান পঁচে গেছে।
নিবিড় মক্কুকে ফোন দিয়ে জানতে পারে জেনিকে নিয়ে একটা গাইনি স্পেশাল ডাক্তারের কাছে গিয়েছে সে।সেটার অপজিটেই শপিংমল হওয়াই নিবিড় তাদের সেখানেই থাকতে বলে ,সেও যাচ্ছে সেখানে।
যারা ভিশন বুদ্ধিমান তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্যকে নিজের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবে। আর যারা উঠতি বুদ্ধিমান তারা অপরকে বোকা ভাবে।জিয়ানা নিজের চেয়ে প্রতিপক্ষ কে বেশি বুদ্ধির দিক থেকে প্রায়োরিটি দেয়।অন্তত নিবিড়ের কাছে সহজেই ধরা পড়ার পর থেকে। এবার তার চিন্তা কিছুই অন্যই।
মানুষ মাত্রই ভয় ,দ্বিধা নিয়েই তৈরি।কিন্তু যাদের বাস্তবিক জ্ঞান ভালো তারা এই ভয় আর দ্বিধা এক সাইডে রেখে চলতে পারে। জিয়ানা এই কয়েকমাসে একা গভীর রাতে ভিন্ন ভিন্ন বেশে বের হয়েছে।তবে সরাসরি নিজেদের বিল্ডিংয়ের গেইট দিয়ে না।পাশের লাগানো দুই বিল্ডিং পাড় হয়ে তিন নাম্বার বিল্ডিংয়ের পেছন দিকে একটা ডোবা আছে যেখানে ময়লা ফেলা হয় সেই দিক দিয়ে।লং জাম্প গুলা এই কয়দিন কাজে দিয়েছে তার।বিল্ডিং গুলা পাশাপাশি হলেও তিন চার ফিট গ্যাপ ছিলো মাঝে।ছয়তালা বিল্ডিং পাড় হওয়ার আগে মনে হয়েছে এই বুঝি ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেলো।আহারে কাবলিওয়ালা কত আশা করে আছে জমিয়ে বাসর করবে।নিশ্চয় জিয়ানার লাশ বুকে নিয়ে আওড়াবে,
“হলো না। না ,হোক
আমি কি এমন লোক
আমার হলো না তাতে কি হয়েছে?
তোমাদের হোক।”
প্রতিবার তার এই কবিতায় মনে পড়েছে প্রতিটা বিল্ডিং পাড় হওয়ার সময়।আপন মনে হেসেও নিয়েছে কিছুক্ষণ। কিছুদিন আগে ফিরতে ফিরতে সকাল হয়ে যায়।তাই বয়স্ক বুড়ি সেজে লম্বা ঘোমটা দিয়ে কুজো হয়ে ক্লাবের ছেলেদের সামনে দিয়ে আসে।সেই সময় তারাই পাড় করে দিয়েছে রাস্তা।ঘোমটার নিচ থেকে হেসে কুটোকুটি হয়েছে বারবার।
নিবিড়কে এক্সপোজ করার ইচ্ছা নেয় জিয়ানার।সে ফ্রেম পাওয়ার জন্য হলেও সত্যি সত্যি জনসেবা করছে এবং করবে।কিন্তু পথে কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়ালে তাকে ওয়ান টু কা ফোর করে দিতে একপ্রহরও ভাবে না।এটাই একমাত্র চিন্তার।
জিয়ানা নিজেও চায় ইয়াং নেতৃত্ব আসুক।কারণ বুড়ো বাম মস্তিস্ক গুলার চিন্তা চেতনা যুগের সাথে যাচ্ছে না।এরা গোড়ামী আকড়েই বসে আছে এখনো। দেশের পরিবর্তন যদি কেউ করতে পারে তবে সেটা একমাত্র ইয়াং নেতৃত্বই পারবে।হুশমে জোস উড়াবে ,ধপাধপ পরিবর্তন করবে রক্তের গরমে। পরবর্তীতে ভুল করবে নিজের ক্যারিয়ার খাবে ,চেয়ার থেকে বিদায় হবে।তবুও ভালো চেয়ার আকড়ে ধরে বসে থাকার চেয়ে ফটাফট উন্নয়ন ,ফটাফট বিদায়।
