Home রুহ এ ইশক রুহ এ ইশক পর্ব ৬

রুহ এ ইশক পর্ব ৬

রুহ এ ইশক পর্ব ৬
আনান রোজ

—ছি উযাইন ছি! তোর একটা বাচ্চা আছে! আর তুই নিজের বন্ধুর ১৬ বছরের মেয়ের চুলে এভাবে নেশাতুর হয়ে যাচ্ছিস? Control yourself, Uzyan!
কথা গুলো নিজের মনেই নিজেকে বলতে লাগলো উযাইন।
ডিনারের টেবিলের সেই ঘটনার পর দীর্ঘ দুটো দিন কেটে গেছে। ইনশিরা উযাইনের সাথে কোনো কথা বলেও নি আর তার সামনেও পড়েনি। উযাইন এতে কিছুটা অবাক হলে, আজ সকালে বাড়ান্দায় উমায়ের কে বসেছিল, আর নিচের বাগানে ইনশিরা তার বাবার কোলে মাথা রেখে দুলনায় শুয়ে গল্প করছিল। উযাইন ওইদিকেই তাকিয়ে ছিল কেন জানি এই দুইদিনের অবহেলা দুরুত্ব তার সইছে না। কেমম যেন খালি খালি লাগছে, সে হয়তো সত্যিই এই কিশোরীর মায়ায় আটকে গেছে। সে কি সত্যিই ইনশিরার উপস্থিতি চায় নিজের জীবনে? তবে কেন এত দূরত্ব? এত বাধা? চাইলেই কি সব নিজের মতো করে নেওয়া যায় না?
এসব ভাবতে গিয়ে তার মনে হচ্ছিল যদি মরেই যেত তাহলে বাচতে পারত বোধ হয়। সে আবার নিজের মন আর মস্তিষ্কের দ্বিধায় জরিয়ে গেল, আর মনে মনে ভাবল—

—তাহলে কি সত্যিই মেয়েটার মোহ কেটে আসছে? ষোলো বছরের ক্ষণিকের আবেগ হয়তো এবার শান্ত হচ্ছে। এটাই বেস্ট সুযোগ! এই সুযোগেই ওর সাথে ডিভোর্সের ফাইনাল কথাটা বলে ফেলা উচিত।
আজ বিকেলবেলা।
উযাইন,পুরো বাড়ি খুজলো কিন্তু ইনশিরা কে পেলো না। চিলেকোঠার সিড়ির এখানে সে, খেয়াল করল ইনশিরা একাকী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রোদ পড়ে আসছে, মৃদু বাতাস বইছে। ইনশিরা তখন আসর এর নামাজ পড়ে ছাদে দাড়িয়ে ছিল,কেন জানি তার ভালো লাগছে না। উযাইন ধীর পায়ে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল এবং খুব সাবধানে ইনশিরার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আর কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব ঠান্ডা ও গম্ভীর করে
—”ইনশিরা, অনেক হয়েছে। সব কিছু আরও বেশি এলোমেলো হওয়ার আগেই চলো আমাদের ডিভোর্সটা নিয়ে নেওয়া যাক। এই অহেতুক জেদটা এবার ছেড়ে দাও। লাইফটা অনেক সুন্দর, ইনশিরা। বড় হও, নিজের স্টাডিতে ফোকাস করো। নিশ্চয়ই ফিউচারে তোমার বয়সের খুব ভালো কেউ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য…”
একদমে কথাগুলো বলে একটা শ্বাস নিল উযাইন। ওর কথা শেষ হতেই ইনশিরা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার ডাগর চোখ দুটো জলে টলমল করছে, ঠোঁট দুটো অভিমানে কাঁপছে। উযাইনের বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় মুচড়ে উঠল—ইনশিরার এই ক্রন্দনরত, মায়াবী চাহনিই তো উযাইনের একমাত্র ধ্বংস! ও সামনে এলে উযাইনের সব পুরুষালি অহংকার ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

—”আমার কোনো ভালো মানুষকে লাগবে না! আপনার মতো এই খারাপ মানুষটাকেই আমার লাগবে…”
ইনশিরার মুখে নিজেকে ‘খারাপ মানুষ’ শুনে প্রফেসর উযাইন একদম আকাশ থেকে পড়ল! সে মনে মনে চরম অবাক হয়ে ভাবল—
—আজব তো! এই মেয়ে একটা বললে আরেকটা বোঝে! আমি ওর ভালোর জন্য বলছি, আর ও আমাকেই ভিলেন বানাচ্ছে! আবার সংসার করতে চায়?!
উযাইন যখন মুখ খুলে ওকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ইনশিরা উযাইনের আরও এক ধাপ কাছে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। ইনশিরা খুব আকুতি ভরা নিচু গলায়—
—”আ..আমি আপনার সব কথা শুনব… আপনি যেভাবে বলবেন, আমি ঠিক সেভাবেই চলব। একদম আপনার বাধ্য বউ হয়ে থাকব, উযাইন সাহেব। তাও প্লিজ… দোহাই লাগে, আমাদের আলাদা হওয়ার কথা আর বলবেন না।”
উযাইনের দমটা যেন আটকে গেছে, সেও তো চায় না। কিন্তু বন্ধুত্ব সমাজ সম্পর্ক, এসব তো চাইলেও বাদ দেওয়া যায় না।
ঠিক তখনই নিচে থেকে ইরা কড়া গলায় ওকে ডেকে উঠলেন—

—”ইনশিরা! নিচে আয়!”
ইনশিরা ওড়নার কোণা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে চলে গেল।
উযাইন শূন্য ছাদে একদম একা দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে এল। সে ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে দিগন্তের শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। ওই বিয়ের দিনটার পর থেকে উযাইন একটা রাতও শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। প্রতিটা মুহূর্ত সে ইনশিরার মায়ায় পুড়েছে।
সে শূন্য আকাশে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই খুব নিচু স্বরে গুণগুণ করে গেয়ে উঠল—
চল বলে ফেলি
কত কথাকলি
জন্মেছে বলতে তোমায়
তোমাকে চাই।।
ঝলসানো রাতের
এ পোড়া বরাতে
তুমি আমার অন্ধকার
আর রোশনাই।।
উযাইনের বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে নিজের মনেই তীব্র হাহাকার নিয়ে ভাবল
—”কেন… কেন তুমি আমার জীবনে এত অসময়ে
এলে, ইনশিরা? একটু আগে এলে কি হতো?

ছাদ থেকে মন খারাপ করে এবং চোখ মুছতে মুছতে ইনশিরা যখন ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো, ড্রয়িংরুমে তখন একটা থমথমে পরিবেশ। সোফায় বসে আছে ইরা এবং রাইমা। রাইমা উযাইনের সাথে ইনশিরার যেকোনো ধরণের মেলামেশা সে কেন জানি একদম সহ্য করতে পারছে না।
ইনশিরাকে ওভাবে লাল হয়ে থাকা চোখ আর বিষণ্ণ মুখ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই রাইমার ঠোঁটের কোণে এক কুটিল চতুর হাসি ফুটে উঠল। সে চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে ইনশিরার দিকে সোজা তাকিয়ে বাঁকা স্বরে—

—”কী রে ইনশি? ছাদ থেকে একলা নামলি যে? তোর উযাইন আঙ্কেলও তো ওপরেই ছিল! তা আজকাল দেখছি পড়ার টেবিল ছেড়ে সারাক্ষণ উযাইন ভাইয়ার পেছনেই ঘুরঘুর করিস।”
রাইমার এই অপমানজনক খোঁচা আর উযাইনের সাথে তার পবিত্র সম্পর্ককে নিয়ে এমন সস্তা ইঙ্গিত করাটা ইনশিরার বুকে তীরের মতো বিঁধল। তার মুখ রাগে আর অপমানে মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। তার ভেতরের বাঘিনী রূপটা জেগে উঠল। রাইমা দিকে এক তীব্র, জ্বলন্ত চাউনি ছুড়ে দিল।খুব দৃঢ়, ধারালো অথচ ঠান্ডা গলায় ফুফুকে জবাব দিল—
—”উনার সাথে আমার আবার কিসের কথা হবে তুমি যেভাবে পড়াশোনার হেল্প চাও, এমন করি না। নরমালি কথা হয়।
কথাটা বলেই ইনশিরা নিজের মায়ের দিকে আর তাকাল না। সে হনহনিয়ে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে সোজা নিজের বেডরুমের দিকে চলে গেল এবং ধড়াস করে দরজা বন্ধ করে দিল। রাইমা ইনশিরার এই কড়া মুখের ওপর দেওয়া জবাব শুনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের হাত মুঠো করে সোফায় বসে রইল, আর ইরা নিজের মেয়ের এই অবাধ্য আচরণ দেখে কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
রাত তখন প্রায় সাড়ে ১০টা।

উযাইন নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিল। ছাদের ওপর ইনশিরার সেই ক্রন্দনরত মুখ আর বুক ভাঙা আকুতি—”আমি আপনার সব কথা শুনব… একদম আপনার বাধ্য বউ হয়ে থাকব উযাইন সাহেব, তাও আলাদা হওয়ার কথা বলবেন না”।
উযাইনের মগজে হাতুড়ির মতো অনবরত আঘাত করছিল। তার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তার সব গাম্ভীর্য আজ এক কিশোরীর কান্নার কাছে এসে ধুলোয় মিশে গেছে।
সে বিছানা থেকে উঠে ডেস্কে গিয়ে বসল এবং ল্যাপটপটা অন করার চেষ্টা করল নিজের মন ডাইভার্ট করার জন্য। ঠিক তখনই ঘরের দরজায় কোনো আওয়াজ না করে খুব ধীর পায়ে ভেতরের দিকে প্রবেশ করল ইনশিরা।
উযাইন চমকে উঠে তাকাল। ইনশিরার পরনে তখন একটা সাধারণ সুতির থ্রি-পিস, চুলগুলো পিঠে ছড়ানো। তার হাতে একটা মগ, যেখান থেকে ধোঁয়া ওঠা চমৎকার ব্ল্যাক কফির সুবাস পুরো অন্ধকার ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ছে। ইনশিরা কোনো কথা না বলে খুব শান্ত মুখে কফির মগটা উযাইনের ল্যাপটপের পাশে ডেস্কে রাখল। তারপর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে আবার দরজার দিকে ফিরে চলে যেতে নিল। ও আর উযাইনের কোনো রুক্ষ ধমক বা ডিভোর্সের কথা শুনতে চাচ্ছিল না।

কিন্তু ইনশিরা যখনই দরজার কাছাকাছি পৌঁছাল, উযাইনের সমস্ত কন্ট্রোল আর সামাজিক ভয় এক সেকেন্ডে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে নিজের চেয়ার ছেড়ে এক লাফে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে ইনশিরার একটা নরম ফর্সা হাত নিজের শক্ত বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় খপ করে চেপে ধরল।
ইনশিরা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। সে থমকে দাঁড়িয়ে আস্তে করে ঘাড় ঘুরিয়ে উযাইনের দিকে তাকাল। উযাইনের চোখের মণি তখন এক অবদমিত আকাঙ্ক্ষায় আর মায়ায় জ্বলজ্বল করছে, তার নিজের নিশ্বাস খুব দ্রুত ওঠানামা করছে।
উযাইন ইনশিরার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় আরও শক্ত করে চেপে ধরে, খুব নিচু, কাঁপানো ও নেশাতুর গলায় বলল—

—”তুমি নিজেকে আমার ‘বাধ্য বউ’ বলছ কেন, ইনশিরা? Why are you doing this to me? তুমি কি বুঝতে পারছ না ওটা জাস্ট পরিস্থিতির চাপে পড়ে, তোমাকে একটা বড় বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য করা একটা ভুল বিয়ে ছিল! ওটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই…!”
ইনশিরা নিজের হাতটা ছাড়ানোর কোনো চেষ্টা করল না। সে ধীরে ধীরে পুরো শরীরটা ঘুরিয়ে উযাইনের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি, একজনের তপ্ত নিশ্বাস অন্যজনের ঠোঁটে এসে আছড়ে পড়ছে। ইনশিরা উযাইনের ওই জ্বলন্ত চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক মায়াবী ও জেদি হাসি দিল।
সে উযাইনের বুকের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা এনে, অত্যন্ত গভীর ও শান্ত গলায় বলল—
—”পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, উযাইন সাহেব… ওই অভিশপ্ত রাতে তিনবার ‘কবুল’ তো আপনি নিজের মুখেই বলেছিলেন, তাই না? ইসলামিক আর আইনি মতে আমি আপনার সম্পূর্ণ বৈধ স্ত্রী।”
—”শাট দ্যা হেল আপ ইনশিরা বারবার সেই এক…”

—”কেন? পরিস্থিতি আজীবন এক থাকে না প্রফেসর সাহেব, কিন্তু মুখের ওই পবিত্র কবুল শব্দটা কিন্তু আজীবনের জন্য আমার তকদিরে সিল মেরে দিয়েছে। এটাই একমাত্র সত্যি!”
ইনশিরার এই ম্যাচিউরদের মতোন যুক্তি আর তার গায়ের বুনো ফুলের সুবাস, তার সমস্ত স্নায়ুকে এক সেকেন্ডে অবশ করে দিল। উযাইনের তীব্র ইচ্ছা করছিল ইনশিরাকে এক টানে নিজের শক্ত বুকের ভেতর পিষে ফেলে বলতে—”হ্যাঁ, তুমি শুধু আমার!”
কিন্তু তার চিরশত্রু হলো, অপরাধবোধ আর এই সমাজ, তাকে পাথরের মতো আটকে রাখল।
উযাইন আর ইনশিরার মধ্যকার এই তীব্র দমবন্ধ অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝেই হুট করে ঘরের দরজার ভেজানো পর্দাটা একপাশে সরে গেল।উমায়ের আধো-আধো কিউট গলায়, চোখ ডলতে ডলতে ঘরে ঢুকে বলল—

—”পাপাহ, ইসিলা… আমি একা একা ভয় পাচ্ছি…”
ছোট্ট উমায়ের নিজের ডাইনোসর প্রিন্টের নাইটস্যুটটা পরে, একহাতে একটা কিউট টেডি বিয়ারের কান ধরে চোখ ডলতে ডলতে ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে। ছেলের এই আকস্মিক ও নিষ্পাপ কণ্ঠস্বর শোনামাত্রই উযাইন আর ইনশিরা। দুজনেই এক সেকেন্ডে যেন এক তীব্র বিদ্যুতের ধাক্কায় বাস্তবে ফিরে এলো!
উযাইন চরম অপ্রস্তুত ও লজ্জিত হয়ে এক ঝটকায় ইনশিরার হাতটা ছেড়ে দিয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। তার নিজের কানের দুপাশ দিয়ে তখন যেন লাভা ছুটছে। সে তাড়াতাড়ি নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করার ভান করতে লাগল।
সে এক নিমিষেই এক দায়িত্বশীল মায়ের রূপ ধারণ করল। ইনশিরা ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে উমায়েরকে এক লাফে নিজের কোল ঘেঁষে বুকের ভেতর টেনে নিল। উযাইন যেন বারবার মুগ্ধ হয়ে যায়, এটুকুনি মেয়ে এত গুছানো। ইনশিরা উমাইরের মাথায় হাত বুলিয়ে, উযাইনের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল—

—”বাচ্চার ওপর কোনো দায়িত্ব নেই আপনার? রাত ১০টা বাজতে চলল, এখনো বাচ্চাটাকে ঘুম পাড়ালেন না?”
—”আমাদের ব্যাপারে তোমাকে এত ভাবতে হবে না, ইনশিরা।”
উযাইন নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে ঠান্ডা গলায় বলে। তখন ইনশিরা একটু ঘাড় ত্যাড়া করে, বিষণ্ণ হেসে খোঁচা দিয়ে বলল—
—”হ্যাঁ! তা তো বটেই! আমি কেন আপনার কথা ভাবতে যাব? আপনার যত্ন নেওয়ার জন্য আর ফুফি তো আছেই!”
বলেই ইনশিরা উমায়েরকে শক্ত করে কোলে চেপে ধরে আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়াল না। উযাইনের মুখের ওপর এক চিলতে রাগী চাউনি ছুড়ে দিয়ে হনহনিয়ে উমাইরের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
উযাইন ইনশিরার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে হা করে অবাক হয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে এক অজান্তেই অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করে বলল—
—এই মেয়েটার জেদ আর জেলাসি এক ফোঁটাও কমেনি! আগেও যেমন একগুঁয়ে ছিল, এখন যেন তার তীব্রতা আরও দ্বিগুণ হয়ে গেছে!

ইনশিরা উমায়েরকে নিজের রুমে নিয়ে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিল। উমায়ের ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সে নিজের ড্রেসটা একটু ঠিক করে ডাইনিং টেবিলের দিকে গেল রাতের ডিনারের জন্য। আজ নানা ঝামেলার কারণে ওদের ডিনারের সময়টা একটু লেইট হয়ে গেছে, ঘড়িতে তখন রাত প্রায় ১১টা।
ডাইনিং টেবিলে পুরো পরিবার খেতে বসেছে। শুধু জাহির আর দাদি ছাড়া, ওরা বাড়িতে নেই। গ্রামে গেছে। ইনশিরা ডাইনিং এ পা রাখামাত্রই তার পুরো শরীর রাগে আবার রি-রি করে উঠল। সে দেখল—রাইমা এখনও সুযোগ বুঝে একদম উযাইনের পাশের চেয়ারটা দখল করে বসে আছে এবং অনর্গল হেসে হেসে উযাইনের সাথে কথা বলছে। ইনশিরা এক পলক সেই দৃশ্যটা দেখে নিজের ক্ষোভ চেপে উযাইনের ঠিক বিপরীত পাশের একটা চেয়ারে গম্ভীর মুখে খেতে বসল।
উযাইন আড়চোখে ইনশিরার ওই থমথমে আর রাগে লাল হয়ে থাকা ফেসটা দেখেই এক সেকেন্ডে বুঝে গেল যে ইনশিরা ভেতরে ভেতরে একদম ফেটে পড়ছে। রাইমার ওভাবে ঘেঁষে বসা যে ইনশিরার সহ্য হচ্ছে না, তা উযাইন স্পষ্ট বুঝতে পারছিল। সে নিজের মনে মনে তীব্র আতঙ্ক আর রোমাঞ্চ নিয়ে রাইমাকে ধুয়ে দিল—

—”উফফ রাইমা! বোন আমার… তুই দয়া করে আমার পাশ থেকে একটু দূরে যা না! আমার বউটা রাগে একদম কাঁপছে? একটু পরেই ও নির্ঘাত কোনো একটা ধামাকা করবে!”
তখন রাইমা উযাইনের আরও একটু কাছাকাছি এসে ওর লন্ডনের ইউনিভার্সিটি আর পড়াশোনা নিয়ে অনর্গল কথা বলতে শুরু করল। আর কথার এক ফ্লো-তে সে উযাইনের ফরসা হাতটা হঠাৎ করে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে ফেলল।
উযাইন রাইমার এই স্পর্শে চরম থতমত খেয়ে গেল! সে ঝট করে নিজের হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। টেবিলের ওপাশে বসে থাকা ইনশিরার পক্ষে এই দৃশ্য হজম করা আর কোনোভাবেই সম্ভব হলো না। নিজের বরের হাত অন্য একটা মেয়ে এভাবে সবার সামনে ধরছে, এটা দেখার পর তার তারুণ্যের মাথা পুরো গরম হয়ে গেল। সে নিজের হাতের ভাতের লোকমাটা প্লেটে ধপাস করে ফেলে—

—”উফফ আল্লাহ…! এই মুহূর্তে আমার একটা খুন করতে মন চাইছে!”
ইনশিরার এই আচমকা কড়া চিৎকার আর এমন কথা শোনামাত্রই ডাইনিং টেবিলের সবার মুখের খাবার মাঝপথেই আটকে গেল! পিনপতন নীরবতার মাঝে সবাই হাঁ করে ইনশিরার দিকে তাকাল।
জারিফ ইনশিরার এই রুদ্রমূর্তি দেখে নিজের চামচটা রেখে, হেসে বলল—

রুহ এ ইশক পর্ব ৫

—”কী রে আম্মু আমার? হঠাৎ খাওয়া ছেড়ে ওমন খুনের কথা বলছিস কেন? কী হয়েছে তোর? কার ওপর এত রাগ?”
ইনশিরার আম্মুও অবাক, ইরা বিকালেই সেই আচরণ নিয়ে কিছু টা ক্ষিপ্ত ছিল। বাবার অতি আদরে এই অবস্থা মেয়ে টার। ইরা ওর দিকে তাকিয়ে বলে—
—”এই মেয়ে এসব কোন ধরনের কথা?”

রুহ এ ইশক পর্ব ৭