Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৩

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৩

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৩
নীতি জাহিদ

রুমের মাঝে রঙ তুলির ছড়াছড়ি। গালে রঙ, হাতে রঙ। ইজেলে ক্যানভাস রেখে তুলির আঁচড় কাটছে একের পর এক। চুল গুলো সব গুছিয়ে মাথার ছাদে শঙ্খের কাঁটা দিতে আটকানো। এই কাঁটা কিনেছিলো কক্সবাজার থেকে। ইমরান কিছু বিশেষ জিনিস সেবার কিনে দিয়েছিলো। শঙ্খের কাঁটা, কাঠের আরশি, ঝিনুকমালা, ঘের ওয়ালা স্কার্ট। আজ সেই সব কিছুতে নিজেকে সাজিয়ে আঁকতে বসেছে সমুদ্রসৈকতের ছবি। ক্যানভাসে সমুদ্রের নীল সাদা জলরাশি যেন ফুটিয়ে তুলেছে বাস্তব প্রতিচ্ছবি। দু পা ছড়িয়ে ফ্লোরে বসে এই কাজ করছে। সারাদিন সবাই শুধু খেতে দেয়, শুতে বলে, কাজ করতে দেয় না। দেখতে দেখতে মোনার মা হওয়ার জার্নির পাঁচ মাস।

এই পাঁচ মাসে ইমরানের যত্নের কোনো ঘাটতি হয় নি। মোনার একেকটা খায়েশ একেক ভাবে সাধ্যের মধ্যে পূর্ণ করার চেষ্টায় আছে ইমরান। ইমরানের অনুপস্থিতিতে ইশান থাকে পাশে। ডাক্তার মোনাকে রুটিন করে মাঝে মাঝে হাঁটতে বলেছে। একেবারে শুয়ে বসে থাকাটাও ঠিক নয়। প্রায় ভোরে ইমরান জগিং করে এসে বাগানে মোনাকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটে গল্প করে, গাছের পরিচর্যা করে, আর পাশে শেপার্ডের সাথে দুষ্টুমি করে ইশান। মিন্নিকে মোনার জন্য আনা হয়েছে এই বাড়িতে। উড়ে উড়ে বেড়ায় পাখিটা। দেখতে দেখতে মিন্নিও আজ অনেক বছর। মোনা চেয়েছিলো উন্মুক্ত করে দিবে মিন্নিকে। খাঁচার দরজা খুলে দেয়ার পর মিন্নি উড়ে তো গেলোই না, বরং মোনার পিছে পিছে ঘুরে ”মুনিয়া – মুনিয়া ”করে। মায়ার মুখে শুনতে শুনতে মিন্নি মাথায় সেট করে নিয়েছে ‘মুনিয়া’ শব্দটা। আপাতত মোনার পাশে বসে রঙ করা দেখছে। রঙ করতে করতে কক্সবাজারের সুন্দর প্রতিটি স্মৃতি ভেসে উঠলো মনের কোণে। সেই রাত, ইমরানের ভালোবাসা, সমুদ্রে ভেজা। আজ পরনে ইমরানের কিনে দেয়া স্কার্ট আর একটা টপ। মেঝেতে বসতে বারণ করার সত্ত্বেও মাঝে মাঝে বসে। তবে আজ আইরিন সাহায্য করেছে। ইন্টারকমে কল দিয়ে রুবিনাকে ডাকলো। রুবিনা এসে উঠালো মেঝে থেকে। উঠে বললো,

