প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৯
নীতি জাহিদ
ডল হাউজের বল গুলো নিয়ে খেলতে ব্যস্ত পুচকে নাহিয়া। নেচে নেচে কথা বলে। প্রথম শ্রেনীতে পড়ছে। মামী বিকেলের নাস্তা বানিয়ে দিয়েছে। মোনা আসবে শুনে রিক্তা অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। সাজানো গুছানো পরিপাটি এই বাড়ি। নানা নানী মারা যাবার পর রিক্তাই সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছে। আপন বলতে শ্বশুর বাড়ির লোকদের মধ্যে আছেই মোনা। আদরে মুড়িয়ে রাখে ভাগ্নীকে। আসার সময় মোনার প্রিয় খাবার গুলো কিনে এনেছে। আজ রাতটা মোনা এখানে থাকার পরিকল্পনা করেছে। দুপুরের খাবারের মেন্যুতে ছিলো মোনার প্রিয় মোরগ পোলাও, রূপচাঁদা মাছ, চিংড়ির মালাইকারী। মামীর হাতের মোরগ পোলাও এর জুড়ি নেই। অনেক দিন পর তৃপ্তি নিয়ে মোনা খেলো। মামীর সাথে খাবার নিয়ে গল্পের মাঝে বললো,
– মামী আমাকে শিখিয়ে দিও তো মোরগ পোলাও রান্না।
– এত তাড়াতাড়ি শিখে কি করবি শুনি?
– বিয়ে হলে তোমাদের জামাইকে খাওয়াবো।
রিক্তা সজোরে হাসলো। গাল টেনে বললো,
– ওরে পাকা মেয়ে, আমাদের না খাইয়ে জামাইকে খাওয়ানোর চিন্তা। আগে কথা দে আমাকে খাওয়াবি। তাহলে শেখাতে পারি।
– ওকে খাওয়াবো।
– প্রমিজ?
– আহ মামী। প্রমিজ খাওয়াবো বললাম তো।
কলিংবেল বাজতেই নাহিয়া ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। বাবার ঘাড়ে চড়ে বসলো। নয়ন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
– কি ব্যাপার বাসায় নাকি আজ মেহমান এসেছে?
মোনা উঠে এসে মামাকে জড়িয়ে ধরলো। রিক্তা ছুটে এসে বললো,
– এভাবে থাকো একটা ছবি তুলি। কাঁধে এক মেয়ে। বুকে এক মেয়ে। আহা! কি সুন্দর লাগছে। তোমাকে একটা গাছ মনে হচ্ছে।
ছবি তোলা শেষে নয়ন সোফায় বসে বললো,
– দেখলি তো খোঁচা দিতে তোর মামী ভুলে না। আমি নাকি গাছ?
মোনা মামার পাশে বললো,
– গাছই তো, বট গাছ। সবাইকে ছায়া দিয়ে রক্ষা করো। কজনের এমন বটগাছ আছে?
রিক্তা আর নয়ন দুজনই হেসে উঠলো। এই মেয়েটাকে কি করে ভালো না বেসে থাকা যায়? দুষ্টুমিতে সেরা হলেও অনেক বুঝদার।
মোনা হঠাৎ উৎসুক হয়ে বলে উঠলো,
– মামা জানো কি হয়েছে?
নয়ন-রিক্তা নড়ে চড়ে বসলো। মোনা দু হাত নেড়ে নেড়ে বলে,
– আজ আবার ওই জাবেদের সাথে দেখা রাস্তায়। বেচারার মুখটা শুকনো। আমাকে দেখে নাকে কাঁদছে। সাথে ছিলো দাদী। সুপার শপে গিয়েছিলাম দাদীর সাথে। সামনে এগিয়ে এসে আমার সাথে কথা বলতে চাইলো পেছনে দাদীকে দেখে উলটো দৌঁড় দিয়েছে। ঘটনা তো এখানে শেষ হয়নি। মাত্র শুরু। কেনাকাটা শেষ করে বাসার দিকে আসার সময় দাদী আমাকে নিয়ে চলে গিয়েছে জাবেদদের বাসায়। আমি তো অবাক। বাসায় গিয়ে সেই হাঁক ডাক। জাবেদের নানী বের হয়ে এসেছে। দুই বুড়ির ঝগড়া যদি দেখতে মামা। আমি হাসিতে গড়াগড়ি খাওয়া বাকি ছিলো।
রিক্তা রীতিমতো হাসছে। কারণ একবার দেখেছে। এদের ঝগড়ার সূত্রপাত হয়েছিলো কচুর তরকারি দিয়ে। জাবেদ দের বাসায় কচুর তরকারি পাঠিয়েছিলো মোনার দাদী। জাবেদের নানা খেয়ে প্রশংসা করেছিলো সেই তরকারির। সেদিন থেকে জাবেদের নানী ক্ষেপে মোনার দাদীকে বলেছে,
– এই নুরজাহান তুমি মোগো বাসায় আর এসব পাডাইবানা।
দাদী তো অবাক হয়ে বললো,
– গলা ধরছিলো কি কচুতে?
