Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪২

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪২

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪২
নীতি জাহিদ

বাতাসটা গায়ে লাগছে। প্রকৃতি আজ বেশ উচ্ছ্বসিত। কিছুক্ষন শান্ত আবার কিছুক্ষণ পর পর ধুন্দুমার লাগিয়ে দিচ্ছে দমকা হাওয়া তুলে। ছাদ জুড়ে অবিরত পায়চারি করছে। হাতের মাঝে ব্যান্ডেজ। নিচে যাওয়া মানে হাজার টা প্রশ্ন। মিথ্যা কথা বলা ছেড়েছে বহুদিন। অবশ্য আগেও তেমন কাউকে বলতে হয়নি। মাঝে সাঝে আইরিন প্রশ্ন করলে বলতো। কাঙ্ক্ষিত কল পেয়ে ফোনটা তুলল। ও পাশ থেকে স্বর এলো,
– স্যার স্বীকার করেছে। কাজটা জারিফের কথায় করেনি। জারিফ জানেই না এমন কিছু হচ্ছে। জারিফের বাবা এমপি হালদারের নির্দেশে করেছে। পরিকল্পনা ভয়াবহ ছিলো। ভাগ্যিস সাইফুল রুট চেঞ্জ করেছিলো সেদিন। ওরা লরিতে আগুন দিতে চেয়েছিলো। এতে বড় সড় বিস্ফোরণ এর আশঙ্কা তো ছিলো, হাসপাতালে একদিনের বেশি থাকলে ম্যাডাম এবং ইশানের উপর আবার আক্রমণ করতো।

– ঠিক আছে। ওর অপরাধের রেকর্ড কেমন?
– কন্ট্রাক্টে কাজ করে। যে যত দিবে তার জন্য তত নিখুঁত কাজ করবে। এক কথায় এমপির ডান হাত। তবে রেপ কেইস আছে অনেক।
– পরিবারে কে কে আছে?
– বউ আছে, ছেলে আছে। ওই দুইটা আরো শয়তান। ছেলেটাও ড্রাগ ডিলার। আর বউ তো বাজারের মাস্তানি।
– ছেলে আর বউকে চোখে চোখে রাখো। ওর হাত দুটো কেটে দাও আর জিভটা ফেলে দাও। রেপের ব্যাপারে প্রমান আছে?
ও পাশের কলদাতা কেঁপে উঠলো,
– স্যাররর…
– কিহ? পারবেনা?
– না মা নে।
– বেঁধে রাখো, আমি আসছি। সামান্য একটা কাজ দিয়েছি ওটাও পারবেনা।
– করিনি তো কখনো। স্যার চেষ্টা করছি। আপনার আসা লাগবেনা।
– তোমার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছো।
– স্যরি স্যার পারবো।
– লাগবেনা। আমি লোক পাঠাচ্ছি।
– ওকে স্যার।
ইমরান ফোন রেখে সজীবকে ফোন দিলো,

– আসসালামু আলাইকুম স্যার।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। জগনকে তবারক বেঁধে রেখেছে। হাত আর জিভটা ফেলে দিবে। রেপ কেস আছে নাকি। প্রমান যদি পাও আমার আদেশের জন্য অপেক্ষা করোনা। কাজটা সেরে ফেলবে।
– জ্বি স্যার।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। ফোনে মিসডকল উঠে আছে। নিচে নেমে আসলো। স্ব-কামরায় প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো মোনা ঘুমে আচ্ছন্ন। সারাদিনের ক্লান্তি হয়তো চেপে বসেছে। একটু স্বস্তি পেলো যে এখন আর প্রশ্ন করবেনা। ফ্রেশ হয়ে গায়ের পাঞ্জাবিটা খুলে সোফায় বসলো। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা। মেসেঞ্জারে টুংটাং শব্দ হওয়াতে ফোন সাইলেন্ট করে দিলো। পাছে মোনার ঘুম ভেঙে যায় যদি। বন্ধুদের গ্রুপে সবাইকে আগামীকালকের জন্য ইনভাইট করেছে। আসবে বলে বন্ধুরা জানিয়েছে। তৌসিফ, জহির, রঞ্জন মজা করছে। অনন্যা মেসেজে সকলের উপস্থিতিতে ইমরানকে প্রশ্ন করলো,

– ইমরান জুয়েলকে চিনো?
ইমরান অবাক হলো না। জুয়েলের সেই খবর প্রথম দিনই জেনেছে। তাই নিশ্চিত ভাবে জবাব দিলো,
– হুম।
– জুয়েল আমার দেবরের ফ্রেন্ড।
– জানি।
– ব্যাপারটা শুনতে খারাপ দেখায় তবুও একটু নিশ্চিত হয়ে নিও। জুয়েলের সাথে কি মোনার সম্পর্ক আছে? শুনলাম দু বছর ছিলো। অনেকের তো বিয়ের পর ও থাকে।
ইমরান প্রতিউত্তর করলো,
– জুয়েল বলেছে সেই কথা?
– না, ইরাদ মানে আমার দেবর বলেছে, জুয়েল পছন্দ করে । বিয়ের ও তো কথা ছিলো।
ইমরান হঠাৎ টাইপিং স্পিড বাড়িয়ে দিলো,
– তুমিও তো আমাকে পছন্দ করতে,তখন কিন্তু এক সন্তানের বাবা ছিলাম। বিয়ে করবো বললে এক পায়ে খাড়া হয়ে যেতে। তাহলে কি তোমার সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো? ক্যাম্পাসে অনেকে ভাবতো তুমি আর আমি বুঝি সম্পর্কে আছি। ব্যাপারটা তুমি বলে বেড়াতে, আমি কখনো এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি। কিন্তু তোমাকে তো আমি সেই নজরে কখনো দেখিনি। জুয়েলের ব্যাপারটাও আমি জানি। জুয়েল আমার অফিসেই জব করতো, ওর গতিবিধি আমার চোখের সামনেই পরিলক্ষিত ছিলো। গতদিন রিজাইন দিয়েছে। আমার মত অসুন্দর মানুষের যদি চারদিকে এত চাওয়ার লোক থাকে সেখানে মোনা তো সুন্দরী কিশোরী। আমার কপাল ভালো মেয়েটাকে ওর বাবা আগলে রেখেছে। নাহয় প্রতিদিন আমার ঘরের জানালায় ছেলেপেলেদের ঢিল পেতাম। মানুষ মেয়ের জন্য চিন্তায় থাকে। আমি সুন্দরী বউয়ের জন্য দুশ্চিন্তায় ম/রি। না পারি কাউকে কিছু বলতে না পারি সইতে। অবশ্য বউ আমার যে পরিমাণ ঝাল একাই একশো নিজেকে সামলানোর জন্য।
তৌসিফ টাইপ করলো,

– সবচেয়ে বড় কথা আমি যতদূর ভাবিকে দেখেছি, উনি লয়্যাল। এছাড়া বিয়ের আগে কত কিই তো থাকে। পুরোনো ইতিহাস ঘেটে লাভ আছে। ইমরান নিজেই কলঙ্কিত সেই অর্থে। ডিভোর্সি ছিলো, একটা সন্তানের বাবা। সেখানে অবিবাহিত মেয়ে। ভাবির দিকে আঙুল তোলা বড্ড বোকামী।
একসাথে সবকটা রিপ্লাই,
– একদম হক কথা।
অনন্যা পুনরায় বললো,
– তুমি এভাবে আমাকে অপমান করতে পারোনা ইমরান। আমি তোমার ভালোর জন্যই বললাম।
– এমন ভালো কেনো করতে হবে যেই ভালোতে আমার সহধর্মিণীর অপমান! কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। আসছি সবার খোঁজ নিতে দাওয়াত দিতে। খোঁচা মারা স্বভাব এখনো গেলো না তোমাদের। মন চাইলে আসবে নাহলে আসবে না। গেলাম। আমার কথায় কষ্ট পেলে দুঃখিত।
ইমরান মেসেঞ্জার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো। একে তো মেজাজ খারাপ এর মাঝে এসব শুনতে হচ্ছে। আশে পাশের মানুষজন কাউকে ভালো থাকতে দেখলেই শুরু করে হাজার রকমের ঝামেলা। সমাজে শান্তি বিরাজ করানো দূষ্কর হয়ে পড়ছে দিনকে দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলো। হাতের যন্ত্রণাটা বাড়ছে। জগনকে কষে দু ঘা দেয়ার সময় ওর ছুরির টান লেগেছে হাতে। অনেকটাই ঘা হয়েছে। কদিন লাগবে এবার ঠিক হতে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ডান হাত বলে অনেক কাজ করতে পারবেনা। বুকের উপর মেয়েলী হাত দেখে মুচকি হাসলো। ঘুমন্ত মোনার কপালে অধর ছুঁয়ে বললো,
– তুমি ভাবো আমি নিরব, অথচ আমি তোমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সরব। যে হাত আমার মোনালিসাকে রক্তাক্ত করে কি করে সেই হাতের অস্তিত্ব টিকে থাকে! আমি চাই তুমি নিজেকে নিজের মত আগলে রেখো। অপ্রতিরোধ্য খুঁটি নিজেই বসাও। আমি তার ঠিক পেছনে সেই খুঁটিতে দেয়াল গড়ে দিব। যাতে গায়ে আঁচটুকু না লাগে।

অপরাহ্নের শেষ প্রহর। আলমারি থেকে অফ সাদা একটা স্যুট বের করলো। সাদা শার্ট। কেন যেন মনে হলো এই স্যুট টা পরার আজই সেরা একটি দিন। আজকের জন্য স্পেশাল করে কিছু কেনা হয়নি। মনে মনে ভেবে রেখেছিলো যদি কখনো এমন দিন আসে উদযাপন করার মত তবে এই পোশাক পরবে। মোনা উপহার দিয়েছে কক্সবাজার যাওয়ার আগে। সবার জন্য টুকটাক শপিং হলেও মোনার শপিং বাকি ছিলো যা ইমরান গত রাতেই মোনালিসার স্টোর থেকে নিয়ে এসেছে। জামদানী লেহেঙ্গা। মোনা নিজ হাতে কক্সবাজার যাওয়ার আগে এই ডিজাইন কাস্টমাইজড করেছে, শো স্টপারের জন্য। হারিয়ে গিয়েছিলো স্টোর থেকে। কাজটা রিমিই করেছিলো। সুস্থ হওয়ার পর অফিসে এসে অনেক মন খারাপ করেছিলো এই লেহেঙ্গার জন্য। পরে জামদানী শাড়ি তুলে দিয়েছিলো স্টেজে। হাতে সময় কম ছিলো।
পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে ইমরান ফোনের অপেক্ষায় আছে। গুরুত্বপূর্ণ কলটা আসতেই বেরিয়ে পড়লো কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্যে।

পরিপূর্ণ সাজে আবৃত ইমরান পত্নী মোনাশা। দেখে মনেই হবেনা ঘরোয়া অনুষ্ঠান। হারিয়ে যাওয়া জামদানী লেহেঙ্গা পেয়ে মোনা প্রচন্ড খুশি। ভাবতেই পারছেনা এও সম্ভব! টুকটুকে লাল জামদানীতে জরি সুতার হাতের কাজ। খুব ইচ্ছে ছিলো নিজেকে লাল শাড়িতে বউ সাজে দেখার। আজ মোনা আয়নায় দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার নিজেকে দেখছে। হাতে গাজরা বেলির। ছোট্ট সোনার টিকলিটা উঁকি দিচ্ছে হিজাবের নিচে কপালে। নাকে চেইন টানা নথ। বিউটিশিয়ান গিয়েছে বেশ কিছুক্ষন। বাবার জন্য কয়েকটা ছবি তুলে ফোনে পাঠিয়ে দিলো। বাবা গতকাল থেকে কথা বলছেনা। আজ অনুষ্ঠান শেষ করে বাবার সাথে বোঝাপড়ায় বসতে হবে।
দরজায় কড়া নাড়তেই বাড়ির মেয়েরা ঢুকলো। মোনাকে দেখে সবাই বেশ খুশি। জামদানীর সৌন্দর্য্য পরতে পরতে ফুটে উঠেছে। খালা শ্বাশুড়ি এগিয়ে এসে বললো,
– আইজই সুযোগ বউ। ইমনরে কাছে টাইনা নিবি কইলাম। পটাইয়া একটা বাচ্ছার কতা কইবি।
মোনা আইরিনের দিকে তাকাতেই আইরিন বুঝতে পারলো আবার খালার সেই কথার বান মোনা নিতে পারবেনা। আইরিন তখন বলে উঠলো ,
– অনুষ্ঠানটা হতে দাও খালা এরপর তোমার জ্ঞান দিও।
ইশান ঢুকলো কামরায়। মাকে দেখে না দেখার ভান করে চমকে বললো,

– আপনারা কি আমার মাকে কোথাও দেখেছেন?
সামান্তা বলে উঠলো,
– ঢং কম কর। তুই নিজের মাকে চিনতে পারছিস না।
ইশান মায়ের কাছে এসে বলে,
– তুমি বুঝতে পারছো না মা, তোমাকে কেমন লাগছে? মনে হচ্ছে আজ ‘সোনালী সকালে’ পরী নেমে এসেছে।
মোনা হেসে বললো,
– কোথায় পাও ইশান এসব বিশেষণ। এগুলা মেক আপের ক্রেডিট। আমি কি এত সুন্দর নাকি?
– তুমি এমনিতেই আমার এবং পাপার চোখে সেরা সুন্দরী। শোনো না এসেছিলাম একটা কাজে।
সবার দিকে তাকিয়ে মোনার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– শেপার্ডকে সব শিখিয়ে দিয়েছি।
– কি?
– আসলে কি কি করতে হবে।
– আর যদি না আসে?
– যে পরিমান বেহায়া ঠিকই আসবে।

মা ছেলের কথোপকথনের মাঝে সবাই বাগড়া দিয়ে মোনাকে নিয়ে নিচে নামতে চাইলো। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই মোনা লক্ষ্য করলো মানুষজনের সমাগম অনেক বেশি। চারদিকে মরিচ বাতি জ্বলজ্বল করছে। ইমরানের বাড়ির ডানপাশেই গ্যারেজের সাথে হলরুম করেছে। ছোট খাটো সকল প্রোগ্রাম এখানে হয়। শাহাদাৎ সাহেব পছন্দ করতেন ঘরের প্রোগ্রাম ঘরেই সারাটা। বাবার সেই পরম্পরা ধরে রাখতে নিজেই বাড়ির আঙিনায় এই রুম করে নিয়েছে। গ্যারেজে বাইরের অনেক গাড়ি। হলরুমের সদরে উপস্থিত হতেই আকাশে আতশবাজি ফুটছে। আচমকা এমন আয়োজনে উচ্ছ্বসিত চারপাশ। পেছন থেকে কেউ একজন মোনার চোখ বেঁধে দিলো। অকস্মাৎ মোনা অনুভব করলো হেলে যাচ্ছে। নিজেকে শূন্যে অনুভব করলো। নাকে স্মুথ সুগন্ধ আসছে। নিশ্চিত হয়ে গেলো কোলে তুলে নেয়া মানুষটার ব্যাপারে। ইমরান সাহেব বুঝি কোলে নিলো! আচ্ছা এত মানুষের সামনে কোলে নিতে লজ্জা লাগলো না এই নিরস মানুষটার! অন্যরকম লজ্জালু অনুভূতিতে ভেতরটা ছেয়ে গিয়েছে। গলা জড়িয়ে ধরলো। প্রেয়সীর স্পর্শ পেয়ে প্রফুল্ল হাসি ছড়িয়ে পড়েছে ইমরানের অধরে।

হলের সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখছে। ইমরান মোনালিসাকে কোলে তুলে সোজা স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বেশ রোমান্টিক ব্যাপার। বাঁধা ধরা কোনো নিয়ম আজ রাখেনি। নিজেকে মেলে ধরেছে ইমরান। খান সাহেবের ঠোঁটে হাসি দেখে আমন্ত্রিত সকলের মুখে হাসি। এতটা হাস্যোজ্বল ইমরান বহুদিন পর দেখছে সবাই। স্টেজের কাছাকাছি এসে মোনাকে দাঁড় করিয়ে দিলো। আলতো হাতে মোনার চোখ খুলে দিলো। পিট পিট করে চোখ খুলে ইমরানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসলো মোনা। ইমরান মোনাকে ঘুরিয়ে দিলো। ঘুরেই মোনা যা দেখলো তা অবিশ্বাস্য। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলোনা। সকলের মুখে হাসি একমাত্র মোনার চোখে জল। বিড়বিড় করে দুবার উচ্চারণ করলো বহুল প্রত্যাশিত ডাক। ঝাঁপিয়ে পড়লো বাবার বুকে। মিনহাজ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই দিলো। ইমরানের চোখের কোনে অশ্রু এ যেন খুশির ক্ষণ। পকেট থেকে টিস্যু বের করে কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে চোখের পানি টুকু মুছে নিলো। মিনহাজের মাথায় ক্যাপ। চুল সব পড়ে গিয়েছে। মোনা বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলো বাবা কয়েকমাসে একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে। অনেক পরিবর্তন। তবুও বেশ সুন্দর লাগছে। বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

– আমি আজকের দিনের জন্য তোমাকে চেয়েছিলাম বাবা। আল্লাহ আমাকে তোমাকে দিয়েছে। কিছুতেই মন স্থির করতে পারছিলাম না।
মিনহাজ মেয়ের চোখের পানি মুছে বললো,
– সব ক্রেডিট তোমার ইমরান সাহেবের এবং ইশানের, শাহজাদী। ওরা লোক পাঠিয়ে ধরে বেঁধে আমাকে আনিয়েছে দেশে।
মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,
– ধন্যবাদ।
ইমরান হাসছে। সবাই চলে এসেছে। আত্নীয়দের ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো মিনহাজ। মিনহাজ ভিড়ের মাঝে ইশানকে ডাকছে। ইশান কাছে আসতেই জড়িয়ে ধরলো। ইশান মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
– নানাভাই থ্যাংকিউ আমার কথা রাখার জন্য।
মিনহাজ ইশানের কথা রাখতেই থাইল্যান্ড থেকে চলে এসেছে। ইশানের এক কথা তুমি আসবে নয়তো আমি এসে তোমাকে নিয়ে আসবো। মায়ের মন খারাপ আর সহ্য হচ্ছেনা আমাদের। ইমরানের শক্ত পোক্ত জবাব, চিকিৎসা দেশে বিদেশে দুই জায়গায় করা যাবে। নিঃসঙ্গ ওখানে পড়ে থেকে জীবনের মানে হারিয়ে ফেলার অর্থ নেই। ইমরান এক পাশে দাঁড়িয়ে বাকিদের সাথে কথা বলছে। মায়া ছাড়া আজ মিনহাজের পরিবারের সবাই এসেছে। মোনার দাদী,দাদা এগিয়ে এসে ইমরানের সাথে কথা বলছে। নুরজাহান বেগম বললেন,

– আর তো বাসায় গেলানা।
– সময় পাইনা।
– বুঝি সব। ঘরে ঘরে তো এরম অনেক ঝামেলাই হয় তাই বইলা আমাগোরে ভুইলা যাইবা নাত জামাই?
ইমরান খানিকটা হেসে বললো,
– মন থেকে নাত জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছেন?
মামুন সাহেব বললেন,
– আমি শুরু থেকেই মেনে নিয়েছি। কারণ আমার নাতনীর জন্য এমন একজন জমিদারই আমরা চেয়েছিলাম।
নয়ন মাঝে টপকে বলে,
– খালাম্মা নাত জামাইরে উপহার দেন।
ইমরান হকচকিয়ে গেলো। কিসব কথাবার্তা। নুরজাহান বেগম হেসে বলে,
– হ দিমু তো উপহার আছে। ঘরে যাইয়া দিমু। বড় উপহার আদরের নাতনীটাই তো দিয়া দিলাম। ঘরটা খালি লাগে।
ইমরান হাসছে। গল্পে, আড্ডায় মেতে উঠেছে হলরুম। চয়ন এসেছে সাথে এহসান। বান্ধবীকে দেখে মোনা মহাখুশি। ইশান মাইক হাতে নিয়ে বললো,

– এটেনশন প্লিজ।
সবাই তাকালে একটা হাসি দিয়ে বললো,
– একটু কথা বলি?
সকলের মনোযোগ সেদিকে। ইশান সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– আমি ইশান ইমরান সান অভ ইমরান শরীফ এন্ড মোনাশা ইকবাল। আজকের আকর্ষণ পাপা বা মা নয়। আমার কাছে নানাভাই। যেদিন পাপা-মায়ের বিয়ে হয় তার পরদিনই তিনি আমাদের ছেড়ে থাইল্যান্ড পাড়ি দিয়েছেন। ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক যেহেতু উনারা বিজনেস করছে যেতেই পারে। আমি পাপার অনেক আদরের। পাপা ছাড়া থাকতে পারিনা। মায়ের অবস্থাও একই। যেহেতু নানীমা নেই বড় হয়েছে নানাভাইয়ের কাছে তাকে ছাড়া, এছাড়া নতুন শ্বশুর বাড়ি সব মিলিয়ে কিছুটা সময় লাগার কথা। আমি মায়ের কষ্ট টা নিতে পারছিলাম না, বাধ্য হয়ে সবাইকে রাজি করিয়ে নানাভাইকে দেশে আনাই। নানাভাই দেশের বাইরে থাকার কারণটাও বিষদ হয়তো আস্তে ধীরে জানতে পারবেন। আসার সম্ভাবনাই ছিলো না।

কিন্তু আপনারা জেনে ভীষণ অবাক হবেন এত কিছুর মাঝেও মা খুব সাবলীল ভাবে সংসার সামলে নিয়েছে। আমাকে অনেকেই বলে নিজের মা ফেলে সৎ মায়ের জন্য এত টান ভালোনা। সত্যি বলছি এই স্টেপ মা আমার জন্য যা করছে আমার নিজের মা এক জীবনে তা করতে পারতোনা, পারবেনা। আমার জীবন বাঁচাতে নিজে মরতে বসেছে। ভাবুন তো কেউ কিভাবে আরেকজনের বাচ্চার জন্য এতটা আকুল হয়! বন্ধুরা মজা করে বলে, তোর নতুন মা তো তোকে দুদিন পর আর পাত্তাই দিবেনা, আমি তখন হাসি। বোকার দল জানেই না মায়ের অর্থ। মা সত্ত্বা নারীর মাঝে জাগতে হয়। সেই সত্ত্বা জাগ্রত হলেই নারী মা হয়ে যায়, তাকে বাচ্চা জন্ম দিতে হয়না। আমি আজ সবচেয়ে বেশি খুশি পরিপূর্ণ পরিবার পেয়ে। আমার পাপা আমাকে সেই ছোট থেকে তিলতিল করে বড় করেছে। আপনাদের বেবিদের মত আমি সোনার চামচ মুখে নিয়ে বড় হইনি। পাপার কোলে মানুষ হয়েছি। পরীক্ষা দিতে দিতে পাপা খাইয়ে দিয়েছে, জ্বরের সময় পাপা বিশ্রাম নিতে ভুলে যেত, আমার প্রতি যেন অবহেলা না হয়। রাস্তায় অবধি থেকেছে আমার জন্য। পাপা আমার জন্য ওয়ান ম্যান আর্মি। এখন পাপার কাজ গুলো মা করে। মা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি কতটা লাকি ভাবুন তো!
কাঁকন এসেছে আজ দাওয়াতে। মোনা এবং ইশান দুজনই তাকে ইনভাইট করেছে। ইমরান নিষেধ করেনি ছেলের আগ্রহ দেখে। কাঁকনের মনে হলো ছেলে নিজ থেকে ইনভাইট করেছে আজ কথা গুলা শোনাবে বলে। ব্যর্থ মা। মাথা নত করে আছে। অনন্যা পাশে দাঁড়িয়ে বলছে,

– একদম ঠিক হয়েছে, তোর মত বেহায়ার জন্য।
– আমি এসব প্রাপ্য।
অনন্যাকে উপেক্ষা করে ইশানের কথায় মনোযোগ দিলো।
ইশান পুনরায় বললো,
– পাপা আমি তোমার কাছে কিছু চাইবো। দিবে?
ইমরান ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাকালো। ইশান হেসে বললো,
– মা সম্পর্কে কিছু বলো। না বলা কথাগুলো প্রকাশ করো।
বাবার হাতে মাইক দিয়ে মায়ের কাছে দাঁড়ালো। মোনা মিনহাজের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। ইমরান ছেলের দিকে তাকিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ভাবছে কি বলবে? বাবার খোলসটা খুলতেই ছেলের এই আয়োজন স্পষ্ট বুঝতে পারছে। খানিকটা সময় নিয়ে বললো,