– রুবিনা আপা, আজকে কি আমাকে একটু রান্না করতে দেবে?
রুবিনা দু হাতে না করে, পরপর দুবার দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,
– একদম না ম্যাডাম, কিছুতেই না। স্যার আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিবে। কি খাবেন তা বলুন। এনে দিচ্ছি।
– খাবোনা। বানাবো। ক্যাশিউনাট সালাদ।
– আমি করে দিচ্ছি।
– নো, আমি বানাবো। প্লিজ। তোমাদের স্যার জানবেনা। সব তোমরা করবে আমি ইন্সট্রাকশন দিব।
– না হবেনা।
– ইশান এসেছে?
– হ্যাঁ দশ মিনিট হচ্ছে।
এর মাঝে মোনার রুমে কড়া নড়লো। ইশান ঢুকে মাকে সালাম দিয়ে বললো,
– কি করছো মা?
– বাবা আমাকে একটু রান্নাঘরে নিয়ে চলো। তোমাদের বাবা-ছেলের পছন্দের ক্যাশিউনাট সালাদ করবো।
ইশান মৃদু ধমকে বললো,

– কোনো প্রয়োজন নেই। পরে করবে।
– আমার ভালো লাগছেনা রুমে। একটু রান্না করি। প্লিজ।
মায়ের আদুরে বাহানায় হার মেনে মাকে নিয়ে বের হলো। সিঁড়ি অবধি এসে মোনার হাত ধরে ইশান নামাতে চাইলো। দেখতে পেলো মোনার স্কার্ট এর জন্য পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে। মোনাকে কোলে তুলে নিলো। দেখতে ইশান বেশ বড়। বাবাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। মোনাকে কোলে তুলে নেয়া যেন এদের বাবা ছেলের কাছে পুতুল কোলে নেয়ার সদৃশ। স্কার্ট দেখে বকতে বকতে বললো,
– কি পরেছো মা এগুলো? মুড়িয়ে পড়বে। চাচী কে তো দেখতাম একটা ডানা ওয়ালা জামা পরতো।
ডাইনিংয়ে এসে মোনাকে নামিয়ে দিলো। বিকেলের নাস্তা রেডি করছে আইরিন। তুশি ইতুকে নিয়ে হাজির হলো। মোনা অবাক হয়ে তুশিকে বললো,
– তুশি আপু কি ডানা ওয়ালা জামা পরেছিলে তুমি ইতু হওয়ার সময়?
তুশি তব্দা খেয়ে বলে,
– ডানা ওয়ালা মানে? কি বলো ভাবী?
– ইশান বললো, তুমি নাকি ডানা ওয়ালা জামা পরেছিলে।
ইশান সবাইকে থামিয়ে বললো,
– থামো তোমরা, বুঝিয়ে বলি। চাচী ওই যে তুমি কেমন কতগুলো জামা পরেছো না? হাত মেললেই ডানা লাগলো। কিছুটা বাদুড়ের ডানা। একদম ঢিলেঢালা আরাম আরাম। ওগুলা মাকে পরতে বলছিলাম। এতে মা আর বোন দুজনই আরাম পাবে।
তুশি, আইরিন আর রুবিনা দু অধর আলগা করে তাকিয়ে আছে। ছেলে বলে কি বাদুড়ের ডানা! অকস্মাৎ রুবিনা অট্টহাসি দিয়ে বললো,

– ইশান ওটা কাফতান। বাদুড়ের ডানা না।
আইরিন এবং তুশি ও হাসছে৷ ইশান ভ্রু কুচকে বলে,
– কাফতান না ক্যাপ্টেন। ক্রিকেট খেলায় হয়, ডিফেন্স জবের ডেজিগনেশনে হয়৷ ঠিকঠাকভাবে বলো আন্টি। আর কাপড় চোপড়ের নাম কেনো ক্যাপ্টেন হবে। ওটার নাম ডানাওয়ালা জামা।
মোনা হাসতে হাসতে পেট ধরে চেয়ার টেনে বসলো। ইশানকে থামিয়ে বললো,
– বাবা থাম, আমাকে একটা ডানাওয়ালা জামা কিনে দিস ওটা পরবো। এরপর সারা ঘর ডানা মেলে মিন্নির মতো উড়বো।
– মজা নিলে মা?
মোনা মুখ দিয়ে হাসি চেপে দু পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– একদম না। এত বড় স্পর্ধা আমার নেই।
ইশান চাচীর দিকে তাকিয়ে বলে,
– তোমার ডানাওয়ালা জামা কই পাওয়া যায়?
তুশি হাসতে হাসতে বলে,
– অনলাইনেও পাবে, শপেও পাবে।
– আমার নামে মাকে দেখিয়ে কয়েকটা অর্ডার দিও তো। আমি তো এসব চিনিনা। আর রুবিনা আন্টি খবরদার এসব জামাকে বাইরে ক্যাপ্টেন বলবানা। লোকে হাসবে।
আইরিন থামিয়ে বলে,

