প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫২
নীতি জাহিদ
মোনার জ্বর সেরেছে, মাথার ব্যান্ডেজটাও খোলা হয়েছে। ইশানের পায়ের ক্ষতটা সারলেও হাত ভালো হয়নি। থেরাপি দিতে হয় রুটিন করে। কলেজে ক্লাস শুরু হয়েছে। কলেজ খোলার পরই অভিভাবক সভার তারিখ আজ পড়েছে। ইমরান দেশে নেই। মিনহাজের সাথে থাইল্যান্ড গিয়েছে। এবার মিনহাজকে একা ছাড়েনি। এদিকে মোনা চাইলেও যাওয়া সম্ভব হয়ে উঠছেনা কারণ তার এতদূর জার্নি করা নিষেধ। তবুও কিছুটা নিশ্চিত বাবার সাথে ইমরান সাহেব আছেন। নয়ন ফোন দিয়ে জানালো আজ অফিস যেতে। ইশানের কলেজ থেকে এরপর অফিস যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। নতুন মা হওয়ার অনুভূতি অন্যরকম। সেরকম খুব একটা পরিবর্তন আসেনি গত পনেরো দিনে। কপালের পাশটাতে কাটার দাগটা হালকা আছে।
এই পনেরো দিনের একাকিত্ব, পনেরো মাসের টনিকের মত কাজ করেছে। নিজের মাঝেই অন্য রকম একটা পরিবর্তন টের পেলো মোনা। সেদিনের দূর্ঘটনার দুদিন পরই ইমরান মিনহাজকে নিয়ে থাইল্যান্ড চলে যায়। ফেলে রেখে যায় একা মোনাকে পরিবারের কাছে। এই কটা দিন মোনা হেসেছে,কেঁদেছে, একা একা কথা বলেছে। পাশে ছিলোনা শুধু ইমরান। ও বাড়ি থেকে মায়া,সালমা,রিক্তা রুটিন করে আসে। মোনা কখন কি খাবে এই নিয়ে তাদের কি আয়োজন। আইরিন এবং তুশি সারাক্ষন খাওয়ানোর মাঝেই ব্যস্ত রাখে মোনাকে। মোনা বাধ্য মেয়ের মত সব করে এরপরো হাহাকার কমেনা। ইশান মায়ের মন ভালো করতে মায়ের প্রিয় বইগুলো কিনে আনে। বিকাল বেলা সোহান এবং ইশান গেম খেলে কখনো ক্যারাম তো কখনো ব্যাডমিন্টন। কিছুক্ষন আনন্দে থাকলেও যখন মনে পড়ে সময় পার হয়েছে অথচ ইমরান মোনার সাথে কথা বলেনা তখন বুকের বাম পাশটা চিনচিনে ব্যাথায় ভরে উঠে। চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। আলমারি থেকে একটা ঘিয়া রঙা জামদানী বের করলো। নিজেকে পরিপাটি সাজে সজ্জিত করে রওয়ানা হলো ইশানের কলেজে। বেশ অনেক দিন পর শাড়ি পরেছে। আগে শাড়ি পরেই ইমরানের গলা জড়িয়ে ধরে বলতো, আমায় কেমন লাগছে ইমরান সাহেব? আজ ইমরান সামনে থাকলেও মুখ ফিরিয়ে নিত মোনা জানে। এর চেয়ে না থেকেই ভালো হলো।
মোনা বের হওয়ার সময় আইরিন বলেছিলো,
– আজ তোকে অন্যরকম লাগছে মোনা।
– কি রকম আপা?
– একদম মা।
মোনা খানিকটা হাসলো। তবে মনে মনে ভাবলো, ‘কই আর মা হতে পারলাম। মা হতে পারছিনা বলে তোমার ভাইয়ের সেই কি রাগ!’ মাঝে মাঝেই মোনার মনে অসহায়ত্ব উঁকি দেয়। কাজে,কর্মে, দুষ্টুমিতে সায় দেয়া মানুষটা এখন দূরত্ব টেনে এনেছে।
আইরিন মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া পড়ে বললো,
– সাবধানে যাস।
কলেজের অডিটোরিয়ামের দিকে যেয়ে স্টেজের একপাশে বসলো। প্রতিটি শিক্ষার্থীর পরিবারের কেউ না কেউ এসেছে। মিনিট দশেকের মাথায় শিক্ষার্থীরা খুঁজে বের করলো অভিভাবকদের। ইশান এসে মোনার পাশে বসতেই মোনা হেসে বললো,
– তুমিও থাকবে?
– হ্যাঁ তো। আমাদের ও থাকতে বললো। মা তোমার সাথে আমার বন্ধুদের মায়েদের পরিচয় করিয়ে দিব আসো। মিটিং আরো পনেরো মিনিট পর হবে।
বারান্দায় বেশ কয়েকজন অভিভাবক দাঁড়িয়ে আছেন। ইশান মোনার হাত ধরে উনাদের সামনে গিয়ে সালাম দিয়ে বললো,
– আন্টি আমার মা।
কয়েকজন মোনাকে জড়িয়ে ধরলেন। হেসে হেসে সুন্দর করে কথা বলছেন। একজন তো বলেই উঠলেন,
– ভাবী আপনাকে দেখলে বুঝাই যায় না এত বড় ছেলে আছে।
মোনা হেসে বলে,
– আমি তো চাই ইন্টারের পর ছেলে বিয়ে করিয়ে দিয়ে শাশুড়ী হয়ে যাবো।
ইশান পাশ থেকে বলে,
– অসম্ভব। এত তাড়াতাড়ি আমি বিয়ে করলে তুমি নিস্তার পেয়ে যাবে। তুমি তো ছেলে বিয়ে করিয়েই দায়িত্ব শেষ করে বউয়ের হাতে আমাকে তুলে দিবে।
মোনাসহ বাকিরা হাসছে। ইশানের এক দুষ্টু বন্ধু বলে উঠলো,
– আন্টি আমাকে বিয়ে করানোর জন্য আম্মুকে রাজি করান প্লিজ। আমি বিয়ে করতে চাই।
বন্ধুদের মাঝে টুকটাক আলাপন। এর মাঝে একজন অভিভাবক প্রশ্ন করলেন,
– ভাবী খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে কি?
মোনা- ইশান একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে।ইতস্তত বোধ না করেই ইশান বলে ফেললো,
– আন্টি মা আমার স্টেপ মম।
সবাই চমকে উঠলো। সাথে সাথে বলে ফেললো,
– ভাবী স্যরি আসলে এভাবে কথাটা আপনাকে জিজ্ঞেস করা উচিত হয়নি।
মোনা খানিকটা হেসে বলে,
– ইটস ওকে ভাবী। ইশান আমারই ছেলে।
এর মাঝেই সবাই ভেতরে প্রবেশ করলো। অভিভাবকদের ফুল দিয়ে বরণ চলছে। মোনা ইশানকে নিয়ে সিটে বসতেই পাশের সিটে তাকিয়ে ইশান চমকে উঠলো। মোনার দৃষ্টি সামনে। ইশান হাত দিয়ে মাকে ডেকে বললো,
– মা দেখো…
মোনা সম্মুখ নজর সরিয়ে ইশানের কথায় মনোযোগ দিতেই চমকে উঠলো। ইশান মৃদু চিৎকার দিয়ে বললো,
– পাপা…
ইমরান ফোন থেকে চোখ তুলে মুচকি হেসে বললো,
– আসসালামু আলাইকুম, ইমরানপুত্র।
ইশান সালাম নিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। মোনা তাকিয়ে দেখলো বাবা-ছেলের বন্ধন। এই লোকটার চমকে দেয়ার ক্ষমতা মারাত্মক। পুরো প্যারেন্টস মিটিং টা সুন্দর ভাবে শেষ হলো। বের হয়ে ইশান বন্ধুদের বাবাদের সাথে নিজের বাবার পরিচয় করালো। সব মিলিয়ে আজ ছেলেটা দারুন খুশি। রোদ পড়ছে, মাথা ব্যাথা বেড়েই চলেছে। কলেজের গাছতলায় ছায়ার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মোনা। ইশানের একজন বন্ধুর মা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলো,
– ভাবী আপনার শাড়িটা সুন্দর কোথা থেকে নিয়েছেন?
– ভাবী শাড়িটা আমাদের তাঁতীর করা। আমার ডিজাইন।
– আপনি ডিজাইনার?
মোনা হেসে বলে,
– ডিজাইনার না ঠিক, তবে আমার শোরুমের সব প্রোডাক্ট আমি ডিজাইন করি।
– আপনার শো রুমের নাম কি?
– মোনালিসা।
– ইয়া আল্লাহ মোনালিসা আপনার? তাই তো আমি এতক্ষন বলছি আপনার শাড়ি, পার্স, জুতা সবকিছুই জামদানী কেনো? অন্য রকম আভিজাত্য। আমি আপনাদের শো রুমের বিশাল ভক্ত।
– ধন্যবাদ ভাবী। আপনি শো রুমে গেলে আমাকে জানাবেন।
– অবশ্যই।
অভিভাবকদের মধ্যে কয়েকজন ইশানকে কটু চোখে দেখতো স্কুল থেকেই। ইশান মা ছাড়া বখে যাওয়া ছেলে হবে। মিশতে দিত না বাচ্চাদের। তাদের সন্তানেরাও কলেজে ভর্তি হয়েছে। আজ ইমরান- মোনা দুজনকে একসাথে দেখে এদের মুখে যেন সমালোচনার খই ফুটেছে। কিছু মহিলা মোনার সুন্দর ব্যবহার নিয়ে প্রশংসা করছে, মোনালিসার শোরুম নিয়ে প্রসঙ্গও তুললো। পাশ থেকে একজন বলে ফেললো,
– ইশানের বাবার টাকা দেখে এই মেয়ে দ্বিধা বোধ করেনি বিয়ে করতে। শো রুম কেনো, পুরা মার্কেট কিনে দিলেও কি আসবে যাবে। দ্বিতীয় তো দ্বিতীয়ই থাকে।
ইশান মায়ের কাছেই যাচ্ছে। ওকে দেখতে পেয়ে সেই মহিলা হাতের ইশারায় ডেকে বললো,
– উনি কে ইশান? তোমার স্টেপ মম।
ইশান বিরক্ত হলেও প্রত্যুত্তরে বললো,
– জ্বি আমার মা।
– পরিচয় করিয়ে দাও। ডাকো উনাকে?
ইশান মনে মনে একছটাক বকে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। মহিলাকে শায়েস্তা করতে সকলের সামনে বললো,
– আন্টি আপনারা তিনজন ছাড়া বাকিদের সাথে মায়ের কথা হয়েছে। বাইরে এত গরম আজ। মা সচরাচর এত রোদে থাকেন না। শুধুমাত্র আমার জন্য আজ কলেজে এলেন। বাসায়, অফিসে তো সারাক্ষণ এসি থাকে। গাছতলায় বসে আছেন ছায়ার মাঝে। এতটুকু পথ হেঁটে আসাটা কষ্ট মায়ের জন্য। আপনি কষ্ট করে একটু পরিচিত হয়ে আসুন।
চমকে উঠলো সবাই এমন কথা শুনে। ছেলের কথাটা যেন অপমানে লাগলো মহিলার। বাকিরা ইশানের কথায় সায় দেয়াতে ওই তিনজন কিছু বললো না লজ্জায় পড়ে। ইশান পুনরায় বললো,
– আচ্ছা, আসুন আমার সাথে।
তিনজন ইশানের পিছু নিলো। ঘটনা কি ঘটে বুঝার জন্য পেছন পেছন এলো অন্যরা। মানুষ কৌতুহল প্রিয় প্রাণী। তাদের ধারণা আজ কিছু একটা হবে। মোনা হাতে ফোন নিয়ে নতুন আসা ডিজাইন গুলো দেখছিলো। গলা শুকিয়ে গিয়েছে। আইসক্রিমে একটা কামড় দিতে পারলে ভেতরটা শান্তি পেত। ইশানকে দেখলো অভিভাবকদের নিয়ে আসছে। বুঝতে পেরেছে হয়তো বন্ধুদের মা। মায়ের সামনে এসে বললো,
– মা, স্যরি বেশি কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পাপা স্যারের সাথে কথা বলছে। শেষ হলেই আমরা বেরিয়ে পড়বো। এত রোদ বুঝতে পারলে অবশ্যই আজ ছাতা নিয়ে আসতাম সাথে। মিনিমাম মতিয়া আন্টি বা রাবিয়া আন্টিকে নিয়ে আসতাম ছাতা ধরার জন্য।
ইশানের কথা শুনে মোনা হেসে বললো,
– পাগল ছেলে, লাগবে না ছাতা। আমি ঠিক আছি।
ইশান বললো,
– মা আন্টিরা তোমার সাথে কথা বলতে চায়।
মোনা,সালাম দিতেই বাকিরা সালাম নিলো। সেই মহিলা বলে উঠলো,
– আপনার নাকি গরম সহ্য হয়না ইশান বললো। আমি ভাবলাম আপনি কষ্ট করে এতদূর কেনো যাবেন তাই এলাম পরিচিত হতে। আমি ফারিসার মাম্মি।
– না না তেমন কিছুনা। শরীর টা একটু খারাপ। তাই ছেলে দুশ্চিন্তা করছে। ভালো আছেন?
– জ্বি। ভালো। দুশ্চিন্তা তো করবেই। ছেলের বাবা তো এখন আপনার। সেই সুবাদে ছেলেকে বাবা এবং স্টেপ মম দুজনের খেয়াল রাখতে হবে।
কথাটা কানে বাজলো। ইশানে দাঁত খিচে মুখ খুললো,
– আন্টি আপনি বার বার…
মোনা বাঁধা দিলো,
– ইশান…
নিজেই মহিলার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
– আসলে হয়েছে কি ভাবী, আপনি একটু ভুল করেছেন। ছেলের বাবাকে কব্জা করতে আগে ছেলেকে কব্জা করেছি। তাই ছেলের বাবা বাধ্য হয়ে আমার হয়ে গিয়েছে। এখন শুধু লাভ আর লাভ। ছেলেও আমার, তার বাবাও আমার। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রানী হয়ে গেলাম। আমি অনেক ভাগ্য করে বাবা ছেলে দুজনকে পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি আপনাদের দোয়ায়।
ইশান মুখ টিপে হাসছে। মাঝে মায়ের নিরবতা কেমন কুটে কুটে খাচ্ছিলো ভেতরটা। আজ মাকে নিজের সত্ত্বায় পেয়ে ভীষণ খুশি। আচমকা বলে উঠলো,
– মা একটু আগে আমাকে এক সিনিয়র ভাই বলছিলো,তোর আপু অনেক সুন্দর।
মোনা মুখে হাসি রেখে বললো,
– বলোনি যে ওটা আমার আপু না, মা।
– হ্যাঁ বলেছি তো।
ইশান হঠাৎ হাত দিয়ে কাকে যেনো ডেকে নিয়ে আসলো। সেকেন্ড ইয়ারের ছেলে সম্ভবত। সবাইকে সালাম দিতেই ইশান বললো,
– ভাই, আপনি যাকে আপু বললেন তার সাথে পরিচিত হবেন না?
ছেলেটা জিভে কামড় দিয়ে হাত জোড় করে বললো,
– স্যরি আন্টি আমি আসলে বুঝতে পারিনি।
– ঠিক আছে। ভালো আছো তুমি?
– জ্বি আন্টি।
পাশে একজন বলে উঠলো,
– তোমরা এখনকার জেনারেশন বড়দের সম্মান করতে জানোনা। মুখে যা আসে তাই বলো।
মোনা উনাকে বললো,
– ভাবী থাক, বাচ্চা মানুষ না বুঝে বলেছে। আমরাও এমন কথা বলে ফেলি। বাচ্চারা তো স্যরি বলে। বড়রা তো স্যরি বলা দূর মিনিমাম কার্টেসী টুকু জানেনা। সেদিক থেকে বাচ্চারা অনেক ভালো।
সকলে মোনার চেহারার দিকে চেয়ে আছে, কথার ইঙ্গিত টুকু স্পষ্ট, কাকে বলেছে,কেনো বলেছে। মোনাকে হালকা ভাবে নেয়া একদম বোকামী হবে । ইশান তখন বলল,
– ভাই, আসলে পাপার সম্পদ তো তাই আমাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। আমার পাপা আমার কাছে অনেক প্রেশিয়াস, আর মা তো জেম। বুঝতেই পারছেন।
ছেলেটা লজ্জায় মাথা নুয়ে বার বার বলছে,
– আমি ওভাবে বলতে চাইনি। আন্টি আমি এক্সট্রিমলি স্যরি।
মোনা হেসে বললো,
– ঠিক আছে। কোনো সমস্যা নেই। তবে তুমি খুব দুষ্টু স্বভাবের তাই না!
মোনার সহজ আচরণে ছেলেটা অবাক হয়ে হেসে উত্তর দিলো,
– মানে আন্টি একটু! মাঝে মাঝে বেশি দুষ্টুমি করে ফেলি।
মোনা হেসে বললো,
– কোনো সমস্যা নেই দুষ্টুমি করা ভালো। সবাই মিলে বাসায় এসো একদিন। ইশান তো তেমন দুষ্টুমি করেনা। তোমাদের পেয়ে যদি একটু করে। এছাড়া আন্টির হাতের চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে যাবে। আশা করি খুব ভালো লাগবে।
– অবশ্যই আন্টি।
ইশানকে নিয়ে আড়ালে এসে সিনিয়র, বন্ধু সবার মুখে একই কথা আন্টি যে রাগ করবে না এটা ওরা ভাবতেই পারেনি। ইশান কলার উঁচিয়ে বলে,
– আমার মা তো তাই।
ইমরানের ডাক পড়লো। মোনা অভিভাবকদের বাসায় দাওয়াত দিলো। ইশান বাসায় চলে যাওয়ার অনুমতি নিলো শিক্ষকদের কাছ থেকে। গাড়িতে উঠেই বাবাকে বললো,
– পাপা আজ বাইরে লাঞ্চ করি আমরা তিনজন?
ইমরান মাথা নেড়ে সায় দিলো। মোনা সিটে মাথা রেখে জানালার বাইরে চোখ রাখলো। ডান পাশের চোখের কার্নিশ ভিজে উঠলো। কনিষ্ঠার চাপে আলতো করে মুছে নিলো সেটুকু। ইশান বাবার সাথে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছে। মোনার না করা প্রশ্নটাও করে নিলো,
– পাপা নানাভাই কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ।
– নিয়ে আসো নি কেনো?
– ক্লান্ত ছিলো। বাসায় নামিয়ে দিলাম। শরীর এখনো অনেক দূর্বল। একটু বিশ্রাম নিক। পরে যেয়ে দেখা করে এসো।
– ঠিক আছে।
দু লাইন প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কথাই বলছে না। অথচ ছেলে সুখ দুঃখের সব আলাপ নিয়ে বসেছে। রবিন ও আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। গাড়ির এই ভরা আবহে অন্য একটি প্রাণী যে নিশ্চুপ হয়তো তার লক্ষ্যই হয়নি। পাশাপাশি বসে থাকা দম্পতির দূরত্ব আকাশসম। দুপুর একটা নাগাদ গাড়ি রেস্টুরেন্টে। ইশান সকলের পছন্দের খাবার অর্ডার দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। ইমরানের মনোযোগ ফোনে। মোনার চোখ নিবদ্ধ শূন্য টেবিলে। ইমরানের দিকে না তাকিয়ে মাথানিচু করে প্রশ্ন করেই ফেললো,
– বাবা কেমন আছে? আগের চেয়ে ইম্প্রুভ হয়েছে?
– আলহামদুলিল্লাহ।
পরাজিত সৈনিকের মত নত মাথা। প্রহর গুনছে ইশানের ফিরে আসার। নিজেদের মাঝে আজ দূরত্ব। সংকোচ বোধে মোনা স্যরি বলেনি এতদিনেও। অন্যদিকে ইমরানের মাঝে সম্পর্কে সমঝোতার কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। ইশান ফিরে এলো। দুপুরের লাঞ্চ সেরে ইশানকে বাসায় পাঠিয়ে মোনা এবং ইমরান অফিসের দিকে চলে আসলো। রাস্তা টুকু মনে হয়েছে অসীম, সমাপ্তিহীন। এতটা সংকোচবোধ মোনার কখনো হয়নি। লিফটে উঠার পর মোনা এক হাত দিয়ে লিফট ধরেছিলো। তেরো তলাতে লিফট থামে বরাবরের মতো। মোনার দুচোখে ক্লান্তি আর বিষাদ। সব কাজ সেরে বাসায় ফেরা প্রয়োজন। কোমড়ের এবং ঘাড়ের ব্যাথাটা বাড়ছে। প্রেগ্ন্যাসির সময়ের একেকটা জটিলতা একেকরকম। রেস্টুরেন্টে খাবারের পর এখন মনে হচ্ছে খানিকটা শুতে পারলে ভাল হতো। শরীর ঝিমিয়ে আসছে।তামান্না এসেছে মিনহাজের ডেস্কে। মোনা আপাতত সেখানে বসে পেপারগুলো সাইন করছে। তামান্নার পিছু পিছু বাকিরাও এলো। কিছুক্ষন গল্প করলো।চৈতি বললো,
– মোনা আজ তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে। কোথাও গিয়েছিলে?
মোনা অনিচ্ছুক হেসে বললো,
– হ্যাঁ আপু। ইশানের প্যারেন্টস মিটিং ছিলো।
– আচ্ছা, তোমার কি শরীর খারাপ?
– না আমি ঠিক আছি।
কিছুক্ষন গল্প করতেই সকলে বেরিয়ে গেলো। মোনার শরীর আর সইছে না। উঠে দাঁড়ায় ব্যাগ নিয়ে। ইমরানের কেবিনের সামনে এসে নক করতেই অনুমতি এলো ভেতরে যাওয়ার। ল্যাপটপে কাজ করছে ইমরান। মোনা ক্ষীন স্বরে বললো,
– আমার তো কাজ শেষ। বাসায় যাবো?
চোখ তুলে ইমরান মোনার দিকে লক্ষ্য করলো পনেরো দিনেই অনেক পরিবর্তন! মেপে মেপে কথা বলছে। শাড়িতেও আজ বেশ পরিণত লাগছে। ল্যাপটপ শাট ডাউন করে বললো,
– বসো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। একসাথে বের হব।
সোফায় মাথা এলিয়ে হেলান দিতেই মনে হলো রাজ্যের ক্লান্তি ছেয়ে এসেছে। চোখ লেগে গিয়েছে। ইমরান ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখতে পেলো মোনা ঘুমিয়ে পড়েছে। ফোন করে পিয়নকে বলেছিলো এক কাপ গরম দুধ নিয়ে আসতে। সেটা নিয়ে মোনার পাশে বসলো। ওর কপালে হাত দিতেই চোখ খুলে ফেললো মোনা। দু চোখে ক্লান্তি আর ঘুমের রেশ। হেলে পড়ছিলো মোনা। কাছে ঘেঁষে মোনাকে বুকে আগলে নিয়ে বললো,
– নাও একটু খাও।
ভেঙে ভেঙে বললো,
– বমি আসবে। পার বো না।
– পারবে। অল্প।
ঘুমের রেশ কাটেনি। ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখে হাতে দুধের কাপ। মোনার মনে হলো, স্বপ্নে ইমরানকে এত কাছে দেখছে। মোনা নড়েচড়ে বসতেই ইমরান একটু খানি দুধ মোনার মুখে দিলো। বাধ্য শিশুর মত মুখে নিলো। বুঝতে পারছেনা বাস্তব পৃথিবী এবং ঘুমন্ত জগতের তফাৎ কি? ঘুমের রেশের মাঝে ইমরান খাইয়ে দেয় সবটুকু। দুধ টুকু খাইয়ে ইমরান প্রশ্ন করলো,
– কিছুক্ষন পর যাবে? একটু ঘুমাবে?
ইমরানের প্রতিটি কথা কর্ণে ধ্বনিত হচ্ছে। ঘুমের কারণে কথা বাড়ানোর শক্তি নেই। মাথা নেড়ে কোনো রকম বুঝালো ঘুমাবে। কাত হয়েই ঘুমিয়ে পড়লো ইমরানের বুকে। এসির টেম্পারেচার সামান্য কমিয়ে ইমরান গায়ের ব্লেইজারটা মোনার গায়ে দিলো। সেন্টার টেবিল টেনে মোনার পা থেকে জুতা জোড়া খুলে দিলো। নতুন জুতা পায়ে দিয়েছে আন্দাজ করা যাছে। লাল হয়ে আছে পা দুটো। আলতো হাতে পায়ের তালুতে, পায়ে ম্যাসাজ করে দিচ্ছে। মোনা ঘুমে আচ্ছন্ন। কপালে উষ্ণ পরশ দিয়ে বুকের মাঝেই আগলে রাখলো স্ত্রীকে।
এর মাঝে মোনার ফোন বেজে উঠলেই ইমরান ধরলো। আইরিন বেশ অবাক হলো ইমরান এসেছে শুনে। ইশান বলেনি। সারপ্রাইজ দিবে তাই। ফোনে আইরিন জানালো আজ মোনার কিছু টেস্ট করাতে হবে। ইমরান ফাইল পাঠিয়ে দিতে বলে নিজেই ডাক্তার কাছে নিবে জানিয়ে বোনকে আশ্বস্ত করলো।
সুখের সময়ের পরিসর খুব কম। আনন্দে কেটে যায়। মোনার আজকের ঘুম শরীরের সব রকমের ক্লান্তি এক ঝলকে মুছে দিলো। চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলো ইমরানের বুকে। নড়েচড়ে উঠতেই ইমরান সাবধান করলো,
– আস্তে।
ইমরানের দিকে তাকিয়ে দেখে মোনার দিকে তাকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখ। মোনার পা দুটো তখন ইমরানের কোলে। হতচকিত হয়ে পা সরাতেই গেলেই মৃদু ধমক খেলো,
– মোনালিসা আস্তে কি হয়েছে?
আমতা আমতা করে বললো,
– স্যরি, আমি খেয়াল করিনি ঘুমের মাঝে।
– কেনো স্যরি? তোমার পা আমি তুলেছি। আমার মনে হলো ঘুমের মাঝে পা ব্যাথা করছে, টান লাগছে। বলেছিলে একবার। এটা খুব স্বাভাবিক। শরীরের ব্যাথা বাড়বে সময়ের সাথে সাথে। এখন ব্যাথা আছে?
– অনেকটা কম। আমি কি আপনাকে ঘুমে অনেক জালিয়েছি?
– না একদম জালাওনি। শরীর যখন এত খারাপ গাড়িতে বললে না কেনো? অফিসে না আসলেই তো হতো।
– মামা বললো সাইন লাগবে। কাজ পিছিয়ে যাবে তো।
– আচ্ছা। এখন উঠো। একটু ফ্রেশ হও। আমাদের হসপিটাল যেতে হবে?
মোনা বিস্মিত হয়ে বললো,
– কেনো কার কি হয়েছে?
– তোমার আজ টেস্টের ডেট আছে। ভুলে গেলে কি করে?
মোনা জিভে কামড় দিয়ে বলে,
– ইশ! একদম ভুলে গিয়েছি। কি যেন হয়েছে সব ভুলে যাচ্ছি।
– সব মনে রাখতে হবেনা। মনে রাখার জন্য আমি আছি। তাড়াতাড়ি যাও। রাস্তায় জ্যাম পড়তে পারে। বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিবে।
মোনা বের হতেই দুজন বেরিয়ে পড়লো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। মোনা গাড়িতেও কেমন যেন নিস্তেজ। ইমরান কাছে টেনে জিজ্ঞেস করলো,
– শরীর বেশি খারাপ লাগছে?
মাথা নাড়িয়ে জানালো ‘না’।
– তবে চুপ করে আছো যে?
– কথা বললেই ভুল করবো, আবার বকা দিবেন। আবার রাগ করবেন।
ইমরান গম্ভীর। মোনাকে কাছে ডাকলো। শক্ত করে ধরে বললো,
– কেনো রাগ করবো?
– আমি কথা বেশি বলি।
– কে বলেছে?
– নিজেই বুঝতে পেরেছি।
– বেশি বুঝবেনা। তুমি অবশ্যই কথা বেশি বলবে। আমার বাচ্চাটা কি গোমড়া হবে নাকি? আমি চাই তোমার মতো চটপটে হোক। নেচে লাফিয়ে বেড়াক।
মোনার মাথা নত। ইমরান মুখ তুললো আজলে। মোনা তাকিয়ে বললো,
– আমি তো বোকা।
– কে বললো! ঠিক সময়ে বুদ্ধি কাজে লাগাও কম। নতুবা ঠিকঠাক আছো।
– এখনো রাগ করে আছেন?
দীর্ঘশ্বাস ইমরানের। কিছু একটা ভেবে বললো,
– তোমরা যা করেছো সহজে কি রাগ পড়ার মতো?
– নাহ।
সিরিয়াস ভঙিতে ইমরান বলতে থাকলো,
– ইশানকে একা ছাড়তে চাওনি বা ওর নিরাপত্তার জন্য করেছো তাও মানলাম। কিন্তু আমার ছোট বাচ্চাটার কি দোষ! তোমাদের দুজনের ভুলের মাশুল ও কেনো দিবে? কিছু হলে আমি নিজেকে মাফ করতে পারতাম? ইশান যদি সেদিন একা বের হতো, বিশ্বাস করো আমি তোমার দিকে একবারো আঙুল তুলতাম না। কারণ আমি আগেই টের পেয়েছি ইশান এসব করছে। হাম্মাদ, সোহান, রবিন এবং সজীব সকলেই জানতো ইশান কিছু একটা করবে। তুমি থাকাতে সবাই ঘাবড়ে গিয়েছে। ইশানকে হ্যান্ডেল করাটা কঠিন না। তোমাকেসহ হ্যান্ডেল করাটা ওদের জন্য অস্বস্তিকর ছিলো। আল্লাহ সহায় হয়েছে তাই তোমরা আমার সামনে। যখনই শুনলাম সাথে তুমি আছো আমার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্সটিংক্ট বার বার বলছে ইমরান তুই সব হারাবি! কি আছে আমার তোমরা ছাড়া?
মোনার দুচোখে পানি। ইমরান চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
– যা হয়েছে অনেক হয়েছে আর কাঁদতে হবেনা। যেহেতু গত পনেরো দিন কষ্ট পেয়েছো আমার দ্বারা, তাই খুব স্যরি। তবে একথা একদম ঠিক নয়, কষ্ট দিয়েছি। এত ছুটোছুটিতে ছিলাম বাবাকে নিয়ে। বাসায় ফোন দিয়ে সবার সাথে কথা বলবো সেই উপায় ছিলোনা।
– হ্যাঁ শুনেছি আমি। আপা আর ইশান তো বলে যে আপনি জেদ করে কাউকে ফোন দেন নি।
– এটা ভুল ধারনা জেদ দেখাতে হয় সামনাসামনি। দূর থেকে জেদ দেখায় কাপুরুষ। আমি দূরে জেদ দেখাই না। অবশ্যই খোঁজ নিতাম পরিবারের। কিন্তু কেমো দেয়ার পর বাবার শরীর এত কলাপস করছিলো আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
– বাবা এখন কেমন আছেন?
– এখন আলহামদুলিল্লাহ স্ট্যাবল। হসপিটাল থেকে যাবে দেখে আসতে?
মোনা ঠোঁট প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলে,
– হ্যাঁ প্লিজ নিয়ে যাবেন?
ইমরান সম্মুখ গ্লাসে নজর রেখে মুচকি হেসে বললো,
– এভাবে হাসলে নিয়ে যাবো।
মোনা হেসে দিলো। ভেতরটা শান্তি পাচ্ছে। মানুষটার রাগ কমেছে।
গেটের কাছেই গাড়ি থামিয়ে দিলো ইমরান মোনার অনুরোধে। গাড়ি থেকে নেমে মোনা একাই ভেতরে ঢুকল। একপাশে দাঁড়িয়ে মাথার হিজাবটা খুলে নিলো। ইমরান পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির রাস্তা ছেড়ে বাগানে নেমে গেলো জুতা জোড়া একপাশে রেখে। সন্ধ্যা নেমেছে বহু আগে। হাওয়ার তেজ বেড়েছে। এক হাতে ব্যাগ, হিজাব। অন্য হাতে চুলের ক্লিপ টা খুলে দিতেই কেশরাজি কাঁধ বেয়ে নেমে এলো। বাতাসে কামিনীর গন্ধ শোভা পাচ্ছে। এলোমেলো হাঁটছে মোনা। পেছনে ইমরান। টুপ করে বৃষ্টির ছিটা পড়লো কপালে। চোখ বন্ধ করে মোনা বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব আমি চার বছর আগে এখানে বসে মিন্নির সাথে খেলতে খেলতে আপনাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলাম। মনে পড়ে?
মুগ্ধ হয়ে মোনাকে দেখছে ইমরান। মনে হলো যেন কন্যার ভেতরের বন্দি আত্মা আজ ছাড়া পেলো গহীন কারাগার থেকে। কেমন প্রজাপতির মতো খোলা আকাশে উড়ার সাধ অনায়াসে লুফে নিচ্ছে। অলকানন্দা ছিঁড়ে কানে গুঁজলো নিজেই। অপেক্ষা করেনি ইমরান গুঁজে দেয়ার। সেই চারবছর আগেও ছাদের গাছ থেকে অলকানন্দা ছিড়ে কানে গুঁজেছিলো।
কেউ একজন বলেছিলেন, সুন্দর সময় ফিরে আসে। আজ হয়তো সেই দিনটা।
বৃষ্টির ফোঁটা বাড়ছে। গলায় নমনীয়তা রেখে ইমরান বললো,
– ভেতরে চলো।
– উঁহু একটু পর।
– বৃষ্টি বাড়ছে। ক্ষতি হবে। সুস্থ হলে ভিজবে, বারণ থাকবেনা।
– আমি তো সুস্থ। মা হওয়া কি অসুস্থতা?
– না, মা হওয়া নিয়ামত। যা সবাই পারেনা। তবে আজ সুস্থ নও।
– আচ্ছা, আমি কি অযোগ্য মা?
ইমরান এগিয়ে এসে হাসলো শব্দহীন। মোনার ডান হাত ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। পুনরায় মোনার প্রশ্ন,
– বলুন না, আমি কি অযোগ্য?
বাড়ির ভেতর ঢুকে সিঁড়ির কাছে থামলো। সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হবে ভেবে কোলে তোলা। মোনাকে কোলে তুলে বললো,
– যোগ্যতার সংজ্ঞা মুখে প্রকাশ করা যায়না।
– তবে বুঝবো কি করে আমি কতটা যোগ্য, আমার তো মা নেই?
দরজার কাছে এসে মোনাকে নামিয়ে দিয়ে বললো,
– পুরোপুরি যোগ্য মা কিনা জানিনা, কারণ আমি নিজেও যোগ্য বাবা নই। যোগ্য বাবা হলে দুই সন্তানের নিরাপত্তায় আমারো ঘাটতি থাকতোনা। একটা কিছু ব্যবস্থা করতে পারতাম। সেটা করিনি তো। তাই যোগ্যতার সংজ্ঞা এক বাক্যে হয়না। তবে সন্তানের দিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে তুমি অর্ধেক যোগ্য। ইশানের মা হতে পেরেছো, ঔশানের পারোনি এখনো। হয়তো সে ধরণীতে আসলে পরিপূর্ণ মা হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
– আপনি এমন কাট কাট কথা বলেন কেনো?
ইমরান হেসে কলিংবেল চেপে বললো,
– মিথ্যা বললাম?
মোনা মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকালো। নুরজাহান বেগম দরজা খুলে নাতজামাই এবং নাতনীকে দেখে আনন্দে আটখানা। জড়িয়ে ধরলেন নাতনীকে। মামুন সাহেব এগিয়ে এলেন। ইমরানকে জড়িয়ে ধরলো। একে একে সবাই মহাখুশি ওদের পেয়ে। মোনা ছুটে গেলো বাবার রুমে। উপরের ইউনিটে আপাতত তালা। মিনহাজ এখানে থাকলেই সুবিধা। মা,বাবা,ভাই- বোনের যত্নে থাকবে। মায়ার হাসবেন্ড শহরের বাইরে গিয়েছে কাজে। তাই শ্বশুর বাড়িতে বলেছে কিছুদিন বাবার বাসায় থাকবে। ভাইকে যত্ন করতে চায় পাশে থেকে। কম কষ্ট তো পায় নি ভাইটা। মিনহাজ মেয়েকে পেয়ে খুশি হলো। প্রতিবার কেমো দেয়ার পর একেবারে দূর্বল হয়ে যায়। মোনা বাবার শরীরের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাবা যখন স্কুলে যেতাম, অনেকে বলতো মোনার বাবা অনেক স্মার্ট। মোনার বাবার চুল গুলো অনেক ঘন। মোনা বাবার ঘন কোকড়া চুল পেয়েছে। অথচ এখন আমার বাবার মাথায় চুল নেই। এখন আমার বাবা আর আগের মত শক্তিমান হয়ে ফাইট করতে পারেনা।
মিনহাজ হাসিমুখ রেখে বলে,
– মোনার দোয়ায় ইনশাআল্লাহ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। এখন মোনা কেমন আছে?
বাবার বুকে মাথা রেখে বললো,
– মোনা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।
– মোনার বাবার ছোট্ট পরী – নাতনীটা কেমন আছে?
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তবে বুঝলে কি করে নাতনী? নাতি ও তো হতে পারে।
– মন বলছে।
ইমরান পাশে বসে বাবা মেয়ের খুনশুটি দেখছে। মিনহাজ ইমরানকে ইশারা দিয়ে প্রশ্ন করলো,
– চুপচাপ কেনো?
– এমনি।
– কিছু বল।
– তোমাদের দেখছি।
– কি দেখছিস?
– ভাবছি তোমার মেয়েটাকে চ*ড় মা/রলাম, কিছু বললেনা। কেউ যদি আমার মেয়েটাকে চ*ড় মা/রে তবে আমি কিভাবে ধৈর্য্য ধরবো?
– পারবি যদি তোর মেয়েও একটা ইমরান পায়, যদি তোর মেয়েও স্বামীর অবাধ্য হয়ে নাতি-নাতনীর জীবনের ঝুঁকির কারণ হয় তখন আমি যা পারিনি তুই তাই পারবি। চ*ড় টা আমার মা/রা উচিত ছিলো। আমার জায়গায় হলে চ*ড় টা তুই মা/রতি। ইশানকে শাসন করার অধিকার যেমন মোনা অর্জন করেছে, মোনাকে শাসন করার অধিকার ইমরানের হাজার বার আছে। এখানে আমার আপত্তি করা সাজেনা।
ইমরান ইষৎ হেসে মাথা নাড়লো। মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আবারো স্যরি।
– ইমরান থাম। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার বলেছিস।
– বলা ভালো। কৈফিয়ত তো সবাইকে দি না। আর আমি সহজে মাফ চাইও না। তবে তুমি, আপা তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করলে অপরাধী হয়ে থাকবো নিজের কাছে।
– আমরা জানি তুই কি। আর বলতে হবে না।
মোনালিসার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনালিসা তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছো?
– কোনটা?
– যোগ্যতা। তোমার বাবা একজন যোগ্য বাবা।
মিনহাজসহ বাকিরা ইমরান মোনার দিকে কৌতুহলী হয়ে বুঝার চেষ্টা করছে ইমরান কি বুঝাতে চেয়েছে। মিনহাজ কিছুটা আন্দাজ করে বলে উঠলো,
– বাবা হিসেবে যোগ্য আমার চেয়ে তুই বেশি। নিজের ভুল বুঝতে পারার মত কাজ কজন পারে। আমাদের ইশান সেদিনের পর থেকে প্রতিদিন একটাই আফসোস করে যাচ্ছে, পাপাকে কষ্ট দিয়েছি। কিছুক্ষন আগে এসেছিলো সোহানের সাথে। আমাকে বললো- নানাভাই, আমার পাপা আমার কারণে এত কষ্ট পেলো, আমি নিজেকে মাফ করবোনা। আমার জন্য পাপার চোখে কষ্ট দেখেছি আমি। পাপা মাকে অনেক যত্ন করে, ভালোবাসে অথচ আমার ভুলের জন্য সেদিন মায়ের এমন অবস্থাতেও মা/রলো। আমাকে মাফ করে দিন।
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫১
ইমরান বিস্মিত হয় নি, হাসছে আনমনে। সে জানে তার শিক্ষা বিফলে যাবেনা। খানিকটা নড়বড়ে হয়, তবে সেই ভুল শুধরেও যায়। চরম ভাবে বিস্ময় নিয়ে মোনা তাকালো ইমরানের দিকে। কণ্ঠনালী শব্দ প্রেরণে এমনি বাঁধা দিলো যে মুখে রা শব্দটুকু উচ্চারণ হলোনা। মোনার মনে হলো শেখার অনেক কিছু বাকি এই মানুষগুলো থেকে। কখনো শিখেছে বাবার কাছে, কখনো বা ইমরান সাহেব আর আজ ইশান। মোনা শুকরিয়া আদায় করতে পিছ পা হয়না, তার পাশে থাকা প্রতিটি পুরুষ তাকে আগলে নেয় নিজের করে। দাদী মোনার মাথায় হাত রেখে বললো,
– আমি মন থেইকা দোয়া করি আমার নাতনীর লাইগা। সুখে থাকুক।