– আমি কি রানবার জানিনা? মোর বাসায় অশান্তি লাইজ্ঞা গেছে তোমার লইগ্যা। তাবিজ করবার লাইগ্যা এসব পাডাও।
নুরজাহান বেগম অবাক হয়ে প্রশ্ন করার আগে কাজের মেয়ে সোলেমা হাসতে হাসতে বলে উঠলো,
– ও দাদী নানায় আপনের তরকারি দিয়া ভাত খাইয়া উইঠ্যা গেছে। নানীর তরকার ডি দেইখ্যা কইছে কুত্তারে দিয়া দিতে। নানী তিত করলা আর ধুন্দুল দিয়া মোরগের গোস রানছে। একসের তিতা হইছে তরকারি। খালুজান, খালাম্মা ও খাইতে পারেনাই।
এতটুকু বলেই হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছে সোলেমা। এদিকে জাবেদের নানী আরো ক্ষেপে সোলেমাকে তাদের কাজ থেকে বের করে দিয়েছে। সোলেমা মহা খুশি হয়ে বলে উঠলো,
– আপনের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি দাদী। আল্লাহ বাঁচাইছে। আপনে গো বাসায় কাম কইরা এই অখাদ্য আমারে খাওন লাগে। আপনের তরকারি কুত্তারে দিছিলাম। কুত্তাডিও খায় নাই। মুখ দিছিলো, বাইচ্চা আছে কিনা খোঁজ লাগাইতে হইবে।
এদিকে নুরজাহান বেগম হতভম্ব। সোফায় বসে ছিলো সালমা,রিক্তা। এদের তুমুল ঝগড়া সেদিন থামাতেই তুলকালাম অবস্থা।
ভাবনা থেকে বের হয়ে মোনার কথায় মনোযোগ দিতেই মোনা বললো,
– শোনো না হয়েছে কি আমরা ওই বাসায় গিয়ে দেখী নানী গালে ফেস প্যাক লাগিয়েছে। তাও আবার মসুর ডাল আর আদা। জীবনে শুনছো আদায় মুখের দাগ উঠে! পরে আমি যখন গিয়ে বললাম নানী মুখ জ্বলে যাবে। আমাকে বলে আমি নাকি আমার দাদীর মতো হিংসুক। পুনরায় ঝগড়া। শেষ মেষ দাদী বলে এসেছে জাবেদকে যদি আমাদের আশেপাশে দেখে লাঠি মেরে লুলা বানায় দিবে। আর আজকেই এই কাজটা করছে। এখানে আসার আগে জাবেদ প্যান প্যান করে জালাচ্ছিলো বাসার গেটে দাঁড়িয়ে। দাদী দোতলা থেকে ওকে দেখে দাদাভাইয়ের পুরান জুতা ফিক্কা মা*র*ছে। বেচারা ভয় গেছে। দাদাভাইয়ের জুতা গুলার অনেক ওজন ছিলো মামী। ব্যাথা পাইছে মনে হয়।
নয়ন হাসতে হাসতে চোখের কোণে আসা পানি মুছে বলে,
– খালাম্মা একটা জিনিস। দোতলা থেকে জুতা ফিক্কা মা*রাতে টার্গেট পয়েন্টে লাগছে?
– হ্যাঁ মামা। একদম কোমড় বরাবর পড়ছে। এদিকে মতি চাচা ওই জুতা নিয়ে দাদীর দিকে তাকায় বলে, খালাম্মা জুতাডি তো ভালা, ফালাইলেন ক্যান। তখনো জাবেদ ব্যাথায় কোকড়াতে কোকড়াতে দাঁড়িয়ে ছিলো এরপর দাদী আরেকটা জুতা ফিক্কা মেরে চাচাকে বলে, দুই জোড়াই তুই লইয়া যা আর ওই জালিমের নাতীডারে জুতা দুইটা দিয়া মাথা ফাডায় দেয় যাতে আমার নাতনীরে না জ্বালায়। ততক্ষনে জাবেদ পগার পার।
নয়ন আর রিক্তা হাসিতে লুটপাট। নুরজাহান বেগমের সাথে তার প্রাক্তন বান্ধবী মঞ্জিলা খাতুনের সাপে নেউলে সম্পর্ক। তারই সুদূরপ্রসারী প্রভাব এই ঘটনা গুলা।
সাত পাহাড়ের শহর বা চিরন্তন শহর এই রোম। টাইভার নদীর তীরে অবস্থিত। ঘন বসতি পূর্ণ এই শহরে আনাচে কানাচে রয়েছে ইতিহাস। ইউরোপের প্রাচীনতম নিরবিচ্ছিন্ন মানব বসতি সম্পন্ন শহর এটি। রোম সভ্যতা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা। এই শহরকে কেন্দ্র করে ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতা বিকশিত হয়। কালক্রমে বৃহত্তম প্রাচীন সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। রাতের রোম বেশ সুন্দর। স্নিগ্ধ হাওয়া শরীরকে চাঙ্গা করে। অফিস থেকে ফিরেই হাঁটতে বেরিয়েছে ইমরান। ডাক্তার নিয়ম করে হাঁটতে বলেছে। দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে বলেছে। রোমের রাস্তায় প্রায় বিভিন্ন রকমের কারু কলা দেখতে পাওয়া যায়। এখানকার লোকজনের উপার্জনের এটি একটি অন্যতম মাধ্যম। একেকজন একেকরকম খেলা প্রদর্শন করে, কেউ বা নাচে অথবা গান করে। ফুটপাত ধরে হাঁটতেই চোখে পড়লো একজন মোহনীয় সুরে মাউথ অর্গান বাজাচ্ছে। ইমরান কাছে যেতেই মিষ্টি হাসি দিলো। দেখে মনে হলো বাঙালি। ইমরানের দিকে আরেকটা অর্গান এগিয়ে দিতেই ইমরান হাত নেড়ে না জানাতেই পুনরায় বাজানো শুরু করলো। রাস্তার পাশে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে বইছে নদী। সাত পাহাড়ের রাজ্য থেকে সুন্দর পৃথিবীটাকে আরো বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। দমকা হাওয়া গায়ে লাগলো। কানে এলো বাংলা ভাষায় গাওয়া অতি পরিচিত গান। প্রতিটি বাক্যই অন্তরের গভীর, কঠিন, লুকানো প্রকোষ্ঠে আঘাত হানলো। চোখ বুজে উপলব্ধি করতেই মিলে গেলো নিজের সাথে সেই গানের প্রতিটি চরন।
– ক্ষ্যাপা ছেড়ে গেলে মনের মানুষ
আরতো পাবো না।
আরতো পাবো না না না,যেতে দেব না।
তোমায় হৃদয় মাঝে রাখবো ছেড়ে দেবো না।
বাকি চরনগুলো একবার কানে আসতেই মনকে কঠিন করে সম্মুখ কদম ফেললো। শুনতে চায়না আর একটি চরনও। চিত্তকে বলি দেয়ার মতো গর্হিত কাজ করে ফেলেছে ইমরান। কেনো ভুল গুলো পুনরাবৃত্তি হতে চায়। পুরোনো অতীত কেনো মনে পড়ে। স্মৃতির পাতায় কেনো ভেসে উঠে জীবনের প্রথম প্রেম, কেনো মনে পড়ে ভালোবাসার মানুষটার বেঈমানী। সবচেয়ে বেশী পিড়া দেয় স্নিগ্ধ ছোট্ট মুখটা। যার জন্য সব কুরবান দিতে মন চায়। অথচ শক্ত শেকলে বন্দি করেছে হৃদয়কে। প্রস্তর মানবদের অনুভূতি প্রকাশ করতে নেই।
অনেকটাই এগিয়েছে সামনে। অস্পষ্ট সেই গান। স্বস্তির শ্বাস ফেলে চলে গেলো বাসার দিকে। গতকাল থেকে দেশে যাওয়ার জন্য মন উতলা হয়ে পড়েছে। তাচ্ছিল্য নিয়ে ভাবে, স্রোত এলেই কেনো গা ভাসাতে হবে? সবাই বোকাবনে গিয়েছে। পকেটে থাকা তারবিহীন যন্ত্র কেঁপে উঠলো। সবুজ অপশনে প্রেস করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো প্রিয় মুখটা।
– পাপা এনাদার ওয়ান মান্থ হ্যাজ বিন পাসড। কখন আসবে?
অধর প্রশস্ত হাসি। অসহায় আকুলতায় ভরা চেহারা ছেলের। এক মাস পর আসবে কথা দিলেও ইমরান দেশে ফিরে আসেনি। মাসের পর মাস পেরোলো। দেখতে দেখতে চার বছর। ইশান বাবার কাছ থেকে ঘুরে এসেছে। স্কুল ছুটি দিলেই ফুফি নয়তো সোহান ভাইয়ার সাথে বাবার কাছে ছুটে যায়। ছোট্ট ইশান বড় হয়েছে। দশম শ্রেণিতে পড়ে। সামনেই এস.এস.সি পরীক্ষা দিবে। প্রানবন্ত কিশোর।
ইশতিয়াকের তদারকিতে থাকে সারাক্ষন। ইশানের জন্য নিরাপত্তা খুঁটি গেঁথেছে। ইমরান দেশে না আসার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ছেলের উপর ডিসিশন ছেড়ে দিয়েছে। এই সময়টাতে ইশান ভেঙেছে,গড়েছে নিজেকে প্রস্তুত করেছে। জীবনে কাকে প্রয়োজন বুঝতে পেরেছে।
বেড়ে উঠছে ছোট্ট ইশান। সেদিনের কথা। ছেলেকে কোলে নিয়ে দেশে এসেছিলো। ইশানকে সহজে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে কষ্ট করতে হয়নি। অভ্যস্ত করেছে সবকিছুতে। ছেলেটা এবার বছর ঘুরতেই হয়তো অন্য বাচ্চা কোলে নেওয়ার মত বেড়ে উঠেছে। মনে মনে এতটুকু ভাবতেই হেসে দিলো ইমরান। ইশানের দিকে তাকিয়ে অধর কার্নিশে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– পড়াশোনা কিছু হচ্ছে?
– হচ্ছে না আবার! সব কটা টিচার ভালো তবে একজন ছাড়া। এক টিচার রেখেছে ফুফি। উনি সব জানে শুধু এটাই জানে না কিভাবে সফট ভয়েজে কথা বলতে হয়।
– কে সেই টিচার?
– সামান্তা আপু।
– সামান্তা পড়াচ্ছে তোমাকে?
– হ্যাঁ জোর করে খাইয়ে পড়াতে বসায়। পড়া না পারলে কান মলে দেয়।
ইমরান হেসে উঠলো ছেলের কথায়। ছেলে পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– পাপা কখন আসবে?
– এইতো পাপা তাড়াতাড়ি।
– আমি সায়েন্স নিয়েছি কিন্তু। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে চাচ্ছি।
– এত কঠিন সাবজেক্ট পড়ার কি দরকার?
– তুমি ও তো পড়েছো পাপা?
– তাই তো বললাম, আমি তো বোকা। আমার ছেলেটা সহজ সাবজেক্ট নিক। এত পড়া লাগবেনা। পাপার বুকে থাকলে হবে।
– নো নো পাপা, আমি পড়বোই। ইউ আর মাই আইডল। তোমাকেই ফলো করবো।
ইমরান হাসে ছেলের কথায়। ছেলেও হাসে। এত মায়া কি করে এলো ছেলের মাঝে। তাকে ছেলে আইডল ভাবে এই কথাটুকু যেন মন প্রশান্ত করার মেডিসিন। হঠাৎ ইশান বলে উঠলো,
– পাপা একটা কথা।
– জ্বি প্রিন্স বলুন।
– আমি ওই মহিলাকে আমাদের জীবনে চাই না।
দুপাশ নিস্তব্ধ, নিশব্দ। রোমের আকাশে মেঘ জমছে। বাতাসের দমকা আওয়াজ। এর মাঝেই ছেলের মুখে এমন কথা! ছেলে কি মন থেকে জন্মদাত্রীকে অপছন্দ করে? এভাবে বলছে কেনো ছেলেটা! ইমরান প্রশ্ন করলো নিরবতা ভেঙে,
– এতটা রূঢ় হতে কি শিখিয়েছে তোমার পাপা?
– মাঝে মাঝে হতে হয়। আমার বন্ধুরাও তাকে নিয়ে কথা বলে। কি বাজে শুনায় জানো। সেদিন রাকিন বলে উঠলো, নায়িকা কাকনের তো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে শুনেছিস। পাপা, আমার ভিষণ লজ্জা লেগেছে। ভাগ্যিস ওরা জানেনা উনি সম্পর্কে আমার কিছু হয়?
