প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫০
নীতি জাহিদ
টিক টিক করছে হাতঘড়িটা। অপেক্ষার প্রহর আটকে যায়। মাঝে মাঝে মানুষকে ভ্রমে রাখাটা নিতান্তই আনন্দ নয়, বরং আত্মতুষ্টি। এই যে আপাতত সকলে জানে, ছেলেটাকে আগলে রাখতে হবে নতুবা তার উপর বিপদ আসতে পারে। অথচ ঘাড়ে বিপদ নিয়েই চলছে। আপন সত্ত্বাকে প্রশ্ন করেও যখন উত্তর দিতে অক্ষমতা জানায় তখন বিবেক সোজা সরল রৈখিক পথটাকে থামিয়ে মস্তিষ্কের বক্ররেখা অনুসরণ করিয়ে জানান দেয়, “তুমি সাধারণ নও, তোমার রক্ত তেজোদীপ্ত, তুমি কৌশলী। সরলপথ তোমার বাঁধা, কারণ ওপথে ছিটানো হাজারো কাঁটা। অনুসন্ধানী হও।”
হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো, ফোন রিসিভ করে কথা শেষ করলো। ধীরে ধীরে নির্জনতাকে বড্ড আপন মনে হয়। পায়চারি করছে কাঙ্ক্ষিত সংবাদের অপেক্ষায়। হাতের ফোনটা পুনরায় বেজে উঠতেই পূর্বের নাম্বার দেখে প্রশ্ন করলো,
– হুম খবর বলো?
– স্যার, আপনি যে ছবি পাঠিয়েছেন ওই ছবির সাথে লোকেশনের মিল পেলেও ওই রুমে থাকা ক্লায়েন্টের কোনো মিল নেই।
– তুমি নিশ্চিত?
– জ্বি স্যার।
– ছবি পাঠাও।
ছবি,ভিডিও দুটোই পাঠানো হয়েছে। চেক করে কোনো হদিস মিলছে না। প্রশ্ন করলো,
– ওখানে কে আছে?
– আপাতত একজন অসুস্থ মহিলা এবং তার ছেলে আছে। আমার মনে হচ্ছে রুম নাম্বার ভুল দিয়েছে কেউ আপনাকে।
– সব ঠিক আছে। খোঁজ নাও ভালো করে। ওদের কোনো ছোট মেয়ে ছিলো কিনা?
– ছিলো একটা রুমে তবে মেয়েটা নেই। দুদিন আগে কিডন্যাপড হয়েছে। সেই ক্লায়েন্ট ও নেই। কিন্তু এদের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে হোটেল কতৃপক্ষ জানালো।
– ঠিক আছে।
কিছু একটা ভেবে ফোনের ভিডিওটা চেক করে পুনরায় বললো,
– আচ্ছা, ৪০৯ এ যাও তো। ওখানে কে কে থাকে দেখো তো?
– স্যার আপনি তো বললেন দশ তলা তবে এখন পাঁচ তলায় কেনো যাবো?
– দশ তলার ৪০৯ এ যাও।
– মানে?
– তুমি আমাকে যেই রুমের ছবি, ভিডিও দিয়েছো তার পাশের রুমের নাম্বার এমন অদ্ভুত কেনো? সবগুলো নাইন দিয়ে শুরু শুধু মাত্র পাশের টাই ফোর দিয়ে?
তড়িঘড়ি করে হাসান ফোনের ছবির সাথে মেলালো। ফোনের মাঝেই চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– ওহ মাই গুডনেস। স্যার ওরা আমাকে ৯০৫ এ কেনো নিয়ে গেলো, আমি তো ৯০৪ বলেছি।
– কারণ কেউ যদি ৯০৪ এ যেতে চায় হয়তো ৯০৫ এ নিতে বলা হয়েছে।
– তাহলে ৯০৪ কোথায়? এই ৪০৯ ই কি? তবে কি হোটেল কতৃপক্ষই ঘাপলা পাকাইছে?
– হাসান ভাই, তোমার মুখের ভেতর আমি বন্দুক ধরে যদি বলি ইশান কে চেনো? ইহ জনমে দেখেছো? কার হয়ে কাজ করো? উত্তর কি দিবে, আমাকে এক্সপোজ করে দিবে?
– না স্যার চিনি না৷ আমি তো একটা এজেন্সিতে কাজ করি।
– তুমি যদি নিজের প্রাণ বাঁচাতে এজেন্ট থেকে এজেন্সির জব করতে পারো তবে হোটেল কতৃপক্ষ রুম নাম্বার উল্টে দিতে কি সমস্যা?
নিচ থেকে ডাক পড়েছে। কেউ একজন সিঁড়ি বেয়ে ছাদে আসছে। ফোন কেটে দিয়ে ঘাড় ঘুরাতেই দেখতে পেলো বাবাকে। ইমরান এগিয়ে এসে বললো,
– প্রিন্স এত রাতে ছাদে কেনো?
– না পাপা। ভেতরে হঠাৎ করে সাফোকেটেড লাগছিলো। তাই হাঁটছিলাম। তুমি ঘুমাও নি? মা কি ঘুমিয়েছে?
