Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৮

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৮
নীতি জাহিদ

সারাদিন স্টাডি রুমে এবং কনফারেন্সে কাটিয়েছে। বাসায় সব কটা মহিলা সদস্যকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে। কোম্পানি বন্ধ। মোনালিসার শো-রুম বন্ধ ঘোষণা করেছে। ঈদের আগের দিন সবাইকে ব্যস্ততায় ডুবিয়ে তথ্য অনুসন্ধানে বসেছে মোনার একান্ত পুরুষ। যা যা তথ্য পেলো চমকে গিয়েছে। নতুন একটা অধ্যায় উন্মোচন হলো। ইমরানের ঠোঁটের কোণে হাসি। উঠে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে হিসেব মিলিয়ে আপন মনে বললো,
– এখনো সেই পুরোনো ব্রেইন নিয়ে চলছো। বোকা দস্তগীর। আজ অবধি কেউ কখনো ভুল পথে সফল হয়নি। ডক্টর ফস্টাসের পরিণতির কথা যদি জানতে শয়তানের উপাসনায় নামতে না।
স্টাডি রুমের দরজায় আঘাত হওয়াতে দরজা খুলে বের হতেই দেখে ইশান দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে সাইড দিতে বলে নিজে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। বাবার হাত ধরে টেনে এনে বললো,

– পাপা মাত্র আছরের সালাত আদায় করে এলাম। জানো সকাল থেকে দ্বিধায় ভুগছিলাম তোমাকে বলবো কিনা। এখন আর পারলাম না নিজেকে সামলাতে। মনে হলো তোমাকে না বললে ভুল হতে পারে অনেক বড়।
ইমরান ভ্রু কুচকে ছেলের হাত ধরে বললো,
– কি হয়েছে প্রিন্স, পাপাকে বলোতো।
– পাপা মৃত মানুষ কি জীবিত হয়?
ইমরান হেসে দিলো। ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললো,
– হয়, হাশরের মাঠে মহান আল্লাহর নির্দেশে। এর আগে নয়।
– আমি জানতাম। আল্লাহ আমার ইমান দূর্বল না করুক। আমিন। আমার ধারণা ভুল ছিলো পাপা। এই ড্যানি আংকেলের মাঝে সমস্যা আছে। আমি ভেবেছি লোকটা ভালো। কিন্তু এতো পুরাই শয়তানের দোসর।

– কি বলছো প্রিন্স?
– পাপা কি হয়েছে শোনো, কাল আমার ফেসবুক আইডি নিয়েছিলো। গল্পের ছলে আমাকে একটা গ্রুপে এড করে। সেখানে কি সব সিম্বল। আমি প্রথমে একদম নজরে টানিনি। পরে গুগল করে দেখি সব স্যাটানিক সিম্বল। জানো ওখানে অনেক ইনফ্লুয়েনশিয়াল মানুষদের সন্তানরা আছে। ওরা প্রত্যেকে ড্যানি আংকেলের ফ্যান। আংকেল নাকি ম্যাজিশিয়ান। উনার একটা শো আছে ঈদের তৃতীয় দিন। সবাইকে ইনভাইট করেছে। সেখানে নাকি তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করে দেখাবে। অনেকে তাদের দাদা,দাদী,বন্ধু,পরদাদা এদের ছবি পাঠাচ্ছে। আমাকে জোর করে বললো, দাদা-দাদীকে দেখাবে। আমি যাবো কিনা পরে জানাবো জানিয়েছি। কারণ আমার প্রোগ্রাম আছে ঈদের। কোনোমতে কথা বলে গ্রুপ থেকে বের হলাম। পাপা কিভাবে পসিবল কাউকে জীবিত করা?
ইমরান হাসছে। ইশান বাবাকে দেখে অবাক। এত বড় একটা ঘটনা অথচ বাবা হাসছে। প্রশ্ন করলো,

