Home প্রিয় মোনালিসা প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৪

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৪
নীতি জাহিদ

বাগানে পানি জমেছে বৃষ্টির। রাবিয়া এবং মতিয়া কাজে ব্যস্ত পানি সরাতে। আইরিন ওদের বকাবকি করছে। পুঁই শাক গাছ লাগিয়েছিলো শখ করে। গাছ টা বেশ বেড়েছে। ইমরান খুব পছন্দ করে খায় পুঁই চিংড়ি রান্না করলে। গত রাতের ঝড়ো হাওয়া, বৃষ্টির পানি লতাগুলোকে এলোমেলো করে দিয়েছি। জোয়াদ্দার ঝাড়ু দিচ্ছে বাগান। ইশান কলেজ থেকে এসেই নেমেছে ফুফির সাথে কাজে। হাঁটু অবধি প্যান্ট গুটানো। বারান্দা থেকে মোনা দেখছে তুশির সাথে। তুশি বললো,
– ভাবী আমার ও নামতে ইচ্ছে করছে। ইতুটার জন্য পারছিনা।
মোনা মুখ গোমড়া করে বলে,
– আমার তো রীতিমতো পানিতে গিয়ে ঝাপাতে মন চাচ্ছে। কপাল খারাপ আমাদের। দুজন দুই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছি। কি আর করা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখো। এটাই কাজ আপাতত।
ইশান মা চাচীকে হাত নাড়িয়ে ইশারা দিয়ে বলছে,
– মা, চাচী নামবে?
দুজনই সবকটা দাঁত দেখিয়ে হি হি করে মাথা নেড়ে বলছে,
– নামবো, আসি?
আইরিন দিলো এক কড়া ধমক,

– চুপ, ওখানে দাঁড়িয়ে থাক দুটো। এখানে কি তোদের ফুচকা, চটপটির দোকান দিয়েছি যে নেমে খেয়ে যাবি? ওখান থেকে দেখ। জোঁক, কেঁচো ও আছে। এগুলা বৃষ্টির আবদ্ধ, তোমরা আনন্দ করে লাফানোর মত পানি না। পরে এলার্জি হবে।
দুটো মুখ গোমড়া করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে নিচের অবস্থা দেখছে। এর আগে এত পরিমান পানি বাগানে জমেনি। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকার সত্ত্বেও এত পানি জমলো কি করে তার হদিস মিলছেনা। অবস্থা এমন যে কেউ দেখলে ভাববে পানি ঢেলে দিয়েছে অথবা বাগানে বন্যা হয়েছে। সোহান আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছে। বেচারা আসার পর থেকে মায়ের ধমক খেয়ে যাচ্ছে। বাগানের সব আগাছা তাকে দিয়ে পরিষ্কার করাচ্ছে। জোয়াদ্দার ছুটে এসে বলে,

– খালাম্মা, আমাগো পানি সরনের লাইন তো ফরিষ্কার তয় এত পানি জমলো কেমনে?
ইশান, সোহান ও এগিয়ে এসে সায় দিচ্ছে সেই কথায়। সপ্তান্তে সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে সকলে মিলে। আইরিন কোঁমড়ে ওড়না পেঁচিয়ে সবাইকে বলে তাকে অনুসরণ করতে। বাড়ির পেছন দিকে আইরিনের লাউ,কুমড়ার মাচা। সেখানে খুব ভালো সবজির ফলন হয়। এখান থেকে বেশ কিছু বার লতি,কচু উঠিয়ে খাইয়েছে সবাইকে। আশে পাশে অনেক বাড়ি পাঠিয়েছে রান্না করে। তবে গতমাসে মোনার কচু খেতে ইচ্ছে করলে আইরিন এখান থেকে তুলে খাওয়ানোর জন্য এসেছিলো তখন একটা পাইপ লাইন চোখে পড়েছিলো। ভেবেছিলো হয়তো বাড়ির। সেদিন ও ঘাপলা লেগেছিলো। আজ ও মনে খুচুরখুচুর করছে। সোহানকে বললো,

– সোহান দেখতো এই পাইপটা কিসের?
সোহান এবং জোয়াদ্দার খুঁটিয়ে দেখছে। এক পর্যায়ে সোহান বললো,
– আম্মু এই লাইন তো আমাদের না? তুমি জানতানা?
– আমাদের না হলে আমার সবজি মাচার পাশে কি করছে?
সোহান মই আনিয়ে, দেয়ালের ওই পাশটাতে গেলো। ওই পাশে এডভোকেট গণি মিয়ার আলিশান বাড়ি। লাইন ধরে আগাতেই দেখতে পেলো গনি মিয়ার বাগান অনেকটাই শুকনো। ইশান ও সোহানের পিছু পিছু এলো। ইশান ভাইকে বলে উঠলো,
– ভাই, এই বাগানে পানি নেই অথচ আমাদের ইয়ার্ডে এত পানি কেনো?
– সেটাই তো ভাবছি।
জোয়াদ্দার রেগে গেলো হঠাৎ। সোহানকে বলে উঠলো,
– সোহান মামা, ওই হালা****ত কামাইল্লার কাম এডি। ওয় বাগান ফরিষ্কার করনের ডরে লাইন আমাগো লগে ফিট কইরা দিছে অহন সব ফানি আমগো বাগানে গিয়া ঢুকছে। ওরে তো আমি আইজকা মাইরাই ফেলমু।
এদিকে কেউ একজন পেছন থেকে চিৎকার দিচ্ছে চোর চোর বলে। জোয়াদ্দার চিৎকার শুনে উল্টা দৌড় দিতেই ইশান ধমকে বললো,
– তুমি না ওরে মাইরা ফেলবা? এতটুক কলিজা নিয়া মা/রবা? তুমি চোর? দৌঁড়াচ্ছো কেনো?
জোয়াদ্দার থেমে বলে,
– ও হ্যাঁ, আমি ক্যান পলাইতাছি?

এত টুকু বলে পাশ থেকে ইট নিয়ে এই বাড়ির মালী কামালের দিকে মা/রার জন্য ছুটলো। অন্যদিকে কামালের হাতে শাবল,লাঠি। এগুলো নিয়ে তেঁড়ে আসছে জোয়াদ্দারের দিকে। অবস্থা বেগতিক। সামলাতে গিয়ে কঠিন অবস্থা ইশান এবং সোহানের। দস্তাদস্তিতে দুই বাড়ির সকল দারোয়ান স্টাফদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। মোটামুটি সবার আঘাত লেগেছে। মাঝে ইশান এবং সোহান বেশ ব্যাথা পেয়েছে। গণি মিয়া বাড়ি নেই। তার বড় ছেলে আয়নাল সালিশ ডেকেছে। আইরিনের সমবয়সী সে। বিনা অনুমতিতে বাড়ির ভেতর প্রবেশের জন্য সোহান এবং ইশানকে কথা শুনিয়েছে। আইরিন গিয়েছে ছুটিয়ে আনতে। সে কিছুতেই শুনবেনা। আইরিনের জন্য বাড়ির গেট অবধি খোলেনি। এর বিহিত করে এরপর ছাড়বে। সোহান- ইশানের যুক্তি তর্ক শুনতে সে নারাজ। ইমরানকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে তার বাড়ি থেকে ইমরানের বাড়ির লোকজনদের ছাড়িয়ে আনতে। ইমরান স্পষ্ট জানিয়েছে সে যাবেনা। শুরু থেকেই আয়নালকে ইমরান পছন্দ করে না। পাড়ার সবাইকে সালাম দেয়, সম্মান করে একমাত্র সে ব্যতীত। আয়নালের ভাষ্যমতে ইমরান তার চেয়ে বয়সে ছোট। দেখা হলেই উঠতে বসতে সালাম দিতে হবে, তা নয় এই লোক সরাসরি এড়িয়ে চলে। শুনেছে বিয়ে করেছে হাঁটুর বয়সী মেয়েকে। ইমরানের চরিত্র নিয়েও বাইরে বাইরে বেশ রটনা রটিয়েছে আয়নাল। ইশান আর সোহানকে পেয়ে আকাশের চাঁদ পেয়েছে। এবার ইচ্ছেমতো জব্দ করা যাবে।
ড্রইং রুমে বসে আছে ইমরান। হাতে একটি পত্রিকা। আয়েশ করে পড়ছে। মোনা পাশে বসে ইমরানকে বলছে,