– ওরে বেকুপরে ক্যাপ্টেন না, ওটার নামই কাফতান। শাড়ি, থ্রিপিছ, জিন্স, টি শার্ট যেমন পোশাকের নাম তেমন কাফতান ও পোশাক। এটা প্রাচীন পোশাক। ফার্সিতে প্রচলন হয়েছিলো। সুতি বা লিনেনের কাফতান গরমে বেশ আরামদায়ক। মাঝে মাঝে আমিও পরি। আগে তো নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও পরতো। এখন যুগের পরিবর্তনে শুধু নারীরা পরে। বুঝতে পারলি?
ইশান নাক মুখ কুচকে বলে,
– পোশাকের কি আকাল পড়েছিলো যে এসব কাপড় পুরুষ পরতো? কেমন লাগবে ভাবো আমি যদি এই পোশাক পরি?
মোনা হাসতে হাসতে বলে,
– বেসম্ভব চমৎকার। ইশান ডানা মেলে উড়ছে ডানাওয়ালা পোশাক পরে। ব্যাটম্যান ইশান উইদ উইংস।
– মা… লাগবেনা? প্লিজ। আর আমাকে নিয়ে ভেবোনা মনে মনে। কেমন বিচ্ছিরি লাগবে ওই যে এখন ভাইরাল ভাইয়া আক্তার আপুগুলার মতো লাগবে। আমি এই সাধারণ ডেনিম আর টিশার্টেই ভালো। তবে তোমাকে আমি কটা কিনে দিচ্ছি কেমন? পরবে হ্যাঁ। আমার ভালো লাগবে তুমি পরলে।
– অবশ্যই পরবো বাবা।

ইশান নুডুলস বাটিটা টেবিল থেকে তুলে সোফায় বসে টিভি দেখায় মনোযোগ দিলো। এদিকে তুশি,আইরিনরা ডাইনিংয়ে ইশানকে নিয়ে হাসাহাসি করতে ব্যস্ত। এর মাঝে ইমরান চলে এসেছে। আইরিন বকাবকি করছে, মোনা কেনো রান্না করছে তা নিয়ে। ফ্রেশ হয়ে এসে ইমরান টেবিলে চেয়ার টেনে বসে বোনকে ইশারায় বারণ করছে। মোনা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে ইমরানকে দেখে খানিকটা ভীত হয়ে বললো,
– শুধু আজকে?
ইমরান মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললো,
– ঠিক আছে করো।
মোনা পুনরায় নিজের কাজে লেগে পড়লো। এদিকে আইরিন ভাইয়ের কাছে এসে বললো,
– বাড়িতে কি কাজের মানুষের অভাব। ও কেনো কাজ করবে?
– আপা করুক। যা করতে চায় দাও। কষ্ট হয় এমন কিছু না করলেই হলো। সারাদিন শুয়ে বসে থাকতে থাকতে হয়তো বিরক্ত।
কিছুক্ষনের মাঝে খাবার রেডি করে মোনা টেবিলে দিলো। ইমরান খেতে খেতে আড়চোখে মোনাকে দেখছে। আগের চেয়ে অনেকটা স্বাস্থ্যবান লাগছে। গাল গুলো ফুলেছে। স্কার্ট পরাতে চেহারায় বাচ্চামো ভাব ফুটেছে। দূর থেকে দেখলে মনেই হবেনা যে অন্তঃসত্ত্বা। সহসা চোখ গেলো মোনার ডান গালের তুলির আচড়ের রঙে। দেখতে বেশ আদুরে লাগছে। নয়ন আর রিক্তা আসার কথা আজ। ইমরানের পাশের চেয়ার টেনে বসে মোনা আনন্দের সাথে বললো, একটা ম্যাজিক দেখবেন? ইমরান থতমত খেয়ে গেলো। ইশান শুকনো ঢোক গিলে বললো,

– মা আবার ম্যাজিক?
মোনা মাথা নেড়ে বললো,
– এটা সেই ম্যাজিক নয়। দেখোই না।
এর মাঝে নয়ন এবং রিক্তা এসে যোগ দিলো। ইমরানের অন্য পাশে নয়ন বসলো। মোনা রাবিয়াকে বলে একটা বাটিতে দুটো ডিম এনে ইমরান এবং ইশানের সামনে দিলো। ইমরানকে বললো,
– একটা তুলুন তো ইমরান সাহেব।
ইমরানের কাছে ব্যাপার টা ঘাপলার মনে হলো। তবুও স্ত্রীকে খুশি করতে যেই না ডিমে হাত দিলো। ডিমটা জেলির মতো লাগলো। মনে হলো কোনো তুলতুলে বল। এই প্রথম এতটা ঘাবড়ে গিয়ে বাটি থেকে হাত সরিয়ে নিলো জোর আওয়াজে বললো,
– হোয়াট’স দিজ?
ভারী আওয়াজে ডাইনিংয়ের বাকিরাও চমকে উঠলো। ইশানকে সাধতেই ইশান ভয়ে পিছিয়ে বলে,
– মা, পাপার কিছু একটা হয়েছে। আমি ধরলে ডিম কামড়ে দিবে।
নয়নের দিকে বাটি এগুতেই নয়ন মানা করলো। ইমরান বিস্ময় নিয়ে মোনাকে দেখছে। জোরাজোরির পর নয়ন ধরলো। ধরার পর লাফিয়ে চেয়ার থেকে উঠে বললো,

– আল্লাহ আল্লাহ এটা কি?
মোনা ভয় লাগিয়ে সবাইকে বললো,
– এখন এখান থেকে একটা আলাদীনের দৈত্য বের হবে।
এর মাঝে ইমরান হাত নাকের কাছে নিয়ে দেখলো গন্ধটা ক্যামিকেল টাইপ। একটু জিহবা দিয়ে টেস্ট করলো। ভীষণ অবাক হলো। এই মেয়ের মাথায় এসব এলো কি করে! মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনালিসা, এসব দুষ্টুমি কি আগে করেছো কখনো?
মোনা দু পাশে মাথা নেড়ে বলে,
– একদম না এই প্রথম।
ইমরান কপালে হাত দিয়ে বললো,
– বুঝছি। ইনশাআল্লাহ যে আসবে সে আমার মাথার চুল গুলো রাখবে না। এত বছর যা করোনি এখন কেনো এই বিচ্ছুপনা করতে হচ্ছে? কাজের কি অভাব পড়েছে?
নয়ন ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলে,
– কি ছিলো এটা? ডিমের মতো কিন্তু ডিম না। কেমন নরম, তুলতুলে৷
ইমরান হতাশ গলায় বললো,

– ডিমই ছিলো। ভিনেগারে ডুবানো। কালকে থেকে হয়তো ডুবিয়ে রেখেছে। চব্বিশ ঘণ্টা রাখতে হয়। তাই বাটিতে ডিম ধরার পর ডিমের খোসাটা নরম লেগেছে। কারন খোসা ক্যালসিয়াম কার্বনেটের তৈরি আর ভিনেগার হল অ্যাসিটিক এসিড। অ্যাসিটিক এসিড, ক্যালসিয়াম কার্বনেটের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। ভিনেগার ডিমের খোসার ক্যালসিয়াম দ্রবীভূত করে কিন্তু খোসার পর্দার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে পারে না । এর ফলে রাবারি পর্দা তৈরি হয় যা ডিম ভাঙা ছাড়াই লাফিয়ে উঠতে সাহায্য করে। তুই এখন এই ডিম দিয়ে বাউন্স করতে পারবি।
উপস্থিত সকলের কপালে চোখ। মোনা সব কটা দাঁত দেখিয়ে হাসছে। ইমরান অসহায় চোখে তাকিয়ে বললো,

– আর কি কি প্ল্যান আছে?
– আপাতত আর কিছু না। এমনি দেখালাম। শিখে মজা লেগেছে তাই।
ইশান এগিয়ে এসে ডিম তুললো। এবার সে বেশ মজা পাচ্ছে। খুশি হয়ে মাকে বললো,
– মা আমাকে শিখিয়ে দিও তো বেশ মজার এক্সপিরিমেন্ট।
– কোনো দরকার নেই। মোনালিসা বুঝতে পারছো, তোমার এসব দুষ্টুমি বেবি শিখবে। মানে কেনো মাথাটাকে এসব দুষ্টু কাজে ব্যস্ত করছো?
– আমি সারাদিন কি করবো?
– যা ইচ্ছে করো তবুও প্লিজ এসব না।
– সত্যিই তো যা ইচ্ছে তাই করবো?
– না। আবার মাথায় কি গোলযোগ পাকাচ্ছো?
– শুধু আপনাকে জালাবো চলবে?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
– ঠিক আছে। জালিও তবুও এসব করোনা। কখন কি দূর্ঘটনা ঘটাবে বলা যায় না?

বাগানে হাঁটছে দুজন। ইমরান বেশ কিছুদিন হচ্ছে জমিদার বাড়ির সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করেছে। এত বড় জমিদার বাড়ি ধূলিসাৎ করা কম কথা ছিলোনা। ভেবেছিলা ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে রেখে দিবে কিন্তু এই জায়গা ভয়ংকর হয়ে উঠে রাত্রিতে। কারো জীবনের কোনো ঝুঁকি না নিয়েই মাটির সাথে মিশিয়ে বিস্তীর্ণ বিরান ভূমিতে পরিণত করলো। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সেখানে ড্যানিয়েলের কোনো অস্তিত্বই ছিলোনা। দুনিয়াতে মানব জীবন ক্ষনস্থায়ী। ভালো খারাপ সব কিছুর পুরস্কার পরকালে যেমন আছে, তেমনি এই পৃথিবীতেও আছে। সে কথা কিছু অধম বুঝেও না বুঝার ভান করে জীবনটাকে পাপাচারে ভরিয়ে তুলে। ফলস্বরূপ ইহকাল এবং পরকাল দুইই হারায়৷ নয়ন ঘোর ভাঙিয়ে প্রশ্ন করলো,
– ওখানে কি কিছু করবি ভাবলি ?
ইমরান চিন্তিত গলায় বললো,
– ইন্ডাস্ট্রি বা ফ্যাক্টরি কোনো কিছু করতে মন সায় দিচ্ছেনা। যাই করবো ভাবি মন পিছিয়ে যায়।
– তবে, এভাবে পড়ে থাকবে?
– নাহ একটা উপায় আছে।
– কী সেটা?

– মোনালিসার একটা ফুলের রাজ্যের শখ ছিলো। ভাবছি দেশী বিদেশী বিভিন্ন জাতের ফুল চাষ করবো। সেই ফুল দিয়ে নাহয় একটা নতুন বিজনেস করলাম। অন্তত কাজে লাগবে আর এখন ফুলের বিজনেস ভালো। ফুল এমন একটা জিনিস সবাই পছন্দ করে। উৎপাদন বেশি হবে, মূল্য কম হবে। কি বলিস?
– আইডিয়া দারুণ। কাজে লাগিয়ে দেখতে পারিস।
দু বন্ধুর আলাপের মাঝে সুখ দুঃখের বিষদ আলাপ চলছে। আচানক নয়ন বললো,
– সেদিন কাঁকনকে দেখলাম জানিস। আমাকে প্রশ্ন করলো মোনা কেমন আছে? স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম। মনে হয় শুনেছে মোনার ব্যাপারে। বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
ইমরান মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
– পরিবর্তন হলে তো ভালোই।
বাগান ছেড়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করছে দুজন। ইমরানের মনে পড়েছে গত পরশু কাঁকনের সাথে দেখা হয়েছে রেস্টুরেন্টে। মিটিং শেষে বেরিয়ে যাবে তখনই দেখা হলো এলিভেটরে। ইমরানকে অভিনন্দন জানালো বাবা হওয়ার জন্য। এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলো,
– ইমরান, মোনাকে কি আমার চেয়ে বেশি যত্ন করো?
ইমরান কথা বাড়ায় নি। ততক্ষনে লিফট গন্তব্যে পৌঁছলো। ইমরান বের হয়ে প্রত্যুত্তরে বললো,
– তুমি যত্নটা পেয়েছো আমার বড় সন্তানের জন্য। মোনালিসা যত্ন পায় আমার বর্তমান সন্তান এবং তার নিজের জন্য। বাকিটা বুঝে নিও।
পেছন ফিরে চায়নি ইমরান। জানে কাঁকনের সহ্য ক্ষমতা নেই এই কথাটুকু সইবার। ইমরানের কাছে এই ব্যাপার বলতে বেশ সহজ হলেও, কাঁকনের কাছে শুনতে সহজ ছিলোনা।

বাবার সাথে কথা শেষ করে কিছুক্ষন গাল ফুলিয়ে বসে আছে। অনেকক্ষণ হলো ইমরানের জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো আসছেনা। বিকেলের পেইন্টিং টা শেষ হয়েছে। ইমরানের এসব জিনিসে অনেক শখ। মাঝে সাঝেই মোনা আঁকায়, ইমরান যেটা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে সেটা স্টাডি রুমে লাগিয়ে দেয়। দরজা দিয়ে ইমরান ঢুকতেই মোনা বলে উঠলো,
– এতক্ষন কোথায় ছিলেন? আমি অপেক্ষা করছিলাম। দেখুন পেইন্টিং টা কেমন হয়েছে?
ইমরান এক কথায় জানালো,
– খুব সুন্দর।

মোনা কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে মন খারাপ করে আয়নার সামনে বসে সাজগোছ করছে। ইমরান ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় বসে মোনার কান্ড দেখছে। মুখ চেপে হাসছে। এত রাতে লিপস্টিক কেনো লাগাচ্ছে! গত চার পাঁচ মাস তো ইমরানকে কাছেও ঘেষতে দেয় নি অদ্ভুত সব অজুহাতে। ইমরান নিজেও চেয়েছে মেয়েটা ভালো থাকুক। সারাক্ষন আতঙ্কে থাকে।গতমাসে রাতে অফিস থেকে আসার পর হালকা ফ্রেশ হয়ে ইমরান ঘুমিয়ে পড়েছিলো। রাতের তিনটা বাজে হুঁশ হলো। উঠে দেখে পাশে বসে প্যাচ প্যাচ করে কান্না করছে। ধড়ফড় করে উঠে প্রশ্ন করলো,
– কি হলো মোনালিসা কাঁদছো কেনো?
ফুফিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে বলে,
– আজকে আপনি রাতে গোসল করেন নি কেনো, আপনার শরীর থেকে পারফিউমের গন্ধ আসছে। আমার বমি বমি লাগছে আবার মাথাও ব্যাথা করছে। ভেবেছিলাম আজ আপার কাছে শুবো কিন্তু আপনাকে না ধরে তো আমি ঘুমাতে পারিনা।
ইমরান বিস্মিত হয়ে বললো,

– মোনালিসা এই পারফিউমটা তুমি আমাকে উপহার দিয়েছো? এটাতেও গন্ধ লাগছে?
– হুম।
– বাকি গুলো তো সব তুমি স্টোরে রেখেছো। এখন থেকে কোনটা লাগাবো তাহলে?
– কিচ্ছু লাগানো লাগবেনা। আমি আপনাকে মেরিল লোশন লাগিয়ে দিব। ওটার স্মেল সুন্দর। ওটা আমি লাগাই।
– আচ্ছা আর কিছু?
– হুম আপনাকে জংলী লাগছে। মুখের দাঁড়ি গুলো শেপ নষ্ট হয়েছে। আমি জড়িয়ে ধরে গাল লাগাই আপনার গালে আমাকে ব্যাথা দেয়। সাইজ করে সুন্দর করে কাটেন না কেনো?
কাজের চাপে বেশ কিছুদিন নিজের প্রতি খেয়াল রাখা হয়নি। তবুও এতটা অগোছালো লাগছেনা যতটা মোনা বলছে। সারা রাত ঘুম হয়না। মাঝে মাঝে মোনার পেট ব্যাথা উঠে যার কারণে আতঙ্কে থাকে। এখন মোনার এসব কথা শুনে মুখের বুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো মধ্য রাত। চুপচাপ খাট থেকে উঠে গলায় তোয়ালে নিয়ে গোসল করতে চলে গেলো। ওয়াশরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখলো। আয়নার দিকে তাকাতেই মনে হলো আয়নার ভেতরের ইমরানটা হেসে বলছে,

– কিরে ইমরান, কেমন লাগছে! মেয়েটাকে কষ্ট দিয়েছিলি না চার বছর আগে? এখন বুঝ।
মন চাইছে আয়নাটা ভেঙ্গে ফেলতে। ফোস করে দম ছেড়ে নিজে নিজে বিড়বিড়িয়ে বললো,
– আমার খুব ভালো লাগছে। আমার বউ আমাকে জালাচ্ছে তাতে তোর কি?
আচানক মনে হলো, দুশ্চিন্তায় মাথা এলোমেলো হয়েছে। আয়নার সাথে নিজে নিজে কথা বলার মানুষ ইমরান নয়। মানুষের সাথে বেশি কথা বলা এড়িয়ে চলে অথচ আজ সে আয়নার সাথেও কথা বলছে। ট্রিমার নিয়ে দাঁড়ি গুলো শেপ করে কে/টে, ভালোভাবে গোসল করে বের হলো। বার বার তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে গন্ধ শুকে দেখছে পারফিউমের গন্ধ আছে কিনে। নতুবা আবার পাঠাবে গোসলে। ইমরানকে বের হতে দেখে মোনা এগিয়ে এসে নাক টানলো। মুখে হাসি নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো,
– এখন পারফেক্ট। আসুন আমাকে বুকে নিন। এবার আমরা ঘুমাবো। পারফিউমের লাগানোর প্রয়োজন নেই। বেবি লোশনটার স্মেল ভালো।

ইমরান ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
– আচ্ছা।
– লাগাবেন?
– অবশ্যই।
প্রায়শই এমন অদ্ভুত কাজের সাক্ষী ইমরানকে হতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে বেশ উপভোগ করে। নিজে নিজে হাসে। ভাবনাচ্যুত হলো আপাতত। মোনা সাজগোজ শেষ করে কাছে এসে বললো,
– আমাকে আজ কেমন লাগছে?
– অনেক সুন্দর। কিন্তু এত সেজেছো যে রাতে? রাতটা কি আমার?
– হ্যাঁ সব রাতই তো আপনার। আজ অবশ্য আমি সব আপনার দেয়া উপহার পরেছি। দেখুন আমাকে কি সুন্দর লাগছে। বারবি বারবি তাই না?
– হুম খুব।
– এখন আপনাকে একটু আদর করে আমি ঘুমাবো। আমার চুলে বিলি কেটে দিবেন।
ইমরান ঠোঁট কামড়ে হাসছে। সেই হাসি দেখে মোনা বলে উঠলো,
– ইমরান সাহেব?
– হুম…
– আপনি কি স্বপ্ন দেখছেন? আমি কিন্তু আপনার দু গালে দুটো ছোট্ট আদর দিবো বলেছি এর বেশি কিছু না।
ইমরান হঠাৎ করে জোরে অট্টহাসি দিতে দিতে বলে,
– মোনালিসা, আমার জীবনের বেস্ট সময়টা আমি কাটাচ্ছি বিশ্বাস করো। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার মেয়েটা তোমার কপিক্যাট হবে। তুমি নিজে নিজে কেনো এতদূর ভাবছো? আমি কি তোমার কাছে কিছু চেয়েছি?
মোনা লজ্জা পেয়ে বিড়বিড়িয়ে বললো,

– আপনাকে আমি অনেক জালাচ্ছি আমি জানি। কিন্তু আমি এমন না।
– আমি জানি তো এসব।
ইমরানের কোলে উঠে বললো,
– আজ আমার অনেক মন খারাপ ছিলো তাই সারাদিন এমন পাগলামি করেছি।
– কেনো মন খারাপ, আমার কোনো ত্রুটি?
– না কাঁকন আপা ফোন দিয়ে বলছিলো নিজের যত্ন রাখতে। ইশানকে আর আপনাকে দেখে রাখতে। আমি অনেক ভাগ্য করে আপনাকে পেয়েছি। তখনই আমার কষ্ট লাগছিলো এই ভেবে যে এক সময় তো উনাকে অনেক ভালোবাসতেন, উনাকে ভুলে কি আমাকে মন থেকে ভালোবাসতে পারছেন? আমার এখনের অবস্থা কি আপনাকে ইশানের জন্মের সময়টাকে মনে করিয়ে দেয় না?

ইমরান নিশ্চুপ। মিথ্যা বলবেনা। মনে করিয়ে দেয় অনেক স্মৃতি- বিস্মৃতি। তখন যা সাধ্য ছিল কাঁকনের জন্য সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছে। চেয়েছে ইশানের জন্য হলেও সংসার টিকিয়ে রাখতে। সেদিন কাঁকন ভালোবাসা পায়ে ঠেলে দিয়ে স্বামী সন্তান ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। বুকের মাঝে কষ্ট গুলো দলা পাকিয়ে থাকে। সেই কষ্ট থেকেই নতুন ইমরানের সৃষ্টি। মোনার মাথা বুক থেকে উঠিয়ে কপালে আদুরে স্পর্শ দিয়ে বললো,
– ইশানের বাবা ইশান ব্যতীত সব ভুলে গেছে। ঔশানের বাবা তার মাকে বুকে আগলে রেখে সারাজীবন ভালোবেসে যেতে চায়। কয়লা পুড়ে হীরা হয় তোমার ইমরান সাহেব পুড়তে পুড়তে এখন হীরার মত পাথর হয়েছে। হীরার মূল্য যতক্ষন তুমি দেবে ততক্ষন। প্রকৃতপক্ষে হীরা পাথর ব্যতীত কিছুই নয়। কাঁকনের কাছে ইমরান পাথর ছিলো তাই ছুড়ে ফেলেছে। তোমার কাছে ইমরান কোহিনূর তাই মাথার তাজ করে রেখেছো। ইশানের জন্মের সময়টা আমি যতটা খুশি ছিলাম এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ। কারণ আগে আমার এক সন্তানের খুশি ছিলো এখন দুই সন্তানের। বুঝলে?
মোনা হেসে বলে,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫২

– আমি বোধ হয় এইজন্য বার বার আপনার প্রেমে পড়ি।
– হতে পারে, আর আমার বোধ হয় এজন্য বার বার আদর করতে ইচ্ছে করে। এই যে আরো বেশি আদুরে হচ্ছো।
” প্রিয় মোনালিসা,
রাত কেটে যাক, না ঘুমানো চোখ
জেগে থাকি পাহারায়, প্রহর নামুক
ঘুমাক না হয় মায়াবী দু চোখ,
রাত্রির শুকতারা মাটিতে খসুক।”

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৪