Home সে খলনায়ক সে খলনায়ক পর্ব ৪২

সে খলনায়ক পর্ব ৪২

সে খলনায়ক পর্ব ৪২
ফারহানা সানিয়াত

শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রাণপ্রিয়ার, দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল অসহায়ত্ব তাকে ভেঙ্গে চূরে চুরমার করে দিচ্ছে। নাহ আর এক মুহূর্ত এখানে নয়। সে দৌড়ে অফিস রুম থেকে বের হয়ে যায়। ম্যানশনের পিছনের দিক বলে আর কারো চোখে সে পড়ে না। দ্রুত গতিতে ম্যানশনে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে অন্ধকার জঙ্গল দিয়ে আশ্রমে দিকে ছুটে । তার করুন কান্না অন্ধকার নিস্তব্ধ জঙ্গল হাহাকার। সে যখন আশ্রমের গেট দিয়ে প্রবেশ করে তার শরীর কাঁপছে, চোখে অশ্রুর স্রোত সব ঝাপসা হয়ে আসছে। কোনো রকমভাবে সদর দরজা দিয়ে ভিতর প্রবেশ করে উপরে নিজের ঘরে ঢুকেই সে মেঝেতে বসে পড়ে।
আর চলছে না তার পা, নিঃশ্বাস এবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মেঝেতে দুই হাতের ভর দিয়ে ঝুঁকে ঘনঘন শ্বাস ফেলতে থাকে। তার শরীর এখনো কাঁপছে, কানে বারবার দামিয়ানের বলা কথা আর জঘন্য বিনিময় চাওয়া বাজছে।
__ এতটা জঘন্য! সে এতটা জঘন্য! তার প্রতি ঘৃণা কোন পর্যায়ের হওয়া উচিত? একজন নিষ্ঠুর মানুষ সাহায্য না করা আর পৈচাশিক জঘন্য চাওয়া না পেলে সাহায্য না করা। কতটা খারাপ হলে মানুষ এমন করতে পারে। সে অসহায় এতিম তাই বলে‌ এতটা মূল্যহীন! তাকে কুপ্রস্তাব দিতে একবারও বিবেকে বাঁধলো না তার। এভাবে তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়ার দাবি।
শব্দ করে কেঁদে ওঠে প্রানপ্রিয়া,

দুই আঙ্গুলের মাঝে ফাউন্টেন কলম নিয়ে ঘুরাচ্ছে দামিয়ান। তার দৃষ্টি হাতের কলমের উপর ঠোঁটের কোণে মৃদু বাঁকা হাসি, কাল রাতে তার আর
প্রাণপ্রিয়ার মধ্যে কথোপকথন যা হয়েছিল সেগুলো খুশি দিচ্ছে তাকে, তার কাছে মেয়েটি সাহায্যের ভিক্ষা চাইছিল। আহ এটা খুব ই দুঃখজনক ছিল। সে আটকা পরেছে তার কাছে, না চাইতে নিজের পাতে কুড়াল মারা বলা চলে। আশা করেনি সে এমনটা ,কিন্তু পাখি শিকারির কাছে নিজে ধরা দিলে অবশ্যই তার শিকার করা উচিত। দামিয়ান ঠোঁটের হাসি প্রসারিত করে। মনে মনে পরিকল্পনা সাজাতে ব্যস্ত হয় অসহায় মেয়েটি মনের ওপর দিয়ে এখন কি না বয়ে যাবে।

বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা আহানাফ অনেকক্ষণ যাবৎ ধরে দামিয়ান কে লক্ষ্য করছিল। এরকম ঠোঁটে হাসি নিয়ে ভাবনায় বসে মতো পুরুষ সে না। তার ব্যক্তিত্বে চুপচাপ, গম্ভীরতা আর প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া অন্য প্রতিক্রিয়া সচরাচর দেখে মেলে না। সূক্ষ্ম পরিবর্তন তার মধ্যে দেখা দিচ্ছে আজকাল আহানাফ হা করে শ্বাস ফেলে বারান্দার রেলিংয়ের সাথে হেলান দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। সকালের মিষ্টি রোদ আর বাতাস তার গা ছুয়ে দিয়েছে।
বারান্দায় দামিয়ান আর আহনাফ বাদে সারা ও রয়েছে। অনেকদিন পর আজ তিনজন এক সাথে। যার যার ব্যস্ততার কারণে একসাথে সময় কাটানো হয় না। সারা দামিয়ানের পাশে ই বসে ছিল সে তার গায়ের সাথে হেলান দিয়ে বসার জন্য তার দিকে কিছুটা চেপে বসলো এতে দামিয়ানের আঙুলে ঘুরানো কলমটা আঙ্গুল থেকে ছুটে নিচে পড়ে গেল।
দামিয়ান তার ভাবনা থেকে বের হয়ে নিচে পড়ে থাকা কলমের দিকে এক নজর দেখে।
সারা তার গায়ের সাথে লেগে হেলান দিয়ে বসেছে।

__ সরে বসো সারা, সে ভারী কন্ঠে শুধালো ।
আহনাফ পাশ থেকে চোখ সরিয়ে তাদের দিকে তাকায়।
সারা হেঁসে উঠে,, কেনো ভালো লাগছে এভাবে।
__ আমার না।
থমথমে মুখে সারা সোজা হয়ে বসে।
দামিয়ান শীতল দৃষ্টিতে তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে তার পা থেকে মাথা অব্দি দেখে।
__ আগ্রহ তার প্রতি থাকে যাকে পাওয়ার জন্য, স্পর্শ করার জন্য কাঠখোর পড়াতে হয়। কিন্তু তোমাকে তো,,,, বাকি টা না বলে দামিয়ান হাসে, সে তাকে উপহাস করে।
সারা কপাল গুটিয়ে হতবাক চোখে তার দিকে তাকায়।
দামিয়ান বসা থেকে উঠে, তার পড়নে কালো
টি শার্টের সাথে কালো ট্রাউজার, কাপলের সিল্কি চুল পড়ে আছে।
দিন দিন গায়ে পড়া হয়ে যাচ্ছ না?
সারা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে।
দামিয়ান দৃষ্টিতে বিরক্তি, সে ঘুরে চলে যায়।

সারার রাগে ভিতরটা জ্বলে ওঠে। তাকে অপমান করল! উপহাস করলো! তাও আহানাফের সামনে। সে কি ভুলে গেছে সে তার ফিয়ান্সে!
আহানাফ দাঁড়িয়ে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে।সে ঠোঁট কামড়ে ধরে, কপালে ভাঁজ তার, কোনোভাবে তার ভাই সারার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে এটা বুঝলো না তো? হতাশায় অস্থির হয়ে উঠলো আহানাফ। ওই অনাথ মেয়ের প্রতি তার ভাই কতটা আকৃষ্ট? এর পরিনতি কি ? সে বুঝতে উঠতে পারে না। তবে এতটুক নিশ্চিত সারা কখনোই মানবে না আর সারা না মানলে ,,,
বাকি টা সে আর ভাবতে পারলো না , তার ভাই ওই অনাথ মেয়েকে গুরুত্ব দিচ্ছে এতটা ই গুরুত্ব দিচ্ছে যে তাকে মেনে সারাকে থাকতে হবে যার সাথে ইতিমধ্যে এংগেজমেন্ট হয়েছে গেছে।
সারা রাগে ফোঁস ফোঁস করে বসা থেকে উঠে বড় বড় কদম ফেলে সেও চলে যায়।
আহানাফ তার ভাবনার মাঝে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হতাশার শ্বাস ফেলে। তার ভাইয়ের মাথায় যে কি চলছে এটা শুধু তার ভাই ই জানে।

হাসিখুশি হইচইয়ে মেতে থাকা আশ্রমে পরিবেশ কেমন একটা যেন হয়ে উঠেছে। নতুন দায়িত্ব থাকা দুজন মহিলার সঙ্গে আরো একজন পুরুষ দায়িত্বে এসেছে আশ্রমে । তবে এখানে সে থাকবে না।তাকে বাইরের যাবতীয় কাজে প্রয়োজনে পড়লে শুধু বলা হবে। আপাতত লোকটি আশ্রমের মাসিক বাজার
ভেতরে এনে রাখছে। প্রাণপ্রিয়া সোফায় বসা নতুন দুজন মহিলা যে দায়িত্বে তাদের বয়স সেলিনা আন্টির বয়সের মত ই হবে। কথাবার্তা ব্যবহারে ভালো ই তার বরাবর সোফায় বসে বাজারে হিসাব মিলাচ্ছেন তারা। প্রানপ্রিয়া তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে, এই তো কিছুদিন আগে এই সোফায় বসে আন্টি আর আংকেল তারা ও একই কাজ করতো। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ ঘুরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বাহিরে দৃষ্টি ফেলে ,আর উঠানে বাচ্চারা হইচই করে খেলাধুলা করত।

কিন্তু আজকাল এত নিস্তব্ধতা তার সহ্য হয় না বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে ।
বসা থেকে উঠে ওপরে নিজের ঘরের দিকে হাটা ধরে,
বাদ ভাঙ্গা কান্না আসছে তার, অনুভব করছে সে যা ভাবে একপর্যায়ে গিয়ে কোনো না কোনো ভাবে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কেনো নিয়তি তার সাথে এমন করছে? কি করেছে সে? কি করেছে?
ঘরে এসে বিছানায় বসে দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ।
সেই জঘন্য রাতের পর বেশ কিছু দিন কেটে গেছে।
নিজেকে ওই লোকের কাছে দিতে রাজি হয়নি। সেই রাতে জঘন্য প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাই পর দিন থেকে নিজের মত বিভিন্ন সংস্থায় গিয়ে কোনভাবে দ্রুত সাহায্য করার কথা বলে এসেছিল । কিন্তু কেনো যেন তারা অজুহাত দেখাচ্ছিল। প্রাণপ্রিয়া বেশ বুঝতে পেরেছিল ইচ্ছে করে তারা নানান ভাবে দেরি হবে বলছে। এতে ভেঙে পড়েছিল সে। যে আন্টি তার জীবন বাঁচিয়েছে, যাকে নিজের মায়ের চোখে দেখে তার জন্য সে কিছুই করতে পারবে না, ডুকরে কেঁদে উঠে প্রানপ্রিয়া। মুখ ঢেকে রাখা হাতের আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে তার অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। দু দিন ধরে আন্টির অবস্থার ও অবনতি দিকে যাচ্ছে। আঙ্কেলের মুখের দিকে ও তাকানো যায় না। টাকার কমতির কারনে ডক্টরদের ও খামখেয়ালি চোখের সামনে, সব কিছু হচ্ছে কিন্তু করার মতো‌ যেন কিছু নেই। এমন মানসিক চাপে খাওয়া, দাওয়া, ঘুম ছেড়ে সব দিয়েছে সে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে আগের থেকে শুকিয়ে শরীরের রং মরা মানুষের মত কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে।

কিছুদিনের জন্য রাশিয়া যাওয়ার কথা ছিল দামিয়ানের। আজ সে আরো পনেরো দিন পেছালো। এভাবে সময় পিছানোর কারন ভিডিও কলে থাকা নিকোলাই বুঝে উঠতে পারছে না। কারন জিজ্ঞেস করার মত সাহস তার মধ্যে নেই, নিজের মত করে ক্যাথরিন কে এর জবাবদিহি করতে হবে । যাইহোক দুজনের মাঝে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলে দামিয়ান কল কেটে দেয়। তৎক্ষণাৎ ঘরে হাজির হয় নিলয়।
দামিয়ান পায়ের পা তুলে বসে নিলয়ের দিকে দৃষ্টি ফেলে।
নিলয় দুটো কাগজ তার দিকে এগিয়ে ধরে।
__ টেবিলের উপর রাখো, সে শীতল কন্ঠে বলল।

নিলয় তার কথামতো টেবিলের উপর কাগজে দুটো রেখে যেভাবে এসেছিল নিঃশব্দে ঠিক সেভাবে চলে যায়।
দামিয়ান এক হাত তার কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো পিছনের দিকে ঠেলে দেওয়া সাথে টেবিলের উপরে রাখা দুটো কাগজের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে।
আমার পরিকল্পনার সামনে তোমার জেদ তোমার সাহস আর প্রত্যাখান ঠুনকো হয়ে যাবে প্রাণপ্রিয়া। এক দিক থেকে না তুমি সব দিক থেকে আটকাবে । ইতিমধ্যে তোমার করুন অবস্থা চলছে সময়ের সাথে এটা বাড়বে। তুমি বাধ্য হবে আমার কাছে আসার জন্য।
দামিয়ান শব্দ করে হেসে টেবিলের উপর থেকে সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ঠোঁটে চেপে হাঁটা সাথে সাথে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে ধূমপান করা শুরু করে। সে বেড রুম থেকে বসার ঘরে খোলা জায়গাটা এসে দাঁড়ালো যেখান থেকে ঝিলের স্বচ্ছ জল দেখা যাচ্ছে। সে বাতাসে দোয়া উড়িয়ে কয়েকবার নিঃশব্দে প্রানপ্রিয়ার নামটা খুব নেশালো ভঙ্গিতে আওড়ালো।
অতঃপর মৃদু হাসে,
তুমি অবশ্যই জানবে আমি যা চাই তা পেয়ে ছাড়ি সেটা যত ই সময় লাগুক না কেনো।

দিন ফুরিয়ে রাত, এরপর রাত শেষ হলে আবারো নতুন দিনের শুরু, এভাবেই চলছে। তবে প্রানপ্রিয়ার জীবনে চলার গতিপথের সাথে হতাশা মানসিক চাপ সময়ের সাথে সাথে বেড়ে উঠেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে ছোট একটা বৃত্তাকারের ভেতর আটকা পড়েছে সে। যেখান থেকে বের হওয়া যেন মুশকিল। সে দীর্ঘ গভীর শ্বাস ফেলে পড়নের স্কার্ট খিচে ধরে চোখ বুজে নেয়। ভর দুপুরে বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে আছে। তাকে দেখে অসুস্থ রোগীর থেকে কম মনে হচ্ছে। আপাতত পরিস্থিতি মনে শরীরের কোথাও তার শক্তি নেই। থাকবে কোথা থেকে আন্টির দিন দিন অসুস্থতা আজ নিজ চোখে দেখে এসেছে। একজন নার্স তো বলছিল রোগী এই অবস্থা থাকলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।
কথাটা শুনে বুকের ভেতর প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছিল তার। আশ্রমে দুজন মেয়ে সাথে ছিল সে নিজেকে শক্ত করে সামনে নিলেও তারা কাঁদেছিল। আঙ্কেলের অবস্থা ও ভালো ছিল না তার বয়স মনে হচ্ছিল কয়েক দিনে আরো বেড়ে গেছে। খুব ইচ্ছে করছিল তাকে বলতে,

যাকে দয়াবান দয়ালু বলে হয় সে কোথায়? আপনি কি জানেন ভিক্ষা করেও যে সে সাহায্য পায়নি । তবে সাহায্যের নামে জঘন্য কুপ্রস্তাব পেয়েছি সেটাতে রাজি হয়নি তাই তার ক্ষমতার নিচে এখন চাপা পড়ছি। কথাগুলো বলতে চেয়ে গিলে ফেলেছিল প্রানপ্রিয়া।
কি হবে বলে ? সে ক্ষমতা দেখাচ্ছে এরমানে সে আরো অনেক কিছু করতে পারবে। খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। সে তার সাহায্য পাওয়ার সব রাস্তা আটকে দিয়েছে। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার পর থেকে ভেবে দেখলে ই বোঝা যাচ্ছে। তাকে বাধ্য করছে,, আর এসবের মধ্যে কষ্ট পাচ্ছে আন্টি।
প্রানপ্রিয়ার দুচোখের কোণ বেয়ে এক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
একজন মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। এমন একজন মানুষের প্রতি তার দয়া নেই নিজের চাওয়া তার কাছে এতটা গুরুত্ব। সে বিকৃত মস্তিষ্কের সাইকো স্বাভাবিক মানুষ কখনো হতে পারে না।
প্রানপ্রিয়া চোখ দুটো খুলে কিছুক্ষণ সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব তৃষ্ণা পেয়েছে তার, গলা ভেজা হবে। সে ধীরে ধীরে শোয়া থেকে উঠে বিছানার পাশে টেবিলের দিকে তাকায়। গ্লাসে পানি ডেকে রাখা ,সে হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিয়ে অল্প একটু পানি খেয়ে হাতের গ্লাসের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। তার মনের ভেতর লড়াই চলচ্ছে। আন্টির উপর খুব খুব ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। সে কেনো নিজের জীবন না বাঁচিয়ে তাকে বাচালো। সে নাহয় অবহেলিত চিকিৎসার অভাবে মারা যেত অত্যন্ত কারো তুচ্ছ আকাঙ্ক্ষার দাবি রাখা হতো না।
গভীর শ্বাস ফেলে প্রানপ্রিয়া, হাতের গ্লাস টা আবারো টেবিলের উপর রাখার জন্য হাত বাড়ারাতেই তৎক্ষণাৎ ঝড়ের গতিতে আশ্রমের দুটো কিশোরী মেয়ে, যারা তার সাথে সকালে হসপিটালে গিয়েছিল তারা ঘরে প্রবেশ করে হাঁপিয়ে কান্না মাখা বলে ওঠে,,

__ আন্টির অবস্থা অনেক খারাপ প্রিয়া আপু। আঙ্কেল এইমাত্র ফোন করে বললো।
কথা শোনা মাত্রই প্রাণপ্রিয়ার হাত থেকে গ্লাসটা নিচে পড়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। তার দুনিয়া যেন এখানেই থমকে গেল ,চোখ ঝাপসা হয়ে অশ্রু গড়িয়ে গাল বেয়ে পরলো অতঃপর,, অতঃপর আর কি করা আছে তার? আর কি হাতে আছে তার? কি করবে?
কিশোরী মেয়ে দুটি তার কাছে এসে হু হু করে কেঁদে ওঠে। প্রাণপ্রিয়া ঠোট কামড়ে চোখ বুজে মনের লড়াইটা বন্ধ করে ফেলে নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলে অতঃপর ,,,,

শীতকাল চলে এসেছে। বাহিরে ঠান্ডা ও পড়েছে বেশ।
তবে প্রাণপ্রিয়ার গায়ে কোনো শীতের পোশাক নেই। সে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে হাঁটছে। অন্ধকার নেমে গেছে চারপাশে কিছু দূরে ঝলমলে আবরার ম্যানশন দেখা যাচ্ছে। সেখানকার লাইটের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে এসে অন্ধকারের মাঝে তার গায়ে পড়ছে। তার পরনে সাদা রঙের শার্ট আর স্কার্ট, গলায় স্কার্ফ ঝুলছে, এলোমেলো চুলগুলো খোলা যা বাতাসে উড়ছে।
আচ্ছা সে কেনো যাচ্ছে সেদিকে?
নিজেকে সঁপে দিতে নাকি আবারো সাহায্য চাইতে। তাচ্ছিল্য হাসে প্রাণপ্রিয়া, কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালে দেখা আন্টির ফোলা মুখটা আর নাক দিয়ে রক্ত পড়া দৃশ্য তাকে আরো করুন করে তুলেছে সে আর পারছে না, আর কোনভাবে ই পারছে না ।
ধীরে ধীরে পায়ের কদম ফেলে গেস্ট হাউসের কাছে চলে আসে প্রানপ্রিয়া। আজ ভেতরে আলো জ্বলছে
তারমানে সে আছে। প্রানপ্রিয়া ঢোক গিলে, ভিতরে সে ভীষণ ভীত শরীর মৃদু কাঁপছে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিয়ে মনকে শক্ত করে। আশেপাশে চোখ বুলায় কোথাও কেউ নেই। সে হা করে শ্বাস ফেলে অতঃপর আবারো পা বাড়ায়।
সদর দরজা দিয়ে যখন প্রবেশ করল প্রানপ্রিয়া আকম্মিক সামনে এসে দাঁড়ালো নিলয়।
__ গুড ইভিনিং ম্যাম।
প্রানপ্রিয়া বেশ অবাক হয় যায় , লোকটি কি তার জন্য অপেক্ষা করছিল? মনে প্রশ্ন জাগে ওঠে,
__ স্যার বাসায় নেই, আপনি আমার সাথে চলুন আমি আপনাকে স্যারের কাছে পৌঁছে দেব। কথাটা বলে নিলয় তার পাশ কাটিয়ে বাহিরে চলে যায়।
প্রানপ্রিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঘৃণা সীমা অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে। সব কিছু তার সাজানো পরিকল্পনা ছিল। তার বিনোদনের এক অংশ সে নিজ জায়গায় থেকে তার করুন পরিস্থিতির আনন্দ নিচ্ছিল এবং নিচ্ছে ও।

পূর্বাঞ্চল শহরের আরও ভেতরের দিকে নিরিবিলি এলাকায় আবরার রা সময় কাটানোর জন্য ফার্ম হাউস তৈরি করে রেখেছে। গাছ গাছালিতে ভরা দু তলায় বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স ফার্ম হাউস। অন্ধকারে এতটা বোঝা যাচ্ছে না শুধু পুরো বাড়ির ভেতর আলো জ্বলছে। দামিয়ান আপাতত এখানেই আছে ফ্যাক্টরি পার্টনারদের সাথে মিটিং ছিল তারা কিছুক্ষণ হয়েছে চলে গেছে। সে বেড রুমে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে মাথা হেলিয়ে বসা। বুকে হাত গুঁজে চোখ দুটো বুজে আছে।
হঠাৎ দরজায় নক,
ঠোঁট বাকিয়ে হাসে সে, কে আসতে পারে সে যেনো ভালো করে জানে।
নিলয় প্রাণপ্রিয়া কে দরজার কাছ পর্যন্ত দিয়ে চলে গেছে। প্রানপ্রিয়া কম্পিত হাতে দরজা ঠেলে ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করে।
ইতিমধ্যে দামিয়ান সোজা হয়ে বসে দরজার দিকেই চেয়েছিল। প্রানপ্রিয়া চোখের সামনে প্রকাশ হতে তার ঠোঁটে বিজয়ের হাসি খেলে যায়।
প্রানপ্রিয়া দৃষ্টি এক জায়গায় স্থির রাখতে পারছে না। এক হাত দিয়ে আরেক হাত দিয়ে ঘষছে।

__ তুমি এখানে? কিছু না জানার ভঙ্গিতে দায়িয়ান জিজ্ঞেস করে উঠলো। তার মুখ সব সময় মত শান্ত, শীতল দৃষ্টি ব্যবহারে গভীরতা রয়েছে।
প্রানপ্রিয়া জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায় , লোকটির কন্ঠ তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে। এতক্ষণ ঠান্ডা গায়ে লাগছিল না কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শীতল বাতাস তার গা ছুঁয়ে গেল।
__ কেক,,নো আমার সাথে এমন করছেন? তার কম্পিত কণ্ঠের সাথে শরীর ও মৃদু কাঁপছে।
__ এটা জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছে?
প্রাণপ্রিয়া চোখ তুলে তার দিকে তাকায়, তার শীতল দৃষ্টি কিছুটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে,
এতটা নির্দয় কিভাবে হতে পারেন আপনি? আপনার সমস্যা আমার সাথে ছিল কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে আন্টি। আমি জানি সংস্থা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত আপনার ক্ষমতায় আছে। দয়া করে এসব সবকিছু বন্ধ করুন। আপনার কাছে আমি হাত জোড় করে বলছি।
দামিয়ান নিরব দর্শকের মত কথাগুলো শুনে গভীর শ্বাস ফেলে,
__ তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হতে বাধ্য প্রানপ্রিয়া। তুমি,,,, আমার ওপর এখানে দোষ চাপাতে এসেছ।
__ কারন আপনি এমন করছেন,
দামিয়ান কিঞ্চিৎ হাসে, কোনো প্রমান?
__ নেই প্রমান, ক্ষমতাধররা কি প্রমাণ রাখে তারা তো ক্ষমতাধর হয় ই অসহায়ত্বদের পিষে।
দামিয়ান মাথা দুলায়, রাইট, এখন আসল কথায় আসো অপ্রয়োজনীয় কথা বলা আর শোনা কোনটাই আমার পছন্দ না।
প্রানপ্রিয়া ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখের জল ধরে রাখার চেষ্টা করে।

__ কেনো আমি ? কেনো চান আপনি আমাকে ? আপনার বাসনার জন্য তো আপনি যে কোনো মেয়ে পেয়ে যাবেন আমি ই কেনো?
চেষ্টা করেও লাভ হলো না বাঁধ ভেঙ্গে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
দামিয়ান ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বসা থেকে উঠে ধীর পায়ে প্রানপ্রিয়ার কাছে এসে দাঁড়ায়।
__ তুমি আলাদা প্রাণপ্রিয়া সব থেকে, । আজ পর্যন্ত অনেকের প্রতি আকর্ষিত হয়েছি কিন্তু কখনো অধিকার করার চিন্তা আসেনি। যাইহোক বেশি কথা আমার পছন্দ নয়। আগেও বলেছি জোর করছি না সব তোমার উপর।
দু চোখে ক্রোধ নিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে
__ কিন্তু আপনি বাধ্য করেছেন ,
, শব্দ করে হাসলো
__ হয়তো
__ কখনো মাফ করবো না, আমি আপনাকে কখনো মাফ করবো না ,
বলেই প্রাণপ্রিয়া শব্দ করে অঝোরে কান্না করতে করতে ফ্লোরে বসে পড়ে।
দামিয়ান ক্রূর হাসে। সে হালকা ঘার কাত করে তার সামনে এক হাঁটু ভেঙে বসে আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

__ ঠিক আছে কিন্তু মেনে নাও তোমার আর কোনো উপায় নেই আমার হওয়া ছাড়া। আর যদি না মেনে নিতে পারো তাহলে দরজা খোলা আছে,
প্রানপ্রিয়া দুহাত শক্ত করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে অশ্রুসিক্ত ঘৃণা ভরা নয়নে দামিয়ানে দিকে দৃষ্টি ফেলে।
__ কত দিনের জন্য আমি আপনার রক্ষিতা হবো?
দামিয়ান ভ্র কুঁচকে কিছুটা , রক্ষিত?
__ হ্যাঁ কত দিনের জন্য,
দামিয়ান তার মাথা থেকে হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
__ তোমাকে আমার চাই। তোমার প্রতি আমার সব ধরনের অধিকার থাকবে। কিছুদিনের রক্ষিতা আমার মন পোষাবে না। আমি যাকে চাইবো তার নিঃশ্বাস যে পর্যন্ত চলবে তাকে আমার হয়ে থাকতে হবে। কথাগুলো বলতে বলতে সোফার সামনে টেবিলের উপর রাখা কিছু কাগজের মাঝ থেকে দুটো কাগজ বের করে দামিয়ান।
__ দু জায়গায় সাইন প্রয়োজন তোমার এরপর দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ট্রাস্ট মি।
প্রাণপ্রিয়া শরীরে শক্তি পাচ্ছে না নিস্তেজ হয়ে পড়েছে।কোনভাবে বাসা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে মুখের সামনে চলে আসে চুল গুলো কানের পিছে গুঁজে দেয়।

তখনি দরজায় আবারো নক,
দামিয়ান ঘুরে তাকায়।
নিলয় প্রবেশ করে একজন হুজুরের সাথে।
প্রানপ্রিয়া ফ্লোরের দিকে চেয়ে। হাল ছেড়ে দিল সে কি থেকে কি হবে তার জানা নেই হুঁশ জ্ঞান তার হারিয়ে গেল। কানে কিছু কথা বলার শব্দ আসছে।
খানিকক্ষণ পর দামিয়ান তার কাছে এসে হাত ধরে সোফার কাছে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল ।একটা পুতুলের মত, যেন সে আসলেই পুতুল এরপর তাকে যা বলা হয় সে তাই বলল।
কি বলল সে?
কবুল, কবুল, কবুল
প্রথম ধর্মীয়ভাবে আটকা পড়লো। অতঃপর দুটো কাগজ প্রথম একটাতে খুব সাধারণ ভাবে আন্টির সাহায্যের যাবতীয় খরচ আজ থেকে দামিয়ান আবরার বহন করবে। একজন সাক্ষী হিসেবে সেখানে সে কম্পিত হতে গুটি গুটি অক্ষরে নিজের নাম লিখলো এরপর দ্বিতীয় কাগজটায় যখন চোখ বুলায়।
তাকে পাওয়ার এত আয়োজন ,তাচ্ছিল্য হাসে প্রানপ্রিয়া একফোঁটা চোখের জল কাগজের উপর পড়ে আইনগতভাবে রক্ষিতা আজ থেকে সে তার।
দামিয়ানের দিক থেকে ধর্মীয় এবং আইনগতভাবে বিয়ের কার্যক্রম শেষ হলে নিলয় আর যে হুজুর এসেছিল তারা যেভাবে এসেছিল সেভাবে আবার চলে যায়।
বেড রুমে নিস্তব্ধতা বিরাজ, মাথা নত করে সোফার এক প্রান্তে বসা প্রানপ্রিয়া। সে ভাবছে, একটা সাধারন সৎ হাসি খুশিতে ভরপুর জীবন যাপন করতে চেয়েছিল কিন্তু নিয়তিতে এমন কিছু ছিল!!
সোফার আরেক প্রান্তে পায়ের পা তুলে বসা দামিয়ান হাত ঘড়ি খুলতে খুলতে নিস্তব্ধতা ভাঙে।

__ একজন পুরুষের একটা নারী থাকতেও অন্য নারীর প্রতি আকর্ষিত হওয়া ভুলের কিছু না। এটা আমি মানি আর আমি যা মানবো সেটাই তোমার মানতে হবে এখন থেকে। আশা করি কোনরকম সাহস দেখিয়ে নিজের পায়ে নিজের কুড়াল মারবে না। মনে রেখো তোমার আন্টির দায়িত্ব আমার হাতে।
প্রানপ্রিয়া তাচ্ছিল্য হাসে, মুখ না খোলার জন্য কি ব্ল্যাকমেইল,,, বাকিটা আর বলতে পারেনা সে আচমকা দামিয়ান তার গলায় ঝুলানো স্কার্ফ টান মেরে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে এবং আস্তে আস্তে তার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
প্রানপ্রিয়ার ভেতরটা ধক করে উঠে, কি হবে তার সাথে এখন ভেবে অন্তর আত্মা কেঁপে ওঠে। তারমধ্যে গলায় পেঁচিয়ে রাখা স্কার্ফের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
দামিয়ান হাসে, ব্ল্যাকমেইল হাহ! দামিয়ান আবরার তার চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে পছন্দ করে। তোমার মুখ খোলা এরপর কে কি ভাবলো বা কি হবে এসবের দামিয়ান আবরার ভয় পায় না। আমাকে চিনতে শিখ লিটল বার্ড।
কথাটা শেষ করে সে স্কার্ফ এর পেচ আরো শক্ত করে।
প্রানপ্রিয়া চোখ বন্ধ করে ছটফট করে উঠে,

__ চিনেছি তো, একজন সাইকো চরিত্রহীন পুরুষ এটা কি যথেষ্ট নয়?
দামিয়ান চোখ তীক্ষ্ণ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ।
__ উপরওয়ালা আছে মিস্টার দামিয়ান আবরার। আজ আপনার দিন কোনো একদিন আমারও আসবে শুরু থেকে এ পর্যন্ত আগামীতেও আমার চোখ দিয়ে যে কয় ফোটা আপনি জল ফেলবেন আমি একদিনের সব শোধ করব।
দামিয়ান ধরে রাখা স্কার্ফ হাতে পেচাতে থাকে প্রানপ্রিয়ার কথা কানে নিয়েছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না।
সে ধীরে ধীরে তার দিকে আরো ঝুঁকছে।
প্রানপ্রিয়া নড়তে পারছে না তার চোখের কোণ দিয়ে বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
__ তোমার কথা ধার বেশ, কিন্তু তুমি কি জানো তোমার সাথে আজ কি হবে? তার ফিসফিস ধীর কন্ঠ। বিশ্বাস কর আজ আর কল্পনা মনে করবে না। সব বাস্তবে হবে। কিন্তু তার আগে আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই,,
বলো তুমি কার? ফিসফিস করে বলল
প্রাণপ্রিয়া কেঁদে ওঠে,
বলো বলছি, সে তার স্কার্ফের পেচ আরো আবারও শক্ত করে।

সে খলনায়ক পর্ব ৪১

__ আআপনার,
দামিয়ান তার গলার দিকে ঝুঁকে তার শরীরের সুবাস নেওয়া সাথে,
__ ছে এগেইন,
প্রানপ্রিয়া শব্দ করে কাঁদে,
__ আপনার,
__ এগেইন,
__ আপনার,

সে খলনায়ক পর্ব ৪৩