Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৩

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

হিমেল আজ ফিরল বিকালের দিকেই। মিথি বোধহয় তখন টিউশনিতে। এসে পাওয়া গেল না মিথিকে। হিমেল খালাকে যেতে বলে মিষ্টিকে নিয়েই বের হলো। কাছাকাছিই বেশ কিছুটা পথ হেঁটে, দুইজনে এদিক সেদিক ঘুরে যখন ফিরে আসছিল ঠিক তখনই মিথির কল এল। ওপাশ থেকে শান্তস্বরেই বলল,
“ কোথায় আপনারা? মিষ্টিকে নিয়ে বেরিয়েছেন? ”
মিষ্টিকে বের হবে না তো কাকে নিয়ে বের হবে? মিথি বের হবে ঘুরতে? হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ তো আর কাকে নিয়ে বের হবো? ”
মিথি মুখ থমথমে করল। পরমুহুর্তেই প্রশ্ন ছুড়ল,
“ দুইজনে অনেকটুকু ঘুরে নিয়েছেন? ”
হিমেল হেসে বলল,

“ হু, হিম আর হিমের মিষ্টি মেয়ে ঘুরেছে অনেক। কেন? তোর এত কৌতুহল কেন? তোরও আমাদের সাথে ঘুরার ইচ্ছে হচ্ছে নাকি? ”
“ নিয়ে তো যান নি আর। এখন বলে আর কি লাভ? ”
হিমেল নিঃশব্দেই হেসে ফেলল ঠোঁট এলিয়ে। কয়েক সেকেন্ড হেসে উত্তর করল,
“ আপনার আসার ইচ্ছা আছে মিসেস সারফারাজ? প্লিজ প্লিজ আসুস। আপনি কোথায় আছেন? আমরা আসছি এক্ষুনি…আমাদের সাথে জয়েন করে ধন্য করুন। ”
মিথি তখন ফের সিঁড়ি বেয়ে নামছিলই। উদ্দেশ্য হিমেলরা কোথায় আছে জেনে ওখানে যাবে। নামতে নামতেই বলল,
“ প্রথমে যখন নেননি এখন আর নিয়ে কি হবে? ”
“ অনেককিছু হবে। আপনার ইচ্ছে পূরণ কিংবা হতে পারে আমারও ইচ্ছে পূরণ হবে। বুকের ভেতর টলমলে অনুভূতিটা নিয়ে শহর ঘুরব আমি, আপনি আর মিষ্টি! বহুদিনের স্বপ্ন মিসেস সারফারাজ আহমেদ। ”
মিথি মাথা নুঁইয়ে ফেলল কেমন। ফোনের এপ্রান্তে সে তবুও শেষ সম্বোধনটা কেমন ছুঁয়ে গেল তাকে। অদ্ভুত এক অনুভূতি ঘিরে ধরল হৃদয়টাকে। মিথি কিয়ৎক্ষন চুপই থাকল। এরপর বলল,
“ কোথায় আছেন? ”

হিমেল মৃদু হাসল।বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরের রাস্তার মোড়টাতেই দাঁড়ানো ছিল সে। অস্পষ্ট হলেও বিল্ডিংয়ের গেইট দিয়ে ফেরিয়ে আসা মিথি চোখে পড়ল ওখান থেকেই। অতঃপর হেসেই বলল,
“ এইতো সামনের রাস্তার মোড়ে। আপনাকে বের হতে দেখছি দাঁড়িয়ে.. ”
মিথি ভ্রু কুঁচকে চাইল। হ্যাঁ। দূর থেকে দেখা গেল হিমেলকে। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে কানে ফোন চেপে ধরা। মিথি দূর থেকে চেয়ে পা বাড়াল এবারে। একটুখানি পর হাজির ও হলো হিমেল আর মিষ্টির কাছে। এগিয়ে বলল,
“ আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরলেন? কারণ কি? ”
হিমেল হাসল কেমন। মনে মনে বিড়বিড় করল, “ হয়তো আল্লাহ চাইছিল আজ আমি আমার দুই দুইজন মিথিফুলের সঙ্গে সঙ্গে শহর ঘুরি তাই। ”
কিন্তু মুখে বলল,
“ এমনিই। মন চাইল। ঘোরাঘুরিতে আপনারও মত থাকলে এমন প্রায়সই তাড়াতাড়ি ফিরব বাসায়। ”
মিথি শুধু হাসল। পা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
“ ঘোরাঘুরি করা মনের জন্য ভালোই তো। অমত কেন থাকবে? ”
হিমেল উত্তর করে না। চাপা হাসে কেবল। অতঃপর মিষ্টিকে কোলে করে পা বাড়াল। মিথি মাঝে বলল,
“ প্রাণকে বরং আমার কোলে দিন। ”
“ তোর কোলে যাবে বলেছে ও? ”
“ আমার কোলে এলেও ক্ষতি কি? ”
হিমেল উত্তর করল,
“ ক্ষতি কিছুই না। আমার কোলেই থাকুক। ”