তবে কেনো জিয়ানার এই গোপন তথ্য কালেকশন এর পায়তারা? কারণ সে চায় জবাবদিহিতা থাকুক।কড়া সমালোচনার ভয়ে স্বেচ্ছাচারিতা না করতে পারুক এই দেশের রাজনীতিবিদরা।সমালোচকরা হোক শুধুই সমালোচক। যাদের কেনা যাবে না। যারা কোন দলের না। পার্টিকুলার কোন ব্যাক্তির প্রতি লয়াল না। তাদের উদ্দেশ্য একটাই কড়া সমালোচনা। ভালো কাজের অ্যাপ্রিশিয়েট করবে তবে তেল মর্দন নয়।তাই তো তিন মাস খেটে উপজেলা পরিষদ গুলাতে ঘুরে ঘুরে ভোটাদের বই কালেক্ট করেছে।সেখান থেকে আবার মৃত্য ব্যাক্তিদের শনাক্ত করে ,এন আইডি কার্ডের নাম্বার কালেক্ট করেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। সেটাও করেছে সরকারি লোক সেজে।যদিও এটাও এক প্রকার প্রতারণা কিন্তু বড় বড় কাজের জন্য কখনো ছোট ছোট মিথ্যার আশ্রয় নিতেই হয়।তানাহলে নিবিড় এক তুড়িতেই তাকে এক্সপোজ করে ফেলতো।কারণ সে আইটিতে এক্সপার্ট।
গ্রুপের নাম “ওয়ান টু কা ফোর” জিয়ানা মাত্রই আকলিমা বানু আইডি দিয়ে একটা পোষ্ট দিলো সাথে উঁচু মঞ্চে নিবিড়ের দাঁড়ানো ফটো।
” নেতা মানে হচ্ছে পথপ্রদর্শক।অথচ আমাদের এলাকার নেতা জনাব সুখনীল নিবিড় ক্ষমতায় না যেতেই পথপ্রদর্শন না করে পথরোধক হয়ে গেছেন।যেখানে সেখানে সমাবেশ করে জনদুভোর্গ বাড়াচ্ছেন।মাঠে ঘাটে সমাবেশ মেনে নেয়া যায় ,কিন্তু সড়কের উপর ঝটিকা সমাবেশের হেতু খুঁজে পেলাম না”
খাদিজা আক্তার কমেন্টস করেছে” কোমরের ব্যাথা নিয়া ঘন্টাখানেক বইসা ছিলাম রাস্তায়।ভোট চাইতে আসলে আমরাও বসাই রাখমু”
ইদ্রিস মিয়ার মন্তব্য ” মাছ ডেলিভারিতে দেরি করায় মাছ নরম হয়ে গেছে তাই গাড়ি ভাড়া হাফ দিছে।আমরাও ভোট দিতে যামু কিন্তু ভোট দিমু না।
রেনু দাসের মন্তব্য ” অসুস্থ হইয়া কত কইলাম একটু যাইতে দেন। হুনলো না। প্রটোকল মারাই। ভোট চাইতে আসলে ঝাটার বাড়ি একটাও মাটিতে পড়তো না।”
জিয়ানা পড়ে আর হাঁসে।ব্যাস তার কাজ শেষ। এখন এটা পোলাপান ভাইরাল করে দিবে।পরবর্তীতে আর রাস্তায় সমাবেশও হবে না।
আর একটা কাজও সে এগিয়ে রেখেছে ,তার টুইন ভাই কোথায় আছে সেটা জেনে গেছে।মামুন ইসলামের অফিসের কোন এক সিক্রেট কামড়াতে। এখানে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে পারছে না।প্রতিটা স্টাফ খুবই কঠিন কিসিমের। এরা বাড়তি কথা একেবারেই বলে না।তাই জিয়ানা কারো সাথেই বিশেষ খাতির ফেলাতে পারেনি।তবে মামুন ইসলামের বর্তমান এসিস্ট্যান্টের বউয়ের সাথে খাতির জমিয়েছে।সেই মহিলার ব্লাডে সুগার বেশি হওয়াই প্রতিদিন সকালে হাটেন।জিয়ানা সেই হাটার সঙ্গী।দুইদিন থেকে জিয়ানাকে তাদের বাসায় দাওয়াত দিচ্ছে। জিয়ানা সময় করে এর মাঝে যাবে ভেবেছে।
তার ভাবনার মাঝেই মক্কুর ফোন আসলো।
-জিয়ু আশা ক্লিনিকে আসো তো একটু তাড়াতাড়ি। জেনিকে সামলানো যাচ্ছে না।প্রচুর কান্নাকাটি করছে।
জিয়ানা কারণ জিজ্ঞেস করলো না ,কারণ কিছুদিন থেকে জেনি ডিপ্রেশনে ভোগছে।ফাইনাল দিয়ে আপাতত পড়াশোনা নেই।বিয়ের পর থেকেই কোন ফ্যামিলি প্ল্যানিং করেনি।কারণ তারা দুইজনই ঘরকে ফুটবল টিম বানাতে চায়।কন্সিভ হচ্ছিলো না দেখে তিনমাস থেকে ডাক্তার দেখাচ্ছে।তিনদিন আগে ডাক্তার কিন্তু বেসিক টেস্ট দেয়। আজ রিপোর্ট আনতে গেছে।নিশ্চিত খারাপ কিছু এসেছে রিপোর্টে। তাই ইমোশনাল ফুল হয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছে।জিয়ানার বুঝে আসে না এদের এত চোখের পানি আসে কোত্থেকে? সিলিয়ারি বডির জায়গা অতি অল্প। তাহলে এতে এত পানি থাকার কথা না। কিন্তু জেনি টানা পাঁচ ঘন্টা কান্না করলেও পানি পড়তেই থাকে হরহর করে।সেখানে জিয়ানার দুইফোটা পড়েই নাই হয়ে যায়।
