প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৮
নীতি জাহিদ
পদ্ম-শাপলা রিসোর্ট। জিন্দা পার্ক পেরিয়ে প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে এই রিসোর্ট। গাড়ি নিয়ে গেলে ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। জিন্দা পার্কের পার্কিং লটে গাড়ি রেখে অটো নিয়ে রওয়ানা হলো রিসোর্টের পথে। প্রবেশ টিকিট জন প্রতি ভাড়া পঞ্চাশ টাকা। ঢুকতেই একটা কাঠের সেতু। প্রথমে মোনা ভয় পেলেও বাবার হাত ধরে সামনে আগায়। ঘড়িতে সকাল নয়টা। এখনো শাপলা পদ্ম ফুটে আছে। দশটা নাগাদ ফুটে থাকবে। চারদিকে ফুলের সমারোহে মন আনন্দে নেচে উঠে। সেতু ছেড়ে উঠলো রিসোর্টে। রিসোর্ট বলতে হাজার বিঘার এই বিল। কুড়িল বিশ্ব রোড থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ। চারদিকে পানি মাঝখানে সমতল মাটি ছোট্ট দ্বীপের মতো। সেখানে কিছু গাছ আছে, কুঁড়ে ঘর আছে, দোলনা আছে, একটা টি স্টল আছে। লোকে – লোকারন্য। গোলাপী পদ্ম- লাল শাপলায় চারদিকে মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
মোনা ছুটে গিয়ে দোলনায় বসলো। মিনহাজ ফোন বের করে ছবি তুলতে যাবে নয়ন তখন হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে বললো,
– ভাই তুমি বসে খাও, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।
মিনহাজ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হেসে বলে,
– চা কখন অর্ডার দিলি?
– এসেই দিলাম। এখানকার চা মজা, খাও খাও।
মিনহাজ থেকে ফোন নিয়ে দম ফেললো। রিসোর্ট থেকে এখানে আসা অবধি শ্বাস হাতে নিয়ে এসেছে মনে হলো। এত চাপ এর আগে কখনো নিয়েছে বলে মনে হয় না। একটা ফোন কি পরিমান দুশ্চিন্তা দিতে পারে আজকের পরিস্থিতিতে না পড়লে বুঝার কোনো উপায় ছিলোনা। এখনো বুক ধুকপুক করছে। প্রথমে এক পাশে এসে নিজেকে স্বাভাবিক করে মোনার কয়েকটা সুন্দর ছবি তুলে দিলো। এরপর আসল কাজটা সেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সব কটা ছবি ডিলিট করেছে।
তিনজন নৌকায় চড়লো। মোনা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। গুনগুনিয়ে গান গাইছে। শাপলা তুলছে। দর্শনার্থীরা এগিয়ে এসে নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করছে। মিনহাজকে একজন প্রৌড়া প্রশ্ন করে বসলেন,
– সম্পর্কে আপনার কি হয় এই মেয়ে?
নয়ন মিনহাজের মুখের উত্তর কেড়ে নিয়ে বলে,
– আন্টি মেয়ে পছন্দ হয়েছে?
কথার মাঝে প্রৌড়া রাগান্বিত গলায় বললো,
– আমাকে আপনার আন্টি লাগছে? একদম আন্টি ডাকবেন না। আমার বয়স আর আপনার বয়স তো একই।
মোনা ফিক করে হেসে দিলো। নয়ন কটমট করে তাকালো। মহিলা পুনরায় নয়নকে প্রশ্ন করলো,
– আপনার বয়স কত?
নয়ন মহিলাকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বললো,
– আজ্ঞে মাত্র তিরিশ।
– মনে তো হয় পঞ্চাশ।
– আর আপনাকে তো সত্তর লাগে।
– অবান্তর কথা বলবেন না।
মিনহাজকে দেখিয়ে বললো,
– উলটা এই ভাইসাবকে মনে হয় পঁয়ত্রিশ।
কথার পিঠে কথা বেড়েই চলেছে। মিনহাজ চোখ পাকিয়ে দেখালেও দমেনি নয়ন। মোনা উচ্চ শব্দে হাসছে। প্রৌড়া মোনার হাসিতে ঝগড়া থামিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললো,
– মা তোমার হাসি ভারী মিষ্টি। এমন একটা মেয়ে খুঁজছিলাম ছেলের জন্য।
মোনার গাল ধরে আদর করে কাছে টেনে বললো,
– আদর করবো অনেক, হবে ছেলের বউ?
মিনহাজ মেয়েকে ছাড়িয়ে বললো,
– খুবই দুঃখিত আপা, আমার একটাই মাত্র মেয়ে। এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিব না।
– আপনার মেয়ে?
– জ্বি।
– বুঝাই যায় না।
নয়ন মুখ বেকিয়ে বলে,
– বুঝা গেলেই কি? ভাগ্নী তো দিবোনা আপনার ছেলেকে। এত খুশি হবেন না। আসছে আমাকে অপমান করতে? হুহ। আয় তো মা। মামার সাথে ওদিকে চল। বাঁশ তলায় যাবো। কিছু বাঁশ সাথে রাখতে হবে। আকস্মিক আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। যেন কেউ ওলট পালট কিছু বললেই পটাশ করে একটা বাড়ি দিয়ে স্মৃতি শক্তি নাই করে দিতে পারি।
মহিলা চরম অবাক হলো হেনো কথায়। কিভাবে অপমান করলো! মোনাকে টানতে টানতে রিসোর্টের বাঁশ বাগানের কাছে নিয়ে গেলো। সেখানে বাঁশ ঝাড়ের সাথে মানুষজন ছবি তুলছে। এদিকে মিনহাজ মহিলাকে বিনয়ী হয়ে বললো,
– কিছু মনে করবেন না, আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ওর মামা মানে আমার শ্যালক একটু রসিক প্রকৃতির।
মহিলা চলে যেতেই মিনহাজ নিজেও হাসছে কিছুক্ষন আগের কর্মকান্ডে। নয়নকে দিয়ে সব সম্ভব। বাঁশ ঝাড়ে এসে মোনাকে বললো,
– দেখলে আম্মা কত্ত ফাজিল মহিলা। কিভাবে আমাকে অপমান করলো? আমাকে নাকি পঞ্চাশ লাগে।
– তুমি আন্টি ডাকলে কেনো?
– তাই বলে পঞ্চাশ বলবে?
মামার কথার মজা উড়িয়ে মোনা মেকি মন খারাপের স্বরে বললো,
– ঠিক, মহিলা অনেক খারাপ, মুখের উপর সত্যি বলা একদম উচিত হয় নি। ভদ্রতাও জানে না।
– একদম ঠিক এদের বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ধাওয়া করা দরকার। আর এই পাগল ছোকরা গুলো বাঁশঝাড়ে কিসের ছবি তুলছে? বাঁশ ঝাড় কি ছবি তোলার জন্য। এখানে মানুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে আসবে তা না…
আরো কিছু কথা বলতে যেয়ে নয়ন মস্তিষ্ক কাজে লাগালো। ভাগ্নী কি বললো আর সে কি উত্তর দিলো? ভাগ্নীর ভাষ্যমতে মহিলা সত্যি বলেছে? নয়ন মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
– মোনা আম্মা কী বলেছো? আমার পঞ্চাশ??
মোনা হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাওয়ার মতো অবস্থা। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে পুরোনো বাঁশের শেকড়েই বসে পড়েছে। এদিকে নয়ন গাল ফুলিয়ে অভিমান করেছে। নয়নের ফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করেই অনর্গল বলতে শুর করলো,
– কেনো ফোন দিয়েছিস? আমার মজা নিতে? আমি যদি পঞ্চাশ হই তুই কি হ্যাঁ? তোর বাচ্চা প্রেমিকাও আমাকে পঁচায়? তোর প্রেমে যদি সতেরো /আঠারো বছরের কিশোরী পড়তে পারে আমাকে ওই বুড়ি কোন সাহসে পঞ্চাশ বললো?
মোনা স্তব্ধ। কাকে বলছে নয়ন এসব? মোনা কিছুটা এগিয়ে এসে আগের মত হাসতে হাসতে বলে,
– এ্যাই মামা পাগল হলে, কাকে বলছো এসব? ফোনের ও পাশের মানুষটা কি করে জানবে ওই মহিলা তোমাকে পঞ্চাশের বুড়ো বলেছে?
সেই মুহুর্তে ও পাশ থেকে ভেসে এলো ভার গলার স্বর,
– কয় বোতল গিলেছিস? উন্মাদের মতো আচরণ করছিস কেনো? কাজ হয়েছে?
যে কটা কদম এগিয়ে এসেছিলো ঠিক গুনে গুনে ততগুলো কদম পেঁছালো। মনের ব্যাকুলতা দমানোর আপ্রান চেষ্টা। পারছে না তো! অতিশয় শান্ত, অনুর্বর নদীর মতো পরিশ্রান্ত হয়ে ধপ করে গাছের গুড়ির উপর বসে পড়লো। এই স্বর আর শুনতে চায় না। বিচিত্র মানব মনকে দমানোর কি কোনো উপায় নেই! তাই বুঝি ম্যাকডোনাল্ড বলেছিলেন- ”মনের উপর কারও হাত নেই। মনের উপর জোর খাটানোর চেষ্টা করা বৃথা।” মনের সাথে যুদ্ধ করে যতটুকু ভুলতে চেয়েছে, বলিষ্ঠ স্বর আবার মনে করিয়ে দিয়েছে সকল অতীত। একটাই প্রার্থনা সৃষ্টিকর্তার নিকট মোনা যেন সেই সুযোগ না পায়, মানুষটার ঘৃন্য, অপদস্থ, অবহেলা সম্পন্ন দৃষ্টির সম্মুখস্থ হওয়ার। সেদিন হয়তো ভেতরটা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে।
সম্বিত পেয়ে নয়ন বুঝে নিয়েছে বড্ড ভুল করে ফেলেছে। হালকা স্বরে উত্তর দিলো,
– হয়েছে।
তিনজন নিশ্চুপ। মিনহাজ দূর থেকে ডাকছে। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। নয়ন মোনার পাশে এসে বসলো। শরীর কাঁপছে মেয়েটার। নয়ন হাত ধরতেই আঁৎকে উঠলো। মামার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মামা আমি চেষ্টা করছি। পারবো আমি।
মোনার হাতের কম্পন যেন নয়নের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এও কি সম্ভব! মোনাকে আশ্বাস দিলেও নিজের মাঝে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দূর্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে আফসোস থেকে, কি হতো যদি মোনাটা আরো একটু বড় হতো! কি হতো ইমরান যদি মোনাকে নিয়ে ভাবতো! সব আকাশ কুসুম কল্পনা। কিছুই সম্ভব নয়। অবশ্য দোষ তারই, ইমরানের নয়।
মোনাকে এই অবস্থায় দেখে মিনহাজ ছুটে এলো। নয়ন মোনাকে আকড়ে ধরেছে। কিছুতেই শান্ত হচ্ছেনা মেয়েটা। আকস্মিকতায় হয়তো অন্তরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসেছে। মেয়েকে প্রশ্ন করতেই উত্তর দিতে পারছেনা। নয়নকে প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে মেয়েটার?