অতঃপর তিনজনেই ঘুরতে ঘুরতে গেল কাছেপিঠে বসা এক মেলায়। বাহারি রকমের জিনিস উঠেছে মেলার আনাচে কানাচে। কাপড়, চুড়ি, ব্যাগ আরো কত কি জিনিস।খুব একটা ভীড় নেই আবার মানুষজন নেই বললেও চলে না। হিমেল ওভাবেই মিষ্টিকে কোলে করে হাঁটছিল। তাদের আগেই মিথি। মাঝে একবার ঘাড় ফেরাল মিথি। হেসে বলল,
“ এর আগে মেলায় ঘুরেছেন কখনো?”
“ এর আগে ঘুরার মানুষ ছিল কোথায় যে ঘুরব? ”
মিথি আবারও সামনে ফিরল। উত্তর দিল না। পা বাড়া বাড়াতেই একটা ব্যাগের দোকানে পা থামাল। দোকানদারের সাথে এইসেই বলছিল। হিমেল দুয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়েই পাশের দোকানটায় তাকাল। বাহারি রকমের কাঁচের চুড়িসহ প্রসাধনী সামগ্রী। হিমেল একটু তাকিয়েই ওখানে গেল। মাঝে ছোটবাচ্চাদের ও কিছু চুড়ি ছিল। তবে কাঁচের চুড়ি গুলোর মধ্যে ছোট হাতের চুড়ি দেখলই না। হিমেল চেয়ে চেয়ই খুঁজল। অতঃপর কাঁচের লাল চুড়িগুলো হাতে তুলে নিয়ে দোকানদারকে বলল,

“ মামা ? এই লাল চুড়িটার মতোই ছোট লাল চুড়ি হবে না? ”
এরপরই মিষ্টির হাতটা তুলে ধরল। নরম বাচ্চামতো হাতটা তুলে ধরেই বলল,
“ মানে এই যে, ওর হাতে হলেই হতো আরকি। ”
দোকানদার মামা চাইলেন এবারে হিমেলের কোলে থাকা ছোট্ট পুতুলটার দিকে। একটু খানি তাকিয়েই যেন চোখ ফেরে না। হেসে বললেন,
“ মাশাল্লাহ! মেয়ে নাকি আব্বা? ”
হিমেল হাসল। মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ হু মামা। বহু কষ্টে পাওয়া মেয়ে। ”
ভদ্রলোক হাসলেন। হাত দেখে বললেন,
“ কাঁচের চুড়ি তো এতো ছোট সাইজের নেই আব্বা। তবে অন্য চুড়ি আছে। ”
হিমেলের মুখটায় এবার একটু হতাশা ফুটল। ভেবেছিল কাঁচের চুড়ি থাকবে মিষ্টির হাতের। একইরকম চুড়ি মিথির জন্যও নিত, মিষ্টির জন্যও নিত। কিন্তু তা হলো না। অতঃপর দোকানদার চাচা অন্য চুড়িই দেখালেন। হিমেলও ওগুলাই নিল। মিথির জন্য লাল কাঁচের চুড়ি গুলাও নিল। অতঃপর হেসে দোকানদারকে বলল,
” আমার বাচ্চা ফুলটাকে চুড়িতে খুব মানাবে বলুন মামা? ”
“ হ । মানাবে খুব। ”