– মা ঘুমিয়েছে? তোমার রুমে গেলাম দেখলাম নেই তাই খুঁজতে এখানে এলাম।
– কিছু বলবে পাপা?
– প্রেম করছিলে?
– নো পাপা। আমার বয়স হয়েছে নাকি?
ইমরান ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
– তুমি তো ব্যাকডেটেড রয়ে গেলে। আমি তোমার বয়সে প্রেম করেছি।
– ওটা তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো পাপা।
– ভুল থেকেই একটা ফুল পেলাম। আমার ইশানকে।
ইশান বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
– পাপা তুমি ছাড়া আমি কিছুই না। আমার নতুন ফ্রেন্ডরা অনেকেই জানেনা তুমি কেমন? মাঝে মাঝে বলি পাপার কথা। বেশি না অল্প। তখন ওরা বলে, সবার পাপাই কোচিং এ আসে তোর পাপা আসেনা কেনো? ওরা তো মাকে দেখেছে। ওদের ধারণা তুমি অনেক বুড়ো। ইয়াং মেয়ে বিয়ে করেছো।
– আমি তো বুড়োই।
– নো ইয়্যু আর স্টিল ইয়াং এন্ড এভারগ্রীন।
ইমরান হাসছে ছেলের কথায়। বাবা ছেলের আলাপন শেষে ইশানকে নিজের কামরা দিয়ে ইমরান চলে আসে রান্নাঘরে। কড়া এক কাপ কফি নিয়ে সোজা স্টাডি রুমে চলে আসে। অসমাপ্ত কাজ গুলো নিয়ে বসে। রবিন ও সজীবকে কনফারেন্সে রেখে প্রথম প্রশ্ন করে,
– ইশানের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করো। আমি চাই না ছেলে আমার পথ বেছে নিক। ওকে হতে হবে বরফের মত শীতল।
– বস, ঠিক হয়ে যাবে। উঠতি বয়স তো রক্ত গরম।
– না সজীব। ওর রক্ত আমার চেয়েও শীতল। ও খুব ঠান্ডা মাথায় আগাচ্ছে। আমি টার্গেট ধরার আগে ও পৌঁছে যাচ্ছে। ওকে আটকাও যেভাবে পারো। আমি আটকাতে গেলে ওর গতিবিধিতে নজর রাখছি তা বুঝে যাবে। আমি চাই না ওর প্রাইভেসি নষ্ট হোক আমার কাছে।
– সোহান ভাইকে বলবো স্যার?
– সোহান অলরেডি ওকে ট্র্যাক করছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো। ও হেল্প পাচ্ছে কার? তুমি আর রবিন হেল্প করছোনা। সোহান আমাকে ফোন দিয়ে জানালো ইশান ড্যানিয়েলকে ধরতে লোক লাগিয়েছে। প্রথমে দুজন বুদ্ধি খাটিয়ে করছিলো তা অবধি ঠিক আছে, এখন সোহানকে কিছু না জানিয়ে আগাচ্ছে। কিন্তু ইশান আলাদা ফোর্স পাচ্ছে কোথায়? খোঁজ লাগাও।
– জ্বি স্যার।
– কাল যেন ইশান শো তে না যায়। আমি জমিদার বাড়ি যাব নাফিসকে নিয়ে। হাম্মাদ সহ তোমরা ড্যানিকে নিয়ে আসবে সেখানে। খবরদার ওর যেন চোখ খোলা না থাকে বার বার বলছি। এই খেল কালই শেষ করতে চাই। ওর চোখ খোলা মানে তোমরা সব ওর আয়ত্বে চলে যাবে।
– ওকে স্যার।
ল্যাপটপের কি বোর্ডের টিপ টাপ শব্দ। সমানে হাত চালিয়ে টাইপিং চলছে। স্ক্রিনে তাকিয়ে মোনা বুঝার চেষ্টায় আছে ইশান কি করতে চাইছে। এখন থেকেই ছেলে বাবার পথে হাঁটছে। ইশান সার্চ দিচ্ছে, হাউ টু হিপনোটাইজ পিপল। মোনার প্রচন্ড হাসি পেলো। কারন কাউকে বশে আনাও এক ধরনের জাদু বিদ্যার মতো যা চর্চার মাধ্যমে আয়ত্বে আনে। অথচ ইশান নাকি একদিনের চেষ্টায় তাও ইন্টারনেটের সাহায্যে তা শিখে নিবে। কৌতুহল নিয়ে ছেলের কাজ দেখছে। ইমরান সাহেব ঘুম পাড়িয়ে ছেলের খোঁজে ছাদে গিয়েছে। এদিকে মা ছেলের রুমে এসে অপেক্ষা করছে। এখন ইমরানকে ধোঁকা দিয়ে দুজনই রুমে গোপন ফন্দি আঁটছে।
ইশানের ব্যস্ত স্বর শুনে মোনা স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে চাইলো,
– অনেকক্ষন হলো, এখনই পাপা আসবে। রুমে যাও মা।
– চলে যাচ্ছি তো। তুমি কাল শো তে যাওয়ার আগে আমাকে নিয়ে যাবে কিন্তু। আর এসব বন্ধ করে ঘুমাও। অনেক শিখেছো।
– জ্বি না। আমার মাথা খারাপ হয় নি যে এসব জায়গায় আমি তোমাকে নিব। তুমি বাড়ি থেকে এক পা ও বাইরে দেবেনা। আমার কাজ শুধু ভিড়ের মাঝে থেকে ড্যানিয়েলকে বের করা। আরেকটা কথা, কিছুই হয়নি শেখা। আরো একটু কাজ বাকি আছে।
– ও ফেস মাস্ক পরে বের হবে আমি জানতে পেরেছি আর খুব সহজে হিপনোটাইজ করতে পারে মানুষকে।
– তাই তো আমি ওকে পাপার হাতে তুলে দেব খুঁজে বের করে। আমিও ওকে হিপনোটাইজ করবো।
মোনা চেপে রাখা হাসি ছেড়ে বলে,
– কিভাবে? এই আক্কার বাক্কার বোম্বে বু, আকড়ুম বাগড়ুম ঘোড়াডুম সাজে এই সব মন্ত্র পড়ে?
– উফ মা, আ’ম সিরিয়াস।
– আ’ম সিরিয়াস ঠু। তোমার পাপা জানতে পারলে তোমাকে খুব বকা দিবে।
– দিলে দিবে। কিন্তু তুমি বের হবে না। আমার বোনের ক্ষতি হবে। যাও ঘুমাতে যাও।
মা ছেলের গোপন আলোচনার মাঝে এখন খুনশুটি চলছে। ইশানকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে মোনা। আর সকল গোপন তথ্য দিয়ে সাপোর্ট দিচ্ছে সজীব এবং রবিনদের দলের আরেক ছেলে, হাসান। এক ড্যানিয়েলের পেছনে এত জন লেগেছে। মোনা বিরক্তি নিয়ে বলে,
– এই ড্যানিকে সবার আগে আমার কাছে নিয়ে আসবে। কষে দুটো চড় দিব। আমার স্বামী-সন্তান সবার জীবন, ঘুম তেজপাতা করে দিয়েছে উড়ে এসে জুড়ে বসে। ওর কালো জাদু চর্চা বের করবো আমি।
ইশান মোনার কথা শুনে হেসেই যাচ্ছে। মা ওর মতো বাচ্চামো করছে দেখে সে বেশ মজা পাচ্ছে। হাসতে হাসতে বললো,
– হ্যাঁ আমরা, বাপ বেডা, চাচারা- ভাতিজা এত জন মিলে ওকে ধরার ফন্দি আটছি আর তোমার এক থাপ্পড়ে ও একদম লাইনে চলে আসবে, তাই না?
ড্যানিকে ধরার পরিকল্পনা গুলো তার বেশ উপভোগ্য লাগছে। তিন গোয়েন্দার মত নিজেকে ডিটেকটিভ লাগছে। একদিকে পাপা, রবিন চাচ্চু- সজীব চাচ্চু। অন্যদিকে সোহান এবং সে। ইশান জোর করে মাকে তার কামরায় পাঠিয়ে ঘুমাতে চলে গেলো। সকালে দ্রুত উঠতে হবে।
সকাল ছয়টা। ফযরের সালাত আদায় করেই ইমরান বেরিয়ে পড়েছে জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। পাঠানগড় যেতে বেশ সময় লাগবে। ময়মনসিংহ জেলার ভালুকাতে অবস্থিত এই গ্রাম। আজকের দিনটা কেমন হবে সবকিছু নির্ভর করছে হাম্মাদের কাজের উপর। বাড়িতে পাহারা বসিয়েছে যেন বাড়ি থেকে আজ কেউ বের না হয়, বিশেষত ইশান। ড্যানিয়েলের শো বেলা এগারোটায়। ততক্ষনে ইমরান জমিদার বাড়িতে যাবতীয় ব্যবস্থা করে নেবে। উত্তরা থেকে নাফিস যোগ দিলো। পেছনে ওদের গাড়ি বহর। নিরাপত্তা ছাড়া ওদিকে পা বাড়ানো বেঠিক। মাঝ রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে দিলো ইমরান। গাড়ি থেকে নেমে নাফিসের দলের এক ছেলের বাইকে উঠলো নাফিস সহ। নাফিস প্রশ্ন করলো,
– বাইক কেনো?
– ওদের আগে পাঠিয়ে দিব। আমি তুই পরে যাবো তবে অন্য রাস্তা ঘুরে যাব। আরেকটা রাস্তা চিনি ওটা দিয়ে।
– কেনো?
– ড্যানি সোজা রাস্তায় চলে না।
নাফিসকে চিন্তিত দেখালো। ইমরান প্রশ্ন করলো,
– পারবিনা ওর সাথে?
– অবশ্যই পারবো। এমন ভাবে বলছিস আমি জীবনে মা*র পিঠ করিনি। ব্যাপারটা পারা না পারা নয়। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে আমরা পুরো একটা টিম শো তে পাঠিয়েছি। ও যদি আজ শো তে উপস্থিত না হয়?
ইমরানকে বেশ ভাবুক দেখালো। ইমরানদের তিনটা গাড়ি ওদের ছাড়িয়ে অনেকটা দূর এগিয়েছে। মাটির রাস্তার বট গাছটার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে দুই বন্ধু। নাফিস পুনরায় বললো,
– এত দীর্ঘ একটা পরিকল্পনা এক দিনে ধূলিসাৎ কি করে করবি ভেবে দেখেছিস? ও ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে ওর বাংলাদেশ সফর ব্যর্থ। তোর সব প্রোডাক্ট সরিয়ে ফেলেছি আমরা। এখন শুধু একটা গোডাউনে পরিত্যক্ত কিছু গান আর বুলেট আছে। কি পরিমাণ ক্ষেপে আছে বুঝতে পারছিস। আরো পাগলা ষাড় হয়ে আছে গতকাল রাত থেকে নাকি যেসব পলিটিশিয়ানদের সাথে কাজ করছিলো সবাই না করে দিয়েছে। কারণ অস্ত্রের সন্ধান না পাওয়াতে পিছিয়ে গিয়েছে। আমরা সবাই মাঠে নেমে পড়েছি অথচ আমাদের হাতে অপশন শুধু একটাই। সেটা কি? যেভাবে হোক ড্যানিকে জমিদার বাড়ি আনতে হবে। মানলাম সব স্কলার, রাবি-রাকি জমিদার বাড়িতে যাবে। দোয়া- রুকাইয়া সব হবে। কিন্তু তোর এটাও মাথায় রাখতে হবে ড্যানিয়েল একজন সার্টিফাইড জাদুকর। একে তো ওর বিজনেস আর পাওয়ার নস্যাৎ করলি এর মাঝে ওকে ধরার প্ল্যান! কতটা বিপজ্জনক কাজ। দুইটা বল চারটা বানালাম, বক্স থেকে কবুতর বের করলাম টাইপ জাদুকর নয় ড্যানি। মানুষকে ভেলকি লাগিয়ে তা দুই ভাগ করে ফেলা জাদুঘর, গায়েব করে ফেলা জাদুকর, যার ওঠাবসা সব শয়তানের সাথে। তুই এটাকে ম্যানেজ করতে পারবি আজ?
বাইকে চড়ে বসলো ইমরান। নাফিসের দিকে তাকিয়ে বললো,
– উঠে বস। আল্লাহ ভরসা।
মাথাভর্তি দুশ্চিন্তা। ঘড়িতে ইতিমধ্যে সাড়ে নয়টা বেজে গিয়েছে। বেলা সাড়ে দশটায় পৌঁছে গিয়েছে জমিদার বাড়ি। সুনশান এরিয়া। গাড়ি গুলো আশেপাশে নেই। অনেক দিনের মরিচা ধরা গেটটা ঠেলে দুজন ঢুকলো। ক্যাত করে শব্দ করলো। রবিন এবং সজীব এগিয়ে এলো। সজীবকে প্রশ্ন করলো তোমাদের গাড়ি কোথায়?
– স্যার আন্ডার গ্রাউন্ডে।
ইমরান, নাফিস চমকে গেলো। নাফিস প্রশ্ন করলো,
– চারটা এত বড় গাড়ি পার্ক করার আন্ডারগ্রাউন্ড ও আছে?
– জ্বি স্যার। এটা নতুন করা। হয়তো ড্যানিয়েল করেছে। ও দেশে যখন আসতো তখন বড় বড় আমলা, মন্ত্রীদের গাড়ি ঢুকতো এই বাড়িতে। বাইরে থেকে কেউ জানতোনা এখানে মানুষ আসে। জাদু কক্ষে জাদু চলতো আর তার পাশের রুমে ওর আলোচনা সভা।
নাফিস বাজে একটা গালি দিয়ে বললো,
– শা*লা মা*****দ এখানে রঙ্গ তামশা করছে। আর গ্রামের মানুষ বলে এই বাড়িতে জমিদারের আত্নারা ঘুরঘুর করে। এজন্যই কি এখানে কেউ আসলে অদৃশ্য হয়ে যেত।
– না বলি দিত শয়তানের নামে।
– পাপিষ্ঠ।
জাদুকক্ষে এসে ইমরান চারপাশটা ভালো করে পর্যবেক্ষন করছে। আলেম,মুফতি, রাকিরা বসেছে। সাধারণ একটা কামরা নাকি মৃত্যুপুরী হয়ে উঠে। ঝকঝকে পরিষ্কার মনে হয় যেন প্রায় সময় মেঝে মোছা হয়। অথচ এখানকার কর্মরত কেয়ারটেকার আজ অবধি এই কামরায় আসেনি। একজন রাকি দাঁড়িয়ে বললো,
– ইমরান ভাই, ওরা অনেক বছর ধরে এই জায়গা ব্যবহার করছে।
ইমরান মাথা নেড়ে বললো,
– জ্বি হুজুর আমি শুনেছি।
– একদিনে কি আমাদের পক্ষে সম্ভব! যা করার সন্ধ্যার আগে করতে হবে।
– ইনশাআল্লাহ।
ইমরানের ফোন বেজে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই ইমরান চেঁচিয়ে উঠলো,
– আহাম্মক গুলা। তোদের রাখছি কিসের জন্য আমি। বাড়িতে কে আছে এখন?
আইরিন ফোন ধরে বললো,
– হ্যাঁ, ইমন।
– আপা কই ছিলা তুমি। এরা দুজন তোমাকে ফাঁকি দিয়ে বের হয় কি করে?
– তুই এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেনো? ওরা হয়তো ঘুরতে গিয়েছে মা ছেলে। রুবিনাকে বলে গিয়েছে।
ইমরান ফোন কেটে দিয়ে মাথায় হাত দিয়ে নিজের চুল ছিঁড়ছে। সবাই এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো, কি হয়েছে?
উত্তরে ইমরান বললো,
– ইশান আর মোনালিসা বের হয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে শো দেখতে।
নাফিস বলে উঠলো,
– ইন্না-লিল্লাহ। ফোন দেয়।
ইমরান ফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও খেয়াল করলো কল ঢুকছেনা। নাফিস সজীবকে বললো,
– সজীব হাম্মাদকে ইনফর্ম করো। ওদের দুজনকে যদি শো তে দেখতে পায় যেন সরিয়ে রাখে। নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যায়।
ইমরান কপাল মুঠো জড়ো করে আঘাত দিয়ে বললো,
– আমি বোধ হয় শান্তিটা আর পাবোনা। একটা সাধারণ জীবন চেয়েছি। অথচ অশান্তির শেষ নেই। এখন যদি এদের দুজনের কিছু হয় আমি তো সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবো। একসাথে তিনজনকে হারাবো আমি। ইচ্ছে করে এরা এমন কাজ করেছে। নিশ্চিত থাক এরা একজন আরেকজনকে সাপোর্ট করতে একসাথে বের হয়েছে।
চারদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজেও একমাত্র কন্যা নিখোঁজ আজ চারদিন। আমেরিকা হলে লোক লাগিয়ে বের করে নিয়ে আসতো। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি আপাতত হাতের নাগালের বাইরে। ইমরান সব জেনে বুঝেই জিনিস সরিয়ে ফেলেছে। শো ইতিমধ্যে চলছে। জমে উঠেছে শো। বাচ্চারা আনন্দ নিয়ে দেখছে। ড্যানিয়েল গ্রীন রুমে বসে স্টেজে থাকা ম্যাজিশিয়ানকে নির্দেশ দিয়ে চলেছে কিভাবে গায়েব করে দিবে। অদ্ভুত ভাবে যে মেয়েকে গায়েব করেছে সেই মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে পারছেনা মঞ্চে উপস্থিত ম্যাজিশিয়ান। ঘাবড়ে গিয়েছে সকলে। দুশ্চিন্তার মাঝেও গ্রীন রুম ছেড়ে পোশাক পরে মুখোশ পরে স্টেজে এলো ড্যানিয়েল। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর সেই মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলো। কিন্তু এমন অভিজ্ঞতা তার জাদুর ক্যারিয়ারে কখনো হয়নি। আজ এত গড়মিল কেনো হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাঁধা আসছে। জ্বীনেরা কি অবাধ্য হয়ে গেলো! শিষ্য জাদুঘরকে নির্দেশ দিলো ছোট খাট জাদু দেখাতে আপাতত। গ্রীন রুমে ফিরে এসে ফেটে পড়লো রাগে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জ্বীনকে ডেকে প্রশ্ন করলো,
– গড়মিল হচ্ছে কেনো?
– সময় সন্নিকটে। প্রস্তুত হও।
– মানে।
– শেষ সময়ের প্রস্তুতি নাও।
ধমকে উঠলো ড্যানিয়েল,
– মশকরা করো আমার সাথে এখন। একে তো মেয়েকে পাচ্ছিনা এর মাঝে নাটক করো।
– তোমার মেয়ে এখানেই আছে।
গ্রীন রুমে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ড্যানিয়েল। এডামেরী ছুটে এসে বললো,
– মি. ড্যানিয়েল। আই হ্যাভ আ নিউজ, ইফ আম নট রঙ ফিউ মিনিটস এগো আই হ্যাভ সীন রোজলিপ ইন দ্যা ক্রাউড।
– হোয়াট!
এডামেরীকে নিয়ে বের হলো দর্শক সিটের উদ্দেশ্যে। আশপাশটা সাবধানী ভঙ্গিতে পর্যবেক্ষন করছে। অকস্মাৎ চোখে পড়লো মেয়ে রোজলিপকে। কার হাত ধরে যেন অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। ড্যানিয়েল মেয়ের পিছু নিলো। ভিড়ের মাঝেও মেয়েকে চোখে চোখে রাখলো। হাম্মাদের হাত থেকে ছুটে গেলো রোজ। হাম্মাদ পেছন ফিরে দেখে রোজ ছুটছে। এদিকে ড্যানিয়েল লক্ষ্য করলো মেয়েকে হারিয়ে ফেলেছে। ক্রোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেনা। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতেই পুনরায় মেয়েকে চোখে পড়লো। মেয়ের সাথে যাকে দেখলো বিস্মিত হলো। ইশানের হাতের মুঠোয় রোজ। ধারণা পুরোপুরি বদলে গেলো। ইশান তো আসার কথা নয় আজ। তবে কি ইমরান পাঠালো ছেলেকে স্পাই হিসেবে! হাম্মাদের টিম ইশানের হাতে রোজকে দেখে আঁৎকে উঠলো। ড্যানিয়েল এগিয়ে আসতে আসতে অট্টহাসি দিয়ে বললো,
– হ্যালো ইশান। হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ।
ইশানের সাথে ছিলো মোনা। হাম্মাদকে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে মোনা লক্ষ্য করলো। হাত দিয়ে ইশারা করছে সরে যাওয়ার জন্য। মোনা ড্যানিয়েলকে দেখে খানিকটা হেসে বললো,
– হাউ আর ইয়্যু?
ড্যানিয়েল হাসছে। প্রশ্ন করলো,
– হু ইজ দ্যা গার্ল?
মোনা না বুঝেই বললো,
– ওহ শী ইজ মাই ব্রাদার ইন ল’স ডঠার।
ততক্ষনে ইশান যেন পাথরের মতো জমে যাচ্ছে। রোজ ইশানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মোনা বুঝতে পারছেনা ইশান এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে কেনো। ড্যানিয়েল ইশানের দিকে তাকিয়ে মোনাকে প্রশ্ন করলো,
– হুজ ইয়্যুর ব্রাদার ইন ল?
মোনা উত্তর দিলো,
– মি. হাম্মাদ।
– ওও রিয়েলী?
নিজের অজান্তের সব ভুল উত্তর দিয়ে ফেঁসে গিয়েছে। এদিকে ইশান অনেকটা ড্যানিয়েলের কব্জায় চলে যাচ্ছে। পেছন থেকে খুব জোরে হাম্মাদ ধাক্কা দিলো ধ্যান ভেঙ্গে গেলো ইশানের। হাম্মাদ জোরে বললো,
– ভাবিজি রান।
মোনা ঘটনার আঁচ বুঝতে পেরে ইশান এবং রোজকে নিয়ে ছুটছে। ড্যানিয়েল এবং হাম্মাদের মধ্যে মা রপিট লেগে গেলো। পাশ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী এসে এদের থামাতে চাইলো। ড্যানিয়েল উগ্র হয়ে হাম্মাদের উপর চটে গেলো। মেয়ের কথা মনে পড়তেই ছুটলো মোনাদের পেছনে। ইশান মোনাকে এবং রোজকে পেছনে বসিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। পেছনে ড্যানিয়েলের বাইক। তার পেছনে হাম্মাদের গাড়ি। যা পরিকল্পনা ছিলো পুরোটাই ভেস্তে গেলো মোনা আর ইশানের অতি চালাকির জন্য। মোনা ইশানকে প্রশ্ন করলো,
– ইশান আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ইশান ডান বাম স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে আর গিয়ারে চাপ দিচ্ছে। কম্পিত গলায় বললো,
– মা আমি জানিনা। আমি সোজা পথ ধরে আগাচ্ছি। এখন কি করবো?
মোনা জোরে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললো,
– ইশান কাম ডাউন বাবা। কিচ্ছু হবে না। হাসান কোথায়?
– ফোন দিচ্ছি ধরছেনা।
– তোমার সোহান ভাইয়াকে ফোন দাও।
– ভাইয়াও ধরেনা।
মোনা মনে মনে দোয়া পড়ছে। ইশান চিৎকার দিয়ে বললো,
– মা, ড্যানিয়েল আমাদের পেছনে।
মোনার দু চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আজ মনে হলো ইমরান সবসময় বলতো, মোনালিসা একটু বুঝে শুনে চলবে। বাস্তবতা অনেক কঠিন। আবেগের জায়গা নেই। কেনো ছেলেটাকে আটকে দিলোনা সকালে! নাহয় বকাই দিতো, না মানলে দুটো চড় থাপ্পড় দিয়ে হলেও আটকে দিতো। বের হলো কেনো? ইশান একবার গাড়ি ডানে চালাচ্ছে আবার বামে। স্পিড তুলেছে একশো। এতে এক্সিডেন্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। রিয়ার মিররে তাকিয়ে ইশানের মনে হলো তিনটা বাইক। ইশান চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে স্মরণ করতে শুরু করলো। আর নিজের ভুলের জন্য আফসোস করছে। চোখের পানি শার্টের হাতা উলটে মুছে ফেললো যেন মা না দেখে। মোনা ইতিমধ্যে ছেলের অবস্থা গ্লাসে দেখছে। ভেজা গলায় ইশান বলে উঠলো,
– মা আমাকে মাফ করে দিও। আমার জন্য আজ তুমি আর বোন দুজনই বিপদে। পাপা আমাকে কোনোদিন ও মাফ করবেনা।
চেয়ারে চোখ বাঁধা অবস্থায় ড্যানিয়েল। ছটফট করছে। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রক্তাক্ত হাম্মাদের টিম। ড্যানিয়েলকে ধরতে গিয়ে এক্সিডেন্ট হয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। হাম্মাদ চেয়েছিলো ড্যানিয়েলকে জায়গাতে শ্যুট করে দিতে। ইমরান চায়নি তা। ইমরানের জন্য এখানে ধরে বেঁধে আনতে অনেক কসরত করতে হয়েছে। ড্যানিয়েলের সামনে আজ হুজুররা হাজির করেছে ওর সকল অশুভ শক্তিকে। রুমটা কেমন উত্তপ্ত। ইমরান বের হয়ে গেলো সকলকে নিয়ে। হাম্মাদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছে সজীব। ভেতরে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। গোঙানির আওয়াজ। ইমরানের সেদিকে মন নেই। হাম্মাদ প্রশ্ন করলো,
– ইমরান ভাই, ড্যানিয়েলকে কি করবা?
– এখানেই ইট চাপা দিয়ে গেড়ে দিব।
নাফিস বুঝতে পারছে ইমরান হিংস্র হয়ে উঠেছে যখন থেকে শুনেছে ইশান এবং মোনা যেই গাড়িতে ছিলো তা ক্ষেতের মাঝে উলটে পড়ে আছে। পকেটের ফোন ভাইব্রেট করছে। বের করতেই দেখতে পেলো সোহানের ফোন,
– মামা আসসালামু আলাইকুম।
– ওয়ালাইকুমুস সালাম।
– আমি জমিদার বাড়ির দিকে আসছি। মামী আর ইশানকে নিয়ে। ওদের পেয়েছি।
– না। ঢাকা ফিরে যাও। আমি আসছি।
– আচ্ছা।
ভেতর থেকে হুজুররা প্রত্যেকে বেরিয়ে এলো। ইমরানদের দেখে বললো,
– ভাই সন্ধ্যা হচ্ছে চলেন।
– আপনারা চলে এলেন যে।
– আমাদের কাজ হয়ে গিয়েছে। যাদের উপর জাদু করেছে এবং যেসব জ্বীনদের এতদিন বশে রেখেছিলো প্রত্যেকে চটে গিয়ে জাদুকরকে ঘিরে ফেলেছে। ওরা আর কিছুতেই ছাড়বেনা।
– এখন আমাদের করণীয় কি?
– জাদুকরের সাথে ভালো কিছু হবে না। তবে এই জায়গাটা নিরাপদ না। খুব ভালো হয় যদি জমিদার বাড়ি টা মিটিয়ে দেন। হয়তো জ্বীনের আসর বসবেনা কিন্তু অন্য যেকোনো অন্যায় হতে পারে। ভেঙে সেটা বিরান ভূমি করে ফেলেন। প্রয়োজনে এখানে কিছু বছর পর চাষ বাস করলেন। তবে এই বাড়ির অস্তিত্ব না রাখা ভালো। এই জাদুকরটা আর বাঁচবেনা। আগামী কিছুদিন এখানে কেউ আসবেন না। কয়েকমাস পর সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবেন।
– ভেতরে যদি ওর লাশ থাকে?
– থাকবেনা। ওরাই নিয়ে যাবে। ওরা অনেক ক্ষীপ্ত।
নাফিস বলে উঠলো,
– তার মানে এখানেই এর কাহিনী খতম?
– জ্বি। আপনারা দূরে থাকবেন এই বাড়ি থেকে। এই বাড়িটা অভিশপ্ত।
– জ্বি।
গেটে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে গেলো সকলে। গাড়িতে নাফিস প্রশ্ন করলো,
– ইমরান তুই এত চুপ কেনো? ভাবী আর ইশান তো ফিরছে বাসায় ইনশাআল্লাহ।
ইমরান তখনো নিশ্চুপ। হাম্মাদ বললো,
– ভাইয়ের আফসোস নিজ হাতে মা*রতে না পারাতে। তাই না ইমরান ভাই?
ইমরান জানালার দিকে তাকিয়ে বললো,
– দস্তগীরের সাথে আজ যা হলো এটাকে কি বলে জানো তোমরা?
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে ইমরানের উত্তরের অপেক্ষায়। ইমরান জানালার বাইরে সন্ধ্যা আকাশের পানে চোখ রেখে বললো,
– পয়েটিক জাস্টিস।
নাফিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
– হুম, প্রত্যেকে তার কর্মফল ভোগ করবে। তবে দস্তগীরের সাথে যা হয়েছে তা অভাবনীয়। ওর কর্মই ওকে ওর ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেলো।
গাড়ি বাড়ির গেটে। নাফিসকে নামিয়ে দিয়ে হাম্মাদকে হাসপাতালে রেখে বাড়িতে এলো ইমরান। নয়ন এবং মিনহাজকে ফোন দিয়ে বললো বাড়িতে আসতে। মিনহাজের গাড়ি গ্যারেজে দেখে বুঝতে পেরেছে সবাই বাড়িতে আছে। সোফায় সবাই বসে আছে। ইমরানকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। ইশানের হাতে ব্যান্ডেজ আর মোনার মাথায়। রোজলিপকে আইরিন ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। কারো মুখে আজ কোনো শব্দ নেই। ইমরান পরনের জ্যাকেট খুলতে খুলতে সিঁড়ি দিয়ে রুমে যাচ্ছে আইরিন ডাক দিলো,
– ইমরান?
– আসছি। অপেক্ষা করো।
লিভিং এরিয়া থমথমে। আঘাত প্রাপ্ত ইশান এবং মোনাকে দেখে আজ ইমরান ছুটে আসেনি। মিনহাজ,নয়ন,আইরিন, ইশতিয়াক পুরো ঘটনা জেনে স্তব্ধ। ইশান এবং মোনা দুজনই বকা খেয়ে মিনহাজ এবং আইরিনের কাছে। মিনহাজ দুশ্চিন্তায় আরো ভেঙে পড়েছে। আইরিন যেখানে আজ অবধি ইশানের দিকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলেনি, সেখানে খুব বকা দিয়েছে। মোনা সোফায় বসে আছে। ওর দিকে তাকালে মনে হয়না এতটুকু পরিমাণ অপরাধবোধ তার মাঝে কাজ করছে। মিনহাজের কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়েছে অন্য কান দিয়ে বের করেছে। মোনার ভাষ্যমতে সে কোনো অন্যায় করেনি। স্বামী – সন্তানের জন্য বের হয়েছে। উপর থেকে ইমরান নেমে আসছে। হাত মুখ টিস্যু দিয়ে মুছে মিনহাজকে সালাম দিলো। ইশানের দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে। ইশান উঠে এসে বাবাকে বললো,
– পাপা স্যরি।
ইমরান মুহুর্তের অপচয় না করে সর্বোচ্চ জোর খাটিয়ে ছেলেকে চড় মা*রলো। কেঁপে উঠলো সকলের আত্মা। বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো সকলে। মোনা ছুটে এসে ইশানকে ধরলো। মিনহাজ ধমকে উঠলো,
– ইমরান। এত বড় ছেলের গায়ে তুই হাত তুললি?
আইরিন ইমরানের কাছে এসে সরিয়ে দিলো।
সোহানকে ধমকে ইমরান বললো,
– তোর মাকে সরা সোহান।
আইরিন চেঁচিয়ে বললো,
– তুই কোন সাহসে বাড়ির ছেলের গায়ে হাত তুলবি?
আইরিনকে হাত দিয়ে সরিয়ে ইশানকে চিৎকার দিয়ে বললো,
– তোকে আমি এজন্য রক্ত মাংস পানি করে মানুষ করছি। এত অবাধ্য হয়েছিস তুই?
মাথা নত ইশানের। মোনা এর মাঝে চেঁচিয়ে উঠলো,
– খবরদার আর একবার আমার ছেলের সাথে জোর গলায় কথা বলবেন তো। আপনি ছেলের গায়ে হাত তুললেন কিভাবে?
সকলকে অবাক করে দিয়ে কষিয়ে দ্বিতীয় চড় ড়া মা*রলো মোনাকে। ইশান বাবার দিকে ক্রন্দরত লাল চোখ নিয়ে তাকালো। মোনাকে আগলে ধরলো। ইমরান আঙুল তুলে বললো,
– একদম চুপ। ছেলে ভুল করছে জেনেও ছেলেকে সাহায্য করার জন্য এই চড়টা তোমার প্রাপ্য ছিলো। এতটুকু ও আফসোস হচ্ছেনা আমার তোমাদের চড় মে*রে। কতটা ব্রেইনলেস হলে দুজনে একসাথে ভুল করে তোমাদের থেকে শেখা উচিত৷ ননসেন্স।
মিনহাজ নিজের জায়গায় অনড়। চোখের পানি আড়াল করে নিলো। মেয়ে আজ থাপ্পড় খাওয়ার মতই কাজ করেছে। ইশানকে বাধা না দিয়ে নিজের জীবন সব তিনটা জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছে। নয়ন, ইশতিয়াক এসে মোনা এবং ইশানকে আগলে ধরলো। মোনা চেঁচিয়ে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪৯
– বেশ করেছি ছেলেকে সাহায্য করেছি। আরো করবো।
আরো একটা চড় খেলো মোনা। ঠোঁটের পাশটা নোনতা লাগলো মোনার। হয়তো খানিকটা কেটেছে। পুরুষালি চড় তো নমনীয় হবার কথা নয়। ইশানের ঠোঁট কাঁপছে। চোখ ভেঙে কান্না পাচ্ছে। দু গাল ভিজে গিয়েছে। মায়ের হাতটা শক্ত করে মুঠোয় পুরে রেখেছে। মোনার গালে দ্বিতীয় চড়ের সাথে শান্ত লিভিং এরিয়া যেন কেঁপে উঠলো। সবাইকে এভাবে ফেলে ইমরান বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
