Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৭

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৭

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৭
নীতি জাহিদ

ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ মনের মাঝে ঝড় তুলেছে। সারাটা দিন স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ। কোচিং থেকে বাসায় যাওয়ার রাস্তা ধরেছে। এমন সময় একটা গাড়ি এসে পুরো ভিজিয়ে দিলো। কাদা পানি এসে ছিটকে পড়লো মুখে আর জামায়। মোনা প্রচন্ড ক্ষেপে রাস্তা থেকে বড় ইটের টুকরা ছুড়ে মা*রলো গাড়ির গ্লাসে। গাড়ি তৎক্ষনাৎ থেমে গেলো। সেদিকে মোনার মনোযোগ নেই। ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে পানির বোতল বের করে মুখ ধুয়ে নিচ্ছে। ড্রাইভার এগিয়ে এসে দিলো ধমক। মোনা ওড়নার আঁচলে মুখ মুছে তাকাতেই ড্রাইভারকে দেখে খেঁকিয়ে উঠে বললো,
– জানতাম এই বিচ্ছিরি কাজটা আপনার মত মানুষের দ্বারাই সম্ভব। এই কালা গাড়ির পাইলট আপনার সাথে আমার কিসের শত্রুতা?
রবিন কিছুটা চিন্তিত গলায় বললো,

– ম্যাডাম খেয়াল করিনি তাই বলে গাড়ির গ্লাসটা ফাটিয়ে দিলেন। দেখেন কি করেছেন। আমি তো নিজ থেকেই গাড়ি থামিয়েছিলাম।
– একদম নাটক করবেন না। বলবো তো আমি ইমরান সাহেবকে?
– মাফ করেন ম্যাডাম। আমি স্যারের কাজেই যাচ্ছিলাম। একটু আগে কাদায় চাকা আটকে গিয়েছিলো, দেরী হয়ে যাচ্ছে। এখন দ্রুত যেতে গিয়ে এমন কাজটা হলো।
স্যারের কাজে বলায় মোনার মস্তিষ্ক কিছু একটা ভাবলো। ভাবনা সেরে বললো,
– যাচ্ছেন কোথায়? আর আপনার স্যার কোথায়?
– স্যার ফ্ল্যাটে। কয়েকটা আর্জেন্ট ফাইল দিতে যাচ্ছি।
– অফিস যায় নি আজ?
– না, স্যার এই দিনে কোথাও যায়না।
– কেনো আজ কি?
– স্যারের জন্মদিন।
তড়াক করে উঠলো মোনার চোখ। মনের মাঝে প্রশান্তি। ছাউনি থেকে বের হয়ে বলে,
– চলুন।
রবিন চমকে বলে,
– কোথায়?
– স্যারের বাসায়?
– আশ্চর্য কথাবার্তা। স্যার এই দিন একাকী থাকতে চায়। আমাকে যদি দেখে আপনাকে নিয়ে গিয়েছি। বাসায় নয়তলা থেকে নিচে ফেলে দিবে। আর আপনি একা একটা মেয়ে কেনো যাবেন?

– একা কেনো থাকবে? বাসার লোক কোথায়?
– এটা স্যারের পারসোনাল ফ্ল্যাট। এখানে কেউ থাকেনা। স্যার একা থাকে মাঝে মাঝে।
একা যাওয়া কি ঠিক হবে? পুরুষ মানুষ। রবিন কি ভাববে? আচ্ছা ভেতরে না ঢুকে বাইরে থেকে উইশ করে আবার রবিনের সাথে চলে আসা যাবে। রবিনের সাথে যাবে বলে রবিনকে বিভিন্ন ভাবে ব্ল্যাকমেইল করছে। শেষমেষ বেচারা ক্লান্ত হয়ে নিতে বাধ্য হলো। মনে মনে ভাগ্যকে দুষছে রবিন।
রাস্তা থেকে একটা ফুলের তোড়া নিলো যেখানে হরেক রকম সাদা ফুল। মানুষটাকে সাদা রঙে সবচেয়ে বেশি দেখেছে মোনা। গাড়ি ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ায়। রবিন দোয়া কলমা পড়ছে। আজকে স্যার ওর অবস্থা খারাপ করবে। লিফটে উঠতে মোনা ভয় পেলেও আপাতত মনে অনেক ফূর্তি। মনকে শক্ত করে পুরোটা সময় নিরবতা পালন করলো।
ফ্ল্যাটের কলিং বাজালো রবিন। মিনিট খানেকের মাথায় সাদা টি শার্ট, কালো ট্রাউজার পরিহিত মানুষটার দেখা পেলো। রবিন সালাম দিলো। সালামের জবাব নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মোনার দিকে। প্রশ্ন করার আগেই রবিন বললো,

