Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৬

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৬

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৬
নীতি জাহিদ

The past always looks better than it was. It’s only pleasant because it isn’t here.” — Finley Peter Dunne
এক বিদেশবিভুঁইয়ে কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার মত মানুষের বড্ড অভাব। সবার চোখে খ্যাতি ধরা পড়ে,অথচ সেই খ্যাতির পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ সময় গুলো কাটিয়ে যায় তার কি কেউ খবর রাখে। ইটালিয়ান বাংলো বাড়িটা সব সময় সুনশান ঘুমন্ত থাকে। গেটের কাছে দুজন পাহারাদার, বাড়ির ভেতর এন্ড্রিউ থাকে দেখাশোনার জন্য এবং রান্নার কাজের জন্য আছে এনেস্থিসিয়া। স্টাডি রুমের জানালার গ্লাসে বাইরের সন্ধ্যাটা ঝাপসা। টিমটিমে মোমবাতি গুলো হলদে আলো ছড়িয়েছে কামরায়। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ছেলের মুখটা হাস্যোজ্জ্বল। ইশান বাবার কাঁধে, ছেলের এগারোতম জন্মদিনে মালয়েশিয়াতে ঘুরতে গিয়েছিলো। সেখানকার বীচে তোলা সেই ছবি। এই ছবিগুলো ল্যাপটপে আছে, ফোনে রাখা হয়না। কি মনে করে কয়েকটা ছবি ফোনে নিলো। ফোন চেক করছে হাসি মুখে, তখনই একটা ভুল ছবির স্ক্রিনশট সামনে চলে আসলো। যা মোটেই কাম্য নয়, ইতালী আসার আগে তরুনীর ফোনের মেসেজ। সেই সময়টাতে সংগ্রহে রাখতে চেয়েছিলো। একদম অনুচিত হয়েছে এই মেসেজ সংগ্রহে রাখা। নতুবা এখন সামনে এভাবে জ্বলজ্বল করে মনে করিয়ে দিতোনা তিক্ত অভিজ্ঞতা। মেসেজের প্রতিটি চরণ প্রকাশ করছে কিশোরীর আবেগের ঘনগর্জন,

– পরের জন্মে বয়স যখন ষোলোই সঠিক,
আমরা তখন প্রেমে পড়বো,
মনে থাকবে?
বুকের ভেতর মস্তবড় ছাদ থাকবে,
শীতলপাটি বিছিয়ে দেবো,
সন্ধ্যে হলে বসবো দু’জন।
একটা দুটো খসবে তারা,
হঠাৎ তোমার চোখের পাতায় তারার চোখের জল গড়াবে,
তখন আমি চুপটি করে দুচোখ ভরে থাকব চেয়ে
মনে থাকবে?

ফোনটা টেবিলের উপর রেখে ল্যাপটপ শাট ডাউন করে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বাইরে হিম হিম ঠান্ডা। বরফ পড়ছে। ড্রয়ার খুলে এস্ট্রে বের করে লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালো। ডাক্তার বেশ বারণ করেছে এই জিনিসে যেন হাত না দেয়। বললেই হলো! এত বছরের একটা অভ্যাস এভাবে কি করে ছেড়ে দিবে? সবাই ছেড়ে গেলেও এই জিনিস যে বইয়ের মতোই প্রিয় সঙ্গী। বিপদে ছেড়ে যায় না। দুঃখ – কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। তফাৎ এতটুকুই বই আলোকিত করে, আর এই ধোঁয়া ভস্ম করে। তৎক্ষনাৎ মনে পড়ে গেলো বছর চারেক আগে কিশোরীর পাগলামির কথা। তার চলন বলনের প্রতিটি খবর মস্তিষ্কে সেভ করে রেখেছে কন্যা। প্রতিদিন হাঁটতে বের হওয়া ইমরানের রুটিন। মিনহাজ বের হয় তবে মাঝে সাঝে মেয়েকে নিয়ে আসে। ইমরান বেশিরভাগ সময়টাতে শাহাবুদ্দিন পার্কেই যায়। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। অদ্ভুত ভাবে পেছনে ঘাড় ঘুরাতেই চমকে উঠলো ট্র্যাকস্যুট পরা কিশোরীকে দেখে। মেয়েলী হাসি দিয়ে বলে উঠলো,

