Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৪০

সে খলনায়ক পর্ব ৪০

সে খলনায়ক পর্ব ৪০
ফারহানা সানিয়াত

হেমন্তের মাঝ সময়কাল। বাতাসের গতিপথ বদলে উত্তর থেকে শীতল বাতাস বয়ে বেড়ায় এতে মাঝে মাঝে শরীরে মৃদু কম্পন অনুভব করা যায়। রৌদ্রের উত্তপ্ত তাপটা ও কমে এসেছে, প্রানপ্রিয়া জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাতাস গায়ে লাগাচ্ছে, উপভোগ করছে। দোতালায় তার ঘরটা বলে জঙ্গলের গাছ-গাছালির সবুজ পাতা হেলে দুলে নড়ার প্রশংসা করতে ভুলছে না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে। সময়ের সাথে সেই অন্ধকার রাতের ঘঠনা কল্পনা নাকি বাস্তব ছিল নিজের এলোমেলো ভাবনার মাঝে এখনো রয়ে গেছে। ছোট সাহেবের সাথে ও তার অপ্রত্যাশিত ভাবে আর দেখা হয়নি।

প্রানপ্রিয়া জানার কাছ থেকে সরে জানালা বন্ধ করে এবং স্কুলের ক্রিয়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণের আয়োজনে যাওয়ার জন্য তৈরি হওয়া শুরু করে।
আজ স্কুলের পাশে বড় মাঠে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে আশেপাশে যত স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা আছে সবাই উপস্থিত থাকবে তার মধ্যে সেও একজন। শিক্ষক হিসেবে হেডমাস্টার তাকে সেখানকার ডিসিপ্লিন ইনচার্জের দায়িত্ব দিয়েছেন তাই ভালোভাবে পরিপাটি হয়েও যেতে হবে। অনুষ্ঠানের আয়োজনে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা থাকবেন। এর জন্য হেডমাস্টার তাকে বয়সের তুলনা একটু বড়দের মত সাজগোজ আর পোশাকে দিক দিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে বলেছেন।তাই প্রানপ্রিয়া গারো নীল আর হলুদের মধ্যে শাড়ি পড়েছে। সে ভ্রূকুটি করে আয়নার দিকে তাকিয়ে চুল চুরুনি করতে করতে বিড়বিড় করে,,

__ আমাকে কি দেখতে এতটাই ছোট মনে হয়।
প্রানপ্রিয়া চুল চিরুনি শেষ করে সব সময়ের মত দু হাত দিয়ে চুল খোঁপার বাঁধার জন্য পেঁচাতে শুরু করে।
__ তোমাকে খোলা চুলে মানায়।
আকম্মিক মনে মস্তিষ্কে পরিচিত পুরুষের বলা কথা ভাবনায় চলে আসতেই প্রানপ্রিয়ার হাত থেকে ঝরঝর করে তার চুল গুলো খুলে পিঠে স্তুপ হয়।সে থমকে যায়। নিজের ভাবনায় অবিশ্বাস্যের মত আয়নায় দিকে চেয়ে থাকে।
যার প্রতি তার তীব্র ঘৃনা, যার জন্য সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে, অপমান কাঁধানোর সাথে আপত্তিকর স্পর্শ করে। সে তার ভাবনায় আসে!!
প্রানপ্রিয়ার মুহূর্তে শরীর টা ছেড়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের কোণায় আঁকড়ে ধরে ফেলে সে।
কিভাবে তার ভাবনায় ওই লোকের কথা আসতে পারে?

আহ!
কিভাবে?
ঘৃনা করি তাকে, তার প্রতি লোক দেখানো সম্মান ও এখন থেকে আসবে না সেখানে তার ভাবনায় তার করা প্রশংসা মনে পড়ে এটা অপমানিত হওয়ার থেকে কি জঘন্য নয় ছি,
আশ্রমের একজন কিশোরীর সাথে সেলিনা ঘরে প্রবেশ করেন। প্রানপ্রিয়া তার ভাবনায় আয়নাতে তাদের দেখে কোনো মত চোখ এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
কিশোরী মেয়েটি তাকে দেখে বিস্ময়ের সাথে বলে ওঠে,,
__ অনেক সুন্দর, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে প্রিয়া আপু। (তার চঞ্চল কন্ঠ)
প্রানপ্রিয়া ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে চুল আবারো চিরুনি করে খোলাই রেখে অস্থির হয়ে বিছানার কাছে গিয়ে বসে জুতো পড়া শুরু করে।
সেলিনা তাকে দেখে মৃদু হেসে বলেন,, আজ তো অনুষ্ঠানে তোমাকেই সবাই দেখবে। একটা শিক্ষক প্রেমিক জুটে গেলে কি ভালো হবে না?
প্রানপ্রিয়া চোখ বড় বড় করে সেলিনার দিকে তাকায় , সেলিনা হাসছেন পাশে কিশোরী মেয়েটাও মুখে হাত দিয়ে মিটি মিটি করে হাসছে।

__ কি? এভাবে তাকাচ্ছো কেনো? বিয়ে সাদি কি করবে না, মনে মানুষ না পেলে বিয়ে করবে কিভাবে?
প্রানপ্রিয়ার গাল লাল হয়ে ওঠে ভেতরে অবিশ্বাস্য লজ্জা মিশ্রিত হয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে তার তাই সেলিনার কথা উপেক্ষা করে দ্রুত জুতো পড়ে বসা থেকে উঠে সাইড ব্যাগ টা কাঁধে ঝুলিয়ে আমতা আমতা করে বিদায় জানায় অতঃপর দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
সেলিনা তাঁর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসি মিশ্রিত উচ্চকণ্ঠে সাবধানে যাওয়ার কথা বলে দু দিকে মাথা নাড়ান।

গার্ডেনে সবুজ ঘাসের উপর সাজানো বেতের সোফায় হাবিব আর হুমায়ুন বাদে বাড়ির সবাই বসা।
বড় বড় গাছের নিচে ছায়াময় শীতল পরিবেশ।
আহানাফ পুরো একটা সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে মুখের ওপর ফোন ধরে আছে। পাশের সোফায় রাইমা , বরাবর দামিয়ান আর সারা। সারা পরীক্ষা শেষ হতেই চলে এসেছে তবে এটা কি খুব ই অদ্ভুত না বিয়ের আগে হবু শ্বশুরবাড়িতে আসা-যাওয়া থাকা।
যাইহোক,
আহানাফ মোবাইলের দিকে চোখ রেখে পা নাড়াতে নাড়াতে বলে,

__ বড় বাবা দুমাসের জন্য চায়নাতে গেল কিন্তু সময়ের আগেই ফিরে আসছে। শরীর সুস্থ থাকার আগে কি ব্যবসা-বাণিজ্য নাকি।
পাশ থেকে রাইমা হা করে শ্বাস ফেলে তার এ ব্যাপারে কিছু বলার নেই ভাইজান ভালো যা বুঝে তাই করেন।
আহানাফ মুখ থেকে মোবাইল টা সরায়,
__ বাবা ও দেশে নেই কি যে ব্যবসা-বাণিজ্য এসব ভাল্লাগেনা। আমি কখনো এসব ফালতু ব্যবসার মধ্যে নেই বাপ চাচার বহুৎ সম্পদ রেখে যাচ্ছে আমি তো বসে বসে খাব।
সারা হেসে তার দিকে কুসন ছুড়ে মারে,,

__ চুপ থাকো, কি বলছো এসব, যোগ্যতা প্রমাণ করা জীবনের একটা লক্ষ্য। আর জীবনে যদি কোন লক্ষ্য না থাকে দুনিয়াতে থাকা না থাকা একই আর অন্যের সম্পদের ওপর ডিপেন্ড করে থাকা নিজেকে মূল্যহীন গড়ে তোলে। সব থেকেও না আছে জীবনে লক্ষ্য যোগ্যতা না আছে মূল্য তুমি কি এমন জীবন যাপন করতে চাও নাকি?
রাইমা ছেলে ধমক দিয়ে বলেন, বড় না হয়ে দিন দিন অবুঝ হচ্ছো তোমার বাবা ঠিক ই বলে। সারা তোমার থেকে ছোট হয়ে ও কত সুন্দর করে বুঝিয়ে বললো এমন জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে চললে সারার মত বুঝদার বউ কপালে জুটবে না।
রাইমা ছেলের দিক থেকে চোখ সরিয়ে খুশি মনে সারা আর দামিয়ানের দিকে তাকান,
উপরওয়ালা অবশ্যই জুরি নিখুঁতভাবে ভেবেচিন্তে ই ঠিক করে রাখেন।
দামিয়ানের তিনজনের কথোপকথনে কোনো মনোযোগ নেই তার সম্পূর্ণ মনোযোগ তার হাতের আইপেডে।
রাইমা জিজ্ঞেস করেন তাকে,, আজ তো স্কুলের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা কখন যাবে দামিয়ান?
দামিয়ান আইপেডের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
__ বিকেলে,
রাইমা মাথা নাড়ায়,
ও তাহলে সারাকে ও নিজের সাথে নিয়ে যেও বাসার আরেকজনের ও তো যাওয়ার কথা ছিল‌।
দামিয়ান বিপরীতে নিশ্চুপ সে নিজের কাজে ব্যস্ত।

প্রাইমারি স্কুলের পাশে বিশাল বড় মাঠে প্যান্ডেল টাঙিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ১১ টা থেকে পূর্বাচলের আশেপাশের মোট পাঁচটা স্কুলের সব শিক্ষকরা এখানে উপস্থিত। ছাত্র-ছাত্রীরা এসেছে দুপুরের দিকে এখন বেলা দুপুর গড়িয়ে বিকেলের ভাব,,সময় কয়টা জানা নেই দেখার ও যেন কারো কাছে সময় নেই। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের আর অনুষ্ঠানের আয়োজন সামলাচ্ছে। প্রানপ্রিয়া ও তাদের মধ্যে গারো নীলের সাথে হলুদ রঙের শাড়ি, গলায় আইডি কার্ডের মত কার্ড নীল রঙের ফিতায় ঝুলচ্ছে সেখানে শিক্ষকদের নাম আর কিসের দায়িত্বে আছেন লিখা। প্রানপ্রিয়া তাদের স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের সারিবদ্ধ করে চেয়ারে বসিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হেডমাস্টার স্টেজে কিছু শিক্ষকদের সাথে কথা বলছেন প্রানপ্রিয়া সেদিকে দেখে আজ হেডমাস্টার প্রশংসা করেছেন তার পরিপাটি বড়দের মত সাজগোজ দেখে প্রানপ্রিয়া অবিশ্বাস্যভাবে হেসেছিল।
ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কার বিতরণের পূর্বে নাচ গানের আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠানে । তবে সকলে অপেক্ষায় আছে ইনভাইট করা চিফ গেস্টদের জন্য। বিকেল সময়, কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে তাই কয়েক জন শিক্ষক হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রানপ্রিয়া নিজ জায়গা থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে প্যান্ডেলের গেটের দিকে তাকিয়ে। তাকে ও ফুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন কিছু শিক্ষকরা। সে ইতস্ত মুখে অজুহাত দিয়ে না বলে দিয়েছে। ক্ষমতাবান অপরিচিত মানুষদের সামনে না যাওয়া ই ভালো।

প্রানপ্রিয়া ভাবনাটা মনে এক ঘৃণা ভরা জায়গা থেকে এসেছিল যেখানে এক বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের দাগ লেগে আছে তবে হ্যাঁ সব মানুষকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক না তবুও সে চায় না।
কালো রঙের কয়েকটা গাড়ি এসে থামে প্যান্ডেলের বাহিরে। ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকরা ঠিকঠাকভাবে নিজ জায়গায় দাঁড়ায়। গাড়ি থেকে দামিয়ান আর সারা নামতেই হেডমাস্টার গিয়ে হ্যান্ডশেক করেন এবং তাদের স্বাগত জানান। ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকরা মুখে স্বচ্ছ হাসি নিয়ে ফুল এগিয়ে দিতেই নিলয় তা হাতে নিয়ে তাদের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে।
প্যান্ডেলের ভেতর দুদিকের সারিবদ্ধভাবে চেয়ার রাখা মাঝ দিয়ে স্টেজে যাওয়ার রাস্তা এক এক করে ইনভাইট করা বাকি গেস্টরা ও চলে এসেছে।

প্রানপ্রিয়া নিজ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তার ভাবমূর্তি বোঝা মুশকিল বুঝতে পারছে না এখানে লোকটি কে‌ দেখে তার ভাবভঙ্গি কেমন হাওয়া উচিত তার কাছে মনে হচ্ছে হঠাৎ এক বালতি ঠান্ডা পানি শরীরে কেউ ঢেলে দিল। সে জানতো হুমায়ূন আবরারের বদলে হাবিব আবরার আসবে কিন্তু এই লোক!!
সকল গেস্ট স্টেজে ওঠে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে তাদের এক এক জনের ভাষণ দেওয়া শুরু হবে। কিন্তু এর মধ্যে উপস্থিত সবার নজর কারছে দামিয়ান আর সারা, বিত্তবান পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দেখার শখ কার না থাকে।
প্রানপ্রিয়া দামিয়ানের দৃষ্টি থেকে আড়াল হওয়ার জন্য কিছুটা দূরে গিয়ে মানুষের ভিড়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়াতেই তার স্কুলের দুজন শিক্ষিকা তাকে দেখে বলে ওঠে,

__ এখানে দাঁড়ালে কেনো? সামনের গেস্টদের বসার চেয়ারগুলো ঠিকঠাক রাখতে হবে না হলে তো বাচ্চারা নষ্ট করে ফেলবে।
প্রানপ্রিয়ার মুখে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি কিছুটা আমতা আমতা করে মাথা নত করে ফেলে।
__ তুমি সামনে গিয়ে দাঁড়াও এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। হেডমাস্টার দেখলে পড়ে বকবে।
দুজন শিক্ষিকা চলে যায়। প্রানপ্রিয়া হতাশার ফেলে।
ধূসর রঙের কোট প্যান্ট পড়া সুদর্শন দামিয়ান ফরমাল গেটাপে সবার আকর্ষণ কেড়ে নিয়েছে সাথে
হালকা রঙের শাড়ি পড়া সারা, দুজনের নিখুঁত দম্পতি হওয়ার প্রশংসা প্রানপ্রিয়ার কানে ফিসফিস শব্দে যাচ্ছে পাশে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভাষণ শুনতে শুনতে মুখে তাদের একই কথা। প্রানপ্রিয়া তাচ্ছিল্য দৃষ্টিতে দামিয়ানকে এক নজর দেখে কিছু একটা বিড়বিড় করে মুখ কালো করে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে।

ঘন্টাখানেক সময় ভাষন, নাচ, গান , মঞ্চ নাটকে পাড় হয়। দামিয়ান আসা পর থেকে তার ভাবভঙ্গি খুবই স্বাভাবিক বিনয়ের সাথে সকলের সাথে কথাবার্তা পরিচিত হচ্ছে তার এমন একটা ভাব যেন সারা আর নিলয় বাদে কারো সাথে পরিচিত নয় বা প্রাণপ্রিয়া নামে মেয়ে তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যাকে সে খুব ভালোভাবে চেনে তার সাথেও। পাশে বসা সারা অনেক বার এটা কৌতুহল হয়ে লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক সে ধরতে পারছে না। স্টেজে ভাষণ শেষ হওয়ার পর যখন তারা নেমে তাদের বসার জন্য ব্যবস্থা করে রাখার চেয়ার গুলোর সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়ায় তখনি প্রানপ্রিয়াকে চোখে পড়ে তার অস্বস্তি হাঁসফাঁসের সাথে কিছুটা জোড়োসোড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে মেয়েটা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল সারার চোখে সবই পড়ছিল। এবং সে প্রাণপ্রিয়া সাথে কথা বলেছিল তবে দামিয়ান তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে ও অন্যদিকে ব্যস্ত ছিল আজ তার চোখ মেয়েটিকে দেখছিল না।
আচ্ছা এমনটা কি স্বাভাবিক? নিজে নিজেকে প্রশ্ন করে সারা অতঃপর ফের মনে মনে বলে ওঠে,,
এসব অপ্রয়োজনীয় ভাবনা তারমধ্যে আসে কিভাবে এমনটা তো হওয়ারই ছিল একদিন খানিক সময়ের আকর্ষণ।
সারার ঠোঁট প্রসারিত করে আজ আছে তো কাল নেই বা কোনদিনই নেই ব্যবস্থা করতে কতক্ষণ।

স্টেজে বাচ্চাদের এক এক করে সবার পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। প্যান্ডেলের ভিতরে তীব্র আলোয় চারপাশ আলোকিত হলেও বাহিরে অন্ধকার নেমে গেছে অনেকক্ষণ আগে। বাচ্চাদের পরিবারের লোকরা এসে শিক্ষকদের সাথে দেখা করে তাদের নিয়ে যাচ্ছে। প্রাণপ্রিয়া আর বাকি শিক্ষকরা অনুষ্ঠানের সমাপ্তি কিছুক্ষণের মধ্যে হবে বলে তারাও বাচ্চাদের দ্রুতই বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।
দামিয়ান সারার কাছে গিয়ে নিলয়কে তাকে বাড়িতে দিয়ে আসার আদেশ দেয় সারা কারণ জানতে চাইলে দামিয়ান ব্যস্ত কন্ঠে হেডমাস্টারের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে বলে চলে যায়।

দায়িত্ব পালন করা শেষ হলে এবার বাড়ি ফেরার পালা। প্রানপ্রিয়া গলার আইডি কার্ড টা একজন শিক্ষকের কাছে জমা দিয়ে তার প্রয়োজনীয় ব্যাগ পত্র নেওয়ার জন্য মাঠের পাশে স্কুলের দিকে হাঁটা ধরে। বাকি শিক্ষকরাও ব্যস্ত পায়ে মাঠ পাড় হয়ে স্কুলের দিকে যাচ্ছে কেউ কেউ আবার মাঠ থেকেই চলে যাচ্ছে বাসার উদ্দেশ্য। প্রানপ্রিয়ার পায়ের গতি ধীর, কান্ত শরীর তারমধ্যে হালকা উঁচু জুতো পড়ার কারনে পায়ে ঠোসা পড়ে গেছে। সে শাড়ি হালকা উঁচু করে হাঁটার মাঝে নিজের পায়ের দিকে তাকায়। অন্ধকার টিমটিমে আলোয় কিছু বোঝা যাচ্ছে না সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হালকা ঠান্ডা বাতাস তার গা ছুয়ে দিচ্ছে থেমে পায়ের জুতো দুটো খুলে হাতে নেয় এরপর আবার হাঁটা শুরু করে।

__ আহ আমি ক্লান্ত! সে হেলেতে দুলেতে বলে উঠলো। কেমন করে দিন কেটে গেল আজ একটু বেশি ই ব্যস্ততার মধ্যে।
স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখে প্রানপ্রিয়া ভেতরে কয়েকটা ক্লাসে আলো জ্বলছে তার মধ্যে একটা টিচার্স রুমে যেখানে তার ব্যাগ সে হাতের জুতোটা পায়ে পড়ে এগিয়ে যায়।
টেবিলের ওপর ধোয়া উঠা চায়ের কাপ রাখা। দামিয়ান হাতের ফোনের দিকে চেয়ে বসে আছে। হেডমাস্টার তাদের সাথে বসা আরো কয়েকজন স্কুলের স্পন্সার দের সাথে কথা বলতে বলতে বাহিরে গেছেন।
প্রানপ্রিয়ার সাথে হেডমাস্টারের সাথে দেখা হয়েছে তবে তিনি কথায় এতোটাই ব্যস্ত ছিলেন যে তাকে খেয়াল করেনি। প্রানপ্রিয়া জুতোর ঠক ঠক শব্দে টিচার্স রুমে প্রবেশ করে দামিয়ান চোখ তুলে তাকায়। মুহূর্তে দুজনের চোখাচোখি। সঙ্গে সঙ্গে বরফের মত জমে যায় প্রানপ্রিয়া অনুষ্ঠানের সারাটা সময় অপরিচিত ভাব ছিল দুজনের মধ্যে এতে প্রাণপ্রিয়া স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিল কিন্তু এখানে!
দামিয়ান কপালে হালকা ভাঁজ ফেলে ফের মনোযোগ দেয় হাতের ফোনে দিকে ভাবটা এমন সে বিরক্ত হলো,
প্রানপ্রিয়ার চারপাশ আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে একটা ভয় ভেতরে খোঁচাচ্ছে যদিও কল্পনা নাকি বাস্তব এখনো এলোমেলো সে শুকনো ঢোক গিলে নিজের মতো ব্যাগ নেওয়ার জন্য ভেতরে ঢুকে। দামিয়ান স্বাভাবিক ভাবে ফোনের দিকে চেয়ে পায়ের ওপর পা তুলে পা নাড়াতে থাকে । প্রাণপ্রিয়া দ্রুত এগিয়ে তার ব্যাগ হাতে নিতেই দামিয়ান বলে ওঠে,,

__ কতটা ম্যানার্স লেস মেয়ে তুমি,
তার কন্ঠে প্রাণপ্রিয়ার হাতটা কেঁপে উঠে,
__ তুমি জানো আমি তোমার প্রতি কতটা বিরক্ত,
দামিয়ান কথাটা বলতে বলতে ভীত প্রাণপ্রিয়া দিকে দৃষ্টি ফেলে,
প্রানপ্রিয়া শক্ত করে তার ব্যাগ ধরে দৃষ্টি নত করে।
দামিয়ান শব্দ করে বসা থেকে উঠে কয়েক কদম এগিয়ে টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়ায়।
প্রানপ্রিয়া মনে মনে সাহস যোগায় সামনে দাঁড়ানো লোকটি কালো ছায়া যেটা তার জীবনে আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে কিন্তু
__ ঠিক আছে আমি চলে যাচ্ছি বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। শক্ত মুখে প্রাণপ্রিয়া বলে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলে।
দামিয়ান শান্ত কন্ঠে বলে ওঠে,

__আর এক পা বাড়ালে সেদিন রাতে যা হয়নি আজ ঠিকই হবে।
কথাটা শোনা মাত্রই প্রানপ্রিয়ার ভেতরটা জ্বলে শরীর ঝংকার দিয়ে ওঠে চোখে মুখে ক্রোধ নিয়ে তার দিকে তাকায়,,
__ আপনাদের আশ্রমে থাকি বলে যা খুশি তা বলতে আর করতে পারেন না।
দামিয়ান হাসে, ভাব ভঙ্গিতে কোনো গম্ভীর্যতা নেই।
__ আমি সব পারি। তোমার ক্ষেত্রে আমি সব পারবো। তার ধীর গলার স্বর।
প্রানপ্রিয়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করে,,
__ আমি অবশ্যই এমন কেউ না, কেনো আপনি আমার মত মেয়ের সাথে এমন‌ করেন।
__ তোমার মত মেয়ে বলেই তো করি।
তার ঠোঁটের কোণে হাসি উপহাস করে অপমানিত করল।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে এতটা শক্ত করে ধরে যেন এখনই ঠোঁট কেটে রক্তাক্ত করবে।
দামিয়ান কিঞ্চিৎ হাসে, তোমার প্রতি কেন বিরক্ত তুমি জানতে চাও না?

__ নাহ,
দামিয়ানের চোখ সরু হয়ে ওঠে, তার মুখের ওপর না!
__ তোমার ভয় লাগে না আমাকে, তার ঠোঁট থেকে হাসি গায়েব হতে থাকে।
প্রাণপ্রিয়া ভিতরে চুপসে গেলেও মুখে স্পষ্ট ক্রোধ।
দামিয়ান সোজা হয়ে ধীরে ধীরে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে,,
__ এটা সত্যি আজকাল তোমার সব প্রতিক্রিয়া আমার ভালো লাগে। এই যে এখন সাহস দেখাচ্ছ আমি পছন্দ করি না তবুও তোমার প্রতি আমি ইমপ্রেস।
তার পা থেমে যায় প্রাণপ্রিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি দেখে সে আজকের অনুষ্ঠানে কারো নজরে না পড়লেও প্রাণপ্রিয়াকে দেখার সুযোগ তার হাতছাড়া হয়নি ।
তোমার খোলা চুল তোমার শরীরের সুবাস এবং তুমি পুরোটাই আমার পছন্দ আমি ধৈর্য হারা হয়ে যাচ্ছি প্রাণপ্রিয়া আমার যে তোমাকে চাই ।
তার ফিসফিস ধীর কন্ঠ দৃষ্টি স্থির প্রাণপ্রিয়া চোখের দিকে।

__ পপাগল নাকি? কম্পিত উচ্চস্বরে প্রাণপ্রিয়া বলে ওঠল। লোকটির পাগলের প্রলাপ শরীরে শিরশির ধরে গেছে, আমি আগে থেকে জানতাম আপনার মাথায় যে সমস্যা আছে এর জন্যই মুখ দিয়ে যা আসে তাই বলে ফেলেন লজ্জা করে না বাগদত্তা থাকতে আরেকটা মেয়েকে এসব বলতে।
দামিয়ান নির্লজ্জের মত মাথা দুলিয়ে হাসে, তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না তবুও সে নিজের মত আবার বলে,,
__ আমি আমার ধৈর্য হারার প্রতি বিরক্ত। সময় সুযোগকে আমার পায়ের কাছে নিয়ে আসে কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে আলাদা হচ্ছে সেই রাতের পর আমি কয়েকদিন ভেবেছি তোমাকে আমার চাই‌ অতি জলদি যেভাবেই হোক তোমাকে জানানো প্রয়োজন মনে হলো মাথায় রাখবে।
প্রানপ্রিয়া কয়েক কদম পিছের দিকে চলে যায়। অবিশ্বাসের মতো হাসি উজ্জ্বল মুখে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা দামিয়ানকে দেখে।
লোকটি এমন কথা এত সহজে তার সামনে তাকে কিভাবে বলছে! সে চাইবে আর পেয়ে যাবে তাকে কি মনে করে? কি ভাবে ?
দামিয়ান পকেটে হাত গুঁজে তার দিকে পা বাড়াতেই ভেতরটা কেঁপে উঠে প্রাণপ্রিয়ার সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে ওঠে,,
__ আপনার মত জঘন্য মানুষের প্রতি আমার ঘৃণা। আপনাদের আশ্রমে থাকি বলে যা বলবেন তাই হবে নাকি আমি আজও বলবো আপনি আমার মালিক নন আপনি আমাকে কিনে নেননি। আপনি বলবেন আর আমি আপনার হয়ে যাব? কে আপনি? আপনার মত মানুষের চিন্তা ভাবনার উপর ও আমার ঘৃণা ছি।
শেষের কথাটা প্রাণপ্রিয়া উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলে এক মুহূর্তের দাঁড়ায় না সোজা টিচার্স রুম থেকে বের হয়ে যায়।

চোখের পলকের সময়ের সাথে দিন কেটে যায় কিভাবে টের ই পাওয়া যায়না। অনুষ্ঠানের পর আজ কয়েক দিন কেটে গেছে প্রতিদিনের মত আজকের আশ্রমের মহল টা একই যে যার কাজে ব্যস্ত। তবে আজ প্রাণপ্রিয়া স্কুলে যায়নি আজ তার ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে যাবে, এর জন্য স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছে। ফরম ফিলাপ করতে হবে সময়ের ব্যাপার আছে একটা তার সাথে মিসেস সেলিনা ও যাবেন বলেছেন তাই দুজন রেডি হয়ে মিস্টার রহমানের কাছে বলে আশ্রমে গেইট দিয়ে বের হয়ে রাস্তায় হাঁটা শুরু করে।
সকালে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। সময় ও বেশি হয় নি এই ১০টা ছুই ছুই। দুজন হাঁটছে পায়ের তাল মিলিয়ে।
প্রানপ্রিয়া মিনমিন করে, তুমি না আসলেও পারতে আন্টি আমি একাই যেতে পারতাম রাস্তা ঘাট তো চেনা ই আছে আমার।

সেলিনা ধমকে উঠেন,,
বেশি কথা বলো তুমি, আজ পর্যন্ত রোড পার হওয়ার মতো রাস্তায় গিয়েছো ,,সব সময় তো গাড়ি দিয়ে চলাচল করো আজ মেইন রোড পার হয়ে গাড়িতে উঠতে হবে। কিশোরী কাল থেকে আমার দায়িত্ব বড় হচ্ছ এখন যুবতী হয়েছ তো কি আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে?
প্রানপ্রিয়া হা করে শ্বাস ফেলে, সময়ের সাথে তার এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় ও ঘনিয়ে এসেছে হোস্টেল খোঁজা চাকরি খুঁজে কত কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। প্রানপ্রিয়া আড়চোখে সেলিনার দিকে তাকায় কালো বোরকার সাথে সবুজ রঙের ওড়না মাথায় ঘোমটার মতো জড়িয়ে নিয়েছে। আশ্রমে এখনো জানানো হয়নি বুঝতে পারে না কিভাবে বলবে কিন্তু খুব জলদি তার এখান থেকে যেতে হবে। সে চোখ সরিয়ে নেয় অনুষ্ঠানে রাতে দামিয়ানের বলা পাগল প্রলাপ গুলো মনে করে যা ধীরে ধীরে তার মনে ভয়ের স্তুপ তৈরি করছে তবে আবার এতটা গুরুতর ভাবে ও নিচ্ছে না।

স্যার প্রাণপ্রিয়া ম্যাম স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। সে খুব শীঘ্রই আশ্রম থেকে চলে যাবে । দৃষ্টি নত করে নিলয় কথা গুলো বলল।
দামিয়ান ফ্যাক্টরির কাগজপত্র গুলোতে চোখ বুলিয়ে
সিগনেচার করছিল কিন্তু কথাটা শুনে হাতা থেমে গেল।
নিলয় সাবধান কণ্ঠ ফের বলে,, কোথায় যাচ্ছে তা এখনো জানা যায়নি তবে শীঘ্রই পূর্বাঞ্চল,,,,
বাকি কথাগুলো বলার আগে নিলয় খেয়াল করে ফ্যাক্টরির কাগজের ওপর কালো রঙের কালি দিয়ে ভরে গেছে গুরুত্বপূর্ণ সাদা কাগজের লেখাগুলো কালো রং দিয়ে নষ্ট। নিলয় ঢোক গিলে,দামিয়ান কলমের নিপ ভেঙ্গে ফেলেছে তবে তার চোখ মুখ শান্ত ঠোঁটের কোণে ফিচেল হাসি।

__ এর জন্য বুঝি কথা এত দার ছিল সে রাতে,
দামিয়ান শব্দ করে হেসে হাতের কলমটা ফ্লোরে ছুড়ে মারে।
মেইন রোডের রাস্তার কাছে দাঁড়িয়ে আছে প্রানপ্রিয়া আর সেলিনা তাদের সাথে আরও অনেক জন মানুষ যারা ব্যস্ত রাস্তায় একটু খালি পথ খুঁজে রাস্তা পার
হওয়ার অপেক্ষায় আছে। বড় বড় গাড়ির শো শো করে একের পর এক নিজ গতিতে যাচ্ছে। কতটা বিপদজনক রাস্তা একটা ফুটওভার ব্রিজ থাকলে কতটা সহজ হয়ে যেত।
সেলেনা প্রাণপ্রিয়াকে সাবধান কন্ঠে বলেন,, বাম দিক থেকে গাড়ি আসছে তাই বাম দিকে চোখ রাখবে এরপর ডান দিকে, আর হাত ধরে রাখবে ঠিক আছে।

সে খলনায়ক পর্ব ৩৯ (২)

প্রানপ্রিয়া ওপর নিজ মাথা নাড়ায়। অতঃপর রাস্তা কিছুটা খালি হলে যতজন মানুষ ছিল সবার সাথে তারা দ্রুতপায়ে প্রথম রোড পাড় হওয়া শুরু করে সাবধানে এরপর পরের রোড যখন পার হতে নিবে ,তখনি হঠাৎ প্রানপ্রিয়ার চোখের সামনে এমন কিছু একটা ঘটে যায় যেটা ছিল কল্পনার বাহিরে সে একটা চিৎকার দিয়ে আন্টি বলে সেখানেই স্তব্ধ।

সে খলনায়ক পর্ব ৪১