– স্যার আমার দোষ নেই। রাস্তায় আমাকে দেখে বায়না ধরেছে…
হাত তুলে থামিয়ে দিলো রবিনকে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে কোনো অকান্ড করেই এই বাসায় এসেছে। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে রবিনকে ইশারা দিলো। রবিন সোজা ভেতরে ঢুকে পড়লো। মোনা হাতের ফুলটা নিয়ে একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত,গম্ভীর, ভারী গলায় বলল,
– ভেতরে আসো।
মোনা একটু বিব্রত বোধ করে সামনে ফুল এগিয়ে দিয়ে বললো,
– শুভ জন্মদিন, আপনাকে উইশ করতে এলাম। আমি চলে যাব। ভেতরে আসবোনা।
ইমরান ফুল নিয়ে বললো,
– ঠিক আছে ধন্যবাদ।
চিন্তিত মোনা প্রশ্ন করলো,
– রবিন ভাই কি থাকবে?
ইমরান ডাইনিং এ ফাইল গুছানো রবিনের দিকে তাকিয়ে পুনরায় মোনার দিকে ফিরে ভ্রু তঞ্চন করে বললো,
– না, চলে যাবে।
মোনা স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে বললো
– আচ্ছা আমি উনার সাথেই যাব।
ভেতরে গিয়ে রবিনকে কিছু বলছে। এরপর রবিন দরজা দিয়ে বের হয়ে বললো,
– আমার সাথে কই যাবেন? আমি যাব নারায়ণগঞ্জ। এই ফাইলগুলো নিয়ে।
এসেই কি ফেঁসে গেলো? এখন বাসায় যাবে কি করে? কেনো এসেছে এখানে? বাবা জানলে মে*রেই ফেলবে। ইমরানের চোখের দিকে তাকিয়ে আঁৎকে উঠলো। এখন নিশ্চিত জোরে ধমক দিবে। চোখগুলো ছলছল করে উঠলো। রবিনকে ভারী গলায় আদেশ দিলো,

– দেরী করোনা রবিন, তুমি যাও। আমি দেখছি। আর যা বললাম মনে থাকে যেন।
– জ্বি স্যার। সব মনে থাকবে।
রবিন একরকম ফাইল হাতে নিয়ে পালিয়েই গেলো। মোনার আসার খবর যাতে কেউ জানতে না পারে এই ব্যাপারে রবিনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ছেলেটা দ্রুত লিফটে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেলো। ইমরানের কেনো যেনো মস্তিষ্ক বলছে মোনা ঘরের ভেতর যাবে না বলেই বাইরে দাঁড়িয়ে উইশ করলো। দরজা আটকে দিলো মোনার মুখের উপর। বুকে কেঁপে উঠলো মেয়েটার। ভয় পেয়ে আশেপাশে তাকালো। চারপাশটা নিরব। এভাবে কেউ অপমান করে। মোনা তো এমনিতেই ভেততে যেত না। চোখের পানি বেয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। কেনো এলো! হুজুগে পাগল হয়ে এত দূর চলে এলো! এখন একা বাসায় ফিরবে কি করে! সব টাকা দিয়ে ফুলের তোড়া টা কিনে নিয়েছে। প্যান্টের পকেটে আছে আর মাত্র আশি টাকা। লিফটের দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে স্বর এলো,

– ছাদে চলো।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে ইমরান বাসায় লক দিলো। হাতে একটা ফ্লাস্ক, একটা মিল বক্স আর দুটো ওয়ানটাইম কাপ। মোনার দুহাতে চোখ মোছা দৃশ্য মানুষটার চোখ এড়ালোনা। সিড়ি দিয়ে ইমরান ছাদে উঠছে। মোনাকে পিছু নিতে ইশারা করলো। মোনা বাধ্য মেয়ের মতো পিছু নিলো। মোনার হাতে ফাস্ক,মিল বক্স ধরিয়ে দিয়ে ছাদের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। বৃষ্টি এখন কিছুটা কম। বসার জায়গাটা খুব সুন্দর ভাবে করা। সিমেন্টের তৈরি ছাতার মত ছাউনি। তার নিচে ডাইনিং টেবিলের মতো গোল সিমেন্ট টেবিল এবং বসার টুল আছে। হাতের জিনিসপত্র টেবিলে রাখতে ইশারা দিলো ইমরান। চাবি পকেটে ঢুকিয়ে ইমরান ছাদের দরজা আটকে দিলো। এই বাড়িটা শাহাদাৎ প্রোপার্টিসের করা প্রথম বাড়ি। নিচের ফ্ল্যাট গুলো সব ভাড়া। নয়তলার বিশাল তিন হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট পুরোটাই নিজের জন্য রেখে দিয়েছে। মোনা ব্যাগটা এক পাশে রেখে চুপচাপ বসলো। কেঁদেছে বলে গালে কান্নার দাগ এখনো আছে। ইমরান প্রশ্ন করলো,

– কি ব্যাপার? কেনো আসলে?
নিচু হওয়া মাথা তুলে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো।
ইমরানের চোখ নিবদ্ধ টবে পানি জমে যাওয়া দোলনচাঁপা গাছটাতে। বেশ কটা ফুল ফুটেছে। মোনার উত্তর শুনেও নির্লিপ্ত। ঘাড় কাত করে মোনার দিকে ফিরেই পুনরায় প্রশ্ন,
– ভেতরে ঢুকলে না কেনো?
মোনা নিশ্চুপ। ইমরান একপেশে হাসি দিয়ে বলে,
– সবই তো বুঝ। অবুঝ সেজে থাকো কেনো? আজ বুঝতে পারলে যতই ইমরান সাহেব বলে ডাকোনা কেনো, ইমরান সাহেব একজন পুরুষ। তোমার জন্য বিপজ্জনক। তোমার বাচ্চা মন ও সায় দেয়নি ইমরান সাহেবের একা বাসায় ঢুকতে, অথচ সকলের সামনে ইমরান সাহেব বলে বেড়াও,আর ভাবো কেউ মাইন্ড করবেনা।
মাথা নত মোনার। ইমরান ফ্লাস্ক ঘুরিয়ে কাপে চা ঢেলে মোনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– খেতে পারো। লেবু, আদা, মধু দেয়া। আমি বিকেলে প্রায় ছাদে আসি। আজো আসবো বলে প্রিপারেশন নিয়েছি। তাই বানিয়ে রেখেছিলাম। মিল বক্সে পিজ্জা আছে। ভেবেছিলাম রবিন আসলে ওর জন্য নাস্তা আনিয়ে রাখি। ওকে দিই নি তুমি খাও।
মোনা বক্সে ঠেলে মুখ ফুলিয়ে বলে,

– আমি কেনো আরেকজনের নাস্তা খাবো?
ইমরান মৃদু হেসে বলে,
– এটা তোমারই। আরেকজনের কেনো হবে। রবিনকে যাওয়ার সময় নাস্তার জন্য একটা এমাউন্ট দিয়েছি। সে কিনে খাবে। খেতে পারো। এত রাগ ভালো না।
সেই এগারোটায় খেয়ে বের হয়েছে। ভেবেছে বাসায় গিয়ে খাবে কিন্তু খাওয়া হয়নি আর। ক্ষুধা পেয়েছে ভীষণ। তাই আস্তে ধীরে বক্স খুলে এক পিচ পিজ্জায় কামড় বসালো। তা দেখে ইমরান হেসে বললো,
– খাবার নিয়ে কোচিং এ যাবে। না খেয়ে থাকলে তো এসিডিটি হবে।
মোনা খেতে খেতে বলে,
– আমার কি আর মা আছে যে সব সময়মত পেয়ে যাব। যতক্ষন ফুফি দেয় ততক্ষন পাই। জেদ ধরলে দাদী খ্যাক খ্যাক করে। সবসময় নুডুলস খেতে ভালো লাগেনা। রুটি নাহয় নুডুলস দে। তাই বাবা টাকা দিলে ক্যান্টিন থেকে খেয়ে নিই।

– বাসায় জানলে বকা দিবেনা?
– জানবে কি করে? বলবো নাকি?
– ফিরতে দেরী হলে?
– তাতে কি? চয়নের বাসায় গিয়েছি বলব।
– মিথ্যে বলবে?
– চয়নের বাসায় গিয়েছি তো, আসার আগে। এরবেশি কাউকে কেনো কৈফিয়ত দেব? কেউ আমার জন্য চিন্তা করেনা বাবা ছাড়া।
ইমরান মাথা নেড়ে হাসলো। মিনহাজের কাছে আদ্যপান্ত সবই শুনেছে। মোনা খাওয়া শেষ করে বললো,
– আপনার মন খারাপ কেনো?
ইমরান চমকালো। মন খারাপের মত ব্যবহার তো করেনি। তবে কেনো এমন প্রশ্ন? প্রশ্ন করলো,
– কেনো মনে হলো এমন?
– আপনি যখন স্বাভাবিক থাকেন আমাকে বকাঝকা করেন। রেগে থাকেন। আজ বকা দিচ্ছেন না। যত্ন করে খাওয়াচ্ছেন।

– আগে খাওয়াই নি?
– হ্যাঁ তা খাইয়েছেন। কিন্তু দুটোর মাঝে পার্থক্য আছে।
খানিকটা হাসলো ইমরান। উত্তর দিলো,
– যাদের জন্মদিনে বাবা-মা দুজনই অনুপস্থিত থাকে তাদের মন আমার মত খারাপ থাকে।
মোনা হেসে বলে,
– আপনি তো ছোট বাবুদের মত কথা বললেন।
ইমরানের দৃষ্টি ছাদে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে নিবদ্ধ। বেশি মন খারাপ মানুষটার। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আচ্ছা বলুন তো আপনাকে আমার কেনো এত ভালো লাগে?
ইমরান আবারো হাসলো। মোনা ইমরানের হাসি দেখে গাল ভরা হাসি দিলো। হেসে ইমরান উত্তর দিলো,
– শোনো, ভিঞ্চি কন্যা। তুমি কোনো রহস্য মানবী নও যে নিজেকে প্রাকৃতিক মোহ,কামনা,ভালোবাসা এসব থেকে পৃথক করে রাখবে। শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখতে রাখতে কল্পনায় যার ছবি এঁকেছো তার হয়তো মিল পেয়েছো আমার মাঝে। মানুষ স্বভাবতই নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষিত হয়। তোমার বেলাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। ব্যতিক্রম কিছুতো নয়।

– এটা কি ভালো না খারাপ?
মুখভঙ্গি পরিবর্তন হলো ইমরানের। কি উত্তর দিবে? খারাপ বলতে ইচ্ছে করছে না? আজ মনটা ভীষণ খারাপ। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছে। মায়ের শেষ কথা মনে পড়ছে। বাবার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী ঠেকছে। এসবের মাঝে এই মেয়েটা আজ এসে ম্যাজিকের মতো কিছু একটা করে দিলো। পুরো মনটাকেই ঘুরিয়ে দিলো। আগে থেকে অনেকটা ভালো লাগছে। তবে নিজের স্বার্থে মোনার এই অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেয়া বড্ড অপরাধ হবে। কিন্তু মন সায় দিচ্ছেনা মুহুর্তটা নষ্ট করার। স্বাভাবিক গলায় বললো,
– নিজেকেই প্রশ্ন করোনা?
– করেছি, মন বলেছে যার কাছে নিজের অস্তিত্ব মেলে ধরা যায়, যার সাথে সব শেয়ার করা যায়, যাকে দেখলে বুকের ভেতর শান্তি লাগে তা আবার খারাপ কি করে হয়!
দীর্ঘশ্বাস ইমরান। পরিণত মেয়ে। বাড়ন্ত বয়স। বিপজ্জনক সময়সীমা। পরিপক্কতা আসছে। মোনার দিকে না তাকিয়েই ইমরান বলে উঠলো,

– মোটেও অবুঝ নও তুমি, মোনালিসা।
মোনা হেসে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে নেমে পড়লো। ইমরান কড়া গলায় বলে উঠলো,
– এখানে বসো, ঠান্ডা লাগবে। ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরবে কি করে?
– আগে বলুন আমার জন্য একটা গান গাইবেন।
ইমরান ভ্রু কুচকে বললো,
– আমি গান পারিনা।
– তাহলে ভিজবো আমি।
– প্লিজ মোনালিসা।
– গান শুরু করুন।
– নাহ।
– ওকে।
বৃষ্টির তেজ বেড়ে গিয়েছে। মোনা ভিজে যাচ্ছে। ভেজা অবয়ব ভেসে উঠবে ইমরানের চোখের সামনে। ইমরান অনুরোধ করে বললো,
– মোনালিসা প্লিজ। এসে বসো। অনুরোধ করছি।
– একদম না।
– গাইবো। আসো।
– সত্যি?
– হুম।
মোনা অনেকক্ষানী ভিজেছে। ইমরানের পাশে এসে ভেজা শরীরে হাসি মুখ নিয়ে বললো,
– শুরু করুন।
মুখ ফিরিয়ে ইমরান বললো,

– কিছুক্ষন পর সন্ধ্যা নামবে। বাসায় তো এখন যাবেনা। ভেজা কাপড় শুকাবে কোথায়? ঠান্ডা লেগে যাবে। এরপর বলবে সব দোষ ইমরান সাহেবের।
মোনা খিলখিল করে হেসে বলে,
– আপনিও মনে প্রাণে মেনে নিলেন, আপনি আমার ইমরান সাহেব।
চমকে উঠলো ইমরান। মুখ ফিরিয়ে মোনার দিকে তাকালো হতবাক হয়ে। বাক হারিয়ে স্তব্ধ। ইমরানকে অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে বের করতে বলে উঠলো,

– গান শুরু করুন তো। মানব দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট। সো কাপড় শুকানোর জন্য পারফেক্ট। আপনি গান শুরু করুন। নতুবা আবার ভিজবো।
অনেক বছর পর বাধ্য হয়ে গান গাইতে হচ্ছে। গলা ঝেড়ে গান ধরলো,
– যদি আকাশের গায়ে কান না পাতি
তোমার কথা শুনতে পাবো না
যদি আকাশের গায়ে কান না পাতি
তোমার কথা শুনতে পাবো না
যদি বাতাসকে আমি ছুঁয়ে না দেখি
যদি বাতাসকে আমি ছুঁয়ে না দেখি
তোমার শরীর স্পর্শ পাবো না
তোমার কথা শুনতে পাবো না………
গাইতে গাইতে দোলনচাঁপা ফুল গুলো ছিড়ে হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো মোনার দিকে। গান শেষ করে ফুল এগিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

– ধন্যবাদ মোনালিসা। আমার আজকের বিকেল টা সাজিয়ে দেয়ার জন্য।
হাতে ফুল গুলো নিয়ে মোনা বলে উঠলো,
– আপনার হাতটা একটু ধরি?
উঠে দাঁড়ায় ইমরান, ছাদের দরজা খুলে বলে,
– চলো বাসায় পৌঁছে দিই।
চোখ খুলতেই মোনার হুঁশ এলো সে ক্লান্ত শরীরে চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ক্লান্তি তাকে ঘুমের মাঝে মনে করিয়ে দিয়েছে চার বছর আগের এক সুন্দর, মধুর স্মৃতি। শরীরে বৃষ্টির গুড়ি গুড়ি প্রতিটি ফোঁটা বিঁধছে। মনে পড়ছে সেদিনের কথা। স্মৃতি এত বেদনা দেয় কেনো। মানুষটা সেদিন এত যত্ন কেনো করেছিলো? ভেতরটা হুঁ হুঁ করে উঠলো। দম আটকে আসছে কান্নার তোড়ে। ওদিকে বাবারা কথা বলছে মানুষটার সাথে। অথচ মোনা কথা বলতে পারছেনা। এত কেনো ভালোবেসে সে! পুলের পানিতে এলোমেলো ভাবে ভিজতে কেনো মন চাইছে। বৃষ্টি কেনো মুছে দিচ্ছেনা মোনার সমস্ত দুঃখ? ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। দূর থেকে বাবা বা মামা দুজনের কেউই দেখতে পারছেনা বৃষ্টিতে মোনার বুক ফাটা আর্তনাদ। থেমে গিয়েছে বৃষ্টি। ভিজিয়ে দিয়েছে মোনাকে। বোঝা মুশকিল কোনটা বৃষ্টির পানি আর কোনটা চোখের পানি। আকাশের দিকে তাকিয়ে মোনা হেসে বললো,
– আজ তুমিও কাঁদলে আমাকে সঙ্গ দিয়ে।