নিজের হাবিজাবি চিন্তা হাটিয়ে ব্যাগ কাধে নিয়ে চুলে হাত খোপা করে ছুটলো। জিয়ানা চ্যাকাচাক একজন মানুষ। ছেলেদের মতো নো রেডি পন্থায় চলার ফলে টাইম বেঁচে যায় বহু।
জেনি মক্কুর কাধে মাথা রেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে অনবরত। মক্কু শান্তনা দিতে দিতে তার শান্তনার বুলি শেষ। নিজের ভেতরটাও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।সে পুরুষ মানুষ ভেতরের খবর বাহিরে জানানোর সিস্টেম তার নাই।তাই তো অন্তর পুড়ে গেলেও জেনিকে সামলাচ্ছে।
জেনির ডান ওভারি রেপের সময় মারাত্মক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। তার জন্য ডান ওভারি ডিম্বাণু উৎপাদনে একেবারেই অক্ষম। বামটাও কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত। তবে সেটাতে সম্ভাবনা আছে ফিফটি পার্সেন্ট। কন্সিভ যে একেবারেই হবে না সেটা ডাক্তার বলেনি তবে বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা জেনির স্বাভাবিকের চেয়ে কম এটা জানিয়েছে।
একজন বাঙ্গালী নারীর পূর্ণতায় বলা হয় বাচ্চা জন্মদানের মাধ্যমকে।সেখানে এমন একটা রিপোর্ট যেকোন মেয়ের জন্য অতি কষ্টের।মক্কু আর জেনির জন্য আরও বেশি কষ্টের।মক্কু এক প্রকার ছিন্নমূল মানুষ। পরিবারহীন।তার যে পরিবারের কতটা স্বপ্ন সেটা জেনি কাছ থেকে দেখেছে।আগের মাসে জেনির ম্যান্সটুয়াল সার্কেল দেরি হওয়াই মক্কু পেটে বারবার কান পেতেছে। জেনি মক্কুকে সেই সুখ স্মৃতিটা দিতে পারবে না ভাবতেই মনটা ভেঙে চুড়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ অদূরে হঠাৎ সজীবের সাথে পেট উঁচু একটা ছোটখাটো আদলের সুন্দর মুখের নারীকে দেখে জেনির মনে হলো কেউ তার কন্ঠনালী শক্ত করে চেপে ধরেছে।হৃদপিণ্ড বরাবর একশো খঞ্জর গেথে দিয়েছে।। আচম্বিতে জেনির কান্না বন্ধ হওয়াই মক্কু জেনির নজর অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখে সজীব আর তার গর্ভবতী স্ত্রী এদিকেই আসছে।জেনি কান্না থামিয়ে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে সেই দিকে।পরক্ষণেই চোখ নিচে নামিয়ে ফেলে।তাদের উপর তার নজর না লেগে যায় এই ভয়ে।নিজের চোখের উপর তার আর ভরসা নেই।যেদিকে তাকাবে সব ধ্বংস করে দিবে। তারপর আস্তে করে বলে,
-মুসাদ্দিক তুমি ভুল করেছো। আমাকে বেছে নিয়ে লাইফ টাইম লস হয়েছে তোমার।তোমারও এমন একটা সিচুয়েশনে থাকা উচিত ছিলো।আমার সম্পুর্ন মত আছে তুমি তোমার মতো লাইফ গুছিয়ে নিতে পারো।আমার কথা ভেবো না। চার আঙুলের কপালে বেশিকিছু লিখা থাকে না।যা থাকে হইতো ভালো ,না হয় খারাপ।আমার কপালে ভালোটা লিখা নাই।তাছাড়া কি হবে এত ভালো দিয়ে।এমনিতেই জীবন চলে যায়।আমাকে জাষ্ট তোমার স্ত্রী স্বীকৃতি দিলেই হবে।তুমি আবার বিয়ে করে নাও একটা।
মক্কু হুংকার ছাড়লো “জেনি” বলে। না চাইতেও সজীব আর তার স্ত্রী থেমে গেলো তাদের ঠিক সামনে।
সজীব এগিয়ে এলো সাথে তার স্ত্রী।মক্কু সালাম দিয়ে শুভেচ্ছা জানালো দুইজনকে।মক্কুর হাতে বেবির ফটোওয়ালা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ফাইল দেখে সজীবের বুক কামড়ে ধরে। সেও জেনি আর মক্কুকে শুভেচ্ছা জানায়।কিন্তু জেনি একবারও তাদের দিকে মাথা তুলে দেখল না। সজীবের স্ত্রী জেনিকে দেখে চিনেছে। এই সিচুয়েশনে একজন নারীর যেমন লাগে তারও ঠিক তেমনই লাগছে।ভেতর বাড়িতে অন্তর্দহন চলছে।
শুভেচ্ছা জানানোতে মক্কু একটু অস্বস্তিতে পড়ে। কিন্তু জেনি উঠে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে,
-শুভেচ্ছা জানানোর মতো কিছু হয়নি সজীব।আমার ভাগ্য অতটাও সুপ্রসন্ন না। একগ্লাস পানি খেতে গেলেও হাত মাথা পেচিয়ে মুখের কাছে আনতে হয়। এবং আজ আবার প্রমাণ হলো তুমি রাইট ডিসিশন নিয়েছিলে।প্রতিটা পুরুষেরই তোমার কাছ থেকে শেখা উচিত।মুসাদ্দিক কে মাঝেমধ্যে টিপস দিয়ো।
সজীব বুঝলো না জেনির কথা।তবে কান্নার পরে চোখ মুখ ফুলে উঠায় বুঝতে পারলো কোন সমস্যা হয়েছে।সজীব কিছু বলবে তার আগেই তার স্ত্রী নীলিমা এগিয়ে এসে বলে,
-মনে হচ্ছে কোন সমস্যা তোমার? তবে সে জন্য ওকে তেড়া কথা শুনাচ্ছো কেনো? নিজের এত বড় কলঙ্ক নিয়েও তো বর পেয়েছো তবুও ছুপছুপ স্বভাব আছে দেখি।এক্সের কাছে নিজের স্বামীকে টিপস নিতে বলছো?
নিবিড় এসে পেছনে দাঁড়িয়ে পরে ,তার পেছনে জিয়ানাও এসে উপস্থিত হয়।
মক্কুর চোখ মুখ হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠলো। কিন্তু নীলিমাকে কিছু না বলে জেনির দিকে তাকিয়ে বলে,
-বাহিরের মানুষের সামনে সব বিষয়ে কথা বলা উচিত না জেনি।এতে অনেকের বদ নজর লাগে। তাছাড়া মানুষের প্ল্যানের চেয়ে যে আল্লাহর প্ল্যান চমৎকার হয় তুমি নিজেও প্রমাণ পেয়েছো? রাইট? এখন আমার দিক থেকে ক্লিয়ার করি শুনো ,আমি আঠারো বছর পর্যন্ত এতিম খানায় মানুষ হয়েছি।প্রতিটা দিন অপেক্ষায় থাকতাম কোন পরিবার এসে আমাকে দত্তক নিবে।আমি নিজে একটা পরিবার পাবো।মা বাবা ডাকতে পারবো।প্রতিদিন রাতে এই স্বপ্নে ঘুমাতে যেতাম। আর উঠতাম ফ্যাকাসে স্বপ্নভঙ্গ মন নিয়ে। এই এমন কয়েকজনের স্বপ্নের পূরনের সুযোগ আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন জেনি।দেখো নিজের বাচ্চা হলে আমি এই চিন্তা করতাম না। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে মনে হলো আমার মতো আমরাও কাউকে আনতে পারি।রাইট? নিজেদের হলে তো এই চমৎকার বোধটা আসতো না? এইজন্যই আল্লাহর প্ল্যান এমন চমৎকার হয়। তাছাড়া আমাদের কুরআন শরীফের সবচেয়ে মূল্যবান মোটিবেশনের চারটা শব্দ হচ্ছে , ” লা তাহযান ” মানে অতীত নিয়ে কখনো হতাশ হবে না। ” লা তাখাফ ” মানে ভবিষ্যৎ নিয়ে কখনো দুশ্চিন্তা করবে না।
বুঝাতে পেরেছি?
জেনি মাথা নাড়ে। মক্কু চোখের জল মুখে সাইড হাগ করে দাঁড়িয়ে সজীবের দিকে তাকিয়ে বলে,
-ভাই একটু সমস্যা তবে বেশি না।তবে আপনার জন্য অগ্রীম শুভকামনা। ভাবি মাশা-আল্লাহ ধানি লঙ্কা।
নীলিমা কটমট করে সজীবের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তোমার সামনে তোমার বউকে অপমান করে আর তুমি তব্দা পুরুষের মতো চেয়ে দেখো? লজ্জা না থাকুক মেরুদণ্ডও নাই? নাকি এক্সকে দেখে পুরাতন পিরিত জেগে উঠেছে?
সজীব লজ্জায় মরমে মরি মরি অবস্থা। মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না।
পেছন থেকে জিয়ানা তার বোনের দিকে তাকায়।তারপর তাকায় মক্কু আর সজীবের দিকে।সত্যি আল্লাহর প্ল্যান কত চমৎকার। একজন কয়েকবছর স্বপ্ন দেখিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। আরেকজন গোপনে যত্ন করে সেই ছুড়ে মারার জিনিস বুকে আগলিয়ে রাখে।
তার নিজের দিক দিয়েও সেইম।সৃষ্টিকর্তা একদিকে কেড়ে নিলে অন্যদিকে ঢেলে দেন।আঞ্জুমানের স্নেহ উঠে যাওয়ার সাথে সাথে জেনির স্নেহ দ্বিগুণ বেড়েছে।জেনি সংসার করছে নিপুন হাতে।জিয়ানাকে কিলিয়ে চাপড়িয়ে খাওয়াই প্রায় প্রতিবেলা।জিয়ানা প্রচন্ড মেসি। তাই কাপড় চোপড়ের এলোমেলো মেলা থাকে রুম ময়। জেনি বিকেলে নিজের সংসারের কাজ গুছিয়ে জিয়ানার রুম গুজাবে আর প্যাক প্যাক করে সংসারের জ্ঞান দিবে।
নিজের অভ্যাস না বদলালে নিবিড় তাকে একঘরে দশমিনিট রাখবে না এটা এলার্ট করে দেয় প্রায়ই।কিন্তু জিয়ানার হেলদোল নেই।সে জেনির এই মা মা ভাবটা খুব উপভোগ করে। কারণ সে জানে তার যে মারহাবা মার্কা ভাগ্য ,কাল এই স্নেহময় শাসনটুকু নাও পেতে পারে।নিজের থুতনি হাত দিয়ে জেনিকে টুকুটুকু করে পুরাটা সময় অপলক দেখবে।জেনির বিরক্ত কখন গলে জল হয়ে যাবে এভাবে বাচ্চাদের মতো তাকিয়ে থাকা দেখে।তবুও মেকি রাগ নিয়ে ঝাড়বে কিছুক্ষন।মাঝমধ্যে পিঠে দুই একটা পড়বেও। জিয়ানা খিলখিল করে হেঁসে উঠে প্রতিটা মার খেয়ে।মারা বাদ দিয়ে নিজেও হাঁসির সঙ্গ দিবে জিয়ানার সাথে।
জিয়ানা যাদের ভালোবাসে তাদের জন্য খুব স্বার্থপর। তাদের কষ্ট সে সহ্য করতে পারে না একেবারেই। ভালোবাসার মানুষের ফর্দো দিনদিন ছোট হয়ে আসলেও নেহাৎ কমও না।তবে প্রথম শ্রেনীর একজন জেনি।কেউ তাকে কটু কথা বলবে আর জিয়ানা তা দাঁড়িয়ে শুনবে? উমহু কাবি নেহি।
নিবিড়কে সাইড কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে বলে ,
-হাই গাইস। হোয়াটস আপ সজীব ব্রো?সিস্টেম রেন্ডার চলছে? হাউ ফাষ্ট। ভেরি ইম্প্রেসিভ। ডাউনলোড হবে কবে?
নীলিমা এমনিতেই রেগে ঢোল তারপর আবার এই উদ্ভট পোশাকের আজব ল্যাংগুয়েজের মেয়েকে দেখে তেতে উঠলো যেনো। জিয়ানা বুঝলো তার ভেতরের অবস্থা তাই নীলিমার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-থ্রি ইডিয়ট মুভি দেখেছেন ভাবি?
বিরক্তি নিয়ে সজীবের দিকে তাকায় নীলিমা এমন আজব প্রশ্ন প্রথম দেখায় কে করে। তবুও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়।জিয়ানা এবার নীলিমার পেটের কাছে মুখ নামিয়ে বলে,
-তোর মা দেখেছে মানে তুইও দেখেছিস।শোন থ্রি ইডিয়টস মুভিতে আমির খান মানে রেঞ্চো তোর মতো পেটের পুচকে একটা টিপস দেয়। “তু আন্দারই রেহেনা ভাই।বাহার বহত সার্কাস হ্যা। এই সার্কাস কা রিং মাস্টার তেরা মা হ্যা। আপনা ঠোট ওর আখে গুল গুল গুমায়েগি আর কাহেগী ছুপছুপ মাত কারনা। “তোকেও সেইম টিপ্স দিলাম।
তারপর মক্কুর দিকে তাকিয়ে বলে,
-ভাইয়া আপনাকে পা ধরে সালাম করতে ইচ্ছা হচ্ছে করি?
-আরেহ কি বলো হঠাৎ এই ইচ্ছা? আমার পকেট কিন্তু ফাঁকা। আগেই বলে দিলাম।
বলে জিয়ানা আর মক্কু হেঁসে উঠলো। নিবিড় এগিয়ে এসে মুচকি হাঁসি দিয়ে সজীবকে “কংগ্রাচুলেশনস “বলে।
সজিব জেনিকে সরি বলে নীলিমার হাতের বাহু ধরে এগিয়ে যায় সামনে। জেনি তার দিকে একবারও তাকায়নি এটা তার গায়ে লেগেছে খুব।এতটাই পর হয়ে গেছে সে।মনে মনে ভাবে হাত ভাঙুক , পা ভাঙুক তবুও কারো হৃদয় না ভাঙে যেনো।
জোর করে ধরে নিবিড় আর জেনি জিয়ানাকে শপিংমলে এনেছে।কিন্তু বান্দী জেনির সাথে লেপ্টে আছে।ভাবখানা এমন তাকে চিনেই না।এমনকি মক্কুকে সাইডে সরিয়ে দুইবোন ধরাধরি করে হাটছে।
নিবিড় বাস্তববাদী মানুষ। ইমোশনাল কথাবার্তা সে বলতে পারে না। বলতে গেলেই থা*প্পাড়াবো ,চটকানা খাবা চলেই আসে।মক্কু থেকে জুনিয়র অনেকেই তাকে টিপস দেয় জিয়ানার সাথে একটু স্ফট হতে। কিন্তু হৃদয়ের প্রলয়কারীনি এই মেয়েকে সে কিভাবে বুঝাবে ,তার জন্য সে কি? কিভাবে দেখাবে তার নজরে জিয়ানা কতটা স্পেশাল?বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন মেয়ের সাথেই নিবিড় জিয়ানাকে কমপ্যায়ার করতে পারে না।
নিবিড় ভালোবাসা যে স্বার্থহীন এই কথায় বিশ্বাসী না।তার কাছে চাহিদার অপর নাম ভালোবাসা।এখন এই জায়গায় এসেই তার সাথে কারো মিলে না।নিশ্চিত জিয়ানাও এইজন্যই এড়িয়ে চলছে।একান্তে বুঝাতে হবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়।
নিবিড় এগিয়ে গিয়ে জিয়ানার বাহু ধরে টেনে নিজের কাছে আনে।জেনি অবাক হয় হঠাৎ এমন টানে।কিন্তু মক্কু তাকে ভাবার সময় না দিয়ে পাশের একটা শপে ঢুকে যায়।
জিয়ানা কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-এটা কি হলো?
-যার যার বউ তার তার কাছে থাকবে।
-আপি তো সারারাত থাকেই মক্কু ভাইয়ের কাছেই।এখন আমি একটু থাকলে সমস্যা কি?
-হ্যাঁ অন্যের বুঝ তো তোমার খুউব আছে।নিজের হাজবেন্ডকে দেখলেই যত ছলাকলা। মক্কু সারারাত বউ পায় আর আমি?
-আপনার আছে না রুহানী? তার কাছে যান।
বলে মুখ ঝামটা দিয়ে জেনিদের পেছন পেছন জিয়ানা ছুটলো। নিবিড়ের হঠাৎ মনে হলো তাহলে এই রুহানী সমস্যা? কিন্তু রুহানীর সাথে লাষ্ট রেজাউল সরকারের মা*রা যাওয়ার দিন দেখা হয়েছে। এরপর তো দেখা তো দূরের কথা ফোনই রিসিভ করেনি সে।তবে? ফট করে মনে পড়ে ,সেদিন ক্যামেরার সামনে রুহানী নিবিড়কে জড়িয়ে ধরেছিলো। হুম এই জন্যই তাহলে জেলাসী থেকে এমন আচরণ।
ব্রাইডাল কাপেল কালেকশান শপের ঢুকেছে সবাই।নিবিড় পছন্দ করে দুইটা লেহেঙ্গা সিলেক্ট করে। জিয়ানা পড়বে না। কারণ প্রতিটা ড্রেসই অনেক দামী। তার এইসব অপচয় পছন্দ না। নিবিড়ের চোখ রাঙানো ,ধমকানো কোনটাই কাজ হয়নি।পরবর্তীতে দোকানী চমৎকার একটা আইডিয়া দিয়েছে।পাশের একটা শপে ব্রাইডাল ড্রেস থেকে শাড়ি সব রেন্টে পাওয়া যায়।জিয়ানা এককথায় রাজি।কিন্তু নিবিড় রাজি না। তার ভাষ্যমতে অপরের ব্যবহৃত জিনিস সে জিয়ানাকে পড়তে দিবে না।
মক্কু আর জেনি এই দুইজনের ঝামেলায় চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থা। শেষমেষ সিদ্ধান্ত হলো মক্কু আর জেনি জিয়ানাকে এই দোকানের সবচেয়ে কমদামী ড্রেসটাই কিনে দিতে চায়।এটা গিফট সে যেনো মানা না করে। জিয়ানা তাই পরজয় স্বীকার করে রাজি হয়।তবুও মুখ ভার করে রেখেছে কারণ সবচেয়ে কম দামটাও পঁচিশ হাজার। তার হিসেব করা শেষ পঁচিশ হাজার দিয়ে রাব্বির কতদিনের স্কুলের বেতন হতো , দারোয়ান মামার প্রায় তিনমাসের সংসার খরচ। আর রিক্সাওয়ালা কাশেম মামার কিস্তিটা শেষ হয়ে যেতো।
জিয়ানা লেহেঙ্গা দুইটা হাতে নিয়ে ট্রায়াল রুমে ঢুকতে ঢুকতে ভাবে বিল গ্রেটসের সেই বক্তব্যের কথা,
“তোমার দশ জন বন্ধুগ্রুপের নয়জন যদি হয় ভিক্ষুক তবে দশ নাম্বার ভিক্ষুকটা তুমি হবে। আর নয়জন যদি হয় মিলিয়নেয়ার তবে দশম মিলিয়নেরাটাও তুমি হবে ।” তাই তো এই বড়লোক গ্রুপে এসে জিয়ানার মতো গরীবও আজ বড়লোক।
ট্রায়ালের রুমে জিয়ানা লেহেঙ্গা দুটো ট্রায়াল দিতে ঢুকেছে।কিন্তু পেছনের জিপ আটকানো তার সাধ্যের বাহিরে।দরজা অল্প খুলে উঁকিঝুঁকি মেরে জেনিকে খুজে।বান্দি লাপাতা। নিবিড় এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
-এনিথিং রং?
-হুম আপিকে ডাকুন তো জিপ লাগাতে পারছি না।
-আপি লাগবে কেন জলজ্যান্ত হাজবেন্ড থাকতে?
বলে ফট করে ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দেয়।জিয়ানা হা করে তাকিয়ে আছে দেখে থুতনি ধরে হা বন্ধ করে ঘুরিয়ে পেছন ফেরায় নিবিড়। উন্মুক্ত কোমল পৃষ্ঠদেশ দেখে নিজের শিরদাঁড়ায় শীতল কিছু অনুভূত হলো।ইচ্ছা হলো অনেক কিছু। সব ইচ্ছাকে পাত্তা না দিলেও একটা ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখা গেলো না।এগিয়ে গিয়ে ঝুকে যায় পিঠের দিকে।হাত নিজের পেছনে নিয়ে দাঁত দিয়ে জিপের হোক ধরে আস্তে আস্তে উপরে উঠানো শুরু করলো। নাক আর ঠোঁট আলতো ভাবে ছুঁয়ে গেলো জিয়ানার পিঠময়।
জিয়ানার ভেতরের কাপন কিছুটা ছিটকে বের হয়ে এলো বাহিরেও।এমন স্পর্শে কোন নারীই স্থির থাকতে পারে না।তবুও অনুভূতি সাইডে রেখে নিবিড়ের দিকে কটমট করে তাকায়। নিবিড় এগিয়ে গিয়ে আলতো জড়িয়ে ধরে কপালে অধরে ঠোঁট ছুঁয়ে বলে,
-মাশা-আল্লাহ।আমার বউ আস্ত একটা হট র্যাবিট। তবে এই পোশাকে বাহিরে যাওয়া যাবে না জিয়ানা।এই ব্লাউজের ডিজাইনটা খোলামেলা এই পাতলা ওড়নায় ঢাকা হবে না।আমি এলাও করছি না।
-গু*ষ্টি কিলাই আপনার এলাওয়ের।আমি এমনিতেও পড়তাম না এইটা। আপি আর মক্কু ভাই রিকুয়েষ্ট করলো বলেই ট্রায়াল দিচ্ছি।উপরে শার্ট পড়বো।এ্যাই আপনি বের হোন তো।কেউ দেখলে ব্যাপারটা কেমন নোংরা দেখাবে?
নিবিড় জিয়ানার দুই গাল একহাতে চেপে ধরে বলে,
-এত সুন্দর ঠোঁট দিয়ে এমন বাজে কথা বের হয় কেন হ্যাঁ? রেডি থাকো আজকের জন্য। এখান থেকে সরাসরি নূরম্যানসনের যাবো।তবে একটা শর্ত আছে।
-কোন শর্ত নাই।আপনার শর্তের খেতা পু..উম্ম…
নিবিড়ের এমনিতেই জিয়ানাকে এই অবস্থায় দেখে আওলা জাওলা অবস্থা। তারপর উপর এই মেয়ের ঠোঁট চেপে ধরায় লাল হয়ে উঠেছে।স্থান কাল ভুলে ডুবে যায় ব্যাক্তিগত নারীর মাঝে।
-জিয়ানা হলো তোর?
বাহিরে জেনির ডাকে নিবিড় ছেড়ে দেয় জিয়ানাকে। জিয়ানা উল্টো ঘুরে যায়।আজকাল তার এই ভন্ড নেতার কথা চিন্তা করলেই লজ্জা লাগে। সাইকাইট্রিসের কাছে জেনেছে একমাত্র জিয়ানাই পারে নিবিড়ের ট্রমা কাটাতে। তাদের ব্যাক্তিগত মুহূর্ত ক্রিয়েট করতে বলেছে বেশি বেশি।তবে কিছুদিন যেনো সে নিবিড়কে এড়িয়ে চলে।এতে করে নিবিড় নিজের অনুভূতির সম্পর্কে ক্লিয়ার হবে।আর নিবিড় আগালে জিয়ানা যেনো সর্বোচ্চ কোওপারেটিভ করে।তখন থেকেই যখনই চিন্তা করে তাদের মাঝেও ওইসব হবে ,তখন থেকেই তার গাল লাল হয়ে উঠে। কি আজব ,অনুভূতি গাঢ়ো হয়ে সে বিপদে পড়েছে।নিজের শরীরের উপর নিজের কন্ট্রোলও হারিয়ে অনেকটা।
নিবিড় খেয়াল করে সবই। জিয়ানা শুধু অদ্ভুত না ,প্রচন্ড ছটফটে আর ফ্লেক্সিবল। অথচ আজ অল্প কাছে আসায় কেমন ব্লাসিং করছে। তাই নিবিড় জিয়ানাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-লজ্জা পাচ্ছো?
-লজ্জা পাবো কেনো?
-তাহলে নজর লুকাচ্ছো কেনো?
-কি আশ্চর্য। বের হোন তো এখান থেকে।
-এইবার আমি শিওর।
-আমি কি মানুষ না?
-সন্দেহ ছিলো এতদিন।ভাবতাম আমার বউ এলিয়েন।আমি মা*রা গেলেও কাদবে না।
-কাদঁবো কেন? আগে মরে যাওয়ার জন্য আবার মারবো আপনাকে।
-দ্যাটস লাইক মাই গার্ল।
বলে গান টেনে আবার প্রশ্ন করে ,
-আর কত পালাই পালাই করবে? আসবে না আমার কাছে?
-দিন যাবে ,সপ্তাহ যাবে ,মাস যাবে কিন্তু আমার তো আপনি ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।
-আজকে যাবে?
-উমহু। কাল সকাল সকাল যাবো।মাগরিবের আজান পড়ে যাবে কিছুক্ষন পর। এই সময় কোথাও যাওয়া অনুচিত।
-আমি নিয়ে যাবো রেডি থেকো।
তারপর জেনির উদ্দেশ্যে কড়া গলায় বলে ,
-টু মিনিটস ,শী ইজ অলমোস্ট ডান।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৫০
জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
এই রেডটাই নাও। দিস ইজ ভেরি প্রিটি।
ভেতরে জিয়ানা ,বাহিরে জেনি আর মক্কু হা হয়ে যায়।জিয়ানা দাঁতে দাঁত পিশে বলে,
-এটা কি হলো?
নিবিড় ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বের হতে হতে বলে,
-এইসব ড্রেস হেল্প ছাড়া পড়া যায় না। তাই হেল্প করলাম একটু।
