Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬১

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬১
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

মিথি পরীক্ষার খাতাটা আজ প্রায় ঘন্টাখানেক আগেই জমা দিয়েছে। এই কয়েকদিন টিউশনিতেও বন্ধ দিয়েছে। বাচ্চাদের সামনে পরীক্ষা বলে অভিভাবকদের একটু মনঃক্ষুন্ন ও এই নিয়ে। মিথি যে কিছুক্ষন দিল ঐ কিছুটা সময়ও তীব্র অস্থিরতা নিয়েই দিল। অতঃপর যত দ্রুত পারে বাসায় এল যেন। তারপর সব অস্থিরতা, চিন্তাকে জয় করে বাসায় যখন এল দেখতে পেল হিমেলের কোলে মিষ্টি। একদম শান্ত বাচ্চার মতো বসে থেকেই কি কি যেন বলছিল। হিমেল ও সেসবের উত্তর করছিল বেশ হেসে হেসে। পাশ থেকে আয়েশা খালা এসে হেসে বলল,

“ সারাক্ষন হিমেল বাপের কোলেই বইসা আছে। আমার কোলে একটুও আইল না। ”
মিথি হাসল কিঞ্চিৎ। উত্তরে বলল,
“ আপনার হিমেল আব্বায় নির্ঘাত কোন জাদু করেছে খালা। নয়তো আমার মেয়েটা দিনরাত উনাকে নিয়েই পড়ে থাকে কেন? ”
হিমেল শুনল। মাথা তুলে মিথির দিকে চেয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ খালার হিমেল আব্বা জাদু জানে না। জাদু জানলে বহু আগেই অনেককিছু বদলে দিতে পারত। শুধু ভালোবাসতে জানে। ”
মিথি শুনল। কথাটা বোধহয় আসলেই সত্য। ভালোবাসতে জানে। একদম খাঁটি ভালোবাসা। মিথি এইটুকু ভেবেই ছোটশ্বাস ফেলল। আল্লাহ বোধহয় তার জীবনে এমন একটা মারুষ পাঠিয়েছেন ভালোবাসাকে বিশ্বাস করার জন্যই। ভালোবাসা শব্দটাকে অনুভব করার জন্য। নয়তো মিথি এই জীবনে কখনো ভালোবাসা শব্দটাকে বিশ্বাস করত? করত না তো। মিথি ছোটশ্বাস ফেলেই এগোল।ততক্ষনে খালা বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছেন। মিথি খাটের একপাশে হিমেলের পাশে বসেই মিষ্টির দিকে হাত বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ হিমেল ভাই ঔষুধ খেয়েছেন ঠিকঠাক? খাবার খেয়েছেন তো? আমি কিন্তু খালাকে বারবার বলেছিলাম সবটা। খেয়েছেন ঠিকঠাক? ”
হিমেল কপাল কুঁচকে তাকায়। উত্তর দিল গম্ভীর স্বরে,
“ না খাইনি। ”
মিথি এবার ভ্রু জোড়া কুঁচকায়। বলল,
“ কেন? কেন খেলেন না? এইজন্যই বলেছিলাম এই পরীক্ষাটাও গ্যাপ দেই। আপনি যে নিজের… ”
হিমেল ওভাবেই কপাল কুুঁচকে তাকাল। মিথির কথা শেষ করার আগেই বলল,
“ গর্দভ! আমি তোর মতো মাথামোটা নই যে নিজের ভালো নিজে বুঝব না। নিজের খেয়াল আমি ঠিকই রাখতে পারি। ”
মিথি ছোটছোট চোখে তাকাল। এটা সুন্দর ভাবে উত্তর দিলে কি ক্ষতি হতো? উত্তরে বলল,

“ উত্তরটা সুন্দরভাবে দেওয়া যেত না?”
“ সুন্দরভাবেই তো দিয়েছি। ”
“ এটা সুন্দরভাবে উত্তর দেওয়ার নমুনা? ”
“ তুই পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধঘন্টা আগেই কিভাবে বাসায় এলি? পরীক্ষা আদৌ দিয়েছিস মিথি? ”
মিথি ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। এইজন্য উত্তরটা এভাবে দিল। উত্তরে বলল,
“ মোটামুটি প্রিপারেশন ছিল হিমেল ভাই। তবুও যা লিখে এসেছি আলহামদুলিল্লাহ। আর লেখা শেষে শুধু শুধু বসে বসে কিই বা করতাম। তাই চলে এসেছি। ”
হিমেল শুনল। উত্তরে তাকিয়ে বলল,
“ খুব ভালো করেছিস।পরের গুলোতে ও একই কাজ করিস না। ”
“ এর পরের গুলো ভালো হবে। ”

হিমেল হাসল এবারে। মিথি তার কথার বিপরীত অর্থ বুঝতে শিখে গেছে। বাহ! আড়ালে হেসে গম্ভীর গলায় বলল,
“ যা ফ্রেশ হয়ে আয় মিথি। মিষ্টি আমার কাছে আছে। ”
মিথি মাথা নাড়াল যার অর্থ যাবে। কিন্তু গেল না। মিষ্টিকে কোলে তুলল দুই হাতে। তারপর উঠে দাঁড়াল। মিথি তখন অল্প ক্লান্ত। বাইরে ভ্যাপসা গরমে ঘামে ভিজে আছে মুখটা। কপালে লেপ্টে আলগোছে কয়েকটা চুল। মেয়েকে কোলে নিয়েই ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল সর্বপ্রথম,
“ তোমার হিমকে খুব জ্বালিয়েছো আম্মু? হিম কিন্তু অসুস্থ। ”
মিষ্টি মুহুর্তেই মাথা নাড়াল।মাথার দুই জুটি নাড়িয়ে উত্তরে দ্রুতই জানাল,
“ ন্ না। হিম তুস্থ এখন। ”
লক্ষী বাচ্চার মতো উত্তরটা শুনে মিথি হাসল। মিষ্টিকে ওভাবে কোলে রেখেই দ্রুত চুমু খেল বাম গালে। অতঃপর ডানগালেও চুমু দেওয়ার সময় খেয়াল করল দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি করছে হিমেল। পুরুষটার মুখে মৃদু হাসি। দৃষ্টি মোবাইলের স্ক্রিনেই। মিথি তা দেখে ঠিক ক্যামেরার গোল গ্লাসটাতেই চাইল তখন। পরক্ষনেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে হিমেলকে খেয়াল করতেই হিমেল শুধাল,

“ কি হলো? ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন? চুমু দে ঠিক করে। ”
মিথি শুনে সে মতো কাজ করল না। ঠিক একইভাবেই তাকিয়ে আছে। বরং ভ্রু জোড়ক আরেকটু কুঁচকাল। হিমেল এবারে আবারও বলল,
“ কি আশ্চর্য! চুমু কি আমায় দিতে বলেছি নাকি? মিষ্টিকেই দিতে বলেছি।”
মিথি ওভাবে থেকেই এবারে বলল,
“ ছবি তুলছেন কেন? আবার ওভাবে হাসছিলেনই বা কেন? ”
হিমেল কপাল কুঁচকায়। বলল,
“ কখন? হাসিনি তো। ”
“ মাত্র হাসলেন তো। ”
হিমেল এবার ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তো? হাসতে পারব না? হাসা কি অপরাধ? ”
মিথি আর উত্তর করল না। হাসা অপরাধ নয়। কিন্তু হাসল ও বা কেন? কেন?

হিমেলের অসুস্থতায় মোটামুটি সবাই দুয়েকবার হিমেলকে দেখে গিয়েছে। ভাই-ভাবী সবারই মোটামুটি রাগ কমেছে মনে হলো। সবাই যেমন এসেছে, তেমন সাবিহাও এসেছে হিমেলকে দেখতে। এইতো একটু আগেও এল। হিমেলের খোঁজখবর নিয়ে হিমেলকে দেখে গেল। মিথি দেখছিল তা দূর থেকে। অতঃপে সাবিহা চলে যাওয়ার অনেকটা সময় পরই হিমেলকে ধীরস্থির গলায় প্রশ্ন করল,
“ হিমেল ভাই? সাবিহা আপুর জন্য আপনার মায়া হয় না? একটুও না? ”
হিমেল তখন এমন কিছু আশা করেনি। হুট করেই এই প্রশ্ন শুনে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“ হঠাৎ এই প্রশ্ন? ”
মিথি তার উত্তর করে না। ফের বলল,
“ বলুন না, হয় মায়া? ”
হিমেল তাকাল স্থির চাহনিতে। মিথির চাহনিতে কোথাও বোধহয় উত্তর জানার ব্যাকুলতা দেখা গেল। কিসের ব্যাকুলতা? মিথি কি ভয় পাচ্ছে? হিমেল কোনভাবে সাবিহাকে মন দিয়ে দিবে এই ভয়? বোকা নারী! হিমেল কিঞ্চিৎ হেসে ভ্রু নাড়িয়ে বলল,

“ হলে? ”
মিথির চাহনিটা যেন হুট করেই নিভে গেল। চোখ নামিয়ে ফেলল মুহুর্তেই। ব্যাকুলতা স্থির রইল। এভাবে নিজের চোখের সামনে সাবিহার এতোটা ভালোবাসা, এতবার দেখতে আসা, এতো অস্থিরতা একটু হলেও কি মিথিকে ভাবাবে না? ভাবানো উচিত নয় কি? মিথিও ভেবেছে তাই। সাবিহা যে পরিমাণ ভালোবাসে তাতে তো হিমেল ভাই কখনো না কখনো ভালোবাসতেও পারে সাবিহাকে। ভালোবাসা দিয়েই তো ভালোবাসা পাওয়া যায়। মিথি এইটুকু ভেবেই বলল,
“ কিছু না। এমনিই জিজ্ঞেস করছিলাম। উঠে বসুন। আপনার ঔষুধ আছে। ”
এইটুকু বলেই যখন পা ঘুরাল হিমেল তখনই গম্ভীর গলায় বলল,
“ দাঁড়া, চোখ নামিয়ে ফেললি কেন? সাবিহার জন্য মায়া হলে কষ্ট পাবি তুই? ”
“ না। ”
“ সত্যি? ”
মিথি এবারে জানাল,
“ থাক ওসব। বাদ দিন। ”
হিমেল বাদ দিল না। বরং মিথিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে শান্ত স্বরে বলতে লাগল,

“ সত্য হলো যে, আমার সত্যিই সাবিহার জন্য মায়া হয়। এই ভেবে যে সেও আমার মতোই একপাক্ষিক ভালোবেসেছে। আর যায় হোক, একপাক্ষিক ভালোবেসে যন্ত্রনার দহনে পোড়ার অনুভূতি আমার জানা আছে। ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হতে দেখার যন্ত্রনাটাও কি বিশ্রীরকমের জঘন্য তাও জানি। তো কি করে ঐ যন্ত্রনা আমি স্বেচ্ছায় অন্য কারোর জন্য চাই বল? আমি তো প্রার্থনা করতাম, আমার শত্রুরও এমন যন্ত্রনা নাহোক। সে জায়গায় সাবিহাকে এই যন্ত্রনায় ঠেলে দিয়ে একটু হলেও মায়া করা উচিত না বল? আমি চাই ও সুখী হোক, খুব সুখী হোক। ওর জীবনের একপাক্ষিক প্রথম ভালোবাসাটা কেউ এসে ভুলিয়ে দিক খুব স্বযত্নে। ”
“ হু। ”
হিমেল চুপ থাকল না। মিথির সামনে দাঁড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে মুখ নিল মিথির কানের কাছে। ফের আবারও গম্ভীর কন্ঠে জানাল,

“ আরো একটা সত্য, আমার জীবনে তুই বিনা কোন নারী নেই মিথি। কোন নারী আসেওনি, নেইও আর আসবেও না। আমার এই ছন্নছাড়া সাধারণ জীবনটায় আমি শুধ একজনকেই চেয়েছি। একজনকেই ভালোবেসেছি। একজনের জন্যই অনুভূতি ফুঁসেছি। আমার ঐ একজন ছাড়া আর কোন গতি আছে বল? নেই তো! ”
মিথি ঠিক স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কথাগুলো যেন কেমন শোনাল। কন্ঠটাও! এতোটা কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে বলাতেই মনে হলো যেন নিঃশ্বাস উপছে পড়ছে। মিথি ঐটুকু অনুভূতিই সামলাতে হিমশিম খেল, তার উপর কথাগুলো শোনার পর মনে হলো যেন শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল এক অনুভূতি বয়ে গেল। হিমেল ততক্ষনে টাউজারে পকেটে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পা দুই পা করে জানালার ধারে দাঁড়াল, যেন কিছুই বলেনি এখন সে। বাইরের পানে তাকিয়ে আবারও বলল,
“ আমার অনুভূতি খুব মজবুত মিথি। তুই তাতে সন্দেহ রাখার সুযোগই পাবি না। ”

আমজাদ সাহেব বিছানায় শোঁয়া। অসুস্থতা এতোটাই ঘ্রাস করেছে উঠে বসারও জোগাড় নেই মানুষটার। একটা স্যাঁতস্যাতে ঘরেই কোনরকমে ফেলে রাখা হয়েছে যেন এক জড়বস্তুর ন্যায়ই। আমজাদ সাহেবের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। কখনো ভেবেছিলেন তার জীবনে এমন দিন আসবে? ভাবেননি তো। এই যে বাড়ি ঘর, বিল্ডিং, কোম্পানি সবই একদিন তার ছিল। শুধু তার নামে। নাম যশ সম্পত্তি সবই ছিল তার। অথচ আজ? আমজাদ সাহেব ছোটশ্বাস ফেলে। মা মা করে গলা ফাঁটিয়ে যখন চিৎকার করল ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হলেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী৷ একপ্রকার বিরক্তি নিয়েই চেঁচিয়ে উঠল,

“ এমন চেঁচাচ্ছো কেন ? সমস্যা কি? তোমার জন্য তো থাকা যাচ্ছে না বাড়িতে। ”
আমজাদ সাহেব ক্ষিপ্ত হয়ে চাইলেন। বললেন,
“ তো থাকতে কে বলেছে? চলে যাও না। আমার ছেলের জামিনের ব্যবস্থার দিয়ে চলে যাও। ”
আমজাদ সাহেবের দ্বিতী স্ত্রী বোধহয় রাগলেন এবারে। রাগে ক্ষোভে হাতের গরম কফিটাই ছুড়ে ফেললেন আমজাদ সাহেবের গায়ে। আমজাত সাহেব মুহুর্তেই কুঁকড়ে উঠলেন। দাঁতে দাঁত চেপে হালকা আওয়াজ করতেই কানে এল,
“ জাস্ট তোমাকে বিয়ে করে আমার সব শেষ হয়েছে। তোমাকে! তুমি কি ভেবেছো? মাথায় তুলে রাখব আমি তোমাকে? আর ঐ ছেলের জন্য এত মায়া? ঐ ছেলের জন্য? ঐ ছেলে জেল থেকে বের হয়ে সর্বপ্রথম তোমায় কু’পিয়ে মারবে। তোমাকে বুঝেছো? ”
এইটকু বলেই সে বেরিয়ে গেল নিজের মতো। আমজাদ সাহেব শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলেন। নিজের এহেন পরিণতি দেখে আজকাল নিজেরই তার নিজের প্রতি করুণা হয়৷ জীবন কখন কাকে নিয়ে যায় কে জানে! আমজাদ সাহেবও তো জানতেন না।

আদ্রকে দেখার জন্য তেমন কেউ না এলেও মাস কয়েক আগে একবার দাদী এসেছিল। বৃদ্ধার বয়স বেড়েছে। নিজেই বছরের অর্ধেকটা সময় অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে। তার উপর ছেলের সেবাযত্ন করা, ছেলের বউ এর আচরণ সব মিলিয়ে আদ্রকে কয়দিন পরপরই দেখতে আসার সুযোগ কোথায়? আজ এলেন প্রায় অনেক মাস পর। একটা সুতির মতো কাপড়ের গেঞ্জি পরা আদ্রর তখন। পোশাকটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে বেশ পুরোনো। অথচ এই আদ্রই একসময় কত রংবেরং এর পোশাক পরত। কত সুন্দর ছিল তার নাতিটা। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যেত। কতেটা সুদর্শন ছিল। অথচ আজ সে আদ্ররই চোখের নিচে কালি পড়েছে। ফর্সা ধবধবে চামড়াটা কেমন যেন মলিন। মুখভর্তি জমেছে অবহেলায় বেড়া উঠা দাঁড়ি। আদ্রর দাদী কেঁদে ফেলল নাতীর এমন হাল দেখে। কাঁপা হাতে কোনরকমে হাত বাড়িয়ে শুধাল,
“ দাদুভাই? ভালো আছো দাদুভাই? ”

আদ্র তাকাল। প্রায় মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে আছে সে। অথচ দাদী তাকে দেখছেনই কেবল। আদ্র যখন দাদীর ডাকে আবারও চাইল ঠিক তখনই তার দাদী আহাজারি করে কেঁদে উঠল যেন। চোখের পানি মোঁছার চেষ্টা করে তবুও বলল,
“ আমার কি নাতিটা কি হইল! কত সুন্দর রাজপুত্রের মতো নাতিডা আমার। ”
আদ্রর কাছে এসব বিরক্তই লাগল। বড্ড অশান্তি এসব! জেলে থাকলে কেই বা রাজপুত্র হয়? দাদীর এইটুকু জ্ঞান নেই? এইটুকু ভেবেই বিরক্ত হয়ে চুপ থাকল। তারপর প্রায় মিনিট দুয়েক পর গম্ভীর গলায় জানাল,
“ আম্মুর কবর পরিষ্কার রাখো তো সবসময়?
“ রাখি, রাখি দাদুভাই।”
আদ্র ফের ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ তোমার ছেলে? তোমার ছেলের সেবাযত্ন করে ঐ হাত দিয়ে আমার আম্মুর কবর পরিষ্কার করো না তো? ”
আদ্রর দাদী বোকার মতো তাকায়।বলে,
“ করলে কি হইব দাদুভাই? তোমারই তো বাপ। মরার পথে পড়ে আছে একপ্রকার আমার পোলাডা। ”
আদ্র দাঁতে দাঁত চাপে। রাগ উঠে তার। রাগে ইতোমধ্যেই হাত পা অব্দি নিশপিশ করে। চোয়াল শক্ত করে বলল,
“ মরল না কেন এখনো? মরা উচিত তো৷ ”
আদ্রর দাদী সঙ্গে সঙ্গেই বলল,

“ এসব কি কথা কও। বাপ হয় তো তোমার। ”
আদ্র এবার দাদীকেও শাসাল। শাসিয়েই বলল,
“ বাপ? মানুষরূপী জানো’য়ার একটা।আমার মায়ের খু’নী। খবদ্দার, ঐ পাপী মানুষটারে ধরে আমার আম্মুর কবর ছুঁবে না দাদী। আমার আম্মুর কবরে কোন পাপ লাগতে দিবানা। মনে থাকবে? ”
আদ্রর চোখ তখন লাল রক্তিম। এমন যেন দাদীকেও পরোয়া করে না। দাদভ বোধহয় ঐ লাল চোখজোড়া দেখেই উত্তর করল,
“ থাকবে, থাকবে দাদুভাই। ”
আদ্রর রাগ কিছুটা কমল বোধহয়। ছোটশ্বাস ফেলে দাদীকে জানাল,

“ শোনো, আম্মুর কবরের পাশে তোমায় বেলিফুলের গাছ লাগাতে বলেছিলাম না? লাগিয়েছো? ফুল ফুটেছে? আমার আম্মুর কিন্তু বেলিফুল খুব প্রিয়। খুব ভালোবাসে আমার আম্মুটা। ”
“ লাগিয়েছি দাদুভাই। ফুলও ফুটেছে। প্রতিদিন ফুলগুলো ফুটে। ঝরে তোমার আম্মুর কবরেই পড়ে। ”
আদ্র শুনল। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়াল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬০

“ আমার তো সাধ্য হলো না তোমার কবর ছোঁয়ার আম্মু। আমারে আল্লাহ ঐ সাধ্য দিল না। তোমারে একটাবার গিয়ে দেখতেও পারলাম না। কবে যে আমারে আল্লাহ সে সুযোগ দিবে। তোমার কবরটা একটু ছোঁয়ার, তোমার কাছে যাওয়ার। কবে যে সুযোগ দিবে তোমার কবরে বসে একটু কথা বলার, বুক ভার হয়ে আসা কান্না গুলো উগড়ে দেওয়ার। কবে যে সুযোগ দিবে তোমার কবরটা একটু জড়িয়ে ধরার। আম্মু? আল্লাহ চাইলে তো তোমার সাথে আমাকেও নিতে পারত। নিল না কেন? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬২