Home সোনাডিঙি নৌকো সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৮

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৮

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৮
মৃধা মৌনি

জ্বরে অস্থির বকুল। এই ক’দিনে পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়েছে সে। দীক্ষার নিজেরও আজকাল ভালো লাগে না। সারা রাত ধরে ঘুমাতে পারে না। শরীরটা পোড়ায়। অস্থির অস্থির লাগে। শুতে গেলেই বুক ভার হয়ে ওঠে। বসে বসে কি আর ঘুমানো যায়? পায়ের পাতায় পানিও জমেছে। কি ভীষণ উতলা লাগে মন বাড়ি!
বকুল ঘুমিয়ে আছে রমিলার খাটে। রমিলা চলে যাওয়ার পর এই ঘর বকুল নিজের আয়ত্তে নিয়েছে। ঘোষণা দিয়েছে, এখানেই থাকবে। অপরদিকে বড় মামা চাইছিলেন, ঘরখানা আগের মতোই তালাবদ্ধ থাকুক। কে জানে, পাগল মানুষের ঘরে থাকলে সুস্থও পাগল হয়ে যায় কিনা। তাতে বকুল কড়া ভাষায় প্রতিবাদ করেছে। বড় মামা চুপসে গেছেন এরপর।

আকাশে আর সূর্যও নেই। এত ঠান্ডা!
বকুলের গায়ের উপর মোটা মোটা দুটি কম্বল চাপানো। তাও কেমন কাঁপছে। দীক্ষা ঘরে ঢুকল। কাছে গিয়ে হাতখানা গালে চাপতেই আঁতকে উঠতে হলো। এত গরম! বকুল পিটপিট করে চোখজোড়া মেলল। অস্পষ্টে ডাকল, ‘আপা।’
দীক্ষা বসল শিয়র পানে, ‘কিছু খাবি? পানি খাবি? এত্ত জ্বর.. ডাক্তার দেখানো দরকার তো।’
দু’ধারে মাথা নাড়ল বকুল, ‘কিছু খাবো না। তুমি একটু বসো। আমার না ভয় ভয় করে আপা।’
দীক্ষা ফ্যাকাশে ঠোঁটে হাসল, ‘ভয়? কিসের ভয়?’
‘জানি না আপা। খালি মনে হয়, মা আমার পাশেই শুয়ে আছেন। মাঝে মাঝে তার গায়ের গন্ধও পাই যেন। ভ্রম বুঝি।’
‘তাই হবে। জ্বরের ঘোরে কি না কি ভাবছিস।’

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

‘কাল বোধহয় দেখলাম ও আপা। একটা ছায়া ছায়া, ওই জানলার কাছে, মা যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন..’
‘ধুর, ওসব কিছু না। কিছু একটা ছায়া পড়েছে আর তুই ভেবেছিস…’
বকুল চুপসে রইল।
দীক্ষা বোঝালো না, ভয় সে নিজেও পাচ্ছে।
যতবার রাতে চোখ বন্ধ করে, ততবারই মনে হয়, আবারও কেউ আসছে। এগিয়ে আসছে, কাউকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
এসব সাধারণ ভয়- হঠাৎ করে কোনো বাড়িতে মৃত্যুদূত এসে উপস্থিত হলে এমন আতংক সবার ভেতরই ছড়ায়।
দীক্ষা বলল, ‘কিছু খেতে মন চাইলে বলিস। এই সময়ে ভাত পানি ভালো না লাগলেও হাবিজাবি খেতে ইচ্ছে করে।’
‘মা তো না খেয়ে আছে, তাই না আপা?’ বকুলের উদাসীন কণ্ঠস্বর। দীক্ষার এত মায়া হলো! মেয়েটা স্বাভাবিক হতে পারছে না এখনো। তার কাছে ঘটনাটি একটা বিরাট ট্রমার মতোন। হঠাৎ করেই চলে যাওয়া, তাও সেদিনই যেদিন তাকে একটু ভালোবেসেছিল রমিলা মামী- যার ভালোবাসা পাওয়ার এক সমুদ্র আকাঙ্খা নিয়ে এতকাল ধুঁকে ধুঁকে বাঁচছিল মেয়েটা…