হিমেল হাসল। অল্প কিছুটা সময় ছোট্ট ছোট্ট চুড়ি গুলোর দিকে তাকিয়ে ও রইল। মিষ্টিকে পরালে কেমন লাগবে তা বোধহয় কল্পনাও করার চেষ্টা করল। একটা অস্থিরতাও কাজ করছে। ধৈর্যশীল হিমেলের বাসায় গিয়ে মিষ্টিকে চুড়িগুলো পরানোর মতো ধৈর্য্য হলো না। মনে মনে বিড়বিড় করল,
“ আমার বাচ্চা মিথিফুলের জন্য বাচ্চা চুড়ি! কি দারুণ। ”
এইটুকু বলেই ফিরে চাইল একবার মিথির দিকেও। তখনও বোধহয় ব্যাগ দামাদামি করছিল। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। মিষ্টিকে নিয়ে একপাশটায় বসে এবার চুড়ি গুলো হাতে নিল। অপর হাতে মিষ্টির একটা হাত তুলে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে বলল,
“ আম্মু হাতটা দাও তো। ”
মিষ্টি নিজে থেকেই হাত বাড়িয়ে ধরল। উৎসুক হয়ে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলল,
“ হিম এতা? ”
হিমেল হেসে ফেলল। মিষ্টির হাতে তুলে ধরে উত্তর দিল,
“ চুড়ি আম্মু। ”

অতঃপর একটা একটা করে বাচ্চামতো ফুলো নরম হাতে চুড়িগুলো পরাল। একবার হাত নাড়িয়ে আওয়াজ করেও দেখল। হিমেল বেশ কিছুক্ষণই তাকিয়ে রইল। সুন্দর না? অনেক বেশি সুন্দর না? মনে মনে এমন প্রশ্ন করে আবার নিজেই স্বীকার করে এটার চেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়ই না। হিমেল হাসে। মিষ্টি দুই হাতই নিজের দুই হাতে ধরে তুলে ধরল পরমুহুর্তেই৷ অতঃপর ঝুঁকে নিজের ঠোঁটজোড়া দিয়ে স্পর্শ করল মিষ্টির হাত জোড়াতেই। চোখে হেসে বলল,
“ মিষ্টি আম্মু চুড়িগুলো কেমন? সুন্দর না? ”
মিষ্টি উচ্ছ্বাস নিয়ে চাইল। হাত জোড়া নাড়িয়ে রিনিঝিনি শব্দ তুলে উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল,
“ কি তুন্নর হিম। ”
হিমেল ফের হেসে ফেলল ঠোঁট এলিয়ে। বাচ্চা মিথিফুল এতো আদুরে কেন? কথা বলাটাও হৃদয় শান্ত করে দেয়। সাথে উচ্ছ্বাস নিয়ে হাসিটা তো বলতেই হয়না। মাশাল্লাহ! হিমেল এইটুকু বিড়বিড় করতে করতেই ঘাড় ফেরাতেই দেখল মিথি তাদের থেকে একটুখানি দূরেই দাঁড়ানো। বুকে হাত গুঁজেই দেখছিল দৃশ্যটা। অতঃপর হিমেলকে তাকাতে দেখেই নজর ফেরাল দ্রুত। এগিয়ে এসে হেসে বলল,
“ দুইজনে এখানে? আমি আরো আপনাদের খুঁজছিলাম? ”
হিমেল প্রশ্ন ছুড়ল,

“ কতক্ষন খুঁজলি? ”
সত্যিটা হলো মিথি বেশিটা সময় খুঁজেনি। এইতো দোকান থেকে বের হয়েই চারদিকে চোখ বুলাতেই হিমেলদের দেখতে পেয়েছিল। তবুও বলল,
“ অনেকটা সময়। না বলেই বা আসলেন কেন? ”
“ তো ওখানে দাঁড়িয়ে তোর মতো ব্যাগ দামাদামি করব? যে দাম বলেছে ঐ দামে নিয়ে নিলেই তো হয়। ”
“ ঐ দামে নিয়ে নিলে ঠকে যাব। জীবনে বহু ঠকেছি, কিন্তু এখন সাবধানে পা বাড়াতে শিখে গেছি। ”
“ গুড। এখন চল। ”
অতঃপর এইটুকু বলেই ফের আবার উঠে দাঁড়াল। মিথিও পা বাড়াতে নিল। অথচ সামনে পড়া একটা ইটের টুকরোর সাথে হোঁচট খেয়ে যেই না পড়তে নিবে তখনই হিমেল হাত টেনে ধরল। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ এই তোর সাবধানে পা বাড়ানোর নমুনা? ”
মিথি ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। পরমুহুর্তেই মনে হলো সাবধানে পা বাড়াতে গিয়ে ভুল হলেও এখন তার জীবনে এমন একটা মানুষ আছে যে তাকে ভুল থেকে দূরে রাখতে পারবে। সবসময় আগলে রাখতে পারবে। তার জীবনের নিরাপদ স্থান।

মিথি-হিমেলরা ফিরল আরো অনেকটা সময় ঘুরেই। টিউশনির পর পুরো সন্ধ্যেটা ঘুরার পর মিথি ক্লান্ত হলেও হিমেলের ক্লান্ত লাগেনি। একটুও না। বরং মনটা ফুরফুরে লাগছিল ভীষণ। কোথাও বোধহয় সুখ সুখ অনুভবও হচ্ছিল। হিমেল বেলকনিতেই বসা ছিল। চোখ বুঝে নিল। বুঝার চেষ্টা করে এত সুখ রাখবে কোথায়? রাখার জায়গা আছে আধৌ? হিমেল ঐ সুখ সুখ অনুভূতি নিয়েই বেলকনিতে বসে থাকল আরো অনেকটা সময়। অন্যদিকে মিথি তখন রান্নাঘরে। একটু আগে দেখে এসেছিল হিমেল মিষ্টিকে ঘুম পাড়াচ্ছিল রুমে। মিথি সময় দেখছিল। হিমেলের কাল জম্মদিন। তার জীবনের বিশ্বস্ত পুরুষের জম্মদিনে উপহার হিসেবে কি দিবে এই ভাবনাটা এল রান্নাঘরে কাজ করতে করতেই। জম্মদিনের বিষয়টা জানলেও তার এসব উপহার সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই। কখনো দেওয়াও হয়নি কাউকে। তবুও হিমেলের জন্য একটা পাঞ্জাবীই নিয়েছিল সে। এর বাইরেও মিথি অনেককিছুই ভাবল। ভেবে ভেবেই মনে হলো কিছুই মাথায় আসছে না তার। মাথা খালি লাগছে। উপায় না পেয়ে মিথি ফোনটা নিয়ে কল দিল আয়মানকেই। উপহার হিসেবে কি দিলে হিমেল খুশি হবে এমন প্রশ্ন করতেই আয়মান হাসল সর্বপ্রথম। অতঃপর হাসি শেষেই উপদেশের ন্যায় বলল,

“ তুমি মিথিটাই হিমেলের কাছে সর্বশ্রেষ্ট উপহার মিথি। তুমি নিজেও জানো না হিমেল তোমাকে পেয়ে কতোটা খুশি হয়েছে। উপহার হিসেবে কি দেওয়া উচিত বলি মিথি। যাতে হিমেল সবচাইতে বেশি খুশি হবে? ”
মিথি আগ্রহী হয়েই শুনতে চাইল,
“ হু। ”
আয়মান একটু সময় নিয়ে জানাল,
“ ভালোবাসো তো হিমেলকে। এই স্বীকারোক্তিটাই উপহার স্বরূপ আমার বন্ধুকে দিও। আমি জানি, এর থেকে বেস্ট গিফ্ট হিমেল ওর জন্মদিনে আশা করবে না। ”
মিথি চুপ থাকল। শুনল। অতঃপর জানাল,
“ রাখলাম তাহলে আয়মান ভাই। ”
মিথি সত্যিই রাখল। অতঃপর মাছ মাখাল হলুদ, লবণ দিয়ে। কড়াইতে তেল গরম হতে দিয়ে আবারও ভাবল স্বীকারোক্তি? কি করে দিবে? মুখে বলবে? বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করা এক অনুভূতি নিয়ে এসব ভাবতে ভাবতেই কড়াইতে গরম তেলে মাছ রাখল।
মেলায় ঘুরার মাঝেই হিমেল দু দুটো শাড়ি নিয়েছিল মিথির অগোচরেই। একটা বড়দের, আরেকটা মিষ্টির জন্য। মেলা থেকে বেরিয়ে আসার মুহুর্তে বকুল ফুল আর বেলি ফুলের মালা দেখে ওখান থেকে মালাও নিয়েছিল। সাথে সে চুড়ি গুলো। ব্যাগটা অবহেলায় খাটের পাশে পড়ে থাকতেই হিমেল এগিয়ে এল। গুঁটি গুঁটি পায়ে এসে মিষ্টিকে দেখে নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ঘুমন্ত মিষ্টির কপালে। বলল,

“ আপনি সত্যিই আপনার আম্মুর মতোই মিষ্টি। ”
এইটুকু বলেই চোখে হাসল। ব্যাগ থেকে কাঁচের চুড়িগুলো নিয়ে গেল মিথির কাছে। অতঃপর মিথিকে রান্না করতে দেখেই গম্ভীর স্বরে বলল,
“ মিথি, তোর হাতটা একটু দিবি? ”
মিথি তখন মাছ ভাজা উল্টে দিচ্ছিল চামচ নিয়ে। ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ কেন? ”
হিমেল ত্যাড়া স্বরে জানাল,
“ তোর হাত বিক্রি করে দিব তাই। ”
মিথি একনজর তাকাল এবার। ফের মাছ ভাজাতে নজর ফেলে বামহাতটা এগিয়ে দিল হিমেলের দিকে। হিমেল হাসল এবারে। অতঃপর পত্রিকার কাগজ মোড়ানো লাল কাঁচের চুড়িগুলো থেকে মুড়িয়ে রাখা কাগজটা ফেলর দিয়ে সযত্নে ধরল মিথির হাতটা। একে একে চুড়িগুলো পরিয়ে দিতে দিতেই গুনগুণিয়ে কোন সুর তুলল গলায়। মিথি ফিরে তাকানোর আগেই হাতটা ওভাবে ধরেই টুপ করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল হাতের উপরিভাগে। গম্ভীর গলায় বলল,
“ দুটো লাল শাড়ি নিয়েছি।একটা আপনার, অন্যটা মিষ্টির। একটা বকুলের মালাও নিয়েছি। পরে উদ্ধার করবেন মিসেস। ”
মিথি ঘাড় ফিরিয়ে চাইতে চাইতেই হিমেল উল্টোদিকে ফিরে পা বাড়িয়েছে ততক্ষনে। মিথি শুধু নজর স্থির রেখে একবার তাকাল হাতের চুড়িগুলোর দিকে, আরেকবার হাতের উপরিভাগের জায়গাটুকুতে। স্পর্শটা? স্পর্শ টা কি…

মিথি এসব ভাবতে গিয়েই মাছ ভাজা পুড়ে গেল কিছুটা। অল্প একটি কালচে দাগ পড়ে গেছে মাছে। মিথি নিরাশ চাহনিতে তাকাল কেবল
ভাত বাড়তে বাড়তে ঐ পোড়া মাছটুকুই প্লেটে রাখল। এতোটাও পুড়েনি যে খাওয়া যাবে না। আবার সামান্য দাগ পড়ে গেছে বলর মিথির খারাপও লাগছিল। অতঃপর ওসব ভাবনা রেখেই খাবার প্লেট নিয়ে হাজির হয়েই হিমেলকে বলল,
“ আপনার জন্য মাছ ভাজা পুড়ে গেল।”
হিমেল হাত ধুঁতে লাগল। ঐ সময়েই কথাটা শুনে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ আমার জন্য? ”
“ আপনার জন্যই তো।”
“ মিথ্যে দোষ দিবি না মিথি। নিজে কার না কার কঠিন প্রেমে পড়ে রান্নায় অমনোযোগী ছিলি। এখন দোষ আমার? সত্যি করে বল তো, কার প্রেমে পড়েছিস? ”
“ মজা করছেন? ”
“ একদম না। বলে দে । আমি কিচ্ছু বলব না। ”
“ বলব না। ”
“ সত্যি বলছি কিচ্ছু করব না। বলে দিলে তোর অপরাধও ভালো কাজ হিসেবে মেনে নিব। ”
“ আমি অপরাধই করি না। সব ভালো কাজই করি। ”
“ ওকে থাক। আমি খুঁজে নিব। ”
মিথি এরপর আর কিছু বলল না। না তো হিমেল বলল।

