Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১২

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১২

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১২
নীতি জাহিদ

তামান্নাদের গ্রাম সাজানো গুছানো ছবির মতন। রাস্তার দু ধারে খেজুর গাছ, তাল গাছের সারি। পাশে জমির আইল, ধানক্ষেত সব সবুজে আবৃত, মাঝে মাটির সরু রাস্তা। মন মাতানো সেই সৌন্দর্য্য।
বাবার গলা ধরে বায়না করলো মিনহাজ কন্যা,
– বাবা একটু নামি, এত সুন্দর গ্রাম। মন চেয়েছে মাটিতে হাঁটতে।
জন্মের পর থেকে শহরের ইট,পাথরে মানুষ। তাই সায় দিতেই মিনহাজ মাথা ঝাকালো তবে মিনহাজ কি আর অনুমতি দেয়ার সুযোগ পায়? এর পূর্বেই মোনার গুণধর মামা লাফিয়ে নামে গাড়ি থেকে। ভাগ্নীকে নামিয়ে গাড়ি সাইড করতে বলে রবিনকে। এ ক্ষেত্রে মিনহাজ এবং ইমরান নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। রবিন গাড়ি সাইড করতেই সবাই নেমে দাঁড়িয়ে পড়লো তাল গাছের নিচে। পেছনে সাদাফদের গাড়িও রাস্তা থেকে নেমে মাঠের একপাশে দাঁড় করালো। সরু রাস্তায় দুটো গাড়ি দাঁড় করানোর জায়গা নেই। মোনা পায়ের জুতা খুলে মাটিতে পা রাখলো। ঠান্ডা মাটি যেন শরীরে কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে। সতেজ হাওয়া বইছে। প্রাণ ভরে শ্বাস নিলো। হাওয়ার দমকা তেজ যেন শিহরণ জাগিয়েছে। তালগাছের ছিড় দিয়ে সূর্যের ছিটা এসে পড়লো রমনীর বদনে। এ যেন সূর্য স্নান। অবাধ্য চোখদের বারং বার বারণ করা হচ্ছে যেন সেদিক পানে না চায়। রিমিরা কাছাকাছি এসে ঘুরছে। রিমি বলে উঠলো,

– মোনা পা চুলকাবে, জুতা খুললে কেনো? মাটি দেখলেই গা গুলায় আমার। মাটিতে কত নোংরা থাকে। আর এতো গ্রামের মাটি।
কথাটা কানে বাজলো। রিমির ইমরানের প্রতি অনুভুতি আছে জানার পর থেকে সহ্য হচ্ছে না মোনার। এখন আবার জ্ঞান দেয়াটা অতিরিক্ত লাগছে। আজকে চুল গুলো টেনেই দিবে। কি সুন্দর ঢং করে স্ট্রেইট করেছে। করাচ্ছি স্ট্রেইট! কিছু একটা বলতে যাবে এর আগেই কড়া ভাষা কানে এলো,
– মিস রিমি, মাটি দেখলে যদি গা গুলায়, তাহলে আপনাকে দেখলেও গা গুলানোর কথা আমাদের। আপনিও তো মাটির তৈরি।
থতমত খেয়ে গেল সবাই। জিহবায় কামড় দিলো সাদাফ, তিহান। রিমির এসব বিলাসিতা একদিন না সবাইকে ডুবায়। কোথায় কি বলতে হয় জানা নেই এই মেয়ের। মিনহাজ ঘটনা সামাল দিয়ে বললো,

– কথাটা হয়তো রিমি ওভাবে বলেনি ইমরান। বাদ দে বাতাসটা অনুভব কর। অনেক বছর পর গ্রামে এসেছি। ভালোই লাগছে।
ঘন মেঘে ঢাকা আকাশের মত মুখটা করে একটু সামনে ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ফোন বের করলো। রোদের আবছা ইমরানের মুখে পড়েছে। মোনা নিষ্পলক তাকিয়ে আছে ইমরানের দিকে। চোখে সানগ্লাসটা বেশ মানিয়েছে। মোনা আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে দেখতে খানিকটা পা ফেলে সামনে এগিয়ে গেলো। রোদ চশমার আড়ালে খালি পায়ে হেঁটে আসার রমনীর গতিবিধি ঠিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই খবর কি রমনী রেখেছে? জানেই না। শাড়ির কুচি ধরে ইমরানের সামনে এসে দাঁড়ায়। মোনাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দৃষ্টি সামনে রেখে মোনার দিকে না তাকিয়ে বললো,

– ভালো করেছো জেদ করে নেমে।
– কেনো? এমন কেনো মনে হলো আপনার।
– কারণ নেই, মনে হলো তাই বললাম। বেশ সুন্দর গ্রাম। হয়তো কিছু একটা মিসিং ছিলো। পা দুটো মাটিতে পড়ায় ষোলো আনা পূর্ণ হলো।
মোনাকে বিস্মিত রেখে এগিয়ে গেলো গাড়ির কাছে। সবাইকে গাড়িতে উঠার তাড়া দিলো। ইমরানের বলা বাক্যগুলো মোনার মর্ম স্পর্শ করলো। হাওয়ার তেজ বাড়লো। গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে মোনার মুখাবয়বের উজ্জ্বল চিত্র দেখে কিঞ্চিৎ হাসলো। লাফিয়ে লাফিয়ে জুতো হাতে মোনা গাড়িতে চেপে বসলো। কি এমন হলো যে মেয়েটা এত আহ্লাদিত?

তামান্নাদের গ্রামের বাড়ি বাইরে থেকে দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। শীতল পরিবেশ। ছায়াঘেরা বাড়ি। বংশের প্রথম মেয়ে হওয়াতে সকলের ইচ্ছে ছিলো গ্রামের বাড়িতে করবে অনুষ্ঠান। গাজীপুরের গ্রাম এই মেহেরপুর। বাড়ির উঠোনে প্যান্ডেল করেছে। এক পাশে গাড়ি পার্ক করেছে ড্রাইভার। সাদাফদের গাড়ি এখনো আসেনি। হঠাৎ শান্ত হলো মোনা। মুড সুইং বলতে একটা শব্দ আছে, আপাতত সেটা পারসোনালিটি সুইং এ স্থানান্তর হয়েছে। কারো সাথে অযাচিত আলাপে যায়নি। কথা বলে কারো মাথা ধরিয়ে দেয় নি। বাবা,মামা নেমে পড়লে নিজেও নেমে পড়ে। মিনহাজ এগিয়ে যায় তামান্নার বাবাকে দেখে। ইমরানের ফোন আসে, একপাশে ছায়ায় গিয়ে কথা বলছে। নয়ন ইমরানের পাশে দাঁড়ায়। কথা শেষে ইমরান ঘুরতেই নয়নকে দেখে মৃদু হাসলো। নয়নের হাসি নেই। গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলো,

– আমি যা সন্দেহ করছি এমন কিছু কি ঘটেছে বা ঘটার সম্ভাবনা আছে?
ইমরান ভ্রু কুচকে ভাবছে নয়নের ইঙ্গিত কোনদিকে। নয়ন ঘুরে মোনার দিকে তাকালো। চোখ দিয়ে বুঝালো মোনার ব্যাপারে প্রশ্ন করছে। মোনা হাতে ফোন নিয়ে অপেক্ষা করছে বাকিদের। নয়নকে জানিয়েছে বাকিরা এলেই ঢুকবে। ইমরান ধানক্ষেতের দিকে ফিরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে,
– নিশ্চিত নই আমি! ধারনা ভুল ও হতে পারে।
– আমি তো নিশ্চিত।
তড়াক করে বন্ধুর দিকে ফিরলো ইমরান। নয়ন চোখ বুজে বললো,
– মিনহাজ ভাই জানলে ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাবে। মোনার আচরণে অস্বাভাবিকতার আলাপ পাচ্ছি। সম্পর্কে ফাটল ধরবে আমাদের।
ইমরান মাথা নাড়ছে। আশ্বাস দিয়ে বললো,
– আমার দিক থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটার আগেই সামলে নেয়ার।
ইমরানের চোখ নিবদ্ধ ধানক্ষেতে। অনুভূতিহীন কথা। নয়ন জানে ইমরান নিজেও এসব ভাবছেনা। বন্ধুকে অহেতুক লজ্জা দিতে চায় নি। আচমকা নয়ন খানিকটা হেসে মজার ছলে বললো,

– একটা কথা বলি?
ইমরান না তাকিয়েই সম্মতি দিলো,
– হুম।
– আমি কিন্তু ব্যাপারটা এঞ্জয় করছি। আই মিন যদিও কল্প কাহিনী কিন্তু ভাগ্নীটা বড় হলে ওয়াদা আমি তোর বউ বানাতাম। কিন্তু বেশীই পুচকি। যদিও তুই অলওয়েজ হ্যান্ডসাম লাইক মি, হিহিহি। কিন্তু মোনার বয়সের উপর বিশ্বাস নেই। আজকে একজনকে ভালো লাগলো, আগামীকাল অন্য কিছুতে মন দিলে! তাই আমি এসবে সায় দিতে অনিচ্ছুক।
ইমরান সজোরে ধমক দিল,
– বেয়াদপ। চুপ করবি তুই নাকি দিবো নাকে? অসামঞ্জস্যপূর্ণ কথাবার্তা যত্তসব ? আমার লাইফস্টাইল, ইশান, এইজ এগুলা দেখিস না? পরবর্তীতে যেন এসব বাজে চিন্তা মাথায় ও না আসে৷ তুই কি হিসেবে ওর মামা আমার আজো মাথায় আসেনা। অন্য কোনো মামা হলে এখানে তুলকালাম লেগে যেতো।
নয়ন ঠোঁট বেকিয়ে বলে,

– তাতে কি ভাগ্নী আমার জমিদারের বউ হতে চায়। ঢাকা শহরে জমিদার পাবো কই? জমিদারদের বয়স তো আর কম না। তাই তোকেই মনে প্রাণে জমিদার বানানোর সামান্য প্রচেষ্টা। অবশ্য মন্দ নয়। তবে তুই জমিদার নাহলেও ভাব এমন ধরিস মনে হয় যেন জমিদার। হ্যাঁ তোকে আধুনিক জমিদার বলা যায়।
ইমরান ঘুরে হাত মুঠ করে ঘু*ষি মা*রার প্রস্তুতি নিবে তার আগেই নয়ন সরে যায় হাসতে হাসতে। পেছনে মোনা দাঁড়িয়ে আছে। নয়ন এবং ইমরান দুজনই ঘাবড়ে গেলো। মেয়েটা কি শুনেছে তাদের কথা! মোনা কথা না বাড়িয়ে মুখের ভঙ্গি স্বাভাবিক রেখেই বললো,
– চলোনা মামা ভেতরে যাই। ওরা আসছে নাতো। এখানে গরম লাগছে আমার।
নয়ন মোনার হাত ধরে সামনে এগোলো। ইমরানকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– চল। ভেতরে যেয়ে বসি।
– আসছি আমি। তোরা যা।
ভাবনায় নতুন চিন্তা। অকল্যাণকর দুশ্চিন্তা যাকে বলে। ফোনের স্ক্রিন বিপ বিপ করে উঠলো। মেসেজ আসলো,
– জমিদারের বউ হওয়ার কথাটি ছিলো মজার ছলে বলা উক্তি। তবে একুশ শতকের জমিদার ইমরান শরীফের উপেক্ষা মেনে নিবো না। চ্যালেঞ্জ।

Yours loving,
~MONALISA
মেসেজ পড়েই ঘাড় ঘুরাতে দেখে নয়ন মোনা ভেতরে চলে গিয়েছে। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কি হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিনগুলোতে! সাদাফদের গাড়ি পৌঁছে গিয়েছে। গাড়ির হর্ণ স্পষ্ট কানে আসছে। ধ্যান হরিৎক্ষেত্রে। গাড়ি থেকে সবাই নেমে পড়েছে। ইমরানকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো অনেকেই। তিহান ডাকলো,
– স্যার?
সম্বিত ফিরে তাকালো তিহানের দিকে,
– হুম
– যাবেন না ভেতরে?
মাথা ঝাঁকালো। নিশব্দ পা ফেললো ভেতরে। পেছনে বাকিরা আসছে। প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকতেই মিনহাজকে দেখছে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তামান্নার ভাই-বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে ইমরানের। মলিন হাসিতে পরিচিত হলো। তামান্নাদের দোতলা বাড়ি। গ্রামের উন্নত বাড়িগুলোর মত। সবাইকে ভেতরে বসতে দেয়া হলো। বসার ঘরটা পরিপাটি করে সাজানো। নাস্তা পরিবেশন করা হলো। সকলে টুকটাক নিচ্ছে। শরবতের গ্লাসটা নিয়ে আসতেই ইমরানের সামনে ধরলো তামান্নার ছোট ভাই। ইমরান মৃদু হেসে বললো,
– আমি শরবত নিব না, আপনি রেখে দিন। অন্য কিছু টেস্ট করবো।
তামান্নার ভাই হাসিমুখেই জবাব দিলেন,
– চিনি দি নি আপনার টাতে। খেতে পারেন। আমরা তো জানতাম না।
মোনাকে দেখিয়ে বললো,

– আপু নিষেধ করলো আপনার টাতে চিনি দিতে, তাই এখন বানিয়ে আনলাম।
তব্দা খেয়ে গেলো ইমরান। পাশে নয়ন ও। মোনা সাথে সাথে মাথা নত করে তামান্নার ভাইয়ের জ্ঞাতিকুল উদ্ধার করছে। কি কারণে মোনাকে দেখাতে হলো? নিজ থেকে কি বলা যেতোনা এতগুলো মানুষ কি ভাববে এখন? বাবা,মামা কি মনে করবে? এদিকে নয়ন বিষম খেয়ে বসে আছে। কাশিতে শরবত নাকে মুখে উঠে গিয়েছে। মিনহাজ ব্যস্ত ওকে স্বাভাবিক করতে। ইমরান টিস্যুর বক্স থেকে টিস্যু এগিয়ে দিয়েছে। নাকে টিস্যু চেপে ধরে নয়ন মোনার দিকে তাকাচ্ছে, পুনরায় ইমরানের দিকে। আনত মাথা মোনার। দৃষ্টি প্রখর ইমরানের। ঈগলের ন্যায় ক্ষীপ্র তেজী দৃষ্টি। মিনহাজ বলে উঠলো,
– নয়ন তোর যখন তখন বিষম খাওয়ার রোগটা গেলোনা।
– স্বাভাবিক অবস্থায় তো এমন হয়না, চারপাশে অস্বাভাবিক…

সময়ের তোয়াক্কা না করে মোনা তৎক্ষনাৎ মাথা তুলে মামার দিকে নজর ফেললো। ভীতি নিয়ে তাকাতেই দেখলো মামা নজর সরিয়ে দুষ্টুমি করছে বাকিদের সাথে। ইমরানের দিকে চোখ পড়তেই দেখলো ঠিক তখনো! তখনো একই ভাবে,একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মোনার দিকে। চোখের পাপড়ি অনড়, নিষ্পলক চাহনী। কতটা স্থির,দৃঢ় এই চাহনী। বুকের ভেতর কেঁপে উঠেছে। মানুষটা চোখ না সরালে তো সকলের সামনে লজ্জায় পড়ে যাবে। মুঠোফোনের কম্পনে আঁখিজোড়া নজরচ্যুত হলো মানুষটার। হাতের ফোনে তাকিয়ে শরবতের গ্লাস হাতে নিয়েই উঠে দাঁড়ায়। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,

– এক্সকিউজ মি।
এই রুমের ব্যালকনি খানিকটা দূরে। এখান থেকে কোলাহল কম কানে আসছে। গুরুত্বপূর্ণ একজন বায়ারের অর্ডার নিয়ে চিন্তিত ছিলো। ম্যানেজার ফোন দিয়েছে। প্রোডাক্ট কোয়ালিটি, কোয়ান্টিটি, এপ্রুভাল নিয়ে আলোচনা করতে। কথা শেষে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে শরবতের গ্লাসে চুমুক দিলো। সত্যি চিনি নেই। একেবারে পিউর গ্রামের গাছের বাতাবী লেবুর সরবত। বিট লবনের সুবাস নাকে লাগছে। শহরের লেমনেড থেকে ঢের ভালো। নাকে মৃদু সুবাস ভেসে আসছে। পারফিউমের গন্ধ নয় এটি, তবে পুরুষের নাকে এসেছে তার মানে কড়া কিছুই হবে। এতদূর থেকে আসার তো কথা নয়। নাকি খুবই সাধারণ সামান্য কিছু। শুধু তার নাকেই ধরা পড়লো! পেছন ফিরে ঘুরতেই ইমরান হতচকিত। এতটা কাছে! ঠিক ইমরানের পেছনটাতে দাঁড়িয়ে আছে মোনা। আচমকা এমন কিছু আশা করেনি। আশপাশটা লক্ষ্য করে দেখলো কেউ নেই। দুজনের মাঝে দূরত্ব খুব বড় জোর দু হাত। কিছুটা দূরত্বে সরে এসে কড়া স্বরে প্রশ্ন করলো,

– কি হয়েছে? এখানে কেনো?
– ভেতরে ভালো লাগছিলো না তাই।
– এত মানুষের মাঝে ভালো লাগছিলোনা, এখানে কিভাবে নিস্তব্ধতা ভালো লাগবে?
– ওখানে ইমরান সাহেব অনুপস্থিত, এখানে উপস্থিত।
পরিস্থিতি ভারী হয়ে আসছে। কোথাও গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেনা। মোনাকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে বসার ঘরে এসে মিনহাজের পাশে বসলো। মিনহাজ প্রশ্ন করলো,
– আজ তো মনে হয় ফোনের উপরই থাকবি। কোয়ালিটি এপ্রুভ হয়েছে?
ইমরান কিঞ্চিৎ হেসে বলে,
– হয়েছে। সব ঠিকঠাক, অর্ডার কনফার্ম।
– যাক আলহামদুলিল্লাহ। তোর ইতালী থেকে আসা সবদিক থেকে সার্থক। ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ডেও পৌঁছে যাবে আমাদের টিউলিপ।
নিজেদের মাঝে কথা চালাচালির এক পর্যায়ে জানানো হলো বর এসেছে। সবাই ছুটলো বর বরনের জন্য। রিমি, চৈতি, সাদাফেরা উঠে দাঁড়ায়। তামান্নার কাজিনরা এসে জানালো রিমিদের গেট ধরতে। রিমি মোনার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে বললো,

– মোনা চলো।
ভীড়ের মাঝে যাওয়াটা অনুচিত অথচ মিনহাজ উদাসীন। বসার ঘরে অনেকেই আছে। তামান্নার মামাদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত সকলে। রাজনৈতিক আলোচনায় একবার প্রবেশ করলে সেই আসর ছেড়ে দেয়া কঠিন। তামান্নার মামা ইমরানকে প্রশ্ন করলো,
– আপনার কথা বেশ শুনেছি। আপনি তো বুয়েটের ভিপি ছিলেন তাই না?
– জ্বি।
– আমার ছেলে এখন বুয়েটে আছে। ছেলেটা বুয়েটে পড়ছে আর্কিটেকচারে অথচ তার মন পড়ে আছে ব্যবসায়। বিভিন্ন সেমিনারে ছুটে যায়। আমাকে আপনার উদাহরণ বেশ কয়েকবার দিয়েছে। জানতামই না আপনি আমাদের তামান্নার চেয়ারম্যান। পারিবারিক অনুষ্ঠানে কিছুদিন আগেই তামান্না যখন আলোচনায় আপনার নাম নিলো সায়ান তো খুশিতে আটখানা। ছেলেটা এখনো জানেনা বোধ হয় আপনি এসেছেন। জানলে ছুটে আসতো। আপনাকে তো আইডল মানে।
তামান্নার মামার প্রতিটি কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেও কান পেতে আছে মোনার প্রতিউত্তরের অপেক্ষায়। দেখতে পেলো মেয়েটা যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। খানিকটা জোর আওয়াজে বললো,

– বসো তুমি। ভীড়ের মাঝে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
সকলের দৃষ্টি মোনাতে আটকালো। মিনহাজ ও মাথা নেড়ে সায় দিলো। নয়ন কিছুটা বুঝতে পেরে ইমরানের সাপোর্টার হিসেবে বললো,
– মোনা বসো, যেও না। শরীর আরো খারাপ হবে। ওখানে ধাক্কাধাক্কি হবে।
কিছুক্ষণ আগে ব্যালকনিতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপেক্ষা ভুলে যায়নি মোনা। নিজের সিদ্ধান্তে অটল সে। ভাবনা অনুযায়ী যাবেনা ভেবেছিলো গেটের সামনে। নিজের মনেও বিরক্তি ভাব পোষণ করছিলো। তবে এখন যাবে। ইমরানকে রাগাতে হলেও যাবে। সকলকে উপেক্ষা করে সাদাফের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। সাদাফ অবুঝ মনে হাত ধরে বসদের দিকে তাকিয়ে বললো,

– স্যার আমি থাকবো নিরাপত্তায়, চিন্তা করবেন না।
মিনহাজ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। ইমরানের মুখাবয়বের চিত্র ছিলো দেখার মতো। চোখ মুখে কঠিন ভাব। চোখ দুটো কেমন জ্বলজ্বল করছে ক্রোধে। নয়নের নজর ইমরানের দিকে। এ যেন ঘোর অমোঘ ক্রোধ। বেশি ঘাটানো ভারী অন্যায় হবে। দম ফেলে নিজের প্রশান্তি এনে মনোযোগ সরিয়ে পুনরায় আলোচনায় মনোযোগ দিলো নয়ন। এদিকে কারো দহনের চিত্র লক্ষ্যনীয়। কিসের এত নিগ্রহ,মনোপীড়ন! আকস্মিক ভাবে হামলা করে ইমরানের মাথাব্যথা ।
হট্টগোলের আওয়াজ এলো। বসার ঘর থেকে সকলে বেরিয়ে এলো। কি নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হলো! সাদাফ তিহান রীতিমতো ক্ষেপে আছে। মা/রধরের মতো বিশ্রী ঘটনা যদি এখন ঘটে যায়, বিয়ে বাড়িতে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। উঠোনের মাঝে এমন ঘটনা ঘটছে। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে মজার ছলে বলা কথা থেকে।
বরপক্ষ – কনেপক্ষের মাঝে আলাপচারিতায় এক ছেলে কনে পক্ষের মেয়েকে উদ্দেশ্য করে ধীর গলায় অন্যজনকে বলছিলো,

– সবদিকে সুন্দর, যেমন হাসি,তেমন চেহারা অন্যদিকে ফিগার তো জবরদস্ত। কাটা কাটা ফিগার, শেপ পারফেক্ট।
কথাটা তিহানের কানে এসেছে। তিহান ঘুরে জবাব দেয়ার আগেই স্বল্প মেয়াদী রাগের সে মেয়ে ক্ষেপে বলে উঠলো,
– কতটা নিচু,হীন এবং ছোট মন মানসিকতার হলে একটা মেয়ের ফিগার নিয়ে কথা বলছেন। বর পক্ষ না হলে আপনাকে সবার সামনে কষে চ ড় দিতাম। অসভ্য, বদমাশ কোথাকার।
সেই থেকে তর্ক বিতর্ক শুরু। তিহান ও সায় দিলো। সাদাফ-তিহান রীতিমতো মা/রা/র জন্য এগিয়ে যেতেই নয়ন, মিনহাজ এগিয়ে গিয়ে ধরলো। অন্যকারো মেয়ের বিয়ে ভাঙার ব্যাপারটা খুবই লজ্জাজনক। এত ঝামেলায় মোনার মাথা নত। কেনো আসতে গেলো। সবার নিষেধ উপেক্ষা না করাই উচিত ছিলো। বরের বাবা কিছুটা রাগান্বিত হয়ে কনের বাবাকে বললো,
– বেয়াই সাহেব খুবই নেক্কারজনক ঘটনা। বিয়ে করাতে এসে আপনারা মাইর খাওয়াবেন আমার আত্নীয়দের ব্যাপারটা অপমানে লাগছে আমার।
তামান্নার বাবা হাত জোড় করে মাফ চাইবে এর আগেই ইমরান তামান্নার বাবার দুহাত ধরে ফেললো। তার ধারণা অফিসের কারো জন্যই এই ঘটনার সৃষ্টি। যেহেতু হট্টগোল সাদাফ,তিহানই শুরু করেছে। অনুরোধের গলায় ইমরান বললো,

– আমি একটু বলি?
নিশ্চুপ তামান্নার বাবা। সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো। ইমরান বরের বাবার দিকে ফিরে বললো,
– আমি যতদূর বুঝতে পেরেছি, অপমানটা একজন মেয়েকে করেছে আপনার আত্মীয়। আপনার ঘরেও নিশ্চয়ই মেয়ে আছে, নিজের মেয়ে ভেবেই জাস্টিফাই করুন। আমরা আদতেও জানিনা ঘটনা কোন মেয়েকে নিয়ে হয়েছে।
তিহানের দিকে তাকাতেই তিহান জোরে বললো,
– স্যার এই শূ**য়ো** বা*চ্চা মোনার ফিগার, বডি অর্গান শেপ নিয়ে কথা বলেছে। খুব বাজে ভাবে বলেছে।
নির্বাক হলো। শব্দেরা সায় না দিলেও জোরপূর্বক বরের বাবার দিকে তাকিয়ে আছে ইমরান। চোখ বুজে ক্রোধ সংযত করে নয়ন এবং মিনহাজের দিকে তাকালো। দাঁতের সাথে দাঁত লেগেছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ। মেয়ের বাবাকে প্রশ্ন করলো,
– আপনি জানতেন ব্যাপারটা?
এখনো লোকটার দম্ভ কমেনি। উলটো বলে উঠলো,
– কি বলেছে না বলেছে তা তো আর দেখি নাই। বিয়ে বাড়িতে এমন হয়।
ইমরান মাথা নেড়ে বললো,

– ওকে। এখন কি করতে হবে? আপনিই বলুন। আমরা চাই না বিয়ে বাড়িতে কোনো কারণে আমাদের জন্য ঝামেলা সৃষ্টি হোক।
পেছন থেকে বর এসে সেই ভাইকে ডেকে আনে সকলের সামনে দাঁড় করায়। স্টেজে বসাতে এখানকার ঘটনা বুঝতে কিছুটা সমস্যা হয়েছিলো। ঘটনা শুনে আদ্যোপান্ত না ভেবে সকলের সামনে কষিয়ে চ/ড় মা/রে সেই ভাইকে। পরিবেশ উত্তপ্ত। বর অনেকটা চেঁচিয়ে বলে,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১১

– মাফ চা ওর কাছে। তুই যে মন্তব্য আজ করেছিস তাতে তো আমার বউ,বোন ও নিরাপদ নয়। আব্বু দোষ মেয়েটির নয়। রিফাতের দোষ। ও প্রকৃতপক্ষেই এমন মন্তব্য করেছে।
খানিকবাদেই পুরোবাড়ির পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে। তামান্না তখনো পার্লার থেকে এসে পৌঁছে নি। খবর চলে গিয়েছে ফোনে। নিজ থেকে ফোনে বুঝিয়ে ঘটনা সামাল দিতে অনুরোধ করেছে হবু স্বামীকে। মানুষটা এতটা বুঝবে ভাবতে পারেনি তামান্না। পুরো পরিস্থিতি খুব সুন্দর ভাবে স্বাভাবিক করে নিয়েছে, তার জন্য সে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে মানুষটার নিকট।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৩