প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৯
নীতি জাহিদ
গাছগুলো কেমন মৃত মৃত হয়ে উঠেছিলো। পানি দেয়া শেষ করে ছাদজুড়ে পায়চারি করছে। ইশান খেলতে গিয়েছে বন্ধুদের সাথে। বিকেলের পর সন্ধ্যাকালীন সময়টাতে মোনা নেমে এলো। আজ বাসা অনেকটাই খালি। আইরিন আপা নেই, তুশি বাবার বাড়ি। বাড়িতে সাহায্যকারী লোকজন আছে মোনার জন্য। মোনা রুমে এসে এলোমেলো কাপড় গুছাচ্ছে। মনে হলো বারান্দা থেকে পুরুষালি স্বর ভেসে আসছে। নিজের পুরুষের কন্ঠ শুনে গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো। ইমরানকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলতে দেখে হেসে উঠলো। উদাম গলায় তোয়ালে ঝুলছে। পরনের প্যান্ট খুলেনি। ফ্রেশ হওয়ার সময় টুকু পায়নি হয়তো। মোনা বাসায় একা হওয়াতে বেশ তাড়াতাড়ি ফিরেছে। ফোন রেখে মোনাকে বুকে জড়িয়ে কপালে ওষ্ঠ ছুয়ে বলব,
– পনেরো মিনিট সময় দাও ফ্রেশ হয়ে আসি। এরপর নাস্তা সারবো দুজন মিলে।
মোনা মাথা কাত করে সম্মতি জানালো। সালাত আদায় করে রুমে নাস্তা আনিয়ে রাখলো মোনা। ইমরান বের হয়ে সালাত আদায় করে মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপা তো আজ আসবেনা। ইশান এসেছে?
– হ্যাঁ এই তো কিছুক্ষন হলো। নাস্তা করে নাকি সোহান মামার সাথে বের হবে।
– কোথায় যাবে?
– কিসের যেন টুর্নামেন্ট আছে।
– ওহ। আমার ও অনেক দিন টেনিস খেলা হয়না।
– আজ গেলে যেতে পারেন।
– উঁহু আজ নয়।
ইমরান স্যুপ বাটি হাতে নিয়ে বললো,
– ডিনার কি খাবে?
– ভাবিনি। আপনি বলুন নতুন কিছু চেষ্টা করি।
– তুমি আজ বিশ্রাম নাও। রান্নাঘর আজ আমার। স্পেশাল মানুষের জন্য স্পেশাল কিছু করি। মাঝে মাঝে বউদের সেবা করতে হয়।
– তাই! তা কি রান্না করবেন?
– জ্বি তাই। দেখি রান্নাঘরে যেয়ে।
– আপনি যাবেন আর ওরা ভয়ে পালাবে।
– পালাতে নিষেধ করব। আমি কি ভয় লাগাই নাকি ওদের! আমাকে দেখিয়ে দিতে বলব কোথায় কি আছে। এরপর যেদিকে খুশি যাক। বাকিটা আমি একা করে নেব।
– প্রয়োজন নেই। বিশ্রাম নিন। কখনো গিয়েছেন রান্না ঘরে?
– বিগত কয়েক বছর ওভাবে যাওয়া হয়না কিন্তু এক সময় রান্নাঘরের সাথে সখ্যতা ছিলো। আজ রান্না শেষ হলে বলবে কেমন শেফ আমি?
মোনা হাসছে। মোনাকে রুমে রেখে বের হবে ইমরান, দরজার কাছে গিয়ে ফেরত এসে মোনার কানে আলতো অধর ছুঁয়ে বললো,
– আজকের রাতটা আমার নামে।
মোনা খানিকটা লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়ালো। ইমরানের পুনরায় প্রশ্ন,
– পাবোনা?
চোখ তুলে মানুষটার দিকে তাকাতেই কাছে এসে মোনার পাতলা নিম্নোষ্ঠে আলতো অধর ছুঁয়ে বলল,
– টেক রেস্ট, আ’ম কামিং উইদ ইন ওয়ান আওয়ার।
আগামীকাল চয়নের বিয়ের প্রোগ্রাম । কাবিনের সময় মোনার অসুস্থতার জন্য যেতে পারেনি। সময় কত তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যায়। বিয়ের উপহার কেনা শেষ হয়েছে। মোনা উপহারের ব্যাগ এক পাশে সাজিয়ে রেখে ভাঁজ করা কাপড় গুলো আলমারিতে তুলে রাখলো। আগামী কাল থেকে অফিস জয়েন করবে। মনের মাঝে একটা ব্যাপারে বেশ খটকা লাগছে। আজ প্রায় কয়েক মাস হতে চললো বাবা আসছেনা। ফোন দেয়, কথা ও হয় তবে ভিডিও কলে অনেক দিন দেখেনা। অবশ্য গত এক মাস তো নিজেও অসুস্থ ছিলো। আজ ভাবছে বাবাকে ভিডিও কল দেবে। মেসেজ দিয়ে রাখবে ফ্রি হলে ফোন দিবে।
রান্নাঘরে ইমরানকে দেখে রীতিমতো ভয় পেয়ে চুপসে গিয়েছে তিনজন। রুবিনা এক পাশে দাঁড়িয়ে কোনো মতে জিনিস গুলো দেখিয়ে দিচ্ছে। বাড়ির ঘরোয়া কাজের ইনচার্জ হিসেবে সে, আজ প্রায় তের/চৌদ্দ বছর। রাবিয়া,মতিয়া মুখে কুলুপ এটেছে। ইমরান সকলের জন্য বিরিয়ানি করবে জানালো। সব রকমের মসলাদি রেডি। এক পাশে ব্লেন্ডারে লেমন মিন্ট করে রুবিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো রাবিয়া মতিয়াকে দিতে। মেয়ে দুটো হাতে গ্লাস নিয়ে চমকে দাঁড়িয়ে আছে। বড় স্যারকে এতটা কাছ থেকে কাজ করতে কখনো দেখেনি। ওদের জন্য শরবত করে দিয়েছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। রুবিনার কাছে এসব পরিচিত। কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মতিয়াকে বললো,
– মতিয়া, তোমার বড় আম্মাকে ডেকে নিয়ে আসো।
মতিয়া ছুট লাগালো। রাবিয়া ফিসফিস করে রুবিনাকে বলছে,
– আপা, স্যার যে রান্ধা জানে এডি তো জানতাম না।
– স্যার ঘরোয়া সব কাজ পারে। ইশানকে বড় করা থেকে শুরু করে ঘর সামলানো সব নিজে করেছে। আমি এসেছি পরে।
ইমরান রাবিয়াকে ডেকে লবন টেস্ট করতে বলাতে রাবিয়া থতমত খেয়ে গেলো। লবন ঠিক আছে জানালো। ইমরান খানিকটা হেসে বললো,
– রাবিয়া, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
– স্যার কেউ নাই। আম্মা মইরা গেছে, আব্বায় আরেক বিয়া করছে। আমার ও তো বিয়া হইছিলো। জামাই তালাক দিয়া দিছে। এহন আর কেউ বিয়া করেনা। আর আমিও করমুনা। জামাইরা খালি মা রে।
দীর্ঘশ্বাস ইমরানের। কত স্বভাবের মানুষ আছে এই দুনিয়ায়। কত দুঃখে ভরা পৃথিবী। ভাবতেই মোনা পেছন দিক থেকে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে,
– কি করছেন?
– ভাবলাম তোমাদের আজ বিরিয়ানি খাওয়াই। আমি এই জিনিসটা ভালো পারি। সাথে বোরহানি চলবে? তুমি খাও?
– আমার খুব পছন্দের।
– ডান। রুবিনা সব রেডি করে ফেলো ঝটপট। আমি বিরিয়ানি টা হলেই করছি। আর মোনালিসা আমি কি একটি অনুরোধ করতে পারি?
ইমরানের প্রশ্নে বাকিরাও উৎসুক। মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– অবশ্যই।
– তোমাদের বাড়িতে ক্যাশিউনাট সালাদ করেছিলো কেউ একজন মনে আছে? মেয়োনিজ উইদ মাশরুম দিয়ে।
– হ্যাঁ মনে আছে।
– ওটা পারো?
– হ্যাঁ ওটা আমিই করেছি। আগে প্রায় করতাম। এখন তো বাবাও নেই করা হয়না।
– ফ্যান্টাসটিক। আজ সেটা করো। আমি খুব পছন্দ করেছিলাম কিন্তু লজ্জায় বলিনি তখন।
কি অকপটে স্বীকারোক্তি। মোনা চোখের পলক ঝাপটে বলে,
– অবশ্যই। এখনি করছি।
– ধন্যবাদ।
ফোনের মাঝে ঘোর আলাপন।
– তোর উচিত প্রোগ্রাম টা সেরে নেয়া।
– তুমি আসো এরপর।
– ইমরান বুঝতে পারছিস না কেনো? আমি কবে ফিরবো ঠিক নেই। সবাইকে না জানিয়ে রাখবি ততদিন? আমার আদেশ প্রোগ্রাম শেষ কর। আমি এলে গেট টুগেদার করবো। আর যদি না করিস ফোন করলে আর ধরবোনা। মোনা মেসেজ দিয়েছে ভিডিও কলে কথা বলতে।
– এভাবে না জানিয়ে আর কত ভাই?
– আবার?
ইমরান হেসে বলে,
– দেশে সুস্থ হয়ে ফিরলে বাবা ডাকবো।
– আর যদি না ফিরি?
– আমাদের জন্য ফিরবে ইনশাআল্লাহ।
– একবার ডাক।
ইমরান হাসছে। মিনহাজ ও হাসছে। নয়নকে কলে যোগ করলো। নয়ন যোগ হওয়ার সাথে সাথে মিনহাজ বললো,
– নয়ন ওরে বল আমাকে বাবা ডাকতে।
– ও জামাই, আব্বা ডাকোনা ক্যা শ্বশুরকে। ডাকো। ছ্যাহ। তুমি দেখি অবাধ্য,অভদ্র জামাই। আমারেও মামা ডাকবা।
ইমরান বিরক্ত নিয়ে বলে,
– একটা চড় দিব। বাবা নাহয় ডাকলাম, কিন্তু মামা কি অর্থে।
– আমি মোনার মামা সেই অর্থে। আচ্ছা আগে আব্বা ডাক।
– পরে ডাকবো। আমি রাখছি। মোনালিসা এসে পড়বে।
মিনহাজ হেসে বললো,
– সুযোগ যদি না পাস আফসোস করবিরে ইমরান।
ইমরানের বুক কেঁপে উঠলো। তৎক্ষনাৎ বলে ফেললো,
– হায়াৎ আল্লাহর হাতে। নিজ থেকে এসব বলবেনা মিনহাজ বাবা। ডাকলাম এবার খুশি! আমি চাইনা আমাদের মাঝ থেকে কেউ হারিয়ে যাক। চিরদিন হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রনা বাবা,মা চলে যাওয়ার পর আমি তিলে তিলে বুঝতে পেরেছি। মোনালিসার শ্বাস প্রশ্বাস তুমি। আমি সত্যি সামলাতে পারবোনা এমন কিছু হলে।
মোনা ডাকছে। লাইন কেটে বারান্দা থেকে ভেতরে এলো। কিছুটা বিক্ষিপ্ত ইমরান আজ। অকস্মাৎ চেহারার রঙ পরিবর্তনে মোনা কপাল কুচকে বললো,
– কি হয়েছে?
– না তেমন কিছু না সামান্য ঝামেলা হয়েছে অফিসের কাজে। চলো খেয়ে নিব। ইশান আর সোহান আরো পরে ওখান থেকে খেয়ে আসবে।
রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষন গল্প করলো। খাবারের প্রশংসা সকলের মুখে মুখে। ইমরান সত্যি চমৎকার রাঁধে। যে রাধে, সে চুল ও বাঁধে এমন কথার বিপরীতে আজ বলাই যায়,
যে পুরুষ রাধে,
সে সুখের মানে জানে,
যদি সঙ্গ কাটে
শখের নারীর হৃদয় তটে ।
এর মাঝে ইশান সোহান এসে পড়েছে। ছেলেদের সাথে সময় কাটিয়ে নিজের শয়ন কক্ষে ফিরলো। রুমে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো ফুলের গন্ধ। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। খানিকটা হলদে আলোতে ঝিমিয়ে যাওয়া কামরা। স্নিগ্ধ পরিবেশ। সোফায় বসে টেবিলের উপর ফোন রাখলো। রুমের কোথাও তার উপস্থিতি নেই। হঠাৎ ঝুমঝুম আওয়াজ কানে আসছে। ছাদ বারান্দা থেকে আসছে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেলো স্লাইডিং ডোর বন্ধ করে গোলাপী শাড়ি পরিহিত ইমরান জায়া প্রবেশ করছে। চুলে গুজিয়েছে বাগানের লাল সাদা গোলাপ। হাতের কাচের চূড়ির রুমঝুম আওয়াজ কানে বাজছে। চুলগুলো একপাশে ছেড়ে দেয়া। ইমরানকে দেখে খানিকটা হেসে ভ্যানিটির সামনে বসে চুল গুলো ক্লিপে মোড়ালো। ঘুরে ইমরানের দিকে তাকাতেই চোখে চোখ পড়েছে।
ঘোর কাটিয়ে ইমরান দাঁড়িয়ে পড়ে। মোনার দিকে এগিয়ে আসছে বলতে বলতে,
– আহমদ সফা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ ধমকে বলতেন, ইমরান তুমি সঠিক উপায়ে প্রেম জাহির করতে সক্ষম হওনি আজো, সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত ‘ রাজকন্যা সাইকি ‘ অথচ নজর তোমার অদৃশ্যে। এ যে ভারী অন্যায়! আমার শামারোখের মত তোমারো আছে মোনালিসা। তার ইন্দ্রজালে ঘেরা চাহনী উপেক্ষা করো কি করে? যেখানে তার সৌন্দর্য্যে মানুষ ও দেবতার যুদ্ধই ছিলো জয় হাসিল করার পথ, সেখানে সব কিছুতেই এতটা বিলম্ব কি হৃদয়ে সয়? কাছে টেনে নাও। হারিয়ে যাও, নিজেকে রাঙাও। এ মোহ কাটবার নয়।
নমনীয় কোমল মেয়েলী বাহু ধরে বসা থেকে এক টানে তুলে ফেললো। আছড়ে পরলো শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ বক্ষে। শ্বাসের তীব্রতা উপলব্ধি হচ্ছে দুজনের। কানের গোড়ায় অঙ্গনার চুল গুঁজে ঠোঁট ছোঁয়ালো নেত্র পল্লবে। মোনা স্তব্ধ। এ যেন ইমরান নয়। স্বয়ং কোনো সাহিত্যের পুরুষ দাঁড়িয়ে তার রূপের বর্ননা করছে আপন শব্দের ঝংকারে। শব্দের এই বিন্যস্ত প্রয়োগ শরীরে শিহরণ জাগায়। কক্সবাজার থেকে ফেরার পর ইমরানকে এতটা উপলব্ধি করেনি মোনালিসা। অথচ আজ ইমরান ভিন্ন সত্ত্বা। হয়তো এই সেই ইমরান যাকে মোনা খুঁজে বেড়াচ্ছে এতটা বছর ধরে। ওষ্ঠাবৃত করলো প্রেয়সীর অধর। অধর ছেড়ে কোলে তুলে নিতেই মোনা বলে উঠলো,
– তবে কি ‘কিউপিড’ আজ নিজেকে ‘ সাইকির’ কাছে আরো একবার মেলে ধরবে?
– আলবত।
– যদি মেডুসা হয়ে দংশন করি?
কবিতার ছন্দ কাটিয়ে উচ্চারিত হলো আপন পুরুষের অধরে,
– যতই দেখি তারে ততই দহি,
আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি,
আমি, জেনে শুনে বিষ করেছি পান।
প্রাণের আশা ছেড়ে সঁপেছি প্রাণ।
অফিস থেকে দু দু বার ফোন এসেছে। মোনা আজ তৈরি হয়ে বের হতেই বেশ দেরি হয়ে গেলো। বেগুনী জামদানীতে নিজেকে সাজিয়ে নিলো। হাতে মোড়ালো গত রাতে উপহার পাওয়া রতনচূর। বেশ আধুনিক ডিজাইন। ইমরানের পছন্দ বরাবরই আকর্ষণীয়। গতরাতে উপহার দেয়ার মুহুর্তে বলেছিলো,
– সোনার গয়না খুব একটা কিনেছি বলে মনে পড়েনা। জুয়েলার্সে যেয়ে বলে দিই কার জন্য নিব, ওরা কিছু অপশন দেয়, তখন একটা পছন্দ করে নিই। তোমার জন্য এই রতনচূর দুবাই থেকে আনিয়েছি। উপহার তো প্রাপ্য তুমি। খুব ইচ্ছে হলো হঠাৎ তোমার হাতে রতনচূর দেখার। লোভ সামলাতে পারিনি।
মোনা বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলো,
– এত কিছু থাকতে রতনচূর কেনো?
ইমরান কিছু একটা ভেবে বললো,
– যদি রাগ না করো তবে বলতে পারি।
– করবোনা। বলে ফেলেন।
– এক্সাম চলছিলো। বুয়েটে তখন। আমার এক বান্ধবীর নতুন বিয়ে হয়েছে। দেখতে শুনতে বেশ ভালো ছিলো। বিয়ের কদিন পরই এক্সাম। মেহেদী ভরা হাতে চূড়ি এবং রতনচূর। আমি খারাপ চোখে তাকাইনি, বিশ্বাস করো। তবে হঠাৎ চোখ পড়েছে ওর হাতে। কেনো জানিনা এত সুন্দর লেগেছিলো চোখ ফেরাতে কষ্ট হয়েছে। এমন প্রশ্ন কখনো কোনো মেয়েকে করিনি। ওকে সেদিন জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম, দোস্ত তোর হাতে এটা কি? ও বলেছিলো ওর বিয়েতে বর এই রতনচূর উপহার দিয়েছে। সেদিন খুব লোভ হয়েছিলো, বউ এবং অনেক টাকা থাকলে উপহার দিতাম। ততদিনে আমার ডিভোর্স হয়ে যায়। চাইলেও অসম্ভব। তোমাকে উপহার দিতে হবে মনে হতেই ইচ্ছে জাগলো, যে জিনিসে আমার চোখ গিয়েছে সেই জিনিসই আমি তোমাকে দেব। তাই এটা দুবাই থেকে আনালাম।
মোনা মুগ্ধ হয়ে শুনছে ইমরানের বলা সত্যি কথা গুলো। হেসে বললো,
– ধন্যবাদ সত্যি বলার জন্য। আমি খুব খুশী হয়েছি এই সুন্দর রতনচূর পেয়ে। আপনাকে অসংখ্য ভালোবাসা।
ফোনের আওয়াজে ধ্যানচ্যুত হলো। নিজেকে আরেকবার আয়নায় দেখে অফিসের দিকে রওয়ানা হলো ইমরান জায়া।
অনেক দিন পর মোনাকে অফিসে দেখে সবাই অনেক খুশি। অফিস আজ বেশ সাজানো। মোনার জন্যই সাজানো হয়েছে। মোনার অনারে আজ দুপুরে খাওয়া দাওয়া হবে। ওরা এখান থেকে সরাসরি রাতে চয়নের বিয়েতে এটেন্ড করবে। অফিসে সকলের সাথে কুশল বিনিময় শেষে ইমরানের রুমের দিকে যাচ্ছে। নক করতেই অটোমেটিক দরজা খুলে গেলো। মোনা ভেতরে আসতেই সালাম দিলো। ইমরানের চোখ ফাইলে নিবদ্ধ। সামনে দুজন এমপ্লয়ী বসে আছে। রিমি এবং নতুন একজন। মোনাকে দেখে দুজনই চমকালো। রিমি আশা করেনি মোনা এভাবে সেজে আসবে অপরদিকে অন্যজন বলেই ফেললো,
– আরেহ মোনাশা যে? কেমন আছো?
আচানক ইমরান ফাইল থেকে মাথা তুলে তাকালো। মোনা হতচকিত। তবুও হেসে বললো,
– ভাইয়া ভালো আছেন?
– আলহামদুলিল্লাহ। তুমি এখানে?
– এটা তো আমার ও অফিস।
জুয়েলের উপস্থিতি মোনাকে বেশ বিব্রত অবস্থায় ফেললো। জুয়েল বেশ উৎফুল্ল হয়ে বললো,
– বাহ! বেশ তো। আমিও এখানেই জয়েন করার কথা বলেছি। কিছুদিন হলো জয়েন করেছি। তোমাকে পেয়ে খুব ভালো লাগছে। পরিচিত কাউকে তো পেলাম।
রিমি প্রশ্ন করলো,
– তোমরা চেনো একে অপরকে।
জুয়েলই উত্তর দিলো,
– জ্বি আপু, মোনাশা আমার ক্যাম্পাসের জুনিয়র এবং খুব ভাল বন্ধু।
মোনা বাক হারিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান মোনার চোখে ভীতি দেখে বললো,
– মোনালিসা, সিট ডাউন। আই হ্যাভ আ প্রাইভেট ডিসকাশন রিগার্ডিং ফ্যাশন উইক।
হঠাৎ রিমি চমকালো ইমরানের মুখে মোনালিসা ডাক শোনাতে।
এর মাঝে দরজায় কড়া নড়তেই সাদাফ, তামান্না হুড়মুড় করে ঢুকলো। তামান্না হাঁপাচ্ছে। গড়গড় করে বলে ফেললো,
– স্যার আমাদের অনেক বড় একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। মোনায়েম সাহেবের ছেলের গায়ে হলুদের জন্য যে একশ বিশ পিছ হলুদ জামদানীর অর্ডার ছিলো, সেখানে আমাদের অর্ডার প্লেসমেন্টের ভুলের জন্য সব কটা শাড়ি কমলা জমিনে সবুজ কাজের ফুলের হয়ে গেছে। অলরেডি আমাদের টিম উনাদের সেই ছবি পাঠিয়েও দিয়েছে। এখন মোনায়েম সাহেব রেগে গিয়েছেন।
নয়ন ছুটে এসে ভেতরেই ঢুকেই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। ইমরান নিস্তব্ধ। মানসম্মানের ব্যাপার। নয়ন ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনায়েম সাহেব পথে আছে। আসতেছে ইমরান। আমি ফায়ার করে দিব পুরা টিমকে। এত বড় মিসটেক কিভাবে করে? কোথায় হলুদ আর কোথায় কমলা এবং সবুজ। এই রঙ পেলো কোথায় ওরা?
মোনা শান্ত স্বরে বলে,
– কমলা সবুজ শাড়িটা মোনায়েম সাহেবের ছেলের বউয়ের গায়ে হলুদের শাড়ি ছিলো। গুলিয়ে ফেলেছে ওরা। সেই শাড়ির প্রাইস বাইশ হাজার। এনিওয়ে, তামান্না আপু আমাকে শাড়ির স্যাম্পল দেখাও। ওরা কি একশ বিশটা শাড়িই বাইশ হাজারের করেছে?
তামান্নার চোখ টলমল। কোনো মতে উত্তর দিলো,
– আমি জানিনা। আমি শাড়ি দেখিওনি। কাস্টমার কেয়ার থেকে আমাকে জানানোর সাথেই আমি এখানে ছুটে এলাম।
নয়ন চেঁচিয়ে বলে,
– একশ বিশটা বাইশ হাজার টাকার শাড়ি? মানে ছাব্বিশ লাখ টাকা? আমরা তো শেষ ইমরান।
ইমরান ঠান্ডা মাথায় মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইনশাআল্লাহ পারবে তুমি সামলে নিতে। চেষ্টা করো। না পারলে আমি আছি।
মোনা মাথা নাড়িয়ে বললো,
– আমাকে একটু সময় দিন।
তিহান স্যাম্পলের শাড়ি নিয়ে ছুটে এসেছে। মোনা শাড়ি পর্যবেক্ষন করে বললো,
– এটা তো দুই হাজারের শাড়ি।
তৎক্ষনাৎ তাঁতীকে ফোন দিতেই ঠোঁটের কোনে হাসি। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– মোনায়েম সাহেবকে ফোন দিয়ে বলেন, যেন তাড়াতাড়ি আসে। ওনার প্রবলেম সলভড।
নয়নসহ মোনা শাড়ি হাতে বেরিয়ে গেলো। সাথে পুরো টিম। কিছুক্ষন পর মোনায়েম সাহেব অফিসে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। উনি কেবিনের ভেতর ঢুকতে নারাজ। ইমরান কথা বাড়াচ্ছে না। বাইরে সিটিং এরিয়ায় ওনাকে বসতে দেয়া হয়েছে। মোনা আসছে বলে জানিয়েছি। উপর থেকে নিচে নেমে এলো মোনা। মোনায়েম সাহেবকে দেখে সালাম দিলো। উনি কথা বলতে অনিচ্ছুক। ইমরানের রাগ উঠছে। নিজের অপমান সহ্য হয়, মোনাকে এভাবে উপেক্ষা করার অপমানটা তীরের মত লাগছে। মোনা চোখের পলক ঝাপটে সায় দিলো। মোনায়েম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনায়েম সাহেব। আমরা খুবই দুঃখিত এমন একটা ঘটনার জন্য…
– আমি কোনো কথা শুনতে চাইছিনা। ছেলের প্রোগ্রাম ফেলে ছুটে এসেছি।
– ভাইয়া আমার একটু কথা শুনুন। আপনার সব অভিযোগ মাথা পেতে নেব। আমাদেরই যেহেতু ভুল, শুধরানোর দায়ভারও আমাদের। আপনারা যে শাড়ি অর্ডার প্লেস করেছেন সেই শাড়ির ডিজাইন আর নতুন শাড়ির ডিজাইন সেম। কালার টা ভিন্ন। এখন সমস্যা হচ্ছে সবাই হলুদ চেয়েছে। হাতে সময় নেই। নাহয় নতুন শাড়ি করে দিতাম। আবার আপনি কিনতে গেলেও দেরি হবে। অনুষ্ঠান পন্ড হবে। লসও হবে আপনার। আমি চাই আপনারা আমাদের শাড়িগুলো রিসিভ করুন। এখনই পেমেন্ট দিতে হবেনা। আমি যতদুর জানি আপনি আমার বাবা, ইমরান সাহেবের এবং মামার খুব কাছের। সেই ক্ষেত্রে নাহয় ছেলের বিয়ে উপলক্ষে উপহারই ধরে নিলেন। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমি শাড়ির সাথে মেয়েদের জন্য একশ বিশ সেট ম্যাচিং হলুদের ফুলের গহনা পাঠাচ্ছি, ছেলের জন্য একটা জামদানী শেরওয়ানি এবং ছেলের বউয়ের জন্য আমার কালেকশনের হলুদের ব্রাইডের সবচেয়ে ইউনিক শাড়িটা দিচ্ছি। যদি কারো পছন্দ না হয় তখন নাহয় আপনি জানাবেন। উপহার হিসেবে নিন। টাকা লাগবেনা। এতটুকু ভুলের জন্য এতদিনের সম্পর্ক নষ্ট হবে তা কি ভালো দেখায়? টাকার কাছে সম্পর্ক হেরে যাবে?
মন ভিজলো বোধ হয়। মোনায়েম সাহেব ছেলের শেরওয়ানি সহ বাকি সব আইটেম দেখতে চাইলেন। প্রোডাক্ট দেখে উনি নিজেই চমকে গেলেন। এক দেখাতে পছন্দ। চিন্তা শুধু বাড়ির মেয়েদের শাড়ি গুলা পছন্দ হবে কিনা সেটা। নাহলেও ম্যানেজ করে নিবে।
কিছুটা কনভিন্স হলে মোনাকে প্রশ্ন করলেন,
– আপনার বাবা কে? আমি তখন খেয়াল করিনি।
নয়ন হেসে বললো,
– মোনা আমার ভাগ্নী, মিনহাজ ভাইয়ের মেয়ে।
মোনায়েম তৎক্ষনাৎ একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে মোনার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত রেখে বললো,
– ভালো থাকো। অনেক দোয়া করি। খুব বুদ্ধিমতি তুমি। আমি তো চিনতেই পারিনি রাগে। নয়ন ভাই, ইমরান ভাই আমার আসলে রাগ নিয়ন্ত্রণে ছিলোনা। আমি খুব স্যরি আমার ব্যবহারের জন্য। বুঝেনই তো বাড়িতে মেয়েরা মন খারাপ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
ইমরান মোনায়েম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
– ইটস ওকে ভাই।
– তবে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি ভাই। আপনারা সবাই উপস্থিত আছেন। অর্ডার নিয়েছে মিসেস ইমরান, উনার তো একবার এপোলোজি চাওয়া উচিত ছিলো। উনি দেখা করতেও আসলেন না।
সাদাফ ফোঁড়ন কেটে বলে,
– স্যরি স্যার, ইমরান স্যারের তো ওয়াইফ নেই। উনি কিভাবে অর্ডার নেবেন?
ইমরান মোনার দিকে তাকালো। মোনায়েম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন,
– ইমরান ভাই অর্ডার কাকে দিলাম। আপনি যে কথা বলিয়ে দিলেন?
আজই তবে মুখ্যম সময়। বোকা বনে গেলো সকলে।অফিসের অনেকে মোনায়েম সাহেবকে বুঝাতে এসেছেন উনি কিছু একটা ভুল করছেন। কোলাহল তৈরি হলো। ইমরান নিশ্চুপ। সে নিজ থেকে কিছুই বলবেনা। মোনা নিজে যদি তার পরিচয় দেয় তবেই সেটা তার প্রাপ্তি।
মোনা খানিকটা এগিয়ে এসে হেসে নিজ থেকে বলে উঠলো,
– আমিই মিসেস ইমরান ।
প্রথমে বিশ্বাস করেনি, দ্বিতীয় বারের প্রশ্নেও মোনার একই উত্তর,
– জ্বি ভাইয়া, আমিই টিউলিপের চেয়ারম্যান ইমরান শরীফের সহধর্মিণী।
মোনায়েম সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে মুখে হাত দিয়ে বলে,
– ইয়া আল্লাহ….
নিরব,নিবিড়,গুমোট পরিবেশ। মোনায়েম সাহেব পুনরায় প্রশ্ন করলেন,
– ইমরান ভাই, এই সেই রমনী! আপনি এতক্ষন চুপ ছিলেন কেনো?
ইমরান মোনার চোখের দিকে তাকিয়ে মোনায়েম সাহেবকে প্রতিউত্তর করলো,
– ম্যাডামের নির্দেশ।
অফিসের বাকিরা এমন কথা শুনে স্তব্ধ। অফিস জুড়ে বরফ শীতল অবস্থা। হুট করেই অফিসটা শান্ত, প্রশান্ত হলো। থেমে গেলো সব কোলাহল। মোনার গলার স্বর ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছেনা। মোনা হেসে বললো,
– এতদিন ইচ্ছে করেই বলিনি। নিজেকে প্রস্তুত করতে যতটা সময় লাগে আর কি। বাবার মেয়ে, স্বামীর স্ত্রী হিসেবে নয়, নিজের কাজেই নিজেকে যোগ্য করার চেষ্টায় আছি। দোয়া করবেন।
কথা শেষ করে মোনায়েম সাহেব বিদায় নিলেন। উনার কাছে ভুলটা এখন কোনো বিষয় নয়। এত বড় সংবাদ পেয়ে সব ভুলে গিয়েছেন। খুব জোর করে বিয়েতে অংশগ্রহণের অনুরোধ করলেন।
বাকিদের মুখের বুলি বন্ধ। মোনা একটু জোরে সবাইকে বলে উঠলো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৮
– এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আমি আপনাদের আগের মোনাই। ডেজিগনেশন বা সম্পর্ক পরিবর্তনে অফিসের উপর কোনো প্রভাবই পড়বেনা। আমিই সেই মোনালিসা যার নামে আপনাদের ব্র্যান্ড।
ইমরান সবার সামনে একটাই বাক্য উচ্চারণ করলো,
– আজকের জন্য ধন্যবাদ মোনালিসা।
– সাহস টা আপনি দিয়েছেন।