সারাদিন তীব্র গরমের পর রাতে শহর ছুঁইয়ে নেমেছে অঝোর বৃষ্টির ধারা। সারা শহর শীতল করতেই তীব্র বর্ষণ যখন বাইরেটা ঘিরে রাখল তখন মিথি জানালার ধারে দাঁড়ানো। বৃষ্টির অল্প কয়েক ফোঁটা ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শরীরও। হিমেল তখনও বিছানার পাশেই বসে মিষ্টিকে পরখ করছিল। মিথি ভেবেছিল সত্যিই হিমেলের দেওয়া শাড়িটা পরবে। চুলে জড়াবে বকুলের মালাটাও। হাতে কাঁচের চুড়ি গুলো থাকবে। অতঃপর এভাবেই নাহয় মিথি দিত উপহারস্বরূপ স্বীকারোক্তিটা। কিন্তু হিমেলকে নিজের ঘরে যেতে না বলল,
“ ঘুমোবেন না? রাত অনেক হলো তো।”
হিমেল ঘড়িতে চোখ বুলাল। প্রায় সাড়ে এগারোটা। ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
“ তো? ”
“ এমনিই। ”
হিমেল উঠল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“ যা বলার সরাসরিই বল মিথি। রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে বলা যায় না? ”
মিথি আহত ভঙ্গিতে তাকাল। বলল,
“ আমি এমনটা বলতে চাইনি যে বলব।”
হিমেল ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বলল,
“ কি বলতে চেয়েছিলি তাহলে? রুম থেকে বেরিয়ে না গিয়ে এই রুমেই থাকি এটা? ”
মিথি বোধহয় এবার নড়বড়ে হয়ে এল
উত্তর দিল,

“ কিছুই বলতে চাইনি। ”
এইটুকু বলেই মিথি নজর নামিয়ে নিল কেমন। এই পুরুষটা চাহনিও আজকাল মারাত্নক ঠেকে। এই যে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নটা করল মিথি সত্যি এইটুকুতেই নুঁইয়ে গেল । অথচ কথাটা সাংঘাতিক কোন কথা। না তো তাদের মাঝে ঘটল। তবুও চাহনিতেই মিথি নত হলো। হিমেল ফের আবারও ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ সত্যিই? ”
“ সত্যি। ”
হিমেল হাসল আড়ালে। চাপা হাসি। পা বাড়াল নিজের রুমের দিকেই। মিথি শুধু দেখল তাকিয়ে। কিয়ৎক্ষন তাকিয়ে থেকে ঐ ব্যাগটা থেকেই হিমেলের কেনা শাড়িটা নিল। লাল রাঙা শাড়ি! দু দুটো শাড়ির মধ্যে থেকে ছোটদের শাড়িটা আলাদা রেখে নিজের জন্য আনা শাড়িটাই নিল। অতঃপর অল্প একটু সময় নিয়ে যত্ন নিয়েই শাড়িটা পরল। জীবনের এতগুলো বছরে এই প্রথম বোধহয় সে বুকভর্তি অনুভূতি নিয়ে কারোর জন্য শাড়ি পরেছে। হাতের চুড়িগুলোর রিনিঝিনি শব্দ তুলর নিজেই চাইল। অতঃপর বকুলের মালা হাতে তুলল। একদম নেতিয়ে যায়নি, আবার একদম উজ্জ্বল ও থাকেনি। তবে একটা বকুলময় ঘ্রাণ এসে ঠেকছে নাসারন্ধ্রে। মিথি ওটা চুলে দিতে চাইল। অবশেষে ক্লিপ দিয়ে আটকাল। ঘড়িতে চেয়ে দেখল তখন অনেক রাত পেরিয়েছে। মনে মনে ভাবল হিমেল হয়তো ঘুমিয়ে গিয়েছে। তবুও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। বিছানার ধারে এসে ঘুমন্ত মিষ্টিকে দেখে হাসল। ঝুঁকে মিষ্টির কপালে চুমু এঁকে বলল,

“ আম্মু একটু পর আসছি হুহ?”
এইটুকু বলেই ছোটবেলার মতো করে চারপাশেই বালিশ দিল মিথি। আলো জ্বালিয়ে রেখেই পা বাড়াল এবার হিমেলের রুমের দিকে। অতঃপর হিমেলের রুমের সামনে এসেই থমকে দাঁড়াল। দরজা খোলা কি বন্ধ, খোলা কি বন্ধ এইটুকু ভেবেই দরজায় টোকা দিতে চাইল। কিন্তু পরমুহুর্তেই দরজা ঠেলে দেখল দরজাটা খোলাই আছ।শুধু ভিড়িয়ে দেওয়া ছিল। মিথি গুঁটি গুঁটি পায়ে ডুকল রুমে বুকের ভেতর টলমলে এক অনুভূতি নিয়ে যখন দেখল হিমেল রুমে নেই তখন বেলকনির দিকে পা বাড়াল। নিঃশব্দেই পা বাড়িয়ে বেলকনির এককোণে দাঁড়িয়েই তাকাল হিমেলের দিকে। বাইরে বৃষ্টির দাপট এতোটাই যে বেলকনির গ্রিল দিয়ে তা এসে পৌঁছাল মিথির চোখে মুখেও। শাড়ির একাংশ প্রায় ভিজে এসেছে সেই বৃষ্টির ছোঁয়াতেই। হিমেল তখনো আকাশপানে চেয়ে আছে। গলায় গুণগুনে একটা সুর। বৃষ্টির দাপটে আর ঝমঝম আওয়াজে বোধহয় তার খেয়ালই হলো না মিথি এসে দাঁড়িয়েছে। কিংবা হয়তো আশাও করেনি মিথি আসবে। মিথি তাকাল। হিমেলের কন্ঠটা গম্ভীর হলেও দারুণ শোনায়। আর সে চমৎকার কন্ঠেই এই তীব্র বৃষ্টির মধ্যে হিমেল গেয়ে উঠল,