– ভাই আচমকা এখানে এসে বসে পড়েছে।
মোনা জোরে শ্বাস টেনে বলছে,
– বাবা বাড়ি চলো, আমার দম আটকে আসছে।
– কোথায় কষ্ট হচ্ছে মা, বাবাকে বল। বাবার কষ্ট হচ্ছে তো।
– বাড়ি যাব বাবা। আমার মাথা ব্যাথা করছে। শ্বাস আটকে যাচ্ছে।
আঘাতের দাগটা দেখিয়ে বুঝালো মাথার ব্যাথা বেড়েছে। বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে বেরিয়ে এলো রিসোর্ট ছেড়ে। গাড়িতে উঠে সারা রাস্তা ছটফট করেছে। মিনহাজ মেয়েকে বাড়িতে না এনে সোজা হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। নয়ন না পারছে বোঝাতে না পারছে বলতে, তোমার মেয়ের কষ্ট মাথায় না হৃদয়ে। যার চিকিৎসা জগৎ জাহান খুঁজেও পাবেনা। যেখানে এই চিকিৎসা আছে সেখান অবধি পৌঁছানো এখন সাধ্য সাকুল্যের বাইরে। নয়নের প্রার্থনা,
– হে অন্তর্যামী অন্তরের খবর তুমি জানো, মেয়েটার সকল মুশকিল আহছান করো। এভাবে যে আমারই কষ্ট হচ্ছে।
বাবার আনচান চোখ দেখে মোনার শ্বাস ফেলতে সমস্যা হচ্ছে। এর মাঝে মোনার ডাক্তার সাজেস্ট করেছে সিটিস্ক্যান করানোর জন্য। ব্রেইনে আঘাত লাগলো কিনা? আজ প্রায় বছর চারেক হলো এক্সিডেন্টের ব্যাথা এখনো কমেনি। চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিনহাজের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
– এভাবে অস্থির হয়ে গেলে তো অসুস্থ হয়ে পড়বে ভাই। আমি আছি তো । বসো শান্ত হয়ে দেখছি আমি।
মিনহাজ বাইরে শান্ত হয়ে বসেছে। ডাক্তারের চেম্বারে মোনা। নয়ন ভেতরে এলো অনুমতি নিয়ে। মোনাকে চেক আপ করছিলো ডাক্তার। ডাক্তারের সামনেই মোনাকে প্রশ্ন করলো,
– মা ব্যাথা কি সাধারণ তোমার মাইগ্রেনের ব্যাথা নাকি অন্যরকম। বাইরে বাবা চিন্তায় পড়ে গিয়েছে সিটিস্ক্যানের কথা শুনে।
নয়নকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমানিত করে চেম্বারের বেডেই মোনা জ্ঞান হারালো। ডাক্তার এবং নয়ন দুজনই ঘাবড়ে গিয়েছে। নার্স এসে স্ট্রেচারে করে মিনহাজের সামনে জ্ঞানহীন মেয়েকে নিয়ে বের হতে দেখেই মিনহাজ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভার ছেড়ে দিলো। ডাক্তার দেওয়ান এবং নয়ন দুজনই মিনহাজকে ধরে বসালো।
সিটিস্ক্যান শেষ। মোনার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষন আগে। প্রস্তরখন্ডের মতো নিশ্চল। বাসায় ফিরে নিজেকে চার দেয়ালের কামরায় আবদ্ধ করেছে।
মোনার রিপোর্টে গুরুতর কিছু ধরা পরেনি। কোনো কারণে খুব বেশি স্ট্রেস নেয়ার জন্য এমনটা হয়েছে বলে ডাক্তারদের ধারনা। সিদ্ধান্থীনতায় ভোগার তুল্য কিছু হতেই পারেনা। বাসায় ফিরেছে দীর্ঘ এক ঘন্টা। একই চেয়ারে,একই জায়গায় বসে আছে। মাথার মাঝে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা কি করা উচিত? কার সাহায্য চাইবে? কে ভালো পরামর্শ দিবে!
– কফি নাও। তোমার পছন্দের এসপ্রেসো।
কপাল থেকে হাত সরিয়ে কফি হাতে নিয়ে স্ত্রীকে বললো,
– একটু বসো। কথা আছে।
হাতের মগে ফুঁ দিতে দিতে বসলো রিক্তা। বাসায় ঢুকার সময় বুঝতে পেরেছে বেশ চিন্তিত ছিলো। ফার্মের ডিজাইন সময় কাঁটা গড়ানোর আগেই সাবমিট করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই কফি হাতে চলে এলো স্বামীকে মানাতে দেরী করার জন্য। মাফ চাওয়াটাও যৌক্তিক।
– স্যরি। ডিজাইন টা সাবমিট করছিলাম তাই…
– আমি জানি। নাহিয়া বলেছে। আমি চিন্তিত রিক্তা।
– তা তো দেখেই ঠাহর করছি। কি নিয়ে?
– এতক্ষন হসপিটালে ছিলাম মোনাকে নিয়ে। সিটিস্ক্যান করাতে হয়েছে মেয়েটার।
রিক্তা চমকে উঠে বললো,
– তোমরা না রিসোর্টে ছিলে। হসপিটালে কেনো? মোনা কেমন আছে? আমি যাবো।
– আহহা! উত্তেজিত হয়ো না বসো। কথা শুনো।
– বলো।
– ইমরানকে আসতে বলি? মোনার মানসিক কন্ডিশনের অবনতি হচ্ছে রিক্তা। ইমরান ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছেনা।
ক্ষিপ্ত হলো রিক্তা,
– মাথা ঠিক আছে তো তোমার? স্বাভাবিক আছো? ইমরান ভাই আসলে কি হবে শুনি? নয়ন ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, মোনা পছন্দ করে, ইমরান ভাই নয়। বুঝতে চাইছো না কেনো?
– মোনার কন্ডিশন জানাই।
– জানালে কি? উনি পাগল হয়ে ছুটে আসবে? পছন্দ করা শুরু করবে? তুমি কি শিশু হয়ে গেলে নয়ন? মোনার মত আচরন করছো? উনি ইমরান ভাই , বাচ্চা নয়, টিনেজ ফিলিংস নয়। বুঝতে চাইছোনা কেনো? উনি কনশাস একজন ব্যক্তি। তার উপর অহেতুক মোনার ফ্যান্টাসি চাপিয়ে দিয়ে মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করোনা। দেখা যাবে ভাইয়া রেগে গিয়ে দুটো কথা শুনিয়ে দিবে। ছোট্ট মনটা ওভার রিয়েক্ট করে ভুলভাল কিছু করে বসবে। মিনহাজ ভাই পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাবে। বুদ্ধি খাটাও। কলেজের গন্ডি পেরিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটো বছর প্রায় শেষ। দেখবে ঠিক হয়ে যাবে। এই সময়টাই ম্যাচিউর হওয়ার প্রকৃত সময়।
কফির শেষ চুমুক দিয়ে নয়ন প্রশ্ন করলো,
– তুমি নিশ্চিত?
– আমি কি জ্যোতিষী?
– না মানে নিজেকে আশ্বস্ত করছি।
– তোমার কথায় হেয়ালী টের পাচ্ছি।
– কেনো?
– কি হয়েছে বলো তো।
– যা বলবো শুনলে চমকে উঠবে।
– কি?
– শুধু এতটুকু জেনে রাখো ইমরান গত কয়েক মাস আগে মাইল্ড স্ট্রোক করেছে।
– ইন্না-লিল্লাহ কি বলছো?
– হুম।
– তুমি আর মিনহাজ ভাই কি এই কারণে ইতালী গিয়েছিলে?
– হ্যাঁ।
– আগে বলোনি কেনো?
– কেউ জানেনি। বুঝোই তো আপা আর ইশান জানলে কি হবে?
– তাহলে কিছুই বলোনা ভাইকে।
– হুম
– এই অবস্থায় আবার একা ফেলে এলে কিভাবে?
– ওখানে সজীব আছে। দেখে রাখবে ইনশাআল্লাহ।
নয়ন এর বেশি আর কিছু আপাতত স্ত্রীকে জানাতে চায়নি। রিক্তা উঠে চলে যাবে এমন সময় দরজা পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে এসে বললো,
– একটা কথা?
– কি?
– মিসেস বোস এর সাথে আজ দেখা হলো। সে জানালো কাকন নাকি কেইস ফাইল করেছে?
– কোন বোস? ব্যারিস্টার অনিরুদ্ধ বোস, তার স্ত্রী?
– হ্যাঁ। আমাদের ফার্মে ইন্টার্ন করছে। চিনি মেয়েটাকে ভালোই। একদিন মি. বোস এসেছিলো আমার সাথে তখন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। সেই থেকে আমাকে চেনে। আমাকে মেয়েটা জানালো কাকনের ব্যাপারটা।
– কিসের জন্য করছে কেইস ফাইল?
– ডিভোর্স।
– ইমরানের সাথে তো সেই কবে হয়েছে।
– আরেহ জারিফের সাথে। আর ইশানের নাকি কাস্টডি চাইছে। ভাইয়া নাকি ইশানের ঠিক মতো কেয়ার করেনা। রেখে ইতালী চলে যায়।
– আল্লাহ কি বলছো? ইমরান জানতে পারলে তুলকালাম হয়ে যাবে।
– আরো আছে, সে নাকি ইমরান ভাইয়ের লাইফে ব্যাক করতে চাচ্ছে। এবার বুঝো কি করবে? আমাদের মোনাটাও বিপদে পড়বে যদি ওই কাকন জানতে পারে এই ব্যাপারে কিছু। সুতরাং চুপচাপ থাকো।
– বললেই হলো ব্যাক করতে চায়? ডিভোর্সী মহিলা প্রাক্তন স্বামীর কাছে ফিরবে। ছ্যাহ! এর লজ্জা নেই।
– লজ্জা থাকলে কি আর এর অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল হয়। দোয়া করি ইমরান ভাইয়ের উপর যেন কোনো কিছুর প্রভাব না পড়ে।
নয়ন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে এক আকাশ পরিমাণ হতাশা। বন্ধুর জীবনটা কি আর শান্তি পাবেনা। এই একটি মহিলা তছনছ করে দিলো মানুষটাকে। আবার আসবে জীবনে? ইশানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আসছে। যে করেই হোক ছেলেটাকে নিরাপদে রাখতে হবে। একদিকে বন্ধু অন্যদিকে ভাগ্নী।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছে জীবনটা কি এভাবেই যাবে তবে! আজ অসুস্থ হলো, বাবার মাথায় চিন্তা এলো। মামা সব জেনেও বিপদে আছে। সারাক্ষন দুশ্চিন্তার মাঝে কাটায়।
সেদিন ছাদ থেকে নেমে মোনাকে গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলো ইমরান। বেশ কিছুক্ষন চুপ ছিলো দুজনই। বাইরে বজ্রপাত, বৃষ্টির তান্ডব। এর মাঝে গাড়ি চালানো মুশকিল। এক পাশে গাড়িটা দাঁড় করালেই পারে। কিসের এত তাড়া! মোনা হাত ঘড়ি চেক করে দেখে ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। এতটা সময় কি করে পার হলো! খুব জোরে বজ্রপাত হওয়াতে গাড়ি একপাশে দাঁড় করালো এবার। এই ঝড়ে এখন গাড়ি চালানো মুশকিল। নিরবতা ভেঙে বলে উঠলো,
– মোনালিসা।
– জ্বি।
– তুমি খুব ভালো অন্যরকম একজন। ধারণা অনুযায়ী সবই বুঝো তবে কেনো এইক্ষেত্রে অবুঝ হয়ে যাও? এত বুঝাচ্ছি তবুও কেনো বিপদে ঝুঁকছো?
হাত কচলাতে কচলাতে মোনা বলে উঠলো,
– আমি জানিনা, আমার আপনাকেই ভালো লাগে। আপনি সামনে আসলে আমার মনে হয় সব কিছু ঝাপসা। আমি জীবনে প্রথম কোনো পুরুষকে এত গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছি।
– ইনফ্যাচুয়েশন বুঝো?
– আপনি আমার ইনফ্যাচুয়েশন না, আমার ইমোশন। আচ্ছা ইমরান সাহেব কখনোই কি সম্ভব নয় আমার- আপনার সম্পর্ক?
শান্ত চাহনী ইমরানের। কি অবলীলায় বলে ফেললো এই মেয়ে! কোনো জড়তা নেই মুখে। মোনার বয়সটা অনেক সাহসের। অথচ ইমরান যা খুশি তা বলতে পারেনা। কারণ তাকে ভাবতে হয় সমাজ নিয়ে, ছেলে নিয়ে, দীর্ঘ দিনের গড়ে উঠা সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে। ফোনের আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো ইমরানের। পকেট ফোন বের করতেই ও পাশ থেকে প্রশ্ন এলো,
– মোনা তোর সাথে?
নয়নের প্রশ্নে কিছুটা সাবধান হলো। মোনার দিকে তাকিয়ে দেখলো বাইরে গ্লাসে তাকিয়ে আছে। নির্লিপ্ত উত্তর দিলো,
– হুম।
নয়নের স্বর গম্ভীর। বলে উঠলো,
– বাসায় পৌঁছে দে। ভাই খুঁজছে। চয়নকে ফোন দিয়েছে। ওই মেয়ে কতক্ষন মিথ্যা বলবে? ভাগ্যিস আমি ফোন দিয়ে সাবধান করে দিয়েছিলাম। আমাকে রবিন না বললে তো বুঝতেই পারতাম না। কপাল করে রবিনকে পেয়েছিস। ভাই যেভাবে চিন্তায় ছিলো আরেকটু হলে থানা পুলিশ করতো।
– রবিন তোকে কেনো বললো?
– তুমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলো। আমি আর রবিন না। রবিন জানে আমি সব জানি।
ইমরান ঠোঁট কামড়ে বললো,
– ঠিক আছে, নামিয়ে দিয়ে কল করছি।
ইমরান দু আঙুলে কপাল ঘষে স্টিয়ারিং এ হাত দিলো। গাড়ি চলছে। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কে ফোন দিয়েছে?
স্বর গম্ভীর,
– কেউ না।
গাড়ি বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে দাঁড় করিয়েছে। বৃষ্টি নেই। মোনাকে নামতে বললো। হঠাৎ থামিয়ে বললো,
– আমার ভাগের সবটুকু সুখ যেন তোমার হয়। একদিন তুমি সব পাবে। শুধু মন বদলে নাও। ইমরান কখনো তোমার ছিলোনা মোনালিসা। তুমি সব পেয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ যা তোমার ভাগ্যে আছে। উপর ওয়ালা কাউকে নিরাশ করেন না। ভুলে যাও সব, এতেই তোমার মঙ্গল।
মোনা কিঞ্চিৎ হেসে বলে,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৭
– আমার ভাগ্যে ইমরান শরীফ থাকলেই চলবে। মন তো বদলে নিয়েছে সেই ছোট্ট বয়সে। যাকে খুঁজেছি তাকে সঠিক সময়ে পেয়ে গিয়েছি। শুধু মানুষটা বুঝতে পারছেনা। আসি। ভালো থাকবেন।
নেমে গেলো মোনা। মোনার যাওয়ার পথে পথ চেয়ে ছিলো বেশ কিছুক্ষন। এরপর গাড়ি ঘুরিয়ে আপন গন্তব্যে।