ফোন রিসিভ করতেই নিজেদের মাঝে আলাপ হচ্ছে। একপর্যায়ে মিনহাজ বলে উঠলো,
– স্যরি দেরী করে ফেললাম,সব প্রিপেয়ার করতে গিয়ে সময় পার হয়ে গেলো, তোকে ফোন দেয়ার কথা ভুলে গেলাম। তোর কল দেখে মাত্রই মোনা ফোন দিয়ে গেলো।
ও পাশের প্রতিক্রিয়া নয়ন ব্যতীত কারো দৃষ্টিতে এলোনা। মিনহাজ কথা শেষ করে নয়নের হাতে ফোন দিলো। নয়ন কথা বলতে বলতে পুল এরিয়া ছেড়ে গার্ডেন এরিয়াতে প্রবেশ করেছে। বৃষ্টি নেই এখন।গাছের আড়ালে হাঁটতে ভালো লাগছে। মন জুড়ানো বাতাস অন্যদিকে একটু শান্ত পরিবেশে বন্ধুর সাথে কথা বলার সুযোগ হবে। হেসে হেসে বলে,
– চার বছর চলছে। আসবিনা?
শক্ত পোক্ত উত্তর,
– আসবো। সময় হোক। ইশানের ফাইনাল এক্সাম শেষ হলে ওকে এখানে কিছুদিন রাখবো।
– ইশানের একা থাকতে কষ্ট হচ্ছেনা?
ও পাশ থেকে খানিকটা হেসে বলে,
– মানুষ বলে বাবা সন্তানের অনুপ্রেরণা, আমি বলবো ইশান আমার অনুপ্রেরণা। আমার ছেলেটা এসব মানিয়ে চলতে শিখেছে অনেক আগেই । বাংলা বলতে পারে সাবলীলভাবে কিন্তু লিখার সময় যাচ্ছে তাই লিখে।
নয়ন হাসছে। কিছুটা গম্ভীর হয়ে বললো,
– এ সময়টাতে ওর পাশে থাকা প্রয়োজন ছিলো তোর।
– সত্যি কি আসা উচিত আমার নয়ন?

নয়ন আজ নিরুত্তর। পুল সাইড এরিয়ায় এক পাশে অন্যমনস্ক মোনা কিটকটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে। এক পায়ের পাতা পানিতে ভিজিয়ে আপন ভাবনায় নিমজ্জিত। সজ্জিত প্রজাপতির ন্যায় বাতিগুলোর আলোতে পুলের পানি হলুদাভ রূপ ধারণ করেছে। ঝিকিমিকি ফেইরী লাইট গুলো গাছের আঁড়ালে আঁড়ালে জ্বলছে। মোহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। নয়ন অনেকটা কাছে এগিয়ে এসে ক্যামেরা ব্যাক সাইডে দিলো। মোনার কার্যকলাপ স্পষ্ট ও পাশের মানুষটা দেখতে পাচ্ছে। কারো পায়ের শব্দ পেয়ে মোনা মাথা না উঠিয়েই বললো,
– কে?
যদিও মামাকে এ পাশটাতে হাঁটতে দেখেছে। হলপ করতে পারেনি মামার হাতে ফোন ছিলো। নয়ন জবাবে বললো,
– মামা। মন খারাপ?
মোনা কিঞ্চিত হেসে নির্লিপ্ত জবাব দিলো,
– মোনার মন খারাপ হয় না মামা। দেখো পুলের পানি কত শান্ত। জানো মামা, আমার নদী বেশ পছন্দ। আপন ছন্দে বহমান,স্বাধীন। চাইলেই গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। অথচ পুলের পানিগুলোকে দেখো। বছরের পর বছর এখানেই আটকে আছে। কতৃপক্ষ চাইলেই ফেলে দিয়ে নতুন পানি রাখবে। নতুবা আটকে থাকবে। মোনা হচ্ছে পুলের পানি।
নয়নের হাতে তখন ও ফোন ধরা। ফোনের পজিশন এমন ছিলো বোঝার সাধ্য নেই ও পাশে সংযোগ আছে। বিপরীত পাশের মানুষটা যে নিরব। মোনা এতটুকু শেষ করে চেয়ার থেকে মাথা উঠিয়ে মামার দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,

– ভয় পেলে মামা? ভয় পেও না। প্রতিনিয়ত নিজের মাঝে পরিবর্তন আনার চেষ্টায় আছি। দুপুরে বললে না বাবাকে কষ্ট না দেয়ার কথা। মাথায় গেঁথেছে। কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকেনি মামা।
– কি ব্যাপার?
– সবাই কেনো আমাকে বলো তোমার বন্ধু আমার আবেগ? ছোট বলে? এখন তো বড় হয়েছি। সেদিন চয়ন ও একই কথা বললো। আর তোমার বন্ধু তো…
নয়ন ফোন কে টে দিবে ভেবে ফোনের দিকে তাকায়, ইমরানের পূর্ণ মনোযোগ মোনাতে আবদ্ধ। কিছু একটা ভেবে সংযোগ রেখেই মোনাকে উত্তর করলো,

– আবেগ নয় কি?
– কি আছে তোমার বন্ধুতে? চার্ম? দেখতে খুব সুন্দর? আমার এইজের মেয়েরা উনার প্রেমে পড়ার প্রশ্নই আসেনা। হ্যাঁ বড়রা অনেকে পড়েছে। কে কে আমি জানি। এমন একজনের ডায়েরি পেয়েছি যা পড়ে আমার সেই মুহুর্তে মন চেয়েছে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য অনেক কঠিন মামা। উনাকে প্রচন্ড ভালোবেসেছে একটা সময়। এত কিছুর পরে আমার তার কথা মনেই আনা উচিত নয়। আমি তার কাছ থেকে উপেক্ষা, অপমান ব্যতীত কিছু পায়নি। অথচ তাকে আমার ভালো লাগে। তার ব্যক্তিত্ব ভালো লাগে। তাকে বলে দিও সে পরবর্তীতে আসার আগেই মোনার তাকে ঘিরে থাকা অনুভূতি সব হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।
থেমেছে মোনা। দু হাতে চোখের জল মুছতেই পুনরায় জল গড়িয়ে পড়ছে কপোল বেয়ে। ফুফিয়ে কেঁদে বলতে থাকলো,

– যে কথা সে বলেছে, আমি প্রস্তুত ছিলাম না তা শোনার জন্য। আমি কখনোই নিজেকে প্রদর্শন করিনি কারো কাছে।
এত টুকুতেই কথা অসমাপ্ত রেখে ছুটে গেলো মোনা রিসোর্টের ভিলার দিকে। নয়ন হতবাক। মোনা যেতেই ফোন সামনে এনে দেখলো ইমরান চোখ বুজে নিজেকে শক্ত খোলসে আবদ্ধ করে নিয়েছে। দম ছাড়ছে না। বন্ধুর এমন অবস্থায় নয়ন ঘাবড়ে গেলো। ফোন নিয়ে আড়ালে চলে এলো। ওকে স্ট্রেস দিতে ডাক্তার বার বার বারণ করেছে। প্রশ্ন করলো,
– কি বলেছিস তুই আমার মেয়েটাকে?
ঢোক গিলে ইমরান চোখ খুলে বললো,
– পরে কথা বলব, রাখছি।

রাতের খাবার শেষে মোনা বাবার ফোনে ফ্রাংকেস্টাইন দেখছে। দেখতে দেখতে মনে হলো ফ্রাংকেস্টাইন বইটা একবার পড়া উচিত। বাবার আইফোনের নেতিবাচক দিক হলো ডাউনলোড করতে ঝামেলা। পিডিএফ নামাতে না পারায় কাছে গিয়ে আবদার করে বললো,
– বাবা, ফ্রাংকেস্টাইন নামিয়ে দাও। পড়বো।
– আম্মু, এখন ঘুমাও। কাল পড়বে। বাবা একটু কথা বলবো ইমরানের সাথে। তখন কথা হয়নি।
মোনা কথা না বাড়িয়ে বাবার হাতে ফোন দিয়ে চলে গেলো। দুই বেডের স্যুট। নিজের বেডে শুয়ে পড়েছে। মিনহাজ ব্যালকনি গিয়ে কথা শেষ করে এসেছে দশ মিনিটের মাঝে। মেয়ের বেডে বসে প্রশ্ন করলো,
– গল্প করবে বাবার সাথে?
ধড়ফড়িয়ে উঠলো। চোখে মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে উপর নিচ মাথা ঝাঁকালো। মিনহাজ হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বললো,
– বাবাকে বলোতো, কি হয়েছে শাহজাদীর?
বাবার কোলে মাথা রেখে চুপ করে আছে। মিনহাজ নিরবতা বুঝে বললো,

– দাদীর ব্যবহারে কি খারাপ লাগে?
মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– নাহ
– তবে?
– ক্যাম্পাসে নিয়মিত যাও না?
– যাই।
– ছেলে বন্ধু আছে?
– নাহ তেমন নেই।
– কাউকে পছন্দ হয়েছে?
বাবার কাছ থেকে লুকাতে মন বাঁধছে কেনো? আজ বাবাকে সব বলবে। বাবাই তো সব মোনার। মিনহাজ মেয়ের চুলে বিলি কে/টে দিতে দিতে বললো,
– তোমার বয়সটা বাবার ও ছিলো। তোমার চেয়ে বেশি ইমম্যাচিউর ছিলাম। প্রেম করতে পারিনি। মেয়েরা তাকাতোই না। কিভাবে যেন তোমার মা ই একটু ভ্যালু দিলো। নতুবা মোনা নামের কোনো রাজকন্যার আগমন এই ধরনীতে হতোইনা। যখন তোমার মাকে বিয়ে করেছি তোমার মায়ের বয়স তোমার চেয়ে কম ছিলো। তবে সে তোমার থেকে অনেক বেশি ম্যাচিউর ছিলো। তাই তো আমার মতো একজন অসুন্দর মানুষের জীবনে এসে সব গুছিয়ে আবার চলে গেলো। ভাগ্যিস তুমি ছিলে,নতুবা এত দিনে ম*রে ভুত হয়ে যেতাম।

– বাবা কি বলো এসব?
মিনহাজ হেসে বলে,
– ঠিকই তো মোনার অসুন্দর বাবাকে কে বিয়ে করতো শুনি? তোমার মা তো ভীষণ বোকা ছিলো।
মোনা বাবার কোমড় জড়িয়ে ধরলো। মিনহাজ মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
– জীবনে প্রথম ভালো লাগা সবসময় স্মরণীয় হওয়া উচিত। তোমার যদি মন বলে যাকে চাইছো সে তোমার জন্য কম্ফোর্ট জোন, তার সাথে ঘোরা, কথা বলা,একসাথে খেতে যাওয়া এগুলো তে যদি তোমার প্রায়োরিটি আধিক্য পায় তাহলে বাবা তোমার পাশে আছি। বুঝে নেবে সেই মানুষটা তোমার জন্য উপর্যুক্ত।সঠিক পথেই আগাচ্ছো তুমি। আমি চাইনা বাধ্য হয়ে কিছু করো। যদি সম্পর্কে জড়াতে গিয়ে রিয়েলাইজ করো যার সাথে সম্পর্কে যেতে চাও সব তার পছন্দে করতে হবে, তার কাছে তোমার প্রায়োরিটি নেই। তবে আমার পরামর্শ এগিয়ো না। ওখানেই থেমে যাও। ওটা তোমার জন্য নয়। যা করবে তোমার জন্য করবে, তোমার খুশির জন্য করবে।ডোন্ট চুজ রং পারসোন, ইউ হ্যাভ দ্য ফ্রিডম। জাস্ট চুজ ওয়াইজলি। ওকে?

মোনা হাসলো। লাস্ট ওয়ার্ড “জাস্ট চুজ ওয়াইজলি” বলেই বাবা একবাক্যে বাজিমাত করে দিলো। মোনা গলা অবধি সাজিয়ে আনা কথা গিলে ফেললো। প্রয়োজন পড়বেনা আর আগানোর। ‘মোনা চুজ ইডিয়টলি’। বাবা কখনই এমন সম্পর্ক মেনে নেবে না। কেনোই বা নেমে। এখন মোনা বাইশে পা দিয়েছে , মানুষটার কত হবে? কাকে মন দিয়ে বসলো মোনা! যার বিন্দু মাত্র পরোয়া নেই। বাবা ঠিক বলেছে, নিজের খুশিকে প্রাধান্য দিতে হবে। ওই মানুষটা বরাবর মোনাকে অপমান,অপদস্ত করেছে। তামান্নার বিয়ের দিনের পর শাড়ি পরা যে ছেড়ে দিয়েছে মোনা সেই খবর কেউ জানেনা। ভাবনা দেশে তলিয়ে যেতেই ঘুমে আচ্ছন্ন হয় কিশোরী। মিনহাজ হাতের ফোনটা নিয়ে নয়নকে কল দিয়ে জানান দিলো কামরায় আসতে। মোনাকে সযতনে শুইয়ে দিয়ে দরজা খুলে দিলো। নয়ন আসার পর নয়নের সাথে আলোচনায় বসেছে।

– নয়ন আমার সন্দেহ কি বেড়েই চলেছে মেয়ের উপর?
– কি হয়েছে?
– ভুল পথে পা বাড়ায় নি তো?
– অহেতুক ভাবনা তোমার।
– এত পরিবর্তন আমি বিগত এত বছরে দেখিনি। এই চার বছরে যা হয়েছে। এত শান্ত মোনা তো ঝড়ের আভাস দিচ্ছে।
– অযথা চিন্তা করোনা, অসুস্থ হয়ে পড়বে।বয়সের সাথে একটা মানসিক পরিবর্তন আসে। তাই আসছে মোনার মাঝে।
– তাই যেন হয়।
নয়ন বেরিয়ে নিজের কামরায় এসেই চিন্তায় পড়ে গেলো। মোনাকে ভীষণ কড়া করে বোঝাতে হবে। এতদিন ভেবেছে যা ঘটছে আড়ালেই আছে, আজ মিনহাজের নজরে আসাটা ভয়ংকর কিছুর পূর্বাভাস।

সাতটায় নাস্তার পর্ব শেষ। রিসোর্টের অন্য পাশটা ঘুরে দেখছে মোনা। পাখির কিচিরমিচির, ভেজা মাটির গন্ধ। সারা রাত ঝুপ ঝাপ বৃষ্টি ছিলো। ছোট্ট একটা কৃত্রিম লেক রেখেছে এখানে। দোল খেলছে বাতাস। কাশফুল ছেয়ে গিয়েছে জঙ্গলের মতো সংরক্ষিত জায়গাটি তে। বেড়াতে আসা লোকজন ছবি তুলতে ব্যস্ত। বাবা এবং মামার কাজ শেষ করে ঘুরতে যাবে পদ্ম-শাপলা রিসোর্টে। তাই আজ মন ফুরফুরে। বান্ধবীদের কাছে প্রায় শুনে পদ্মবিলের গল্প। সিলেটে যখন গিয়েছিলো সেই মৌসুমে শাপলা ছিলোনা। মন খারাপ নিয়ে ফিরে এসেছিলো। তবে এখন শাপলা আছে বিলে, মামা জানালো।
নয়ন রুমে এনে মোনার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে বললো,
– মামা, আমরা একটু পর রিসোর্ট ছেড়ে দিবো তৈরি হয়ে নাও। তোমার পছন্দের জায়গায় যাবো।
মোনা ব্যাগ খুলে দেখে জামদানী শাড়ি, যার রঙ মেজেন্টা এবং সোনালী কম্বিনেশন। এ যেন সদ্য ফোটা শাপলা। মোনা আশ্চর্য। এই শাড়ি কোথায় থেকে পেলো? মামার দিকে কৌতুহলী চোখে তাকাতেই নয়ন হেসে বললো,
– ফেসবুকে ঢুকলেই এই শাপলা বিলের ছবি। তাই ভাবলাম আমাদের শাহজাদী যেহেতু যাচ্ছে তাকে নিয়ে এবার আমরা ছবি উঠাবো। তোমার মামীর জন্য ও কিনেছি। কালই এক ফাঁকে ঢুঁ মে*রে নিয়ে আসলাম।দেরী হয়ে যাচ্ছে, মা। বাবা পরে বকা দিবে।
– কিন্তু মামা, আমি তো শাড়ি পরিনা অনেক দিন।
– তাতে কি আজ পরো।

মামার মুখের দিকে তাকিয়ে না বলাটা মুশকিল। ব্লাউজ নেই। রিসোর্টের শপ থেকে কোনো মতো ম্যাচিং হবে একটা ব্লাউজ চড়াও দামে কিনে নিয়ে আসলো বাবাকে বলে। শাড়ি হাতে নিয়েই কামরায় এসে তৈরি হওয়া শুরু করলো। চয়ন ভার্সিটির নবীন বরনে শাড়ি পরতে জোর করেছিলো বেশ কয়বার। বার বার নাকোচের পরে মেয়েটা রাগ করে নিজেই পরেনি আর। হালকা প্রসাধনীতে নিজেকে সাজিয়ে নিলো। শাড়ির সাথে মানানসই তেমন গয়না নেই। তবে স্কার্ট এর সাথে পরার জন্য পার্লের মালা, কানে ছোট দুল আর এক জোড়া এন্টিক বালা এনেছিলো। সব কিছু সেট করে চুলে বিনুনী করলো। মোনার ঢেউ খেলানো চুলের বিনুনীতে যেন অপ্সরী লাগছে। রিসোর্টের পাঁচ ফিট মিররে নিজের কয়েকটা ছবি তুলবে বাবার কাছ থেকে ফোন চেয়ে। মিনহাজ রুমে এসে মেয়েকে দেখে মিষ্টি হাসলো। বাবাকে জড়িয়ে ধরতেই মেয়ের কপালে স্নেহময় আদর করে বললো,

– বাহ! মা শা আল্লাহ। আমার মা টাকে তো বেশ লাগছে। মাঝে মাঝে তো সাজতে পারেন আম্মা।
– এমন নতুন শাড়ি কিনে দিলে সাজতে আমার আপত্তি নেই।
– ইশ! বাবাকে গরীব বানানোর পায়তারা চলছে।
– দশটা নয়, পাঁচটা নয় মিনহাজ ইকবালের একমাত্র রূপবতী কন্যা মোনাশা ইকবাল, শাড়ি কি তার প্রাপ্য নয়?
– আলবত! হুকুম শিরধার্য রাজকুমারী।
বাবা মেয়ে হেসে দিলো খুনশুটিতে। বাবার আইফোনে বেশ কিছু ছবি তুললো। মিনহাজ তৈরি ছিলো। কিছু জিনিস নিতে এসেছিলো। মোনা আয়নায় দাঁড়িয়ে ছবি তোলা শেষ করে চয়নের জন্য আরেকটা ছবি উঠালো। যেই দাগটা কাউকে দেখাতে চায়নি। চয়ন সেদিন শাড়ি না পরাতে রাগ করে আর শাড়ি পরবে না বলেছে মোনাকে। শাড়ির আঁচল টা তুলে পেটের বাম পাশে কাটা দাগের অল্প একটু দেখিয়ে শাড়ি পরা স্পষ্ট ছবি তুললো। এ যেন চাঁদের গায়ে দাগ । সবকটা ছবি সিলেক্ট করে পাঠিয়ে দিলো চয়নের নাম্বারে। শেষ ছবিটাতে লিখেছিলো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৬

– এ জন্যই শাড়ি পরা বন্ধ করেছিলাম চয়ন। যতবার শাড়ি পরতে যাই এই দাগটা চোখে পরে। কপালের দাগটা কম বোঝা যায়। নির্দাগ পেটে সিলের মতো সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এই চিহ্ন। পুরোটা দেখালে ভয় পাবি। আমি দেখতেও চাইনা, দেখাতেও চাই না এই চিহ্ন কাউকে। আমার ভীষণ কষ্ট হয় যখন আয়না দেখি। এবার নিশ্চয়ই আর রাগ করে থাকবি না।
মেসেজ যে ভুল নাম্বারে চলে গিয়েছে তা হয়তো কিশোরী নিজেই বুঝতে পারেনি। ফোনটা বাবার ছিলো। পরপর দুবার ক্লিক করতেই উপর নিচ দুইটা নাম্বারে ছবি সেন্ড হয়ে গিয়েছে

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৮