কতটা শক্ত পোক্ত জবাব। বাস্তবতা অভিজ্ঞতা করা ছেলে এই ইশান। নতুন করে শেখানোর মত কিছু নেই।
– তোমার সাথে কথা হয়?
দু পাশে মাথা নাড়ালো ইশান। অন্যদিকে মুখ করে আড়াল করলো অশ্রু। শক্ত পোক্ত ছেলেটা কাঁদছে।
– ইশান তাকাও আমার দিকে।
ইশান নাক টেনে বলে,
– পাপা আমি তাকে রেসপেক্ট করতে পারি না। জানো তার গেট আপ দেখে আমি ভীষণ লজ্জা পাই, উইয়ার্ড সব পোশাক পরে। প্রায় সময় স্কুলের সামনে আসে। আমি কথা না বলে গাড়িতে উঠে আসি। একদিন কড়া করে বলেছিলাম, স্কুলে যেন আমাকে ছেলে পরিচয় না দেয়। উনি আসলেই সবাই সেলফি তোলার জন্য ঘিরে ধরে। লজ্জা লাগে আমার উনার সাজ দেখলে। ভাইরাল হবার পর থেকে আমি নিজেই পালিয়ে বেড়াই। রবিন চাচ্চু না আসা পর্যন্ত গেট দিয়ে বের হইনা।
ইমরান ছেলের সামনে নিজেকে সামলে নিলো। আশ্বস্ত করলো ছেলেকে। হেসে বললো,
– প্রিন্স শোনো, আমি আর তোমার মা দুজনই বিচ্ছেদে চলে গিয়েছি। সে ফিরে আসার অপশন পাপা রাখিনি। তার জীবনটা তার মত কাটাক। তার জীবনে কি হলো না হলো আমাদের দেখার দরকার নেই। যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
– মা বলবেনা পাপা। উনি প্রতিবারই বলে কেইস করবে? আমার কাস্টডি নিবে। আমি কি বাচ্চা নাকি?
– ভয় লাগিয়েছে।
ইশান দু চোখ মুছে মুখে হাসি ঝুলিয়ে বললো,
– তুমি দেশে আসো, এরপর আমি ভয় লাগাবো উনাকে।
ছেলের কথা শুনে হেসে ফেললো। ইমরানের আজ মনে হলো ছেলে বড় হয়েছে। সঠিক- ভুল জ্ঞান হয়েছে। এমনটাই চেয়েছিলো। নিজের মানসিকতার দায়িত্ব নিতে শিখবে ইশান। আজ ইমরান সফল। বাবাকে কখনো ভুল ভাববেনা। সিদ্ধান্ত ছেলের উপর ন্যস্ত করেছিলো। আজ সেই ছেলে দৃঢ় মনোবলে ভরপুর।
সময় কত দ্রুত চলে যায়। বালুঘড়ির সময় গড়িয়ে যেতে যেতে সকলকে মনে করিয়ে দেয়-
– হে মানব সম্প্রদায় তোমরা নব চিন্তাকে আলিঙ্গন করো,নব উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হও। দূর করো যতো পুরোনো গ্লানি, পুরোনো হতাশা।
আঁধার সরে গিয়ে সোনালী সূর্যের দিনের সূত্রপাত হলো। দিন গড়িয়ে বিকেল। চয়নের সাথে বেরিয়েছে মোনা। চয়নের প্রশ্নের ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত হওয়ার কথা অথচ কোনো ভাবমূর্তি নেই এই মেয়ের। নিজের মতো হেঁটে যাচ্ছে। বাসার কাছেই ছোট্ট একটা পার্ক। ইট পাথরের নগরে এক রাশ গাছপালা ও স্বস্তির অপর নাম এই বনলতা উদ্যান। কাঠের বেঞ্চিতে বসেই দুই বান্ধবী আলাপ জুড়েছে। চয়ন কাল বেড়াতে যাচ্ছে মামার বাড়ি। অনেক দিন দেখা হবেনা মোনার সাথে। কিছুদিন আগেই ফলাফল বেরিয়েছে সেমিস্টারের। রেজাল্ট শুনে মিনহাজ মিষ্টি বিতরন করেছে খুশিতে। এইচ এস সির পর থেকে যেন মিনহাজের নির্ধারিত রুটিনে এই মিষ্টি বিতরন পর্ব বাঁধা পড়েছে। মোনা একটি করে ফলাফল ভালো করে আর বাবা মিষ্টি বিতরন করে। এডমিশনের সময় তো ঢাকার বাইরে পরীক্ষাই দিতে দিলো না। মিনহাজের ভাষ্যমতে দূরে মেয়ে দিবেনা। প্রয়োজনে আশে পাশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হবে। সৌভাগ্যক্রমে মোনার চান্স হয়ে যায় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সবার বেড়ানোর জায়গা থাকলেও মোনার গন্ডি মামার বাসা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিজের বাড়ি। চয়ন বিদায় নিয়ে চলে গেলো মোনা রাস্তা ধরলো আপন পথে। এক পর্যায়ে দেখা রিমির সাথে। রিকশায় চড়ে রিমি যাচ্ছে। মোনাকে ডাকলো। একই রিকশায় চড়ে বসলো। মোনাকে সামনে নামিয়ে দিলো। সমস্ত রাস্তা ইমরান সম্পর্কে বলেছে, প্রতিটি কথাই স্বাভাবিক হওয়ার সত্ত্বে ও মোনার মনে হলো রিমিকে মোনার বেশ অপছন্দ। চৈতি বা তামান্না দুজনই পছন্দের তালিকায়। কিন্তু রিমির কথার ধাঁচ কেমন যেন। মোনা বিরক্ত।
সময় পেরিয়ে যায়, তামান্নার বেবিটা বড় হয়েছে। তিহান,সাদাফ আগের মতোই আছে। চৈতির ও বিয়ে হয়েছে। চঞ্চল বন্ধু দলটা মোনাকে মিস করে। বাবার অফিসে আর তেমন যাওয়া হয়না।
বাসায় এসে মোনা উপরের তলায় চলে এলো সরাসরি। এক বছর হলো বাবা মেয়ে শিফট হয়েছে। খাবারের সময়টাতে সবাই দোতলার ডাইনিং এ বসে খায়। পোশাক বদলে সোফায় বসে টিভি ছাঁড়লো। পাশে থাকা মিন্নির সাথে বকবক করছে। এই পাখিটাই একাকিত্বের সঙ্গী। এখন মিন্নি কথা বলে। বাড়িতে প্রচুর মেহমান। আগামীকাল মায়ার ঘরোয়া ভাবে বিয়ের আয়োজন করা হয়ছে। তুলে নেয়া হবে কয়েকমাস পর। নিচে গিয়ে খেয়ে আসতে শরীর সায় দিচ্ছেনা। ভাবছে একটু খানি নুডুলস করে খাবে। মিন্নির সাথে বারান্দায় কিছুক্ষন কথা বললো, খাওয়ালো।
কলিংবেলটা বেজে উঠেছে। বাবা আসার সময় হয়নি। মোনা দরজা খুলতেই দেখে চাচী। হালকা হেসে চাচীকে জায়গা করে দিলো ভেতরে আসার। চাচী হেসে সোফায় বসলো। হাতে খাবারের থালা। মোনা মৃদু হেসে চোখ নাচিয়ে বলে,
– কি ব্যাপার চাচী, হঠাৎ আজ গরীবের কুটিরে।
টেবিলের উপর খাবার রেখে সালমা বললো,
– ভালো লাগছেনা বাসায়, সব দিকে গেস্ট। তুই এসেছিস জানালা দিয়ে দেখেছি তাই চলে এলাম চুপি চুপি।
– ভালো করেছো। খাবার এনেছো কেনো?
– খেয়ে আসিস নি জানি। এতক্ষন অপেক্ষা করলাম নিচে গেলি না। কেউ তো আর তোর খবর নিবে না এই ভিড়ের মাঝে। ভাবলাম হয়তো আর যাবিনা তাই নিয়ে এলাম। খাইয়ে দিবো?
মোনা চাচীর আচরণে অবাক হয় না। ফুফির সাথে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে চাচীর সাথে গভীর হলো। মাথা ঝাঁকিয়ে খাইয়ে দিতে সাঁয় দিলো। সালমা হাত ধুয়ে পাশে বসে খাইয়ে দিতে দিতে জানালো,
– বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় পনেরো বছর। এখনো সন্তান হয়নি। আফসোস নেই। কষ্ট লাগেনা। তোর চাচ্চু আমাকে চোখে হারায়। তোকে আমার বরাবর অপছন্দ ছিলো। সবার আহ্লাদে ছিলি অথচ আমার কোল খালি। ভাইয়া তোকে নিয়ে উপরে আসার পর পর ই কেমন যেন মন খারাপ লাগতে শুরু করলো। তুই আগে মাঝে সাঝে খোঁজ নিতি। এখন তো আমার কাছে ও যাস না। নিচে ও থাকিস না বেশিক্ষন। কি হয়েছে?
মোনা হেসে চাচীর কোল ঘেষে বললো,
– কিছু হয় নি। কি হবে? এমনি যাই নি, ভার্সিটি থেকে ফিরে সময় পাইনা।
– একদম মিথ্যা বলিস না। আমি দেখেছি সেদিন। ডায়েরীটা মায়ার ছিলো। তুই হাতে তুলে ধরাতে মায়া খুব বকেছে। ডায়েরীতে কি আছে আমি জানি। আমিও দেখে নিয়েছিলাম একবার, অনেক আগে। যদিও ব্যক্তিগত জিনিস ধরা অপরাধ তবে ক্রোধে তখন এমন করেছি। নতুন করে জানার কিছু নেই। এই বাড়ির সবাই জানে।
– বাদ দাও না চাচী।
– কেনো বাদ দিবো? সামান্য একটা ডায়েরী নিয়ে তোকে সেদিন এত কথা শোনালো চুপ করে ছিলি কেনো? তুই নাকি ওর জানের জান পরানের পরান।তবে? আমি বাড়ির বউ বলে চুপ করে ছিলাম এত বছর। তুই তো বাড়ির মেয়ে। ভাইয়াকে জানাস নি কেনো?
মোনা নিরব। সেই ডায়েরী ভর্তি ফুফির অনুভূতি লিখা ছিলো। সেই অনুভূতিতে বার বার একটি নামই উঠে এসেছে। ইমরান শরীফ খান। মোনা মনে করতে চায় না। ইমরান সাহেব বিবাহিত। ব্যাপারটা মোনার জন্য খুব লজ্জার। চাচীর দিকে ফিরে মোনা প্রশ্ন করলো,
– চাচী, ফুফি ইমরান সাহেবকে বিয়ে করলেই তো পারতো। করে নি কেনো?
সালমা হেসে বলে,
– মায়াকে আমার অপছন্দ করার অনেক কারণ আছে। তবে তোকে পছন্দ করার জন্য একটা কারণই যথেষ্ট। তুই যখন ইমরান ভাইকে ইমরান সাহেব ডাকিস মায়া ব্যাপারটা একদমই ভালো নজরে দেখেনা। এই কারণে সেদিন তোকে ওভাবে বকেছে। যেখানে ইমরান ভাইয়ের কাছে কাকন ব্যতীত কোনো মেয়ে ঘেঁষতে পারেনি সেখানে অনায়াসে তুই উনাকে ইমরান সাহেব বলে মায়ার মাথা ব্যাথা ধরিয়ে দিয়েছিস।
– আমি তো ছোট, সেই হিসেবে মজা করে ডাকি। ফুফি ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছে চাচী?
মোনা হতভম্ব হয়ে চাচীকে প্রশ্ন করলো। তবে কি ফুফি কিছু বুঝে গেলো? শুকনো ঢোক গিললো মোনা।
সালমা মোনার কথা তিরস্কার করে বললো,
– মায়া ইমরান ভাইয়ের ব্যাপারে বদ্ধ উন্মাদ। কতবার যে কাকন আর ভাইয়ার বিয়ে ভাঙতে চেয়েছিলো। তখনো আমার বিয়ে হয়নি। যেহেতু আমি আর মায়া বন্ধু ছিলাম এই বাড়িতে আমার আনাগোনা ভালোই ছিলো। বিয়ের আগের আমাদের গলায় গলায় ভাব ছিলো। মাধ্যমিকের পর পরই বিয়ে হয়ে যায় আমার। মায়াই জোর করে এই বাড়িতে এনেছিলো আমায়। তোর চাচ্চুর ও পছন্দ ছিলাম আমি। বিয়ের পরই মায়া তার ননদের সত্ত্বায় ফিরে আসে। মাইশা ভাবী ওকে সহ্য করলেও আমার ওকে কোনো কালেই সহ্য হতোনা। কখনোই আমরা ওর জন্য একা স্বামী স্ত্রী সময় কাটাতে পারি নি। যেখানেই যাব, মাঝখানে ঢুকে যেত। শপিং করলে সেম জিনিস ওর চাই, আমি কিছু খাব, ওর ও তাই খেতে হবে। সবার সামনে আমাকে আর ভাবীকে অপমান করে বলতো আগে ভাইরা আমার আবদার পূর্ণ করবে এরপর তোমাদের। একই জোর খাটাতে চেয়েছিলো ইমরান ভাইয়ের উপর। হাত ধুয়ে পিছেই পড়ে ছিলো উনার। লাভই হয় নাই। বড় ভাইয়া তো ওকে মে*রেছে অনেক এই কারণে। ইমরান ভাই মুখের উপর বার বার নাকোচ করেছে। ইমরান ভাইয়ের মেহেরবানী যে এখনো ভদ্র ব্যবহার করে ওর সাথে।
– এখন এসব অনুভূতি মনের মাঝে লালন কি লাভ? উনার স্ত্রী-সন্তান আছে।
– স্ত্রী কই পেলি?