– ছেলেগুলা সেই কখন গিয়েছে। ওরা দুপুরে কিছু খায়নি।
গম্ভীর স্বরে বললো,
– এসে খেয়ে নিবে।
– আসবে কি করে? ওদের নাকি আটকে রেখেছে এডভোকেট চাচার বড় ছেলেটা? আপাকে তো ঢুকতেই দিলোনা।
বলতে বলতে বাড়িতে একসাথে অনেক লোক প্রবেশ করলো। মোনা মাথায় ঘোমটা টানলো। মুখের সামনে থেকে পেপার সরিয়ে ইমরান দেখতে পেলো রবিন ছাড়িয়ে এনেছে সোহান- ইশানদের। সাথে আছে বাড়ির অন্যান্য লোকজন,জোয়াদ্দার, সলিম সহ বাকিরা। আয়নাল তার সাগরেদদের নিয়ে পিছু পিছু এলো। এসেই হুমকি দিয়ে ইমরানের দিকে আঙ্গুল তুলে বললো,

– আজকের মতো ছেড়ে দিলাম। নিজের যাওয়ার সাহস নাই, চামচা পাঠাও আমার বাড়ি ছেলেদের ছুটাতে। পরের বার হাঁড়গোড় ভেঙে দিব।
ইমরান নিজের জায়গায় অনড়, নির্বাক। ক্ষীপ্ত হলো মোনা। উচ্চ আওয়াজে বলে উঠলো,
– কার হাঁড়গোড় ভাঙবেন, আমার ছেলেদের? এত সাহস আপনার? গুণে দেখেছেন নিজের হাড়গোড় কয়টা ঠিক জায়গায় আছে? এই ছেলেগুলো আপনাকে ওদের হাত দিয়ে একটা আস্তে থাপ্পড়
মা/রলেও তো নিজের পায়ে শক্তপোক্ত ভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই আসছে হাঁড়গোড় ভাঙতে! এতক্ষন অবধি ওরা শান্ত ছিলো এটা ওদের পারিবারিক শিক্ষা।
চিৎকার দিয়ে আয়নাল বলে উঠলো,
– চোরের মায়ের বড় গলা। মেয়ে মানুষের গলা এত উঁচুতে কেনো। এই বাড়িতে কি পুরুষ মানুষ গুলা বোবা?
প্রতিউত্তরে মোনা বললো,
– মুখ সামলে কথা বলুন। কে চোর! আমাদের ছেলেদের কোন যোগ্যতায় চোর বলছেন? শুনেছি আপনার তো কাম কাজ নেই রাস্তায় রাস্তায় গীবত গেয়ে বেড়ান আর এ বাড়ির – ও বাড়ির হাঁড়ির খবর নেন। আসছে যোগ্যতা শেখাতে!

– চুপ করো বেয়াদপ মহিলা।
– আপনি চুপ করুন অসভ্য পুরুষ।
ইমরান তখনো নিশ্চুপ। স্ত্রীর দিকে তাকালো। মনে মনে ভাবছে বউটা ভালোই ঝগড়া করতে পারে! ইশারা দিয়ে মোনাকে বসতে বললো। মোনা নিরবে ইমরানের পাশে বসলো। ইমরানের নিশ্চুপতা দেখে ইশান আর সোহান ও তাই কথা বাড়াচ্ছেনা। রবিন স্যারের নিশ্চুপতা দেখে থমকে আছে। বাগান নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার আইরিনের সাথে ঝগড়া করেছে আয়নাল। ইমরান ঘাটায় নি, আইরিন সামলে নিয়েছে। আগে দুইবাড়ির মাঝে রাস্তা ছিলো। পরে ঝামেলার জন্য দেয়াল তোলা হয়েছে। ইমরান তখন খুব একটা দেশে থাকতো না বলে এসব ব্যাপার আইরিন এবং ইশতিয়াক দেখতো। ঘটনা এখন স্পষ্ট। আয়নালের নির্দেশেই হয়তো কামাল এই বাড়ির সাথে পাইপ সংযোগ করেছে যাতে করে আবর্জনা সব এই বাড়িতে প্রবেশ করে। নতুবা এত বড় সাহস একজন মালী নিজ থেকে দেখাতোনা। আইরিনও চেঁচিয়ে উঠে বললো,

– খবরদার এই বাড়ির মেয়েদের নিয়ে আরেকটা কথা বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো তোর। সবসময় আমাদের পিছনে লাগিস। তোর কি কাজ নেই খেয়ে দেয়ে।
– আসছে আরেকজন। এই ঝগড়াটে মহিলার কাজ তো খালি ঝগড়া করা। তা বলিহারি যাই বাপু। ইমরান তোমার বাড়িতে কি এদের কতৃত্ব চলে তুমি কোনো কথা বলোনা? পুরুষ গুলা কি নপুংসক নাকি?
মাথা থেকে টুপিটা খুলতে খুলতে ইশতিয়াক বাড়িতে প্রবেশ করছে। হাসতে হাসতে বললো,
– হয়েছে কি আয়নাল সাহেব এই বাড়ির পুরুষ গুলার মুখ চলে কম, হাত চলে বেশি। তাই আপনাকে সময় দিচ্ছে আপনার কথা শেষ করার। এদের হাত একবার উঠলে আর কথা বলার সুযোগ পাবেন না। একবার তাকিয়ে দেখুন সবার দিকে। এরপর নিজের দিকে দেখুন।
ঢোক গিলে আয়নাল সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো।থমথমে হয়ে আছে পরিবেশ। এরা একেকজন ভালোই শক্তিধর হবে। বেশ লম্বা আর সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সত্যি যদি মা/রে তবে রেহাই নেই। । হাসপাতালে কমছে কম এক মাস কাটাতে হবে। ইশতিয়াক হেসে বললো,

– ভয় লাগছেনা? একদম। এজন্যই সবাই চুপ করে আছে। আমাদের বাড়ির নারীরা আগে কথা বলে কারণ তারা সতর্ক বাণী দেয়। এরপর পুরুষরা সরাসরি অ্যাকশনে নেমে পড়ে।
– আমি কিন্তু কেইস করবো বলে দিলাম?
– আমি কি বসে ঘাস চিবাবো? আমাকে দেখে ভয় লাগছেনা একটুও? আপনাদের বাড়ির সঠিক দলিল নিয়ে আসবেন। আর যে পাইপটা আমাদের বাগানে ফিট করেছেন তা এখনো আছে। কার অনুমতি নিয়ে বসিয়েছেন জানাবেন। অনুমান করা যাচ্ছে আপনাদের বাড়িটা দখল করা জায়গায় নির্মিত। কাল সকালে কোর্ট থেকে নোটিশ আসবে। এখানে দাঁড়িয়ে কাপুরুষের মত বাড়ির মহিলাদের সাথে ঝগড়া না করে নিজের বাড়ির মহিলাদের সম্মান বাঁচানোর জন্য ছাদের ব্যবস্থা করুন। বলা তো যায় না, কাল নসিবে যদি আমাদের বাড়ির সামনের জারুল গাছ তলাও না জুটে তখন তো স্টেশনে যেয়ে উঠতে হবে। সব তো সুদের আর ঘুষের কারবার।
ইশতিয়াকের দিকে আঙুল তুলে আয়নাল চিৎকার দিয়ে বললো,

– এই বেয়াদপ, অসভ্য কিভাবে কথা বলছিস তুই? তুই দুই টাকার পুলিশ হইতেই পারিস আমিও সুপ্রিম কোর্টের উকিলের ছেলে। কি করবি দেখে নিব, তার আগেই আমি তোদের…
বাক্য শেষ হওয়ার আগেই হুংকার শোনা গেলো,
– খবরদার আর একটি বাক্য ও যদি আমার বাড়িতে আমার অপছন্দে উচ্চারিত হয়, কসম করে বলছি এখানেই পুঁতে দিব।
সচকিত হলো বাকিরা। ইমরান আঙুল তাক করে পুনরায় গর্জে উঠলো,
– আউট।
এতক্ষন হামকে তুমকে করলেও এবার চুপ হয়ে গেলো আয়নাল। চুপ করে দাঁড়িয়ে ইমরানের চোখের দিকে তাকালো। ইমরান উঠে দাঁড়ায়। এতেই কাজ হয়েছে। রবিন ইমরানের ইশারার অপেক্ষায় ছিলো। ইশারা পেতেই জোয়াদ্দার, সলিমসহ আয়নাল ও তার সাগরেদদের সাথে নিয়ে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। গেটের কাছে এসে আয়নাল রবিনকে বললো,

– তোর মালিককে আমি দেখে নিব।
রবিন হেসে বললো,
– এতদিন তো দেখছেন, এখন বুঝবেন স্যার কি জিনিস। আগে নিজের ঘর বাঁচান। দুদিন পর দেখা যাবে আমাদের গেটের কাছে থালা হাতে এসে বলছেন-
মাগো দুইটা ভিক্ষা দেন, মায়েরা, ভায়েরা- বোনেরা দুদিন ধরে কিছু খাই নাই।
এতটুকু শুনে সবাই হাসা শুরু করেছে দারোয়ানেরা। আবার রবিন পুনরায় একে বেকে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চুলকানোর অভিনয় করে বললো,
– অথবা চুলকানির মলম বেচা লাগবে এভাবে- হায়রে মজার চুলকানী, চুলকায় রাজরানি, চুলকাইলে বাইর হয় লাল পানি। আমার কাছে আছে সেই লাল পানির মলম।পাগলা মলম। কিনবেন, লাগাইবেন। এরপর নাচবেন।
বাকিরা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছে। গজগজ করতে করতে দলবলসহ চলে গেলো আয়নাল।

রাতের খাবার শেষ। সোহান এবং ইশানের ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে ঘরোয়া একজন ডাক্তার এসে। আইরিন দুজনকে খাইয়ে দিয়েছে। এদিকে মোনা বকেই যাচ্ছে আয়নালকে। রাবিয়া ছুটে এসে বললো,
– স্যার ওই মাস্তান গুলা আবার আইসা পড়ছে?
ইমরান রাবিয়ার কথা না বুঝে আইরিনের দিকে তাকালো। আইরিন ধমকে বললো,
– কথা স্পষ্ট বল। কোন মাস্তান?
– ওই যে গণি মিয়ার পোলা। লগে এহন বাপরে লইয়া আইছে। গুন্ডাও আছে কতগুলা।
ইমরান রুম থেকে বের হতেই ইশতিয়াক পিছু নিলো। বলে উঠলো,
– এত বড় পেটওয়ালা পোলা নিজের নাই হেডম। বাপ নিয়া আসছে সালিশ মিলাতে৷ বেক্কল।
ভাইয়ের কড়া চক্ষু দেখেই ইশতিয়াক চুপ হয়ে গেলো। সোহান এবং ইশান উঠতে চাইলে আইরিন ধমকে বসিয়ে দেয়। ইমরান বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আসতে দাও ওদের।
ড্রইং রুমে গণি মিয়াকে দেখে সুন্দর করে সালাম দিলো ইমরান। বাবার বয়সী একজন মানুষ। মসজিদে দেখা হলে ইমরান নিজ থেকে সালাম দেয়, কুশলাদি জানতে চায় । তখন অল্প সল্প কথা হয়। ভাব গাম্ভীর্য সম্পন্ন মানুষ। ইমরান ও যথেষ্ট সম্মান করে। গণি মিয়া করমর্দন করে ইমরানকে বুকে টেনে নিলেন। ইমরান হেসে বললো,

– চাচা বসুন।
গণি মিয়া সোফায় বসে বললেন,
– কেমন আছো?
– এইতো চাচা আলহামদুলিল্লাহ।
গণি মিয়া দম ফেলে ভাবুক ভঙ্গিতে বললো,
– মনে হয় আমি ভালো থাকতে দিলাম না। আজ যা যা হলো সব শুনলাম তোমার চাচীর কাছে।
ইমরান হেসে দিলো। আয়নাল এবং ওর সাগরেদরা ইমরানের বর্তমান ব্যবহারে বিস্মিত। আইরিন হালকা নাস্তা দিলো টেবিলে। গণি মিয়াকে সালাম দিয়ে বাড়ির সকলের খবর নিলো। গণি মিয়া হেসে আইরিনকে বললো,
– মা রে বয়স হয়েছে। মাঝে মাঝে চাচার ভুল হয়ে যায়। তোর বাগানে পাইপ লাইনটা কিভাবে আসছে তাতো জানতাম না। বাসায় এলাম আধ ঘন্টা হলো। এর মাঝেই এত কিছু হয়ে গেলো টের পেলাম না। তোর চাচী বললো এসব ঝামেলা প্রায় হয়। আয়নালটা অবুঝ ওর কথা ধরিস না। পাইপটা তুলে বাগানের দেয়াল টা মেরামত করে দিবো।
আয়নাল গর্জে উঠলো,

– আব্বা এরা শুধরাবেনা, আবার ঝগড়া করবে। এত সুন্দর করে বইলেন না।
গণি মিয়া রেগে ছেলেকে ধমকে বললেন,
– এক চড়ে সব কটা দাঁত ফেলে দিব বেয়াদপ। তুই এসে এখানে ঝামেলা না করে সমস্যা সমাধান করলেও তো পারতি। তা না করে বাড়ির মেয়ে বউদের সাথে ঝগড়া করলি। অসভ্য।
মোনা নিচে নামেনি। গণি মিয়া ইমরানকে হাত জোড় করে বললো,
– ইমরান বৌমাকে বলবে আমাকে মাফ করে দিতে। এই গর্দভ না বুঝে খারাপ ব্যবহার করছে। সংসার করে নি তো বুঝবে কি করে মেয়ে, বউদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়?
ইমরান হাত ধরে বললো,
– না না চাচা, এভাবে বলবেন না সমস্যা নেই। আপনি কষ্ট করে না আসলেও হত এসব কথার জন্য।
– আসতে হতো বাবা। আমার বয়স বেশি হলেও তোমার সম্মানটা বেশি এই পাড়ায়। এভাবে আমাদের মাঝে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কোন্দল খুবই লজ্জাজনক। প্রতিবেশী আমরা। সুখ দুঃখে একে অন্যের পাশে থাকব। আইরিনের হাতের রান্না বেশ। মাঝে সাজে এটা সেটা তরকারি পাঠায় তোমার চাচীর জন্য। সে তো আর একা খায় না, আমাকেও দেয়। আমি খুব তৃপ্তি করে খাই।
ছেলের দিকে ফিরে বললেন,

– এই মাথা মোটা টাকে গুণায় ধরবেনা কেমন। নাতি গুলা কি বেশি ব্যাথা পেয়েছে?
ইশান আর সোহান দুজনই হেসে সালাম দিয়ে বললো,
– সমস্যা নেই। ঠিক হয়ে যাব।
বাচ্চাদের ব্যবহার গণিমিয়া জানেন। যথেষ্ট ভদ্র। নিজের মাঝেই অপরাধ বোধ কাজ করছে ছেলের এহেন ব্যবহারের জন্য। ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাড়ির দলিল লাগবে তোমার?
ইমরান কিঞ্চিৎ হাসলো। ইশতিয়াক এর দিকে তাকাতেই ইশতিয়াক বললো,
– চাচা ব্যাপারটা এতদূর গড়াতোই না যদি না আয়নাল ভাই আপাকে আর ভাবীকে অপমান করতো। আমাদের বাড়ির মেয়েরা যথেষ্ট আত্মমর্যাদা সম্পন্ন। উনি যেভাবে উচ্চ আওয়াজে কথা বললেন, খুবই অভদ্রতার পরিচয় দিয়েছেন। ইশান আর সোহানকে চোর বললেন। আমরা কি আমাদের ছেলেদের সেই শিক্ষা দিয়েছি? ভাইয়া সামনে ছিলো। আমাদের ও আজেবাজে ভাষা বললেন। কেইস করবেন বললেন। তাই আমি বাধ্য হলাম সত্যটা বলতে।
– শুনো বাবা, ও বয়সেই বেড়েছে; বুদ্ধিটা এখনো খাটোই আছে। বাচ্চাদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় জানে নাকি আহাম্মক টা? আর কার নামে কেইস করবে? তোমাদের নামে? ওর পরিবার পথে বসবে সেই খেয়াল আছে ওর? আগ বাড়িয়ে কথা বলে সব জায়গায়।
ইমরান আচমকা প্রশ্ন করলো,

