Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৮ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৮ (২)

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৮ (২)
jannatul firdaus mithila

দাউদাউ করে জ্বলছে সাদোভোদ মার্কেটের প্রতিটি দোকানপাটপাট! হিংস্র দাবানলের আগ্রাসী থাবা ধীরে ধীরে গুড়িয়ে দিচ্ছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান। বুক ভাঙা আর্তচিৎকারে মত্ত সবাই। দু’হাতে মাথার খুলি চেপে নতমুখে কাঁদছে তারা। এদিকে মনস্টার কেমন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে নিজ জায়গায়। উত্তপ্ত আগুনের লেলিহান শিখায় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন কঠিন মানব। মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখটা বড্ড গম্ভীর তার। চোয়ালের পেশী টানাটান! পিয়ার্সিং করা ডান চোখের ভ্রু-টা কেমন উঁচিয়ে আছে দেখো! বাদামী চোখদুটোতে আগুন জ্বলছে রীতিমতো। যুবক শক্ত মুখে ঘুরে দাঁড়ায় এবার। দু-কদম দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে মাহি, দু’হাতে গা জড়িয়ে রেখেছে কেমন। বোধহয় মস্কোর হিম ধরানো বাতাসে বেজায় কষ্ট হচ্ছে বেচারির। মনস্টার একমুহূর্ত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আপাদমস্তক পরোখ করল সপ্তদশীকে।

পরক্ষণে তার কি হলো কে জানে! দাম্ভিক কদমে এগিয়ে এলো মাহি’র নিকট। সপ্তদশী আড়দৃষ্টে দেখছে সব। অগত্যা ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে কদম পেছালো আলগোছে। মুগ্ধ বিরতিহীন! মাহি যত পেছাচ্ছে, ততই এগোচ্ছে তার পা। একপর্যায়ে পেছাতে পেছাতে সপ্তদশীর পিঠ ঠেকল গাড়ির সঙ্গে। তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে ওঠে মাহি! হড়বড়িয়ে ঘাড় বাঁকাতেই আচমকা একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে আঁটকে নিলো তাকে। সপ্তদশী কাঁপছে এবার, দুরুদুরু করছে বুক! তার অতি নিকটে নির্দয় মানব, দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ন্যায়। মাহি’র সাধ্যিতে কুলোলো না চোখ তুলে তাকাতে। সে কেমন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে এদিক-ওদিক। ছোট্ট মস্তিষ্কে তার অবাধ প্রশ্ন গিজগিজ করছে। লোকটা আবার হুট করে তার এতো কাছে এলো কেন? আবার না মাঝরাস্তাতেই থাপড়ানো শুরু করে দেয়! মাহি ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল সামান্য। পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে বোকা সপ্তদশী আগে-ভাগে নিজের হাতদুটো উঠিয়ে আনলো গালের ওপর। অতঃপর চোখমুখ খিঁচে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কেমন!

মুগ্ধ কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঠায়। বা-হাতখানা তার গাড়ির জানালার ওপর ঠেকিয়ে রাখা, ডানহাতের দু-আঙুল দিয়ে আচমকা টোকা বসালো জানালার পুরু কাঁচে! তৎক্ষনাৎ গাড়ির ভেতর থেকে হড়বড়িয়ে বেরিয়ে এলেন ড্রাইভার। মাথাটা ঠায় নুইয়ে, দু-হাটুঁ গেঁড়ে বসলেন মনস্টারের পায়ের কাছে। অতঃপর অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একখানা লালরঙা মখমলের লম্বাটে বক্স আলগোছে বাড়িয়ে দিলেন মাফিয়া মনস্টারের দিকে। মুগ্ধ সেদিকে তাকায়নি একবারও। তার কটমট দৃষ্টি এক সপ্তদশীর নতমুখ পানে নিবদ্ধ। সে রয়েসয়ে সটান হয়ে দাঁড়াল এবার। হাত বাড়িয়ে ড্রাইভারের হাতে থাকা মখমলি বক্সটা খুলতেই সেথায় চকমক করে উঠল একখানা চশমা। কার্টিয়ার ব্র্যান্ডের গোল্ড ফ্রেমের গোলাকার চশমাখানা, কি সুন্দর ঝকমক করছে। চশমাটার ফ্রেমের গায়ে গোটা গোটা অক্ষরে কি যেন লিখে রাখা! মুগ্ধ শক্ত মুখে হাত বাড়িয়ে চশমাটা তুললো। পরক্ষণে তা আলগোছে মাহির চোখে পরিয়ে দিতেই ভড়কায় সপ্তদশী। ত্বরিত চোখ মেলে তাকায় সামনে। চোখে এটেঁছে পাওয়ারের চশমা, ঠিক যেমনটা আগে ব্যাবহার করত সে। একদম -০.৫০ এর সঠিক মাপ! মাহি হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল কেমন। মুগ্ধ নামক রূঢ় মানবের মুখব্যক্তি খুব একটা স্পষ্ট নয় তার কাছে। মুখটা ওমন মাস্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকলেও তার চোখদুটো দিয়ে যেন আগুন বেরুচ্ছে! এই বুঝি চোখের আগুনে জ্বলসে দিবে বেচারিকে। মাহি ভড়কে গিয়ে মাথায় ঝোঁকায় ফের। তবে এরইমধ্যে তার কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের কিড়মিড় কন্ঠ,

“ নাউ ইউ’ল সি দ্য ওয়ার্ল্ড দ্য ওয়ে আই ওয়ান্ট ইউ্য টু!”
চমকায় মাহি! হতবাক নেত্রে চোখ কুঁচকাল কেমন। মসৃণ কপালে তার গোটাকতক ভাঁজের উপস্থিতি স্পষ্ট। মুখাবয়বে একরাশ জিজ্ঞাসা! মুগ্ধ পাত্তা দিলোনা মেয়েটার এহেন মুখো অভিব্যক্তিতে। উল্টো কদম পেছাতে লাগলো হুট করে। কিছুটা দূরে গিয়ে কঠিন মানব ঘুরে দাঁড়ালেন এবার! দাঁতে দাঁত চেপে দু’হাত পকেটে গুঁজে হুংকার ছুঁড়ে গার্ডদের উদ্দেশ্যে আওড়াল,
“ ওলভস! গো এন্ড গ্যাট দ্য বাস্টা’র্ড।”
কথাখানা মনস্টারের জিভ থেকে খসতে না খসতেই সম্মুখে পা বাড়ালেন ওলভস সদস্য। গম্ভীর মুখে স্থানীয়দের ভীড়ের মধ্যে গটগটিয়ে ঢুকলেন কেমন। একে একে প্রতিটি মানুষের চুলের গোছা খপ করে চেপে ধরে মুখ তুললেন উঁচুতে। বিচক্ষণী দৃষ্টিতে প্রত্যেকের মুখাবয়ব পরোখ করে যাচ্ছেন তারা, খুঁজে চলেছেন মিষ্টি দোকানীকে। ওদিকে এতক্ষণ যাবত ভীড়ের মাঝে গা লুকিয়ে বসে ছিলেন মিষ্টি দোকানী। তবে মনস্টারের হুকুমে গার্ডদের ওমন খোঁজাখোঁজি দেখে ভয়ে প্রাণ উড়ে যাবার যোগাড় বেচারার! শরীরটা কেমন থরথর করে কাঁপছে তার। গলাটাও তো শুকিয়ে কাঠ ভাব ধরেছে! বেচারা মুখ লুকলেন ভীড়ের মধ্যে। সম্মুখে হাঁটু গেঁড়ে বসে থাকা দু’জন ফল ব্যাবসায়ীর বড়সড় পিঠের আড়ালে গা লুকিয়ে চাপা স্বরে শুধালেন,

“ স্পাসিতে মিন্যা, পাঝালুস্তা!”
(আমাকে বাঁচাও প্লিজ।)
কন্ঠ কাঁপছে মিষ্টি দোকানীর। তা শুনে মুখ কুঁচকালেন সম্মুখের দু-ব্যাক্তি। ললাটে দীর্ঘ বিরক্তির ভাঁজ টেনে ঝাঁঝাল কন্ঠে মিনমিন করে আওড়ালেন,
“ যখন মেয়েটাকে মে’রেছিলে তখন মনে ছিল না একথা? একমাত্র তোমার জন্য আজকে আমাদের সর্বস্ব পুড়ে ছারখার হলো। তারপরও কোন মুখে তোমায় সাহায্য করার কথা বলছ বেয়াদব?”
কাচুমাচু ভাব ধরলেন মিষ্টি দোকানী। চোখেমুখে বিরাট অপরাধী ভাবসাব ফুটিয়ে যে-ই না কিছু আওড়াবেন ওমনি একখানা শক্তপোক্ত হাতের থাবা এসে খপ করে আঁকড়ে ধরল তার ঘাড়। হকচকালেন মিষ্টি দোকানী! ভয়ার্ত ঢোক গিলে নজর উঁচাতেই দৃষ্টি আটকালো মুখোশধারী গার্ডের পানে। বেচারা কেমন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে হাতজোড় করে বলে ওঠে,

“ ছেড়ে দিন সাহেব! আমার ভুল হয়ে গেছে, আমি সত্যি জানতাম না ঐ মেয়ে…”
বাকিটা মুখ থেকে বেরুনোর আগেই বেচারার পিঠ বরাবর সজোরে পড়ল এক লাথি। তক্ষুনি দোকানী কেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল সম্মুখে। আশেপাশের নতমুখে বসে থাকা মানুষজন ত্বরিত সরে গেলেন সেখান থেকে। বেচারা মিষ্টি দোকানী শেষবারের মতো কারো কারো পা চেপে ধরে অনুনয় করে বলে যাচ্ছে,
“ আমায় ছেড়ে যেও না! প্লিজ আমাকেও তোমাদের সাথে নিয়ে যাও।”
এহেন অনুনয় মোটেও কানে তুললেন না স্থানীয়রা। উল্টো জোরপূর্বক নিজ নিজ পা থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলেন দোকানীর। কেউ কেউ বুঝি চাপা স্বরে আওড়াল,
“ নিজে বাঁচলে বাপের নাম! নিজের ম’রা নিজে মরো।”

কথাটা কেমন তীরের মত বিঁধল দোকানীর মনে। বেচারা অসহায় মুখে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছেন। ভয়ে ভয়ে হাতদুটো কনক্রিটের জমিনে ঠেকিয়ে সামান্য উঠে বসতেই ফের পিঠ বরাবর সজোরে বসল আরেক লাথি! এপর্যায়ে লাথির তীব্রতা বুঝি বেশ ছিল। বেচারা তক্ষুনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন রাস্তার বুকে। নরম-সরম থুঁতনিটা তার বড্ড জোরালো আকারে ঘষা খেলো রাস্তার সঙ্গে। তৎক্ষনাৎ থুঁতনিটা কেমন থেঁতলে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা হয়েছে দেখো! দোকানী মুখ খিঁচে আর্তনাদ করে উঠলেন এরূপ ব্যথায়। একহাতে সঙ্গে সঙ্গে আলতো করে চেপে ধরলেন নিজ থুতনি। হাতের তালুখানা তার ভেসে যাচ্ছে লহুতে। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে দোকানী, ঠিক তখনি পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এসে খপ করে চেপে ধরে তার চুল! এবারেও ককিয়ে ওঠেন দোকানী।

মুখ খিঁচে কোনরকমে সহ্য করলেন চুলের যন্ত্রণাটুকু। হাতের মালিক জোর বাড়াচ্ছে হাতের! বেচারা দোকানীর চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরে ইচ্ছেমতো টানছে ওপরের দিকে। দোকানী আর বসে থাকার উপক্রমে নেই! তৎক্ষনাৎ দূর্বল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন কোনরকম। সম্মুখের কঠিন মানব দাঁতে দাঁত চেপে আরেকহাতে তক্ষুনি চেপে ধরে দোকানীর খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে আবৃত চোয়ালটা। তার হাতের সে-কি জোর! মনে হচ্ছে এক্ষুণি দোকানীর নরম চোয়ালটা ভেঙে গুড়িয়ে ফেলবে। দোকানী মধ্যবয়স্ক মানুষ! ফর্সা মুখখানা তার ব্যথায় লাল হয়ে উঠেছে। সে এবার না চাইতেও ভুল করে চোখদুটো মেলে তাকালো সম্মুখে। তৎক্ষনাৎ তার চোখাচোখি হলো মনস্টারের বাদামী চোখজোড়ার সঙ্গে। মুহুর্তেই থমকায় দোকানী! হৃৎপিণ্ডটা বুঝি একটুর জন্য দুয়েকটা বিট মিস করে ফেলেছে। একপল সম্মুখের মনস্টারের সাথে চোখাচোখিতে খরচ হতেই পরক্ষণে মস্তিষ্কে টনক নড়লো দোকানীর। ভুল করে ভুল হয়ে যাওয়ায় তক্ষুনি নজর নামালেন মধ্যবয়স্ক! আতঙ্কে জর্জরিত মানুষটা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াল,
“ ক্ষমা করুন মনস্টার! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি ভুল করে তাকিয়েছি আপনার দিকে। বিশ্বাস করুন মনস্তার, আমি ইচ্ছে করে তাকাইনি। আমি আসলে… মনস্তার, মনস্তার আমায় ক্ষমা করুন। আমি সত্যি জানতাম না ঐ মেয়েটা…!”

বাকিটা বলার আগেই বেচারার নাকমুখ বরাবর সজোরে পড়ল এক ঘুষি। মুহুর্তেই চোখের সামনে সব কেমন আধাঁরে ছেয়ে গেল বেচারার। নাক ফেটে ফিনকি দিয়ে গড়াচ্ছে লহু। তাতেও বুঝি রাগ কমল না সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানবের। সে উল্টো আরেকদফা পাঞ্চ বসালো দোকানীর নাক বরাবর। পরপর একবার, দু’বার, বেশ কয়েকবার! সাথে হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ ইউ্য মাদা’রফাকা’র! ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টু কল হার — মেয়েটা! শি ইজ মা’ই প্রপার্টি। সো কল হার — দ্য শ্যাডো মনস্টার’স প্রপার্টি!”
এরূপ হুংকারে তটস্থ সবাই! অথচ মাহির চোখেমুখে একরাশ হতবাকতা! মেয়েটা কেমন সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মুগ্ধের পানে। মস্তিষ্কে তার এখনো বাজছে মুগ্ধের বলা একটি কথাই — মা’ই প্রপার্টি! ওদিকে বেচারা দোকানীর মুখের অবস্থা নাজেহাল! নাকের কচি হাড়টা বোধহয় এতক্ষণের জোরালো আক্রমণে ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। ঠোঁট দুটো দাঁতের সঙ্গে থেঁতলে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! সম্মুখের দাঁত কপাটি থেকে ভেঙে পড়েছে বেশ ক’টা দাঁত। দোকানী ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছেন মনে হচ্ছে। তা টের পেতেই মুগ্ধের আক্রমণাত্মক হাত থামল একমুহূর্তের জন্য। আগুন চোখদুটোর দৃষ্টি হলো সরু! সে কেমন ক্রুর হাসলো মনে হচ্ছে। সহসা দোকানীর চোয়ালটা ছেড়ে দিতেই টলতে টলতে দূর্বল শরীরটা নিয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লেন মধ্যবয়স্ক। চোখদুটো নিবুনিবু তার! অসহ্য ব্যথায় গোঙাচ্ছে মাটিতে পড়ে। মুগ্ধ এবার সটানভাবে দাঁড়াল। হাত উঁচিয়ে নিজের ঘাড় ডলতে ডলতে গর্জে বলল,

“ প্রিনেসি ময় ক্লিনোক!”
(আমার ব্লেড নিয়ে আয়।)
অগত্যা এহেন হুকুম তামিল করতে ছুটলেন ক’জন গার্ডস। মিনিট খানেকের মধ্যেই ফিরে এলেন হাতে একখানা জাপানিজ তলোয়ার নিয়ে। তলোয়ারের সম্পূর্ণ গা আবৃত মেটালের তৈরি কেসে। তার সে-কি ওজন! গার্ড মহাশয় মনস্টারের নিকট এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়ালেন ফের। হাতদুটো উঁচিয়ে বাড়িয়ে দিলেন তলোয়ার। মুগ্ধ তক্ষুনি হাতে তুললো তলোয়ারটা। একটানে তলোয়ারের গা থেকে কেসটা সরাতেই উম্মুক্ত হলো তীক্ষ্ণ ধারালো তলোয়ারখানা! দিনের আলোয় তা কেমন চিকচিক করছে দেখো! অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি বুঝি এবার জ্ঞান হারাবে। ভয়ে জড়সড় সপ্তদশী দু’হাতে খামচে ধরেছে নিজ জামার একাংশ। ভয়ার্ত দৃষ্টিযুগল এদিক-ওদিক লুকোতে চাইলেই শোনা গেল মনস্টারের কঠিন হুংকার!
“ এ্যাই বান্দীর মেয়ে!”
সহসা থমকায় মাহি। চোখদুটো না চাইতেও তাকালো সম্মুখে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মনস্টার কেমন হিসহিসিয়ে আওড়ায় এবার,