দীক্ষা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
নরম সুরে বলল, ‘বোকা মেয়ে, রুহ চলে গেলে খাওয়া ঘুম এসব লাগে নারে। যতক্ষণ রুহ আছে ততক্ষণেই সব। এরপর অন্য এক পৃথিবী।’
‘সেই পৃথিবীতে মা কি ভালো আছে?’
‘অবশ্যই আছে। রমিলা মামীর মতো ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে আর একটাও ছিল? যে মানুষটা এত কষ্ট, জ্বালা, যন্ত্রণা সহ্য করে গেলেন দুনিয়াতে, তাকে আল্লাহ তার মাটির ঘরে ভালো রাখবেন না? নিশ্চয়ই রাখবেন। দোয়া কর বকুল, বেশি বেশি দোয়া কর।’
বকুল শুয়ে শুয়েই দোয়া পড়ল, রাব্বির হামাহুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরাহ…
শান্ত জানালায় এসে দাঁড়াল ঠিক সেই সময়। বকুল, দীক্ষা দু’জনেই তাকাল ওর দিকে। শান্তর চেহারা শূন্য, সাদা- যেন তার উপর দিয়েও বড় কোনো ঝড় বয়ে গেছে। দীক্ষা উঠে এগিয়ে এলো।

‘কিছু বলবেন?’
শান্ত কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। তার অস্বস্তি বুঝতে পেরে দীক্ষাই বলল আবার, ‘কিছু বললে বলুন, সমস্যা নেই।’
‘না মানে…’ মাথা চুলকালো শান্ত, ‘এখন এটা বলার সময় কিনা বুঝতাছি না। আপনি কি ভাবেন…’
দীক্ষা অভয় দিলো, ‘কিছু ভাবব না। আপনি বলুন। ভিতরে আসেন নাহয়।’
‘আসি।’

শান্ত ঘরের ভেতর ঢুকল। বকুল উঠে বসল সামান্য। মাথাটা ঠেকালো দেয়ালে, গলা পর্যন্ত কম্বল টেনে দিয়ে ঘোর লাগা চোখে চেয়ে রইল মানুষটার দিকে। কি জন্য এসেছে এই লোক? এতকিছু হলো, একবারও বকুলের কাছে আসেনি। স্বান্তনা দিয়ে দুটো কথাও বলেনি। অথচ প্রতিদিন ঘুরে গেছে এ বাড়ি থেকে। সবার সাথে কথা বলেছে- কেবলমাত্র তার সাথেই কথা বলার সময় হয়নি। কি খারাপ! মানুষ কি এই সময়েও এত দেমাগ নিয়ে থাকে? বকুলের হৃদয় ভার হলো।
শান্ত ওর দিকে একবারও তাকাল না। তার সমস্ত মনোযোগ যেন দীক্ষার দিকেই। হাতে করে কিছু একটা এনেছে। সেটা খুলে দেখাতেই দীক্ষা হতবিহ্বল হয়ে পড়ল।
‘এটা কি!’
শান্ত মাথা চুলকায়, ‘আপনার একটা খাতা পাইছিলাম, আঁকাআঁকির।’
‘পরে?’

‘না বলে নিয়ে গেছিলাম। আমার বাড়ির ওইখানে দুইটা মেয়ে আছে। ওরা আবার হাতের কাজ করে। শহর থেকে একজনে অর্ডার দিয়া যায়। আমি কয়েকদিনই দেখছি। ওগোরে এই ছবি দেখাইয়া ডিজাইন তুলতে বলছি কাপড়ে। ওরা সুতা দিয়া ফুটাইছে, যদ্দুর পারছে আর কি। তাই দেখাইতে আনলাম, আপনার পছন্দ হয় কিনা।’
দীক্ষা অভিভূত হয়ে পড়ল। এত সুন্দর একেকটা কারুকার্য! নীল অপরাজিতার কাজটি পুরোই সত্যিকারের মনে হচ্ছে। লাগছে হলুদ কাপড়ে নীল ফুল ফুটেছে সত্যি সত্যি! একটা সাদা কাপড়ে লাল গোলাপ ফুটিয়েছে। কি দারুণ… দীক্ষা সবকিছু ভুলে গেল। হাতে নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল একটার পর একটা কারুকাজ।
বকুলকেও এগিয়ে দিলো। সেও অবাক।

জানাই ছিল না, তাদের গ্রামে এত সুন্দর হাতের কাজ করে কেউ!
দীক্ষা সিক্ত চোখে তাকাল শান্তর দিকে, মোহিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি চমৎকার জিনিস দেখালেন। আমি যে কি বলে আপনার ধন্যবাদ দেই…থ্যাংকিউ! থ্যাংকিউ আপনাকে!’
শান্ত হাসল, ‘আরে ধুরো, নিজেদের মধ্যে আবার ধন্যবাদের কি! আপনার উপকার করতে পারলে নিজের মনেই একটা শান্তি শান্তি লাগে।’
‘আপনাকে এবার আমার ম্যানেজারের দায়িত্বটা দিতেই হয় বুঝি…’
শান্ত – দীক্ষা দু’জনেই হেসে উঠল।

হাসল না কেবল বকুল। মনটা আরও ভারাক্রান্ত হলো তার। যাক…গামছার ম্যানেজার থেকে সুতার ম্যানেজার হতে তো পারছে। ইশ দেখো না, কি দাঁত কেলানি.. হাম্বলদিস্তা বলদ গরু একটা!!
বকুল কিড়মিড় করল মনে মনে, জ্বর বোধহয় আরও বেড়ে গেল তার, ‘খুশিতে দুটো ডান্স দে এবার.. ছাগলের মতো ম্যা ম্যা করছিস কেন? ঘুঙুর এনে দেবো? কোমরের বিছা? চকোমকো নেচে মনের খুশি প্রকাশ কর। হাবাইত্তার ঘরের হাবাইত্তা…’

শান্ত বিরামহীন ভাবে হেসেই চলেছে। দীক্ষা ‘দিনকাল কেমন চলছে’ জিজ্ঞেস করাতেও শান্ত হেসে হেসেই উত্তর দিচ্ছে। বলা বাহুল্য, হাসির দমকে উত্তর ঠিক করে দিতেও পারছে না। বকুলের নাক দিয়ে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস বেরোলো। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট পদটা পেয়ে গেছে নাকি পাঠার বাচ্চা….
দীক্ষা ঘর ছেড়ে বেরোলো। কাজগুলো খালেদা বেগমকে দেখাবে। ওর চঞ্চল মস্তিষ্ক বহু বছর বাদে আবারও সচল হয়ে উঠেছে। নানা রকমের বুদ্ধি নিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। দেখা যাক, এই বুদ্ধির জোরে কোনো কিছু করা যায় কি না!
শান্ত ও বেরোতে নিলো।

তারপর হঠাৎই দরজার মুখে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। দীক্ষা পুরোপুরি উঠানের আড়াল হতে সে আবারও ঘুরে আসলো। বকুল খানিকটা চমকালো। কিন্তু মুখভঙ্গি দেখে তা বোঝার উপায় নেই। থমথমে জ্বরে কাতর চেহারায় চোখ দুটো বুঁজে নিলো। এই রামছাগলের মুখটাও দেখতে চায় না সে…
বিছানায় শব্দ হলো।

শান্ত বসেছে। বকুল মনে মনে আওড়ালো, ‘বসতে গিয়ে খাটটাও নড়িয়ে ফেলছে। পুরাই বলদ গরু!’
শান্ত কোমল সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে, শরীরটা এখন কেমন লাগে?’
বকুল চোখজোড়া মেললো না। বুঁজে রেখেই থমথমে কণ্ঠে জবাব দিলো, ‘জানি না।’
‘সেকিরে, নিজের শরীরের খবর নিজেই জানিস না? ব্যাড, ব্যাড, ভেরি ব্যাড।’
বকুল চোখ মেলে তাকাল। তার ভ্রু কুঁচকে রয়েছে।
‘আপনি এখানে বসেছেন কেন? আপা তো ওইদিকে গেল।’
‘তো?’

‘আপনি তার সুতার ম্যানেজার না, বসের পেছন পেছন হাঁটবেন, এইতো স্বাভাবিক…’
শান্ত’র কপালে ভাঁজ পড়ল সহসা, ‘তুই কি আবার আমাকে নিয়ে মজা করতেছিস নাকি?’
বকুল হাসল, ‘মজা আর আমি? হাহ, আমার মজার পাত্র হতেও কোয়ালিফিকেশন চাই। একটা সুতার ম্যানেজারের সেই যোগ্যতাই নাই।’
দারুণ অবাক হলো শান্ত। এ কোন বকুল?
সবসময় মিষ্টি ভাবে নরম সুরে কথা বলা বকুল মেয়েটি কই? শান্ত আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজতে শুরু করল। বকুলের বিরক্ত লাগল খুব, ‘কি খুঁজছেন?’
শান্ত বলল, ‘বকুল রে…’
মেজাজ চড়ে না এমন কথায়? বকুলেরও চড়ল। রাগটাকে গিলে টিলে কোনোরকমে বলল, ‘মানে কি?’
শান্ত শান্ত ভাবেই ওর দিকে তাকাল, ‘মানে আমি বকুল রে খুঁজতেছি।’
‘তাহলে আমি কে?’
‘আমি কি জানি! আমাদের বকুল দুনিয়ার শান্ত মাইয়া দের ভিতরে এক নম্বর। বাতাসেও তারে নাড়াইতে পারে না। এতই স্থির। তোমার মতো না, চারাল! কটকট কটকট করে এত কথাও বলে না।’

‘আমি…আমি চারাল?’
‘ইয়েস!’
‘আপনি দয়া করে এখান থেকে বিদায় হন, প্লিজ!’
‘মামা বাড়ির আবদার..’
‘না বাপের বাড়ির আবদার। দয়া করে এখান থেকে বিদায় হন। আমি এক দুই তিন গুনার সাথে সাথে আপনি চম্পট… ওকে? এক…’
শান্ত উঠে দাঁড়াল, ‘জ্বরে মাথাটাই আউলে গেছে নাকি কে জানে। নেহাৎ অসুস্থ মানুষ দেখে দয়া দেখিয়ে চলে যাচ্ছি। সুস্থ থাকলে…’
বকুল গলা বাড়ালো, ‘কি করতেন?’
‘যা করতাম না…’
‘হু, কি করতেন, সেটাই তো জানতে চাচ্ছি, বলুন বলুন, কি করতেন আপনি?’
‘একদম ধরে…’

‘ধরে কি? ধরে কি? বলেন…’
শান্তও এগিয়ে দিলো গলাটা, চোখ গোল গোল করে বলল, ‘ধরে একদম…’
বকুল আরও আগালো, ‘একদম কি? বাকিটা বলতে পারেন না? জবান কি বন্ধ হয়ে গেছে?’
শান্ত কোনো কথা বলতে পারল না।
হঠাৎ করেই একজোড়া গভীর সমুদ্রের চোখের সন্ধান পেল সে। এত ভাসা ভাসা কারো চোখ হয়! মনে হচ্ছে মুখের উপর চোখ দুটো কেউ আলগা ভাবে বসিয়ে দিয়েছে। ডাগর ডাগর আঁখি- শুনেছিল কোথায় যেন! এই বুঝি সেই ডাগর ডাগর আঁখিদ্বয়ের রূপ?
শান্তকে হঠাৎ করেই স্থির হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বকুল নিজেও স্থির হয়ে গেল। আশেপাশের সব নীরবতা কমে এলো। শুধু বেড়ে চলল হৃদয়ের হৃদস্পন্দন। এত জোরে দ্রিম দ্রিম শব্দ করে বাজছে… শান্ত ভাই শুনে ফেলবেন বুঝি!

বকুল ইতস্তত করে সরে যেতেই শান্ত’র ঘোর ভাঙল। সে নিজেও কেমন হতভম্ব হয়ে উঠল।
ঘর ভরে গেছে অস্বস্তির বাতাসে, উপস্থিত দু’জনের হৃদয়ই সর্বোচ্চ শব্দে ড্রাম পিটিয়ে চলেছে।
দু’জনেই স্তম্ভিত, লজ্জিত। পালাতে পারলে বাঁচে আপাতত!
শান্তই নীরবতা ভাঙলো শেষমেশ, ‘নিজের খেয়াল রাখ, ওষুধ পত্র খা, দ্রুত সুস্থ হ। এই ঘর-বাড়ির প্রয়োজন আছে… তোকে!’

তারপর বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে গেল। বকুলের খুব করে জানতে ইচ্ছে করল, ‘শুধু ঘর-বাড়িরই আমাকে প্রয়োজন, আর কারো কি আমাকে প্রয়োজন মনে হয় না?’
জানা হলো না। সবকিছু সবসময় জানাও যায় না। কিছু রহস্য প্রকৃতি নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখে মানুষ খেলিয়ে আনন্দ লুটে খায়।
খালেদা বেগম ও ভীষণ পছন্দ করলেন। হাতের কাজগুলো এতই সুন্দর, পছন্দ না হয়ে যায় কই!
দীক্ষা বলল, ‘এই ধরনের কাজ থ্রিপিস, শাড়িতে তুলতে পারলে ভালো হতো। ফতুয়া, ফ্রকের গলায়- হাতায়, সবাই পছন্দ করত।’

খালেদা বেগম উত্তর দিলেন, ‘সে তো মেলা পরিশ্রমের কাজ মা। তুই পারবি?’
‘চেষ্টা করতে ক্ষতি কি?’ দীক্ষার স্বর গাঢ় হয়ে উঠল, ‘নিজের জন্য কোনোদিন ভাবি নাই মা, এখন থেকে নিজের মনে যেটাই চাইবে সেটাই করব। ঠকলেও লাভ, জিতলেও লাভ- মনটা তো খুশি থাকবে।’
খালেদা বেগম মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
এই মেয়েটা বড়ই কোমলমতি, মায়াবতী ধরনের ছিল। যা দিয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট, বাড়তি চাওয়া পাওয়া নেই, জেদ নেই, স্বপ্ন ও ছিল না। জীবনে একটা জিনিসই চেয়েছিল প্রচন্ড জেদ করে, সেটা শিশির! খালেদা বেগম কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ওর সঙ্গে একটা ছোট্ট সংসার হলেই আমার এই জীবনের সব স্বপ্ন পূরণ হবে মা, তুমি বাবা কে বুঝিয়ে বলো না…

সেই চাওয়া পূরণ হয়েছিল ওর- বিনিময়ে হৃদয়টা ভেঙে গুড়িয়ে দিলো জা নো য়া র টা..
খালেদা বেগমের বুকচিঁড়ে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস তিনি সন্তর্পণে লুকালেন। মেয়েটা নতুন করে নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে যেখানে, সেখানে অতীতের শ্বাস ফেলাও উচিত হবে না।
দীক্ষা বহুদিন পর নিজের আইডিটায় ঢুকল আবারও। মাথার ভেতর একটা জিনিস ঘুরছে বারংবার। সেটা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত হবে- কে জানে!
কিন্তু এছাড়া আর উপায় কি?
নিজের জন্য দাঁড়াতে হবে, নিজের সন্তানের জন্য দাঁড়াতে হবে, নিজেদের বর্তমান আর ভবিষ্যতের জন্যেই দাঁড়াতে হবে শক্ত পায়ে.. যেন আর কেউ হাঁটু ভেঙে দিতে না পারে!
দীক্ষা মাথায় ঘোমটা টানলো। বিছানার একপাশে বসে আরও কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর ক্লিক করল ফেসবুকের লাইভ নামক অপশনটিতে….

শিশির বেরোচ্ছিল। গতকাল নিজেই ধুঁয়ে আয়রন করে একটা শার্ট গুছিয়ে রেখেছিল, ওটাকেই পরছে দেখে তৃণা সরু চোখ করে তাকাল।
‘কোথায় যাচ্ছেন?’ ভারী থমথমে স্বরে প্রশ্নখানা ছুঁড়ে দিলো সে।
শিশির শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে দায়সারাভাবে জবাব দিলো, ‘বাইরে।’
তৃণা হাতের কাজ থামাল, শান্ত চোখে শিশিরের দিকে তাকাল, ‘সে তো আমিও দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু বাইরেটা কোথায়?’
‘কাজে।’
‘কি কাজ?’

শিশিরের হাত থেমে গেল। কপালে ভাঁজ পড়ল। চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠল বিরক্তি, এই আচরণ তৃণার অপরিচিত মনে হলো না। দীক্ষার সঙ্গেও শেষ কিছুদিন এরকম ঠান্ডা মেজাজ দেখিয়েছে…
‘এত জেনে তোমার লাভ কি?’ বলল শিশির, ‘কাজে যাচ্ছি। সোজা বাংলায় টাকা কামাতে যাচ্ছি।’
‘আপনি কি কাজ করেন তাই তো জানলাম না। কোথায় চাকরি নিছেন,কিছুই বললেন না৷ টাইম টেবিল নাই। যখন মন চায় বেরোন, যখন মন চায় আসেন..’
‘তাতে তোর কি?’ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল শিশিরের কণ্ঠস্বর। তৃণা মোটেই চমকালো না। দীক্ষার সঙ্গে অল্পতেই তুই তোকারি করে ফেলত তখন, সে নিজের চোখে দেখেছে। এই সবকিছু কিসের ইংগিত দেয়- তৃণা বোঝে! ভালো করেই বোঝে! যা হয়েছিল, সব তো চোখের সামনেই হয়েছিল।

তৃণা কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নরম গলায় বলল, ‘রাগ না করলে একটা কথা বলতে চাই।’
নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে শিশির। পুনরায় হাতা গোটাতে গোটাতে জবাবে বলে, ‘শুনছি।’
তৃণা উৎসুক হয়ে এগিয়ে এলো, ‘আর কত দেড়ি করবেন? বিয়েটা করে নেই চলুন! কাবিন এক লাখ করলেই হলো। কাবিন তো মেইন না, মেইন হচ্ছে আমাদের একসঙ্গে থাকা টা, তাই না?’
শিশির আসমান থেকে পড়ল। বাপরে বাপ, শয়তানের মুখে আল্লাহর নাম! যে মেয়ে পাঁচ লাখের নিচে তাকে বিয়েই করবে না, সে কিনা এক লাখেই করতে চাচ্ছে। আর দু’দিন টাইট দিলে হয়তো দেনমোহরের ব্যাপারটাই থাকবে না। হাহ! চান্দু…

শিশির মনে মনে কথাগুলো বললেও উপর দিয়ে হাব করল সে গ্রাহ্যই করেনি তৃণার কথা। যেন শুনতেই পাইনি, এমন ভঙ্গিতে চুপ করে রইল। চিরুনি হাতে ফটাফট চুল আঁচড়ে নিতে লাগল।
তৃণা আবার বলে উঠল, ‘কি হলো? কি বললাম?’
শিশির গম্ভীর স্বরে বলল, ‘শুনেছি।’
‘জবাব কই?’
‘জবাব নেই।’
‘কেন?’
‘কারণ আমার কিছু বলার নেই।’
‘মানে কি? এভাবে আর কতদিন?’
‘কেন, এতদিন ধরেই তো আছো, আজ হঠাৎ এত উত্তেজিত কেন বিয়ে নিয়ে?’
তৃণার চোখ জোড়া ছলছল করল, শিশিরের সম্মুখে এসে দু’হাতে ওর গলাটা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতে করতে শুধালো, ‘আপনার হয়েছে কি? আপনি আমার দিকেও তাকান না। সারাক্ষণ ব্যস্ততা দেখান। আপনি কি আমাকে আর ভালোবাসেন না?’
শিশির তৃণাকে ঠেলে সরিয়ে দিলো। বিরক্তির চূড়ান্ত মাত্রা দেখিয়ে বলল, ‘যাবো একটা কাজে, এখন এসব ঢং না করলেই হয় না?’

‘এগুলো ঢং?’
‘তা নয়তো কি? আর বিয়ে টিয়ে এগুলোর কথা আপাতত ভুলে যাও। আমি নিজের একটা ব্যবসা দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। আগে ওটা দাঁড়াক, এরপর দেখা যাবে।’
তৃণার দু’চোখ উপচে কয়েক ফোটা জল গড়ালো। দেখলই না শিশির, বিছানার উপর থেকে ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেল ধাম করে, দরজা বারি খেয়ে তীব্র শব্দ করে উঠল। তৃণার মনে হলো, ওটা দরজা না, তার হৃদয়ে আঘাতের শব্দ- চূর্ণবিচূর্ণ হচ্ছে ভেতরে ভেতরে…
শিশির আজও এসেছে রূপালিতে। দু’দিনেই কেমন নেশা ধরিয়ে দিয়েছি মেয়েটা। নামও জানা গেছে- নয়নতারা। আসল নাকি নকল, কে জানে। এই লাইনে সবারই একটা করে আলাদা নাম থাকে। আজকে জেনে নিতে হবে। বাড়িতে কেউ আছে কিনা তাও জানতে হবে। মেয়েটাকে শিশিরের ভালো লেগেছে খুব। কেমন যেন, শান্ত, নম্র, বিনয়ী- কিন্তু দুর্দান্ত ঝড় তুলতে পারে। শিশির পুরো হাওয়ায় ভাসে ওর সঙ্গে থাকা সময়টা জুড়ে…
আজ অপেক্ষার তর সইছে না আর।
এত সময় লাগছে কেন, কে জানে!

সে বিছানার উপর দু’হাত ছড়িয়ে বসে আছে। চোখটা দরজার দিকে সেট করা। মনে মনে গুণছে, এক, দুই তিন…
পঁচিশে গিয়ে নয়নতারা ঢুকল। সেই হাসি হাসি মায়াবী মুখখান, পরনে হলদে সালোয়ার কামিজ, তাতে গোলাপি ফুলের বড় ছাপা আঁকা, কি সুন্দর আহা…!
শিশির মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
নয়নতারা ছিটকিনি আঁটকে ওর দিকে ফিরল। ঠোঁট দুটি চওড়া করে সুন্দর একটি হাসি ছুঁড়ে দিলো। কোমল গলায় জানতে চাইল, ‘কেমন আছেন আপনি?’
শিশির ঝলমলে কণ্ঠে বলল, ‘খুব ভালো। তোমার আজ দেড়ি কেন? কতক্ষণ আগে আসলাম..’
‘দুঃখীত। আমার শরীরটা আজ একটু খারাপ।’
শিশির আহত হলো, ‘কেন? কি হয়েছে? এদিকে আসো তো…’
এক হাতে টেনে নিলো নয়নতারাকে নিজের দিকে, নয়নতারাও মোলায়েম মাখনের মতো তার কোলের উপর গিয়ে বসল। শিশির দু’হাতে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মাথা রাখল।
‘কি হয়েছে?’

‘জ্বর।’
‘শরীর তো ঠান্ডা।’
‘এখন নেই।’
‘তাহলে আবার গরম করে দেই?’
নয়নতারা কিছু না বলে হাসল। রিনিঝিনি হাসির সুর, বুকে গিয়ে দোল খায় যেন…
শিশির ওর ভেতর আরও ঢুকে গেল।
‘তোমাকে খুব ভালো লেগেছে।’
‘আমারও!’
‘সত্যি?’
‘হুম। আপনার মতো কেউ এত সুন্দর করে কথা বলেনি। সবাই চাকরের মতো করে….’
‘ওসব বাদ। আমায় কিছু কথার জবাব দেবে?’
‘বলুন।’
‘তোমার আসল নাম কি নয়নতারা?’
নয়নতারা মিটমিটিয়ে হাসল, ‘কেন? সন্দেহ হচ্ছে?’
‘না মানে এই লাইনে তো…’

শিশির উশখুশ করছে। সে কিছুতেই ভাবতে চায় না নয়নতারা একজন প্রস্টিটিউট! এমনকি ওকে ও সেটা ফিল করাতে চায় না।
নয়নতারা তার সংকোচ বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বলল, ‘আপনাকে মিথ্যে বলিনি। এ জগতে আমায় সবাই চাঁদনি বলে চেনে।’
‘নয়ন…’
‘হুঁ?’
‘তোমার বাবা মা কেউ নেই?’
নয়ন নীরবে দু’ধারে মাথা ঝাঁকাল, ‘উঁহু..’
শিশির ওকে টেনে সামনের দিকে ফিরিয়ে দু’হাতের আঁজলায় মুখটাকে আগলে নিলো।
‘এভাবেই জীবন কাটবে? একটা সংসারের সাধ কি জাগে না?’
নয়নতারা জবাব দিলো না।

তার চোখজোড়া সিক্ত হচ্ছে ধীরে ধীরে। সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না মোটেই…
শিশির ওকে বুকে ঢুকাল, ‘আমায় বিয়ে করবে নয়ন?’
নয়ন স্থির হয়ে জমে গেল, ‘উঁ?’
‘উঁ কি? হ্যাঁ অথবা না বলো। কিন্তু প্লিজ না বলো না। হ্যাঁ-ই বলো, প্লিজ! আমি শিশির, আগে জব করতাম, এখন এসব ছেড়ে ব্যবসা করি। আমার বাবা নেই, মা, ভাই, ভাইয়ের বউ সব আছে।’
‘আর বউ?’
শিশির হাসল, কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ওটা তো তুমি হবে..’
লজ্জায় এইটুকুনি হলো নয়নতারা। এ পেশায় এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি। তবু এইটুকুতেই তার রূপের জাদুতে কাবু করেছে অনেককেই। অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। কারো ডাকে সাড়া দেয়নি সে। কিন্তু আজ… কেন যেন এই এলোমেলো চুলের ছেলেটার হাতে হাত রাখতে ইচ্ছে করছে। চিরজীবনের মতো…

‘উত্তর দেবে না?’ আবারও বলল শিশির।
নয়ন কেঁপে ওঠে শুধালো, ‘আমি আপনার… এখন!
আগামীর কথা…. ললাটে বলবে!’
ওর ওষ্ঠদ্বয়ের সঙ্গে নিজের অধর মিশিয়ে দিতেই শিশির চোখ বুঁজে নিলো। এই মেয়েটা এত নেশাময়ী কেন? শিশির ডুবে যাচ্ছে… কোথায়?
এই সমুদ্র থেকে হাতড়ে বেঁচে ওঠার ও কোনো পথ কি আছে? জানা নেই….

তৃণা কাঁদল, খুব কাঁদল।
কেঁদেকেটে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলল।
শিশিরের এই পরিবর্তনের কারণটা বুঝতে পারছে তৃণা। বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে। একই কারণে তো পরিবর্তন হয়েছিল এর আগেও একবার.. তৃণার কারণে দীক্ষার সঙ্গে, আজ নিশ্চয়ই অন্য কারো কারণে তৃণার সঙ্গে। কিন্তু সেই অন্য কেউটা কে? তৃণা বুঝতে পারছে না। কোনো প্রমাণ ও পাচ্ছে না। শিশিরের সঙ্গে কার হঠাৎ করেই এত খাতির জমে গেল যে তৃণাকে আর সইছেই না ছেলেটা! নাকি পুরোনো কাসুন্দিই ঘাটছে ও? দীক্ষাই কি আবার ফিরে এলো? হতে পারে!
তৃণার বুক ভেঙে খানখান হয়। দীক্ষার পেটে ওর সন্তান- তাকে মেনে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু না। কি করবে তৃণা? কোথায় যাবে? শিশির তাকে আর বিয়ে করে কিনা, তাতেও একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন লেগে গেছে এখনে…এভাবে কি জীবন যাবে?

মোটেই না!
তৃণা চোখমুখ মুছে বাইরে বেরোলো। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। পশ্চিমা আকাশে লালিমার চাদর টানা। সে ধীরে ধীরে পা বাড়াল সহেলিদের ঘরের দিকে। সহেলিও তার সঙ্গে খুব একটা কথা বলছে না… কেন, কে জানে! জিজ্ঞেস করতেও সাহসে কুলায় না। যদি থলের বেড়াল বেরিয়ে আসে?
দরজা ভেতর দিয়ে বন্ধ।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৭

তৃণা কান পাতলো। ভেতরে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সে নিচে তাকাল। দরজার সামনে জুতোজোড়া নেই। এর মানে হাসিব ভাই বাইরে…. তৃণা সরে এলো। দাঁড়াল ছাদের সেই কোণায়, যেখানে দাঁড়ালে মন ভালো হতো তার। আজ হচ্ছে না। আকাশের দিকে তাকালে কেবলই কান্না পাচ্ছে। কিভাবে আবার ফেরাবে শিশিরকে? উপায় আছে? আছে- যদি দীক্ষাকে ফেরানো যায়, হয়তো আবারও তৃণাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করবে সে। তৃণা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, যেভাবেই হোক, বাড়ি যাবে সে… দীক্ষার মুখোমুখি হবে। শিশিরকে ছিনিয়ে আনবে- যেভাবে ছিনিয়ে নিয়েছিল আগেও একবার! ভাবতে ভাবতেই তৃণার শরীরটা এত খারাপ লাগল। পেটের ভেতর থেকে কি যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তৃণা গলগল করে বমি করে ছাদের ওই কোণ ভাসিয়ে ফেলল।

সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৯