– চাচা জায়গার মালিকের কি খোঁজ পেলেন?
দীর্ঘশ্বাস গণি মিয়ার। দু পাশে মাথা নেড়ে বললো,
– নারে বাবা। আর মনে হয় পাবো না। এক জায়গায় শুনলাম লোকটা বছর খানেক আগে মা/রা গিয়েছে। জমির টাকা টা আলাদা করে রেখে দিয়েছি। জমির মালিক বেঁচে থাকলে টাকাটা দিয়ে মাফ চেয়ে নিতাম। যৌবনে করা ভুলের মাশুল বাকিজীবন আমার বিবেককে পোড়াবে।
– ওই টাকাটা কোনো এতিমখানায় দিয়ে দিতে পারেন বা কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দায়িত্ব নিতে পারেন।
গণি মিয়া খুশিতে চকচক করা চোখে বললো,
– ভালো বলছো তো। তোমার পরিচিত বিশ্বস্ত আছে এমন?
– আছে বেশ কয়েকটা। আমি যাই প্রায়। আব্বার আম্মার নামে দিয়ে আসি।
– বেশ আমাকে নিয়ে যেও।
– ইনশাআল্লাহ।
সমস্যার সমাধান করে বেরিয়ে আসলো গণিমিয়া ও তার লোকজন। পথিমধ্যে আয়নাল বাবাকে প্রশ্ন করলো,
– আব্বা আপনি আমাকে এত অপমান কেনো করলেন। আমি তো ভাবছিলাম আপনি ওই ইমরানকে চড় থাপ্পড় মারবেন?

– ও কি চড় থাপ্পড় খাওয়ার মানুষ হলো? আমার গলা কাঁপে কথা বলতে। যোগ্য লোকের যোগ্য আসন। ইমরান সম্মানের যোগ্য আর তুমি অপমানের। সমস্যাটা তুমি এভাবে সমাধান করলে তুমিও সম্মান পেয়ে যেতে। ঝগড়াঝাটি করে এসেছো কূটনি মহিলাদের মতো।
– আমার মাথা গরম ছিলো। কিন্তু ইমরান জায়গার কথা কিভাবে জানে?
– ইমরান জায়গা কিনেছিলো আমাদের জায়গার মালিকের ভাইয়ের কাছ থেকে। বড় ভাইটা মিথ্যা মামলায় ফেঁসে গিয়েছিলো। আমি সেই মামলা থেকে উদ্ধার করেছিলাম। টাকা ছিলো না মামলা লড়ার, টাকার পরিবর্তে এই জায়গা নিজের নামে করে নিয়েছিলাম যা মামলার টাকার চেয়ে দশগুণ বেশি ছিল সেই সময়টাতে। এভাবেই শুনেছে ইমরান।

– শালা একটা জিনিস।
– ভাষা সংযত করো। এজন্যই ওই বাড়ির ছেলেগুলা তোমাকে অপছন্দ করে। তোমার বয়সে ওরা পুরা সাম্রাজ্য চালাচ্ছে। আর তুমি বাপের অন্ন ধ্বংস করো। আজকে এর সাথে কালকে ওর সাথে ঝগড়া, গুতাগুতি, দরবার-সালিশি করে বেড়াও। লজ্জা করে আমার তোমাকে ছেলে হিসেবে পরিচয় দিতে। ওরা একবার ক্ষেপে গেলে রাস্তায় বসতে হবে আমাদের। এছাড়া পরিবারটা ভদ্র। ওর মুখের কথাই যথেষ্ট আমাদের পথে বসানোর জন্য। নিজের দিকেই তাকিয়ে দেখো, তোমার বাড়িতে তোমার সম্মান কতখানি আর ওদের বাড়িতে ইমরানের সম্মান কেমন। শুধু বাড়িতে নয় মহল্লা জুড়ে সবাই ছেলেটাকে শ্রদ্ধা করে। এগুলো পয়সা দিয়ে কিনে পাওয়া যায়না। অর্জন করতে হয়। তোমার মত গর্দভের মাথায় এসব ঢুকবেনা।
বাবার করা অপমান বেশ গায়ে লেগেছে। যতকিছু হয়েছে ওই আইরিনের জন্য। একটা শিক্ষা আইরিনকে সে দিতে চায়। কিন্তু ভয় হয় আবার শিক্ষা দিতে গিয়ে না ফেঁসে যায়। হঠাৎ গণি মিয়া বলে উঠলো,
– মনের মাঝে কুটিল কিছু আসলে ঝেড়ে ফেলো। এরপর ঝামেলা হলে তোমাকে আমি রাস্তায় নামিয়ে দিব। মান সম্মান যা অর্জন করেছি এতদিনে সব তোমার জন্য খোয়াবো।