– পাপা হাসছো কেনো? আমার বুকে হাত দিয়ে দেখো। ধুকপুক করছে।
ইমরান হাসি থামিয়ে বললো,
– বেশি ভয় পেয়েছো?
– অনেক।
– আচ্ছা, অপেক্ষা করো পাপা ভয় কাটিয়ে দিচ্ছি। জ্বীনের অস্তিত্ব আছে এটা তো জানো।
– হুম জানি।
– জ্বীন জাতি স্বভাবে দুরকম। ভালো এবং খারাপ। মহান আল্লাহ বলেছেন মানুষের এবং জ্বীনদের কাজের হিসেব নিবেন। ভালো জ্বীনরা আমাদের মত ইবাদত বন্দেগী করে,নামাজ- রোজা করে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে। অপরাধ করলে আমাদের জন্য যেমন জান্নাত এবং জাহান্নাম, ঠিক তেমনি জ্বীনদের জন্য ও তা প্রযোজ্য। শাস্তি থেকে কিন্তু কেউ রেহাই পাবেনা বুঝলে বাবা? এখন তোমার প্রশ্ন থাকতেই পারে, জ্বীনদের কেনো আমরা দেখিনা। আমরা জ্বীনদের দেখতে পাই না এর কারণ তারা অদৃশ্য। জ্বীনদের আদি পিতা (আবুল জিন্নাত) সামূমকে তৈরি করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তুমি কি চাও, তোমার কামনা বলো? তখন সে বলেছিলো- আমরা মানুষদের দেখবো কিন্তু তারা আমাদের দেখতে পাবেনা। এবং আরেকটি হলো, আমাদের বৃদ্ধরাও যেন যুবক হয়ে যায় মৃত্যুর পূর্বে। তাই জ্বীনেরা মৃত্যুর আগে যুবক হয়ে মৃত্যু বরণ করে। এবং এই একটা কারণে আমরা জ্বীনদের দেখতে পাইনা, তারা অদৃশ্য। বাকি রইলো তাদের ভয় পাওয়ার ব্যাপার, শোনো বাবা জ্বীনদের থেকেও মানুষ ভয়ংকর। এরা জ্বীনদের ব্যবহার করে অপশক্তির অধিকারী হয়ে স্বজাতির ক্ষতি করে। এখন বলো ভয়ংকর মানুষ না জ্বীন? মানুষ একে অপরকে কুপিয়ে জখম করে, জ্বীনকে শুনেছো কোপাতে? তুমি জ্বীনের ক্ষতি প্রাথমিক ভাবে না করলে জ্বীন তোমাকে শারীরিক ভাবে আঘাত করবেনা। সে তোমাকে ইন্ধন দিবে,খারাপ কাজ করার জন্য মনকে উৎসাহিত করবে তবে তোমাকে শারীরিক আঘাত খুব একটা করবেনা। কারণ জ্বীনেরাও জানে তাদের প্রত্যেকটি কাজের হিসেব মহান রবকে দিতে হবে। বুঝলে?

– তাহলে পাপা, জীবিত হওয়ার ব্যাপারটা।
– আমাদের প্রত্যেকের সাথে একটি করে জ্বীন আছে। একে ক্বারীন জ্বীন বলে। এই জ্বীনের কাজ হলো, আমাদের ভালো কাজে অনুৎসাহিত করা। দেখোনা মনে মনে হাজারটা খারাপ চিন্তা আসে। নামাজে ভুল করি, নিষিদ্ধ কাজ করে বসি, নিজের অজান্তে মানুষকে আঘাত করি, খাবার শুরুর আগে বিসমিল্লাহ বলিনা, ভালো কাজে শুকরিয়া আদায় করিনা। এই সব কিছুতে তার যোগসূত্র। মানুষের মৃত্যুর পর ও তার ক্বারীন জ্বীন বহুবছর বেঁচে থাকে। আর ম্যাজিশিয়ান সেই সুযোগ কাজে লাগায়। খারাপ জ্বীন কিন্তু শয়তানই। মানুষের মাঝে যেমন শয়তান পূজারী আছে, ঠিক তেমনি জ্বীনের মাঝে আছে। ইবলিসের কথা তো জানো। যাকে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নাম দেয়া হয়েছে। বেলজিবাব, লুসিফার হিসেবেও চিনি তাকে আমরা। ম্যাজিশিয়ানরা এই ক্বারীন জ্বীনকে বশ করে লুসিফারের সাহায্যে মানে খোদ ইবলিসের সাহায্যে। এবং যেহেতু মানুষের জ্বীন তার মৃত্যুর পর ও বেঁচে থাকে, সেই জিনিস মৃত মানুষের প্রতিকৃতি নিয়ে সামনে আসে, আর মানুষ ভাবে বাবা-মা, দাদা-দাদী বুঝি জীবিত হলো। পুরোটাই তোমাকে,আমাকে বোকা বানানোর খেলা বাবা।

– পাপা, ওরা তো অনেক শক্তিশালী। এভাবে তো অনেক ক্ষতি হতে পারে মানুষের।
– তা হয় যদি কেউ সেই ফাঁদে পা দেয় তবে। তবে সেইসব ম্যাজিশিয়ানদের পরিণতি কিন্তু খুব ভয়ানক হয়। তারা পৃথিবীতেও শান্তি মত বাঁচতে পারেনা। ওই জ্বীন যদি ক্ষেপে যায় তাহলে ম্যাজিশিয়ানকে মে*রে ফেলে। আর আখিরাতে তার পরিণতি তো জাহান্নাম।
ইশানের মুখে যেন রক্ত নেই। কম্পিত গলায় বলে,
– পাপা মা…
– কি হয়েছে মায়ের?
– বিজনেস ডিল।
ইমরান হেসে ছেলের হাত ধরে বললো,
– চলো, অতিথিরা সবাই চলে আসবে। আমরা একসাথে চাঁদ দেখবো আজ ইনশাআল্লাহ। আর মায়ের জন্য দুশ্চিন্তা করোনা। মা অর্ডার ক্যান্সেল করে দিয়েছে সকালে।
ইশানের ঠোঁটের কোণে হাসি। ইমরান একপেশে হাসি দিয়ে মনে মনে বলে,
– দস্তগীর তুমি যদি চলো ডালে ডালে আমি চলি পাতার শিরায় শিরায়। তোমার সাথে থাকতেই পারে শয়তানের হাজারটা শক্তি। আমার কাছে আছে আমার সব শুভ শক্তি,যা মহান আল্লাহ প্রদত্ত। তোমার প্রভু শয়তান, মহান আল্লাহকে বলেছিলো, সে যেন মানব দেহের শিরা উপশিরায় প্রবেশ করতে পারে। তা যেন কবুল হয়। আমাদের রব ও তার প্রিয় বান্দাদের জন্য ক্ষমার বিধান রেখেছেন। তুমি ফাঁদে ফেলে বিপদগ্রস্ত করো,আমরা তওবা করে ক্ষমা চেয়ে নেব। দেখি তুমি কতদূর যাও।

আকাশের সুন্দর চাঁদ হাসছে। পুরো পরিবার এবং অতিথিরা আজ ছাদে। ইমরান কর্ণারে দাঁড়িয়ে আছে। মোনা সকলের সঙ্গে গল্প করছিলো চাঁদের। বাকিদের গল্পে রেখে চুপি চুপি পেছনে চলে গেলো স্বামীর কাছে। ইমরানের হাত ধরে বললো,
– তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। ঈদ মোবারক।
ইমরান একহাতে আগলে ধরে কাছে টেনে বললো,
– তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম বউজান। ঈদ মোবারক।
– ধন্যবাদ ইমরান সাহেব।
– কেনো?
– আমাদের সবসময় আগলে রাখার জন্য। কতবড় একটা বিপদে পড়তাম। আল্লাহ রক্ষা করেছেন আপনার উছিলায়।
– ভুল করতে করতেই শিখেছি মোনালিসা। তোমরাও শিখবে। যেহেতু কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে, যথেষ্ট চেষ্টা থাকবে তোমাদের সাহায্য করার ইনশাআল্লাহ। বাদ দাও ওসব। মজার ব্যাপার শুনবে?
– কিহ?
– আমরা ভেবেছিলাম ইশানকে ড্যানিয়েলের ব্যাপারটা খোলাসা করবো তাই না?
– জ্বি।
– ছেলে তার আগেই আমাকে এসে সব বলে দিয়েছে আজ বিকেলে?
– কি বলেছে?
– ওকে প্রলোভন দেখিয়েছে নাকি বাবা- মাকে দেখাবে। সেই থেকে তার মনে সন্দেহ। এরপর অনুসন্ধান করে যা পেয়েছে সব এসে আমাকে বলে দিয়েছে।
মোনা অসহায় গলায় বললো,

– আচ্ছা বিপদে পড়লাম বলুন তো, আমার জন্য এমন হলো তাই না। কোথা থেকে যে এই ক্লায়েন্ট জুটলো কপালে।
– শুনো মোনালিসা, আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের পরীক্ষায় ফেলেন৷ এই বিপদ হয়তো মনে হচ্ছে আমাদের জন্য অকল্যানকর তবে এতেও কল্যান আছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ এর মাঝে কল্যান রেখেছেন। আমি দুশ্চিন্তা করছিনা তোমরা কেনো ভাবছো?
– ভাববো না বলছেন?
– একদম না। কারণ ড্যানিয়েল পরোক্ষ ভাবে আমাকে আক্রমণ করতে আমেরিকা থেকে এসেছে। তোমাদের হাতিয়ার বানাতে চেয়েছে। সেই দিক থেকে ব্যর্থ। ওর কাজকর্ম নিয়ে আমরা সকলে ঘাটাচ্ছি বলেই আমাদের এমন প্যাঁচানো লাগছে ব্যাপারটা। নিজের জালে নিজের প্যাচিয়ে যাচ্ছে।
– আপনাকে আক্রমণ করতে বলতে?
– ওর টার্গেট পলিটিকেল পাওয়ার নিজের দখলে আনা, যা আপাতত আমার কাছে। আমার অস্ত্র বিজনেস। কক্সবাজার হামলা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ওর হাত। একটার পর একটা চাল চেলে যাচ্ছে। বুঝতে পারলে। বড় বড় পলিটিশিয়ানরা ওর গুণগ্রাহী, কাকনের শ্বশুর এর মাখে অন্যতম। সে অনেক কাহিনী বাদ দাও ওসব।

– না আমাকে বলেন? সে আপনার পেছনে কেনো লেগেছে। বিজনেসের জন্য এত কিছু?
– তুমি ড্যানিয়েল কে চেনো ওর ছদ্মনামে। আমি চিনি ওর বংশগত পরিচয়ে। ওর অন্য নাম দস্তগীর সানোয়ার খান, আমার দাদা-জানের বড় ভাই সানোয়ার খানের দুইজন জমজ নাতি ছিলো। খাস্তগীর সানোয়ার খান এবং দস্তগীর সানোয়ার খান। খাস্তগীর মারা গিয়েছে বেশ কিছু বছর আগে। আর দস্তগীর আমেরিকাতে ছিলো। ওদের কিছু খারাপ দিক আছে, যা ওরা চর্চা করে আসছে। আমার দাদীর উপরও করতে চেয়েছিলো। তোমাকে সেদিন লঞ্চে বলেছিলাম না আমার পরদাদা কেনো আলাদা হয়েছিলো তার মেজো বউকে নিয়ে। এসব কিছু কুফরি চর্চার মাধ্যমে ওরা নিজেদের সব হাসিল করতো, বশীকরণ করতো। সেই সময়টা ছিলো খানিকটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাবিজ, দরবেশ,কুফরি, কালো জাদু এসব তখন অহরহ চলতো। যার প্রভাব পরে ফুফু আনারকলির উপর। জ্বীন জাতি ক্ষিপ্ত হয়ে ফুফুর বিয়েই দিতে দিলোনা। সাথে সেই দাদীর মৃত্যু হয়েছিলো করুন ভাবে। ও এখন আধুনিক কালো জাদু চর্চা করছে।

– মনে হচ্ছে রূপকথা শুনছি।
– রূপকথার মতো। মনে এসব ভাবনা আনবেনা। শেয়ার করেছি এই কারণে যেন বিপদে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করো। জীবনটা বৈচিত্রময়। অনেক কিছুই ঘটতে পারে চলার পথে। সবকিছু স্বাভাবিক ভাবে নেবে দেখবে আল্লাহ সহজ করে দিচ্ছেন। বাই দ্য ওয়ে, কি যেন সারপ্রাইজ আছে বললে না?
– ও হ্যাঁ। গেস্টদের বিদায় দিয়ে আসছি। আপনি রুমে যান। আপনার জন্য গরম গরম কফি পাঠাচ্ছি।
– অপেক্ষায় থাকবো। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু।
– জ্বি আচ্ছা, জমিদার মশাই।
ইমরান হাসলো। রুমে প্রবেশ করতেই নাফিসের ফোন। ফোন রিসিভ করতেই ভেসে উঠলো পরিচিত দুই মুখ। হাম্মাদ সালাম দিয়ে বললো,

– আসসালামু আলাইকুম ভাই। তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। কাইফা হালুক হাম্মাদ ভাই?
– আলহামদুলিল্লাহ আনা বি খাইর ইমরান ভাই।
– এত খুশি কেনো? কাজ হয়ে গিয়েছে?
– আলবাত। হাম্মাদ কাজ নিয়েছে হবে না কেনো ভাই।
নাফিসের হাসি দেখে ইমরান প্রশ্ন করলো,
– হাসছিস কেনো?
নাফিস প্রতিউত্তরে বললো,
– তুই এত বুদ্ধি নিয়ে ঘুমাস কি করে ইমরান? আমি গতকাল থেকে দুশ্চিন্তায় ছিলাম কিভাবে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার হবো আর তুই এমন একটা পথ বললি সাপ ও ম/রবে, লাঠিও ভাঙবেনা।
হাম্মাদ বললো,
– হামি তো অলরেডি খবর পাঠয়েছি আমেরিকায় ড্যানিয়েল বাংলাদেশে। ও জেল থেকে পালিয়েছে।
ইমরান হেসে বললো,

– ওর সাথে গেম খেলতে হলে ওর টেকনিক ফলো করে খেলতে হবে বুঝলি। আমেরিকান সরকার তো ওকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওই দেশে অকারেন্সের অভাব নেই। অবশ্য আমার কাছে নিউজ আছে ও যে এখানে এসে আমাদের জমিদার বাড়িটাকে ইলুমিনাতি রাজ্য বানাচ্ছে তার পেছনে ইন্ধন দিচ্ছে আমাদের কিছু পলিটিক্যাল ফিগার। জায়গার দাম অনেক। ওখানে নাকি কোন নেতার ফ্যাক্টরি করবে। আসল কাহিনি অন্য ওখানে সব চোরাচালানের সাম্রাজ্য বানাবে। এদেশের প্রচলিত একটা ব্যাপার হচ্ছে কোনো পরিত্যক্ত বাড়িকে হন্টেড এরিয়া বানালেই সেই বাড়ির মালিক ভয়ে পালাবে। আমাকে হয়তো ও দূর্বল প্রতিপক্ষ ভাবছে। অন্যদিকে এই বাড়ি হাসিল তো ওর জন্য আরো সহজ। ও জমিদার বাড়িরই ছেলে। ভেতরে যে বংশ পরম্পরার রীতিনীতি আছে তা যদি আমার পরিবার ধ্বংস করে তাহলে তো ঢেকেই পড়বে। সবাই ভাববে আমার অনুপস্থিতিতে এই বাড়ি ওর। আমি ওটাকে হিস্ট্রিরিকাল হেরিটেজ হিসেবে রেখে দিতে চাচ্ছি। ব্যবস্থা কর। সব দায়িত্ব নাফিস তোর। ওই নেতাদের ফাইন্ড আউট কর।
নাফিস হতবাক হয়ে বলে,

– মাস্টারমাইন্ড। তুই যে ওর এসব ব্যাপার ধরতে পেরেছিস আমি তো তোকে পরের বার স্যালুট করবো। কি গেম খেলতেছে। আল্লাহ।
– নিজের বংশের লোকদের আমার চেয়ে ভালো কে চিনবে বল। যতসব কুবুদ্ধি এদের মাথায় ঘুরে। আরেকটা ব্যাপার ড্যানিয়েলের ঈদের তৃতীয় দিন ওর একটা শো আছে।
– ওখানে গেলে ওকে পাবো?
– জ্বি না ও সামনে আসে না। ওখানে গেলে ওর সাগরেদদের পাবি। ও ভিড়ের মাঝে থাকবে।
– আমি কি ম্যাজিশিয়ান? বের করবো কিভাবে?
হাম্মাদ এবং ইমরান দুজনই হাসছে। নাফিস ধমকে বললো,
– তোমরা হাসছো কেনো? আশ্চর্য। আমি চলে যাচ্ছি।
হাম্মাদ গলা ঝেড়ে হেসে বললো,

– আরেহ নাফিস ভাই, রুখো যারা। ওকে ভিড়ের মাঝে থেকে টেনে আনার দায়িত্ব হামার। তুমি শুধু ওকে ধরবে তোমার লোক দিয়ে। কিন্তু সাবধান। জাদু টোনাও করতে পারে তোমাকে।
– আশ্চর্য হাম্মাদ ভাই, কি বলো এসব? সব সময় আমাকে ঝামেলায় ফাসিয়ে নিজেরা আরামে থাকো।
ইমরায় সায় দিয়ে বললো,
– ও এখনো জানেনা, আমি ওকে চিনে ফেলেছি। তোমাদের এতটুকু গোপন রাখতে হবে। আমার বংশের অংশ তো যে রূপেই আসুক আমি চিনে নেব। তোমাদের কাজ শুধু ভিড় থেকে বের করে আনা। পারবেনা?
হাম্মাদ এবং নাফিস দুজনই সায় দিলো। হাম্মাদ বিদায়ের আগে বললো,
– ভাই মেয়েটাকে কি করবো?
– অবশ্যই আমার বাড়ি নিয়ে এসো কাল। আমার আদরের ভাস্তি। ওর বাবার সাথে সম্পর্ক যাই হোক। মেয়েটা নিষ্পাপ। তবে এটা ড্যানিয়েল ওরফে দস্তগীরের জন্য মেসেজ, আমার ছেলেকে বিপদে ফেলে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টায় ছিলো। আমি ওর মেয়েকে ভালোবেসে ওকে আটকে দিবো। দেখি কার শক্তি বেশি। জমিদার বাড়িতে ওই নিষ্পাপ মেয়ের ও হক আছে। মেয়ের নাম নিয়ে বাড়িটা নিজের নামে করে নেয়ার পরিকল্পনা আমি ভেস্তে দিব ওর। দেখি কি করে ওখানে ও এসব কালা জাদু আর ইলুমিনাতির চক্কর চালায়?
নাফিস নাক মুখ কুচকে বলে,

– জীবনে কত কি হ্যান্ডেল করলাম, বাকি ছিলো এই তান্ত্রিক বাবা হওয়া,এখন মনে হচ্ছে তান্ত্রিক ওঝা হয়ে হয়ে ভূত জ্বীন ধরবো। তোর সাথে থেকে সব অভিজ্ঞতা হচ্ছে।
– খু/ন করতে তো বলিনি, শুধু বলেছি ওকে ধরে আনবি। বাকি কাজ হয়ে যাবে।
– খু*ন করা কি কঠিন নাকি?
– এখন কঠিন। আগে যা অনায়াসে করতাম এখন থাপ্পড় দিতেও হাত কাঁপে।
হাম্মাদ চিন্তিত গলায় বললো,
– হামার মনে হচ্ছে ওকে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া উচিত নতুবা ডিরেক্ট শ্যুট। বিকাজ হি ইজ ঠু মাচ ডেঞ্জারাস। ডে বাই ডে হিজ পাওয়ার ইজ ইনক্রিজিং। এতক্ষন অপেক্ষা কখনোই করতাম না যদিনা তোমরা নিষেধ করতে।
– মাথা গরম করলে হবেনা। আগে ধরো, এরপর বাকি কাজ। ওকে ধরাটাই ট্রিকি। কাল আমার বাড়ি এসো। দাওয়াত রইলো।
হাম্মাদ সায় দিলো,
– ইনশাআল্লাহ হামি আসবো।

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানি তাগিদ…
গুনগুন করতে করতে কফির কাপ নিয়ে প্রবেশ করলো ইমরান জায়া। ইমরান কাপ হাতে নিয়ে হাসছে। ভালোই লাগছে সহধর্মিণীর গলায় গান। ফোন হাতে নিয়ে সকলের উইশ চেক করছিলো সেই সাথে স্ত্রীর চাল চলন লক্ষ্য করছিলো। দেখতে পেলো বেলকনি থেকে দুটো অলকানন্দা ছিড়ে এনে টেবিলে রাখলো। আলমারি থেকে একটা বাসন্তি শাড়ি বের করলো। ভাবনায় ডুব দিলো ইমরান। মোনা শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো। মিনিট দশেক অতিক্রম করে বের হলো। পরিপাটি করে চুল বেঁধে খোঁপা করলো। ফুল গুজলো চুলে। হাতে কাচের চুড়ি। বেশ সুন্দর লাগছে সাজ শেষে। আজ অনেকদিন পর সাজলো। ইমরানের কাছে এসে পাশে বসলো। মাথা নুয়ে বললো,

– আমাকে কেমন লাগছে?
থুতনি উঠিয়ে ইমরান জানালো,
– মা শা আল্লাহ আমার মোনালিসা লাগছে। এটা সারপ্রাইজ?
মোনা দু পাশে মাথা নাড়লো। ইমরান প্রশ্ন করলো,
– তবে?
ইমরানকে হাত বাড়াতে বললো চোখ বন্ধ করে। হাতের মুঠোয় গুজে দিলো কিছু একটা। চোখ খুলে মুঠো খুললো ইমরান। নির্বাক, শব্দহীন প্রতিক্রিয়া। হাতের মুঠোয় একটা স্ট্রিপ। যেটাতে স্পষ্ট লাল দুটো দাগ। স্তব্ধতা কামরা জুড়ে। শক্তপোক্ত ভাবে আড়াল করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো, গড়িয়ে পড়লো অনায়াসে চোখ বেয়ে জলটুকু। চশমা খুলে টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু নিয়ে চোখ মুছলো। মোনার তখনো মাথানত। মোনাকে বুকের সাথে চেপে ধরলো। বুকের মাঝেই ফুফিয়ে কেঁদে উঠলো মোনা। ওষ্ঠ ছোঁয়ালো সহধর্মিণীর মাথার অগ্রভাগে। ভেজা কণ্ঠে এতটুকু আওড়ালো,
– ধন্যবাদ মোনালিসা। বুঝতে পারিনি সুখটুকু এত তাড়াতাড়ি ধরা দিবে।
মোনা নাক টেনে মাথা তুলে বললো,

– আমার অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিলো তাই সাবধানে ছিলাম। ইমরান ভ্রু কুচকে বললো,
– তোমার পরিকল্পনা কি প্রথম দিন থেকেই ছিলো?
মোনা মুখ হাত দিয়ে হাসি চেপে উপর নিচ পর পর মাথা নাড়ালো। ইমরান হেসে বললো,
– তাহলে তো ফুফু আর খালাম্মার কাছে মাফ চাইতে হবে। না বুঝেই কত কি বললাম। অথচ বউ আমার প্রথম দিন থেকেই প্ল্যানিংয়ে ছিলো।
– বাহ রে থাকবোনা কেনো? ইশান আমার কাছে বোন চেয়েছে।
ভ্রু উঁচিয়ে ইমরান বলে,
– বাহ! তাহলে তো হলোই। শুধু আমি বেখবর।
– ইশ! কোথায় বেখবর। কাছে আসার সময় তো সবটুকু দিয়ে ভালোবাসেন।
– বাসবো না বলছো? তুমি আমার কত সাধের তা কি তুমি জানো? ইচ্ছে তো করে বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখি। সেই সাধ্য নেই।
– আপনি এত অকপটে সহজ ভাষায় কিভাবে প্রকাশ করতে পারেন মনের কথা গুলো? আমি মুগ্ধ হয়ে এজন্যই দেখি আপনাকে।
– ভালোবাসা হতে হবে সহজবোধ্য। যাকে বলা হয় সে যদি নাই বা বুঝলো তবে তাতে সার্থকতা কোথায়! তোমার কাছে গোপন রাখার কোনো প্রয়াস নেই মোনালিসা। বলো সুখবর কাকে কাকে দিবে?

– আপাতত বাবা, ইশান এবং আপাকে। বেশি কাউকে বলা ঠিক হবেনা। আমি বাড়ি থেকে বের হবোনা আগামী কয়েকমাস।
ইমরান হাতের ফোন দিয়ে মিনহাজকে কল দিয়ে মোনাকে ধরিয়ে দিলো। মোনা দু শব্দ উচ্চারণ করে লজ্জায় কিছু বলতে পারেনি। চুপ করে আছে। ইমরান হাতের ফোন নিয়ে সালাম দিলো,
– আসসালামু আলাইকুম, বাবা। তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। ঈদ মোবারক
– ওয়ালাইকুমুস সালাম। তাক্বাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম। ঈদ মোবারক। কি অবস্থা কেমন আছিস?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি এলে না কেনো আজ?
– আজ শরীরটা ভালো লাগছিলোনা। কাল ইনশাআল্লাহ ভোরেই আসবো মনসুর আর নয়নকে নিয়ে। ঈদের জামাত তোদের সাথে পড়বো।
– ইনশাআল্লাহ। একটা কথা ছিলো।
– কি কথা? মোনা কি যেন বলতে চাইলো। এরপর তোকে ধরিয়ে দিলো। কি হয়েছে বল তো? সব ঠিক আছে?
– হ্যাঁ ঠিক আছে। দুশ্চিন্তা করোনা। আসলে সুখবর দিতে ফোন দেয়া। মোনালিসা তোমাকে প্রথম দিতে চেয়েছে।
– কি সুখবর?
– তুমি নানাভাই হবে।
মিনহাজ ফোনেই হেসে বলে উঠলো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৭

– আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ সুস্থ রাখুক আমার মেয়ে এবং আমাদের অনাগত অতিথিকে। পাগলীটা লজ্জা পেলো কেনো? দে দেখি ফোনটা ওকে।
ইমরান ফোন এগিয়ে দিলো। মোনা দ্বিধা কাটিয়ে বাবার সাথে গল্প করছে। ইন্টারকমে কল দিয়ে ইমরান বোন এবং ইশানকে ডেকে নিলো। খুশির খবর একসাথে দেয়া হোক না হয়।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৯