Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৮
নীতি জাহিদ

দেদারছে কাজ চলছে জামদানী প্রোডাকশনের। তামান্না, চৈতি,জোবায়দা,রিমিসহ অফিসের সব কটা মেয়ে সেদিনের পর থেকে ভীষণ একটিভ। গত এক মাসে নিজেদের সবটুকু দিয়ে দিচ্ছে কাজে। ইমরানকে অফিসে বসতে তেমন একটা দেখা যায় না। হাসপাতাল বাসা করে মোনার দিন কেটে যায়। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর ইমরানের সাথে রাতে দেখা হলেও কথা কম বলেছে ইমরান। মেডিসিন খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে আইরিন। নার্স এসে ড্রেসিং করে দিতো। ইশান, তুশি,আইরিন বেশ গল্প করতো মোনার সাথে। ইমরানের নিস্তব্ধতা মোনাকে কঠোরভাবে ভেঙে দিয়েছে। ইমরান যখন রাতে বাড়ি ফিরে তখন মোনা ঘুমিয়ে পড়ে। আজ তুলনামূলক অন্যদিনের তুলনায় শরীর বেশ ভালো। দুপুরে খাবারের পর কিছুক্ষন বিশ্রামের জন্য শুয়েছিলো।
রাবিয়া, মতিয়া খাবারের ডিশ নিয়ে রুমে ডুকছে দেখে মোনা কিছুটা অবাক হলো। খাবার তো খেয়েছে। পিছু পিছু ইমরান ও ঢুকলো। টেবিলে খাবার রেখে ওরা বেরিয়ে গেলো। মোনাকে সালাম দিয়ে ইমরান ফ্রেশ হতে চলে গেলো৷ আজ মানুষটা এই সময়ে বাসায় এলো! ফ্রেশ হয়ে সালাত আদায় করে খাবার ট্রে নিয়ে মোনার সামনে বসলো। এক প্লেটে খাবার মেখে মোনার মুখে দিতেই মোনা বললো,

– আমি তো খেয়েছি।
– এখন আবার খাও।
খাবারের দিকে তাকিয়ে দেখে মোরগ পোলাও। না করেনি। খেয়ে নিলো ভালো বাচ্চাদের মতো। মানুষটা কেমন নির্জীব, নিষ্প্রাণ। মোনার বেশ ইচ্ছে করছে কথা বলতে। কিন্তু কি দিয়ে শুরু করবে! জড়তা কাটিয়ে ইমরানের বাম গালে হাত ছুঁয়ে বললো,
– মন খারাপ?
ইমরান মাথা নাড়লো। মোনা পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– তবে কথা বলছেন না যে।
– ক্লান্ত আমি।
মোনা দেখছে মানুষটা সত্যি ক্লান্ত। খেতে খেতে বলে উঠলো,
– ভয় পেয়েছিলেন?
প্লেট থেকে চোখ তুলে মোনার দিকে তাকালো। চশমার ফাঁকে ইমরান এর চোখ দুটো গভীর। এই চোখে আশঙ্কা, ভয়, দুশ্চিন্তা। পলক ঝাপটে চোখ নামিয়ে এক পিছ শসা প্লেট থেকে তুলে মোনার মুখে পুরে দিলো। মানুষ টা এমনি কথা কম বলে এখন তো পুরোপুরি বোবার মত আচরণ করছে। বেশ কিছুক্ষন পর মুখ খুলে প্রশ্ন করলো,

– ব্যাথা আছে?
মোনা হালকা মাথা নেড়ে বললো,
– আছে, আগে থেকে কম।
খাবার শেষ করে উঠে হাত ধুয়ে নিলো। রাবিয়া, মতিয়া এসে সব গুছিয়ে নিয়ে যেতেই ইমরান দরজা আটকে নিরবে খাটের কোণায় বসলো। মোনাকে আকুলতা নিয়ে বললো,
– মোনালিসা তোমার পাশে শুবো কিছুক্ষন। চুল গুলো হালকা বিলি কেটে দিতে পারবে? একটু ঘুমাতে চাই।
– আচ্ছা।
ইমরান শুয়ে পড়তেই মোনা মাথায় হাত দিলো। কপাল গরম, প্রচন্ড উত্তাপ। মোনা এগিয়ে এসে ইমরানকে প্রশ্ন করলো,
– আপনার তো জ্বর ইমরান সাহেব?
– তেমন কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।
বেড সাইড টেবিল থেকে থার্মোমিটার বের করে মোনা জোর করে জ্বর মেপে দেখলো প্রায় ১০২। মাথায় পানি দিতে চাইলে ইমরান বললো,

– আমি ওয়াশরুম থেকে দিয়েই এসেছি। এখন একটু ঘুমাবো।
মোনার কেমন যেন খুব মায়া হলো। রাজ্যের সব চিন্তা একা একটা মানুষ মাথায় নিয়ে দিব্যি ঘুরে অথচ তার কথা ভাবার সময় টুকু কারো হয়না। অবশ্য বাড়ির সব সদস্যই অনেক ভালোবাসার। কেউ জানেও না মানুষটার এই অবস্থা। নিজেকে আড়াল করতে করতে অসুস্থতাও আড়াল করতে শিখে গিয়েছে। কাউকে না বলুক মোনা জানুক, যদি নাইবা জানলো কিসের অর্ধাঙ্গীনি হলো, সুখ দুঃখের সঙ্গী হলো? এগিয়ে এসে ইমরানের চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। ইমরান কিছুটা মোনার দিকে ঘেঁষে ওর কোমড়ে হাত রাখলো। মোনার মনে হলো মানুষটা আলিঙ্গন চাইছে। আরো খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ইমরানকে জড়িয়ে ধরলো। ইমরানের মাথা নিজের বুকে চেপে বললো,
– চুপচাপ ঘুমান উঠার প্রয়োজন নেই। ফোন আসলে আমি এটেন্ড করবো। যতক্ষন খুশি ঘুমান। আমি ধরে রাখছি।
ঘুমে আচ্ছন্ন উত্তর দিলো,
– হুম
কিছুটা সজাগ ছিলো। মোনার আলিঙ্গন পেয়ে পুরোপুরি ঘুমের দেশে হারিয়েছে। ফোনের কম্পনের মোনার হালকা ঘুম ছুটে গিয়েছে। ইমরানের সাথে মোনার ও ঘুম চলে এসেছিলো খানিকটা। স্ক্রিনে Kakon দেখে মোনা থমকে গেলো। দোটানায় থেকেও রিসিভ করে নিলো। কথা বলার আগেই ও পাশ থেকে প্রশ্ন এলো,

– আসসালামু আলাইকুম, মোনা কেমন আছে, ইমরান?
মোনা নিরব। দ্বিধান্বিত। কথা বলা কি উচিত! পুনরায় প্রশ্ন,
– কথা বলো? কদিন ধরে ফোন দিচ্ছি। রিসিভই করোনা। সোহানের কাছে হালকা খবর পেলাম; এলিটা টেক্সটাইলে দেখা হয়েছিলো, মোনা এখন সুস্থ আছে। আমি জানি সব রাগ আমার উপর। আমার তো দোষ নেই। আমি যতদূর ইনফরমেশন পেয়েছি কাজটা জারিফের না। একটু কথা বলো ইমরান?
এবার মোনা মুখ খুললো,
– উনি তো ঘুমাচ্ছে।
কাঁকন চমকে উঠলো। অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
– স্যরি। তাই তো বলি কে রিসিভ করলো। তুমি ভালো আছো?
– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ।
– ইশান ভালো আছে?
– জ্বি আলহামদুলিল্লাহ।
– খেয়াল রেখো নিজেদের। ইমরানকে জানিয়ে দিও আমি যা যা বলেছি। আমি সত্যি এসবের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। যতদূর জানি জারিফ কাজটা করেনি। ওর এত সাহস নেই। সারাক্ষন পড়ে থাকে নিজের আমোদ ফুর্তি নিয়ে৷ কাজটা অন্য কারো খতিয়ে দেখতে বলবে।

– ঠিক আছে।
– আরেকটা কথা, ধন্যবাদ। আমার ছেলেটার জন্য এত করলে…
– আমার ও ছেলে। আপনি জন্ম দিয়েছেন আর বেড়ে উঠছে আমার কাছে।
– ভালো থেকো।
ফোন কেটে দিলো কাঁকন। মোনা ফোন রাখার আগেই ভারী ঘুমো আওয়াজে বললো,
– নাম্বারটা ব্লক করে দাও।
মোনা চমকে উঠলো। ঘুমায় নি!
উত্তর দিলো,
– এতদিন যখন করেন নি, এখনো থাক।
– এতদিন প্রয়োজন পড়েনি।
ইমরান গড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে ফোনটা নিয়ে নাম্বার ব্লক করে পুনরায় শুয়ে পড়লো। যেভাবে উঠেছিলো মোনা ভেবেছে রাগ করে আর শুবে না। মোনাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– মোনালিসা, আমি সত্যি ভীষণ ক্লান্ত। গত দুদিন ধরে ফোন দিচ্ছে। আমি কখনোই কাউকে ব্লক করিনা। এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনা। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আবার গিয়ে দু চার ঘা দিই। পরে মাথায় আসে নোংরা ধরে নিজে নোংরা হবো নাকি! ওর জন্য নিরবঘাতী থিওরি বেস্ট। আমার সন্তানের মা বলে অনেক কিছুই পারিনা। এখানেই আমার ব্যর্থতা। তবে আজ রাগ হচ্ছে।

– কেনো রাগ করছেন?
– এই সামান্য কারণে তুমি অবিশ্বাস করলে।
– কোথায় অবিশ্বাস করলাম।
– কিছুক্ষন আগেই তো বললে, এতদিন যখন করেন নি, এখনো থাক।
– আল্লাহ আপনি কথাটাকে ওভাবে নিচ্ছেন কেনো?
– মোনালিসা আ’ম নট আ কিড ওকে?
মোনা হাসছে। ইমরানের অভিমান দেখতে বেশ। মোনা ইমরানের গাল টেনে বললো,
– আহারে আমাল বাবুতা অভিমান কলেছে। আত্তা আল লাগ কব্বোনা। আতো বাবু আদল কলে দি।
মানুষটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে চোয়াল যুগল আলগা করে তাকিয়ে আছে। কি অভিব্যক্তিটাই না করলো এই মেয়ে! মোনা পুনরায় বলে উঠলো,

– আদল করে দিবো সোনা? উম্মাহ। আল লাগ করে না।
ইমরান উঠে বসে গাল এগিয়ে দিয়ে বললো,
– দাও আদর করে।
দুষ্টুমিটাকে যে সিরিয়াসলি নিয়ে এভাবে বলবে মোনা বুঝতে পারেনি। বেচারী লজ্জা পেয়ে বলে,
– এ্যাই যাহ, দুষ্টুমি করছিলাম। আপনিও!
– আমিও কি? আদর পেতে পারিনা, নাকি অধিকার নেই? যদি বলো বয়স নেই ডাহা মিথ্যা কথা। এটাই আদর পাওয়ার উপযুক্ত বয়স। শুধু পাওয়ার নয় দেওয়ারও। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো দুপুর দুপুর সময়। কতটা দিন আমি দূরে তোমার থেকে বলো? কাছে আসো।
মোনা ছিটকে দূরে সরে গেলো। ইমরান হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে বলে,
– আজকে আর ছাড়ছিনা। সব আজ একসাথে শোধ নিব। যাচ্ছো কোথায়?
মোনা লজ্জা পেয়ে বলে,
– আমি প্রস্তুত নই প্লিজ। দেখুন আমার কাঁধে এখনো ব্যাথা।
– উফফ। আচ্ছা আদর করে দিবো বউসোনা। আসো আসো। তোমার ফ্রাংকেস্টাইনের আদর পেলে সব ব্যাথা চলে যাবে।
– প্লিইইইইজজ।
ইমরান জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতে বললো,

– পাগলী মেয়ে। এত ভয় পাও কেনো আমাকে? আমি তোমাকে কষ্ট দিবো ভাবলে কি করে?
লজ্জালু আনত মাথা মোনার। ইমরান হাসছে। মানুষটা কদিন পর হাসছে ধারণা নেই। হাসি দেখেই মনে হলো এই বুঝি মনটা ভালো হলো। ইমরান হাসি থামিয়ে বললো,
– চলো নিচে যাবে। সবার সাথে গল্প করবে।
মোনা মাথা ঝেঁকে উঠতে যাবে তখনই দরজায় কড়া নড়ে উঠলো। অনুমতি দিতেই ইশান ঢুকলো। জানালো নিচে সাংবাদিক এসেছে ইমরানের ইন্টারভিউ নিতে নতুন প্রজেক্ট এর ব্যাপারে। ইমরান কিছুটা বিরক্ত হয়ে ইশানের দিকে তাকাতেই ইশান প্রশ্ন করলো,
– পাপা এটা কোনো সময় হলো এদের আসার। তুমি জানতে না?
– ভেতরে কে নিয়ে এসেছে?
– আমি। জোয়াদ্দার চাচাকে বিরক্ত করছিলো গেটের সামনে। ইন্টারকমে ফোন দিলো। পরে ফুফি বললো নিয়ে আসতে।
– কয়জন এসেছে?
– চারজন।
মোনা বলে উঠলো,

– কি এমন প্রজেক্ট শুরু করলেন যে এত জন একসাথে এলো?
– আমি নিউজ পাবলিশ করতে ভয় পাই এই একটা কারণে। প্রজেক্ট টা ইশানের কথায় চালু করেছিলাম। ভেবেছিলাম সারপ্রাইজ দিবো?
ইশান উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে,
– পাপা সোলার সিস্টেম নিয়ে?
– ইয়েস প্রিন্স।
ইশান বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– থ্যাংকিউ সো মাচ পাপা। ইট’স আ বিগ সারপ্রাইজ। আমি তো ভয় পেয়ে বলেছিলাম তোমাকে। তুমি তো পছন্দ করছিলেনা আমার ওই সেক্টরে যাওয়াটা।
– আমি চাই তুমি খুব সাধারণ জীবন যাপন করো বাবা। আমার অনেক টাকা। কি করবো এত টাকা দিয়ে। কিন্তু তুমি তো সেই আমার পথেই হাঁটলে। তবে আমি ভীষণ খুশি কারণ তুমি নিজে কিছু করতে চাচ্ছো। তাই এতটুকু সাহায্য পাপা করতেই পারি।
বাবা ছেলের কথা মোনা খুব উপভোগ করছে। ইমরান মোটামুটি তৈরি হয়ে সাদা পাঞ্জাবি পরে নেমে এলো ড্রইং রুমে। সাথে ছিলো ইশান এবং মোনা। মোনাকে মোটামুটি সবার সাথে একটু করে পরিচিত করাতে চাচ্ছে ইমরান। ড্রইং রুমে আসতেই দেখতে পেলো সাংবাদিকরা সকল প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে।
একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ছে। এদের মধ্যে একজন মেয়ে বেশ চালাক আর বাকিরা ইনফরমেটিভ তথ্য নিতে ব্যস্ত। পুরুষ সাংবাদিক প্রশ্ন করলো,
– স্যার একটা প্রশ্ন ছিলো আপনার প্রোপার্টির ব্যাপারে। আমরা যতদূর জানি পড়াশোনা ব্যাকগ্রাউন্ড আপনার ইঞ্জিনিয়ারিং। বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ড ল্যান্ড নিয়ে কেনো? যদি এর পাশাপাশি আরো অনেক কিছু আছে।
ইমরান হেসে বললো,

– যখন ব্যবসা শুরু করেছি তখন আমার কাছে শুধু একটা মেশিন ছিলো তাও সেকেন্ড হেন্ড। আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন আমার বাবার ব্যাপারে। যেহেতু বাবা তৎকালীন ব্যবসায়ী ছিলেন সেই সুবাধে আমার মেশিনারিজ ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা ভালো ছিলো। বাবার ব্যবসা শেষ হওয়ার পর আমি নতুন করে সব শুরু করি। একটা কোম্পানির তো একটা সেক্টর থাকেনা তাই না। অনেক গুলো ব্রাদার,সিস্টার কন্সার্ন থাকে। ল্যান্ড টাও একটা পার্ট। ভালোবেসেই শুরু করা। আমাদের ল্যান্ড ব্যবসার সবচেয়ে বড় বেনিফিট আমি ইম্পোর্টেট প্রোডাক্ট এর পাশাপাশি দেশের সংস্কৃতিতে ধরে রাখতে দেশীয় মান সম্মত জিনিস ব্যবহারের চেষ্টা করি এবং জায়গা ক্রয় থেকে শুরু করে বিল্ড আপ এবং ইন্টেরিয়র ও আছে৷ একের ভেতর সব পেলে আর কি লাগে?
– জ্বি জ্বি স্যার সেটা শুনেছি। স্যার আরেকটা প্রশ্ন, সোলার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে কেনো জাগলো?
ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ওটা আমার ছেলেই বলুক।
ইশান লজ্জা পেলো। বাবার ইশারা পেয়ে বললো,

– সোলার নিয়ে ইন্টারেস্ট আমার ছোট থেকে ছিলো তেমন নয়। এই চিন্তা মাথায় এসেছে আমি ফুফির শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভবত আমি তখন ক্লাস এইটে। দু তিন বছর আগের কথা। উনাদের গ্রামের বাড়িটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্বাভাবিক ভাবে গ্রামে বিদ্যুতের ঘাটতি হয়। ওখানে আমি ছাদের উপর প্রথম দেখেছি এই সোলার প্যানেল। সোহান ভাইয়া ছিলো সাথে। ডিটেইলস জানার পর কৌতুহল জাগাতে পাপাকে ফোন দিয়ে বললাম আমি সোলার নিয়ে কাজ করতে চাই। পাপা একদমই আগ্রহ দেখায়নি। বললো দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে প্যানেল নিয়ে আপাতত আগ্রহ না দেখাতে। কিন্তু আজ প্রায় এত বছর পর পাপা আমাকে এই সারপ্রাইজ দিবে তা আমার জন্য বেশ আনন্দের।
সাংবাদিক প্রশ্ন করলো,

– অন গ্রীড এবং অফ গ্রীড দুটো নিয়েই কাজ করতে চাচ্ছেন?
– অবশ্যই। কারণ দুটোই প্রয়োজন। দেখুন ভবিষ্যৎ ভাবনাটা আমাদের জন্য। যতই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হোক আর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে উৎপন্ন করুন না কেনো সকল শক্তির মূল উৎস সূর্য। আমাদের মহান আল্লাহ সুযোগ দিয়েছেন। কাজে লাগাতে, ব্যবহার করতে, বুদ্ধি খাটাতে সমস্যা কি! অন গ্রীড আপাতত শহরের জন্য খুবই প্রয়োজন। যদিও কিছুটা ব্যয়বহুল তবে প্রতিটি বাসার ছাদে থাকা খুবই দরকার। বিপদের কি সময় জ্ঞান আছে? ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেছে লিফট, মেশিনারিজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের জেনারেটর বিদ্যুৎ সাপ্লাই দিচ্ছে তবে সেই তো খরচ। তেল কিনতে হচ্ছে, সার্ভিসিং করতে হচ্ছে। অন্যদিকে সোলার প্যালেন একবার লাগাবেন বাড়ির ছাদে আপনি যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে সেই বিদ্যুতের শক্তি সঞ্চয় তো করবে সেই সাথে সূর্য থেকে শক্তি নিয়ে আপনাকে দ্বিগুন ফিরিয়ে দিচ্ছে। এতে তো আমাদেরই লাভ বলুন। আর অফ গ্রীড নিয়ে কাজ করা মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট কারণ গ্রামেগঞ্জে, নৌকায়, লঞ্চ, জাহাজ,খামার বাড়ি এবং যেসব জায়গায় বিদ্যুৎ রিচ করতে পারছেনা সেখানে তো অফ গ্রীডের বিকল্পই নেই।

– ধন্যবাদ ইশান, শুনে ভালো লাগলো আপনার আগ্রহের ব্যাপারে। শুভকামনা রইলো।
আচমকা একজন ইমরানকে প্রশ্ন করলো,
– মি. খান সেই হিসেবে তো আপনি একজন ফিউডাল লর্ড। অন্যান্যদের মত কি আপনিও আপনার অপ্রেসিভ ন্যাচার শো করেন? আই মিন আমি জানতে চাচ্ছি, আমরা বাইরে যা শুনি তা কতটুকু সত্য? একজন ফিউডাল লর্ড এর ন্যাচার খুব এগ্রেসিভ হয়। যতদূর শুনেছি আপনি বেশ কলাকৌশলে নিজের কাজ আদায় করে নেন। সেই ক্ষেত্রে তো আপনাকে অনেক বাঁকা পথ ও ব্যবহার করতে হয়।
সোহান এসে বসেছে বেশ কিছুক্ষন। পালটা প্রশ্ন করলো,
– কি শুনেছেন বাইরে?

– এই যে একজন ফিউডাল লর্ড তো ওয়ার্কিং ক্লাসের উপর টর্চার করে। ইভেন লর্ড দের আলাদা সেল থাকে যেগুলো একেকটা টর্চার সেল। শ্রমিকদের মেয়ে,বউদের ধরে নিয়ে যায়। অত্যাচার নির্যাতন করে এইসব।
সোহানের চেহারা রঙ পরিবর্তন হয়েছে। চোখ দুটো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। মারামারির রেকর্ড ভালোনা। শান্ত হয়ে বসে থাকাটা মামার নিকট ভদ্রতা মাত্র। ইশান কপাল কুচকে চোখ পাকিয়ে ফেলেছে। ইশান যে ক্ষেপে গিয়ে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তা বুঝে গিয়েছে। ইদানীং ছেলেটার রাগ বেড়ে যাচ্ছে। অন্য দিকে সোহান মুখ খুলবে, ইমরান মৃদু হেসে পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার আগেই সামলে নিয়ে বললো,

– থাকতেই পারে। যদি থাকে তা আপনাদের কেনো বলবো। আপনাদের মধ্যে কয়জন ছিলেন সেই সেলে? আর ভাবলেন কি করে থাকলে আমি তার খোলামেলা আলোচনা করবো? সবচেয়ে বড় ব্যাপার আপনার কেনো মনে হলো আমার এত বিত্ত বৈভব থাকার সত্ত্বে ও আমি শ্রমিকদের মেয়ে বউদের ইজ্জতে হাত দিবো? মেয়ের কি অভাব পড়বে নাকি। টাকা ছিটালে আমার বেডরুম ভর্তি হবে মেয়ে দিয়ে। ইভেন এখন কার যুগে তো শ্রমিকদের মেয়ে বউ লাগে না। তাদের সম্মান অনেক বেশি। কিছু নাম মাত্র জব হোল্ডার মেয়েদের তো ইশারার প্রয়োজন।
– স্যরি স্যার ব্যাপার টা ওভাবে বুঝাতে চাইনি। বাইরে একটা রিউমার আছে আপনি এখনো সিঙ্গেল…
– ওয়েট… হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সিঙ্গেল? সিঙ্গেল ছিলাম সতেরো বছর বয়সে। এরপর সম্পর্কে জড়িয়েছি,বিয়ে করেছি,বাবা হয়েছি,ডিভোর্সি হয়েছি এগেইন আমি ম্যারিড। কে বললো আমি সিঙ্গেল! এই যে ছেলের পাশে চুপচাপ আপনাদের সহ্য করা রমনী মোনাশাই আমার সহধর্মিণী, ছেলের মা। তথ্য না জেনে কিভাবে একজনের বাসায় হুট করে এসে তাকে বিব্রত করছেন? মান হানির কেইস করতে পারি আমি।
থতমত খেয়ে গেলো বাকিরা।
পুনরায় বললো,

– আমি আপনাকে সেই সাহস দিয়েছি মিস..
– তিশা…
– জ্বি মিস হোয়াটেভার। আপনাকে সাহস দিয়েছি বলেই এমন প্রশ্নের সুযোগ পেয়েছেন। সৃষ্টিকর্তা নারীদের সম্মানিত করেছেন আর আপনারাই নিজেদের সম্মান রাখতে পারেন না। আপনার বেশ কজন নারী সাংবাদিক সহকর্মী আমাকে এবং আমার বন্ধুদের প্রায় ফোন দিয়ে বিরক্ত করে ইন্টারভিউয়ের জন্য। ইন্টারভিউ বাহানা মাত্র, তাদের পছন্দ আমাদের সঙ্গ। শো অফ ভীষণ অপছন্দের। ইশানের প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলতে এসে চলে গেলেন আমার ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিতে। যেহেতু এমন উদ্ভট প্রশ্ন করেছেন সেহেতু এত টুকু বুঝতে পারছি আমার প্রতি আপনার বেশ ইন্টারেস্ট, আড়ালে হয়তো আমাকে নিয়ে স্বপ্নও দেখে ফেলেছেন। আমি কিন্তু খুব ভালো সাইকোলজি বুঝি। সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে চেনেন? মনোবিজ্ঞানী। টুকটাক জ্ঞান রাখি মনোবিজ্ঞান নিয়ে। আপনার আনকনশাস মাইন্ড এতক্ষন আমাকেই মুগ্ধ হয়ে কল্পনা করছিলো। স্পষ্ট আপনার চেহারায় ইঙ্গিত ভেসে উঠেছে তাই ট্রিগার আমার দিকেই ছিলো। এমন ভাবে তীর নিক্ষেপ করলেন যেন কেউ বুঝতে না পারে টার্গেট কে এবং সুকায়দায় আমার থেকে কথাও বের করতে পারেন, উত্তর ও জানা হলো। ভেরী ইন্টারেস্টিং। গুড জব। এনিওয়ে আই হ্যাভ টু লিভ। ইটস মাই ফ্যামিলি টাইম।
ইমরান উঠে গেলে ইশান বলে উঠলো,

– আশা করিনি এমনটা আপনাদের কাছে।
মোনা তখনো নিজের জায়গায় বসে আছে। সাংবাদিকরা একজন দুঃখপ্রকাশ করলেন। সকলে উঠে দাঁড়ালে মোনা বলে উঠলো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৭

– পরের বার প্রশ্ন কিভাবে করতে হয় তা শিখে আসবেন। আর ভাইয়া আপনারা যাকে তাকে সাথে নিয়ে আসবেন না এতে আপনাদের চ্যানেলের রেপুটেশন চলে যাবে। ফিউডাল লর্ড যখন বলেই ফেললেন, তার সম্পর্কে জেনে আসা উচিত ছিলো। ফিউডাল লর্ডরা কিন্তু অনেক খারাপ হয়। দেখবেন আপনাদের মধ্যে কেউ একজন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন। সাবধানে থাকবেন।
শান্ত হুমকি যেন জমিয়ে দিলো উপস্তিত প্রানীদের। যেন সামনে সাক্ষাৎ বিপদ। দেরি না করে যথাসম্ভব দ্রুত পা চালিয়ে ত্যাগ করলো ‘সোনালী সকাল’। কি জানি হয়তো হাজারো রহস্যের ফাঁদ পাতা এই ভুলভুলাইয়াতে!

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৯