– প্রথমে সবাইকে অনেক ধন্যবাদ আজকের জন্য। তৎক্ষনাৎ আয়োজন এই প্রোগ্রামের। তেমন কোনো পরিকল্পনাই ছিলোনা। রিক্তা ধন্যবাদ তোমাকে পুরো ইভেন্টের সব সামলানোর জন্য। আমি কৃতজ্ঞ। ইশানকে ধন্যবাদ আজকের আয়োজন এতটা আকর্ষণীয় করার জন্য। একটা সময় মনে হতো ছেলেকে এমন ভাবে বড় করতে হবে যেন সব বাঁধা পেরিয়ে নিজেই চলতে পারে। সাদাসিধা সুন্দর জীবন গড়বে। এখন আমার সেই ছেলে এতটাই গুছালো হলো আমি প্রতিনিয়ত শিখছি তার কাছে। মাঝে পাজেলড হয়ে যাই। তখন ঠান্ডা মাথায় আমাকে বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু। অনেক কথা বলতে পারিনা। কাজের কথা বলতে ক্লান্তি লাগেনা। কিন্তু অন্যক্ষেত্রে, এই যে অনুভূতি প্রকাশের জন্য বললো, মা সম্পর্কে বলতে। আমি বুঝতেই পারছিনা কি বলবো ওর মা সম্পর্কে।
মোনার দিকে ইমরান তাকালো। মিনহাজের দিকে তাকালো। সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বললো,

– এক কথায় মোনালিসা অনন্য। যার তুলনা সে নিজেই। জীবনের উত্থান পতনে তাল মিলাতে গিয়ে ভুলেই গিয়েছি কিভাবে আনন্দ উপভোগ করতে হয়। সেই তাল ফিরিয়ে এনেছে মোনালিসা। মোনালিসা এলো, ইশান সঙ্গী পেলো। আমি পরিপূর্ণ হলাম। এইতো জীবন। দোয়া করবেন সবাই।
ইশান ফ্যাকাসে মুখে বললো,
– হয়নি।
ইমরান ইশানের দিকে তাকিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,
– কেনো জানিনা আমি অনুভূতি জাহির করতে বরাবরই অপটু। আজ না পারলে হয়তো কখনোই হবেনা। মোনালিসা, আমার জীবনে প্রথম নারী তুমি নও তবে তুমিই সেই শ্রেষ্ঠ জীবন সঙ্গী। প্রচন্ড ভালোবাসি। প্রকাশ করতে পারিনা বলেই আজ সকলকে সাক্ষী রেখে বললাম, ইমরান শরীফ তার #প্রিয়_মোনালিসাকে সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছে, ভালোবেসে যাবে। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এসে ইমরানের হাত ধরার জন্য শুকরিয়া মোনালিসা।
থেমে গেলো ইমরান। বাকিরা হাত তালি দিচ্ছে। মোনা বাবার কাছে ছিলো। ইশান মোনার পাশে দাঁড়িয়ে। ইমরান দুজনের দিকে তাকিয়ে দু হাত মেলে দিলো। মোনা দু হাতে লেহেঙ্গা তুলে ছুট লাগালো, ইশান সব ফেলে দৌঁড় দিলো। দুজন আছড়ে পড়লো ইমরানের বুকে। এই দৃশ্যটা দেখতে এতটাই আকর্ষণীয় আদূরে ছিলো যে সবাই হেসে উঠল একসাথে। দুজনকে বুকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে খান বাড়ির বড় ছেলে। আফসোস তার, বাবা মা মরার আগেও জেনে গেলো ইমরান অযোগ্য। একবার যদি তাদের সামনে নিজেকে প্রমান করার সুযোগ টা পেত জীবনটা ধন্য হত। এই আক্ষেপটাই পাথুরে ইমরান গড়ে তুলেছে।

কষে থাপ্পড় মারলো কাঁকন। খাওয়ার টেবিলের সামনে একটা কোণে জটলা পেকেছে। এদিকটাতে মানুষের কম সমাগম হওয়াতে এমন একটা কাজ করেছে রিমি। সোহান এবং ইশান ডাক পেয়ে ছুটে এসেছে। আরো উপস্থিত আছে অফিসের কলিগরা। কাঁকন ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– এই বেয়াদপকে দাওয়াত দেয়ার আগে তোমার বাবা ভেবে নিলো না কেনো যে এটা বিষাক্ত সাপ।
তামান্না এগিয়ে আসলে তামান্নাকে বললো,
– ওকে ধরে রাখো। ইশান, সোহান খেয়াল রাখো। আমি আসছি।
কাঁকন সোজা হেঁটে মোনার কাছে চলে আসলো। মোনা স্টেজের পাশটাতে ছিলো। ইমরানের বুয়েটের বন্ধুরা কথা বলছিলো। কাঁকন সকলের সামনে মোনাকে উঠিয়ে বললো,
– এদিকে আসো তো মোনা।
হতবাক সকলে। ইমরান দূর থেকে লক্ষ্য করে আগাতে চাইলে কাঁকন হাতের ইশারায় বারণ করে। মোনাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে বলে,
– একটু আগে জুস পড়েছিলো ওড়নাতে খেয়াল করেছো?
মোনা মাথা নেড়ে বললো,

– হ্যাঁ, মুছে নিয়েছি। একটা বেবি ভুলে ফেলেছে। ওয়াশে দিতে হবে।
– ওটা জুস না কেরোসিন ছিলো। রিমি ফেলতে বলেছে ওই বাচ্চাকে। হাতের মধ্যে লাইটার নিয়ে ঘুরছে অঘটন ঘটাবে বলে। আমি জানতাম আজকে এমন কিছু করবে। ফোন দিয়ে আমার সাথে এসব আলোচনা করেছে। লজ্জাবোধ তো আমারও কিছু আছে। ছেলের অপমান সহ্য করতে আসতাম না। শুধু মাত্র বেয়াদপটা অন্যায় করবে জেনেও চুপ থাকতে পারিনি বলে এসেছি। এত বড় দূর্ঘটনার পরিকল্পনা করবে জানা ছিলো না। তোমার সাথে ছবি তোলার বাহানায় এসে আগুন লাগিয়ে দিত। বুঝতে পারছো কত বড় অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলো এই মেয়ে!
মোনার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। কাঁকনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার রাগে গা জ্বলছে।
– চলো।
– কোথায়?
কাঁকন হাত ধরে হলের মাঝে মোনাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভিড়ের মাঝে অনেকেই খেয়াল করছেনা। ইমরান, নয়ন দেখতে পেয়ে ছুটে আসছে। এদিকে সবাই রিমিকে প্রশ্ন করছে, সে জেদ ধরে বসে আছে। উত্তর দিচ্ছে না। কাঁকন মোনাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বললো,

– কি করবে করো। সময় পাঁচ মিনিট। তোমার গুণধর সভ্য জামাই আসলে বাঁধা দিয়ে বলবে ছিঃ মোনালিসা তুমি এসব করতেই পারোনা। শুরু করো।
মোনা এদিক সেদিক না ভেবে সব রাগ উগড়ে দিলো। রিমির চুল ধরে কষে কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে বললো,
– এত সহজে আমাকে মা/রবি। এর আগে তোর একটা ব্যবস্থা করবো।
রিমি পালটা মোনাকে ধরতে যাবে এর আগে ইশান হাত মচকে ধরেছে৷ সোহান কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। ইমরান, নয়ন কাছে আসতেই মোনা রিমিকে ছেড়ে দিলো। প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে এখানে?
জায়গাটা কর্ণারে হওয়াতে কেউ বুঝতেই পারলো না কি ঝামেলা হয়েছে। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,

– তেমন কিছুনা। মেডিসিন দিচ্ছিলাম, আপনারা যান।
ইমরান কিছু বলবে এর আগেই রিমি বললো,
– আমি নারী নির্যাতনের মামলা করবো।
ইমরান এবং নয়ন আশপাশে তাকিয়ে দেখলো। সোহানের পাশে যে ইশতিয়াক ছিলো তা কেউ টেরই পেলোনা। প্রথমবারের মত কাঁকন বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। সব আগে ইশতিয়াককে বলে এই কাজ ঘটিয়েছে। ইশতিয়াক সবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপনারা যান। আমি, মিসেস কাঁকন আর সোহান দেখছি ব্যাপারটা। ভাইয়া তুমি ভাবীকে নিয়ে যাও।
ইমরান রেগে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪১

– হচ্ছেটা কি?
কাঁকন চেতে বলে,
– দেখছো ইশতিয়াক, মোনা? জানতাম।
মোনা কাঁকনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আপা সরেন, জায়গা দেন। এই ভদ্রলোককে আমি দেখছি। ইশান আব্বা চলে আসো। ইমরান সাহেব চলুন আমার সাথে।
মোনা ইশান এবং ইমরানের হাত ধরে সামনে হাঁটছে। ইশান ঘাড় ঘুরিয়ে সোহানের দিকে তাকালো। সোহান চোখের ইশারাতে বুঝালো কাজ হয়ে গেছে। কি কাজ হয়েছে তা এখন জানার বিষয়!

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৩