“ খবরদার দৃষ্টি নামাবি না! এখন যা হবে সবটা নিজ চোখে দেখবি তুই। ভুলেও যদি দেখেছি তোর চোখ নিচে তাকিয়েছে, দ্যান আই সয়্যার, আজকে এখানেই তোর গর্দান আলাদা করব আমি! মাথায় রাখিস।”
নিশ্বাস আঁটকে গেল মাহির। এ কেমন শাস্তি দিচ্ছে তাকে? এতো ভয়ানক শাস্তি না দিয়ে তাকে নাহয় দু-চারটে থাপ্পড় দিয়ে বসত লোকটা! তাতেও হয়তো এতটা কষ্ট হতোনা তার। মাহি নিজেকে শক্ত করল বেশ। কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিযুগল সম্মুখে তাকিয়ে আছে তার। অদূরের কঠিন মানব একহাতে তলোয়ার তুলে রেখেছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দু-হাতে ধরে রেখেছে দোকানীর ডানহাত। মুগ্ধ কিয়তক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রয়েসয়ে নিজের ক্রুর দৃষ্টিযুগল মাহি’র পানে নিবদ্ধ করে আচমকা চোখ টিপল কেমন! মাহি ভ্রু গোটাতেই মুগ্ধ দেখাল তার পৈ*শাচিক কর্মকাণ্ড। এক ঝটকায় তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে বসল দোকানীর বাহুতে! মুহুর্তেই দোকানীর গা থেকে ছিটকে পড়ল হাতখানা। আর্তচিৎকারে ভেসে উঠল চারপাশ।

রাস্তার একপাশটা কেমন ধুয়ে যেতে লাগল দোকানীর তাজা লহুতে। বেচারা নিজ বাহু চেপে কাতরাচ্ছে বেশ! এদিকে মুগ্ধ তখন আলতো করে গার্ডের হাত থেকে দোকানীর নিস্তেজ হাতখানা নিজ হাতে তুলল। তার দৃষ্টি এখনো মাহি’র থমকানো মুখপানে নিবদ্ধ। ওদিকে মাহি কেমন থমকে গেল এহেন নির্দয় কর্মকাণ্ডে। বেচারি হতবিহ্বলতায় আচমকা ধপ করে বসে পড়ল মাঝরাস্তায়। তার চোখদুটো নিরবে ঝরাচ্ছে অশ্রু! তারজন্য! হ্যাঁ, হ্যাঁ শুধুমাত্র তারজন্য একটা লোকের এতবড় শাস্তি হলো। মাহির অবোধ মন দোষাচ্ছে নিজেকে। তার চোখদুটো কেমন ভরে উঠছে বারংবার। সামনে থেকে একজোড়া দাম্ভিক কদম যে ধীরে ধীরে তার দিকে এগোচ্ছে সে খবর কি আর আছে সপ্তদশীর? থাকলে থোড়াই বসে থাকত! মাহি যখন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি সে টের পেলো — তার চুলের গোছা দিয়ে রয়েসয়ে আঙুল ঢুকছে। সেকেন্ড পেরুতে না পেরুতেই আঙুলগুলো খপ করে চেপে ধরল তার চুল। মাহি নিষ্প্রাণ চাহনিতে ঘাড় উঁচিয়ে তাকায় এবার। চুলের গোছা চেপে রাখা হাতখানা জোর বাড়িয়ে তাকে দাঁড় করালো বসা ছেড়ে। মাহি তখনো প্রতিক্রিয়াহীন! কাঁদছে নিরবে। মনস্টার কেমন ক্রুর হাসলো মেয়েটার ওমন ভেঙে পড়া দেখে। সে আলগোছে নিজের ঘাড় ঝুঁকিয়ে মুখ নামিয়ে আনলো মাহি’র কানের কাছে। সেথায় ফিসফিসিয়ে বলল,

“ এটা তো জাস্ট ট্রেইলার চাশমিস! আমার অধীনে থাকাকালীন তুই নামক আমার শিকারকে ছুঁতে আসা প্রতিটা ব্যাক্তির পরিনতি হবে বড্ড করুণ! এন্ড গেস হোয়াট? আমার কাছ থেকে পালানোর মতো দুঃসাহস দেখানোর জন্য আজ তোকে ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে করছে। ইউ নো নাহ? আমি খুব ভালো আদর করি। একদম দাঁতভাঙা আদর! ”
একমুহূর্ত থামল মুগ্ধ। দাঁত কপাটি একে-অপরের সাথে খানিক ঘর্ষণ চালিয়ে কিড়মিড় করে আওড়াল,
“ আজ পাশা খেলব রে শাম… সো বি রেডি বি’চ!”

হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা সপ্তদশীর। চোখে বাঁধা কালোপট্টি। দূর্বল পায়ে এগোচ্ছে সে। এক-আধবার হোঁচট খেতে গিয়েও নিজেকে সামলেছে বহুকষ্টে। সপ্তদশী নিজেও জানেনা সে এখন কোথায়। বেশকিছুক্ষন আগে হেলিকপ্টার থেকে নামানো হয়েছে তাকে। এরপর থেকে শুধু হাঁটছেই তো হাঁটছে! একমুহূর্তের জন্যও পাদু’টো আর আটকাচ্ছে না তার। তবে এতক্ষণ ধরে একনাগারে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত সপ্তদশী। আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল নিজ জায়গায়। দূর্বল পাদু’টো অসার হয়ে যাচ্ছে তার, এই বুঝি ভেঙে পড়বে তারা। মাহি আর দাঁড়িয়ে থাকার অবস্থাতে নেই। দূর্বল পাদু’টো তার হুট করে ভেঙে বসল শীতল মেঝেতে। এদিকে তার ওমন হুটহাট বসে পড়ায় ভড়কায় গার্ডস। বাদবাকি সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে পড়লেও একজন অতি উৎসাহিত হয়ে সপ্তদশীর দিকে হাত বাড়াতে গেলেই আচমকা এক লাথি বসল তার মুখ বরাবর। ঘটনার আকস্মিকতায় তক্ষুনি অদূরে ছিটকে পড়লেন গার্ড। ইশশ! কি ব্যথাটাই না পেয়েছে বেচারা। সে কেমন রয়েসয়ে উঠতে গেলেই মনস্টারের ব্যুট পরিহিত পা এসে চট করে তার মাথাটা চেপে ধরে মেঝের সঙ্গে। মেজাজ হারিয়ে হিংস্র যুবক হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ কাক ত্যি পসমেল প্রোতিয়ানুত ক নেয় রুকু?”
( ইউ্য সান অফ আ বাস্টা’র্ড! ওর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কি করে হলো তোর? মর’তে চাচ্ছিস নাকি আমার হাতে? বল তাহলে মে’রে দেই!)
কাতরাচ্ছে গার্ড! তৎক্ষনাৎ কোনরকমে দু’হাত জোর করে অপরাধী কন্ঠে বলল,
“ ক্ষমা করুন মনস্তার! ক্ষমা করুন।”
থামল মুগ্ধ! ব্যুট পরিহিত পা-টা রয়েসয়ে নামিয়ে আনলো গার্ডের মাথার ওপর থেকে। দাঁতে দাঁত চেপে একটুখানি সামনে এগিয়ে ফের লাথি বসালো গার্ডের পেট বরাবর। বেচারা গার্ড মুখ ফুলিয়ে সহ্য করে নিলো ব্যথাটুকু। চিৎকার দিয়ে থোড়াই মরবে সে? এদিকে মুগ্ধ তখন পা বাড়ায় মাহির দিকে। শক্ত হাতে মেয়েটার কনুই চেপে ধরে তাকে দাঁড় করালো বসা ছেড়ে। তারপর জোরালো পায়ে সম্মুখে এগোতে এগোতে কটমট করতে করতে বলল,
“ পালাতে বুক কাঁপেনি অথচ এটুকু হাঁটতেই হাঁটু কাঁপছে জানোয়ারের বাচ্চা’র! নাটক দেখলে বান্দীর মেয়ের, মনটা চায় তুলে একটা আছাড় মারি!”

কথাগুলো বেশ কানে গেল মাহি’র। বুকটা ভার হয়ে গেল অজানা ভয়ে। কিয়তক্ষন বাদেই তাকে এক হেঁচকা টানে ছুঁড়ে ফেলা হলো মেঝেতে। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় মাহি। তৎক্ষনাৎ উবু হয়ে পড়ল মেঝেতে। দু-হাতের কনুইয়ে ব্যথা লেগেছে সামান্য, বেচারি হালকা গুঙিয়ে উঠল ব্যথায়। কান খাঁড়া করে শুনতে পেল — বিশালাকার ভারি দরজা লাগানোর কর্কশ শব্দ। সহসা ভয়ডর এসে হানা বাঁধল সপ্তদশীর মনে। হাতের ব্যথা ভুলে গিয়ে সে চট করে উঠে বসল মেঝেতে। হাতদুটোর সঙ্গে চোখটাও বাঁধা তার। কি যে এখন হবে তার সঙ্গে কে জানে! এদিকে তার ভাবনার মাঝেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলেন রূঢ় মানব। এসেই কেমন ক্ষিপ্রতার সাথে মেয়েটার হাতদুটো খুলে দিতে লাগল। পরপর একটানে মাহি’র চোখে বাধাঁ কাপড়টা খুলতেই চোখ কুঁচকে নেয় মাহি। রয়েসয়ে চোখদুটো খোলার আগেই চোয়ালের হাড়ে চাপ পড়ল বেশ! মুগ্ধ কেমন হিংস্র বাঘের ন্যায় থাবা বসিয়েছে মাহি’র চোয়ালে। মাহি ককিয়ে যাচ্ছে ব্যথায়। দু’হাতে মুগ্ধের হাতখানা সরানোর ব্যর্থ চেষ্টায় মত্ত সপ্তদশী। তবে লাভের লাভ তো হলোই না, উল্টো ব্যথা বাড়ল চোয়ালে। মুগ্ধ তখন রাগে গজগজ করতে করতে হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,

“ কার সাথে পালিয়েছিলি তুই? কে সাহায্য করেছে তোকে উত্তর দে বান্দীর মেয়ে!”
ভয়ার্ত ঢোক গিললো মাহি। চোখদুটো আরেকদফা কুঁচকে নিয়েছে কেমন! এদিকে তার এহেন নিরবতা আগুনে ঘি ঢালল যুবকের। সে এবার রাগের চোটে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে এক ঝটকায় ছেড়ে দিলো মাহি’র চোয়াল। তার পরপরই শক্ত হাতে এক চপেটাঘাত বসালো মাহির নরম-সরম গালটায়। গর্জে ওঠে বলল,
“ কে সাহায্য করেছে তোকে উত্তর দে জানোয়ারের বাচ্চা! ওকে শ্মশানে না পাঠানো অব্দি শান্তি পাব না আমি।”
শুনেছে মাহি! তবুও প্রতিত্তোর করল না এবারেও। মুগ্ধের মাথা ফেটে যাচ্ছে রাগে। সে আরেকবার থাপ্পড় বসালো মাহি’র অন্যগালে। বেচারি মাহি কেমন গাল বাকিয়ে হাউমাউ জুড়ে কেঁদে উঠল এবার। তাতে অবশ্য মন গলল না মুগ্ধের। সে এবার চট করে চেপে ধরল মাহি’র চুলের গোছা। মেয়েটার ছোট্ট মুখখানা এক ঝটকায় নিজের মুখোমুখি নিয়ে এসে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে ওঠে,