– স্ত্রী না থাকলে সন্তান আসলো কিভাবে?
– আরেহ ছিলো। ডিভোর্স হয়েছে সেই সতেরো বছর আগে। ইশান হওয়ার ছ মাসের মাথায় তো ডিভোর্স হলো।
– কিহ?
এর মাঝে সালমার খাওয়ানো শেষ। মোনা দু অধর আলগা করে রেখেছে। ভোকাল কর্ড ভুলে গেছে আন্দোলন। বিস্মিত দৃষ্টি। এ কথা মোনার অজানা থাকলো কি করে? অবশ্য থাকারই কথা সাহস করে এই প্রশ্ন কি কাউকে করা যায়, করে নি। অনেকটা জেদের বশেও মানুষ টার খবর নেয় নি এত বছর। মনে প্রাণে তার বলে যাওয়া শেষ কথাকে বেদবাক্য ভেবে যাচাই ও করে নি। সে নাকি নায়িকার সাথে সংসার করতো?
মোনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
– উনার প্রাক্তন কোন নায়িকা?
– কোন দুনিয়ায় আছিস? কাঁকনকে চিনিস না, ভাইরাল হলো যে?
মোনার চক্ষু ছানাবড়া। কি শুনলো! সালমা মোনার এহেন কান্ড দেখে হেসে বললো,
– তবে কি আর বলছি। কাকনের এসবের জন্যই ভাই এর সাথে সেপারেশন হয়েছে। তবে মায়ার নতুন প্ল্যান ইমরান ভাই দেশে আসলেই গলায় ঝুলবে।
মোনা চাচীর মুখ থেকে কথা বের করার সুযোগ পেয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে বললো,
– তাহলে তো ভালো। তবে কি আগামীকাল বিয়ে হবে না?
সালমা মুখ ভেঙচি দিয়ে বললো,
– ইশ কত শখ! ইমরান ভাই জীবনেও মায়াকে বিয়ে করবেন না। প্রয়োজনে একাই বাকি জীবন পার করবে। ওর কপালে আগামীকালকের বিয়েই আছে।
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে মোনা ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখে মনসুর দাঁড়িয়ে আছে। সালমাকে দেখে ভেতরে ঢুকলো। ভাইঝির হাতে চিপস চকলেট দিয়ে সোফায় বসলো। মোনার চাচার বুকে মাথা রেখে চকলেট খুলতে খুলতে বললো,
– আমাকে আর চাচীকে শপিংয়ে নিয়ে যাবে চাচ্চু?
মনসুর হেসে জানালো,
– অবশ্যই কবে?
– আজই। কাল তো ফুফির গায়ে হলুদ, বিয়ে।
মনসুর হেসে বললো,
– ওটা তো ঘরে ঘরে।
মনসুর ফোন রিসিভ করার জন্য আড়ালে যায়। এর মাঝে সালমা মোনার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– দেখিস কাল বিয়েটা বানচাল এর চেষ্টা করবে। তাই তো চালাকি করে কয়েক মাস পর অনুষ্ঠান করতে বললো। যাতে করে কাল কিছু একটা বলে ভাঙতে পারে।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ১৮
– তাতে আমাদের কি?
– আমাদের আবার কি? দুই ভাই আবার চিন্তায় পড়বে। তুই তো বেঁচে গেলি উপরে এসে। আমি নিচে ওর তামশা দেখতে হবে।
মোনা খিলখিল করে হেসে উঠলো। সালমা ও হেসে দিলো। আজ মেয়েটার সাথে গল্প করতে বেশ লাগছে সালমার। মনে হচ্ছে এ যেন মাইশা ভাবীরই প্রতিচ্ছবি।