“ ভালোবাসি বলে দাও আমায়,
বলে দাও হ্যাঁ সব কবুল।
তুমি শুধু আমারই হবে,
যদি করো মিষ্টি এই ভুল….”
মিথি স্থির চোখে চেয়েই শুনছিল। বৃষ্টির ফোঁটার সাথে সাথে বোধহয় এই গানের প্রতিটা শব্দও এসে ছুঁয়ে গেল তার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ। হিমেল আনমনেই প্রায় কয়েক সেকেন্ড নিয়ে গাইল গানটা। মিথি তখন মাথা নিচু করা। ঠোঁটে ঠোঁটে চেপে মৃদু হেসে এবার নিজেও গাইল পা ঘুরিয়ে চলে যেতে নিয়েই,
“ ভালোবাসি বলেই দিলাম,
বলে দিলাম হ্যাঁ সব কবুল।
আমি শুধু তোমারই হবো,
যদি মানো এই আর্জি…”
হিমেল প্রায় অবিশ্বাস্য নজরেই ঘাড় ফেরাল এবারে। বিষয়টা বুঝে উঠতে বোধহয় সেকেন্ড খানেক সময় লাগল। অতঃপর চোখের সামনে মিথিকে দেখতে পেয়ে এবং সুরে সুরে বলা কথা গুলো আরো একবার মস্তিষ্কের মধ্যে সাজিয়েই হিমেল চাইল। বিড়বিড় করল,

“ মিথি গাইল এটা? ”
সুরেলা কন্ঠটা মিথিরই। গেয়েছে ও মিথিই। হিমেলের বুঝতে অসুবিধে হয় না। মিথি তখন ও বেলকনি পেরিয়ে রুমে পা রাখে নি। হিমেল অপেক্ষা করল না। হৃদয়ের ভেতর দাপিয়ে উঠা সুখ, অনুভূতিতে ডুব দিয়েই মিথির হাত টেনে ধরল। বলল,
“ মিথি, কি বললি? আরেকবার বলে যা তো..”
মিথি তখনই উত্তর করল না। ঘাড় ফিরিয়ে চাইল শুধু। হিমেল আলো -আঁধারে খেলা বেলকনিতে আরো একবার বলল,
“ কোন আর্জির কথা বললি মিথিফুল? আমি শুনতে চাই..”
এইটুকু বলতে বলতেই হিমেল পা এগোল আরো। অতঃপর একটু একটু করে একদম মিথির সামনেই দাঁড়াল। দূরত্ব গুঁছিয়ে নিয়ে ঝুঁকল অল্প একটু। ফের আবারও বলল,
“ আর্জিটুকু বল মিথিফুল।প্রমিস, মেনে নিব। ”
মিথি বলতে পারল না। চারপাশে ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সাথে বৃষ্টির জোরালো ধারা । মিথির পিঠটা প্রায় বেলকনির গ্রিলে গিয়েই ঠেকেছে। বৃষ্টির দাপটে এখন শাড়ির প্রায় অর্ধাংশই ভিজে চুপসে গিয়েছে শরীরে। মিথি শুকনো ঢোক গিলল কেবল। কপাল তুলে চাইতেই হিমেলের কপালে ঠেকল নিজের কপাল। হিমেলের চাহনি তখনও স্থির। মিথির দিকেই তাক করা। অতঃপর কপালে কপাল ঠেকিয়েই আবারও বলল মিথিকে,
“ একটু আগের সব মিথ্যে? এমনিই গেয়েছিস ঐটুকু তাই না? ”
মিথি চাইল। হিমেলের চাহনি আহতদের মতোই দেখাল যেন। অথচ মিথি মিথ্যে বলেনি। এমনি এমনি ও গায় নি৷ হিমেলের আহত চাহনি দেখে উত্তরে শুধু বলল,

“ না। ”
এইটুকু বলেই মাথা নামাল দ্রুত। হিমেল শুনল। বৃষ্টির ধারাতে সেও ভিজল। সাদা শার্টটা ভিজে প্রায় চুপসে গিয়েছে বুকের কাছটায়। ফোঁটা ফোঁটা পানি মুখ, চোখ, গলায় স্থান করে নিয়েছে নিজেদের মতোই। একই ভাবে বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা পানি ছুঁয়ে গেল মিথিকেও। মুখ চোখে সে ফোঁটা ফোঁটা পানি পরখ করেই হিমেল মাথা নামাল আরেকটু। চাপা হেসে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ তাহলে আর্জিটুকু পেশ করুন। আপনার জন্য সব আর্জি মেনে নেওয়া হবে মিসেস সারফারাজ আহমেদ হিমেল। আপনি শুধু আমার থাকবেন এইটুকু হলেই চলবে। ”
মিথি জড়োসড়ো তবে ওভাবেই দাঁড়ানো। সরাসরি আর্জি ও জানাল না। হিমেল চাইল। হেসে আরেকটু এগিয়েই মাথা ঝুঁকাল পুরোপুরি। অতঃপর এই প্রথমবারের মতোই খুব সযত্নে তার ঠোঁটজোড়া ছুঁয়ে গেল মিথির ভেজা কপাল। ফিসফিস স্বরে বলল,

“ বৃষ্টিরা তোকে ছুঁয়ে যেতে পারে, অথচ আমি অধমের কি ঐটুকু অধিকার ও নেই। তুই তো দিলি না। ”
এইযে কথা গুলো বলল এখনো তো তার কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে হিমেলের ঠোঁট। তবুও অধিকার নেই? মিথি যখন মাথা তুলে চাইতে নিবে ঠিক তখনই হিমেল দ্বিতীয়বারের মতো মিথির গালে লেগে থাকা ফোঁটা ফোঁটা পানিগুলোকে মুঁছে নিতে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল মিথির ডান গালে। অতঃপর ঠোঁটজোড়ার স্পর্শে একটু একটু করে বৃষ্টির পানির ছিটকে গুলো মুঁছে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ ভালোবাসার মানুষটা আমার। অথচ বৃষ্টিটুকু তোর চোখেমুখে এমনভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে যেন অধিকার তারই। তুই কি আমার থেকেও বৃষ্টিকে প্রাধান্য দিয়েছিস বেশি? ”

মিথি কেমন গুঁটিয়ে গেল হিমেলের ঐটুকু স্পর্শেই। শুধু মাথা নাড়িয়ে এইটুকুই বুঝাল যে না, সে বৃষ্টিকে প্রাধান্য দেয়নি। যেদিন থেকে হিমেলকে হারানোর উপলব্ধিটা সে পেয়েছে সেদিন থেকেই হিমেল ভাইয়ের ভালোবাসাকে কম গুরুত্ব দেওয়ার মতো সাহস তার হয়েই উঠেনি। আর না তো এই সাহস সে করবে। হিমেল শুধু চেয়ে দেখল। অতঃপর ঠোঁট এলিয়ে হেসে মিথির কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে শীতল চাহনি ফেলেই ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তাহলে কি সারফারাজ আহমেদ হিমেলকেই প্রাধান্য দিয়েছিস? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬২

মিথি বোধহয় এই প্রশ্নের উত্তরটা নিরবতা দিয়েই দিল। অতঃপর সে নিরবতার সাক্ষী হিসেবে এই বৃষ্টিময় রাত্রিতে মিথি সত্যি সত্যিই সারফারাজ আহমেদ হিমেলকেই প্রাধান্য দিল। প্রাধান্য দিল পুরুষটার অনুভূতিকে,
ভালোবাসাকে। বৃষ্টিময় মুহুর্তটা সত্যিই নেমে এল দুইজনের ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলোর গভীরতা প্রকাশ করার এক নিঃশব্দ সুযোগ হিসেবে।
দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি, ভালোবাসা সবকিছুর পূর্ণতা হিসেবেই। যেন পুরো মুহুর্তটাই স্নিগ্ধ, শান্ত এক স্বীকারোক্তি।

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬৪