Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৪১

সে খলনায়ক পর্ব ৪১

সে খলনায়ক পর্ব ৪১
ফারহানা সানিয়াত

কিশোরী কালে থেকে যে মেয়েটিকে দায়িত্ব নিয়ে বড় করেছেন সে কি তার যুবতী বয়সে দায়িত্ব ভুলে যাবেন? ধমক কন্ঠে সেলিনা আসার পথে প্রাণপ্রিয়াকে বলেছিলেন । স্তব্ধ প্রাণপ্রিয়া ‌টলমলে চোখে রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা রক্তাক্ত সেলিনা কে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। তার দুনিয়া ঘুরছে ,চারপাশ অন্ধকার হয়ে আস্তে আস্তে সে পিচ ঢালা রাস্তায় ঢলে পড়ে। তার চোখ দুটো খোলা, চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
খানিকক্ষণ আগে,
পথচারীদের সাথে রাস্তা পাড় হওয়ার মাঝে আকম্মিক একটা গাড়ি এত দ্রুত গতিতে চলে আসতে থাকে যে বাকিরা পার হয়ে গেল ও প্রাণপ্রিয়া আর সেলিনা রাস্তায় রয়ে যায়। দ্রুত গতিতে আসা গাড়িটি সেলিনার চোখে পড়ে তিনি প্রাণপ্রিয়াকে এক ধাক্কায় দূরে ফেলে কিন্তু তিনি আর পাড় হতে পারে না। সবার চোখের সামনে অনেক টা দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে তার নিথর রক্তাক্ত শরীর।

আকম্মিক জোরে ধাক্কায় প্রাণপ্রিয়া কিছু না বুঝে উঠে নিজেকে রাস্তায় পড়া থেকে সামনে নিয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতি কলিজা টা ফেটে যাওয়ার মত। আশেপাশে মানুষের মুখে আহাজারি, চিৎকার, দৌড়ে সেলিনা দিকে যাচ্ছে। প্রানপ্রিয়া চারপাশ যেন শব্দহীন, শরীর নিস্তেজ হয়ে একদৃষ্টিতে শুধু মানুষের ভিড়ের মাঝে আড়াল হয়ে যাওয়া রক্তমাখা সেলিনার হাত টা দেখছে।
তবে প্রতিটা চোখের পলকে সব কিছু ঝাপসা হয়ে উঠে তার দিকেও মানুষ দৌড়ে এগিয়ে আসতে থাকে।
অতঃপর ,,, অতঃপর,,,
সময় কয়টা হবে জানা নেই। মেনইরোডের কাছাকাছি একটা হাসপাতালে ইমারজেন্সিতে ভর্তি করেছে সেলিনা কে আশ্রমে খবর অনেকক্ষণ আগেই পৌঁছে গিয়েছিল রহমান অসুস্থ শরীর নিয়ে চুপচাপ হাসপাতালের করিডোরে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তার নোংরা পোশাক উস্কো খুশখো পাকা চুল দেখেই ভেতরের হাল কেমন হবে বোঝা যাচ্ছে।
প্রানপ্রিয়া হাসপাতালের বেডে শুইয়ে আছে। অতিরিক্ত মস্তিষ্কে চাপ নিতে না পারার কারনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। তবে এখন চোখ দুটো টেনে খোলার চেষ্টা করে কিন্তু তীব্র আলো আর ফিনাইলের গন্ধে নাক, মুখ, চোখ সাথে সাথে কুঁচকে ফেলে।

তখনি একজন নার্স জিজ্ঞেস করে ওঠে,, এখন কেমন অনুভব করছেন আপু?
নার্সটির প্রশ্নে প্রানপ্রিয়া চট করে তার চোখ খুলে তীব্র আলোর সমস্যা হলেও মিটিমিটি চোখে আশপাশ দেখে। হল রুমের মতো, পাশে কয়েকটা বেডে রোগীরা শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ প্রাণপ্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে সে এখানে কেনো তবে যখন চোখের সামনে সেলিনা আন্টির এক্সিডেন্ট ভেসে ওঠে, ধপ করে শোয়া থেকে উঠে বসে সঙ্গে সঙ্গে তার হাত পায়ে কম্পন উঠে যায়। তার ভেতরটা ভারী হয়ে এখনই যেন ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম চোখ দুটোতে টলমলে পানি নিয়ে অস্থির হয়ে বেড থেকে নেমে বিড়বিড় করে পাগলের মতো বলা শুরু করে,,
__ আমার কোথায় আন্টি? আমার আন্টি কোথায়? আমার আন্টি কোথায় ?
নার্স টি প্রানপ্রিয়াকে উত্তেজিত হতে দেখে থামানোর চেষ্টা করে কিন্তু প্রানপ্রিয়াকে যেন থামানো দায় । সে রুম থেকে বের হয়ে শব্দ করে কান্না করতে করতে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সবার কাছে আন্টি কোথায়? আন্টি কোথায়? উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করতে থাকে।
নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা রহমান হঠাৎ প্রানপ্রিয়ার কান্না মাখা কন্ঠ শুনে সেও অস্থির হয়ে মাথা তুলে পাশে তাকায়,
এলোমেলো অবস্থায় প্রাণপ্রিয়া সবার কাছে সেলিনা খোঁজ করছে। রহমান ভেতর থেকে আরো ভেঙে যায় মেয়েটার অবস্থা দেখে তিনি অতি কষ্টে মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করে।

__ প্রিয়া মা!
এদিকে প্রাণপ্রিয়ার ও চোখে পড়ে রহমানকে,
__ আঙ্কেল! সে হু হু করে কেঁদে দ্রুত কাছে গিয়ে রহমানের হাতে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ে।
__ উপরওয়ালা আন্টির সাথে এমন কেনো করল আঙ্কেল? আন্টির সাথে এমন কেনো হলো? আন্টির কিছু হয়ে গেলে আমি কি করবো, আমি পাগল হয়ে যাব আঙ্কেল, আমি পাগল হয়ে যাব।
প্রানপ্রিয়া রহমানের হাতে মাথা ঠেকিয়ে ডুকরে কাঁদছে।, আশ্রমে আসার পর থেকে সেলিনাকে নিজের মায়ের চোখে দেখছে প্রানপ্রিয়া। যিনি সব সময় একজন মায়ের মতই তার দায়িত্ব পালন করছেন এবং এক্সিডেন্ট হওয়ার সময় ও নিজের জীবনের আগে প্রানপ্রিয়ার জীবন রক্ষা করা আগে ভেবেছেন তাহলে প্রানপ্রিয়া কিভাবে সহ্য করবে সেলিনা এই অবস্থা।

রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তার চোখদুটোও লাল হয়ে গেছে। মেয়েটাকে কিভাবে বুঝ দিবে বুঝতে পারছে না। সেলিনা কে সে নিজে ও ছোট বোনের মত দেখেছেন তার ও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
তিনি তার আরেক হাত প্রানপ্রিয়ার মাথায় রেখে কম্পিত কন্ঠে বলেন,
__ উপরওয়ালা কাছে দোয়া কর প্রিয়া মা,তিনি ই সব কিছু ঠিক করার মালিক এখন যা চাওয়ার তার কাছ থেকে চাইতে হবে।
প্রানপ্রিয়ার হেঁচকি উঠে গেছে কান্না থামছে না তার কোনভাবে ই সেলিনা র এই অবস্থা মেনে নেওয়ার মতো না।
অপারেশন থিয়েটার থেকে দুজন ডক্টর বের হয়ে নার্সদের বলা শুরু করে এই রোগীকে এখানে রাখা রিক্স অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
রহমান আর প্রাণপ্রিয়া দুজন ই ডক্টরের দিকে দৃষ্টি ফেলে তাদের ভেতরটা চেপে ধরে। শরীরের কম্পন তাদের সামনে থাকা যে কেউ দেখতে পাবে।
সেলিনা মাথায় প্রচন্ড আঘাত পাওয়ার ফলে অতিরিক্ত রক্তপাত হচ্ছে। নাক ও দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না। সাথে একহাত একবার ভেঙে খুব ই ভয়ংকর অবস্থা। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমার কাছে ভীষন খারাপ লাগছে সেলিনার জন্য শুনেছি খুব খারাপ অবস্থা হাসপাতাল বদলানো হয়েছে। চোখে মুখে দুঃখ প্রকাশ করে বললেন রাইমা,
দামিয়ান খোলা বারান্দার রেলিংয়ের সাথে হেলান দিয়ে চেকবুকে সাইন করে নিলয়ের কাছে দিয়ে বলে,
__ মিস্টার রহমানের কাছে দিবে আরো সাহায্য প্রয়োজন হলে আমাকে অবশ্যই জানাতে বলবে।
নিলয় মাথা নাড়ায়, ওকে স্যার
সে চেকবুক নিয়ে চলে যায়।
দামিয়ান ঘুরে নিচের গার্ডেনের দিকে দৃষ্টি ফেলে।
কয়েকজন সার্ভেন্টে বাগানের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে গোলাপের চারা লাগাচ্ছে।
রাইমা দামিয়ানের পাশে এসে দাঁড়ায়,
__ তোমার বাবা আর ছোট বাবাকে কি এই দুঃসংবাদ দেওয়া হয়েছে?
দামিয়ান রেলিংয়ে দু হাত রাখে, গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুধায়,
__ প্রয়োজন নেই তারা দেশের বাহিরে বাংলাদেশ আসলে জানানো যাবে।
রাইমা হা করে শ্বাস ফেলে, হুম তুমি যা ভালো বুঝ। কি আর বলো অসহায় মানুষ তার মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা তাদের ফান্ডে যে পরিমাণ টাকা আছে সব সময় সাহায্য করার জন্য হাত বাড়িয়ে রাখো ।
দামিয়ান গার্ডেনের দিকে দৃষ্টি রেখে হালকা মাথা নাড়ায়।

সেলিনা কে পূর্বাঞ্চলের আরেকটা হাসপাতালে জরুরী বিভাগে কে ভর্তি করানো হয়েছে। রহমান আর প্রাণপ্রিয়া দুজন এখনো এক সাথে বসা। সেই সকালের দুর্ঘটনা, এখন পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া কিছু নেই। মুখ শুকিয়ে চোখ গর্তে চলে গেছে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় মাথাটা ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা। নিলয় ব্যাংক থেকে ক্যাশ টাকা উঠিয়ে দায়িত্বের সাথে প্রথম আগের হাসপাতালের বিল পরিশোধ করে এরপর বাকি টাকা রহমানের হাতে দিয়ে দামিয়ানের বলা‌ কথা বলে ডক্টরদের সাথেও‌ কথা বলে গেছে।
রহমান প্রানপ্রিয়াকে বলেন,,
__ তুমি চলে যাও আশ্রমে বাচ্চারা একা সবকিছু ওরা সামলে থাকতে পারবে না। আমি আছি এখানে সেলিনার কিচ্ছু হবে না। আমি সব খবর তোমাকে ফোনে জানাবো তুমি চলে যাও আমাদের দায়িত্ব ভুলে গেলে চলবে না।
প্রানপ্রিয়া ঠোট কামড়ে ধরে, মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর পড়ে আছে। অতিরিক্ত কান্না করার ফলে গলা বসে গেছে কোনরকম ভাঙ্গা গলায়, পরে যাওয়ার কথা বললে রহমান তাকে নানানভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে পাঠিয়ে দেন।
সময়ের সাথে রাত গভীর হচ্ছে, আশ্রমের ভেতর চারপাশ নিস্তব্ধতা। প্রতি টা বাচ্চার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। প্রাণপ্রিয়া আসার পর সব গুলো একসাথে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। ছোট থেকে একটা পরিবারের মত থেকেছে তারা। কারো প্রতি কারো টান কম না সেখানে এতিম বাচ্চাদের মা রূপী ছিল সেলিনা। প্রানপ্রিয়ার বুক ফেটে কান্না আসলেও চোখ দিয়ে এক ফোঁটাও জল গড়িয়ে পড়ছে না।হয়তো সকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে চোখের জল ফুরিয়ে গেছে।
রহমান হাসপাতাল থেকে ফোন দিয়েছিলেন সেলিনার রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে তবে আই সি ইউ তে ভর্তি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। রহমান আল্লাহর কাছে তার জন্য শুধু দোয়া করতে বলেছেন।

সময় আপন গতিতে চলছে তবে এই সময় চলার পথে কত ঘটনাই না ঘটে যায়। তারমধ্যে সেলিনার হৃদয় বিধায়ক সড়ক দুর্ঘটনা। এই দুর্ঘটনার পর পাঁচ – ছয় দিন কেটে গেছে আশ্রমের পরিবেশ এখনো নিস্তব্ধতার ঘোর কাটাতে পারিনি। ওই যে বলে না আপন হতে হলে রক্তের সম্পর্কের প্রয়োজন নেই দিনের পর দিন একসাথে থাকা রক্তের সম্পর্ক থেকেও মাঝে মাঝে গভীর সম্পর্কে পরিণত হয়। তাদের আবার একে অপরের টান দুঃখ কষ্ট আপন সম্পর্ক থেকেও শক্তিশালী হয়ে থাকে। তবে দুঃখের সময় গুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে শক্ত হতে হয় এক সময় বড়দের হাত যেমন নিজের মাথার উপর থাকে কিছু পরিস্থিতিতে নিজেকে বড় বানিয়ে দায়িত্বের সাথে নিজের হাতটাও ছোটদের মাথায় রাখতে হয়। প্রাণপ্রিয়ার ক্ষেত্রে এমনটাই হলো দায়িত্ব যেন একটা চক্রের মত অবশ্যই যেকোনো পরিস্থিতিতে থেমে থাকা চলবে না। আশ্রমে সেলিনা আর রহমানের অনুপস্থিতিতে দুজন মহিলা আশ্রমের দায়িত্বের জন্য দেওয়া হয়েছে কারন প্রাণপ্রিয়া বয়সে ছোট একা হাতে সব সামলাতে পারবে না।
সে যতটুকু দায়িত্বের মধ্যে আছে মন শক্ত করে পালনের সাথে হাসপাতালে সেলিনার নিয়মিত খবর নিতে ভুলছে না। সেলিনার জ্ঞান ফিরলেও তার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি রহমান হাসপাতালে থাকছেন শুধু প্রয়োজনে আশ্রমে কয়েক ঘন্টার জন্য আসেন এরপর আবার চলে যান। দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছে।
সুফিয়া আশ্রমের গেট দিয়ে প্রবেশ করেন। সদর দরজার কাছে বসে প্রাণপ্রিয়া আনমনে নানান ভাবনা ভাবছিল।
সুফিয়া এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন,,

__ এভাবে বসে আছো কেনো প্রিয়া?
আকম্মিক ভাবনার মাঝে সুফিয়া আন্টির কথা শুনে
চমকে উঠে প্রাণপ্রিয়া,
__ ওহহ আন্টি আপনি,
সুফিয়া পাশে বসেন,
__ হু সেলিনা কে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম তার শরীরের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। হঠাৎ কি থেকে কি হয়ে গেল। সুফিয়া হা করে শ্বাস ফেলেন অতঃপর জিজ্ঞেস করেন,
__ তোমাদের আশ্রমের সবকিছু ঠিক আছে ?
প্রানপ্রিয়া মাথা নাড়ায়, হ্যাঁ।
__ শুনেছি দুজন নতুন মহিলা আশ্রমের দায়িত্বে দিয়েছেন তারা কোথায়?
__ ভেতরেই আছে রান্না করছেন হয়তো।
এটা ভালো হয়েছে এতগুলো বাচ্চার দেখাশোনা চারটে খানে কথা না। তুমিও তো এতটাও বড় হও যাইহোক,
হাসপাতালে রহমান ভাইয়ের মুখটা খুবই শুকনো লাগছিল জিজ্ঞেস করলে বললেন বেসরকারি হাসপাতাল না হলেও টাকার প্রয়োজন আছে। আশ্রমের ফান্ডের টাকা আর কত সেগুলো বাচ্চাদের জন্য তার মধ্যে সেলিনা শরীরের অবস্থা উন্নতির দিকে না। কখন কি হয়ে যায় বলা যাচ্ছে না। কথাগুলো বলার সাথে সুফিয়া প্রাণপ্রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, অতি দ্রুত সাহায্যের প্রয়োজন হবে সেলিনার তুমি পারলে আবরার ম্যানশনে গিয়ে সাহায্যের কথা বলো তারা মালিক তার অবশ্যই ব্যবস্থা করে দিবেন।

প্রানপ্রিয়া মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনে তার চোখ দুটো টলমল করছে। মানুষ কতটা অভাগী হলে অসহায় আর এতিম হয় আচ্ছা উপরওয়ালা এমন কেনো দিল না অসহায়দের দুর্ঘটনা অসুখ বিসুখ কিছু হয় না। যাদের টাকা-পয়সার খরচ করার মতো সামর্থ্য নেই তাদের আবার এসব কিসের জন্য । প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে বুকের ভিতর কষ্ট গুলো গিলে ফেলে।
টলমল করা চোখের পানি আটকে মনে মনে ভাবে
এখন কিছু করার নেই উপরওয়ালা ভাগ্য এমনই দিয়েছেন তাই সুফিয়ার কথা মত সাহায্যের জন্য সে অবশ্যই যাবে। যে আন্টি দুর্ঘটনার স্থানে নিজের জীবন বাঁচানোর আগে তার জীবনের কথা চিন্তা করেছেন তার জন্য সব করবে সে।
মাগরিবের আযানের পরপর ই চারপাশে অন্ধকার ছেয়ে যায়। কিছুদিন পর শীতকাল বলে ঠান্ডা আগের থেকে বেড়েছে। প্রানপ্রিয়া সাদা রঙের পাতলা একটা চাদর জড়িয়ে আশ্রমে সদর দরজা দিয়ে বের হয়। সে আজ সারা দিন ভেবেছিল। আন্টির শরীরের অবস্থা উন্নতি না হলে অবনতি হতে ও সময় নিবে তাই সাহায্য চাওয়া জন্য দেরি করা ও ঠিক হবে না ।

সে জানে বড় সাহেব বা তার ভাই দেশে নেই তার এমন একজন থেকে এখন সাহায্য চাইতে হবে যে তাকে অস্বস্তি করেছে তাকে আতঙ্কিত ও অপমানিত এবং নিরলসভাবে উত্যক্ত করেছে। তবুও সে বিশ্বাস করছে সে তাকে সাহায্য করবে কারন সাহায্য করার মত ছোট সাহেব ই একজন ব্যক্তি ছিলেন।
জঙ্গল পার হয়ে বাগানের দিকটায় চলে আসে।আবরার ম্যানশনে চারপাশে আলোয় আলোকিত প্রানপ্রিয়ার নিঃশ্বাস নেওয়া দ্রুত হয়ে যায়। সে কিছুটা ছুটে চলার মত গেস্ট হাউসের দিকটায় যেতেই দেখে গেস্ট হাউস পুরো অন্ধকার মানে কেউ নেই। সে কিছুটা অস্থির হয়ে ওঠে,
ছোট সাহেব কি বাসায় নেই?
তার মনে প্রশ্ন,
কিছুক্ষণ সে দাঁড়িয়ে থাকে অতঃপর ম্যানশনের দিকে হাটা ধরে। দরকারে এসেছে কারো কাছে জিজ্ঞেস করা উচিত হবে।
ম্যানশনে সাদা ফক ফকে টাইলসের সিঁড়ি বেয়ে ওঠে প্রানপ্রিয়া। ভেতরে আলোয় ঝলমল করছে। একজন মহিলা সার্ভেন্ট প্রাণপ্রিয়াকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
__ এ সময় এখানে?
প্রাণপ্রিয়া বেশ কিছুটা ইতস্ত অস্থিরতা নিয়ে বলে, ছোট সাহেবের সাথে দরকারি কথা আছে তিনি কি বাসায় নেই।
মহিলা সার্ভেন্ট কিছুটা সরু চোখে প্রাণপ্রিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি দেখে।
__ আছেন বড় সাহেবের অফিস রুমে তিনি।

ম্যানশনে পিছনে দিকটায় বিশাল বড় লাইব্রেরির মত অফিস রুম হুমায়ুন আবরার খুব শখ করে রুমটা সাজিয়েছেন। রুমের একপাশে শুধু বই আর বই । তিনি বই পড়তে খুব পছন্দ করেন অবসর সময় নাকি এখানেই কাটিয়ে দেন । আরেকপাশে হলো অফিসের মতো ডেকোরেশন করে চেয়ার টেবিল রাখা আপাতত দামিয়ান এই রুমে বসে, থুতনিতে আঙ্গুল ঘষে মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু দেখছে তার পাশে নিলয় দাঁড়ানো।
তবে আকম্মিক মনোযোগ ভাঙ্গে দরজার দুবার নক হওয়ার শব্দে। দামিয়ান নিলয় দুজন চোখ তুলে দরজার দিকে দৃষ্টি ফেলে।
শুভ্র রংয়ের চুড়িদার পড়া প্রানপ্রিয়া অস্বস্তি নিয়ে দৃষ্টি নত প্রবেশ করে ভেতর।
__ দুঃখিত আপনাদের বিরক্ত করার জন্য,
দামিয়ানের চোখ দুটো সরু হয়ে ওঠে হালকা ঘাড় কাত করে জোড়সোড়ো হয়ে দাঁড়ানো প্রাণপ্রিয়াকে দেখে।
নিলয় পাশ থেকে দামিয়ানকে বলে রুম থেকে বের হয়ে যায়।
প্রানপ্রিয়া কাতরানো দৃষ্টি নত রেখে কানের পিছনে চুল গুঁজে।
__ এখানে আসার কারন? ভ্রূকুটি করে দামিয়ান জিজ্ঞেস করে। এই মেয়ে হঠাৎ এ সময় নিজের থেকে তার কাছে আসা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
প্রানপ্রিয়া জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়,
__ আ,,আসলে আমি।
__ হ্যাঁ তুমি,

দামিয়ান পিছনের দিকে হেলান দিয়ে বসে সব সময় মত তার মুখে গম্ভীরতার স্পষ্ট।
__ আআমি সেলিনা আন্টির চিকিৎসার সাহায্যের জন্য এসেছি ছোট সাহেব। আন্টি শরীরের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। ফান্ডের টাকা চিকিৎসার খরচের জন্য না তবুও আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু হাসপাতালে থাকতে হলে অনেক খরচ যেগুলো আমাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব না। আপনাদের কাছ থেকে আমি আন্টির জন্য সাহায্য চাইতে এসেছি ।
প্রানপ্রিয়া কন্ঠ কাঁপছে,তার চোখের কোণে জল এসে পড়েছে।
দামিয়ান মাথা দুলিয়ে বলে, ওহ এই জন্য ।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁটে ঠোঁটে চাপে।
দামিয়ান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে অতঃপর মৃদু সুরে ডাকে।

__ প্রানপ্রিয়া,
চোখ তুলে তাকায় প্রানপ্রিয়া তার চোখের কোণ বেয়ে জল ঘুরে পড়ছে।
__ আশ্রমের নিয়ম অনুযায়ী আশ্রমের টাকা থেকে যথেষ্ট সাহায্য করা হচ্ছে। এখন তুমি যা চাইছো সেটা হবে আমাদের নিজের তরফ থেকে,
অস্থির ভঙ্গিতে প্রাণপ্রিয় দু কদম এগিয়ে হাত জোড় করে বলে, আপনারা আমাদের মালিক দয়া করে সাহায্য করুন ছোট সাহেব।
গভীর শ্বাস ফেলে দামিয়ান বাসা থেকে উঠে প্রাণপ্রিয়া দিকে এগোয়। প্রানপ্রিয়ার অশ্রুসিক্ত দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ। সে ভয় পাচ্ছে না । অস্থিরতা আর তার মধ্যে নেই।
দামিয়ান দুহাত দূরত্ব বজায় রেখে টাউজারের পকেটে হাত গুঁজে মেয়েটি তার কাছে সাহায্য চাইছে
কিন্তু দামিয়ান সাহায্য চাওয়ার জন্য মিস্টার রহমান কে আশা করছিল সে জানতো অল্প টাকায় মহিলাটি চিকিৎসা হবে না। দামিয়ান তার দিকে নিবদ্ধ দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে যেখানে সে দেখছিল করুনা পাওয়ার ভিক্ষা মেয়েটি তার কাছে সাহায্যের জন্য আটকা পড়েছে মনে মনে হেসে ওঠে দামিয়ান।

__ এটা সম্ভব না আমি তোমাকে এভাবে সাহায্য করতে পারি না। আমার যতটুকু দায়িত্ব সাহায্য করার মত আমি করেছি তবে তুমি বিভিন্ন সংস্থা থেকে সাহায্য চাইতে পারো দেরি হলেও অবশ্যই পাবে তুমি এখন যেতে পারো।
দামিয়ান ঘুরে লাইব্রেরির দিকে পা বাড়াতে নিলে
প্রানপ্রিয়া দু হাত দিয়ে মুখ চেপে কান্না করতে করতে বলে,
__ দয়া করে এভাবে বলবেন না, আমার আন্টিকে সাহায্য করুন ছোট সাহেব আমি অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।
দামিয়ান কিঞ্চিৎ বাঁকা হেসে প্রাণপ্রিয়া দিকে ফিরে,
কান্নার ফলে তার শরীর কাঁপছে আগের থেকে আরও চিকন হয়ে শরীরের ফর্সা রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ময়লা জামা কাপড় শরীরে তবুও দামিয়ান তার প্রতি আকর্ষিত ছিল তার লম্পট মন তাকে কাছে পাওয়ার কামনা করছিল।
দামিয়ান ধীরে গতিতে তার কাছে এসে দাঁড়ায় তার কি উচিত না এই সুযোগ কে হাতে নিয়ে দুমড়ে মুছে ফেলা যেখানে শিকার শিকারীর কাছে অবশেষে কোনো কারনে আটকা পড়েছে। দামিয়ান ঠোঁটে হাসি প্রসারিত করে এমনটা সে ভাবেনি কিন্তু এর সুযোগে সে অবশ্যই নিবে।

__ আমি কেন করব? বলে ওঠে দামিয়ান
প্রানপ্রিয়া মুখ তুলে আবারো হাত জোড় করে,
__ আপনি মালিক ছোট সাহেব।
__ তাই নাকি, তার কন্ঠে হালকা ঠাট্টা মিশ্রিত ভাব।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে সে এই পর্যন্ত দুইবার তাকে মালিক না বলেছিল।
__ সময় নষ্ট না করে আশ্রমে ফিরে যাও, যতটুকু দায়িত্ব পালন করার মত চলবে।
প্রানপ্রিয়ার মাথা নত করে চোখ বুজে তার গাল বেয়ে অশ্রুর স্রোত বয়ে যায় সে সাহায্যের ভিক্ষা বারবার চেষ্টা চেষ্টা করে কিন্তু তার গলা ধরে গেছে শব্দ বের হতে পারছে না।
__ দায়িত্বের বাইরে সাহায্য করা মানে আমার নিজের কাছ থেকে টাকার সাহায্য করতে হবে। কারণ বাবা দেশে নেই। আশ্রমের আসল মালিক হুমায়ুন আবরার সেখানে আমি শুধু শুধু সাহায্য করবো।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁটে কান্না থামানোর চেষ্টা করে।
সাহায্য করতে সমস্যা নেই। আমি একজন ব্যবসায়ী তবে বাবার মতো গরিবদের জন্য আবেগ আমার মধ্যে কাজ করে না আমি সাহায্য করার বিনিময় নেই।
প্রাণপ্রিয় আবারো মুখ চেপে ধরে কান্না থামানোর বদলে তার আরো কান্না আসছে।
দামিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়,

__ তোমার কান্নাকাটি দেখে আমি তৃপ্তি অনুভব করি। সাহায্যের বিনিময়ের জন্য এটা যথেষ্ট নয়।
__ আপনাকে দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছু নেই ছোট সাহেব আমি আপনার কাছে সাহায্যের ভিক্ষা চাইছি আপনি দয়া করে ফিরিয়ে দিবেন না আমাকে।
__ কে বলেছে তোমার কাছে কিছু নেই । তার কন্ঠ ধীর আর নেশালো হয়ে উঠল,
প্রানপ্রিয়ার কান্না থেমে যায়। সে মাথা তুলে দিকে তাকায় তার সে তো চাহনি তার দিকে প্রানপ্রিয়া ভ্র কুঁচকে কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করে,
__ কি আছে আমার কাছে?
দামিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,, তুমি নিজে যা আমার চাই,
মুহূর্তে প্রানপ্রিয়ার মুখটা যেন ফ্যাকাসে হয়ে উঠে,
দামিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগোতে এগোতে বলে,

__ আমি কথা দিচ্ছি তুমি আমার হলে আমি তোমার আন্টির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবকিছু দায়িত্বে নিব।
প্রানপ্রিয়ার ভেতর কেঁপে উঠে সে ও একবার একটা করে পিছিয়ে যেতে থাকে এবং একপর্যায়ে পিছের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে যায়।
দামিয়ান কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়ায় সে প্রাণপ্রিয়ার পা থেকে মাথা অব্দি খুব বাজে ভাবে দেখে।
আমার হওয়া মানে কি জানো?
তোমার উপর সব ধরনের অধিকার আমার থাকবে বলতে পারো তোমার জীবনের মালিক হব আমি ।
প্রাণপ্রিয়ার ভেতর ভয় গেঁথে যায় তবে ভিতর ক্রোধের দোলা ও পাকেচ্ছে তাকে কিভাবে এত বিশ্রী বিনিময়ের কথা বলতে পারে সে।
দামিয়ান হাসে, আহ টিচার্স রুমে কি যেন বলেছিলে
আমি তোমাকে টাকা দিয়ে কিনে নি এখন ব্যাপারটা কি আবার এমন হয়ে গেল নাকি।
প্রাণপ্রিয়ার এবার যেন মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে, তার সাথে এত খারাপ কিছু করার পরও সাহায্য করার মত একমাত্র ব্যক্তি মনে করে এসেছিল। কিন্তু সে প্রতিবারের মতো এবার আরো জঘন্যভাবে অপমান করলো তাকে এত এত বাজে,,
বাকিটা প্রাণপ্রিয়া ভাবতে পারল না দাঁত চেপে বলা শুরু করে,,

__ আমি ভেবেছিলাম আপনি পাগল, বিকৃত মস্তিষ্কের, খারাপ, নিষ্ঠুর ,নির্দয় কিন্তু আপনি জঘন্য চরিত্রহীন পুরুষ আপনার লজ্জা করে না সারা আপুর সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরও অসহায় মেয়ে পেয়ে বাজে অফার দিতে কিভাবে আপনি আমার এই বিনিময়ের কথা বললেন আপনার প্রতি আমার ঘৃণা ছিল এখন আমার গা গুলিয়ে আসছে।
দামিয়ান হেসে ওঠে, লিটল বার্ড ভেবেচিন্তে কথা বলো নাহলে কিন্তু তোমার উপর ভারী হয়ে পড়ে। আর আমি জানি তুমি অনেক বুদ্ধিমতী মেয়ে‌। তোমাকে জোর করছি না সব তোমার উপর আমার সাহায্যের প্রয়োজন না হলে তুমি অন্যভাবে চেষ্টা করতে পারো আর যদি আমার সাহায্য প্রয়োজন হয় আমি বলে দিয়েছি বিনিময় আমার কি চাই।
প্রাণপ্রিয়ার ভেতর যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দিল

সে খলনায়ক পর্ব ৪০

__ আপনার কি মনে হয় না আপনার এসব কথা, অফার আমি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি।
দামিয়ান লাইব্রেরির দিকে যেতে যেতে বলে,,
__ তুমি সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারো,
প্রানপ্রিয়ার মুখের ভাষা যেন হারিয়ে যায় সে এতটাই অসহায় মূল্যহীন এটাই কি বুঝালো সে, উপহাস করলো সে আসলে কিছুই করতে পারবে না।

সে খলনায়ক পর্ব ৪২