Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৪
নীতি জাহিদ

হুলস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে দিয়েছে লঞ্চটাতে। কিছুক্ষনের মাঝেই স্যারের গাড়ি এসে পৌঁছাবে। লঞ্চ সাজিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। প্রোগ্রাম শেষ করে সজীব ঘাটে পৌঁছেছিলো দশটায়। স্যারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে এই লঞ্চ ব্যবহার করা হয়। ফোন করে বলার পর থেকে ইমরানের পারসোনাল স্যুট নিজেদের মতো গুছিয়ে সাজিয়েছে লঞ্চে কর্মরত সকলে। সজীব, সারেং এবং হেড ইঞ্জিনিয়ার তিনজনই ফুল হাতে বেরিয়ে এলো তাদের অভ্যর্থনা জানাতে।
গাড়ি গুলিস্তান পেরিয়ে থেমেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। এত জায়গা থাকতে কিনা নিয়ে এলো বুড়িগঙ্গার পানি দেখাতে! ইমরান মোনার হাত ধরে এগিয়ে আসছে। মোনা হতবিহ্বল হয়ে প্রশ্ন করলো,
– এত সুন্দর গান শুনিয়ে আপনি আমায় এই পঁচা পানি দেখাতে আনলেন ইমরান সাহেব?
ইমরান এমন প্রশ্নে অবাক হয়ে হেসে দিলো। ঠিকই তো মোনা কি আর জানে এখানে নিয়ে আসার কারণ। হাত টা আরেকটু শক্ত করে ধরে হাসতে হাসতে বলে,

– তুমি কি জানো বুড়িগঙ্গা ঘিরে কত ইতিহাস। ধলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ভুত। লেখকেরা কত গবেষণা করেছেন এই নদীর সৌন্দর্য্য নিয়ে। পৃথিবীর বড় বড় শহরের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী- সাগর ঘিরে, লন্ডন টেমসের তীরে, সুইডেন বাল্টিক সাগরের তীরে, ইতালী টাইবারের তীরে এছাড়া আরো অনেক। নদী,সাগর এবং সভ্যতা ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। গিরধর জোশী কি বলেছিলেন জানো? বলেছিলেন – “যদি তুমি প্রবাহিত নদীর মতো উদ্দেশ্যহীন জীবনকে উপভোগ করতে শেখ, তবে তুমি বেঁচে থাকার শিল্প শিখেছ।” এছাড়া নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ (আদি পর্ব) বইয়ে বুড়িগঙ্গার উৎপত্তি নিয়ে লিখেছেন। কত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী আর তুমি এভাবে বলছো। হ্যাঁ মানছি কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। তা তো আমাদের দোষ তাই না।
– আপনি যেখানেই যান ওখানকার ইতিহাস কি মুখস্ত করে ফেলেন?
ইমরান খানিকটা হেসে বলে,
– জানার কি আর শেষ আছে রে পাগলী? যত জানবে তত শিখবে। আর এই শেখার মাঝেই জীবনের প্রকৃত সুখ খুঁজে পাবে। আচ্ছা বাদ দাও গল্প শুনবে বুড়িগঙ্গার?
মোনা মুখটা ফ্যাকাসে করে বললো,

– শুনছি বলেন।
ইমরান বলার আগেই সজীব তার দলবল নিয়ে হাজির। ফুলেলে অভ্যর্থনা দিয়ে লঞ্চের ভেতর নিয়ে গেলো ইমরান-মোনা দম্পতিকে সকলে। নির্দেশ অনুযায়ী আজ রাতে লঞ্চ নদীর আশপাশটা ঘুরে দেখাবে। লঞ্চ সাজানো দেখে ইমরান মৃদু ধমকে বললো,
– এমন সাজানো কেনো লঞ্চ! কার বিয়ে ছিলো।
বাকিরা ভয়ে থতমত খেয়ে গেলেও সজীব বসের স্বভাব জেনে বললো,
– স্যার কারো বিয়ে না, আমাদের লঞ্চ প্রায় সাজানো থাকে। দূর থেকে দেখতে সুন্দর লাগে।
এমন উত্তর ইমরানের মনপুত হয়নি, সে জানে এই আয়োজন তার জন্য। তবুও সে কথা বাড়ায় নি। সজীব ও এই সুযোগ নিয়ে এমন কথা বলেছে। স্যার ম্যাডামের সামনে কথা বাড়াবেনা জানে। ইমরানের আসল রূপ সহজেই কারো সামনে বের হয়না। দ্বিতীয় তলার রুমের সামনে এসে বারান্দায় দাঁড়ালো দুজন। বাকিরা চলে গেলো। টুকটাক নাস্তার ব্যবস্থা করেছে সজীব। রাতে খাবেনা বলে আগেই জানিয়েছে ইমরান। লঞ্চ চলতে শুরু করলো। ঝিরিঝিরি বাতাস মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। বারান্দার কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,

– গল্প শোনান। শেষ করেন নি তো তখন।
ইমরানের মাথায় আসছে না কিসের গল্প। পরে মনে পড়াতে ভাবলো সেই ইতিহাস যদি শোনায় মেয়েটা বিরক্ত হতে পারে। এমনিতে বুড়িগঙ্গা দেখেই নিশ্চয়ই মেজাজ চটে আছে। এর চেয়ে অন্য ইতিহাস শোনানো যাক। বললো,
– বুড়িগঙ্গার গল্প?
– হুম হুম।
– বুড়িগঙ্গার ইতিহাস শুনলে বিরক্ত হতে পারো। বুড়িগঙ্গার গল্প না বলে, বুড়িগঙ্গার তীরে জমিদারের গল্প বলি?
– ওয়াও বলেন। আমি অনেক এক্সাইটেড।
– ওকেএএএএ। শোনো তবে… ওই যে বুড়িগঙ্গার ওপারে খুব সুন্দর সুন্দর গ্রাম আছে। প্রায় একশো বছর আগের কথা। তখন তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। জমিদারদের মাঝে অনেক মিলমিশ ছিলো। সেখানকার এক জমিদারের নাম ছিলো মোহাম্মদ শহীদুল কবির খান। তার ছিলো তিন বউ। তিন বউ তিন গ্রামের। তিনি গ্রাম বেছে সুন্দরীদের বিয়ে করেছিলেন। তার বড় বউয়ের ঘরে একটি ছেলে সন্তান নাম সানোয়ার কবির খান আর ছোট বউয়ের ঘরে একটি কন্যা সন্তান, নাম নাহার জাহান। মেজো বউ ছিলেন সন্তান হীনা। স্বভাবতই দুই সতীনের সন্তান আছে তার নেই ব্যাপারটা দুঃখজনক। কিন্তু জমিদার সাহেব তার মেজো বউকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। কেনো জানো?
মোনা অবাক হয়ে শুনছে। প্রশ্ন করলো,

– কেনো?
– কারণ মেজো বউ ছিলো শান্ত স্বভাবের মিষ্টভাষী। তার বাবার আর্থিক অবস্থা বাকিদের চেয়ে অস্বচ্ছল থাকার সত্ত্বেও কোনো লোভ ছিলোনা তার। এবং সেই বউ রূপবতী তো ছিলেনই সেই সাথে ছিলেন গুণবতী। জমিদার মশাইয়ের যখনই দুশ্চিন্তা হতো, কোনো সমস্যার সমাধান পেতেন না মেজো বউয়ের ঘরে উপস্থিত হতেন। তার ধারনা অনুযায়ী তিনি মেজো বউয়ের মাঝে সুখ খুঁজে পেতেন। এই কাজ বাকি দুই বউয়ের দিনে দিন চক্ষূশূল হয়ে দাঁড়ালো। এছাড়া জমিদারের একটা সফট কর্ণার তো ছিলো। সবার পুত্র,কন্যা আছে অথচ মেজো বউ একেবারে একা। জমিদার সাহেব সঙ্গ দেয়া তো ভুল নয় তাই না! দিন যায়, কয়েক বছর পেরোয়। জমিদারের ছেলে-মেয়েরা বড় হতে থাকে। জমিদার ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের কাজে। তখনই সু সংবাদ আসে মেজো বউয়ের সন্তান হবে। এই সংবাদ পেয়ে জমিদার খুশিতে আত্মহারা। জমিদার বাড়িতে নেমে আসে খুশীর জোয়ার। দুঃখের সংবাদ হলো বাকি দুই বউয়ের মনে হিংসার আগুন জ্বলে উঠলো। তারা কোনোভাবেই এই সন্তানকে দুনিয়ার মুখ দেখতে দিবেনা। এতে জমিদারের সম্পদ যে তিনভাগ হয়ে যাবে। বিভিন্ন ভাবে কৌশলে হত্যার চেষ্টা করে সেই সন্তানকে। প্রতিবারের বিফল হয়। দশ মাস পর মেজো বউ জন্ম দেয় তার পুত্র সন্তান শফিক কবির খানকে। জমিদার দুই বউয়ের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে নতুন বাড়িতে রাখে স্ত্রী-পুত্রকে। অনেক বছর পেরিয়ে যায়।

জমিদার পরপারে পাড়ি জমায় এরপর পুত্র শফিক মাকে নিয়ে একা থাকতো। বাবার অল্প কিছু রাজকার্য পেলো। বাকি সব অন্য পক্ষের ভাইয়ের দখলে। শফিকের চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে অন্য গ্রামের জমিদার তার কন্যাকে বিয়ে দেন। সেই কন্যার প্রতি চোখ ছিলো তার বড় ভাইয়ের। শফিক একটু বোকা স্বভাবের হলেও তার বুদ্ধিমতি স্ত্রীর সুবুদ্ধিতে স্বামী এবং শাশুড়ীকে নিয়ে বাবার সহায়তায় গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। বড় ভাই সানোয়ার কবির খান তাদের সুস্থভাবে থাকতে বাঁধা দিচ্ছিলেন গ্রামে। বাংলার রাজধানী তখন কলকাতা। এরপর থেকে নতুন জীবন শুরু। তাদের ঘর সংসার শুরু। তাদের ঘরে পুত্র কন্যা হলো। শফিক কবির খানের ঘরে দুই কন্যা ও তিন পুত্র হয়। দেশ ভাগের পর ঢাকা আসে। এরপর ঢাকাতে তাদের বানিজ্য শুরু হয়। তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের ঘরে জন্ম গ্রহন করে এক কন্যা ও দুই পুত্র। কন্যা ছিলো রুপে গুনে মহীয়সী। আর জ্যেষ্ঠ পুত্র সে তো মহা গুণী ব্যাক্তি। বেশ বিখ্যাত। তুমি চেনো তাকে। নাম শুনবে?
মোনা উচ্ছ্বসিত হয়ে হাতে তালি দিয়ে বললো,

– ওয়াও আমি চিনি। আল্লাহ আমার কি খুশী লাগছে। কি নাম?
– বিখ্যাত আধুনিক জমিদার ইমরান শরীফ খান।
দু অধর আলগা করা বদনের চোয়ালদ্বয় ঝুলে গেলো মিনহাজ কন্যার। মোনার মনে হলো পুরো গল্পটাই একটা ঢপ ছিলো। বুড়িগঙ্গা থেকে জমিদার, জমিদার থেকে কলকাতা, এরপর ঢাকা, এরপর ব্যবসা এখন বলে আধুনিক জমিদার! মোনার থুতনি ঠেলে মুখ বন্ধ করে নমনীয় মেয়েলী অধরে আপন অধর আলতো ছুঁয়ে ইমরান বললো,
– গল্পটা সুন্দর না বউসোনা?
মুখ,ঠোঁট কুঁচকে মোনা বললো,
– এভাবে বানোয়াট কাহিনী বললেন আমাকে! আমি আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম।
ইমরান হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। এদিকে মোনা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকলো ইমরানের দিকে। হাসি নিয়ন্ত্রণ করে ইমরান বললো,

– বিশ্বাস করো শুধু বুড়িগঙ্গার ওপারে গ্রাম ছিলো ওটা বানোয়াট। কিন্তু সত্যি হলো শহীদুল কবির খান আমার পরদাদা, শফিক কবির খান আমার দাদা, এবং তার জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহাদাত শরীফ খান আমার বাবা আর আমি ইমরান শরীফ খান। মজার ব্যাপার হচ্ছে আপা সেদিন আনারকলি ফুফুর কথা বলেছিলেন মনে আছে? বংশের সেরা সুন্দরী। কিন্তু ফুফুর বিয়ে হয়নি কখনো।
– হ্যাঁ। সেই আনারকলি ফুফু হলে বড় দাদা মানে, শফিক কবির খানের অন্য পক্ষের ভাই সানোয়ার কবির খানের কন্যা। শুনেছি বড় দাদীর কৃতকর্মের ফলই ফুফু ভোগ করেছেন। এক সময় সব সম্পর্কই ঠিক হয়েছিলো। ততদিনে তো সবাই পরপারে পাড়ি দিয়েছেন।
– তার মানে আপনি সত্যি জমিদার ছিলেন?
– বলতে পারো। কিন্তু আমি নিজের কষ্টের টাকায় জমিদার। আমার বাবা পর্যন্ত বেশির ভাগই তাদের বংশীয় সম্পদ ছিলো। আমি কারো টাকায় হইনি।
মোনা ভাবনায় হারালো। উপন্যাসের মত মোনাও জমিদারের বউ হয়ে গেলো। ব্যাপারটা বেশ বিস্ময়কর। অকস্মাৎ নদীর ঢেউ বড় হলো। বাতাসের তীব্রতা বেড়ে গেলো। বৃষ্টি শুরু হলো। ইমরান তাড়া দিলো কেবিনে প্রবেশের জন্য। কেবিনে ঢুকেই দুজন চমকালো। কেবিন ও সাজানো ফুলে। মোনা না পেরে হেসে দিলো। ইমরান চুপচাপ বসে পর পর দু পাশে মাথা নেড়ে ঠোঁট চেপে হেসে বলে,

– আজ পুরো জগৎ চাচ্ছে ইমরানের ঘরে পূর্ণিমা আসুক। কি একটা অবস্থা। যেখানেই যাই রুম সাজানো। নাহ! এভাবে কি আর অপেক্ষা করা যায়?
মোনা ঘাঁবড়ে গিয়ে বললো,
– এখানে কি? আমরা কতক্ষনই বা থাকবো এখানে। আমি এক কাপড়ে বেরিয়েছি ইমরান সাহেব।
ইমরান মোনার হাত ধরে উঠিয়ে কেবিনের কাভার্ড খুলে কোমড় জড়িয়ে ধরলো। মোনার মেয়েলী কাঁধে থুতনী রেখে বললো,
– এটা আপনার স্বামীর ব্যক্তিগত কামরা। এখানে সব রকমের নিরাপত্তা আছে ইনশাআল্লাহ। যেখানেই আপনার স্বামীর অস্তিত্ব থাকবে সেই সব জায়গা আপনার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের ঘর হয়ে হয়ে যাবে। দেখুন প্রতিটি চেম্বারে আপনার জন্য শাড়ি, জামা ও বিভিন্ন রকম পোশাকে সজ্জিত। আপনাকে নিয়ে নদীতে একটি রাত কাটানোর ইচ্ছে অনেক আগের। চমকে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। তাই কিছু পোশাক এনে রেখেছি। কিন্তু ভাবিনি আজ রাতেই সেই সুযোগ পেয়ে যাবো। দুশ্চিন্তার কি আর কোনো কারণ আছে?
মোনা আনত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। ইমরান পাঁজকোলা করে তুলে নিলো স্বীয় নারীকে। বিছানায় বসিয়ে নিজে মেঝেতে বসে পড়লো। মোনার পা হাঁটুতে নিতেই পা সরিয়ে নিতে চাইলো মোনা।

– সরাবেনা।
পকেট থেকে একটি সোনার পায়েল বের করে রমনীর পায়ে পরিয়ে দিলো। মোনা পায়েলের দিলে তাকিয়ে বললো,
– আরেকটা গিফট!
– যতবার ইমরান মোনালিসাকে নিজের করে গ্রহন করবে ততবার মোনালিসা সম্মানিত হবে।
মোনা চেয়ে আছে স্বামীর দিকে। হঠাৎ উদ্ভট এক প্রশ্ন মাথায় এলো। করেও ফেললো,
– এভাবে কি কাঁকনকে ও ভালোবেসেছিলেন?
আচমকা এমন প্রশ্নে মোনার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। ইমরানের চোখ দেখে মোনার মনে হলো রেগে গিয়ে ধমকাবে। তবে তা না করে নির্লিপ্ত উত্তর ইমরানের,
– সেই সুযোগ কাঁকন দেয় নি আমাকে। সত্যি বলতে প্রেম যখন করেছিলাম ওকে সব এক্সপেন্সিভ শপিং করে দিতাম। টাকা টুকটাক থাকতো পকেটে তখন। বাবার টাকা। পকেট গরম। ওর পছন্দ অন্য রকম যা আমার পছন্দ হত না। তাই নিজ থেকে পছন্দ করে ওকে কিছু কিনে দেয়া হয়নি। দিলে ওর পছন্দ হতোনা। বিয়ের পর তো আমার অভাবের সংসার ওর ভালো লাগেনি। আর রইলো ভালোবাসার প্রশ্ন। ও আমার ভালোবাসার একশো ভাগের দশ ভাগ ও পায়নি। তবে যতটুকু পেয়েছে তার শক্তি কতটা জানিনা, তা পাওয়ার জন্যই মরিয়া হয়ে উঠেছিলো পুনরায়। তার চাক্ষুষ সাক্ষী তো স্বয়ং মোনালিসা, তাই নয় কি! সেটা ওর দূর্ভাগ্য বলা যায়।

– আর আমি?
ইমরান শব্দ করে হেসে উঠলো।
– ইশান এসেছিলো আকস্মিকতায়,, আর ঔশান আসবে তোমার আমার সম্মতিতে। এছাড়া ইমরান নিজের সব কিছু উজাড় করে দিতে পারে এই রমনীর জন্য। তবে বুঝে নাও কতটা ভালোবাসি!
মোনা চমকে প্রশ্ন করলো,
– ঔশান কে?
– আমার জুনিয়র মোনালিসা।
মোনা লজ্জা পেয়ে বললো,
– নাম কখন ঠিক করলেন?
– তোমার আমার বিয়ের দিন রাতে।
– আল্লাহ, আল্লাহ আপনি এত দূর ভাবলেন! যদি জুনিয়র ইমরান আসে?
– আসলে আসবে, আবার চেষ্টা চলবে। আমার ঔশান চাই। ছোট্ট মিষ্টি পাখির ছানা। উড়ে উড়ে বেড়াবে। কিচিরমিচির করবে। আর কি লাগে জীবনে?
হাতে গোলাপের পাপড়ি নিয়ে মোনা দেখছে। নাকে গন্ধ শুকে বললো,

– একদম সতেজ।
– তোমার মতো।
– আপনি খুব ভাল ফ্লার্ট করেন।
– আমি জানি। আমি কিন্তু মারাত্মক অসভ্য মোনালিসা।
– দেখে তো মনে হয়না।
ইমরান মোনার মুখের কাছাকাছি এসে ধীর গলায় বললো,
– তুমি জানোনা, কতটা?
উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় ইমরান পত্নী। ইমরান পরনের পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বলে,
– মোনালিসা গরম লাগছেনা?
মোনা ফিক করে হেসে দিলো। মুখে হাত দিয়ে স্বর টেনে বললো,
– অনেএএএএক। কিন্তু বাইরে ঝুপঝাপ বৃষ্টি।
– তাতে কি? কেবিনে তো উত্তপ্ত হাওয়া।

মোনা জানে মানুষটার প্রেম নিবেদনের ভাষা। রমনীর মেহেদী রাঙানো দু হাত নিজের মুষ্টিতে নিলো। অধর ছোঁয়ালো দু হাতে। আবেশে চোখ বুজলো মোনা। ইমরান ঠোঁট ছোয়ালো মোনার সুন্দর আঁখিতে। মাথায় থাকা আধ ঘোমটা খুলে দিলো। খোঁপার কাটায় টান দিলো। ঘাড় বেয়ে নেমে এলো কেশরাশি। রাধাচূড়াগুলো চুল থেকে খুলে নিলো। নাক গুজলো চুলে। চোখ বুজে আওড়ালো নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতা,
– শুধু একবার তোমাকে ছোঁব,
ঐ আনন্দে কেটে যাবে সহস্র জীবন।
শুধু তোমাকে একবার ছোঁব,
তারপর হব ইতিহাস।
অসংখ্য আদুরে উষ্ণ পরশে সিক্ত মোনার গলা, ঘাড়, মোনার ক্ষত শুকানো বুক,পেট। নমনীয় অধর আজ অধরাবৃত প্রিয় পুরুষের স্পর্শ। ভালোবাসায় সিক্ত কায়া। এই স্পর্শ অপরিচিত নয়। তবুও ভালোবাসার পুরুষের প্রতিটি স্পর্শ প্রতিবার নব্য অনুভূতি জাগায়। স্থির ইমরানের অস্থিরতায় মোনা মিটিমিটি হাসছে। ইমরানের সব রূপে মোনা প্রেমে পড়ে যায়। কাতানের আঁচল সরিয়ে ইমরান বলে উঠলো,

– ঠিক বলেছো শাড়িটা বদলানো উচিত ছিলো। এত ভারী কেনো এই শাড়ি। প্রচন্ড বিরক্ত করছে।
মোনা হাসছে অধৈর্য্য পুরুষের কথা শুনে। পুরুষালী গলা জড়িয়ে ধরে মোনা বললো,
– ভালোবাসি ইমরান সাহেব।
মোনার অধরে আলতো অধর ছুঁয়ে ইমরান হেসে উত্তর দেয়,
– মোনালিসার অতৃপ্ত হৃদয় পরিতৃপ্তি পাওয়া অবধি ভালোবেসে যেতে চাই। ইমরানের সবটুকু সত্ত্বা দিয়ে ভালোবাসি বউসোনা।
মোনালিসা চোখের পলক ঝাপটে খিলখিল করে হাসছে। দু হাত বাড়িয়ে দিলো সামনে। ইমরান ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। প্রিয় পুরুষের খোঁচা খোঁচা দাড়ি যুক্ত মুখটা কাছে টেনে সাহস করে খসখসে ঠোঁটে এই প্রথম নিজ থেকে অধর ছোঁয়ায়। ইমরান হেসে বলে,

– বাহ! এত সাহস। ইমরানের যোগ্য রমনী।
ইমরান মোনাকে বিরক্ত করতে নিজের গাল লাগালো নরম মেয়েলী গালে। গতবার মোনা রাগ করে বলেছিলো, আপনার খোঁচা দাঁড়িতে আমি ব্যাথা পাই। আজ মোনা হেসে বললো,
– আজ আমি বিরক্ত হবোনা, ইমরান সাহেব।
ইমরানের বুকে নাক ডুবিয়ে বললো,
– সেই স্পেল। ইটস হিলিং মাই মাইন্ড ইমরান সাহেব।
ভালোবাসার কমতি ছিলোনা এই রজনীতে। দুজনই আজ নিজেদের সবটুকু উজাড় করেছে। মনের আলাপন হয়েছে। রাখেনি কোনো গোপনীয়তা। ভালোবাসা গভীর হলো। আকাশে বজ্রপাত বৃদ্ধি পেলো। আজ প্রকৃতি যেন আনন্দে মেতে উঠেছে ইমরান-মোনা দম্পতির ভালোবাসা উদযাপনের খুশিতে।
বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। লঞ্চ দুলছে। এলোমেলো শাড়িতে মোনা উঠে অনুরোধ গলায় ইমরানকে বারান্দায় যাওয়ার কথা জানায়। দরজা খুলে লঞ্চের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুজন দেখতে পেলো নদীর আন্দোলিত রূপ। মোনার দৃষ্টি ঢেউয়ে। ইমরানের এক হাত মোনার উন্মুক্ত কোমড়ে অন্য হাত বারান্দার রেলিংয়ে। মোনার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৩

– কি দেখো?
– আমার তেইশ বছরের জীবন।
– বুঝিনি?
– একদিন রিসোর্টের সুইমিং পুলের পানিকে জীবনের সাথে তুলনা করেছিলাম। তখন আপনি ছিলেন না কাছে। আজ আপনি আছেন পাশে। আর আমার জীবনটা নদীর মতো আনন্দের জোয়ারে ফুলেফেঁপে উঠেছে ইমরান সাহেব। ধন্যবাদ সবকিছুর জন্য। আমাকে সহ্য করার জন্য। আমাকে ভালোবাসার জন্য।
শক্ত করে ছোট্ট প্রেয়সীকে বুকে আগলে নিয়ে ইমরান আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আমি কৃতজ্ঞ মহান রবের নিকট, মোনালিসা। তোমাকে দিয়ে আমার না পাওয়া সমস্ত সুখের প্রাপ্তি ঘটিয়েছেন।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৫