ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৭+৩৮
তানিশা ভট্টাচার্য্য
১৮ই নভেম্বরের কুয়াশাভেজা নরম সকাল। অভিক সাহেবদের ড্রয়িংরুমে আজ সাজ সাজ রব। একটু পরে সকলেই রওনা দেবেন রুদ্র বাবুদের বাড়িতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের যাওয়ার কথা ছিল আরও একদিন পরে।
রুদ্র বাবুর একমাত্র ছেলে তৃষাণের জন্মদিন। উৎসবের আলোকসজ্জা এখনো হয়তো পুরোপুরি বসেনি, কিন্তু রুদ্র বাবুর তর সইছে না। গত দুদিন ধরে তিনি আর তাঁর স্ত্রী অন্তত কম করে ৫০বার ফোন করেছেন। ফোনের ওপার থেকে বারবার ভেসে এসেছে রুদ্র বাবুর সেই চেনা কণ্ঠস্বর
“অভিক! ভাই, দুদিন আগেই চলে আয় না! কাজ তো চলতেই থাকবে, একটু আগেভাগে না এলে কি আসর জমে?”
বন্ধুর এমন আবদার আর আতিথেয়তার ব্যাকুলতাকে উপেক্ষা করার সাধ্য অভিক সাহেবের ছিল না। তাই তড়িঘড়ি করে সুটকেস গোছানো হলো। বাড়ির সকলের একসাথেই বেরোনোর কথা ছিল, তখনই বাদ সাধল তানভীর স্কুল। রাখী রায়চৌধুরী একবাক্যে বলছিলেন
-“গুল্লু স্কুল থেকে ফিরে আসুক, তারপর না হয় বিকেলে সবাই মিলেই একসঙ্গে বেরোনো যাবে।”
কিন্তু আর্ভিক আজ বড় শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে নিজের মত জানাল। সে ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-“বাবা, তোমরা অযথা দেরি করো না। রুদ্র আঙ্কেল বারবার ফোন করছেন, তোমরা এখন না গেলে উনি খুব মন খারাপ করবেন। তানভীর স্কুল শেষ হতে তো দেরি আছে। বরং এক কাজ করো, তোমরা এখন বেরিয়ে যাও। আমি বিকেলের দিকে তানভীকে সাথে করে নিয়ে যাব। তাছাড়া আমারও যেতে বিকেল হবে অফিসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। তোমরা চলে যাও আমরা দুজন একসাথে যাব।”
দাদার কথা শুনে ঋষি বলে
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“ভাইয়া তাহলে আমিও তোমার সাথে অফিস যাই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে বললে।”
আর্ভিক মুচকি হেসে জবাব দিল
-“না তুই চলে যা, আমি একা সামলে নেব।”
ঋষি আর কথা বাড়ালো না। সকালের রোদে যখন শিশিরবিন্দুরা মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছে, তখনই অভিক সাহেব, রাখী রায়চৌধুরী আর ঋষি রুদ্র বাবুদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। মূল উৎসবের এখনো দুদিন বাকি, কিন্তু এই আগাম পৌঁছানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অকৃত্রিম বন্ধুত্ব আর আন্তরিকতার এক পশলা আনন্দ।
সবাই চলে যেতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল ঘরটায়। আর্ভিক কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের শান্ত সকালটার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তানভীর রুমের দিকে। তানভীর স্কুল আছে, তাকে জাগিয়ে তোলাটা এখন তার বড় দায়িত্ব।
ঘরের নীল পর্দার আড়াল দিয়ে সকালের এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে তানভীর বিছানায়। আর্ভিক দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। অঘোরে ঘুমাচ্ছে তার প্রনয়িনী। ঘুমের ঘোরে ওর অবিন্যস্ত চুলগুলো কপালে ছড়িয়ে আছে, মুখে এক অদ্ভুত সারল্য আর প্রশান্তি। আর্ভিক মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সেই নিষ্পাপ মুখটার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর আর্ভিক ধীর পায়ে তানভীর বিছানার কাছে গেল। তারপর খুব নিচু স্বরে ডাকল
“তানভী…ওঠ।”
তানভী ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলল। চোখের পলক বারবার ফেলে সামনের চেনা অবয়বটাকে চেনার চেষ্টা করল সে। একটু অপ্রস্তুত হয়েই উঠে বসে আধো-বোজা চোখে বলল,
-“আর্ভিক ভাই? আপনি এখানে?”
আর্ভিক বিছানার একপাশে বসে মৃদু হেসে ওর মাথায় হাত রাখল। স্নিগ্ধ স্বরে বলল,
-“হ্যাঁ, আমি। সবাই তোদের বাড়িতে চলে গেছে। এখন চটপট উঠে স্কুলের জন্য রেডি হয়ে নে তো। তুই স্কুল থেকে ফিরলে বিকেলে আমি আর তুই একসাথে যাব।”
তানভীর চোখে তখনো ঘুমের ঘোর থাকলেও আর্ভিক ভাইয়ের আশ্বাসে একটা চওড়া হাসি ফুটল ওর ঠোঁটে। আর্ভিক উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
-“যা, আর দেরি করিস না। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়, আমি তোর জন্য ব্রেকফাস্ট রেডি করছি।”
তানভীর আলসেমি মাখা মাথা নাড়া দেখে আর্ভিক ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তানভী তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিল, তাড়াতাড়ি রেডি হতে গিয়ে সে আর্ভিকের দেওয়া ঘড়িটা পড়তে ভুলে গেছে। এরপর ব্রেকফাস্ট করে আর্ভিক তানভীকে স্কুলে ছাড়তে গেল। তানভীর স্কুলের গেটের সামনে আর্ভিক গাড়ি থামাল। তানভী গাড়ি থেকে নেমে গেলে আর্ভিক তার হাতে ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে একটু গম্ভীর হয়েই বলল
-“শোন , আজ অফিসে একটা খুব জরুরি মিটিং আছে, তাই আজ ক্লাসেও আমার যাওয়া হবে না। আর স্কুল এক পিরিয়ড আগে ছুটি হবে, তুই এখানে অপেক্ষা করবি। আমি ড্রাইভার আঙ্কেলকে বলে দিয়েছি, উনি ঠিক সময়ে তোকে স্কুল থেকে পিক করে নেবেন। তুই ওনার সাথেই সোজা বাড়ি চলে যাবি। গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নিয়ে একদম রেডি হয়ে থাকবি। ”
তানভী মাথা নেড়ে আর্ভিক ভাই কে আশ্বস্ত করল। আর্ভিক একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত অফিসের দিকে গাড়ি ছোটাল।
অভিক সাহেবরা যখন রুদ্র বাবুর সদর দরজায় এসে পৌঁছালেন, তখন শরতের পড়ন্ত রোদে বাড়ির চারপাশটা এক উৎসবমুখর আমেজে ঝলমল করছে। গাড়ি থামার শব্দ পেতেই স্বয়ং রুদ্র বাবু প্রায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ওনার মুখে এক গাল হাসি।
-“আরে অভিক! সত্যি এলি তবে? আমি তো ভাবছিলাম এই বুঝি ফোনে আবার কোনো অজুহাত দিবি!”
বলতে বলতেই রুদ্র বাবু অভিক সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন।
রাখী রায়চৌধুরী গাড়ি থেকে নামতেই দোয়েল ব্যানার্জী দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন। বড় আদরের সঙ্গে তাঁদের ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,
-“আসুন, আসুন। আপনাদের ছাড়া তো উৎসবটা ঠিক জমছিলই না। ওরে বিমু, তাড়াতাড়ি শরবত নিয়ে আয়।”
ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে বসতেই অভিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন
-“রুদ্র, তুই যেভাবে বারবার ফোন শুরু করেছিলি, আমার কী আর সাধ্য ছিল বাড়িতে বসে থাকার? সব কাজ ফেলে রেখেই চলে এলাম।”
রুদ্র বাবু পরম তৃপ্তিতে সোফার এক কোণে বসে বললেন,
-“এই তো চাই! বন্ধুত্ব কি আর ক্যালেন্ডারের তারিখ মেনে চলে? তোরা এসেছিস, এখন বাড়িটা বাড়ি বলে মনে হচ্ছে। ওদিকে রান্নাবান্নার কী আয়োজন হচ্ছে জানিস? আমার গিন্নি তো কাল রাত থেকেই মেনু ঠিক করতে ব্যস্ত।”
দোয়েল ব্যানার্জী হেসে যোগ করলেন,
-“খালি রান্না নয়, আড্ডাও হবে জমিয়ে। তবে গুল্লু আর সিনু কে তো দেখছি না?”
