Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫১

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫১

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫১
নীতি জাহিদ

ফ্ল্যাটের বারান্দায় নিরবে বসে আছে চেয়ারটাতে। মাথা নোয়ানো। সারাদিনের ক্লান্তি শরীর জুড়ে। এরপরো বিছানায় যেতে মন সায় দিচ্ছেনা। বাড়ি ফিরবেনা। আজ এদের কারো মুখ দেখবেনা। স্বস্তি দরকার। মেঝেতে চোখ নিবদ্ধ। যা করতে চায়নি তা করে বসেছে আজ। এক ফোঁটা, দু ফোঁটা করে বেশ কয়েক ফোঁটা অশ্রু জমা হয়েছে মেঝেতে। যে হাতে আজ মানুষ দুটোকে আঘাত করেছে হাতটার দিকে তাকিয়ে আছে। একবারো প্রশ্ন করলোনা, কোথায় আঘাত পেয়েছে! ছেলেটা খুড়িয়ে হাঁটছিলো। হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। হাত কি ভেঙেছে! পায়ে কি বেশি আঘাত লেগেছে? এইতো সেদিন পড়ে গিয়ে বাগানে ব্যাথা পেয়েছিলো বলে কোলে নিয়ে নেমেছে সিঁড়ি দিয়ে অথচ আজ জিজ্ঞেস করলোনা অবধি কতখানি আঘাত পেয়েছে। আর মোনা!

ও সুস্থ আছে? মাথায় কতটা আঘাত লেগেছে? বাচ্চাটা সুস্থ আছে? ফোন দিয়ে যে কাউকে ওদের খবর জিজ্ঞেস করবে তার ও উপায় নেই। কিছুক্ষন আগে রাগের মাথায় আঁছাড় দিয়ে ফোন ভেঙে ফেলেছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে। হয়তো মন হালকা হতো। কিন্তু ইমরানরা কাঁদতে পারেনা। ওদের কষ্ট গুলো বুকে চাপা থাকে। শূন্যে মিলিয়ে যায়। জমা হয় কিছু দীর্ঘশ্বাস। বুকটা খাঁ খাঁ করছে ছেলেটাকে একটাবার জড়িয়ে ধরতে পারতো। কিভাবে ফুফিয়ে কাঁদছিলো। অথচ বাবার মুখে মুখে তর্ক করেনি। আর মোনা! মেয়েটা অবাধ্য হতে গেলো কেনো? পারলোনা ইশানকে ধমকে আটকে রাখতে? মা হিসেবে ইশানের জন্য সেরা। তবে মায়েরা তো শাসন ও করে। শাসন করেও তো ছেলেটাকে বুঝাতে পারতো!

এপ্রিলের ঝড় শুরু হয়েছে। ঈদের পর পর চারদিক ফাঁকা। এখনো মানুষের ঘরে ফেরা হয়নি। কখন যে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়েছে শরীর খেয়ালই করেনি। ভেজা শরীর নিয়ে উঠে পোশাক পালটে বিছানায় বসলো ভাঙা ফোন জোড়া লাগাতে। কোনো সমাধান না পেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। অনেকটা চোখ লেগে এসেছিলো। তখনই কলিংবেল বেজে উঠলো। চোখ কচলে চশমাটা চোখে দিলো। ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারোটা। আশপাশটা নিরব হওয়াতে সাড়ে এগারোটাও মধ্য রাত মনে হচ্ছে। গায়ে টি শার্ট চাপিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলেই হতবাক ইমরান। ইশান দাঁড়িয়ে আছে। কথা না বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। ডান পা খুড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বাবাকে সালাম দিলো। সোফায় বসে হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটা সেন্টার টেবিলে রাখলো। ইমরান চুপ করে অন্য সোফায় বসলো। গমগমে স্বরে প্রশ্ন করলো,

– কেনো এসেছো?
– পাপা স্যরি।
সোফা থেকে উঠে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায় ইমরান, ইশান পেছন থেকে এক হাতে বাবাকে ঝাপটে ধরে কেঁদে উঠলো। কাঁদতে কাঁদতে একই কথা বলছে,
– আর কখনো এমন করবোনা পাপা। প্লিজ কথা বলো। তুমি কখনো এত রাগ করোনি আমার উপর। কে আছে তুমি আর মা ছাড়া আমার। একটু কথা বলো পাপা।
ঘুরলোনা ছেলের দিকে। ঠোঁট চেপে হাহাকার টুকু উগলে নিলো। ঝরতে দিলো চোখের পানিটুকু। আবেগী হলোনা। শক্ত খোলসে আগলে রাখলো নিজেকে। প্রগাঢ় স্বরে বললো,
– ছাড়ো। ঘুমাবো আমি।
– আচ্ছা ঘুমিয়ে যেও। মা খাবার পাঠিয়েছে। একটু খাও।
ইশান বাবাকে ছেড়ে খাবারের বাটির দিকে এগিয়ে গেলো। ইমরান ছেলের দিকে না তাকিয়ে রুমে চলে গেলো। বাটি নিয়ে ইশান বেড রুমে এলো। বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,

– খাবেনা?
– নাহ।
– আমিও খাইনি পাপা।
– না খেলে খেয়ে নাও।
– তুমি না খাইয়ে দিলে খাবোনা।
– খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
এর আগে কখনো বাবার এমন রূপ ইশান দেখেনি। চেয়ে আছে বাবার দিকে। ইমরান শুয়ে পড়লো বিছানায়। খাবার বাটিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে বাটির উপর। এক হাত বুকের সাথে বাঁধা অন্য হাতে বাটি। ভেজা গলায় বললো,
– পাপা আমি কি চলে যাবো?
ইমরান অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলো,
– এসেছো কার সাথে?
– রবিন চাচ্চুর সাথে।
– রবিন কি আছে?
– থাকবে বলেছিলো আশে পাশে। ফোন দিলে আসবে।
– চলে গেলে চলে যাও।
– আচ্ছা দরজা আটকে দাও।
– ড্রয়ারে দুটো চাবি আছে একটা নিয়ে লক করে যাও।

ইশানের পা চলছেনা। প্রচন্ড ব্যাথা করছে। পায়ে হাঁটুর কাছটাতে থেতলে গিয়েছে। আজ পাপার আচরনে মনে হলো অনেক বড় অপরাধ করেছে। তৎক্ষনাৎ মনে হলো আজ যদি বেঁচে না ফিরতো তবে পাপা কার সাথে রাগ করতো! ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে বললো,
– পাপা আমি আসি। টেবিলে খাবার বাটি টা রেখে যাচ্ছি। সকালে খেয়ে নিও। আর বেডসাইড টেবিলে তোমার প্রেশারের ঔষধ টা রেখে যাচ্ছি খেয়ে নিও।
এতটুকু বলে ডাইনিং পর্যন্ত গিয়ে ইশানের মনে হলো আর পা চলছে না। চেয়ার টেনে বসলো। পাপা তো ঘুমিয়েই পড়বে। দশ মিনিট বসে না হয় বের হবে। পা টা একটু বিশ্রাম পাক। ফোন হাতে নিয়ে রবিনকে ফোন দিলো,
– হ্যাঁ ইশান বলো।
– চাচ্চু দশ মিনিট পর আসো। আমি নামবো।
– নামবে মানে থাকবেনা?
– না পাপা চাইছেনা আমি থাকি।
– আচ্ছা। আসতে পারবে নিজে নিজে?
– এজন্যই দশ মিনিট সময় চাইলাম। পায়ে টান লাগছে। ব্লিডিং হচ্ছে একটু বসি। পা চলছে নাতো।
– পাপাকে স্যরি বলে থেকে যা ব্যাটা। এমন একটু আকটু রাগ করে বাবারা। ফিরে আসছিস কেনো?
ইশান কেঁদে দিলো। কাঁদতে কাঁদতে বললো,

– পাপা আমাকে চায় না পাশে এখন। আমি পাপাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি চাচ্চু। আমার জন্য পাপা আজ মাকেও মে*রেছে। মায়ের দোষ ছিলোনা। আমাকে অনেক বুঝানোর পর ও রাজি না হওয়াতে একা ছাড়ার রিস্ক নেয় নি মা। নিজে বেরিয়ে এসেছে আমার সাথে। সবাই আজকে মায়ের দিকে আঙুল তুলেছে। কেউ বুঝলোনা মাকে।
– দোষ তো তোর। কি দরকার ছিলো বাড়াবাড়ি করার। আমরা ছিলাম না? এখন যা হয়েছে, হয়েছে। এখন বাবা শুনো, তোমার পাপা কিন্তু কিছুই খায়নি। নিজেও খেয়ে পাপাকে খাওয়াও।
– আমি এখন আবার রুমে গেলে আরেকটা থাপ্পড় দিবে। এবার আমি ম*রে যাবো। পাপা আমাকে কখনো মা*রেনি। ব্যাথা লাগার চেয়েও বেশি কষ্ট লাগে বুকে।
পেছন থেকে ইমরান এসে ইশানের কান থেকে ফোন কেড়ে নিলো। রবিনকে বললো,

– রবিন সকালে এসে নিয়ে যেও ওকে।
– জ্বি স্যার।
– তুমিও বিশ্রাম নাও সারাদিন বাইরে ছিলে। অনেক ধকল গিয়েছে।
– ওকে স্যার। কিছু লাগলে আমাকে কল দিয়েন।
– ঠিক আছে।
ইশান বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সহসা হেসে উঠলো। ইমরানের মুখে হাসির ছিটাফোঁটাও নেই। রান্নাঘর থেকে প্লেট এনে একটা ছেলের জন্য খাবার বাড়ছে। মুখে শব্দ নেই। ইশানকে খাইয়ে দিতে দিতে বললো,
– খাওয়ার পর চুপচাপ ঘুমিয়ে যাবে। ঔষধ নিয়ে এসেছো সাথে?
– এনেছি।
– খেয়ে নিবে।
ইশান মাথা কাত করে সায় দিলো। বাবাকে খাওয়ার কথা বলতে ভয় করছে। তবুও বললো,

– পাপা তুমি খাবেনা?
– আমার খাবার নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। খেয়ে বেডের উপর ড্রেস রেখেছি ওটা পরে শুয়ে পড়বে।
– এখানে আমার ড্রেস আছে?
– হুম আমি এনে রেখেছি।
খাবার শেষে ইমরান রান্নাঘরে চলে গেলো, ইশান রুমে এসে কয়েকবার চেষ্টা করেও পরনের শার্ট টা খুলতে পারছেনা। ইমরান এসে খুলে পরিয়ে দিলো। প্যান্ট তো ছেলে খোলার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ ইমরান ধরতে যাবে পিছিয়ে গিয়ে বলে,
– নো পাপা।
চোখ রাঙিয়ে বলে,
– আরেকটা থাপ্পড় খেতে চাও?
দু পাশে পর পর মাথা নেড়ে জানালো সে চায়না।
– পাপা আমি তো বড় হয়েছি।
– কত বড়?
ইমরান তোয়ালে পরিয়ে প্যান্ট বদলে দিয়ে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরিয়ে দিলো। হাঁটুর কাছটাতে র/ক্ত, পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। গজ ভিজে গিয়েছে। চোয়াল শক্ত করে মেঝেতে বসে ইশানের পা কোলে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সটা বের করে জায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করলো। হেক্সিসল, পভিসেফ লাগিয়ে গজ দিয়ে মুড়িয়ে দিয়ে বললো,

– চুপচাপ ঘুমিয়ে যাও। বাতি নিভিয়ে দিচ্ছি।
ছেলের পাশে শুয়ে পড়লো। সময় কিছুটা পার হতেই ইশানের ফোন ভাইব্রেট করে উঠলো। মেসেজ জমা হয়েছে ফোনে। মায়ের অনেক মেসেজ। সব কটা মেসেজের উত্তর দিয়ে জানালো, সে কাল সকালে আসবে। মোনার আরেকটা মেসেজ ছিলো যার উত্তরে ইশান মিথ্যা বলেছে। মেসেজে মোনা প্রশ্ন করেছে,
– ইশান আমার কথা জিজ্ঞেস করেছে তোমার পাপা?
উত্তরে ইশান বলেছে,
– হ্যাঁ মা। তুমি কেমন আছো? খেয়েছো কিনা।
ইশান চায়নি মা দুশ্চিন্তা করুক। অথচ পাপা আজ একবার ও মায়ের কথা জিজ্ঞেস করেনি। মা সারা রাত না খেয়ে থাকবে যদি ইশান উত্তর না দিতো।
– ইশান ঘুমাতে বলেছি। ফোন রাখো।
– জ্বি পাপা, স্যরি। মা মেসেজ দিয়েছিলো তাই রিপ্লাই করছিলাম।
– তাহলে মায়ের কাছেই থাকতে এখানে এসেছো কেনো?
– পাপা মা খায়নি এখনো। উত্তর না দিলে আরো খেতোনা। মায়ের মেডিসিন আছে।
– ওটা তোমার মা বুঝবে। ঘুমাও।

ইশান মন খারাপ করে ফোন রেখে শুয়ে পড়লো। ব্যাথায় ঘুমাতে পারছেনা। ইমরান ছেলেকে বুকে আগলে ধরে চুলে বিলি কেটে দিতে থাকলো। নিজেও ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করতেই মনে মনে ভাবলো,
– আমার এক সন্তান আমার বুকে, আরেক সন্তান না খেয়ে আছে। মোনালিসা তোমার অবুঝপনার জন্য আমার দুই সন্তান ভুগছে। তুমি ব্যাথা পেয়েছো তোমার দোষে, অথচ ভুগছে আমার অবুঝ বাচ্চাটা। তোমাকে আমি এত সহজে মাফ করবোনা।

এক হাতে এক বাটি স্যুপ অন্য হাত দিয়ে চোখের পানি মুছছে। আইরিন আপা রাগ করে বাবার সাথে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আপার একটাই কথা, ও ঘরের বউয়ের গায়ে হাত তুলবে কেনো? সবাই বুঝিয়েছে। অবশেষে চুপচাপ হলেও রাগ কমেনি। মিনহাজ, মনসুর চায়নি মোনাকে নিয়ে যেতে, মোনাও যায়নি। নিজের ভুল বুঝতে পারছে। মোনা কোনোভাবেই চায়নি ইশানের মন ভেঙে যাক। ছেলেটা বাবাকে সাহায্য করার জন্য এত কিছু পরিকল্পনা করলো। সকালে বুঝানোর পর ও যখন বারণ মানলোনা বাধ্য হয়ে বেরিয়ে পড়লো। নিয়তিতে ছিলো আজকের এই দূর্ঘটনা। তার জন্য যদি মোনাকে ইমরান দায়ী করে তবে মোনাই দায়ী। এই যে একটু আগে মিথ্যা মেসেজ দিলো, ওর পাপা নাকি মোনার খোঁজ নিয়েছে। মোনা জানে ইমরান কখনোই মোনার খোঁজ নেবেনা। অন্তত আজ তো নাই। স্যুপ টুকু খেয়ে যাবতীয় ঔষধ নিয়ে শুয়ে পড়লো। বিছানা আজ খালি লাগছে। মানুষটা কাছে থাকলে রাগ করলেও ভালো লাগে। যদি সত্যি কোনো ভুল আজ মোনা করতো, তবে ইমরান সারা রাত পাশে থেকে যত্নে আগলে নিতো। কক্সবাজারের ইন্সিডেন্টে মোনা দেখেছে ইমরানের ছটফটানি। আজ সেই ইমরান মোনার খবর নিতেও নারাজ। কথা বলা তো অনেক দূরের চিন্তা।

ইশান বাসায় আসার পর থেকেই ফুফির রাগ দেখতে পাচ্ছে। সারাদিন ধুমধাম, তোলপাড় করছে জিনিস পত্রের সাথে। ইশতিয়াক ড্রইং রুমে কিছু অতিথি এসেছে ওদের সাথে গল্প করছিলো। বোনের আওয়াজের ইশারা নিজে বুঝলেও অতিথিকে আলাপ পেতে দিলো না। অতিথি যাওয়ার পর কিচেনে গিয়ে দেখলো কিচেনে প্রতিটি প্রাণী ভয়ে তটস্থ। ইশান সোফার এক কোণে ইতুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। মুখটা অসহায় বানিয়ে রেখেছে। তুশি, রুবিনা কিছুতেই আইরিনকে সামলাতে পারছেনা। রাবিয়া এবং মতিয়া নির্দেশ মোতাবেক সব কাজ করতে গিয়ে হাত থেকে এটা ওটা ফেলে দিয়ে রান্না ঘরে গোলমেল লাগিয়ে দিয়েছে। ইশতিয়াক বোনকে শান্ত স্বরে বললো,

– আপা তুমি কি থামবে? এমন ভাঙচুর করে কার কি উপকার করছো শুনি? নিজের স্বাস্থ্য শরীর খারাপ করে সবাইকে বিপদে ফেলবে।
আইরিন ঘুরে ফোঁস করে উঠলো ভাইয়ের কথায়,
– হ্যাঁ তাই তো, এখন আমাকে বিপদ লাগবে, কাল তুশিকে বিপদ লাগবে। তোরা পুরুষ মানুষরা মেয়েদের পেয়েছিস টা কি? তোদের সংসার ও করবে মেয়েগুলা। বাচ্চা জন্মদিবে, বাচ্চা পালবে আর তোমরা মরদগিরি দেখায় জন সম্মুখে বউদের গায়ে হাত তুলবা এসব অসভ্যতামি শিখিয়েছে আম্মা,আব্বা।
ইশতিয়াক গলার স্বর নরম করে বললো,
– আপা এবার একটু থামো। ভাইয়া ভুল করেছে আমরাও জানি। কিন্তু সিচুয়েশন টা বুঝো। তুমি বা আমি কেউই ভাইয়ার জায়গায় নেই। একটু যদি ঘটনার হেরফের হতো একসাথে ইশান,ভাবী আর আমার নতুন বাচ্চাটাকেও হারাতাম। ভাইয়ার কি করার ছিলো।

– তাই বলে মা/রবে?
– আচ্ছা ভাইয়া আসলে এর বিহিত কইরো। আসতে দাও।
আইরিন কিছুটা নরম হয়ে বললো,
– তুশিরে, যা না মোনাটাকে একটু কিছু খাওয়াতে পারিস কিনা দেখ। সকালে একবার গা মুছে দিছি। সারা রাত জ্বরে ছটফট করছে।
তুশি বাটিতে কাস্টার্ড নিয়ে উপরে চলে গেলো। আইরিন ড্রইং রুমে এসে সোফায় বসে ইশানকে বললো,
– আব্বু দেখি ফুফির কাছে আয়? পায়ে ব্যাথা কমছে।
ইশান ফুফির কোল ঘেষে বসলো। ছেলেটার চোখ মুখ ফুলে গেছে। ইশানকে খাইয়ে দিতে দিতে বললো,
– তোর বাবা কি আজ আসবে?
ইশান উত্তর মাথা নেড়ে বললো,
– আসবে বলেছে তো।
– ঠিক আছে,আসুক আজকে। এরপর হবে।

বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছে খাবার টেবিলে। দশটা বেজে চললো, ইমরানের আসার নাম নেই। আইরিন জেদ ধরে বসে আছে আজ কাউকে খেতে দিবেনা ইমরান না আসলে। ইশান বাবাকে মেসেজে বলেছে ফুফি আসতে বলেছে। ফোন কেটে দিচ্ছে সবার। মেসেজের রিপ্লাই নেই। এক পর্যায়ে আইরিন শুধু মোনার খাবারটা বেড়ে ওকে খেতে দিলো। মোনা খাচ্ছেনা। মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে বিশ্বাস। মানুষটা আসবে। ঠিক ঠিক দশটা দশে বেঞ্জ ঢুকলো গেট দিয়ে। বাড়ির সদর দরজা দিয়ে হেঁটে শার্টের হাতা ফোল্ড করে, সোজা বেসিনে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলো। বাকিরা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে। যেন ইন্সট্রাকটেড কাজ করছে। এসেই খেতে বসে যাওয়া উচিত হবে এমন। তবে এমন কাজ কখনোই ইমরান করেনা। আগে ফ্রেশ হয়ে এরপর নামবে। ওকে দেখে সবাই দাঁড়ালে হাতের ইশারায় বসতে বলে নিজেও বসলো। বোনকে সালাম দিয়ে নিজের প্লেটে খাবার বেড়ে মুখে খাবার তুললো। বাকিদের মনে হলো, যাক এবার দুটো মুখে রচবে। ইশানকে প্রশ্ন করলো,

– ইশান ব্যাথা আছে?
ইশান মাথা নেড়ে বললো,
– হাঁটতে গেলে টান লাগে, আর হাত নাড়াতে পারিনা।
সোহানকে প্রশ্ন করলো,
– ওর কি হাত ভেঙেছে?
– না মামা। তবে লিগামেন্ট ছিঁড়েছে। থেরাপি নিতে যেতে হবে।
– ঠিক আছে।
আইরিন খাবার থামিয়ে ইমরানকে প্রশ্ন করলো,
– ভালো। নিজের সন্তানের খোঁজ নিলি রক্তের টান বলে, আরেকজনের মেয়ে যে তড়পাচ্ছে রাত থেকে তার দিকে তো ফিরেও দেখলিনা।
থমকে গেলো সকলের খাবার। প্লেটের উপর হাত ঝেড়ে ইমরান বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– নিজের সন্তান ভুল করেছে, ভুল স্বীকার করেছে। তাকে যা খুশি শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা আছে। আরেক জনের সন্তানকে দুটো থাপ্পড় দিয়েই মনে হলো এই অধিকার খাটানো উচিত হয়নি। তাই খবর নেয়ার ও প্রয়োজন বোধ করছিনা। কি দরকার এত খেয়াল রাখার। যার নিজেরই হুঁশ জ্ঞান নেই। যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তাকে বোঝানোর মত কিছু নেই।

– পেটে যে তোর বাচ্চা?
– আগে জিজ্ঞেস করো মা হওয়ার যোগ্যতা আছে কিনা? কোনো মা দুই সন্তানকে নিয়ে একসাথে
সু/ইসাইডাল কাজ করতে পারেনা। আমার কাছে কালকের ঘটনাটা পুরাটাই সু/ইসাইডাল। তার এত টুকু সেন্সে ধরলোনা যে, আমি একসাথে দুইটা বাচ্চাকে নিয়ে কেনো ঝুঁকি নিচ্ছি?
– তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস মোনার উচিত ছিলো ইশানকে মে/রে আটকানো। ইশান তো স্বীকার করেছে ও জোর করেছে।
– তার মানে তুমিও মেনে নিচ্ছো মোনা ইশানের সৎমা। ও ইশানকে মা রতে পারবেনা? প্রয়োজন হলে মে*রে আটকাবে। ইশান আমার জন্য কি এটা সবাই জানে।তাকে শাসন করার অধিকার এই বাড়ির দুটো মানুষকে দিয়েছি। যাদের দিয়েছি তারা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এটা মাথায় রাখা উচিত ছিলো। তোমাকে আর তার মাকে। সেখানে তার মা যদি নিজের দায়িত্ব পালন করতে গড়িমসি করে তার দায়ভার কে নিবে? প্রশ্ন কি যোগ্যতা নিয়ে উঠে না?

– যোগ্যতা নেই মোনার মা হওয়ার?
– আছে নাকি? প্রশ্ন করে দেখো? কোন মা পারে সন্তানদের নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দিতে? আমার কথা মাথায় ছিলোনা? এদের হা/রালে যে আমি পাগল হয়ে যাবো এটা এদের কারো সেন্সে আসেনি কেনো? এত ভালোবাসি, এত যত্নে রাখি সেগুলো কি ব্যর্থ চেষ্টা আমার!
– তার মানে সব দোষ মোনার?
ইমরান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
– সব দোষ ইশানের। ওকে মা বার বার নিষেধ করার পরও মায়ের কথা শুনেনি। নিজেও বিপদে পড়েছে, মাকে আর বোনকেও বিপদে ফেলেছে। এখন ভোগ করুক যন্ত্রনা। চোখের সামনে দেখুক মা আর বোনের কষ্ট। ওর ভুলের শাস্তি বাকিরা পেলে কেমন লাগে বুঝুক। আমি কি সবাইকে বার বার মে রে ধমকে বুঝাবো নাকি!
– পেটের বাচ্চাটা তো কষ্ট পাবে। ওটার ক্ষতি হলে তার দায়ভার কে নিবে?
ঠান্ডা, শান্ত গলায় ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,

– কারো গাফেলতির জন্য যদি আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয় তাকে মাটি চাপা দিয়ে নিজে ম*রবো আমি।
কথাটা আস্তে ধীর আওয়াজে শোনালেও মনে হলো সকলের শ্বাস আটকে গিয়েছে। চুপচাপ নিজের খাওয়া খেয়ে উঠে দাঁড়ায় ইমরান। ইশান বাবার দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে বললো,
– পাপা আমি আর এমন করবো না। মায়ের অবাধ্য হবোনা। প্লিজ মাকে কষ্ট দিও না।
– এত চিন্তা থাকলে মায়ের কথা শুনতে।
হনহন করে হেটে ইমরান নিজের কামরায় চলে গেলো। আইরিন দম মেরে বসে আছে। দাঁত খিচে বললো,
– আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে দেখি এ কি আমাদের ভাই! এখন ও সবাইকে কষ্ট দিবে।
ইশান মোনার হাত ধরে বললো,
– মা স্যরি। আমার জন্য পাপা…
মোনা হেসে বলে,
– তোমার পাপার রাগ পড়ে যাবে। আমি দেখছি। আপা এত চিন্তা করো না। ঠিক হয়ে যাবে।
আইরিন মোনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

– সব আগের মত স্বাভাবিক করে নে বোন। এই অশান্তি আর ভালো লাগেনা।
মোনা খানিকটা হেসে মাথা ঝাঁকালো। সবাইকে বুঝ দিলেও নিশ্চিত জানে এই রাগ পড়বেনা সহজে। খেয়ে রুমে এসে দেখলো আজ অনেকদিন পর ইমরান সিগারেটে হাত দিয়েছে। দোষটা মোনারই। যেখানে বুদ্ধি নিয়ে কাজ করার কথা সেখানে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে। যা যা ঔষধ খাওয়ার সব খেয়ে বারান্দায় ইমরানের পাশে দাঁড়ালো। চারদিক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে। মোনাকে দেখে হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে রুমে ফিরে এলো। কাজটা যে মোনার ইচ্ছাকৃত বুঝতে পারছে। ইশানের সামনেই ইমরান ধূমপান করেনা, সেখানে মোনার এই অবস্থায় পরিবেশ সুস্থ রাখার জন্য হাতের দ্রব্য ফেলে দিবে মোনা জানে।

– কথা বলবেন না?
বিছানায় শুয়ে পড়েছে ইমরান। মোনার কথা শুনে বললো,
– কি কথা বলবো?
– কেমন আছি একবারো তো জিজ্ঞেস করলেন না?
– দেখছি ভালোই। আর প্রশ্নের কি দরকার?
– মাথায় ব্যান্ডেজ আর শরীরে জ্বর নিয়ে আমি ভালো আছি?
– খারাপ থাকলে বিশ্রাম নেয়া উচিত কথা কম বলে।
মোনা ইমরানের পাশ ঘেঁষে শুয়ে দু হাতে ইমরানকে ধরে বললো,
– আর এমন বাচ্চামো করবোনা ইমরান সাহেব?
– কে ধরে রেখেছে?
– স্যরি।
ইমরান বিছানা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পা ফেললো। মোনা প্রশ্ন করলো,
– কোথায় যাচ্ছেন?
– এখানে দম আটকে আসছে। ইশানের কাছে যাচ্ছি।
– আরেকজন যে একা থাকবে।
– একা নেই, তার মা আছে। সে দুনিয়াতে আসলে তাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাবো।
– আমার রাগ ওর উপর ঝাড়ছেন কেনো?
– ও কেনো এখনো ওর মায়ের মনে নিজের জন্য ভালোবাসা তৈরি করতে পারলোনা, মা কেনো ভাবলোনা তার কথা। তাই এটা তার শাস্তি।

– ঠিক আছে যান। ঘরের সবাইকে শাস্তি দিয়ে আপনি শান্তিতে থাকুন।
বেরিয়ে গেলো ইমরান। মোনা হেড বোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে। দু চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। জীবনের শিক্ষা হয়েছে। মিনিট দশেক পর দরজার নব ঘোরাতেই ভাবলো মানুষটা ফিরে এসেছে। তাকিয়ে দেখে ইশান একটা বড় সাইড বালিশ এবং মতিয়াকে দিয়ে তোষক নিয়ে রুমে ঢুকলো। মাকে বলে,
– মা তোমার রুমে শুই। নিচে শোব।
মোনা থতমত খেয়ে বলে,
– হ্যাঁ অবশ্যই। কিন্তু তোমার পাপাকে ফেলে ঘুমাবে?
– কোথায় পাপা?
– তোমার রুমে?
– কই নাতো। আমার রুমে যায় নি।
– আমাকে যে বললো।
ইশান হেসে বলে,

– তোমার মনে হলো, পাপা এখান থেকে আমার কাছে যাবে? তোমাকেও শাস্তি দিবে,আমাকেও দিবে। তাই তো আমি আজ থেকে প্ল্যান করেছি যতদিন না পাপা থাকবে তুমি অনুমতি দিলে নিচে থাকবো তোমার পাশে। ফুফিও আসতেছে। তোমাকে আমরা একা থাকতে দিব না। পাপার আশা করোনা, আসবেনা।
আইরিন কাকে যেনো বকতে বকতে রুমে ঢুকে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫০

– তোরা বকবক করছিস কেনো। মোনা শুয়ে পড়। আজ থেকে আমি আর ইশান থাকবো তোর সাথে।
– কেনো আপা? আমি ভয় পাচ্ছি না তো। এভাবে নিজেদের রুম ছেড়ে থাকা কষ্ট হবে তোমাদের জন্য।
– ইমন আমাকে একটু আগে বলছে আমার এত দরদ হলে আমি যেন তোর সাথে থাকি।
মোনার আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না। মনে মনে বললো,
– আমার সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করবেন বলে সবাইকে কথার জালে ফেলে আমার রুমে পাঠিয়েছেন ইমরান সাহেব? ঠিক আছে আপনি যা ভালো বুঝেন তাই হবে।

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫২