প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৫
নীতি জাহিদ
সকালের নাস্তা সেরে দুজনই বেরিয়ে পড়বে। লঞ্চে নাস্তার মোটামুটি ভালো আয়োজন করেছে সজীব। গোলাপি আনারকলিতে মোনাকে সদ্য ফোটা পদ্ম মনে হচ্ছে। ইমরানের ফোনে ক্রমাগত ফোন ঢুকছে। বাসা থেকে অস্থির হয়ে গিয়েছে। ইশান ফোন দিচ্ছে। মোনা কিছুতেই ইমরানকে ফোন রিসিভ করতে দিচ্ছেনা। এখান থেকে বের হয়ে ফোন ধরতে অনুরোধ করেছে। নতুবা এক গাল মিথ্যা বলবে। ব্যাপারটা লজ্জার। লঞ্চ পুরো এক রাতের রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষ করে ভিড়লো ঘাটে। নাস্তা শেষে পাটাতন বেয়ে টার্মিনাল ছেড়ে গাড়ির কাছে চলে এলো ইমরান- মোনা যুগল। সজীবের সাথে টুকটাক আলোচনা করে ইমরান গাড়িতে উঠার আগেই উষ্ঠা খেলো পাথরের সাথে। গাড়ির ডোর ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো। বাকিরা ছুটে আসতেই হাত দিয়ে থামিয়ে বললো,
– আমি ঠিক আছি।
মোনা ধরে প্রশ্ন করলেন,
– ইটের টুকরাটা বেশ বড় ছিলো। ব্যাথা পেয়েছেন?
– না না, ঠিক আছি। গাড়িতে বসো।
সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ি সদরঘাট ছাড়লো। আশপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখলেও কিছু একটা মনের মাঝে খচখচ করছে আজ। সকালে অনাকাঙ্ক্ষিত মেইল পেলো,
‘ Best of Luck Mr. Khan ‘
সেই থেকে মনের মাঝে সন্দেহ কাজ করছে। কিছুটা উচাটন, চিন্তা পীড়িত মন। অনেক সময় মস্তিষ্ক ভুল সিগনাল ও দেয়। ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। জগনের ব্যবস্থা সজীব করে ফেলেছে। মোনার মন বাইরে। জানালার ওপাশে শহুরে জীবনের রোজকার রুটিন, কষ্ট, দৈন্যতা সবটা সূক্ষ্ম ভাবে পর্যবেক্ষনে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। কত জীবন, কত নিয়ম, রঙ বেরঙের জীবনের কত গাঁথা রচিত হয় এই শহুরে পিচ ঢালা রাস্তার মাঝে। কত সুখ- দুঃখের সাক্ষী এই নগরী।
পুনরায় কল ঢুকলো ইমরানের ফোনে। মোনার দিকে তাকাতেই বুঝালো, রিসিভ করুন। ইমরান ফোন রিসিভ করতেই শুনতে ছেলের উদ্বিগ্ন কন্ঠ,
– পাপা, আসসালামু আলাইকুম। কোথায় তোমরা? কখন থেকে ফোন দিচ্ছি।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম, চ্যাম্প। এইতো বাবা গাড়িতে আসছি আমরা। তুমি নাস্তা করেছো?
– নাতো সবাই বসে আছে। সাড়ে ন’টা বাজে। নানাভাই চলে যাবে। তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
– নাস্তা করে নাও। তোমার নানা ভাইকে একটু দাও তো।
ইশান মিনহাজের হাতে ফোন দিলো।
– হ্যাঁ ইমরান বল, তোরা কোথায় আছিস?
– আসছি আমরা। তুমি খেয়ে নাও। আমাদের আর এক ঘন্টা লাগতে পারে। যেও না বসো।
– মোনা আছেনা তোর সাথে।
– হ্যাঁ আছে, কথা বলবে?
মোনা ফোন নিয়ে বললো,
– বাবা, থাকো। আমরা আসছি।
– ঠিক আছে আসো। সাবধানে।
– তুমি কিন্তু ঔষধ খেয়ে নাও। এরপর প্রতিদিন আমি যত্ন নেব।
– আচ্ছা, মা। আসো।
ফোন গাড়ির সামনের চেম্বারে রেখে বললো,
– কি একটা অবস্থা করলাম সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছে।
– তুমি বাসায় গিয়ে প্রথম লজ্জা পাবে কেনো জানো?
মোনা হতচকিত হলো। লজ্জা! লজ্জা কেনো? চোখের পলক ঝাপটে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– কেনো কেনো?
– কেউ না বললেও খালা বলতে পারে। শাড়ি নেই, জামা কেনো পরনে।
মোনা নিজের দিকে তাকিয়ে পুনরায় মাথা তুলে ইমরানের দিকে তাকালো। এই প্রশ্ন যদি সবার সামনে করে মান সম্মান বলে কিছু কি থাকবে! এমন একটা অসম্মানজনক ব্যাপার। ইমরান হেসে বললো,
– তোমার এই স্বভাবটাই আমার অপছন্দের। এসব ছোটখাটো ব্যাপার ট্যাকেল দিতে পারবেনা তুমি? এরচেয়ে পাহাড়সম সমস্যা সমাধান চুটকিতে করে ফেলো। রিমির চুল টেনে দিচ্ছো, অনন্যাদের কথায় হারিয়ে দিচ্ছো। এখন এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে দুশ্চিন্তার সমুদ্রে ডুব দেয়ার মতো কিছু তো দেখছিনা আমি।
– এই প্রশ্ন আপনাকে করলে কি করবেন?
– বলবো, একটু কাজে লঞ্চে থাকতে হয়েছিলো । বৃষ্টি ছিলো ভিজে গিয়েছি। তাই পোশাক পরিবর্তন করতে হয়েছে। দ্যাটস ইট। এত চিন্তার তো কিছু নেই।
খুশিতে মোনার চোখ চকচক করে উঠলো। ইশ! কি সহজ সমাধান আর এদিকে মোনা রাজ্যের চিন্তা করে বেড়াচ্ছে। গাড়ির চেম্বারে হাত দিয়ে সেখান থেকে একটা চকলেট বের করে মোনার হাতে ধরিয়ে দিলো ইমরান। মোনা চমকে উঠে বললো,
– এটা এখানে ছিলো? রাতে দেন নি কেনো?
– মাথা খারাপ নাকি আমার! রাতে এমনিতেই নিজের মাঝে ছিলাম না। এই জিনিস দিলে তো আজকে বাসায় ফেরা লাগতো না। তুমি কি আমাকে এত সুবিধার পুরুষ ভেবে নিয়েছো? হাহ! আমি জানিনা আমি কি? গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তুমি আমার শখের নারী।
মোনা চকলেটের এক বাইট মুখে দিতে দিতে মুচকি মুচকি হাসছে। মানুষটা নিজের সম্পর্কে বলা এমন বেপরোয়া কথা গুলো ভীষণ উপভোগ করে মোনা। কেউ নিজেকে কি করে এভাবে উপস্থাপন করে! ইমরানের চোখ সামনের রাস্তায় স্থির। হাত স্টিয়ারিং এ। মাঝে মাঝে গিয়ারেও রাখছে। স্পিড এখন স্বাভাবিক। মোনার দিকে না তাকিয়ে বললো,
– কি এত মুগ্ধতা নিয়ে দেখছো আমাকে?
– আমার হাতের চকলেট আর আপনার গায়ের রঙ একই। এখন ভাবছি…
ইমরান কথা কেড়ে নিয়ে বললো,
– ভাবছো কোনটা আগে খাবে তাই তো?
মোনা লজ্জা পেয়ে জোর আওয়াজে বললো,
– ইমরান সাহেব… আপনি দিন দিন মারাত্মক অসভ্য হচ্ছেন। আমি এই কথা আমার ভাবনাতেও আনিনি। ভাবছিলাম দুইটাই এত আমার প্রিয় কেনো?
এর মাঝে ইমরান গলা ছেড়ে বললো,
– শিট…
মোনা সামনে তাকিয়ে দেখে বিখ্যাত বিজয় সরনীর জ্যাম। ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রচন্ড বিরক্ত মুখাভঙ্গী। এই জ্যাম কয় ঘন্টা বসিয়ে রাখবে তার ইয়ত্তা নেই। পাক্কা এক ঘন্টা পর ছেড়েছে। মোনা ঘুমিয়ে পড়েছিলো জ্যামের মাঝেই। উঠে বললো,
– পানি আছে?
ইমরান চেক করে দেখলো পানি শেষ। একটু সামনে গিয়ে গাড়ি একপাশে রেখে বললো,
– তুমি বসো আমি এক বোতল নিয়ে আসি। এক লিটার?
– না হাফ।
দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো রাস্তার বিপরীত পাশে। মোনার গাড়িতে বিরক্ত লাগাতে বাইরে এসে দাঁড়ালো। পানির বিল মিটিয়ে ইমরান রাস্তা পার হবে দেখতে পেলো উলটো দিকে, ভুল সাইডে সাদা মাইক্রো ছুটছে তার গাড়ির দিকে। গাড়ির ডোর ওপেন। ও পার থেকে চেঁচিয়ে বললো,
– মোনালিসা সরো।
ইমরানের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে মোনা সরে যাবে এর আগেই একটা বাইক এসে মোনার সামনে দাঁড়িয়ে মোনাকে আটকে দিলো। ইমরান ছুটে রাস্তা পার হবে, তখনই একটা সি এন জির সাথে খুব জোরে বাড়ি খেয়ে ছিটকে গেলো কিছুটা। প্রতিটি ঘটনা এত দ্রুত ঘটে গেলো যে আঁচ করার সময় টুকু পায়নি কেউ। ততক্ষনে মাইক্রো চলে গেলো। ইমরান পড়ে গিয়েছিলো। গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে, বুঝলো আগের অপারেশন করা পায়ে প্রচন্ড ব্যাথা পেয়েছে। উঠে দাঁড়াতে পারছেনা। পা চিনচিন করছে। প্যান্ট রক্তে রঞ্জিত। আশে পাশের মানুষ এসে ধরে উঠালো। দূর থেকে দেখতে পেলো মোনার সামনে এখনো একটা বাইক দাঁড়িয়ে আছে। কোনো রকম পা খুঁড়িয়ে লোকজনের সাহায্য নিয়ে সামনে আসতেই মোনা ঝাঁপিয়ে পড়লো বুকে। এক হাতে মোনাকে আগলে নিয়ে বাইকারের দিকে তাকাতেই, সেই ছেলে হেলমেট খুলে বললো,
– স্যার আপনি ঠিক আছেন?
– সজীব তুমি?
– সকালেই আমার কেমন যেন লাগছিলো। তাই আপনার পেছনেই ছিলাম এতক্ষন। এবারের কেস টা তো ভিন্ন।
ইমরান মোনাকে আগলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের ব্যাথা ভুলেই গিয়েছে। মোনার চোখ ইমরানের পায়ে পড়তেই দেখতে পেলো অফ সাদা প্যান্টটা হাঁটু থেকে পায়ের গোড়ালি অবধি রক্তে লাল। চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– আপনার পা, ইমরান সাহেব।
সজীব ও ভয় পেয়ে গেলো। ইমরান আশ্বাস দিয়ে বললো,
– ও কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ঠিক আছো এই অনেক আমার জন্য।
সজীব হাতের হেলমেট গাড়ির রুফে রেখে রাস্তায় বসে পড়লো। ইমরান বকা দিলেও শুনলোনা। রাস্তার লোকজন জোরাজোরি করছে কতটুকু কি হয়েছে আগে দেখতে। গাড়ির দরজা খুলে এক পাশে বসলো। সজীব যত্ন করে জুতা মোজা খুলে প্যান্ট উঠাতেই দেখতে পেলো পুরো পা কেটে, ছিলে গিয়েছে। অনেক জায়গায় থেতলে গিয়েছে। র*ক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। গাড়ি থেকে ফার্স্ট এইড বক্স নামিয়ে চেপে ধরলো। যতটুকু সম্ভব প্রাইমারি চিকিৎসা দিলেও স্টিচ লাগবে বুঝা যাচ্ছে। কোনো রকম গজ দিয়ে পেঁচিয়ে দিলো। এর মাঝে আরো কয়েকজন ছেলে সজীবের ফোন পেয়ে চলে এসেছে৷ হাসপাতাল পর্যন্ত এলো। ইমরান নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। ইমরান এতটা শান্ত থাকেনা। ব্যাথা কি বেশি হচ্ছে? পায়ে প্রায় আটটা সেলাই লেগেছে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নিরবে মেয়েটা। চোখের পানি ঝরছে অঝোরে । সজীব বলে উঠলো,
– ম্যাডাম দুশ্চিন্তা করবেন না। স্যার ইনশাআল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে। স্যার সবসময় বাম পায়ে আঘাত লাগা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতো, আগেরও এক্সিডেন্ট এই পায়ে। আমার ধারণা মতে ব্যাথা বেশি পেয়েছে।
মোনা কাঁদতে কাঁদতে বলছে,
– আমি একটুও চিন্তাহীন থাকতে পারিনা ভাইয়া। কখনো বাবা, কখনো উনি কখনো বা আমি নিজে। এত বিপদ কেনো। উনার এই শান্ত রূপ আমার ভালো লাগছেনা। কিছুক্ষন আগেও মানুষটা সুস্থ ছিলো। এখন বিছানায়।
– ম্যাডাম সব তো আল্লাহর ইচ্ছে। শুকরিয়া এই ভেবে যে হাড়ে লাগেনি। হতাশ হবেন না।
মোনা দুচোখ মুছে আদেশের স্বরে বললো,
– আজকের ঘটনার পেছনে যে বা যারাই থাকুক। আমি এদের চাই। নিজ হাতে শাস্তি দিব। আমার সুখ কেড়ে নিতে এসেছিলো। আমি ওদের টা কেড়ে নিব।
সজীব বিস্মিত হলো এত দৃঢ় আদেশ তো স্যার দেয়। মনে মনে হাসছে আর ভাবছে, এজন্যই স্যার এই নারীর কাছে নিজেকে সঁপেছে। কখনো কোমল তো কখনো দৃঢ়।
সকাল সকাল নাস্তা নিয়ে হাজির সালমা এবং রিক্তা। ‘সোনালী সকালে’ নাস্তার পসরা। যাদের উপলক্ষ্যে নাস্তা আনা তারাই গায়েব। নয়ন তখন থেকে মজার কথা শুনিয়ে সবাইকে হাসাচ্ছে। মনসুর এক পর্যায়ে বলে উঠলো,
– তোমার মুখে লাগাম নাই ভাই। মানে যা তা। মোনা আমাদের মেয়ে, ইমরান ভাই আমাদের জামাই একটু তো রয়ে সয়ে বলো।
রিক্তা মনসুরকে সাপোর্ট করে বললো,
– আরো কিছু বলো তো বেশরমটাকে। ওর শব্দের অত্যাচারে ইমরান ভাই পালাই পালাই করে। মানুষটাকে নাজেহাল করে ছাড়ে।
মিনহাজ হাসছে। পরিবারটা তার আজ ভরপুর লাগছে। অভাব শুধু মাইশার। মনে মনে মহান রবকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে সেই সাথে মাইশাকে ভেবে বলছে, মাইশা তুমি থাকলে আমরা দুই বুড়ো বুড়িতে মিলে মেয়ের সুখের সংসার দেখতাম। দেখো চারদিকে কত আনন্দ।
নয়ন মনসুরকে ইঙ্গিত করে বললো,
– শুন মনসুর, ইমরান আগে আমার বন্ধু পরে ভাগ্নী জামাই। বুঝছিস কাল থেকে রোজা তাই ও বউ নিয়া ঘুরতে গেছে। রোজার সময় তো আর পারবেনা। বেটা চালাক আছে। আসুক আজকে।
সেই মুহুর্তে আইরিনের চিৎকার শোনা গেলো। সকলে সেদিকে নজর দিলো। ঘড়িতে তখন প্রায় দুপুর বারোটার কাঁটা পেরিয়েছে। ইমরান হুইল চেয়ারে। সজীব, রবিন পাশে। মোনার হাতে ইমরানের যাবতীয় জিনিসপত্র সব। থমকে গেলো সোনালী সকালের আনন্দের ঘন্টা। আইরিন ভাইকে ধরেই স্তব্ধ। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। সেলাইয়ের ব্যাথা একটু করে ছাড়ছে। ইমরান নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে বোনকে বললো,
– আপা এটা তেমন কিছুই না। কেঁদো না। একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবো।
চিৎকার শুনে ইশান ছুটে আসছে নিজের কামরা থেকে। মিনহাজের করুন চোখ ইমরানে স্থির। ইমরান সেদিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো মানুষটা কথা বলছেনা। হয়তো আশা করেনি এমন ইমরানকে। সজীবকে ইশারা দিতেই মিনহাজের কাছে হুইল চেয়ার নিয়ে এলো। মিনহাজের হাত ধরে আশ্বাস দিলো,
– ঠিক আছি। দুশ্চিন্তা করোনা। আমি হাঁটতে পারি। এরা জোর করে এই চেয়ারে বসিয়ে আমাকে অসুস্থ বানানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
মিনহাজ দম ফেলে বললো,
– উপরে খাবার পাঠালে মোনা খাইয়ে দিও। যা রেস্ট নে। সব আমরা পরে শুনবো। স্টিচ লেগেছে?
মোনা মাথা নেড়ে বলে,
– আটটা
চারদিকে অমোঘ ছায়া যেন গ্রাস করে নিচ্ছে সব। ইমরান সকলকে আশ্বাস দিয়ে বললো,
– ঠিক হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।
অনেক কষ্টে রবিন এবং সজীব ধরে উপরে উঠালো। ইশান বাবার সাথে লেপ্টে আছে। মোনা একটু খাবার খাইয়ে দিতেই ইমরানের ঘুম পেলো। ঘুমের ঔষধের প্রভাব। বাড়ির বাকিরা অপেক্ষা করছে পুরোপুরি ঘটনার শোনার জন্য। ইমরান ঘুমিয়ে যাওয়ার পর মোনা এবং সজীব দুজন সব খুলে বলতেই মিনহাজ এবং নয়নের কপালে চিন্তার ভাঁজ। মিনহাজ নয়নকে ইশারা দিতেই দুজন আড়াল হলো। ইশান বেশিক্ষন নিচে ছিলোনা আলোচনায়। বাবার কাছে এসে পাশে শুয়ে ছিলো। বাবার কি লাগবে না লাগবে দেখার জন্য। এদিকে মোনা পোশাক ছেড়ে আইরিন ও বাড়ির অন্যদের সাথে কাজে হাত লাগিয়েছে। ইমরানের জন্য কিছু খাবার তৈরি করছে। আজ সবাই বিদায় নিবে। থাকবে শুধু খালা এবং ফুফু। আইরিন আর ইমরানের অনুরোধ ছিলো এই বছর রোজা এবং ঈদ যেন উনারা দুজন এখানেই পালন করেন।
– কোথায় গিয়েছিলে বাবা?
মায়ের দিকে তাকিয়ে ইতস্তত বোধ করলো ইশান। মাকে বাবার পাশে ঘুমে রেখেই বের হয়েছিলো। হয়তো উঠে গিয়েছে। বাড়ির সবাই যে যার যার কাজে ব্যস্ত। বের হওয়ার সময় বলে যায় নি। মোনা হাতে নাস্তার ডিশ নিয়ে কামরায় যাচ্ছিলো। তখনই দেখলো ছেলে বাইরে থেকে ঢুকছে। ভেবেছিলো কামরায় আছে। কিন্তু বের হলো কখন! সচরাচর বের হলে তো বলে যায়। ইশান মায়ের প্রশ্নের উত্তরে বললো,
– মা এই তো আমার একটা বন্ধু এসেছিলো, এই যে এই নোট টা দিতে। কোচিং এর। সেটা নিতে গিয়েছিলাম। কলেজ খুললেই তো ক্লাস শুরু। বন্ধের মাঝে একটু পড়বো। পাপার কি অবস্থা?
সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মা ছেলে কথা বলছে। ইশান মায়ের পিছু নিলো। মোনা আগে হাঁটছে। ইশান ডান হাতটা নিজের বুকের উপর রেখে বুঝলো হার্ট রেট ভালোই স্পিডি। স্পিড উঠা নামা করছে। আরেকটু হলেই ধরা খেতো। খাতা টা হাতে নিয়ে বের হয়েছিলো বলে বাহানা টা যথার্থ হলো। দুজন রুমে ঢুকেই দেখলো ইমরান বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছে। ইশান ছুটে গিয়ে বাবাকে ধরলো,
– পাপা নামছো কেনো?
– একটু ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার বাবা।
ইশান বাবাকে ধরে ওয়াশরুম পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসলো। মোনা খাবারের ডিশটা এক পাশে রেখে অপলক চেয়ে আছে সেদিকে। বাবার জন্য দরজার বাইরে ছেলে অপেক্ষা করছে। ইমরান বের হতেই ইশান ধরে আবার নিয়ে আসলো। আজ মোনার মনে হলো সব কিছুর জন্য মোনা দায়ী! গাড়ি থেকে বের না হলেও তো পারতো। মানুষটা কেমন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। পায়ে কোনো রকম ভর টুকু দিতে পারছেনা।ডাক্তার থাকতে বলেছে হাসপাতালে সে তাতেও রাজি হয়নি। খাটে বসে ইমরান বললো,
– কাল থেকে রোজা। ইশান, তোমার ডা. তওহীদ আংকেলকে ফোন টা ধরিয়ে দাও পাপাকে। মেডিসিনের রুটিন টা জেনে নিই। কখন কখন খেতে হবে।
ইশান মোনা দুজনই সমস্বরে বলে উঠলো,
– কিহ? রোজা রাখবেন?
ইমরান থতমত খেয়ে বলে,
– আস্তে, কি হলো তোমাদের মা ছেলের। রোজার দিন, রোজা রাখবোনা?
মোনা চোখ বড় বড় করে বললো,
– কিভাবে রাখবেন? আপনার কতগুলা ঔষধ। এই শরীরে?
– শোনো মোনালিসা, আমার জ্ঞানত বুদ্ধি হবার পর আমি কখনো রোজা না রেখে থাকিনি। পায়ে ব্যাথা সেরে যাবে। অমন কিছুই নয়। রোজা ছুটে গেলে আমি ফিরে পাবোনা। পরে রাখার স্কোপ থাকে অনেক কিন্তু আমাদের রাখা হয় কোথায়? আর এই মাসের মাহাত্ম্য থেকে আমি কিছুতেই নিজেকে বঞ্চিত করতে রাজী নই। এটা নিয়ে আর কথা নয়। তোমরা খেয়েছো?
মোনা আর কথা বাড়ায় নি। সম্মতিতে মাথা নাড়লো। স্যুপের বাটিটা ইমরানের মুখের সামনে ধরে খাওয়াতে যাবে ছেলের সামনে হঠাৎই ইমরান ইতস্তত বোধ করলো। ইশান চোখ নামিয়ে ডাক্তারকে ফোন দিতে ব্যস্ত। মোনা অন্য মনস্ক হয়ে বললো,
– আমি খাইয়ে দিচ্ছি। হা করুন?
– দাও আমি খেয়ে নিতে পারবো।
ইশান ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। ইমরান মোনার দিকে তাকাতেই মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– ছেলে ছোট নেই। স্পেস দিয়েছে। খেয়ে নিন।
খেতে খেতে ইমরান বললো,
– তোমার মন খারাপ কেনো?
মিনিট খানেক অপলক চোখে তাকিয়ে মাথা নোয়ালো। নিজের ভেতর কষ্ট টা উজাড় করতে চাইছে। পারছেনা কেনো? ইমরান বুঝতে পেরে বললো,
– মোনালিসা, দূর্ঘটনা কি বলে কয়ে আসে? এত দুশ্চিন্তা করোনা। দোয়া করো সব ঠিক হবে।
চোখ দিয়ে বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে মোনা বললো,
– আমি কটা চিন্তা নিব বলুন তো। বাবার এই অবস্থা, আপনার এই অবস্থা। আমি একদম অপয়া।
– খবরদার!
ধমকে উঠলো ইমরান। ইশান ছুটে এলো বারান্দা থেকে। এসে দেখে মায়ের চোখে পানি। ফোনে ঔষধের সমস্ত কিছু জেনে নিয়েছে ডাক্তারের কাছ থেকে। বাবার পাশে বসে বললো,
– বকছো কেনো মাকে?
– আজে বাজে কথা বললে বকা খাওয়াটা স্বাভাবিক।
মোনা নাক টেনে স্যুপের চামচটা বাড়িয়ে দিলো। ইমরান নাকোচ করে বললো,
– আর খাবো না। আমি বিশ্রাম নিব। দুজনই যাও রুম থেকে।
ইশান দাঁড়িয়ে হেসে বললো,
– মা থাকো আমি গেলাম। খবরদার ভুলেও পাপাকে একা ছেড়ে যাবেনা এখন। সারাজীবন রাগ একা করতে করতে পাপার রক্তে মিশে গিয়েছে একা থাকা।
ইমরান ছেলের কথায় ভ্রু কুঁচকে বললো,
– মাঝে মাঝে তো তুমি ভুলে যাও আমি তোমার বাবা তাই না?
ইশান ও গলা উঁচিয়ে বললো,
– আমি সবসময় মাথায় রাখি তুমি আমার বাবা, কিন্তু তুমি ভুলে যাও তুমি একজন সতেরো বছর বয়সী ছেলের বাবা। যেভাবে জেদ করছো এভাবে জেদ ছোট বাচ্চারা করে। বি ইজি পাপা।
– যাচ্ছো কোথায়?
– আসছি। তুমি স্বাভাবিক হও এরপর। মা বেশি করে প্যাম্পার করো। নতুবা দেখা যাবে সেলাই করা পায়ে উঠে সবাইকে বকে ধমকে একাকার করছে। পাপা আমি জানতাম আমাকে প্যাম্পার করা লাগে, কিন্তু ফুফির কাছে শুনলাম তুমি আমার চেয়েও বেশি ন্যাওটা ছিলে দাদী আম্মার। তোমাকে মুখে তুলে না খাইয়ে দিলে নাকি খেতে না। এই দিক থেকে ইশান ইজ ফার বেটার দেন ইউ। আমাকে কেউ খাইয়ে না দিলে আমি কাঁদি না। হা হা হা।
ইশান বেরিয়ে গেলো। ইমরান তাজ্জব বনে গেলো! এত বছর বোন এসব বলে নি। এখন ছেলেটাকে এসব বলে তার মান ইজ্জতে হাত দেয়ার কি প্রয়োজন বুঝলো না। কপালে হাত দিয়ে বললো,
– দিন যখন খারাপ যায়, তখন দুধের বাচ্চাও মজা নেয়।
মোনা ইমরানের কথার উত্তরে বললো,
– আপনার দিন খারাপ যাচ্ছে না, আপনি খারাপ বানাচ্ছেন। কথা কম বলে রেস্ট নিন। ছেলের পেছনে লেগেছেন কেনো?
– কোথায় আমি ছেলের পেছনে লাগলাম। ছেলে উলটো আমাকে কত কথা শুনিয়ে গেলো। মনে হলো ও আমার বাপ আর আমি ওর ছেলে।
– আপনার কাজ গুলাই ওকে এমন রুঢ় হয়ে কথা বলতে বাধ্য করেছে। জানেন না আপনাকে অসুস্থ দেখলে আমাদের কারো মাথা ঠিক থাকেনা। ইশানও এলোমেলো হয়ে আছে। কে আছে আমাদের আপনারা ছাড়া! দুজনের বাবারই অবস্থা এমন। আমরা কোথায় যাবো আপনাদের কিছু হলে? লোকে তো ফিরেও তাকাবেনা? এর মাঝে কথা শুনানোতে তো বাদ রাখেনা।
মোনার দু চোখে আকুলতা। ইমরান হাত দিয়ে ইশারা করলো পাশে বসতে। বুকে টেনে নিয়ে মাথার অগ্রভাগে ঠোঁট ছুয়ে দিয়ে বললো,
– তোমরা দুজনই তৈরি হয়ে গিয়েছো ইতিমধ্যে। আমি এবং বাবা দুজনই সফল পিতা। ইশানের মাঝে আমি অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, আমার আমিটাকে খুঁজে পাচ্ছি। আর তুমি তো আমার অলরাউন্ডার। একটা গল্প শুনবে?
মোনা ঘাড় কাত করতেই ইমরান বলল,
– ঠিক গল্প নয়, বাস্তব ঘটনা। তুমি বললে না মানুষ ফিরেও তাকাবেনা। এই সমাজে বাস করতে হলে তোমাকে আওয়াজ তুলে বাঁচতে হবে। লড়াই টা তোমার নিজের। কেউ কারো দিকে তাকায় না, উপহাস করে অথবা ক্ষতি করে। উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো, মারিয়া আব্রামোভিচ, একজন সার্বিয়ান তরুনী। বেশ সুন্দরী। তার উপর এক্সপিরিমেন্ট চালানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তাকে অবজেক্ট বিবেচনা করে মানুষের বুদ্ধিমত্তা, বিবেকবোধের পরীক্ষা নেয়া হয়েছে সেই এক্সপিরিমেন্টের মাধ্যমে। শুরু হলো।এক্সপিরিমেন্টের নাম রিদম জিরো। গুগলে সার্চ করতে পারো পেয়ে যাবে। সেই এক্সপিরিমেন্টে মারিয়া স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে একটা নির্দিষ্ট সময় অবধি। রুম ভর্তি লোক। তাকে যা খুশি করতে পারবে। সে কোনো প্রতিবাদ করবেনা। সময় সম্ভবত দুইটা থেকে আটটা অবধি বেঁধে দেয়া। আমার সঠিক মনে পড়ছেনা। এরপর কি হলো জানো?
মোনা উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি?
– প্রথম কিছু ঘন্টা সবাই মারিয়ার যত্ন নিলো, ফুল দিলো, আদর করলো। এরপর হঠাৎ করে পরের ঘন্টাগুলোতে মানুষ তাকে আঘাত করলো। চুল ছিড়ে দিলো। মা/রলো, জামা ছিড়ে ফেললো, ব্লেড দিয়ে হাত পায়ে কাটলো। রক্তাক্ত করলো। খুব কষ্ট দিলো। সর্বশেষ মারিয়াকে গুলি করতে অবধি উঠে এসেছে। অথচ মারিয়া কারো কোনো ক্ষতি করেনি। তবে এমনটা কেনো হলো?
মোনা হতবাক হয়ে প্রশ্ন করলো,
– ইয়া আল্লাহ! কি বলেন। এখানে মারিয়ার কি দোষ। শুধু শুধু কেনো মে রেছে?
– ন্যাচার অভ হিউম্যান বিয়িং বুঝলে। মানুষ কখনো কারো ভালো চায়না। মারিয়াকে এক টানা দেখতে দেখতে তারা বিরক্ত অথবা প্রথম সবাই যেভাবে মারিয়ার যত্ন করছিলো এতে মারিয়া খুশি ছিলো। হয়তো কারো মাঝে মারিয়ার সেই সুখ টা সহ্য হয়নি। আরো একটা কারণ হতে পারে। সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে, মারিয়ার অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে। তারা জানে মারিয়াকে এখন খুন করলেও ও কিছু করতে পারবেনা। তুমি বিভিন্ন ভাবে ইন্টারপ্রেটেনশন করতে পারবে। শেষে যখন মারিয়া চলে যাচ্ছিলো, সকলের লজ্জায় মাথা নত ছিলো। তাহলে বুঝো এরাই আঘাত করে লজ্জা পায় আবার এরাই আঘাত করতে ভালোবাসে। হিউম্যান নেচার কখনোই স্টেবল থাকেনা। আমি কেনো এই গল্প শুনালাম জানো? শুধু মাত্র এতটুকুই বুঝাতে যে, মানুষ কি বলবে, কি করবে তাতে কখনো কান পেতো না। মানুষ তাই বলবে যা তুমি তাদের দিয়ে বলাবে। তোমার ভাষাই হবে তাদের ভাষা। আমি আমার ছোট্ট জীবনে খুব কম মানুষকে সংগ্রামের সময় পাশে পেয়েছি। তুমি খেয়াল করেছো কিনা জানিনা, আমি কথা কম বলার চেষ্টা করি মানুষের সাথে। শ্রদ্ধা করি সবাইকে কিন্তু কাউকে মাথায় তুলি না। আজ প্রশ্রয় দিলে কাল মাথায় উঠে নাচবে৷ নিজেকে এমন ভাবে গড়বে যাতে কেউ আঙুল তুলতে না পারে।
মোনা ইমরানকে দু হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,
– ধন্যবাদ এত সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু আপনার এসব নীতিবাক্য আমার লাগবে না। আমার আপনাকে চাই। সব মুহুর্তে, সব সময়।
ইমরান ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে ভাবছে, কাকে কি বুঝালাম! আচানক ইমরান প্রশ্ন করলো,
– ভালো আছো? মোনালিসা।
মোনা চমকে গিয়ে বললো,
– আলহামদুলিল্লাহ। হঠাৎ?
ইমরান মুচকি মুচকি হেসে, ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মোনার গলায় হাত বুলিয়ে বলে,
– ব্যাথা আছে?
মোনা গলায় হাত দিয়ে লজ্জা পেয়ে গেলো। খাট ছেড়ে উঠে লাজুক গলায় বললো,
– উফ! আপনার না পায়ে ব্যাথা।
– তুমি তো খুশি হলে তাই না। কয়েকদিন ছুটি পাবে।
– লাগাম দিন মুখে।
– আমাকে লাগামছাড়া কে বানিয়েছে?
– নিচে গেলাম। সবাই চলে যাবে একটু পর। আপনি বিশ্রাম নিন।
– রাতটা তো আমারই।
– ইশ! আপনি ঘুমালে আসবো আমি।
– আচ্ছা, তাই নাকি দেখা যাবে। এনিওয়ে ইশানকে ডেকে দাও তো।
মোনা মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। ইমরান হাসছে।
বাড়ির মানুষ গুলোকে দুশ্চিন্তায় ফেলেও এতটা দুশ্চিন্তা হচ্ছেনা যতটা একজন উচ্চ অফিসারের ফোন পেয়ে হচ্ছে। দরজা আটকানো কামরার। বাবা ছেলে মুখোমুখি। মাথা নত পুত্রের। কথা ধার বেড়েছে আগেই বুঝতে পেরেছিলো। ইমরান কড়া আওয়াজ,
– ইশান তুমি এখনো এত বড় হও নি যে এভাবে রিস্ক নিবে?
ইশান নিরব। ইমরানের পুনরায় প্রশ্ন,
– চুপ থেকে কি আমাকে অপমান করছো?
মাথা তুলে ইশানের উত্তর,
– না পাপা। আসলে আমি শুধু এটুকুই জানতে চেয়েছিলাম আমার লাইসেন্স কবে পাবো?
– বয়স কত তোমার?
– সতেরো বছর এগারো মাস।
– কি গুরুত্বপূর্ণ পদে আছো?
বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।
– আমি প্রশ্ন করেছি তোমার জব বা পেশাগত যোগ্যতা কি?
– স্টুডেন্ট।
– তাহলে কোন সাহসে এই বয়সে অস্ত্রের লাইসেন্স চাইছো? যা চেয়েছো তা পাচ্ছো, যেভাবে পড়তে চাও, আমি সেভাবে পড়াতে রাজি। অস্ত্রের দিকে ঝুঁকলে কেনো?
আচমকা ইমরান পুনরায় প্রশ্ন করলো,
– তুমি যে প্রতিনিয়ত চর্চা করো আমি জানি, রবিন আর সজীব সাহায্য করে সেই খবর ও কানে এসেছে।যতই যাই করো অস্ত্র তুমি হাতে পাবেনা। আর কখনো যদি আমার বিরুদ্ধাচারণ করো তবে তুমি পাপাকে চিরকালের জন্য হা/রাবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন তোমার পেছনে সাহস কে যোগাচ্ছে?
ইশানের মাথা নত। ইমরান ঠান্ডা গলায় বললো,
– তোমার মা?
ইশান সাথে সাথে মাথা তুললো। গর্জে উঠলো ইমরান,
– এক্ষুনি মাকে ডেকে নিয়ে আসো, যাও।
শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরা রক্ত সঞ্চালনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেনা। এই দুইজনের পরিকল্পনা কতটা ভয়ানক ভাবা যায়! কিছু ঘন্টার মাঝে মা খোঁজ নিয়ে ফেলেছে ইমরানের শত্রু কে। আর অন্যদিকে ছেলে তাকে গুলিবিদ্ধ করার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে ঘুরছে। হন্তদন্ত করে মোনা রুমে ঢুকলো। ইশান দরজা আটকে দিতেই ইমরান শীতল স্বরে বললো,
– আমার উপরে গিয়ে এত পরিকল্পনা দুজন কেনো করলে?
মোনা ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
– কি করেছি আমরা, ইশান?
ইশানের মাথা নত। ইমরান সোজাসাপটা বললো,
– আমার শত্রুর নাম বের করানোর কাজে সজীব আর রবিনকে লাগিয়ে দিয়েছো। তোমাকে এক ধাপ এগিয়ে তোমার ছেলে টেক্কা দিচ্ছে তাদের শ্যুট করবে তা ভেবে। মা ছেলে মিলে এই বয়সে কি আমাকে হাসপাতালে পারমানেন্ট থাকার ব্যবস্থা করে দিতে চাও। আরেক টা কথা ইশান কে প্র্যাকটিসে কেনো পাঠাও?
– আপনাকে কে বলেছে?
– তর্ক করোনা। যা প্রশ্ন করেছি উত্তর দাও।
– জেনে রাখা ভালো।
– কি জেনে রাখা ভালো?
– কিভাবে পিস্তল চালাতে হয়। আপনার বিজনেসের ভবিষ্যৎ কর্ণধার ইশান। সব কাজ জেনে রাখা ভালো। আপনি একটা এক্সপার্ট শ্যুটার আর ছেলে কি মেনি বিড়াল হবে নাকি। আর আপনি অযথা দুশ্চিন্তা করছেন। আমরা কেউই এক্সট্রিম লেভেলে যেতাম না। ইশানকে আমি বলেছি জেনে রাখতে সব। কারণ ছেলে বাইরে বের হয়, কলেজ যায় কখন কোন বিপদ আসে বলা যায়? তাই চোখ কান খোলা রেখে চলতে বলেছি। আপনার তো শত্রু অভাব নেই। আর ভুল কি বললাম!
ইমরান অবাক হয়ে গেলো। ইমরান এক্সপার্ট শ্যুটার সে কথা মোনা জানলো কি করে? তার মানে ইশান ও জানে। ইমরান অতি আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলো,
– আমি শ্যুটার কে বলেছে তোমাদের?
ইশান গলা উঁচিয়ে উত্তর দিলো,
– জানি আমরা। অথেনটিক সোর্স থেকে জেনেছি।যে বলেছে সে বিশ্বাস করে বলেছে। তুমি আর ঘাটাবেনা এই ব্যাপার। পাপা তোমার কাজ রেস্ট নেয়া। আমি লাইসেন্সের ব্যাপার এমনি ফয়েজ আংকেল থেকে জানতে চেয়েছি। আর শ্যুট করবোনা কাউকে তবে জেনে নিতে চাচ্ছি কে তোমার শত্রু। এখন আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়াশোনায়। আর মা স্যরি তোমাকে। মাকে বকোনা পাপা, মা জানতোই না আজ আমি বিকালে রবিন চাচ্চুর সাথে প্র্যাকটিসে গিয়েছি। এতক্ষন মা যা বলেছে আমাকে সেভ করতে বলেছে।
মোনা ছেলের দিকে তাকিয়ে হতাশ হলো। ছেলেটার পেটে কথাই থাকেনা। এখন যদি বকা দেয় তখন তো বাবার বকা খেয়ে কেঁদে দিবে। ইমরান মাথায় হাত দিয়ে বললো,
– কি চাও তোমরা দুজন।
দুজনই ইমরানের কাছে ছুটে গেলো। ইশান বাবার হাত ধরে বললো,
– তোমার সেফটি। পাপা বিজনেসটা ডেঞ্জারাস। আমি বা মা কেউই বলবোনা ছেড়ে দাও। কারণ এটা তোমার প্যাশন তবে সেইফ থাকা প্রয়োজন আমাদের। মায়ের উপর দুইবার আক্রমণ হলো।
ইমরান দুজনের মাথায় হাত রেখে বললো,
– সুস্থ হতে দাও আমাকে। তোমরা আগ বাড়িয়ে কিছুই করবেনা। যা করবে আমাকে জানিয়ে করবে। বাকিটা আমি দেখছি। যা জানো চুপ থাকবে দুজনই।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৪
দুজনের বাধ্যগত আচরণ দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেললো ইমরান। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, কে এই নতুন শত্রু! পরিচিতরা কম বেশি সবাই জানে ইমরানের লিগ্যাল বিজনেস। যতটুকু জানে জগনকে হাসপাতালে পাঠানোর পর জারিফের বাবা সহ বাকিরা শান্ত। নিজের আহত পায়ের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে মনে মনে আওড়ে নিলো,
– যেই হও না কেনো, ঘুমন্ত ইমরানকে জাগিয়ে বড্ড ভুল করেছো। বোকা মানুষ, পরিবারের দিকে হাত বাড়িয়েছো তুমি। সেই হাতের মানবকে বদ করতে পুনরায় আমার দু হাত র/ক্তে রাঙাবো।