– ভাবলাম সকালে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করে নেয়াটা অতি গুরুত্বপূর্ণ।
ইমরান কথা না বাড়িয়ে নিজের মত হাঁটছে। মোনা পিছু নিলো। আজ মিনহাজ আসেনি স্পষ্ট তাই এই মেয়ে এত সাহস পেয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা গাছের ছায়ায় চলে এলো দুজন। আচমকা গাছের গুড়ির সাথে লেগে মোনা পড়ে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পড়ন্ত মোনাকে দেখে ধরে ফেললো। পা মচকেচে হালকা। গমগমে আওয়াজে বললো,
– কোথাও লেগেছে?
পা ঘষতে ঘষতে উত্তর দিলো,
-হুম।
– দেখে চলা উচিত নয় কি?
মোনা ফিচলে হেসে বলে,
– আপনি আছেন কেনো তবে?
মোনাকে গাছের গুড়ির উপর বসিয়ে জুতা খুলে দিতে দিতে আনমনে ইমরান উত্তর,
– সবসময় তো আমি থাকবোনা।
– I wonder, by my troth, what thou and I
Did, till we loved? Were we not weaned till then?
But sucked on country pleasures, childishly?
Or snorted we in the Seven Sleepers’ den?
’Twas so; but this, all pleasures fancies be.
If ever any beauty I did see,
Which I desired, and got, ’twas but a dream of thee.
চমকে উঠলো ইমরান। মোনার চোখে সরাসরি তাকিয়ে ভাবলো ডেঞ্জারাস মেয়ে। বয়স কত? আঠারো! এর মাঝেই ‘জন ডান’ আওড়ে যাচ্ছে। জন ডান পড়ার বয়স তো হয়নি এখনো। আর একটি কথাও না বাড়িয়ে ইমরান সরাসরি বললো,

– বাড়ি যেতে পারবে?
– না পারলে কি কোলে করে দিয়ে আসবেন?
– বড্ড বেপরোয়া হচ্ছ দিন দিন। অসংলগ্ন কথাবার্তা বেড়েই চলেছে।
পুনরায় বলে উঠলো John Donne এর আরেকটি বিখ্যাত কবিতা, ‘The canonization’ এর প্রথম স্তবক,
– For God’s sake hold your tongue, and let me love,
Or chide my palsy, or my gout,
My five gray hairs, or ruined fortune flout,
With wealth your state, your mind with arts improve…
– মোনা স্টপ। হোয়াট’স রঙ উইদ ইউ?
পকেটের ফোন কেঁপে উঠেছে। রবিন এসে পার্কের বাইরে। হেঁচকা টেনে মোনাকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো। এই মেয়ে আদর পেলেই মাথায় উঠে। টেনে গাড়ির কাছে এনে গাড়িতে উঠিয়ে নিজেও পিছনে বসলো। মোনা আচানক শেষবারের মত সেদিন হেসে ইমরানের এক হাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলেছিলো,
– And I love you till my last breath.

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাস প্রথম বর্ষে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও দ্বিতীয় বর্ষে অনেক ক্লাস মিস হয়ে যাচ্ছে। চারটি বসন্ত দেখতে দেখতে কেটে গেলো। প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া লাগলেও মোনার মনের আঙিনায় এখনো মলিন শীত। যার কোনো সুবাস নেই।
ক্লাস করে বাসায় ফিরতেই মায়া জানালো মিনহাজ ফোন দিয়ে অফিস যেতে বলেছে সেখান থেকে ঘুরতে যাবে। ব্যাগে দুদিনের কাপড় নিয়ে রওয়ানা হলো অফিসের উদ্দেশ্যে। মায়া সেজে গুজে বেরিয়েছে আজ বান্ধবীর সাথে দেখা করবে৷ মোনাকে অফিসে নামিয়ে দিয়েই চলে যাবে। মোনাকে ধাক্কা দিয়ে নিরবতা ভেঙে বললো,
– আগে তোর সাথে রিকশায় চড়লে কানে আঙুল দিয়ে রাখতে হতো কবে বক বক বন্ধ করবি তার জন্য। আর এখন তোর কথা শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে বসে থাকে গোটা বাড়ির মানুষ সব।

– ফুফি মায়ের কথা অনেক মনে পড়ে। আমার কিছু ভালো লাগে না। তাই চুপ করে থাকি।
অফিসের কাছে আসতেই মোনাকে নামিয়ে চলে যায় মায়া। সেদিন অফিস থেকে অনেকটা রাগ করেই বেরিয়ে ছিলো। চার বছর পেরিয়ে গেলো। ইমরানের প্রতিটি কথা কানে বেজেছে। ইমরান বিবাহিত। ইমরানের ছেলে আছে। কতটা অন্যায় করেছে! কত বিচ্ছিরি বাজে ব্যাপার! একজন বিবাহিত পুরুষকে পছন্দের তালিকায় রেখেছে, যার সন্তান আছে,সে নিশ্চয়ই তার স্ত্রী সন্তানকে ভালোবাসে। সেদিন ইমরানের করা বিশ্রী অপমান আজো কানে বাজে৷ ইমরানের কথার বিপরীতে মোনা মজার ছলেই বলেছিলো,
– তাতে কি? আমি তো জমিদারের বউ হবো।
মোনা ভেবেছিলো ইমরান মজা করছে। সালমা চাচীর মুখে শুনেছিলো ইমরানের বউ নেই। তবে কি চাচী মিথ্যা বলেছিলো? চাচীর কথায় বিশ্বাস করে ইমরানের কথা অবিশ্বাস করলো। মোনার কথার প্রতিউত্তর এভাবে এসেছিলো,

– লিসেন মোনা, নিজের উপর আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ভালোনা।
কথা আর বাড়েনি সেদিন। রিমি,চৈতিদের সাথে ফুচকার আড্ডা বেশ জমলেও মন পড়েছিলো ইমরানের তিরস্কার। অন্যদিকে বার বার মগজে আঘাত হানছিলো ইমরান বিবাহিত,সন্তান আছে। এত কথা কেনো শুনিয়েছে। সে কি বলেছে তাকে বিয়ে করতে? সামান্য আবেগ কি করে এত জটিল রূপে বদলে গেলো? ইমরানের ব্যাপারে কোনো কৌতুহল পোষণ করলেই নিজেকে একাধিক কাজে ব্যস্ত রাখার উপায় খুঁজে বের করে।
সপ্তাহ পেরিয়ে যেতেই শুনে ইমরান ইতালী ফিরে গিয়েছে। অফিসে এসেছিলো বাবার সাথে দেখা করার বাহানায়। এখন উপলব্ধি হচ্ছে বেশ কিছুদিন দেশের নাম্বারে যোগাযোগ করতে চেয়েও ব্যর্থ হওয়ার কারণ। বাবা থেকে ফোন নিয়ে যোগাযোগ করতে চেয়েছে। কল করতেই রিসিভ হলো মুহুর্তেই। মোনার কথা শুনে চমকে উঠলেও স্বাভাবিক মৃদু হেসে গলায় বললো,

– কেমন আছো মোনালিসা?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ।
– আপনার চেয়ারে বসেছি। আপনাকে মিস করছি।
– গুড। পড়াশোনা কেমন যাচ্ছে?
– ভালো। আপনি আমায় না বলে চলে গেলেন কেনো?
– সময় পায়নি ডিয়ার। স্যরি। তোমার বাবা কোথায়?
– বাবা তো বাবার কেবিনে।
– ওকে, একটু কাজ আছে। রাখছি, আমি তো বাইরে।পরে কথা বলি?
– ইমরান সাহেব কথা ছিলো?
কিছুটা ক্ষিপ্ত হলো ইমরান৷ কড়া স্বরে বললো,
– এই নামে ডাকবেনা।
– ডাকবো একশো বার ডাকবো। আপনি আমার ইমরান সাহেব।
কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছেনা ইমরানের। কি বলতে কি বলে ফেলবে। হয়তো কষ্ট পাবে উড়নচণ্ডী। তাই নিশব্দ।
মোনা নিজ থেকেই বলছে,

– ইমরান সাহেব আপনি মিথ্যে বলেন। আমার জন্য আপনার একটা স্ট্রং অনুভূতি আছে যা হাইড করেছেন। যতবার আমার দিকে তাকিয়েছেন আমি আপনার চোখে মুগ্ধতা খুঁজে পেয়েছি। আমি অন্যায় করছি। পাপ করছি। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছি। আমাকে এভাবে অগ্রাহ্য করে আমার অনুভূতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে আপনার কি লাভ হচ্ছে? একটু সময় দিন!
ক্রোধ সংবরন করতে পারেনি আজ ইমরান,
– তোমার সৌন্দর্য্যে বিয়ে বাড়ির ইয়াং ছেলেপেলে পাগল হয়ে বডি শেপ হট, ফাইন, নাইচ বলতেই পারে। হট ফিগার দেখাতেই ভীড়ের মাঝে যাও বারণ করার সত্ত্বেও। সবার কাতারে আমাকে ফেলবেনা। বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই এসবে। নিজেকে তুমি কি হিসেবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে চাও তুমিই ভালো জানবে? আমাকে বাকি সবার মতো ভাববে না যে তোমার ফিগারে আকৃষ্ট হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বো। নায়িকা নিয়ে ঘর করেছি। এসব ফিগার আমার নখদর্পনে। বাচ্চা নেই তুমি আর। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিবে বছর শেষ হলে। বি ম্যাচিউর। ওকে? আরেকটা কথা, সীমা অতিক্রম করলে বাধ্য হবো ব্যবহার খারাপ করতে।

মনের মেঘ কা/টিয়ে কাঁধের ব্যাগ প্যাকটা নিয়ে লিফটের সামনে এলো মনে হলো পথটা একাই চলতে হবে। ইমাজিনেশন,ইনফ্যাচুয়েশন থেকে বের হয়ে আসা ভীষণ জরুরি। একাই উঠবে আজ লিফটে,যা হবার হবে। একা উঠার অভ্যেস করে উঠতে পারেনি।কেউ না কেউ সাথে থাকে। লিফটের দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকলো। দোয়া পড়ছে মনে মনে। তেরো তলাতেই লিফট থেমেছে। বের হয়ে সোজা অফিসে প্রবেশ করলো। রিমি, চৈতি এবং তামান্না দেখে ছুটে এসে মোনাকে জড়িয়ে ধরলো। এই অফিস মুখো হয়নি গত এক বছর। প্রথম দিকে দু, তিন বছর পাগলের মতো ছুটে আসতো। মন কারো অপেক্ষায় থাকত। এখন আর আসেনা। নিষিদ্ধ অনুভূতি এই ইমরান সাহেব। মনে হলো যেন মস্তিষ্ক মুছে দিতে পারলেই বেঁচে যাবে।
কিছুক্ষন এখানে থাকবে জানিয়ে বাবার কেবিনের সামনে যেতেই চোখ পড়লো পাশের কেবিনে। অন্ধকার কামরা। বাবা এবং মামার কামরায় আলো জ্বলছে। এই কামরার অধিকারী দেশে নেই। তাই কামরা বিরান। বুকের ভেতরটা চিন চিন করে উঠলো। শেষ যেদিন এই কামরা থেকে বেরিয়ে গেলো, আবেগ অনুভূতি সব রাস্তায় ধূলিসাৎ হয়েছিলো। পরের ঘটনা সারাজীবনের জন্য চিহ্ন হয়ে থাকবে।
দম ফেলে বাবার কেবিনের দরজা ঠেলে দেখে বাবা নেই। চুপচাপ সোফায় বসে ম্যাগাজিন হাতে নিলো। দরজা ঠেলে মামাকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। গুটিশুটি মে*রে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। মামা কাছে এসে ভাগ্নীকে জড়িয়ে ধরলো।

– আসসালামু আলাইকুম। আমাদের প্রিন্সেস যে, কখন এলে মা?
– ওয়ালাইকুমুস সালাম মামা, কেবল এলাম।
– কিছু খাবে? ড্রিংক্স বা স্ন্যাকস।
– না মামা। খেয়ে এসেছি।
দুজনই চুপচাপ। নয়ন ভাগ্নীকে পরোক্ষভাবে পর্যবেক্ষন করছে। প্রশ্ন করলো,
– মোনালিসা, পরীক্ষা কেমন হলো?
তড়াক করে মাথা তুললো মোনা । নয়নের হাতে পেপার। মামা এই নামে ডাকলো কেনো? শুকনো ঢোক গিলছে বারংবার। ছলছল চোখ আড়াল করে সিক্ত স্বরে বললো,
– মামা, আলহামদুলিল্লাহ। তবে এক্সিডেন্টের পর থেকে পড়া মনে রাখা অনেক কষ্ট। মিডের রেজাল্ট নিয়ে একটু আপসেট।
নয়ন মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,

– ইনশাআল্লাহ ভালোই হবে সব।
– জ্বি মামা। বাবা কোথায়?
– নিচের অফিসে মিটিং এ আছে।
নয়নের ফোনে ভিডিও বার্তা এসেছে। রিক্তা এবং নাহিয়া দুজনের সাথে কথা বলে নয়ন মোনার দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলো। মোনা কিছুক্ষন ওদের সাথে কথা বললো। নয়ন উঠে দাঁড়ায়, মোনাকে বলে,
– মামার কেবিনে চলো। কথা আছে।
মোনা ব্যাগ নিয়ে মামার পেছনে এলো। কেবিনে বসেই নয়ন মোনা একে অন্যের মুখোমুখি। মোনার দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো,
– ইমরান চলে যাবার পর তোমাকে বুঝিয়েছি সবার অগোচরে, আবেগে গা না ভাসাতে। তুমি কি আমার কথা গুলো বুঝেছিলে?
মোনার মনের কোনে ভেসে উঠেছে হাসপাতালের কামরায় মামার বুঝানো প্রতিটি কথা,

– মোনা বোকামি করছো কেনো? একসাথে সবার সম্পর্ক নষ্ট করবে তুমি। কিসের নেশায় ছুটছো? তুমি ভাবছো আমি জানিনা বা দেখিনি কিছু নাকি বুঝিনা। ইমরান তোমার এসব চালচলন পছন্দ করছেনা। এভাবে অফিস থেকে ছুটে বেরিয়ে দূর্ঘটনা তোমার ঘটলো। হেয়ালীপনার জন্য ইমরান পুনরায় দেশ ছেড়েছে। পড়াশোনা করো। তোমার বাবা জানতে পারলে কতটা কষ্ট পাবে বুঝতে পারছো? তোমাকে হয়তো কিছু করবেনা। দুটো চড় থাপ্পড়ও মা/রতে পারবে না। কিন্তু ইমরানকে ঠিক কতটা অপমানের সম্মুখীন হতে হবে ভেবে দেখেছো? মানলাম তুমি তাকে পছন্দ করো, তাহলে কি চাইবে পছন্দের মানুষের অপমান? বিবাহিত, অন্য দিকে এক সন্তানের জনক ইমরান। সবদিক থেকে বেমানান। আবেগ থেকে সরে এসে বাস্তবতায় মনোনিবেশ করাটা জরুরি। তোমার অধঃপতনে আঙুল উঠবে মিনহাজ ভাইয়ের দিকে। মেয়েকে মানুষ করতে পারেনি। অথচ মানুষটা তোমার জন্য নিজে দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি। এতটা অসম্মান করোনা বাবার?
পুনরায় মস্তিষ্কে নাড়া দেয়াতে কথাগুলো কর্ণপ্রকোষ্ঠে তরতাজা আন্দোলিত হচ্ছে। মামার কেবিনটাকে এখন শীতল ঘর মনে হচ্ছে। মামা কি সেদিনের মতো আবার বুঝাবে! ভেসে উঠেছে অক্ষিযুগল। মামাকে আড়াল করে গলায় ঝুলানো স্কার্ফে চোখ মুছলো।
আকস্মিকভাবে নিরবতা বিচ্ছিন্ন করে নয়ন এক অদ্ভুত প্রশ্ন করলো,

– দেশে আসতে বলবো ইমরান সাহেবকে?
চমকে গিয়ে চোখ তুললো মোনা। মামা পুনরায় বললো,
– এখনো কি অনুভুতি কাজ করে তোমার?
মোনা সজোরে মাথা নেড়ে ভেজা গলায় বলে,
– না মামা, আমি জানতাম না উনি বিবাহিত। সত্যি জানতাম না ছেলে আছে। যদি জানতাম কখনো এমন ভুল করতাম না। উনি দেশে আসলে বাবাকে সব বলে দিবে এবার। আমি কোনোভাবেই চাই না বাবা অপমানিত হোক। তোমাকে কথা দিয়েছিলাম, আমি কখনো আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করবোনা। করিনি মামা। প্লিজ মামা।
মোনা সজোরে কেঁদে দিলো। নয়ন ভাগ্নীকে সামলে বললো,

– ঠিক আছে। বলবোনা। স্বাভাবিক হও। আগের মোনা হয়ে ফিরে আসো। এমন মন ম/রা মোনা আমার অপছন্দের।
নাক টেনে, টিস্যুতে নাক মুছে মাথা নেড়ে সায় দিলো। নয়নের দরজায় কড়া নড়লো। মোনা ছুটলো ওয়াশরুমে। বাবা চোখের পানি দেখলে বুঝে যাবে মোনার কষ্ট।
মিনহাজ এসেই দু চারটা কথা সেরে নিলো। মিনহাজ,নয়ন এবং মোনা বেরিয়ে পড়লো রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। রিসোর্টে একটা ফরেইন বায়ার টিমের সাথে মিটিং আছে। সেই সুবাধে গাজীপুরের নতুন ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখতে চেয়েছে বায়ার। এমন সুযোগের সদ্ব্যবহারের উপায় হিসেবে চট করে দুদিনের জন্য রিসোর্ট বুকিং দিলো এবং আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখাবে। মোনার পরীক্ষা শেষ তাই মেয়ের বিনোদনের জন্য বাইরে নিয়ে আসলো মিনহাজ। হঠাৎ করে পড়ার চাপে মেয়েটা কেমন চুপসে গিয়েছে।

রিসোর্টে এসেই বিকালের নাস্তা সেরে নিলো। সন্ধ্যা থেকে বারবিকিউ এর আয়োজন করা হয়েছে। সুইমিং পুলের পাশে কিটকট চেয়ার আছে বেশ কিছু। একটাতে মোনা বসলো। রাতের আকাশ ভীষণ সুন্দর। পরিবেশ বেশ আমোদপূর্ণ। বাবা,মামাদের চেয়ে খানিকটা সরে এসে বসেছে। এক পাশে পুল অপর পাশে গাছপালা। হিম শীতল আবহাওয়া, শিরশির সমীরণে পত্রপল্লব যেন আন্দোলিত হচ্ছে সুরের তালে। পবনের শো শো আওয়াজ কর্ণকুহরে অন্যরকম শিহরণ জাগিয়েছে। রিসোর্টের ক্লায়েন্টদের মাঝে কেউ হয়তো গিটার এনেছে। সুরেলা কণ্ঠে গানের প্রতিটি বাক্য ছড়িয়ে পড়ছে এক প্রান্তর থেকে অপর প্রান্তরে।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৫

মোনা বাবার ফোন হাতে নিয়ে ইউটিউবে মুভির কয়েকটা ক্লিপ দেখছিলো। সেই মুহুর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত কল আসলো। হাতের মাঝে ফোন কে/টে গেলো। পুনরায় রিং হতেই ফোন নিয়ে ছুটে গেলো বাবার কাছে। বাবার হাতে ফোন দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এলো। পাথর হয়ে রইলো চোখ মুখ। বন্ধ চোখের আকুতি, মনে মনে চাইছে, মানুষটা ফিরে আসুক। তাকে আগলে নিক। চোখ খুলেই পানিতে তাকিয়ে উপস্থিত মন পরিবর্তন করলো,
– নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি লোভ করা পাপ, মহাপাপ। আর লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৭