অভিক সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
-“ওরা বিকেলে আসবে। মামনির স্কুল ছিল, তাই আর্ভিক ওকে নিয়ে পরে আসছে।”
রাখী রায়চৌধুরী সোফায় বসেই চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে স্মিত হাস্যে জিজ্ঞেস করলেন,
-“সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আমাদের নায়ক কোথায়? তাকে তো একবারও দেখছি না!”
রাখী রায়চৌধুরী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওপর তলার সিঁড়ির দিকে ইশারা করে বললেন,
-“আর বলো না দিদি সে আজ ঘরবন্দী। বাবার কাছে আচ্ছা বকা খেয়ে গাল ফুলিয়ে উপরে বসে আছে।”
অভিক সাহেব কৌতূহলী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-“সে কী! কী এমন অঘটন ঘটালো আমাদের তোজো বাবু?”
রুদ্র বাবু এবার বিরক্তি আর উদ্বেগের সুরে বললেন,
-“আর বলিস না। ছেলের শখ হয়েছে সে বাইক রাইডার হবে। ওই যে বাচ্চাদের ছোট ছোট ‘পিট বাইক’ হয় না? সেই বাইক কেনার জন্য বায়না ধরেছে। বলছে ওসব নিয়ে সে কসরত দেখাবে, রেসিং করবে। এখন এইটুকু বয়সে এসব বিপজ্জনক শখ কি মেনে নেওয়া যায়?”
দোয়েল ব্যানার্জী যোগ করলেন,
“ওর বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনোভাবেই বাইক কিনে দেওয়া হবে না। ব্যাস, তাতেই যুদ্ধ লেগে গেছে। ওদিকে বাবা চায় ছেলে বিজনেসম্যান হবে, আর ছেলে হতে চায় রাইডার। এই নিয়েই সকাল থেকে বাড়িতে মান-অভিমানের পালা চলছে।”
অভিক সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। বন্ধুর পিঠে হাত রেখে বললেন, “আরে রাখ তো রুদ্র! বয়সটাই তো স্বপ্ন দেখার। তা বলে ছেলেটাকে এভাবে বকবি?”
এরপর সবাই আতিথেয়তার আন্তরিক উষ্ণতায় আর অমায়িক হাসাহাসিতে মুহূর্তেই বাড়িটা এক প্রাণবন্ত আসরে পরিণত হলো। যেন দুই পরিবারের দীর্ঘদিনের ব্যবধান নিমেষেই ঘুচে গেল।
অফিসের জরুরি মিটিংয়ের জন্য তখন ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল আর্ভিক। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফাইল আর ল্যাপটপের নীল আলোয় তার চোখেমুখে কিছুটা ব্যস্ততার ছাপ। ঠিক সেই মুহূর্তে পকেটে রাখা ফোনটা কম্পিত হয়ে উঠল। স্ক্রিনে ড্রাইভারের নাম দেখে কিছুটা ভ্রু কুঁচকালেও ফোনটা ধরল সে। ওপাশ থেকে অত্যন্ত বিনীত ও কুণ্ঠিত স্বরে ড্রাইভার বলল,
-“স্যার, একটা কথা ছিল। আজ আমার মেয়ের জন্মদিন। সকাল থেকে মেয়েটা পথ চেয়ে বসে আছে কখন বাবা ফিরবে। যদি আজকে একটু তাড়াতাড়ি ছুটি দিতেন…”
কথাটা শুনে অভির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়মাখা হাসি ফুটে উঠল। কাজের চাপ তাকে যান্ত্রিক করে তুললেও ভেতরের মানুষটা যে এখনো সজীব, তার প্রমাণ দিতে দেরি করল না সে। ফাইলটা বন্ধ করে আর্ভিক স্নিগ্ধ গলায় বলল,
-“আরে এতে অনুমতির কী আছে? তুমি এখনই চলে যাও। আজ নয় তানভী কে স্কুল থেকে আমিই পিক করে নেব।”
ড্রাইভারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আগেই আর্ভিক যোগ করল,
-“আর শোনো, তোমার মেয়ের জন্য আমার তরফ থেকে অনেক অনেক শুভকামনা রইল। আমি তোমার একাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছি, ওকে সুন্দর একটা উপহার কিনে দিও।”
ফোনের ওপাশে তখন কেবল কৃতজ্ঞতার নিস্তব্ধতা আর আনন্দের এক দীর্ঘশ্বাস। অস্ফুট স্বরে একটা ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে ফোনটা রাখল ড্রাইভার। জানলার বাইরে বিকেলের নরম রোদে আর্ভিকের মনে হলো, মিটিংয়ের ফাইলগুলোর চেয়েও ওই ছোট্ট মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানোর তৃপ্তিটা অনেক বেশি দামী।
স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বেজেছে অনেকক্ষণ আগে। জনকোলাহল প্রায় ফুরিয়ে এখন গেটের সামনে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মেইন রোডের ঠিক ধারেই তানভী একা দাঁড়িয়ে আছে, ওর চোখেমুখে চাপা উৎকণ্ঠা। বাড়ি ফেরার গাড়িটা কেন যে এখনো এলো না, সেই দুশ্চিন্তায় বারবার এদিক সেদিক দেখছে সে। রাস্তার ঠিক উল্টো দিকের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে একদল লোক। তাদের শরীরী ভাষা আর কুৎসিত চাহনি তানভীর অস্বস্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই লোলুপ দৃষ্টিগুলো যেন ওকে বিঁধছে বারবার। রাস্তার ব্যস্ততা আছে ঠিকই, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে তানভী নিজেকে ভীষণ অসহায় বোধ করছে। জনাকীর্ণ মেইন রোডের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে।
তানভীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ হিম হয়ে এলো। আড়চোখে দেখল, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকগুলো অকারণে জটলা পাকিয়ে ধীর পায়ে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। তাদের ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা কুৎসিত হাসি আর চোখে এক বিচিত্র লালসা। রাস্তার ব্যস্ত গাড়িগুলোর শব্দ ছাপিয়ে নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি শুনতে পাচ্ছিল সে।
ওর হাতের মুঠোয় ধরা স্কুলব্যাগটা ঘামে ভিজে উঠছে। পালাতে চাইলেও যেন পা দুটো পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। চারপাশের চেনা পৃথিবীটা মুহূর্তেই অচেনা ও ভয়ংকর রূপ নিল। মেইন রোডের উজ্জ্বল আলোতেও এক পৈশাচিক অন্ধকার যেন ধীরে ধীরে ওকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে। তানভী বুঝতে পারল, আজ কেবল বাড়ি ফেরার অপেক্ষা নয়, বরং এক অসম লড়াইয়ের মুখোমুখি সে।
ভয়ে নীল হয়ে যাওয়া তানভী আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না; তিরের বেগে দৌড় দিল। পেছন থেকে লোকগুলোর পৈশাচিক অট্টহাসি আর ভারী বুটের শব্দ বুঝিয়ে দিচ্ছিল—শিকারির দল পিছু নিয়েছে। তানভীর দৌড়াতে দৌড়াতে ফুসফুস ফেটে যাওয়ার উপক্রম, চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে আর্ভিকের মুখটা বিদ্যুতের মতো ওর মনে পড়ে গেল। আর্ভিক বলেছিল, “বিপদে কখনো হার মানবি না।”
কিন্তু ভাগ্য আজ সহায় নেই। পথ ভুল করে তানভী ঢুকে পড়ল এক অন্ধকার নির্জন গলিতে। দৌড়ে গিয়ে দেখল সামনে নিরেট দেওয়াল—রাস্তা শেষ। পিঠ দেওয়ালের সাথে ঠেকে গেল ওর। শিকারি নেকড়ের মতো লোকগুলো ঘিরে ধরল ওকে। তানভী ডুকরে কেঁদে উঠল, দুই হাত জোড় করে মিনতি করতে লাগল,
-“দোহাই আপনাদের, আমাকে যেতে দিন!”
কিন্তু সেই পশুদের কানে তখন কামনার আগুন। কান্নার নোনা স্বাদ ঠোঁটে এসে লেগেছে তানভীর, বার বার করে আর্ভিকের কথা খুব মনে পড়ছে তার। তখনই মনে পড়ে আর্ভিক ওর স্কার্টে একটা গোপন পকেট বানিয়ে দিয়েছিল, যেখানে পরম যত্নে রাখা ছিল সেই বিশেষ সুরক্ষার দণ্ডটি—যা একই সাথে লাঠি আর সুইচ-ব্লেড। কাঁপতে থাকা হাতটা পকেটে গেল। আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল ধাতব হাতলটা।
লোকগুলোর মধ্যে একজন কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে তানভীর ভেতরে যেন কোনো আদিম শক্তি জেগে উঠল। আর্ভিকের নামটা মনে মনে জপ করে সে দণ্ডটির সুইচ টিপে দিল। মুহূর্তেই ঝিলিক দিয়ে বেরিয়ে এল তীক্ষ্ণ ফণা। লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তানভী সর্বশক্তি দিয়ে ছুরিটা চালিয়ে দিল তার কণ্ঠনালী বরাবর। ফিনকি দিয়ে তপ্ত রক্ত ছিটকে এল তানভীর সাদা স্কুল ইউনিফর্মে। সাদা শার্ট মুহূর্তেই লাল রক্তে ভিজে একাকার। লোকটার গোঙানি আর শরীরটা যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, বাকিরা ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। এই সুযোগ! এক মুহূর্ত দেরি না করে, জমে থাকা সবটুকু ঘৃণা আর শক্তি দিয়ে বাকিদের সজোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সে। রক্তমাখা পোশাকেই সে পাগলের মতো ছুটল আলোর দিকে, পেছনে ফেলে এল এক পৈশাচিক অন্ধকার আর নিজের এক নতুন সত্তাকে।
আর্ভিকের চঞ্চল চোখদুটো যখন স্কুল গেটের জনশূন্যতার মাঝে তার প্রিয়তমাকে খুঁজে পেল না, মুহূর্তেই ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। তানভীর বন্ধুদের মুখে যখন শুনল সে অনেক আগেই চলে গেছে, তখন এক অজানা আশঙ্কায় আর্ভিকের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। পাগলের মতো গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সে এদিক-সেদিক খুঁজতে লাগল। ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোনে বারবার ট্র্যাকিং ম্যাপটা দেখছিল সে, কিন্তু আজ কপাল মন্দ—তানভী সেই বিশেষ ঘড়িটা ছাড়াই বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।
“বউ!কোথায় গেলি তুই?”—আর্ভিকের আর্তনাদ যেন গাড়ির কাঁচের ভেতরেই গুমরে মরছিল। ঠিক তখনই মেইন রোডের বাঁকে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখল সে। একটা মেয়ে টলতে টলতে তার গাড়ির সামনে এসে পড়ল, তার সাদা স্কুল ইউনিফর্ম টাটকা লাল রক্তে ভেজা। আর্ভিক ব্রেক কষতেই দেখল, এ তো সেই! তার নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় মানুষটি।
আর্ভিক বিদ্যুৎবেগে গাড়ি থেকে নেমে এসে তানভীর কাঁপা কাঁপা দুটো গাল নিজের হাতের মধ্যে নিল।
-“এ কি অবস্থা তোর? রক্ত কেন তোর ইউনিফর্মে? কী হয়েছে বল আমায়!”
আর্ভিকের কণ্ঠস্বরে তখন উদ্বেগ আর আগুনের মিশেল। দূর থেকে সেই লোকগুলো তাড়া করে আসছিল, কিন্তু আর্ভিকের রুদ্রমূর্তি আর তার আভিজাত্যের ছাপ দেখে তারা অন্ধকারের গলিতে গা ঢাকা দিল।
তানভী কান্নায় ভেঙে পড়ে সবটুকু হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলল। শুনে আর্ভিক বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল, পরক্ষণেই এক গভীর গর্বে তার বুক ভরে উঠল। সে পরম মমতায় তানভী কে নিজের বুকের পাঁজরে টেনে নিল। তারপর মনে মনে বলল—”জেঠু মণি, তোমার মেয়ে ঠিক তোমার মতোই সাহসী হয়েছে।”
তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে অভি শান্ত গলায় বলল,
-“ভয় পাস না একদম। আমি আছি তো, কেউ তোর আর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
এরপর তানভী কে ধীরস্থিরভাবে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি থেকে একটু দূরে এসে ফোন বের করে ওপাশে কাউকে একটা কঠোর নির্দেশ দিল
-“I’m only giving you five minutes to separate each of those devils’ body parts and bring them before me.”
তারপর ফিরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে,স্টিয়ারিং হাতে নিল আর্ভিক। তানভীর দিকে এক পলক তাকিয়ে বাড়ির পথে গাড়ি ছোটাল।
বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই এক থমথমে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। আর্ভিক আলতো করে তানভীর থুতনি ধরে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখনো আতঙ্কের রেশ, কিন্তু আর্ভিক চাইল তাকে স্বাভাবিক করতে। অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে সে বলল
-“অনেক হয়েছে, এবার শান্ত হ। যা, এই রক্তমাখা জামাটা বদলে চটপট তৈরি হয়ে নে। আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”
তানভী যন্ত্রচালিতের মতো নিজের রুমে চলে গেল। আর্ভিক নিজের রুমে এসে ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিল। বরফশীতল জল যখন ওর মাথায় পড়ছিল, তখন ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল রাগে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে দেখল, তানভী আগে থেকেই সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে। তার ফর্সা মুখটা কান্নায় লাল হয়ে ফুলে গেছে, চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল।
আর্ভিক ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের হাত দিয়ে ওর চোখের জলটুকু মুছে দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল
-“কাঁদিস না আর। ওরা সবাই চরম শাস্তি পাবে, কথা দিলাম।”
তারপর ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করল
-“তোর গায়ে হাত দেওয়া মানে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটা। আমি আর্ভিক বেঁচে থাকতে আমার অর্কিডের গায়ে কেউ আঁচড় কাটতে পারবে না।”
তানভী এবার আর্ভিকের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু আশ্বস্ত বোধ করল। আর্ভিকের এই রক্ষাকর্তার রূপ তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিচ্ছিল। এরপর আর্ভিক তানভী কে নিয়ে রওনা দিল, তাদের সাথে ছিল গোল্ডি আর তানভীর গোপাল বিগ্ৰোহ।
সকাল থেকে গাল ফুলিয়ে বসে আছে ব্যানার্জী বাড়ির আদরের ছেলে তৃষাণ। দুপুরে খেতে ও আসে নি সে। সকলে অনেক ডাকাডাকি করেছে কিন্তু তাও সে আসেনি। বাধ্য হয়ে অভিক সাহেব বললেন
-“আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখছি।”
বলা মাত্র তিনি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলেন। তৃষাণের রুমের দরজাটা আধখোলা। ভেতরে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। তৃষাণ জানালার ধারে চুপচাপ বসে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। অভিক সাহেব ঘরে ঢুকে ওর মাথায় হাত রাখতেই তৃষাণ চমকে উঠল। চোখে জল টলটল করছে।
-“কী রে বাবা? তুই এভাবে অন্ধকারে বসে আছিস?”
অভিক সাহেব স্নিগ্ধ স্বরে বললেন। তৃষাণ ধরা গলায় উত্তর দিল
-“আঙ্কেল, বাবা আমার শখের কোনো দামই দেয় না। আমি কি খুব অন্যায় কিছু চেয়েছি?”
অভিক সাহেব ওকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন
-“স্বপ্ন দেখা অন্যায় নয় রে পাগল। কিন্তু তোর বাবার ভয়টা তো তোর প্রতি ভালোবাসার জন্য। চল নিচে চল। আর্ভিক ভাইয়া আর তানভী দিভাই আসছে, ওরা এলে কি আর এসব রাগারাগি মনে থাকবে?”
ঠিক সেই মুহূর্তেই নিচে বাইকের হর্ন শোনা গেল। আর্ভিক আর তানভী পৌঁছে গেছে। বাইরের বারান্দায় তানভীর হাসিখুশি গলার আওয়াজ আর আর্ভিকের গম্ভীর কণ্ঠস্বর বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। তৃষাণ চোখ মুছে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, আর্ভিক বাইক স্ট্যান্ডে রাখছে।
নিচে নামতেই দেখা গেল এক অন্য দৃশ্য। আর্ভিক কে দেখেই রুদ্র বাবু হাসিমুখে এগিয়ে এলেন, আর্ভিক রুদ্র বাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
অভিক সাহেব তৃষাণকে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে এলেন। তানভী আর আর্ভিক কে দেখেই তৃষাণ দৌড়ে গেল তাদের কাছে। তারপর তানভী কে জড়িয়ে ধরল। গোল্ডি তৃষাণ কে দেখে প্রচন্ড ডাকাডাকি করেছে। তৃষাণ তানভীকে ছেড়ে দিয়ে বলে
-“দিভাই অনেক মিস করছি”
-“আমিও অনেক মিস করছি তোকে তৃষু”
এই বলে তানভী তৃষাণ আবার জড়িয়ে ধরল। গোল্ডি সমানে ডাকাডাকি করে যাচ্ছে তৃষাণ গোল্ডিকে উদ্দেশ্য করে বলল
-“এই কুকুর এদিকে আয়! তুই এত ডাকছিস কেন?”
তৃষানের মুখে ‘কুকুর’ কথাটা শুনে তানভীর ভীষণ রাগ হয়। তাই সে তৃষাণের কান টেনে বলে
-“এই অসভ্য বাঁদর! ওর একটা সুন্দর নাম আছে।”
বেচারা তৃষাণ কানে হাত বোলাতে বোলাতে বলল
-“কী নাম?”
-“গোল্ডি”
আর্ভিক পাশে থেকে উওর দিল। তৃষাণ আর্ভিকের কাছে গেল তৃষাণকে আর্ভিক কোলে তুলে নিল তারপর চোখের ইশারায় যেন কোনো এক গোপন সমঝোতা হলো তাদের মধ্যে। এরপর ওরা সবাই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। রুদ্র বাবুদের বাড়ির বৈঠকখানা তখন পূর্ণতা পেল। অভিক সাহেবের পরিবার আর রুদ্র বাবুর পরিবারের আড্ডা, হাসি আর খুনসুটিতে জমজমাট হয়ে উঠল সন্ধ্যার আসর।
পরের দিন সকালের মিঠে রোদ যখন রুদ্র বাবুদের বিশাল বাগানে এসে পড়েছে, তখন অন্দরমহলে চলছে ব্রেকফাস্ট পরবর্তী খোশগল্প। তৃষাণ ড্রয়িংরুমের সোফায় মনমরা হয়ে বসে ছিল, যেন উৎসবের সব আলো তার কাছে ম্লান। ঠিক তখনই আর্ভিক তার পাশে এসে দাঁড়াল। মুখে রহস্যময় হাসি নিয়ে বলল
-“চল তোজো, তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
তৃষাণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্ভিক তাকে একপ্রকার পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে চলল তাদের বাড়ির সামনে বিশাল বিলাসবহুল বাগানে। সেখানে আসতেই তৃষাণ দেখল, মাঝখানে লাল কাপড়ে ঢাকা রহস্যময় এক বস্তু দাঁড়িয়ে আছে। আর্ভিক তাকে নামিয়ে দিয়ে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল
-“যা, গিয়ে কাপড়টা সরা।”
তৃষাণ কাঁপা কাঁপা হাতে লাল কাপড়টা সরিয়েই থমকে গেল। তার স্বপ্নের সেই ‘পিট বাইক’! চকচকে বডি আর সাদা রঙের গ্রাফিক্স রোদে চিকচিক করছে। তৃষাণ এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর সব বাঁধ ভেঙে সে দৌড়ে এসে আর্ভিক কে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এ কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না চরম প্রাপ্তির।
এরপর শুরু হলো প্রশিক্ষণের পালা। বাগানের ফাঁকা জায়গায় তৃষাণকে বাইকে বসিয়ে দিয়ে আর্ভিক পেছন থেকে শক্ত করে ধরে রইল। বাইকের ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর গর্জন যখন শান্ত সকালটাকে কাঁপিয়ে তুলল, তখন সেই আওয়াজে আকৃষ্ট হয়ে বাড়ির সকলে একে একে বাইরে বেরিয়ে এলেন। রুদ্র বাবুর কপালে তখনো চিন্তার ভাঁজ।
আর্ভিক তৃষাণ কে নিয়ে ধীরে ধীরে রুদ্র বাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। রুদ্র বাবুর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আর্ভিক গম্ভীর স্বরে বলল
-“আঙ্কেল, তোজোর স্বপ্নকে আমি ডানা দিলাম। তবে তোজো, তোকে আমার কাছে কথা দিতে হবে, বাইক রাইডিংয়ের নেশা যেন তোর পড়াশোনার ক্ষতি না করে। তোকে দুটোই সামলাতে হবে।”
তৃষাণ মাথা নিচু করে তার বাবার দিকে তাকাল।
-“বাবা, প্লিজ আর রাগ করো না। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমি পড়াশোনাও খুব মন দিয়ে করব।”
ছেলের চোখের আর্জি আর আর্ভিকের দায়িত্বশীলতা দেখে রুদ্র বাবুর কঠোর মনটা গলে গেল। তিনি মৃদু হেসে তৃষাণের মাথায় হাত রাখলেন। বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই আনন্দঘন হয়ে উঠল।
তানভীর মুগ্ধ চোখ দুটো যেন আর্ভিক কে নতুন করে চিনছিল। সবাই যখন হাসিমুখে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল, এমনকি তৃষাণও যখন তার সখের বাইকটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল, তানভী তখনো একা দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ আর্ভিকের গলার আওয়াজে তার ঘোর ভাঙল। আর্ভিক তানভীর সামনে এসে চোখের পলকে একটা তুড়ি বাজিয়ে বলল
-“কী রে, এখানেই কি পাকাপাকি থাকার প্ল্যান নাকি? চল এখন, অনেক কাজ বাকি!”
এই বলেই আর্ভিক লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল। তানভী কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর একগাল হাসি নিয়ে আর্ভিকের পিছু পিছু বাড়ির ভেতরে দৌড়ে গেল।
বিকেলের অলস আলো তখন জানালার কার্নিশে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আর্ভিকের পেটে তখন খিদে চনমন করছে। ড্রয়িংরুমের দিক থেকে মা আর কাকিমনির হাসাহাসি আর কাজের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আর্ভিক রুম থেকেই হাঁক ছাড়ল,
-“মা, শুনছো? খুব খিদে পেয়েছে গো! কিছু একটা দিয়ে যাও না।”
আর্ভিকের মায়ের বদলে রুমে প্রবেশ করল তানভী। সে শান্ত গলায় বলল
-“বড়মারা সবাই ব্যাস্ত। আপনার কী চাই আমাকে বলুন।”
আর্ভিক একটু ইতস্তত করে বলল
-“পেটটা খালি খালি লাগছে রে। কাউকে বল না চট করে দুটো ডিম সিদ্ধ করে দিয়ে যেতে।”
তানভী সপ্রতিভভাবে উত্তর দিল
-“সবাই ব্যস্ত, দাঁড়ান আমিই করে আনছি।”
আর্ভিক বিস্ময়ে ভ্রু কুঁচকে তানভীর দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বলল
-“তুই পারবি? থাক, তোকে হাত পোড়াতে হবে না। আমি অন্য কাউকে বলছি।”
-“আমি সব রান্না পারি, আপনি একটু অপেক্ষা করুন!”
এই বলে তানভী সগর্বে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু আর্ভিক কৌতূহল সামলাতে না পেরে পা টিপে টিপে তানভীর পিছু নিল। রান্নাঘরের দরজায় পৌঁছানোর আগেই সে দেখল, তানভী ফোনটা মুখের কাছে ধরে খুব সিরিয়াস মুখে গুগলকে জিজ্ঞেস করছে
-“হ্যালো গুগল, ডিম সিদ্ধ করতে প্রপার কত টাইম লাগে?”
পেছন থেকে আর্ভিকের অট্টহাসি শুনে তানভী চমকে উঠল। আর্ভিক হাসতে হাসতে বলল
-“তোর দৌড় তো বোঝা গেল! গুগলকে জিজ্ঞেস করে রান্না করতে হবে না, তুই বরং গিয়ে খেলনা বাটি খেল।”
তানভী অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে কৈফিয়ত দিল,
-“আরে না না, আমি পারি! কিন্তু এই ডিম সিদ্ধর ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে। সবসময় হাফ বয়েল হয়ে যায়। প্রপার টাইমটা জানার জন্যই তো জিজ্ঞেস করলাম। আমি নিয়ে আসছি, আপনি গিয়ে বসুন তো!”
তানভীর এই আদুরে জেদ আর গুগলের ওপর অগাধ ভরসা দেখে আর্ভিক আর কথা বাড়াল না। সে তার রুমে ফিরে গেল এক চিলতে হাসি মুখে নিয়ে।
ব্যানার্জী মেনশন, তৃষাণের জন্মদিনের আগের রাত। চারদিকে সাজ সাজ রব থাকলেও তানভীর কপালে জুটল পড়াশোনার কড়া শাসন। ভাইয়ের জন্মদিনের আগের দিন পর্যন্ত আর্ভিক তাকে ছাড় দেয়নি। আর্ভিকের স্পষ্ট হুকুম, “আগে পড়া শেষ কর, তারপর উৎসব।” তানভী যখন টেবিলের ওপর বই খুলে গাল ফুলিয়ে বসেছিল, ঠিক তখনই তৃষাণ ঘরে ঢুকল।
তৃষাণের মুখভঙ্গি আজ বেশ রহস্যময়। সে কাছে এসে খুব আবেগপ্রবণ গলায় বলল,
-“দিভাই, আমি তোর জন্য আজ পর্যন্ত কিছুই আনতে পারিনি। কিন্তু আজ তোর মন ভালো করতে আমি খুব সুন্দর একটা নিয়ে এসেছি! যেটা আজ পর্যন্ত কেউ কাউকে দেয়নি”
তানভীর মনটা নিমেষেই নরম হয়ে গেল। তার ছোট ভাইটা কি তবে সত্যিই ওর জন্য কোনো আশ্চর্য জিনিস নিয়ে এল? সে বই বন্ধ করে চোখ বড় বড় করে বলল,
-“সত্যি বলছিস তৃষু? দেখি কী এনেছিস!”
তৃষাণ মুচকি হেসে পকেট থেকে নীল আর লাল রঙের দুটো ইলেকট্রিক তার বের করল। একদম খাঁটি তামার তার! তৃষাণ সেগুলো তানভীর চোখের সামনে দুলিয়ে বলল,
-“এই দেখ! একটা নীল আর একটা লাল। কোনটা চাই তোর?”
মুহূর্তে তানভীর রোমাঞ্চকর স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গেল। তৃষাণের এই টেকনিক্যাল রসিকতা দেখে সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। রাগে আর বিরক্তিতে তৃষাণের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল
-“ফাজলামি করার আর জায়গা পাস না? ইলেকট্রিক তার দিয়ে আমি কী করব? বের হ এখান থেকে, আমায় একটু শান্তিতে পড়তে দে!”
বেচারা তৃষাণ নিজের ‘ভয়ংকর জোকস’ মাঠে মারা যেতে দেখে মুখটা চুন করে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
রাতের খাওয়ার টেবিলে তখন রাজকীয় আয়োজন। দোয়েল ব্যানার্জীর হাতের হরেক পদের গন্ধে বাতাস ম-ম করছে। অভিক সাহেব আর রুদ্র বাবু পুরনো দিনের স্মৃতি চর্বণ করছেন, রাখী রায়চৌধুরী আর দোয়েল ব্যানার্জী ব্যস্ত সবার পাতে খাবার তুলে দিতে। ঠিক এই সময়েই টেবিলের এক কোণে তৃষাণ তার ‘তার’ নিয়ে করা সেই ব্যর্থ কৌতুকের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। তানভী সবে একটা বড় সাইজের চিকেন লেগ-পিস মুখে তুলতে যাবে, এমন সময় তৃষাণ খুব গম্ভীর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল
-“বাবা, তোমাদের তো বলা হয়নি, দিভাই কিন্তু আজ গুগলকে দিয়ে ডিম সিদ্ধ করিয়েছে! গুগলের সাথে ওর যা দারুণ ফ্রেন্ডশিপ, আমি তো ভাবছি সামনের বছর থেকে আমার বার্থডের রান্নার ঠাকুরকে বাদ দিয়ে দিভাই কে রান্না করতে বলব আর ওখানে একটা বড় স্পিকার বসিয়ে দেব।”
তৃষাণের কথা শুনে টেবিল জুড়ে হাসির রোল উঠল। আর্ভিক এক টিপে হাসি চেপে তানভীর দিকে তাকাল। তানভী লজ্জায় রাঙা হয়ে গেছে তার ইচ্ছা করছে মাটিতে মিশে যেতে সে তৃষাণকে নিচু স্বরে ধমক দিয়ে বলল
-“তৃষু, চুপ করবি!”
অভিক সাহেব হেসে বললেন
-“আরে, এ তো আধুনিক যুগের রন্ধন প্রণালী! তা মামনি, গুগল কি লবণ-হলুদের পরিমাণটাও বলে দিচ্ছিল নাকি?”
তানভী এবার মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইল
-“আরে না না আঙ্কেল, ওটা তো শুধু টাইমিং দেখার জন্য! আর এই তৃষাণ নিজেই তো লাল-নীল ইলেকট্রিক তার দেখিয়ে আমায় ‘আশ্চর্য জিনিস’ এনেছি বলে বোকা বানাতে চেয়েছিল!”
খাওয়ার টেবিলটা যেন এক হাসির লহরীতে ভেসে গেল। আর্ভিক এবার আসরে নেমে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে দিয়ে বলল
-“তোজোর কথা বাদ দাও বাবা, তানভীর রান্নায় এতটাই ডিজিটাল টাচ ছিল যে ডিমটা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধ না হয়ে হয়তো সফটওয়্যার হয়ে গিয়েছিল!”
তানভী বেচারার অবস্থা দেখে বাড়ির বড়রা হাসতে হাসতে প্রায় নাজেহাল। তানভী রাগে তৃষাণের পায়ে টেবিলের নিচ দিয়ে একটা মৃদু লাথি মারল, আর তৃষাণ ‘উহ্’ শব্দ করে উঠতেই সবাই আবার নতুন করে হেসে উঠল। এই খাবারের টেবিলটা শুধু তৃপ্তির নয়, হয়ে উঠল অমলিন আনন্দ আর খুনসুটির এক মিলনমেলা।
ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। চারদিকের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনা বাসা বাঁধছে বাড়ির তিন মূর্তির মধ্যে—আর্ভিক, তানভী আর ঋষি। তৃষাণ তখন নিজের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঠিক বারোটা বাজার পাঁচ মিনিট আগে তারা তৃষাণের রুমে হানা দিল। ঘুমের ঘোরেই তানভী তৃষাণের চোখ বাঁধল, আর ঋষি তাকে পাজামা থেকে চটজলদি একটা নতুন স্মার্ট ড্রেস পরিয়ে দিল। তৃষাণ আধো-ঘুমে অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইলেও কেউ তার কথায় কর্ণপাত করল না।
তিনজনে মিলে ধরাধরি করে তৃষাণ কে বাড়ির সামনের রাস্তায় নিয়ে এল। রাতের অন্ধকার তখন গাঢ়, রাস্তার মোড়ে একটা বিশাল কালো রঙের লাক্সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। তৃষাণ তখনও দিশেহারা, চোখ বাঁধা অবস্থায় সে শুধু অনুভব করছে রাতের হিমেল হাওয়া আর তাদের পায়ের শব্দ। তার মাথার ওপর দিয়ে সবকিছু যাচ্ছে—এত রাতে এরা তাকে কোথায় নিয়ে এল?
গাড়ির ঠিক কাছাকাছি আসতেই আর্ভিক ইশারা করল। তানভী এক ঝটকায় তৃষাণের চোখের বাঁধন খুলে দিল। আর্ভিক বাড়িয়ে দিল গাড়ির রিমোট চাবিটা তৃষাণের হাতে সে যন্ত্রচালিতের মতো হাতে নিল। আর্ভিক মৃদু হেসে বলল
-“নে তোজো, এই সুইচটা প্রেস কর।”
তৃষাণ বোতামটা টিপতেই এক জাদুকরী দৃশ্য উন্মোচিত হলো। গাড়ির পেছনের ডিকিটা ইলেকট্রিক মোশনে আস্তে আস্তে খুলে গেল। তৃষাণের চোখ তখন বিস্ময়ে চড়কগাছ! গোল্ডেন আর ব্ল্যাক থিমের হাজারো বেলুন, ঝলমলে ‘হ্যাপি বার্থডে’ লেখা নিওন লাইট আর অসংখ্য রূপালি জরি ঝরে পড়ছে সেখান থেকে। গাড়ির ভেতরের অংশে তৃষাণের জন্মের প্রথম বছর থেকে আট বছর পর্যন্ত প্রতিটি জন্মদিনের মুহূর্তের সব রঙিন ছবি সুন্দর করে সাজানো।
কিন্তু সব আকর্ষণ কেড়ে নিল মাঝখানে থাকা অসাধারণ সেই বার্থডে কেকটি। কালো গাড়ির থিমের ওপর ঠিক তৃষাণের মতো দেখতে একই পোশাক পরা একটি ছোট পুতুল বসানো, যার হাতেও ধরা একটা ক্ষুদে বার্থডে কেক। তৃষাণ যখন সেই দৃশ্যে বুঁদ হয়ে আছে, তখনই সবাই মিলে একসাথে ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলে উঠল, ঋষি পেছন থেকে এক বিশাল রঙিন বাজি ফাটাল। আলোর ফুলঝুরিতে রাতের আকাশ এক নিমেষে রঙিন হয়ে উঠল।
তৃষাণ দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে আর্ভিক কে জাপটে ধরল। সে বুঝতে পারল, এই নিখুঁত আর আবেগপ্রবণ পরিকল্পনার মূলে ছিল আর্ভিক, তানভী দিভাই আর ঋষি ভাইয়াদের নিপুণ ভাবনা। ঠিক তখনই বাড়ির বড়রাও হাততালি দিতে দিতে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। কেক কাটার পর তৃষাণ প্রথম টুকরোটা আর্ভিকের মুখে তুলে দিয়ে বলল
-“ভাইয়া, তুমি সেরা!”
কেকের ওপর ঠিক তৃষাণের মতো দেখতে সেই ক্ষুদে পুতুলটা যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তৃষাণের কাছে। তৃষাণ কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ কী মনে করে সে পুতুলটাকে দুই আঙুলে টিপে তুলে নিল। আর্ভিকের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরলভাবে প্রশ্ন করল
-“ভাইয়া, এটা কে?”
আর্ভিক হাসিমুখে কিছু একটা ব্যাখ্যা করতে যাচ্ছিল, হয়তো বলতে চেয়েছিল এটা তৃষাণেরই একটা মিষ্টি প্রতিরূপ। কিন্তু আর্ভিকের উত্তর দেওয়ার আগেই তৃষাণ আর কালক্ষেপণ করল না। কোনো কিছু না ভেবেই সে সোজা নিজেরই সেই ‘ক্ষুদে সংস্করণে’ সজোরে এক কামড় বসিয়ে দিল! মুহূর্তের মধ্যে তৃষাণের মতো দেখতে সেই চিনির পুতুলের মাথাটা গায়েব হয়ে গেল।
তৃষাণের এই কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল, তারপর ফেটে পড়ল এক বাঁধভাঙা হাসিতে। তানভী তো হাসতে হাসতে প্রায় রুদ্র বাবুর কাঁধে ঢলে পড়ল। ঋষি হাততালি দিয়ে বলে উঠল
-“আরে তোজো, তুই তো নিজেকেই খেয়ে ফেললি রে!”
তৃষাণ তখন আপন মনে মনের সুখে সেই মিষ্টি পুতুলটা চিবোচ্ছে। তার মুখে তখনো চকোলেট ক্রিমের দাগ লেগে আছে। আর্ভিক কপালে হাত দিয়ে হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল,
-“তোর তুলনা কেবল তুই-ই তোজো! আমি তোকে তোর প্রতিরুপ উপহার দিলাম, আর তুই সেটাকেই জলখাবার বানিয়ে ফেললি?”
তৃষাণ অবশ্য এসবে ভ্রুক্ষেপহীন। সে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলল
-“ভাইয়া, এটা দেখতে তো ভালো ছিলই, খেতে তার চেয়েও দারুণ হয়েছে!”
এই রসিকতায় মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই জন্মদিনের আসরটা যেন হাসির এক মহোৎসবে পরিণত হলো। এরপর শুরু হলো এক অন্যরকম মুহূর্ত। আর্ভিক তৃষাণ কে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিল, আর তানভী পেছন থেকে স্পিকারে চালিয়ে দিল তৃষাণের প্রিয় গান। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই কালো গাড়িটা যেন এক লহমায় আস্ত একটা ড্রয়িংরুমে পরিণত হলো। কিছুক্ষণ পর সবাই বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল।
রাতের সেই হইহুল্লোড়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ভোরের আলোয় নতুন করে জেগে উঠল রুদ্র বাবুর বাড়ি। অভিক সাহেব আজ সবার আগে উঠে পড়েছেন। হাতে একটি সুন্দর মোড়কে মোড়া নতুন পোশাক নিয়ে তিনি হাজির হলেন তৃষাণের রুমে। তৃষাণের মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে বললেন
-“বাবা, উঠ! চটপট তৈরি হয়ে নে দেখি।”
তৃষাণ নতুন জামা পরে যখন ড্রয়িংরুমে নামল, তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও একটি বড় চমক। সেখানে ছোটখাটো অথচ রুচিশীল এক আলোকসজ্জার মাঝে রাখা ছিল বিশাল এক কেক। আশ্চর্যজনকভাবে কেকটি তৈরি করা হয়েছে ইংরেজি ‘9’ (নাইন) সংখ্যার আদলে। তৃষাণ যে আজ নয় বছরে পা দিল, অভিক সাহেবের এই সুনিপুণ পরিকল্পনা সেটিকেই যেন উদযাপন করছে।
কিন্তু চমকের শেষ এখানেই ছিল না। অভিক সাহেব হাসিমুখে তৃষাণের সামনে একটি বিশালাকার বক্স এগিয়ে দিলেন। তৃষাণ প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে প্যাকিং ছিঁড়তেই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। বাক্সের ভেতরে চকচক করছে একটি আধুনিক ‘হাভারবোর্ড’। তৃষাণের দুচোখ তখন উত্তেজনায় ছানাবড়া! সে তৎক্ষণাৎ সেটা বের করতে চাইল, কিন্তু পারছিল না। বড় ভাই হিসেবে আর্ভিক তখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। সে হাভারবোর্ডটি বের করে তৃষাণ কে তার ওপর দাঁড়াতে সাহায্য করল।
প্রথম দিকে ভারসাম্য রাখতে তৃষাণের বেশ কষ্ট হচ্ছিল, শরীরটা টালমাটাল করছিল বারবার। কিন্তু আর্ভিক তাকে হাত ধরে আগলে রেখে ব্যালেন্স করার কৌশল শিখিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তৃষাণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। সে নিজেই আয়ত্ত করে ফেলল হাভারবোর্ড চালানোর জাদু। এরপর সে দ্রুত কেক কেটে নিল তারপর শুরু হলো পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে তার রাজকীয় বিচরণ।
ওদিকে ডাইনিং টেবিলে সবাই ব্রেকফাস্টের জন্য বসে পড়েছে। দোয়েল ব্যানার্জী কয়েকবার ডাকলেও তৃষাণের কানে তখন কোনো কথাই পৌঁছাচ্ছে না। সে আপন মনে হাভারবোর্ড নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। শেষমেশ দোয়েল ব্যানার্জী কিছুটা ধমকের সুরে বললেন
-“তোজো, অনেক হয়েছে! এবার নেমে এসে খেয়ে যা।”
অভিক সাহেব হাসতে হাসতে বাধা দিলেন
-“আরে দোয়েল, আজকের দিনে অন্তত ছেলেটাকে বোকো না। আনন্দের নেশা যখন একবার চাপে, তখন খিদে-তেষ্টা সব উবে যায়।”
তানভীও সায় দিল, শেষ পর্যন্ত অভিক সাহেবের প্রশ্রয় আর তানভীর মিষ্টি শাসনের পর তৃষাণ হাভারবোর্ড থেকে নামল এবং সবার সাথে প্রাতরাশে যোগ দিল। সকালের সেই খাবার টেবিলটা তৃষাণের নতুন খেলনার গল্পে আর বড়দের স্নেহের পরশে এক অপূর্ব শ্রী ধারণ করল।
দুপুর গড়াতেই রুদ্র বাবুর বাড়ি যেন এক কর্মব্যস্ত মৌচাক। একদিকে ডেকোরেশনের কর্মীরা বেলুন আর রঙিন টুনি লাইটে বাড়িটাকে সাজাতে ব্যস্ত, অন্যদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে নানা রকমের পদের ঘ্রাণ। এই হুল্লোড়ের মাঝেও বার্থডে বয় তৃষাণ তখন নিজের রুমে উবুড় হয়ে শুয়ে মোবাইলে মগ্ন। তানভী সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে ওর সামনে তৃষাণের বহুকাঙ্ক্ষিত এক রোবটিক অ্যাকশন ফিগার ধরতেই সে লাফিয়ে উঠল। প্রিয় দিভাইকে এক জাপটে ধরে সে তার কৃতজ্ঞতা জানাল।
তানভী হেসে বলল
-“এবার গেম ছেড়ে চটপট রাজপুত্র সেজে ফেল তো আমার সোনা ভাই!”
তৃষাণও আর দেরি করল না। এই বিশেষ সন্ধ্যার জন্য তার বরাদ্দ ছিল ড্রেস, সে দ্রুত সেটা পরে নিল। তৃষাণ কে তৈরি হতে দিয়ে তানভীও দৌড়ল নিজের রুমে, সন্ধ্যার আয়োজনে নিজেকে অপরূপা সাজে সাজিয়ে নিতে।
সন্ধ্যার আঁধার গাঢ় হতেই ড্রয়িংরুমে অতিথিদের গুঞ্জন বাড়তে শুরু করল। আর্ভিক আর ঋষি এক কোণে সোফায় বসে নিচু স্বরে গল্প করছিল। আর্ভিকের পরনে ছিল ধবধবে সাদা একটা শার্ট, হাতা দুটো কবজি পর্যন্ত গোটানো, কালো ফর্মাল প্যান্ট লেদারের ঘড়ি, আর চোখে সেই চেনা চটপটে চাউনি। তার এই মার্জিত কিন্তু পুরুষালি সাজ যে কারো নজর কাড়তে বাধ্য।
ঠিক ৭ টা বাজার কিছু আগে আর্ভিকের কথা হঠাৎ মাঝপথে থমকে গেল, দৃষ্টি আটকে গেল সিঁড়ির বাঁকে। উপর থেকে তানভী নেমে আসছে। তার পরনে একটা পিচ রঙের জমকালো আনারকলি থ্রি-পিস, যার ওড়নায় সোনালি পাড়ের কাজ আলোয় চিকচিক করছে। কপালে ছোট একটা টিপ আর কানে ঝুমকো হালকা মেকআপ—তানভীর এই অপরূপ রূপ দেখে আর্ভিকের বুকের বাঁ পাশটা যেন অবাধ্য হয়ে উঠল। সে অজান্তেই হৃদপিণ্ড চেপে ধরল, মনে হলো যেন বুকের ধুকপুকানি বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে। আর্ভিকের কানে তখন এক রোমান্টিক সুর বাজছে।
“Chand teri roshni ka
Halka sa ek saaya hai
Teri nazaron ne
dil ka Kiya jo hashar
asar yeh hua
Abb inmein hi doob Ke
ho jau paar yehi hai dua
Aankhon mein teri
Ajab si ajab si adayein hai”
ঋষি আর্ভিকের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখল তারপর ভাইয়ার অবস্থা দেখে মুচকি হেসে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তানভী তাদের কাছে এসেই একগাল হেসে জিজ্ঞেস করল
-“কেমন লাগছে আমাকে ঋষি ভাইয়া?”
ঋষি স্নেহের স্বরে বলল
-“অপূর্ব লাগছে রে বোনু!”
তানভীর নজর এবার আর্ভিকের দিকে গেল। আর্ভিকের গম্ভীর কিন্তু বিচলিত মুখ দেখে সে ভ্রু কুঁচকে শুধাল
-“আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? বুকে হাত দিয়ে বসে আছেন কেন?”
আর্ভিক নিজেকে ধাতস্থ করে বাঁকা হেসে বলল
-“শরীর আর ভালো থাকে? তোর এই ভয়ংকর সাজ দেখে তো আমার প্রায় হার্ট অ্যাটাক হওয়ার দশা!”
তিন্নি রেগে গিয়ে চলে যেতে নিলে আর্ভিক পেছন থেকে রাশভারী গলায় বলল
-“শোন, বেশি ভিড়ের মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই। কেক কাটার পর খাবার খেয়েই সোজা নিজের রুমে চলে যাবি। অবাধ্য হলে কিন্তু বাড়ি থেকে বের করে দেব।”
তানভী পিছনে না ঘুরেই বিড়বিড় করে বলতে বলতে এগোলো
-“উমমম! আমার বাড়ি, আমার রুম—আমাকে নাকি বের করে দেবে! আমি তো বেশীক্ষণ থাকবই।”
কথাটা আর্ভিকের কান এড়াল না। সে পেছন থেকে এক চিলতে ধমক দিয়ে বলল
-“কথার অবাধ্য হলে তুলে এমন আছাড় দেব যে হাঁটার ক্ষমতা থাকবে না, মনে থাকে যেন!”
রুদ্র বাবুদের অন্দরমহল আজ এক মায়াবী প্রাসাদে রূপ নিয়েছে। দরজায় পা রাখতেই নাকে আসছিল রজনীগন্ধা আর সাদা গোলাপের স্নিগ্ধ সুবাস। ড্রয়িংরুমের ছাদ থেকে ঝুলে থাকা ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় কাঁচের দেয়ালগুলো হীরের মতো জ্বলজ্বল করছিল। বাদামী লেদারের মোড়ানো সোফা আর টেবিলগুলো এক রাজকীয় আভিজাত্য ঘোষণা করছে। মূল মণ্ডপটি সাজানো হয়েছিল ভেলভেটের লাল পর্দা আর নিওন লাইটের এক অপূর্ব সংমিশ্রণে, যেখানে বড় বড় হরফে লেখা ছিল “হ্যাপি বার্থডে”।
রাত ঠিক আটটায় শুরু হলো কাঙ্ক্ষিত সেই কেক কাটিং পর্ব। তৃষাণ ছোট্ট এক নবাবের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। পাঁচ স্তরের সেই বিশাল চকোলেট ফাজ কেকটি যখন টেবিলে আনা হলো, তখন অতিথিদের মুহুর্মুহু করতালিতে ঘর মুখরিত হয়ে উঠল। মোমবাতির শিখায় তৃষাণের উজ্জ্বল চোখমুখ এক অনাবিল খুশিতে ভাসছিল। রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেব দুপাশে দাঁড়িয়ে বড়দের আশীর্বাদ দিচ্ছিলেন, আর পেছন থেকে ঋষি আর তানভী ক্রমাগত বেলুন ফাটিয়ে উৎসবের উন্মাদনা বাড়িয়ে তুলছিল। কেক কাটার পর প্রথম টুকরোটা তৃষাণ যখন ওর বাবা-মার মুখে তুলে দিল, তখন দোয়েল ব্যানার্জীর চোখে ছিল এক চিলতে সুখের জল।
এরপর শুরু হলো ভূরিভোজের পালা। বাগানের একপাশে সাজানো হয়েছিল রাজকীয় বুফে। জাফরানি পোলাওয়ের সুগন্ধে ম-ম করছিল বাতাস। মেনুতে ছিল ধোঁয়া ওঠা গলদা চিংড়ির মালাইকারি, কচি পাঁঠার মাংসের ঝোল আর গরম গরম নলেন গুড়ের রসগোল্লা আরো অনেক কিছু। রুপোলি পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল, যা দেখে অতিথিরাও তৃপ্তির ঢেকুর তুলছিলেন।
আর্ভিক ভিড়ের মাঝেও কয়েকবার তানভীর দিকে তাকাল। তানভী তখন বন্ধুদের সাথে হাসাহাসিতে ব্যস্ত, কিন্তু আর্ভিকের সতর্ক নজর সারাক্ষণ তাকে আগলে রেখেছিল। খাওয়ার শেষে যখন রঙিন আতশবাজিতে রাতের আকাশ ছেয়ে গেল, তখন তৃষাণ তার হাভারবোর্ড নিয়ে উঠোনে চক্কর কাটছিল। অনুষ্ঠান শেষে সব অতিথিরা নিজেদের বাড়িতে চলে গেলেন।
“Hey Sur Nayak Hey Asurari
Aana Pade Hum Sharan Tihari
Hey Sur Nayak Hey Asurari
Aane Pade Hum Sharan Tihari
Vinati Ki Mori Dekh Rakhiyo
Vinati Ki Mori Dekh Rakhiyo
Mangal Karan Aa Mangal Haari”
পরের দিন সকালের আকাশটা যেন এক পবিত্র প্রশান্তিতে ভরে উঠল। একে একে সবার ঘুম ভাঙছে, সকলে এসে ঠাকুর ঘরে জোড় হলেন। সকলে দেখল তানভী সুমধুর কন্ঠে কৃষ্ণ ভজন গাইছে আর পূজো করছে। তানভী যখন বাড়িতে থাকত এটা তখন তার নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল। তার গানের সেই মায়াবী সুর বাড়িটাকে যেন মন্দিরের মতো শান্ত করে তুলেছে।
ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে অভিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
-“রুদ্র, এবার তবে আমাদের যেতে হয়। অনেক তো থাকা হলো।”
রুদ্র বাবু আবেগী গলায় বাধা দিলেন
-“আরে আর একটা দিন থেকে যা না ভাই! এই তো এলি, আবার কবে দেখা হবে ঠিক নেই। আজকের দিনটা থেকে কাল সকালে যাস।”
অভিক সাহেব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে আর্ভিক গম্ভীর স্বরে বলল
-“বাবা, মা—তোমরা বরং এখানেই থেকে যাও। ঋষিও থাকুক। আমি অফিস সামলে নেব তাছাড়া তানভীর স্কুল আছে তাই আমি আর তানভী আজ বিকেলেই রওনা দেব।”
আর্ভিকের এই প্রস্তাব সবাই মেনে নিল। দুপুরে তৃপ্তি করে খেয়ে সবাই যখন যে যার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল, তানভী তখন নিজের রুমে সুটকেস গোছাতে ব্যস্ত। তৃষাণ ওর বিছানায় আরাম করে শুয়ে মোবাইলে গেম খেলছিল। হঠাৎ ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে তৃষাণ গুনগুন করে এক অত্যন্ত রোমান্টিক হিন্দি গান গেয়ে উঠল।
“Intzaa hain Dil Ki
Mujhse Dur Na Raho
Bas Tum Mere Pas Raho
Haaye, Bas Tum Mere Pas Raho”
তানভীর হাত থেকে একটা জামা খসে পড়ল। সে অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল
-”এইটুকু ছেলের মুখে এসব গান কোত্থেকে এল!”
তানভী ভ্রু কুঁচকে বলতেই যাচ্ছিল—”তৃষাণ, এসব কী গান?” তখনই তৃষাণ গেম থেকে চোখ না তুলেই হাসতে হাসতে বলল
-“দিভাই, তোর চেহারার সাথে বেশি ম্যাচ করছে?”
তানভীর গাল মুহূর্তেই রাঙা হয়ে উঠল। সে রাগে একটা বালিশ ছুড়ে মারতেই তৃষাণ খিলখিল করে হেসে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে পালালো।
বিকেলের পড়ন্ত রোদে সবার থেকে বিদায় নিয়ে আর্ভিক আর তানভী যখন বাড়ির পথে রওনা দিল, তখনই আর্ভিকের ভেতরে এক অস্বস্তি বাসা বাঁধছিল। শরীরটা যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে, মাথার ভেতর চিনচিনে একটা যন্ত্রণা। বাড়ি ফিরে তানভীর জন্য তার পছন্দের খাবার টা রান্না করল। নিজের কষ্ট চেপে রেখে তানভীকে শুধু বলল
-“যা, পড়তে বোস।”
তানভী বাধ্য মেয়ের মতো পড়তে বসল। কিছুক্ষণ পর একটা কঠিন অংক না পেরে সে আর্ভিকের রুমে গিয়ে দাঁড়াল।
-“আর্ভিক ভাই, এটা একটু বুঝিয়ে দেবেন?”
বলতে গিয়েই তানভী থমকে গেল। দেখল, আর্ভিক বিছানায় মাথা চেপে ধরে চোখ বুজে পড়ে আছে। সেই বলিষ্ঠ ছেলেটা আজ কেমন নিস্তেজ, যন্ত্রণায় কাতর। এই দৃশ্য দেখে তানভীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল, দুচোখ ফেটে জল এল। সে দ্রুত আর্ভিকের কাছে যায়
-“আর্ভিক ভাই আপনার কী হয়েছে?”
আর্ভিক নিরুত্তর। তানভীর খুব কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। সে তড়িঘড়ি তাদের ফ্যামিলি ডক্টরকে ফোন করল। প্রথমবার কল রিসিভ হল না। তাই সে আবার করল। দ্বিতীয়বারে ডক্টর ফোন ধরতেই তানভী কাঁদতে কাঁদতে সব জানাল। ডক্টর আশ্বস্ত করে বললেন
-“ভয় পেও না তানভী। মনে হচ্ছে প্রচণ্ড ধকল আর রোদে ওর মাইগ্রেন বা প্রেসারের সমস্যা হয়েছে। তুমি ওর মাথায় জলপট্টি দাও, ঘর অন্ধকার করে দাও আর গরম কিছু খেতে দাও। আমি একটা ওষুধের নাম বলছি, ওটা খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও।”
ডক্টরের পরামর্শমতো তানভী যেন এক নিপুণ সেবিকা হয়ে উঠল। সে চটজলদি নিচ থেকে গরম স্যুপ বানিয়ে আনল। স্যুপ বানাতে গিয়ে কিছুটা গরম স্যুপ তার হাতে পড়ে যায়। তানভী সেসবে পাত্তা দিল না। এরপর স্যুপের বাটি নিয়ে আর্ভিকের রুমে চলে গেল।
আর্ভিক প্রথমে খেতে না চাইলেও তানভীর জেদের কাছে হার মানল। ওষুধ খাইয়ে দিয়ে তানভী দীর্ঘক্ষণ আর্ভিকের কপালে হাত বুলিয়ে দিল, যন্ত্রণার উপশমে মাথা টিপে দিল। সেবা করতে করতে কখন যে সে আর্ভিকের বুকের ওপর মাথা রেখে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা সে নিজেও জানে না।
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৫+৩৬
পরদিন সকালে আর্ভিকের যখন ঘুম ভাঙল, সে অনুভব করল তার বুকে এক অদ্ভুত নির্ভরতার স্পর্শ। তাকিয়ে দেখল, তানভী তার বুকে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কাল তানভীর সারা রাতের অক্লান্ত সেবায় আর্ভিকের শরীরের সব গ্লানি আর মাথার যন্ত্রণা উবে গেছে। সে অপলক দৃষ্টিতে তানভীর সেই নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তানভীর প্রতি এক গভীর মমতা আর ভালোবাসায় আর্ভিকের মনটা ভরে উঠল। সে তানভীর মুখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
