প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৩
নীতি জাহিদ
ছেলের বাবা,মেয়ের বাবা এক টেবিলে বসেছে। মেয়ের বাবা অনুরোধ করলো মিনহাজদের একই টেবিলে বসতে। এক পর্যায়ে ছেলের বাবা ও বসার অনুরোধ জানালো। বিয়ে বাড়িতে দু একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেই। আনন্দ, উচ্ছ্বাসটা যেন হারিয়েই গেলো। পাশের টেবিলে সাদাফরাও বসেছে। কারো মুখে শব্দ নেই। খাবার ইমরানের প্লেটে দিতে যাবে তখনই ইমরান জানালো সে খাবেনা। অকস্মাৎ এমন কিছু উপস্থিত কেউই আশা করেনি। সকলে জোর করার সত্ত্বে ও নাছোড়বান্দা ইমরান সরাসরি টেবিল ছেড়ে উঠে গেলো। মিনহাজ ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সকলকে বললো,
– থাক ভাই জোর করার দরকার নেই। সকাল থেকে প্রেশারে আছে, মাথা ব্যাথা করছিলো। অন্যদিকে কিছুক্ষন আগের ঘটনা হয়তো মাথা থেকে বের করতে পারছেনা।
ছেলের বাবা মন্তব্য করে বসলো,
– আপনি তো ব্যাপারটা ভুলে গিয়ে স্বাভাবিক আছেন। উনি এত সিরিয়াসলি না নিলেই পারেন।
মিনহাজ হেসে বলে,
– কিছু মনে করবেন না বেয়াই সাহেব। আমরা মেয়ের বাবা। চাইলেও অনেক কিছু পারিনা। না ভুললেও ভুলার ভান ধরতে হয়। আপনি ছেলের বাবা বলে কিছুক্ষন আগে অনেক কড়া করে কথা বললেন। অথচ দোষ আপনাদের আত্মীয়ের। মেয়েদের পরিবার দোষ না করেও অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। আমি মেয়ের বাবা তাই আমার রক্ত ঠান্ডা। ইমরান মেয়ের বাবা নয়, রক্ত আমার মত ঠান্ডা না। তামান্নার উপর যেন প্রভাব না পড়ে আজ সে শান্ত ছিলো। নতুবা যেই ছেলেটি আমার মেয়েকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছে সেই ছেলেটি সুস্থ থাকতোনা। থাক বাদ দিন। মোনা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদের ফিরতে হবে।
চোখ ছলছল মোনার। সব ঝামেলার কান্ডারী সে। কেনো যে বড়দের কথা অমান্য করে। তখন যদি জেদ না ধরতো এসব হতোনা। সুন্দর সন্ধিক্ষণে এমন অসুন্দর ঘটনা ঘটতোনা। মানুষটা না খেয়ে থাকবে? মোনা হঠাৎ বাবাকে বললো,
– বাবা, আমি ভেতরে খাই? সাথে উনার খাবার টা নিয়ে যাই?
খেতে খেতে মোনার কথায় নয়ন বেশ অবাক হলো। সন্দেহ পুরোপুরি সত্যি। ইমরান সাহেব, ফ্রাংকেস্টাইন,গোমড়ামুখো, কালা মানিক এসব ছেড়ে একেবারে ‘উনি’ সম্বোধনে চলে গেলো। মাথায় এলোমেলো সব ভাবনা আসতে আসতেই হঠাৎ মনে হলো বন্ধুর বউ ভাগ্নি হলে, ভাগ্নি কি ভাবী হবে! ধ্যাৎ কি সব ভাবছে? আপাতত এসব পরে ভাববে। সাথে সাথে মোনার কথায় তাল দিয়ে ধীর গলায় বললো,
– মিনহাজ ভাই, ইমরান সবাইকে না বললেও মোনাকে না বলবে না। ঠিক খেয়ে নিবে। সকাল থেকে তো মিটিং এর জন্য খায় নি।
তামান্নার বাবাও কথায় সাঁয় দিলেন। নিজেই দাঁড়িয়ে ইমরানের জন্য প্লেটটা সুন্দর করে খাবারে সাজিয়ে দিলেন। মিনহাজ মৃদু হেসে মোনাকে বললো,
– স্যরি বলবে, তোমাকে তখন বারণ করেছিলো ভীড়ে না আসতে। মাঝে মাঝে বড়দের কথা শুনতে হয়। ভুল তোমার।
মোনা মাথা নেড়ে ভেতরে বসার ঘরে চলে এলো। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ইমরান সোফায় বসে ফোনে কি যেন করছে। মোনার পেছন পেছন খাবার পরিবেশনকারী দুজন ছেলে এসেছে খাবার নিয়ে। বসার ঘরের সেন্টার টেবিলে খাবার রাখলো। ইমরান ভ্রু কুচকে মোনার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলে দুটো চলে যেতেই মোনা মুখ চালিয়ে বললো,
– ক্ষুধা পেয়েছে তাড়াতাড়ি শুরু করুন।
– কি?
– খাবার।
– আমি খাবো না।
– খাইয়ে দিই?
– এক চ*ড় দিব। বেয়াদপ মেয়ে। বাড়াবাড়ি পেয়েছো? সব কিছুতেই তোমার এসব হেয়ালীপনা যথেষ্ট অসন্তোষজনক। কি শুরু করেছো এসব…
সব টুকু রাগ উগলে দিচ্ছে। মোনার মন খারাপ হয়নি।বরং মুচকি হেসে মোনা গেয়ে উঠলো,
– না জানি কি মন্ত্র পড়ে জাদু করিলো, সোনা বন্দে;
ও সোনা বন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইলো।
স্তব্ধ ইমরান। এই মেয়ে রাগ করেনি। উল্টো হাসছে।
মোনা হাসতে হাসতে বললো,
– গল্প পড়তে ভীষণ ভালোবাসি আমি। শরৎচন্দ্রের চরম ভক্ত বলা চলে। আমার প্রিয় উপন্যাস পরিণীতা। ললিতার পাগলামী, দুষ্টুমি, হেয়ালী সবই শেখরের পছন্দের ছিলো। শেখর গিরীন বাবুর কথা যখন জানলেন, ললিতার সাথে তার আচরনের ধরণ ও বেশ পরিবর্তন হলো। আজ আমার নিজেকে ললিতা মনে হয়েছে, আপনাকে শেখর আর সাদাফ ভাইয়াকে গিরীন বাবু। সাদাফ ভাইয়া সুন্দর লেগেছে বলাতে আপনি বললেন এত সাজলাম কেনো বিয়েটা কি আমার! এরপর বর পক্ষের ছেলেটার করা মন্তব্যে ও বেশ রেগে আছেন। এতটাও কি অবুঝ আমি ইমরান সাহেব? ললিতা যদি শেখরের ভাগ্যে থাকে তবে মোনার কি দোষ?
অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে ইমরান। আগের মতো একই মুখভঙ্গি। প্রতিক্রিয়া দেখাই নি। তৎক্ষনাৎ উত্তর দিলো,
– শরৎচন্দ্র পছন্দ তাই না?
– হুম
– ‘দেবদাস ভেবেছিলো পার্বতী তাকে ছাড়া ম*রে যাবে। কিন্তু পার্বতীর জ্বরটুকু এলোনা।’ এখন কেউ যদি ভেবে থাকে তার জন্য আমার মনে অনুভূতি বিরাজ করছে,সেটা তার ভ্রম ব্যতীত কিছুই নয়। তাকে সাদাফ কেনো, কোনো দেশের রাজপুত্র এসে তুলে নিয়ে গেলেও ইমরানের কিচ্ছু এসে যাবে না। অন্যদিকে কোনো ছেলে কোনো মেয়ের দেহ নিয়ে বাজে মন্তব্য করলে সেখানে সুপুরুষ রাগ করাটা বেশ স্বাভাবিক। আমার মত বাকিরাও করেছে। এত আদিখ্যেতার প্রয়োজন নেই তো?
শক্ত বাক্য গুলো শুনে ঢোক গিললো মোনা। চোখ দুটো জ্বলে উঠলো। গাল ভিজে গেলো। কথার বাণে বুঝি এভাবেও আঘাত করা যায়! হয়তো যায়। নতুবা বুকের ভেতরটা এভাবে যন্ত্রণা পাচ্ছে কেনো!
বারান্দায় বসে মিন্নিকে শোনাচ্ছে বিয়ে বাড়ির গল্প। ফোনে পাঠানো হয়েছে সাদাফের ক্যামেরায় উঠানো বিয়ে বাড়ির কিছু ছবি। মিন্নির সাথে একাকী কথা বলতে বলতে ল্যাপটপে ছবি গুলো দেখছে, এমন সময় একটি ছবি সামনে এলো। বাবা,মামাদের গোল টেবিল আলোচনার। বিয়ের বাড়ির ছবিতে সকলের ছবির জৌলুশ থাকে। এটিও তেমন একটি। ছবিতে খান পরিবারের কালা মানিক জ্বলজ্বল করছে। মোনা ভেবে পায় না কি করে এই মানুষটাতে প্রলুব্ধ হলো? অফ সাদা স্যুটে যেন ফুটে উঠেছে চেহারার মাধুর্য। এর মাঝে মুখের হাসিটা অমায়িক। কিছুটা জুম করে মোনা লক্ষ্য করলো কপালের ডান পাশটাতে সরু কাটা দাগ। একবার মনে হলো ছবি তোলার সময় হয়তো ক্রেক পড়েছে। পরে মনে হলো না আসলেই হয়তো আছে। দাগের জন্য যদি কাউকে বেশি সুদর্শন মনে হয় তবে নিশ্চিতভাবে এই মানুষটার উপস্থিতি আবশ্যক। দাগ সুন্দর। কিসের দাগ! কোনো আঘাতের! পরবর্তীতে দেখা হলে প্রশ্ন করতে ভুলবেনা মোনা।
ছবি গুলো নতুন ফোল্ডারে সংরক্ষণ করে রেখে ল্যাপটপ বন্ধ করে কামরায় ফিরে এলো। খাটে বসতেই মায়া কামরায় প্রবেশ করলো। মোনার হাতে ফোন দিয়ে কাজে চলে গেলো। সাদাফ ভিডিও কল দিয়েছে।
– আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। ছবি সবগুলো পেয়েছো না?
– হ্যাঁ কিন্তু ভিডিও টা দেন নি তো।
– ওটা এডিট শেষ করে পাঠাচ্ছি।
তিহান সাদাফ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে বললো,
– মোনা একটা নিউজ শুনবা?
তিহান হাসছে। হাসির কারণে কথা স্পষ্ট বলতে পারছেনা। তিহানের হাসি দেখে মোনা মৃদু হেসে বললো,
– এমন করছেন কেনো ভাইয়া? কি হয়েছে?
তিহান ক্যামেরাটা তামান্নার দিকে ধরলো। বেচারী মুখ লটকে বসে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে ভীষণ ক্লান্ত। অফিসের বাইরে ক্যান্টিনে সবাই সমবেত হয়েছে বলেই সুযোগ পেয়েছে কল করার। অফিস টাইমে তো কখনো এভাবে কথা বলেনা। কৌতুহলের জেরে মোনা প্রশ্ন করলো,
– তামান্না আপুর কি হয়েছে ?
রিমি হাসতে হাসতে বলে,
– ওর বাসা ভর্তি গেস্ট। বেচারি ভেবেছিলো হানিমুনে যাবে। ছুটিও নিয়েছিলো অফিস থেকে কিন্তু গেস্টের জন্য আর যেতে পারলো না। রাত দিন সেবা শুশ্রূষা করতে করতে বেচারী নাজেহাল। তাও গেস্ট হচ্ছে ওই যে রিফাত ছেলেটার পরিবার।
মোনার মন খারাপ হলো খুব। এই ছেলেটার জন্যই সেদিন সব ঝামেলা হয়েছে। আরেকবার সামনে পেলে কি যে করবে! অনেকটা ক্রোধে নিয়েই বলে উঠলো,
– ওই বেয়াদপ ছেলেটাকে আরেকবার সামনে পেলে থাপড়ে চেহারা বদলে দিবো।
তিহান হাসতে হাসতে বলে,
– তার আর প্রয়োজন নেই রে মোনা। বেচারা হাসপাতালের বেডে। কে যেন এমন ক্যালানো ক্যালাইছে থোবড়ার শেপ বদলায় গেছে। কথা বলতে পারেনা, খাইতে পারেনা। স্যালাইন দিয়া গিলাইতাছে।
মোনা হা করে তাকিয়ে আছে। মুখে চাপা হাসি দিয়ে বললো,
– একদম আল্লাহ বিচার করেছে। আমি দোয়া করেছিলাম মন থেকে। আল্লাহ যা করেন একদম সঠিক করেন। কিন্তু আমার মায়া হচ্ছে তামান্নার আপুর জন্য। এই ছেলে যেখানে যায় অশান্তি করে। আহারে আপু যেতেও পারলোনা। আচ্ছা গেস্ট রা গেলে যেও আপু।
তামান্না এতক্ষনে মুখ খুলে বলে,
– কি আর করা, পরেই যাবো। আত্মীয় স্বজনদের তো না করা যায়না। বিপদে পড়ে এসেছে।
কথা শেষ করে মোনা খুশি মনে একটা নাচ দিয়ে গুণগুনিয়ে গান গেয়ে উঠলো। মনটা ভালো হয়ে গেলো। কোচিং আজ বন্ধ। বাসায় পড়াশোনা করবে। বিছানায় পড়ার বদভ্যাসটা ফুফি এত বকা দেয়ার পর ও যায় নি। আজ ক্যালকুলাসের সব গুলো সূত্র শেষ করা বাঞ্চনীয়। দুদিন পর পরীক্ষা। কি যে লিখবে তার নেই কোনো চিন্তা, অথচ নিজেকে মগ্ন রেখেছে আকাশ কুসুম ভাবনায়৷
আকাশ কুসুম ভাবনা থেকে মাথায় এলো বিয়ে বাড়ির খাবারের সময়ের কথা। মানুষটার তীব্র ক্রোধ সেদিন কেউ ভাঙাতে পারেনি। মোনা নিজেও না। এত জোর করার পরো একটি দানা মুখে তুলেনি সে বাড়ির। উলটো তাকে যা নয় তা বলে অপমান করেছিলো। না খেয়ে ফিরে এসেছিলো ঢাকা। বেশ কিছুদিন হলো আর দেখা হয়নি। আবার মাথা চড়া দিয়েছে উদ্ভট ভাবনা গুলো। বইটা বন্ধ করে মোনা উঠে বসলো। আলমারি খুলে জিন্স,কুর্তি বের করে পোশাক বদলে নিলো। চুলে খোপা করে মাথায় ওড়না পেঁচালো। নিজেকে আয়নায় বেশ কয়েকবার দেখে আবিষ্কার করলো ওড়না মাথায় দিলে মোনাকে বেশ লাগে। স্নিগ্ধ, মার্জিত। গতমাসে দোয়েল চত্বর থেকে কেনা পাটের সাইড ব্যাগটাতে ক্যালকুলাসের নোট, ম্যাথ বই,খাতা এবং কলম নিয়ে রওয়ানা হলো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। হাতে ডেইরি মিল্ক নিয়ে বের হতেই মায়া আটকালো।
– রাস্তায় এভাবে খেতে খেতে যাস না মুনিয়া?
– তোমাদের মতো তো গান বাজানোর ফোন নেই যে গান শুনতে শুনতে যাবো। ফুফি তুমি ও খেমতী বুড়ির মত আচরণ করছো?
মায়া হেসে বললো,
– ঠিক আছে সাবধানে যা। যেয়ে ফোন দিস।
মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলো। রিকশায় চড়ে বসলো। আপন মনে ডেইরি মিল্ক খাচ্ছে,এদিকে রিকশাওয়ালা গল্প জুড়ে দিয়েছে তার সাত নাম্বার বউয়ের ডেলিভারি হওয়ার কেচ্ছা নিয়ে। সাত বউকেই ভালোবাসে। সাত বউয়ের ঘরে তেরোটা বাচ্চা। সে আবার পরিবার পরিকল্পনা মেনে চলে। দুটি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো হয়। তাই প্রতিটি বউয়ের ঘরে দুটো করে সন্তান। সাত নাম্বার বউয়ের দু নাম্বার সন্তান হলেই ষোল কলা পূর্ণ। কান দুটো ঝাঁঝড়া করে দিলো। গন্তব্যে পৌঁছে মোনা ভাড়া মিটিয়ে দিতেই আরো দশটাকা বেশি চাইলো। মোনা ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো,
– কেনো বেশি দেব?
– আসলে বউয়ের ডেলিভারি তো অনেক টাকার ব্যাপার?
– বিয়ে করার সময় এই কথা মাথায় ছিলোনা যে এত বাচ্চা হওয়ার খরচ লাগবে। আমার কাছে টাকা নেই।
– তখন তো বিবেক কাজ করে নাই।
– বেশি কথা বলেন আপনি, সারা রাস্তা পক পক করে জ্বালিয়েছেন। আমার কানের চিকিৎসার জন্য উলটা আমাকে টাকা দিন।
এরই মাঝে সামনে কালো মার্সিডিস বেনজ্ এসে থামলো। গাড়ি থেকে নেমে মোনাকে দেখেও না দেখার ভান করে ভেতরে প্রবেশ করলো মানুষটা। রিকশাওয়ালাকে দশটাকা বাড়িয়ে ধন্যবাদ দিলো অপেক্ষা করানোর জন্য। এতে যে দেখা হয়ে গেলো মানুষটার সাথে। যদিও উপরে দেখা হতো কিন্তু শুরুটা তো তার মুখ দেখেই হলো। ছুট লাগালো অফিসের প্রবেশদ্বারে। নাছোড়বান্দা মোনার কিছুক্ষণের জন্য সেদিন মন খারাপ হলেও নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলো নিজের অনুভূতি কতটা শক্ত। বাবাকেও কথা দিয়েছে এমন কিছু ঘটাবেনা যাতে করে তার অপমান হয়।
দিন দিন মানুষটার প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। লিফটের কাছে এসেই হাঁপাতে লাগলো। সালাম দিলো। সাথে একজন মার্সেন্টাইজার থাকাতে ভদ্র ভঙ্গিতে সালাম নিয়ে অপেক্ষা করছে লিফট নামার। অকস্মাৎ মোনা সেই মার্সেন্টাইজারের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মি. চুলবিহীন মানব সেদিন না আপনি আমাকে কত কি বলেছেন? এটা নাকি এফ ডি সি নয়, আরো কি কি যেনো?
লোকটা লজ্জা পেয়ে গেলো। সেদিন এসব কথা শোনানোর জন্য অফিসে সবার সামনে স্পেশাল ডোজ দিয়েছিলো চেয়ারম্যান স্যার। সেই থেকে এখন অফিসে গোলমাল করা চলে না। মেপে মেপে কথা বলতে হয় সকলকে। ইমরান নিরবে তাকিয়ে রইলো। সেই মার্সেন্টাইজার আমতা আমতা করে বললো,
– স্যরি, আসলে সেদিন বুঝতে পারিনি আপনি এম ডি স্যারের মেয়ে। মজা করতে গিয়ে বলেছিলাম।
– মেয়ে দেখলেই মজা করতে ইচ্ছে করে। মেয়েদের সম্মান করতে শিখুন, হোক সে এমডির মেয়ে অথবা বাসার মেইড।
এর মাঝে লিফট এসে পড়ে। তৎক্ষনাৎ মোনার লিফটের ঘটনা মনে পড়লো। ইমরানের পিছু নিয়ে লিফটের সামনে চলে এসেছে। ইমরান এবং সেই মার্সেন্টাইজার দুজন প্রবেশ করলেও মোনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে। ছেলেটা মোনাকে ডাক দিলো,
– যাবেন না?
– নাহ, আপনারা যান।
– কিভাবে যাবেন?
– সিড়ি দিয়ে।
বিস্মিত হলো ছেলেটা। মোনা মুখ ঘুরিয়ে সামনে আগাবে পেছন থেকে স্বর ভেসে এলো,
– ভেতরে এসো।
মোনা ঘাড় ঘুরিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। হাত পা ঘেমে যাচ্ছে। আজ যদি আবার দূর্ঘটনা ঘটে? মার্সেন্টাইজার ছেলেটা জোর দিয়ে বললো,
– আসুন, দেরি হচ্ছে।
ধীর পায়ে প্রবেশ করলো মোনা। গুটিশুটি মেরে দাঁড়ালো পেছনে একপাশে। লিফট চালু হলো। চালু হতেই মৃদু ধাক্কায় কেঁপে উঠে চোখ বুজে ফেললো। ইমরান পিছিয়ে শক্ত করে আকড়ে ধরলো মোনাকে। পুরুষালি ছোঁয়ায় মন প্রশান্তি খুঁজে পেলো। জানে হাতটা সেই মানুষটার। বালিকার শরীরের কম্পন স্পষ্ট অনুভূত। ইমরান সংকিত। সেদিনের ভয়টা খুব খারাপ ভাবে মনে গেঁথেছে এই মেয়ের। দশম তলায় এসে লিফট থেমেছে। মোনাকে ছেড়ে দিলো।
– চোখ খোলো।
মোনা চোখ খুলে দেখে লিফট থেমেছে। মুখে হাসি নিয়ে বললো,
– চলে এসেছি?
মোনার ডান হাত শক্ত করে ধরে দশম তলার অফিসে ঢুকে ইমরান। ইমরানকে দেখে সকলে দাঁড়িয়ে পড়ে। মোনাকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে ভেতরে যায়। পাঁচ মিনিটের মাথায় এসে মোনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আবার লিফটের সামনে আসতেই মোনা কাচুমাচু করে বলে,
– প্লিজ আমি সিড়ি দিয়ে উঠি আর মাত্র তিন তলাই তো।
– নাহ।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১২
লিফট আসতেই দুজন উঠে পড়ে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে। লিফট থেমে গিয়েছে। মোনা সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো। চিৎকার দিয়েই পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। বাম হাতে কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয় ইমরান। ফোন বের করে ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালাতেই দু মিনিটের মাথায় ইলেক্ট্রিসিটি এসে পুনরায় লিফট চালু হয়েছে। চোখ বন্ধ। লিফট থেমেছে তেরো তলাতে। মোনাকে ছেড়ে দিয়েছে ইমরান। এতেই যেন মেয়েটা ঢলে পরে যাবে। আবার ভয়!