“ দু’দিনের পরিচিত নাগরের জন্য আমার সাথে ভাব দেখাচ্ছিস বান্দীর মেয়ে? তুই কি ভেবেছিস? তুই না বললে আমি জানব না, তুই কার সাথে পালিয়েছিলি? ওহ সিরিয়াসলি? আমার রাজত্ব থেকে আমারই শিকারকে নিয়ে কেউ একজন পালাবে আর আমি তা টেরও পাব না ভেবেছিস? দেখ বান্দীর মেয়ে, শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি। ভালোয় ভালোয় বলে দে, কার সাথে পালিয়েছিলি। এতে অন্তত তুই বেঁচে থাকবি! নাহলে আমি খুজতে গেলে কিন্তু তুই এবং তোর নাগর দু’জনে একসাথে ম’রবি! মাইন্ড ইট।”
ভয়ার্ত ঢোক গিলল মাহি। র*ক্তাক্ত ঠোঁট দুটো কেমন তিরতির করে কাঁপছে তার। চোখদুটো ছলছল! মাহির নমনীয়তা আজ মোটেও কমাতে পারলোনা মুগ্ধের ক্রুরতা। যুবকের চোয়ালের পেশী টানটান হচ্ছে ক্রমশঃ চোখদুটোর আগুন যেন এক্ষুণি ভস্ম করে দিবে মাহি’কে। মাহি আজ নিজেকে বড্ড শক্ত করেছে। ভুলেও জিভের আগায় উপকারীর নাম আওড়ায়নি মানবী। এতে অবশ্য রাগ বহুগুণ বাড়ল মুগ্ধের। হিংস্র মানব কেমন আচমকা মাথা দোলালো খানিক। এক ঝটকায় মাহি’র চোয়াল ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো বসা ছেড়ে। কটমট করতে করতে বললো,
“ গো এন্ড গেট রেডি! আ’ম কামিং। পুরো গা ঘষে ঘষে ধুয়ে আসবি জানোয়ারের বাচ্চা, আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি কাইন্ডা ডার্টি থিংগস ইন এরাউন্ড মি! গো টু দ্য ওয়াশরুম বি’চ!”
বলেই গটগটিয়ে দরজার কাছে এগোয় মুগ্ধ। শক্ত হাতে একটানে ওমন বিশালাকৃতির দরজাটা খুলে নিয়ে বেরোয় কামরা থেকে। এদিকে মাহি কেমন ফোঁপাচ্ছে মেঝেতে বসে থেকে। দু’হাতে নিজের মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আওড়াচ্ছে,
“ আমি অভিশপ্ত! হ্যাঁ হ্যাঁ আমি অভিশপ্ত। আমার জন্য কতগুলো মানুষ ঐ রাক্ষসের হাতে ম’রছে, শুধুমাত্র আমার জন্য! আমি অভিশপ্ত!”

সন্ধ্যা নেমে সেইন্ট পিটার্সবার্গের আকাশে। স্নোফলের মাত্রা আগের তুলনায় বেড়েছে বেশ! বিশালাকার কাচেঁর তৈরি কক্ষের ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে আগুন। সদ্য গোসল সেরে বেরিয়ে আসা সপ্তদশী বসে আছে ফায়ারপ্লেসের সামনে। পোহাচ্ছে আগুন! এতো বড় কামরায় স্রেফ জ্বলছে মোমবাতির আলো। সারা ঘর তন্নতন্ন করেও সুইচবোর্ড খুঁজে পায়নি সপ্তদশী। তাইতো সে এখন বসে আছে আগুনের সামনে। তার মুখখানা কেমন লাল হয়ে আছে, বোধহয় অতিরিক্ত কান্নার ফল। মাথার ভেজা চুলগুলো থেকে অবহেলায় চুইয়ে পড়ছে পানি। মাহি আর আগ বাড়িয়ে চুলগুলো মুছলো না। কেন যেন ইদানীং চুলগুলো ধরতেও ঘেন্না লাগে তার! মাহি চুপচাপ বসে আছে নিজ জায়গায়। ঠিক তখনি পেছন থেকে ভেসে এলো কারো জোরালো পায়ের শব্দ! মাহি ঘাড় বাকিয়ে তাকায় পেছনে। তক্ষুনি নজরে পড়ে — সুদর্শন যুবকের উম্মুক্ত দেহখানা। মুগ্ধ কেমন গটগটিয়ে ঢুকল ঘরে। দরজাটা হা করে খুলে রাখা! মাহি নড়েচড়ে উঠে বসল বসা ছেড়ে। সুদর্শন যুবক তার দিকে কোনরূপ দৃষ্টিপাত না করে এগিয়ে গেল সম্মুখে। রয়েসয়ে গিয়ে বসল অদূরের ডিভানের ওপর। হাতে তার একখানা কাঁচের শিশি। সেথায় তরল জাতীয় কিছুর উপস্থিতি স্পষ্ট! যুবক আয়েশ করে বসল ডিভানে। সারা গা উম্মুক্ত তার, পেটের ছ’টি পেশি স্পষ্ট চক্ষু গোচর। ডানহাতের ফুলেফেঁপে থাকা বাহু হতে শুরু করে পুরো হাত জুড়ে পাইথনের ট্যাটু। বুকের একপাশে ইটালিয়ান হরফে কিছু একটা লিখে রাখা ট্যাটু! দু’হাতের মুষ্টিতে লম্বা লম্বা কি যেন একে রাখা! ফর্সা দেহে কালো কালো ট্যাটু গুলো বড্ড চোখে বাজছে। যুবকের বাদামী চুলগুলো আজও এলোমেলো করে পেছন দিকে ঝুঁটি বেঁধে রাখা। ডান ভ্রু-টায় পিয়ার্সিং করে রিং বসানো। বামপাশের ঠোঁটের নিচেও একই দশা। মাহি আজ প্রথমবার এতো নিখুঁত চোখে পরোখ করল লোকটাকে। মুগ্ধ তখন কাঁচের শিশি থেকে কিসব তরল নিয়ে যেন গায়ে মাখছে। মোমবাতির আবছা আলোয় চকচক করছে যুবকের গা। মাহি কৌতুহল বশত আচমকা প্রশ্ন ছুড়ঁল,

“ গা-গায়ে এভাবে ত-তেল মাখছেন কেন?”
যুবকের ব্যস্ত হাতজোড়া থামেনি, না থেমেছে তার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা ক্রুর হাসি! সে কেমন ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে লোমহীন উম্মুক্ত চওড়া বক্ষে আলতো করে ডলে যাচ্ছে তরল জাতীয় কিছু। তার তীক্ষ্ণ চাহনি এবার আচানক তাকালো মেয়েটার পানে। মাহি ঢোক গিলল পরপর। যুবকের এহেন তাকানো দেখে তার পাদু’টো ওমন হুট করে কাঁপছে কেন কে জানে! সিক্ত চুলগুলো থেকে এখনো চুইয়ে পড়ছে পানি। ভিজিয়ে দিচ্ছে পিঠ থেকে কোমর! সপ্তদশী থরথর করে কাঁপছে। লাজুক দৃষ্টিযুগল এদিক-ওদিক লুকচ্ছে বারবার। এদিকে মনস্টার মহোদয় আচমকা বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতে তার কাঁচের শিশিটা! সে সরু চোখে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে পা বাড়াল মেয়েটার দিকে। সপ্তদশী ঘাবড়ে গিয়ে পেঁচাচ্ছে এবার। দুরুদুরু বুকখানা দু- হাত দিয়ে চেপে ধরে দু-কদম পেছাতেই আচমকা তার গতিরোধ হলো বুঝি। মনস্টারের শক্ত হাতের থাবা আচমকা চেপে ধরল মাহি’র ডানহাতের কব্জি। মাহি ভড়কায়! হকচকিয়ে সামনে তাকাতেই ঘটল আরেক কান্ড। মুগ্ধ কেমন হুট করে হাতে থাকা কাঁচের শিশিতে থাকা তরলটুকু মাহি’র মাথার ওপর ঢেলে দিলো। মুহুর্তেই সপ্তদশীর গা ভিজে গেল উটকো গন্ধযুক্ত তরলে। মাহি তৎক্ষনাৎ নাক কুঁচকায়। হতবুদ্ধির ন্যায় সামনে তাকাতেই দেখে মুগ্ধ কেমন শক্ত চোয়ালে তাকিয়ে আছে তার পানে। যুবকের শক্ত হাতখানা ক্রমশ মাহির হাতদুটোয় তরল ঘষে যাচ্ছে। মাহি সন্দিহান! বোকার ন্যায় অবোধ সুরে বলল,

“ এসব কি? আমার গায়ে এসব মাখছেন কেন?”
মুগ্ধ তাকালো না মাহি’র পানে। নিজ কাজে অব্যহত থেকে শক্ত গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ কজ টুডে আ’ম ফিলিং স্লিপি।”
কথাটা কানে যেতেই বোকা মাহি ঠোঁট গোল করে শব্দ তুলল খানিক। রয়েসয়ে আচমকা বলে বসল,
“ তাহলে যান! ঘুমান গিয়ে। আমার গায়ে এসব মাখছেন কেন?”
তক্ষুনি বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিযুগল মাহি’র মুখপানে নিবদ্ধ হলো। যুবকের তামাকে পোড়া ঠোঁটদুটো বুঝি ক্ষনিকের জন্য দাঁতের নিচে পিষ্ট হলো। ঠিক এর পরমুহূর্তেই ঘটল এক অঘটন! মুগ্ধ কেমন শক্ত করে মাহির নরম হাতখানা চেপে ধরে মেয়েটাকে বেশ দক্ষতায় ঘুরিয়ে নিলো। সপ্তদশীর নরম হাতখানা ঘুরিয়ে চেপে ধরল তারই পিঠের সঙ্গে! এরূপ আকস্মিক ঘটনায় হতবিহ্বল মাহি। হকচকাবে নাকি হাতের ব্যথায় ককিয়ে যাবে — তা নিয়ে পড়ল বড্ড দোটানায়। এদিকে হাতে চাপ বাড়ছে ক্রমশ! সপ্তদশীর ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরুলো ব্যথাতুর ধ্বনি। সেদিকে অবশ্য খুব একটা পাত্তা দেয়নি যুবক। উল্টো ঘাড় ঝুঁকিয়ে মুখ নামিয়ে আনলো মাহির কানের কাছে। পেছন থেকে কেমন গা-হিম ধরিয়ে দেবার মতো শান্ত অথচ রূঢ় কন্ঠে দাঁত কিড়মিড় করে আওড়াল,

“ ঘুমানোর প্রস্তুতিই তো নিচ্ছি বান্দীর মেয়ে। তোকে সারারাত না নাচিয়ে ঘুমিয়ে আরাম পাবো না আমি! সো.. লেট মি ডু মা’ই ওয়ার্ক!”
মুহুর্তেই সারা গা জুড়ে মৃদু ঝংকার বয়ে গেল মাহির। গলাটা শুকিয়ে কাঠ তার! শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে খানিকটা নড়তেই পেছন থেকে ফের ফিসফাস শোনা গেল কেমন!
“ ইউ্য নো হোয়াট বি’চ? আই হেট ইউ্য! অনেস্টলি স্পিকিং — আমার জীবনে আমি যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে থাকি তবে সেটা হচ্ছে তোর বাপ। আমি ঘৃণা করি ঐ বাস্টা’র্ডকে, তার র’ক্তকে! সো ডেফিনেটলি — আই হেট ইউ্য টু! বাট বাট বাট…. আমি তোকে এক আকাশসম ঘৃণা করলেও আগামী ৬মাস তুই আমার, আমার মানে শুধু আমার! আর আমার ব্যক্তিগত শিকারে কেউ হাত বাড়ানোর সাহস করা তো দূরে থাক, জাস্ট চোখ তুলে তাকাক একবার। আই সয়্যার — আমি তাকে ভীষণ করুণভাবে শেষ করব। আই রিপিট — একদম শেষ করে ফেলব। এন্ড যদি এই একই কাজ আমার শিকার নিজেই করতে চায়….. ”
একটু থামল যুবক। পিয়ার্সিং করা ঠোঁটদুটো আলগোছে ছুঁইয়ে গেল মাহির নরম কান। ফের একইভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বিড়বিড় করে শুধালো,

“ সো আমি নিজ হাতে আমার শিকারকে উত্তপ্ত গরম তে*লে চুবাবো। ডু ইউ্য গেট দ্যাট বি’চ? না-কি আরেকটু বোঝাবো?”
কাপছে মাহি! ত্বরিত মাথাটা ওপর নিচ নাড়িয়ে নিরবে বোঝালো — সে বুঝেছে। মুগ্ধ ক্রুর হাসলো। চাপা স্বরে শুধালো,
“ ডোন্ট মুভ!”
বলেই যুবক সরে গেল পেছন থেকে। অথচ মাহি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো নিজ জায়গায়। পাদু’টো নাড়ানোর সাধ্যি নেই তার। শত হলেও মনস্তারের হুকুম বলে কথা! অমান্য করে থোড়াই চড় খাবে? এদিকে মিনিট খানেক পার হতেই মুগ্ধ ফিরে এলো আবারও। হাতে করে নিয়ে এসেছে একখানা লাল রঙা পশমি হ্যান্ডকাফ। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মাহির হাতদুটোকে পেছন থেকে চেপে ধরে আলগোছে হ্যান্ডকাফটা পরিয়ে দিলো যুবক। মাহি তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে উঠল কেমন! অবোধের ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ঁল,
“ কি পরাচ্ছেন আমার হাতে?”
মুগ্ধ ঠোঁট পিষে হাসল মনে হচ্ছে। মাহি’র সোজা কথার সঠিক প্রতিত্তোর না করে উল্টোভাবে কঠিন গলায় জবাব দিলো,

“ তোকে নাচানোর পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে যা দরকার, তা পরাচ্ছি!”
বুঝলোনা মাহি! কপালটা কুঁচকে রাখল কেমন। ওদিকে মুগ্ধের কাজ শেষ। পরক্ষণে মাহির ঘাড়টা ধরে মেয়েটাকে কেমন ছুড়ে মার’ল সম্মুখে। হুটহাট আক্রমণে তাল সামলাতে পারেনি মাহি। একটুর জন্য পরতে গিয়েও বেঁচে গেল কোনরকম! দু-হাটুঁতে আচমকা ভর দিয়ে বসল মেঝেতে। এদিকে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধ এবার আলগোছে মাহি’কে পাশ কাটিয়ে চলে এলো ডিভানের কাছে। পাদু’টো হালকা ছড়িয়ে ডিভানে গা এলিয়ে বসলেন যুবক। মাহি’র পানে ক্রুর দৃষ্টি লেপ্টে শুধালো,
“ এখনো সময় আছে বান্দীর মেয়ে, বল কার সাথে পালিয়েছিলি?”

উত্তর নেই মাহি’র মুখে। মানবী নতমুখে বসে আছে এবার। তা দেখে চোয়াল শক্ত হলো মুগ্ধের। ছেলেটা চট করে নিজের ডানহাতে চুটকী বাজাল দুবার। তারপর? তারপর সুনশান নিরবতায় আচ্ছন্ন চারপাশ। আচমকা মাহি টের পেলো কোত্থেকে যেন প্রবল হিসহিসানি ভেসে আসছে। মাহি কান খাঁড়া করল আওয়াজটা শুনতে। নিরবতা ভেদ করে আওয়াজটা ক্রমশ ভারী হচ্ছে। মানবী নতমুখটা একটুখানি উঁচাতেই যাবে ওমনি সে টের পেলো তার গায়ে কি যেন একটা লেপ্টে যাচ্ছে। ত্বরিত নজর ঝোঁকায় মাহি। নিজ গায়ে দৃষ্টি পড়তেই আকাশ থেকে পড়ল মেয়ে! তার গায়ে ওমন দৈত্যাকার সাপ আঁকড়ে ধরল কখন? আর সাপটা এতো মোটা কেন?

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৮

এতো বড় সাপ? মাহি একমুহূর্ত থমকে থাকলেও পরক্ষণে যেইনা সাপের সবুজ-রঙা জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখগুলো দেখল ওমন সম্বিত ফিরল তার। তৎক্ষনাৎ গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে সপ্তদশী। তার চিৎকারের আওয়াজ পুরো কক্ষ জুড়ে ধ্বনিত হয়ে ফের কানে ভেসে এলো তার। চিৎকারের তীব্রতা বাড়তেই সাপের জোর বাড়ছে বুঝি! মাহির পুরো শরীরটা মোচড়ে ধরেছে দৈত্যাকার সাপটা। মাহি চিৎকার করছে একদিকে, অথচ মনস্টার কেমন ক্রুর হাসছে তার কান্না দেখে। সে কেমন রয়েসয়ে ঘাড় কাত করে বলল,
“ মিট উইথ মা’ই ফেভরেট — সাইকি! দ্য ব্ল্যাক মাম্বা। হাউ ডু ইউ্য লাইক ইট দেড়ব্যাটারী?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২৯

1 COMMENT

Comments are closed.