মিনহাজের শরীর টা আগে থেকে কিছুটা সুস্থ। বাবা,মা,ভাই বোনদের সাথে আলাপ চলছে। এর মাঝে মায়াকে বলে উঠলো,
– মায়া, তোর সংসারটা একটু গুছা বোন। বাচ্চা কাচ্চা তো সংসারের সৌন্দর্য। একজন হলে আমরা নিশ্চিন্ত।
মায়া হেসে বলে,
– ভাইয়া, আগে নাতনী আসুক আমাদের। মেয়েটার একটু যত্ন করি৷ এরপর নিজেকে নিয়ে ভাববো। এছাড়া শাহাজাহান চাচ্ছে আগামী বছর বাইরে শিফট হবে। ওখানে গেলেই ভাববো।
সালমা মায়ার কাঁধে হাত রেখে বললো,
– ওখানে একা গিয়ে পারবে? এখানে তো আমরা আছি।
মায়া হেসে বলে,
– আরে একবার গিয়ে সব স্যাটেল করে চলে আসবো। তোমাদের শান্তি দিবোনা। তখন আমার টা পালবে।
পারিবারিক আলোচনার এই মিশুক পরিবেশ টা তৈরি হতে জীবনের বেশি অর্ধেক সময় শেষ মামুন সাহেবের। হাসিখুশি আনন্দে ভরা পরিবার তার।

হাতে পায়ে লোশন লাগিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে হাসছে। ইমরান সোফায় বসে আন্দাজ করতে পারছে তার সাথে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এখনি যদি না সামলে নেয় তবে এই বেবি লোশন থেরাপি চলবে। তাই মোনাকে কথার প্যাঁচে ফেলতে বললো,
– বেশ ঝগড়া করতে পারো তো তুমি।
মোনা হাত থেকে লোশন রেখে বললো,
– কখন?
– নিচে করলে না এডভোকেট চাচার ছেলে আয়নালের সাথে।
– আপনার প্রক্সি দিচ্ছিলাম আপনি তো মুখের মধ্যে ব্যোম ঢুকিয়ে বসে ছিলেন।
– ওটাকে নিরবে ঘটনা পর্যবেক্ষন বলে মোনালিসা, ব্যোম ঢুকিয়ে বসে থাকা নয়। আমি অবাক হয়ে যাই, তোমার শব্দ চয়ন শুনে। কোথায় পাও এসব?
– এগুলা পাওয়া লাগেনা, পরিবেশগত ভাবে চলে আসে। আচ্ছা একটা কথা আমার এখন মটু পাতলু দেখতে ইচ্ছে করছে। আমি কি তা পারবো?

ঠোঁটের উপর তর্জনি রেখে এক দৃষ্টিতে সহধর্মিণীকে দেখে যাচ্ছে। মুহুর্তের মাঝে মুড সুইং হচ্ছে। আলো সরলরেখা বরাবর চলে, বেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। এই স্পিড মিনহাজ কন্যার মুড সুইংয়ের স্পিডের কাছে হার মেনেছে। সেকেন্ড হতেও ঘড়ির কাঁটা ঘুরে কিন্তু ইমরান জায়ার মর্জি পরিবর্তনের কোনো সময় কাঁটা নেই। ইমরান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে রিমোট দিয়ে টেলিভিশন ছাড়লো। মোনা ভ্যানিটি ছেড়ে খাটে এসে বসলো। ইশারায় ইমরানকে ডাকলো। ইমরান পাশে বসে বাম হাত মেলে দিতেই মোনা ইমরানের বাম পাজরের পাশটাতে মাথা রেখে বললো,

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৩

– আমার মটু পাতলু কেনো দেখতে ইচ্ছে করলো জানেন? আজকে বাসার ঘটনার সাথে এপিসোড মিলালাম, মিলাতেই মনে হলো আহা চরিত্র গুলাতো আমার পরিচিত। মটু ছিলো এডভোকেট চাচা, পাতলু আপনি, চিংগাম স্যার ইশতিয়াক ভাইয়া আর জন হচ্ছে ওই আয়নাল। ডক্টর ঝাটকা হচ্ছে সোহান আর খাসিকা রাম হচ্ছে ইশান।
অধরদ্বয় আলগা হয়ে গেলো ইমরানের। অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে মনে মনে ভাবলো-
– Wah, What a fantastic comparison!!!

প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৫৫