প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৩
নীতি জাহিদ
অনুষ্ঠান পর্ব শেষ হয়েছে বেশ কিছুক্ষন। ঘড়িতে বেশ রাত। মোনা মিনহাজকে যেতেই দিলোনা। সকলের জোরাজোরিতে বাধ্য হলো মিনহাজ থেকে যেতে অতিথিরা যে যার যার মত বিশ্রাম নিতে চলে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষন হলো মোনা জানতে পেরেছে বাবা অসুস্থ। সেই থেকে কান্না থামছেনা। সব রাগ গিয়ে জমা হয়েছে ইমরানের উপর। নয়ন বুঝালো, মিনহাজ বুঝালো নাছোড়বান্দা মোনার একটিই বাক্য,
– তোমরা কি করে পারলে এত বড় একটি কথা আমার কাছ থেকে লুকাতে? বাবা হারানোর কষ্ট আমার চেয়ে বেশি বুঝার কথাও নয় তোমাদের। আমার কেউ নেই বাবা ছাড়া।
ইমরান অপরাধীদের মত চুপচাপ বসে আছে। কি উত্তর দিবে! এই অবস্থায় কাউকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা থাকেনা। মিনহাজ মেয়েকে বললো,
– মোনা বাবার কিছু কথা শুনো। অনেক তো হলো এসব ঝামেলা। এবার আমার সুস্থতা লুকিয়ে আছে তোমাদের ভালো থাকার মাঝে। আমি ততক্ষন সুস্থ থাকবো যতক্ষন তোমাদের হাসিখুশি দেখবো। তোমাকে এবং ইমরানকে অনেক ধন্যবাদ তোমরা খুব সুন্দর ভাবে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছ। আমার দেখে খুবই ভালো লাগছে।
মোনা বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি সব কিছু গুছিয়ে মানিয়ে নিব কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেনা কথা দাও।
– ইনশাআল্লাহ কথা দিলাম। অনেক রাত হয়েছে এবার শুতে যাও। পোশাক ছাড়ো।
ইমরানের নিশ্চুপতা এখনো ভাঙেনি। মোনা রুম থেকে বের হয়েছে পোশাক ছাড়ার জন্য। মিনহাজ নয়নের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইমরানের কি হয়েছে রে! এমন চুপচাপ সব শুনছে। এতক্ষনে তো রুম গরম হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ চুপচাপ কোণায় বসে ফোন চালাচ্ছে।
নয়ন মুখ টিপে হেসে বলে,
– সব তোমার মেয়ের কামাল বুঝলে।
– মানে?
– মোনা কথা বলা শুরু করলে চুপচাপ শুনে। কিছু বলেই না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় মোনাকে ভয় পায়।
– ইয়া আল্লাহ কি বলিস! এমন চুপসে যাওয়া ইমরান তো আমার পছন্দ না। ভয় পাবে কেনো? স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে হবে সুন্দর। নিশ্চয়ই মোনা হৈ-হুল্লোড় করে সবকিছুতে। নিতান্ত ভদ্রমানুষ বলে ও চুপ থাকে। দাঁড়া আমি দেখছি। ইমরান…
মিনহাজের ডাকে ফোন থেকে চোখ তুলে বললো,
– হুম।
– এখানে আয় কথা আছে।
ইমরান এগিয়ে এসে পাশে বসলো। মিনহাজ প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে তোর?
– কি হবে?
– এত নিরব যে।
– না এমনি তোমরা কথা বলছিলে তো তা দেখছিলাম।
– মোনা কি অনেক জালায়?
– না জালাবে কেনো?
– ভালো আছিস তুই?
একজন বাবার চোখে মেয়ের জন্য, তার সংসারের জন্য দুশ্চিন্তা যেন ফুটে উঠেছে। মিনহাজের হাত দুটো ধরে আশ্বাস দিয়ে বললো,
– খুব ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। চুপ করে ছিলাম কারণ দোষ তো আমারও ছিলো। এতদিন জানাই নি ব্যাপারটা খুব খারাপ করেছি। নিজের মাঝে অপরাধ বোধ কাজ করছিলো। ইশান আমাকে বার বার বলছিলো, পাপা উই আর কমিটিং কাইন্ড অফ ক্রাইম।
– ইশান ছোট মানুষ অনেক কিছুই বুঝেনা আরেকটা ব্যাপার যা বুঝলাম ও মোনার ন্যাওটা। মোনা কষ্ট পাবে এমন কিছু সে হতেই দিবে না তাই আবেগ থেকে এসব বলছে। যাই হোক নিজেদের মধ্যে সব মিটিয়ে নেয়। আমি ফিরে যাবার আগে।
– কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই এখন। সময় হলে সবাই মিলে যাবো। ট্রিটমেন্ট শেষ হলে তোমাকে নিয়ে ফিরবো।
নয়ন উঠে দাঁড়ায়। বললো,
– আমি বের হবো। তোমরা কথা বলো।
পরিপাটি কামরা, তবে প্রতিদিনের মতো নয়। মাঝে মাঝে মনে হয় এই বাড়িতে প্রতিটি দিনই তার জন্য উৎসব। একেকটি দিন একেক রকম সুন্দর। ইশান মায়ের সাথে কয়েকটি ছবি তুলে বলল,
– মা সব সাদা ফুল লাগিয়েছি। তুমি বেশ পছন্দ করো তাই।
মোনা হেসে বললো,
– এসব করতে কে বলেছে শুনি? তোমার পাপা দেখলে বকা দিবেনা?
– শুনো লাইফের প্রতিটি দিনই স্পেশাল। এঞ্জয় করো।
– কে শিখিয়েছে এসব?
ইশানের ঠোঁটের কোণে মলিন হাসি। নির্লিপ্ত উত্তর,
– বাস্তবতা।
মোনা ছেলের মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলে,
– যাও শুয়ে পড়ো।
রিমির সাথে আজকের ঘটনার পর রিমির অবস্থা দেখার মত ছিলো । তামান্না এবং চৈতি তাদের আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে রিমিকে রেখেছে। সাদাফ কলে সবাইকে বললো,
– আমার কেনো জানিনা রিমির জন্য খারাপ লাগছে।
তিহান হেসে বলে,
– আমার লাগছেনা। আজ হয়তো মারাত্মক কিছু একটা ঘটে যেতে পারতো। মোনা হসপিটালে থাকতে পারতো। হল রুম পুড়ে ভস্ম হতে পারতো। স্যারের জায়গায় আমি হলে শাস্তিটা আরো বাড়িয়ে দিতাম।
তামান্না বললো,
– তোর হয়তো রিমির জন্য সফট কর্ণার আছে। কয়টা ভুল কাজ করলো? আমি অবাক হয়েছি এটা জেনে যে ও স্যারকে পছন্দ করতো স্যারের টাকা দেখে। এতদিন কি একটা ভ্রমে ছিলাম! ভাবতাম মেয়েটা স্যারকে বোধ হয় সত্যি ভালোবাসে। অথচ আজ জানলাম যা করেছে, নিজেকে স্যারের পাশে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। উফ কি জঘন্য। ওর সাহস দেখেছিস বলে কি নারী নির্যাতন মামলা করবে। ওকে পুলিশে দেয়া উচিৎ। এত ধূর্ত মেয়ে, আজ ইশতিয়াক ভাই না থাকলে তো বাকিরা ফেঁসেই যেত।
সাদাফ উত্তর দিলো,
– এত সহজ! ইমরান স্যারকে আমার সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্রই মনে হয়নি। উপরে যতই ব্যাপারটা লাইটলি নিক। উনার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম উনি কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করছে। শাস্তিটা কি হয়তো সময় গেলেই বুঝতে পারবো।
চৈতি হাসছে। সকলের ওর দিকে ভস্ম করা দৃষ্টিতে বললো,
– এভাবে হাসছিস কেনো? হাসির কি হলো?
– হঠাৎ কুকুরটার কথা মনে পড়লো। ইশানের কুকুরটা কত বড়। কিভাবে দৌঁড়ালো রিমিকে। রিমি পারছিলোনা শাড়ি কাপড় খুলে ছুটতে। আরেকটু হলে কামড়েই দিত।
আচমকা সবাই হেসে দিলো। ওরা যখন বেরিয়ে যাবে। তখনই শেপার্ড রিমির পেছনে ছুটেছিলো। এক পর্যায়ে সোহান এবং ইশান গিয়ে সামলে নিয়েছে। পরশু থেকে রোজা। রিমির লাস্ট ডেট অফিসে। ইমরান জানিয়েছে এসে যেন সব ফরমালিটিস পূরণ করে নেয়।
আজ মোনার খুশির দিন। বাবা ফিরে এসেছে তবে সাথে নিয়েছে ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগ। দায়িত্ব বেড়ে গেলো। সংসার,স্বামী -সন্তান এবং বাবা।সব সামলে মোনা কি পারবে? আকাশের তারাগুলো আজ কিছুটা দৃশ্যমান। জ্বলছে মিটমিট করে। খুব মনে পড়ছে মায়ের কথা। মনে মনে মাকে প্রশ্ন করলো,
– চলে গেলে মা, কেঁদেছি, কষ্ট পেয়েছি তবুও বাবার কোল ছিলো। আজ কেনো নিঃসঙ্গ অনুভূতি ছড়িয়ে দিলে। নিয়ে যেতে চাও বাবাকে তোমার কাছে? যেও না মা। আমি পুরোপুরি এতিম হয়ে যাবো তো। কেউ থাকবেনা আমার।
দু চোখের পানি ঝরছে টুপটাপ। আইরিন আপা, রিক্তা মামী,সালমা চাচী, তুশি সবার কথা গুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছুক্ষন আগে বুঝিয়ে গেলো সংসারের মায়ার ব্যাপারে। রিক্তা বলেছিলো,
– ইমরান ভাই তোকে কতটা আগলে রাখে তুই জানিসই না। তোর জন্য সব ছেড়ে এক বছর নিজেকে কষ্ট দিয়েছে। নয়নকে ফোন দিলেই বলতো, আমি আর পারছিনা। ইশানকে নিতে চাইতোনা ইতালী কারণ বাচ্চাটা বুঝে গেলে লজ্জায় পড়ে যাবে। ইশানের বাড়ন্ত বয়স। তোকে ভালোবাসা প্রকাশ করেনি, তাই বলে এই নয় যে বাসে না। বরং এটা বলতে পারিস এতটাই বাসে যে তোর কিছু হলেই নিজেকে সামলাতে পারেনা। ছটফট করতে শুনেছি তোর অসুস্থতার দিন গুলোতে। তুই দেখেছিস কখনো?
মোনা দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
– আমি সবসময় শান্ত দেখেছি।
সালমা হেসে বলে উঠলো,
– বের করে আন, উনার ভেতর থাকা স্বাভাবিক মানুষটাকে। এতদিন আছিস অথচ বুঝতে পারলিনা স্বামী কি চায়?
তুশি বললো,
– ভাইয়া বেবি খুব পছন্দ করে ভাবী। মজা না সত্যি বলছি।
মোনা মনোযোগ নিয়ে তাকালো তুশির দিকে। তুশি বললো,
– ভেবে দেখতে পারো। তুমি সম্পর্কে বড় আমার চেয়ে, এভাবে বলা উচিত নয়। তবুও বললাম যদি বেবি আসার পর তোমরা স্বাভাবিক হও।
মোনা ধীর গলায় বললো,
– আমরা দুজনই স্বাভাবিক। আমি অনেক এক্সট্রোভার্ট, ইমরান সাহেব তার চেয়ে বেশি ইন্ট্রোভার্ট। তফাৎ এতটুকুই। দুশ্চিন্তা করোনা।
এতটুকু বলেই মোনা দম ফেললো। কথাগুলো অনায়াসে বলে ফেললেও ভেতরে কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করছে। সকলে বেরিয়ে যাবার মুহুর্তে সালমা মাথায় হাত রেখে বললো,
– নার্ভাস হোস না। তুই প্রচন্ড নার্ভাস।
মোনা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু ঘাবড়ে আছে। প্রোগ্রামে ইমরান সবার সামনে ভালোবাসি বলাতে ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলো।
দুই অপরাধীর মাথা নত। কখনো এভাবে বকা খাওয়া হয়নি। একে অন্যের হাত চেপে ধরে আছে। কক্ষের ভেতরে কি হচ্ছে তা সকলের অজানা। বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত পুরো বাহিনী। কক্ষের দুই আসামীর অপরাধ তারা শেপার্ড নামক জার্মান ব্রিডটাকে রিমির পেছনে লাগিয়ে দিয়েছিলো। যা অতি অনুচিত কাজ। তাতে কি! দুজনের মাথায় একটাই খেলা কাজ করেছে রিমিকে শাস্তি দিতে হবে। এবং তারা সফল। তৎক্ষনাৎ সফল হলেও কিভাবে যেন বাড়ির শাসক ইমরান খানের কানে চলে এসেছে শেপার্ড নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আক্রমণ করেনি, রীতিমতো তাকে আজকের আক্রমনের জন্য দু তিনদিন ধরে ট্রেইন করা হয়েছে। এখন সেই মাস্টারপ্ল্যানের দুই মাস্টারের সাজা ঘোষণা করা হবে।
– ইশান, তুমি কি জানো কতটা লো ফিল করাচ্ছো আমাকে? মানুষ কি করে এমন একটা হীন কাজ করতে পারে?
ধমকে উঠলো ছেলেকে। বাবার ধমকে কিছুটা ভয় পেয়ে সোহানের দিকে বার বার তাকাচ্ছে। বুঝা যাচ্ছে ভাইয়ের কাছে সাহায্য চাচ্ছে। এদিকে সোহান নিজেই কাচুমাচু অবস্থা। তীর টা সোহানের দিকে ধেয়ে আসলো এখন,
– আমি মানলাম ইশান বাচ্চামো করেছে, তুমি কি বাচ্চা সোহান? কতটা চাইল্ডিশ ওয়েতে এমন একটা বাজে কাজ করেছো। সবচেয়ে বড় কথা মেয়ে হিসেবে ওই মেয়ের সম্মান রাখলে তোমরা! এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোদের দুটোকে। মন চাইছে দুটোকে চড়িয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিই। কেউ দোষ করলে দোষের শাস্তি দেয়ার ও টেকনিক থাকে। আমি আমার জীবনে শুনিনি কুকুর লাগিয়ে দেয়ার কথা।
ইশান – সোহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে গেলো। এখন কি এই জাদরেল মানুষটা বাড়ি থেকে বের করে দিবে! তাহলে এত রাতে কোথায় থাকবে গিয়ে। ইশান মনে মনে ভেবে নিয়েছে নয়নকে ফোন দিয়ে ওখানে চলে যাবে। দরজায় অনবরত ধাক্কা। প্রথম কয়েকবার উপেক্ষা করেছে। ধৈর্য্য হারিয়ে দরজা খুলে চেঁচিয়ে উঠলো,
– কি সমস্যা?
পেছনে বাড়ির মানুষ সব দাঁড়িয়ে আছে। দরজা ধাক্কা দিয়েছে মোনা। এখনো মেয়েটা পোশাক ছাড়েনি। হন্তদন্ত হিয়ে বেরিয়েছে রাবিয়ার কাছে ঘটনা শুনে। মোনার দিকে তাকিয়ে বজ্রকন্ঠে বললো,
– কি হয়েছে? এখানে কি?
ইমরানের দিকে ভস্ম হওয়া নজরে তাকিয়ে সকলের সামনেই হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলো। ইতস্তত বোধ করলো ইমরান। তাকে একপাশে সরিয়ে হনহন করে ভেতরে ঢুকে সোহান আর ইশানের হাত ধরে বের করে আনলো কক্ষ থেকে। ছেলে দুটোর মুখ শুকিয়ে কাঠ। ইমরানের দিকে তাকিয়ে সূক্ষ্ম নজরে মোনা বললো,
– দুজনকে নিয়ে গেলাম যা ক্লাস নেবার পরে নেবেন। সারাদিন এরা কিছুই খেতে পারেনি৷ আপা, ইশান আর সোহান বাবাকে খাবার দাও।
সিড়ির কাছে এনে দুজনের হাত ছেড়ে দিলো। দুজনই ইমরানের দিকে তাকাচ্ছে ভীত চোখে। মোনা পেছন থেকে রাম ধমক দিলো,
– কি হলো যাও। খেয়ে দুজন শুয়ে পড়বে।
ইশানকে মোনা চোখ রাঙাতেই ছুটে নেমে গেলো। আইরিন বুকে হাত দিয়ে হাঁপ ছাড়লো। ইমরান তখনো আগের জায়গায় অনড়। এভাবে ওর শাসনে আজ অবধি কেউ ব্যাঘাত ঘটায় নি। তুশি ঢোক গিলে ননাশকে বললো ফিসফিস করে,
– আপা, ভাইয়া কি ভাবীকে সবার সামনে ধমকাবে?
আইরিন শুকনো কাশি দিয়ে গলা ঝেড়ে নিলো। মলিন চোখে তাকিয়ে শুধু দু শব্দে উত্তর করলো,
– আল্লাহ জানে।
তুশি পুনরায় বললো,
– এখন যদি রুমের অবস্থা দেখে তাহলে তো সবাইকে বাসা থেকে বের করে দিবে।
– পালা এখান থেকে। বাকিদের ও নিয়ে যা। তুফান যে কোনো দিক দিয়ে আসতে পারে।
ইশতিয়াক এগিয়ে এসে বললো,
– ভাইয়া, মানে মিনহাজ আংকেল তো রুমে রেস্ট নিচ্ছে। এখন যদি তুমি রাগ করো তবে…
ঠান্ডা গলা ইমরানের,
– সবাই শুতে যাও।
একটু সামনে এসে মোনাকে জোর আওয়াজেই বললো,
– কাজটা ঠিক হয়নি।
– শাসন করার জন্য আপনাকে বিশ মিনিট সময় ভেতরে দেয়া হয়েছে। প্রসেস এত লেনদি হলে তো ঝামেলা। বিশ মিনিট কেউ আপনাকে বিরক্ত করেনি। কোনো কিছুরই ওভার ডোজ ভালো নয়। শাসন কার্য শেষ। এখন স্নেহের পালা। ওটা আমার ডিপার্টমেন্ট। আপাতত আপনি বিশ্রাম নিন। ভেতরে নিশ্চয়ই আদর করে কথা বলেন নি? শরীরের শক্তির অপচয় হয়েছে অনেক। বিশ্রাম করে সেই শক্তির পুনরায় যোগান দিন। এছাড়া ডাক্তারও বলেছে আপনার বেশি রাগারাগি, চেঁচামেচি করা অনুচিত। আমি এখন ছেলেদের সামলে নিব আপনি যান।
পাশ কাটিয়ে আইরিন, তুশি, আশফি- মাশফির স্ত্রী নেমে গেলো। খালা ফুফুদের ইশতিয়াক কামরায় নিয়ে গেলো। মোনা ইমরানকে সেই অবস্থায় রেখে নিজের কক্ষে ঢুকে দরজা দিল। বউয়ের ধারালো সব কথা শুনে ইমরান অপ্রতিভ।
রুমে ঢুকেই মেজাজ বিগড়ে গেলো। পুনরায় সাজানো হয়েছে এই রুম। সকলে মিলে কি তামশা শুরু করেছে! আইরিনকে ফোন দিয়ে ঝেড়েছে খানিকটা। আইরিন উলটা ঝাড়ি দিয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। খানিকটা সময় বসে থেকে খেয়াল করলো মোনা বারান্দা থেকে আসছে না। নিজেকে প্রশান্ত করে এগিয়ে গেলো বারান্দার দিকে।
– ঠান্ডা লাগবে ভেতরে এসো।
প্রগাঢ় স্বর শুনে ঘাড় ঘুরালো। একান্ত পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে রিসিপশনের পোশাকে।
দিনগুলো সব রঙ হারালো ,
আঁধার রাতের আহবানে ।
রাধাচূড়া মুখ লুকালো,
কৃষ্ণচূড়ার আলিঙ্গনে ।
বসন্তের কোকিল এখনো ডেকে ডেকে উঠে। শীত ও গরমের মিশ্র অনুভূতি। ইমরান মোনাকে দেখে চমকে উঠলো। চোখ সরিয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সফল হলো না। কিছুক্ষন আগে এই অবস্থায় ছিলোনা। অঙ্গ জুড়ে সোনায় মোড়ানো। ইমরান নিশ্চিত এই কাজ আইরিনের। তার বহুদিনের শখ ছিলো ইমরানের বউকে নিজের হাতে সব গয়না পরাবে। শাড়ি পরিয়েছে বাঙালি ধাঁচে। মেরুন রঙা কাতান যেন জ্বলজ্বল করছে কায়া জুড়ে। ব্লাউজের পেছন দিকটা বেশ বড়, সুচারু নকশায় হাতের কাজ। চোখ ফেরানো দায়। কানের গোড়ায় বাগানের লালচে কমলা রাধাচূড়া ফুল।
মোনা বারান্দা পেরিয়ে রুমে এলো। কথা বলছেনা ইমরানের সাথে। চারপাশটা মনোমুগ্ধকর ভাবে সাজানো। সহসা ইচ্ছে করলো সব রাগ, মনঃপীড়া ভুলে খানিকটা প্রশান্তি আগলে নিতে। ইমরান শান্ত স্বরে বললো,
– আজ রাগ না করলে হয়না?
মোনা ঘাড় কাত করে সায় জানালো। মনকে শান্ত করেছে বেশ কিছুক্ষন হলো। দুজনের দৃষ্টি মিলে লেগে কিছুটা বিচলিত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। খাটের একপাশে বসলো। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– চেঞ্জ করে আসুন।
– করতেই হবে?
– এভাবে থাকবেন?
– কেমন লাগছে বললে না যে? তোমার দেয়া স্যুট পরলাম তো।
– হ্যান্ডসাম লাগছে।
শব্দ করে হেসে বললো,
– সে কথা তো প্রতিনিয়ত বলে সান্ত্বনা দাও।
– নারী পুরুষের সৌন্দর্যে আটকায় না। আপনার কাছে হ্যান্ডসামের মানে কি শুধুই আউটলুক! নারী আটকায় প্রিয় মানুষটার দায়িত্ববোধে, স্নেহে,যত্নে এবং ভালোবাসায়।
– আমি তো অনুভূতিহীন বলেই সবাই জানে।
– কখনো বলেছি।
– মুখে প্রকাশ করা হয়নি হয়তো।
– এত কথা বুঝেন, এটুকু বুঝেন না কি চাই?
– বেশি বুঝাতে চাইলে যদি ভুল বুঝে বসে থাকো?
– বুঝিয়েই দেখুন।
ইমরান হেসে উঠে দাঁড়িয়েছে। কাভার্ড খুলে মোনার দিকে তাকালো। পরিচিত দৃষ্টি। মোনা জানে কেনো তাকিয়েছে। মুচকি হেসে বললো,
– কালো পাঞ্জাবিটা পরুন।
পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে ইষৎ হেসে ফ্রেশ হতে চলে গেলো। টাওলে চুল মুছে রুমে এসে দেখলো মোনা গয়না খুলছে। পাশে বসে প্রশ্ন করলো,
– হেল্প করবো?
মোনা কান থেকে হাত সরাতেই কানের দুল খুলে দিলো সযতনে। ভারী দুলে কান জোড়া লাল হলো। গলার সীতাহার খুলে দিলো। মেরুন শাড়ির রঙটা যেন আলোড়ন তুলেছে কন্যার গায়ে। এর মাঝে গয়না। কোমরে সোনার কোমড় বন্ধনী। প্রতিটি গয়না সযতনে খুলতে সক্ষম হয়েছে ইমরান। একেবারে জমিদার গিন্নী । ইমরানের মা-দাদীর গয়না সব। আইরিনের কাছ যে টুকু সংরক্ষণে ছিলো। দেখেই চিনে নিয়েছে। মোনা নাকের ছোট্ট নোলকটা খুলতে যাবে ইমরান বাঁধা দিয়ে বললো,
– এটা কি ব্যাথা দিচ্ছে?
– নাহ।
– তবে, এটা খুলো না প্লিজ।
মোনা হাত সরিয়ে নিলো নাকের উপর থেকে। প্রশ্ন করলো,
– কেনো?
– এভাবে কখনো নোলকে কাউকে দেখিনি। চোখ ফেরাতে পারছিনা। তোমাকে আজ সত্যি জমিদার গিন্নী লাগছে।
মোনা মুখে হাত দিয়ে হেসে বলে,
– আমি তো তাই
– কি করবেন এখন? ঘুমাবেন না?
– আরেকটু দেখি?
মোনা লজ্জা পেয়ে মাথা নত করলো। পরবর্তীতে বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব?
– হুম।
– আপনি বেবি পছন্দ করেন?
ইমরানের ঠোঁটের কার্নিশে হাসি। চোখে মুখে উল্লাস নিয়ে বললো,
– অনেক। ইনফেক্ট আমি চাই যে বাড়িতে অনেক বেবি থাকুক।
মোনা মাথা নুয়ে বললো,
– আমাকে তো একবারো বলেন নি।
ইমরান না বুঝে উত্তর দিলো,
– বলে কি লাভ। এত বেবি কোথায় পাবো? বেশ কিছুদিনের মধ্যে অবশ্য আরেকটা বেবি আসবে। সামান্তার বেবি হলে তিনটা হবে তাই না। ইতু,ইশান আর সামান্তার বেবি। সোহানকে বিয়ে করিয়ে দিই, কি বলো? তবে চারটা বেবি পাবো।
মোনা মাথা তুলে হতভম্ব হয়ে ইমরানের দিকে তাকালো। কি বুঝালো আর কি বুঝলো! ইমরান তখনও নিষ্ক্রিয়। সম্বিত পেয়ে মোনার দিকে সহসা তাকিয়ে দেখলো মোনার অবাক হওয়া দৃষ্টি। অকস্মাৎ কিছু মনে হওয়াতে ইমরান বাক্য ভুলে গিয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে সামলে নিতে বলে উঠলো,
– তুমি কি কোনোভাবে খালাম্মা আর ফুফুর কথার জেরে এসব ভাবছো?
মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– নাহ। সবাই বলে আপনি বেবি পছন্দ করেন তাই বললাম।
– ওহ আচ্ছা।
– শুয়ে পড়ো।
মোনা চুলে খোঁপা করবে ইমরান বাঁধা দিয়ে বললো,
– ছেড়ে রাখো। তোমার চুলের গন্ধ খুব সুন্দর।
আনত হলো রমনীর লাজুক মুখ। খাটে পা তুলে বসলো। ইমরান তখন ধীর গলায় বললো,
– মোনালিসা…
– হুম।
– আমাকে বেবি দিবে?
এতটা দিন তেমন লজ্জাই পেলোনা অথচ আজ সব লজ্জা একসাথে ভর করেছে। মোনা তো ভেবেছে ইমরান তখন কথাটা বুঝতেই পারেনি। মোনার কথার প্রতিউত্তর সেই মুহুর্তে দিলেও হয়তো লজ্জারানী ভর করতোনা। প্রসঙ্গ বদলে ফেলার পর এমন কথা শুনে মোনা মাথাই তুলতে পারলো না। শাড়ির আঁচলের কোণা আঙ্গুলে পেঁচিয়ে একবার প্যাচ দিচ্ছে পরের বার খুলছে। ইমরান দু অধর চেপে হাসছে। মুখ খানা স্বাভাবিক করে বললো,
– আজ কি রুমের চারপাশে লজ্জাদের আনাগোনা বেড়েছে?
মোনা চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো। কৌতুহলী দৃষ্টি। নিরবতা ভেঙে মোনা বললো,
– আমি তো বারণ করিনি।
– সময় নিতে চাও না?
দু পাশে মাথা নাড়ে রমনী। আচানক ইমরান মুচকি মুচকি হেসে বলে,
– প্রতিদিন বাসর রাত লাগে কেনো এই কামরাকে? আজ কে সাজিয়েছে?
– ইশান, সোহান এবং সামান্তা।
– সুন্দর সাজিয়েছে। কপাল ভালো যে আমি রুমে আসার আগে পালিয়েছে।
– আপাকে তো ফোনে ঠিকই ঝেড়েছেন।
– আপা তো নাম বলেছি আসামীদের। আর এতদিকে খেয়াল রাখো কেনো? ছিলে তো বারান্দায়।
– যেভাবে গলা ছেড়েছিলেন। রাখতে হয়। মানুষ গুলা আমার।
মোনা খাট থেকে নেমে বললো,
– ইমরান সাহেব আবহাওয়াটা সুন্দর ছাদে যেতে চাই।
মোনার কাছ থেকে মিনিট খানেক সময় চেয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বারান্দায় গিয়ে ফোন দিলো কাকে যেন। এসে মোনাকে বললো,
– ছাদেই যাবে? নাকি বাইরে যাবে?
– এত রাতে?
– যেতে চাও কিনা বলো?
মোনা খুশিতে মাথা ঝাঁকি দিয়ে বললো,
– হুম চাই চাই। আমাকে সময় দিন শাড়িটা পালটে নিই।
– ফিরবো নাতো আমরা আজ। চেঞ্জের প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে এভাবেই চাই আজ রাতে।
মোনা বিস্মিত হয়ে বললো,
– যাচ্ছি কোথায়?
ইমরান হেসে বললো,
– চলো আগে।
পেছনে আঁচল টেনে দিলো মোনার। গাড়ির চাবি নিয়ে রুম লক করে দিলো। বাড়ির দরজা পেরোচ্ছে তখনই মুখোমুখি হলো খালা এবং আশফির স্ত্রীর। খালা তো প্রশ্নই করে বসলো,
– বউ নিয়া কই যাস বাপ এত রাতে?
ইমরান লজ্জা পেলেও নিজেকে সামলে বললো,
– খালা একটু কাজ পড়ে গিয়েছে। রাতে ফিরবোনা। তোমরা শুয়ে পড়ো।
আশফির স্ত্রী বললো,
– চাচাজান, এই অবস্থায় যাবেন? চাচী জান তো শাড়ি চেঞ্জ ও করেনি। কোনো এমার্জেন্সী?
– দুশ্চিন্তা করো না বৌমা। আমি সামলে নেব। শুয়ে পড়ো।
খালা কথা বাড়াতে চাইলেও আশফির স্ত্রী আন্দাজ করে বাঁধা দিলো। বাড়ি থেকে বের হয়েই গাড়িতে চুপচাপ বসলো। ইমরানের প্রাণোচ্ছলতা দেখছে মোনা। অজানা উদ্বেগ। কোথায় নিয়ে যাচ্ছে মানুষটা এত রাতে! গাড়ি যখন সুনশান রাস্তা ধরলো,স্পিড তখন ১২০। মোনা ভয় পেয়ে ইমরানের হাত খামছে ধরলো। ইমরানের চক্ষুস্থির সম্মুখে। মনে হয় যেন রেসে নেমেছে। চোখে মুখে অপরিচিত সাহস। মিনিট বিশেকের মাথায় লোকালয়ে প্রবেশ করলো গাড়ি। আশপাশটা দেখে মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা রাত। রাস্তাটা মোনার অপরিচিত। বাইরে দোকানগুলোর সাইনবোর্ডে দেখলো লিখা গুলিস্তান। ইমরান টানা এক ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে বললো,
– ভয় পেওনা। তোমার ইমরান সাহেব এতটা অপটু নয় গাড়ি চালানো তে। বয়স পেরোলেও স্বভাব পেরোয় নি। আঠারো থেকে বিশ বছর পর্যন্ত ঢাকার রাস্তার রাত গুলো জানে রেসিং এ বিট করতে পারতোনা কেউ ইমরানকে সেই সময়। পরিস্থিতি, সময় বদলেছে পরিবর্তন এনেছি নিজের মাঝে।
মোনা নিষ্পলক চেয়ে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষটা বেশ চমৎকার। মোনা প্রশ্ন করলো,
– আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক ঝাপটে বললো,
– অজানায়।
ইমরান হঠাৎ গেয়ে উঠলো,
– আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো
হারিয়ে যাবো আমি তোমার সাথে
সেই অঙ্গীকারের রাখী পরিয়ে দিতে
কিছু সময় রেখো তোমার হাতে।
মোনা চমকে গেলো। ইমরানের দিকে খানিকটা এগিয়ে এসে ইমরানকে আগলে ধরে, কাঁধে মাথা রাখলো। কিভাবে যেন মানুষটা মনকে প্রফুল্ল করে দিলো। ইমরান মুচকি হেসে বললো,
– আরেকটি গান শুনাই, আমার বেশ প্রিয় একটি গান। আমি যেমন দোষী, হাজারটা দোষ করে তোমার মন খারাপের দায়ভার নিই। এই গান ও তেমন দোষী, তবে আমার মন ভালো করার দায়ভার নেয়।
– মানে?
– গানের নাম গুরুচন্ডালী। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রন। জানোই তো বাংলা ভাষায় একে গুরুচন্ডালী দোষ বলে। শুনবে?
– অবশ্যই।
– শোন তবে। তোমাকেই উৎসর্গ করলাম।
“এমনও নিদানের দিনে বিনীত প্রার্থনা গো, লক্ষ্য-কোটি ভুল আর ত্রুটি করিও মার্জনা গো, শোনাইবো তোমারে আজ করেছি বাসনা গো,
ঐরাবতের হৃদয় হতে ক্ষুদ্র এ রচনা-
আমি কি করিব? কোথায় যাব?
কোন সাধনে পাব গো?
আর একটি বার তোমারই দর্শন
আর একটি বার তোমারই দর্শন
কোন বাধনে বাধি?
আমি কেমনে তোমায় রাখি গো?
তুমি ছাড়া হৃদয় অচেতন”।।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪২
আর কত মুগ্ধ করবে মানুষটা! এতটা মোনা আশা করেনি। একটু করে যেন উপভোগ করছে জীবন। নতুন ভাবে উন্মোচিত হচ্ছে জীবনের সুখ। এই ইমরান গোমরামুখো নয়। নিজেদের আজ পালিয়ে যাওয়া প্রেমিকযুগল মনে হচ্ছে। যারা পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়েছে হারিয়ে যাচ্ছে অজানা আনন্দে।
