সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৯
মৃধা মৌনি
আমি আমার ভালোবাসার মানুষটির থেকে প্রতারিত হয়েছে। না, না, সে শুধুই আমার প্রেমিক ছিল না; বরং অনেক যুদ্ধের পর তাকে আমার স্বামী হিসেবে পেয়েছিলাম আমি। প্রেমের পূর্ণতা হয়েছিল আমাদের। কিন্তু সেটাকে ধরে রাখতে পারিনি। হয়তো আমার দোষে, হয়তোবা তার দোষে, হয়তোবা ভাগ্যের দোষে- ঠিক জানা নেই, কেন, কীভাবে তার সঙ্গে আমার এই করুণ পরিণতির মোড় ঘুরল জীবনে! তাও কি না আমারই গর্ভাবস্তায়!
কার সঙ্গে জানেন? জানলে খুব বেশি অবাক হবেন না হয়তো… আমার আপন ছোট বোনের সঙ্গে, যে কিনা পড়াশোনার জন্যে আমার শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই আমার ঘর ভাঙলো! অবশ্য দোষ ওর একার দিয়ে লাভ কি, যেখানে আমার ঘরের মানুষই ঘর করতে চায় না…আচ্ছা, যারা প্রতারিত হয়েছেন, তারা কীভাবে নিজেদের সামলেছেন? কীভাবে গুছিয়েছেন? কীভাবে শুরু করেছেন সবকিছু? এলোমেলো, অগোছালো রাস্তায় পড়ে হাঁসফাঁস করেনি আপনাদের হৃদয়? আমার তো করে। খুব করে। মাঝে মাঝে সবকিছু এতো জটিল মনে হয়, জীবনটাকে বিচ্ছিরি লাগে। ইচ্ছে করে পালিয়ে যেতে- অনেক অনেক দূরে…
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তারপর যখন পেটের ভেতর গুটিশুটি পাকিয়ে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট সোনাটার কথা ভাবি, তখনই হার মানি। হার মানি মুক্ত হওয়ার ভাবনা থেকে। হার মানি ডিপ্রেশন থেকে হাতড়ে পাতড়ে ওঠার রাস্তা খোঁজা থেকে। আমাকে যে বেঁচে থাকতে হবে, একটি নতুন প্রাণ পৃথিবীতে আনতে হবে, তাকে সুন্দর একটি জীবন দিতে হবে- কত কত দায়িত্ব আমার কাঁধে তাই না? ডিপ্রেশনে ডুবে ভেঙেচুরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেলেও এই দায়িত্ব থেকে হটার কোনো পথ কি আছে? নেই…তাই আমি শুরু থেকেই শুরু করছি। শুরু করছি আমার এক নতুন যাত্রার… যা আমাকে বাঁচাবে, আমার ছোট্ট সোনাটাকে একটা সুন্দর জীবন দেবে। এবং এই যাত্রায় আমারই মতোন কেউ যদি আমার সঙ্গের যাত্রী হতে চায়, আমি খুশিমনে তাদের গ্রহণ করে নেবো।
আমার ছোট্ট একটা ক্লথিং পেজ- ‘রুদ্রাণী’ কে আপনারা কি একটু ভালোবাসা দেবেন? সুই সুতোর গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এবং কারুকার্য নিজের ঘরে, নিজের পোশাকে বহন করতে চাইলে ‘রুদ্রাণীর’ সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
“আমরা শুরু করেছি শূন্য থেকে;
আজ বুক ভরে দাঁড়াই শত সহস্র সাহসী নারীকে সঙ্গে নিয়ে।
যাদের পথ থামায়নি ভাঙা সম্পর্ক, প্রতারণা কিংবা ত্যাগ- আমরা তাদের শক্তির পোশাক বুনি।”
দীক্ষা মজুমদার।
কি লিখল, নিজেও জানে না সে। লাইভে এসে কি বলবে, বুঝতে না পেরে পোস্টেই লিখল যা খুশি তাই। তারপর চোখ বুঁজে পোস্ট অপশনটি ক্লিক করল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। গলা শুকিয়ে আসছে। কেন এরকম অস্থির লাগছে নিজেও জানে না সে। সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব যে একটিভ পারসন সে, তাও না। গুটিকয়েক মানুষের সঙ্গে এড- তারা সবাই চেনা পরিচিত। এর বাইরে তেমন কারো সাথে কথাও বলেনি দীক্ষা। এভাবে পোস্ট করে কয়জনের থেকেই বা সাহায্য পাওয়া যাবে? জানা নেই। তবু দীক্ষা একটা চেষ্টা করল। আল্লাহ তায়ালার হাতেই তো সব- সুখ, দুঃখ। তার হাতে যদি সুখ লেখা থাকে দীক্ষার জন্যে, আসবে। আর দুঃখ থাকলে তাই সই। যা ছিল হারানোর, সব হারিয়েই গেছে। বিশ্বাস, সম্মান, ভালোবাসা- হারাবার আর কিছুই তো নেই।
দীক্ষা বাইরে বেরোলো। বকুল মুখ কালো করে দাওয়ায় বসে আছে। গায়ের উপর কম্বল চাপানো। দীক্ষা ওদিকেই গেল।
‘খাবি কিছু?’ প্রশ্ন করল সে।
বকুল তার উত্তরে আচানক বলল, ‘ভালোবাসা জিনিসটা কি আপা?’
দীক্ষা চমকালো, অবাক হলো বকুল নিজেও।
কিরকম একটা প্রশ্ন করে ফেলল! আপা কি না কি ভাবছে এখন! বকুল মিঁইয়ে গেল কম্বলের তলায়, বিড়বিড় করে সাফাই দিতে লাগল, ‘সরি আপা, কি যে বলে ফেললাম…’
দীক্ষা ওর পাশে বসল পা ছড়িয়ে।
পেটটা এত উঁচু আর ভারী হচ্ছে দিনকে দিন, আগের মতো আরাম করে বসতে পারে না এখন আর। যেখানেই বসুক, পা ছড়িয়ে হেলান দেওয়া লাগে। টিনের দেয়ালে হেলান দিলো দীক্ষা, সম্মুখপানে তাকাল। কোথায় কে জানে! কোনো এক বিন্দুতে মিলল হয়তো চোখের দৃষ্টি, কিংবা মিলল না…
দাওয়ার ওপরে নিস্তব্ধ সন্ধে নেমে এসেছে। পশ্চিম আকাশে রঙ বদলাচ্ছে আলো। কমলা থেকে বেগুনি, তারপর ধীরে ধীরে ঘন নীল। গাছের মাথায় হালকা বাতাস লাগছে, বাঁশের পাতাগুলো সশব্দে দোল খাচ্ছে, দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে যেন ঘরে ফেরার তাড়া লেগেছে তারও। বারান্দার ঠিক নিচে মাটিতে শুকনো পাতার উপর দিয়ে একটা বিড়াল হেঁটে গেল হালকা খসখস শব্দে। সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন এই মুহূর্তে একটা নিঃশ্বাসহীন নীরবতায় ডুবে আছে।
শব্দহীন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোল তার বুক চিঁড়ে- নীরবতাকে নিশ্চিন্দ্র করে দিয়ে উচ্চারণ করে গেল একেকটি ভারী শব্দ অক্ষর,
‘ভালোবাসা… ভালোবাসা হলো… কারো পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি। শুধু ভালো সময়ে না- সর্বনাশের সময়েও। ভালোবাসা মানে হচ্ছে, একটা মানুষকে দেখে মনে হওয়া- তার কাছে আমার সব ক্লান্তি গলে যাবে… তার কাছে আমি নিরাপদ। আমার আর ঘুমের ওষুধ লাগবে না। তার বুকে মাথা রাখলেই ঘুম নামবে ঝাঁপ ধরে। ভালোবাসা তো তাই, কাঠফাটা রোদে টগবগ গরমে ভীড়ের মাঝে বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ মনে পড়ল তার মুখটা- ব্যস, চোখ বুঁজে একটা নিঃশ্বাস টেনে নিতেই পরবর্তী দুই ঘন্টা চলার শক্তি পেয়ে গেলাম নতুন করে…’
বকুল নিঃশব্দে শুনছে। তার চোখের দৃষ্টি কাঁপছে।
দীক্ষার গলা হঠাৎ থমকে গেল। চোয়াল শক্ত হলো সামান্য, ‘আমি তো… ঠিক এমনভাবেই ভেবেছিলাম শিশিরকে নিয়ে…’ সে ফিসফিস করে বলল।
‘ভাবতাম ও থাকলে আর কিছু লাগবে না। আমি সব দেব, নিজের সবটুকুই… দিয়েছিলামও। সংসার, স্নেহ, মান–অভিমান… মানুষটাকে যেন আমিই বাঁচিয়ে রাখব, এই ভাবনা ছিল। কিন্তু তারপর…. আচ্ছা কি কমতি ছিল আমার? কেন হলো এসব…’
কথা বলতে বলতে তার চোখ ভিজে উঠল হঠাৎ করেই। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো সামনে।
হাওয়াটা যেন একটু ঠান্ডা হয়ে গেল। দাওয়ার সামনে রাখা তালগাছের ছায়া দোল খেতে খেতে দীক্ষার চোখের জলে মিলিয়ে যাচ্ছে।
‘ভালোবাসা…’ দীক্ষা আবার বলল, শব্দগুলো এবার কাঁপছে, ‘ভালোবাসা তো হারাতে হয় না… ভালোবাসা তো বুকভরে থাকার কথা সবসময়। কিন্তু আমি হারিয়েছি। হারিয়েছি আমার ঘর, আমার সম্মান… সবচেয়ে বেশি হারিয়েছি বিঃশ্বাস নামের জিনিসটা।’
তার চোখের কোণ বেয়ে ধীরে ধীরে অশ্রু গড়িয়ে নামছে। নিজের অজান্তেই পেটের উপর হাত রেখে দিল, ‘এই যে আমার সোনা, এটা আছে বলেই বাঁচি আমি। না থাকলে… জানি না, কোথায় ভেঙে পড়তাম।’
বকুল এতক্ষণ কম্বলের ভেতর মুখ গুঁজে ছিল। এবার আস্তে করে দীক্ষার পাশে আরও একটু সরে বসে।
একদম কিছু বলে না, শুধু তার মাথাটা হালকা করে দীক্ষার কাঁধে ঠেকিয়ে দিল।
দীক্ষা চমকে তাকাল। বকুলের চোখে দুঃখ… অপরাধবোধ… আর এক ধরনের শীতল মমতা।
‘আজ আর না করব না।
কাঁদো আপা, খুব কাঁদো..’ বকুল খুব নরম গলায় বলল, ‘মনটা ভারী রাখলে মানুষ বাঁচে না। কাঁদলে হালকা হয়… একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহ খুব ভালো রাখবেন তোমাকে।’
দীক্ষার চোখ আবার ভিজে গেল।
হাওয়াটা একটু জোরে বইল। উঠোনের আমগাছের পাতাগুলো সরসর শব্দ তুলল, যেন নেমে আসা রাতও এ দু’জনের ব্যথায় কান পেতেছে।
দীক্ষা নিঃশব্দে মাথা নামিয়ে চোখ বন্ধ করল।
বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে এল এক টুকরো ভাঙা অথচ স্বস্তিদায়ক নিঃশ্বাস- যেন অনেকদিন পর একটু হালকা হলো সে।
শিশির বাড়ি ফিরল রাত একটায়।
তৃণা চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছে এতক্ষণে। সেই নয়টা থেকে অপেক্ষা করছে। অথচ মহাশয়ের কোনো দেখাই নেই। ফোন দিয়েছিল বার কয়েক, ফোনটাও বন্ধ! তৃণার এত চিন্তা জীবনে হয়নি। উত্তেজনায় ঘর ফেলে ছাদে পায়চারি করেছে ভূতের মতো করে। বারবার উঁকি দিয়ে দেখছে রাস্তায়, শিশিরের খোঁজ নেই।
দরজা চাপানোই ছিল৷ তৃণা শুয়েছিল গুটিশুটি হয়ে। দরজা ফাঁক হতেই উঠে বসল তড়িঘড়ি।
‘কোথায় ছিলেন?’ উত্তপ্ত স্বরেই জিজ্ঞেস করল।
শিশিরের হেলদোল নেই। যেন শুনতেই পায়নি তৃণার কথা। ঘরে ঢুকেই শার্টটা খুলতে শুরু করল। তৃণা আর কিছু বলল না। উঠে ভাত বাড়তে নিতেই শিশির জানাল, ‘খাবো না।’
তৃণা অবাক হলো, ‘খেয়ে এসেছেন?’
‘হুম।’ বলে শিশির শুয়ে পড়ল বিছানায়, ‘বাতি নেভাও, ঘুমাবো।’
তৃণা লাইট বন্ধ করল না। বরং এগিয়ে এসে শিশিরের শিয়রের কাছে বসে, ‘কোথায় ছিলেন?’ তার কণ্ঠস্বর ভারী শোনালো।
‘কাজে।’ শিশিরের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
‘কী এমন কাজে ছিলেন এত রাত অবধি! আপনি জানেন আমি আপনাকে কতগুলো ফোন করেছি? আপনার ফোনটাও অফ…’
‘চার্জ নেই।’
‘আমাকে একবার জানিয়ে দিতেন যে দেড়ি হবে।’
শিশির উঠে বসল, ‘না জানিয়ে অনেক বড় অপরাধ করে ফেলেছি ম্যাডাম, এই যে হাতজোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি, এবারের মতো আমাকে ক্ষমা করে দেন। এরপর থেকে রাত ভোর যাই হোক, আমি আপনাকে জানাবো, ঠিক আছে?’
বিরক্তি গলে গলে পড়ছে তার গলা দিয়ে। তৃণার মেজাজ চড়ল, ‘এমন কি বলে ফেললাম যে এভাবে রিয়েক্ট করছেন? আমাকে একটু জানাতেই তো বলেছি, নাকি…’
‘আমিও তো বললাম জানাবো নাকি?’
‘তাতে এত নাটকের কি? স্বাভাবিক ভাবে বলা যায় না?’
‘আমাদের জীবনটাই তো নাটক হয়ে গেছে তাই না তৃণা?’ শিশির হাসল।
‘নাটক? কিসের নাটক?’
‘কেন, তুমি আমার বউ সাজার নাটক করছ, আমি তোমার জামাই হওয়ার নাটক করছি.. সব তো নাটকই, জীবনটাই একটা নাটক, তাই না?’
তৃণা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
দীক্ষার জন্যে তাকে এতোটা দূরে সরিয়ে দিয়েছে! আজ তার কাছে সবকিছু নাটক মনে হচ্ছে? তার জন্য স্কুল গেল, ফ্যামিলি গেল, সম্মান-আদর সব গেল। এখন তাকেই ছুঁড়ে ফেলে আবার চলে যেতে চাইছে?
তৃণা আচানক কলার চেপে ধরল ওর, ‘আপনি আমার জীবনটাকে নাটক পাইছেন? হ্যাঁ এটা একটা নাটক?’
শিশিরের এত বিরক্তি লাগল, ঝটকা মেরে ফেলে দিলো তৃণাকে সে। বালিশের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। ওভাবেই বলল, ‘ঘ্যানঘ্যান করো না তৃণা। ভালো লাগছে না, ঘুমাতে দাও।’
‘ভালো লাগবে কেন?’ তৃণা ফোঁপাচ্ছে, ‘এখন আর আমাকে ভালো লাগবে কেন? নতুন পেয়েছেন না…’
‘কি বললে?’ শিশির আবার উঠল, ‘কি বললে তুমি?’
‘বললাম, নতুন পেয়েছেন না, আমাকে আর ভালো লাগবে কেন?’
‘আমি নতুন পেয়েছি, তুমি জানলে কী করে?’ শিশির ভাবল, নয়নতারার কথা বুঝি জেনে ফেলেছে তৃণা। কিন্তু তৃণা জবাব দিলো, ‘নতুন না পেলে আমাকে ঠিকই ভালো লাগত আপনার৷ আমার কারণেই তো ওই দীক্ষাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন, এখন আবার তার কাছেই ফিরে গেছেন…ফেলা থুতু আবার গিয়ে চাটছেন.. ছিহ!’
ঠাস করে একটা চ ড় দিয়ে বসল শিশির। দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল, ‘ওর চেয়ে তুই তো আরও বড় যন্ত্রণারে… তোর মতো এত অসভ্য আর বেয়াদব ছিল না দীক্ষা। আমাকে বুঝছে। আর তুই.. নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছু চিনিস?’
‘আমি..আমি আমার স্বার্থ চিনি?’ তৃণা কাঁপছে- ভয়ে নয় ক্রোধে… কিড়মিড়িয়ে বলল আবারও, ‘কি স্বার্থ চিনছি হ্যাঁ?’
‘যখন বিয়ের কথা বলছিলাম, পাঁচ লাখের নিচে বিয়েই করবি না। আর এখন…. পায়ে ধরতেছিস…শালির ঘরের শালি…’
‘আর বিয়ে ছাড়া আমাকে খেয়ে দেয়ে এখন রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন, আপনি খুব ভালো?’
শিশির উচ্চস্বরে হেসে উঠল, ‘খেয়েছি, তোকে? ইয়াক থু… তোকে আমি ছুঁইওনি ওভাবে, ওকে?’
‘কে বিশ্বাস করবে?’
‘কে করল না করল আই ডোন্ট কেয়ার। যার করার সে করলেই হবে।’
‘তার মানে আমার সন্দেহই ঠিক। আপনি আবার দীক্ষার সাথে…’
শিশির কিছুই বলল না। তার নির্ভার লাগছে। মনে মনে ভাবছে, দুই বোন চুল ছিঁড়াছিঁড়ি করুক, মরুক গিয়ে, সে নয়নতারাকে বিয়ে করে অনেক দূরে কোথাও চলে যাবে। সবার থেকে দূরে। সুন্দর একটা সংসার সাজাবে, তার নিজের সংসার…
‘কি হলো, কি ভাবছেন? উত্তর দেন..’
‘উঁ? ভাবছি কীভাবে তোর বোনকে আবার আদর করব। ইশ, কত্তদিন আদর করি না। তুই শুনবি কীভাবে করব? শোন, প্রথমে গালে একটা চুমু খাবো, তারপর ঠোঁটে… তারপর ওর নিচে…’
তৃণার সহ্য হলো না কিছু।
মাথার ভেতর র*ক্ত উঠল যেন। এত রাগ, এত ক্রোধ- এত জেদ… সব মিলেমিশে একাকার!
শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে সে খাঁমচে ধরল শিশিরকে।
মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক গালাগাল…
‘হারামির বাচ্চা, শয়তান, শু য়ো র.. তোরে আমি…’
শিশিরও থেমে রইল না।
এই মেয়েটাকে তার আর সহ্যই হয় না। কিছুতেই না। দু’জনে রাস্তার কুকুরের মতো মা রা মা রি করল। চিল্লাচিল্লি, গালা গালি, গরম হয়ে উঠল আশপাশ। পাশের দুই ভাড়াটিয়াও বেরিয়ে এসেছে। বাড়িওয়ালাকে ডেকে এনেছে হাসিব। তিনি শিশিরদের দরজা ধাক্কা দিয়ে খোলার ব্যবস্থা করল। ভেতরে অবস্থা খারাপ। সবকিছু ভেঙেচুরে চৌচির অবস্থা। শিশির হাঁপাচ্ছে ষাড়ের মতো। আর তৃণা…
র ক্তা র ক্তি অবস্থায় পড়ে আছে ফ্লোরে। সাড়াশব্দ নেই, ম রে গেছে নাকি? বাড়িওয়ালা পুলিশ কল করল সাথে সাথেই…
রাতারাতি ভাইরাল হলো দীক্ষার পোস্টটা। যেন নিঝুম কোনো রাতের আকাশে আচমকা ফুটে ওঠা আতশবাজি। পরিচিতরা শেয়ার করল, সেই সঙ্গেই শেয়ার করল অপরিচিতের দল, যাদের মুখ দীক্ষা কোনোদিন দেখেওনি।
এক রাতের মধ্যে সদ্য খোলা পেইজটা বিশ হাজার মানুষের ভালোবাসায় থইথই করে উঠল।
বিভিন্ন গ্রুপ, অগণিত আইডি ও বড় বড় পেইজে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার পোস্ট। মানুষজন সমবেদনা জানাচ্ছে, উৎসাহ দিচ্ছে, কেউ লিখছে, “তুমি শক্ত থেকো বোন,”
কেউ লিখছে, “তোমার লড়াই আমাদের অনুপ্রেরণা।”
মেসেঞ্জারে ঢুকে দীক্ষা যেন এক বিশাল তরঙ্গের ধাক্কা খেল। নোটিফিকেশনে হাজারটা আলো ঝলমল করছে,
হাজারো হাত বাড়িয়ে এসেছে তার পাশে দাঁড়াতে।
এত ম্যাসেজ… এত কথা… কীভাবে সামলাবে সে?
চোখ দিয়ে অকারণে পানি নেমে এল—
দুঃখের নয়, কৃতজ্ঞতার। কেউ একসময় বলেছিল,
বিধাতা যা কেড়ে নেয়, তার বহুগুণ ফেরত দিতে ভুল করে না। আজ সেই কথাটাই যেন নতুন করে জন্ম নিল তার জীবনে।
দীক্ষা গভীর একটা শ্বাস নিল।
হঠাৎই তার ভিতরে আগুনের মতো দৃঢ়তা জন্মাল-
এবার কাজ শুরু করতে হবে, দ্রুত, যত্ন নিয়ে, নিষ্ঠা নিয়ে। নতুন জীবনের দরজা আজ সত্যিই খুলে গেছে।
বাড়িটা মুহূর্তেই উৎসবের মতো উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল।
বকুলের জ্বর পুরোই সেরে গেছে— সে তো লাফিয়ে লাফিয়ে দীক্ষার পাশে এসে বসল, নতুন ডিজাইনের খসড়া আঁকতে আঁকতে দু’জনে হাসাহাসি করছে।
খালেদা বেগম হাতে পানি নিয়ে সদকা দিলেন,
মেয়ে যেন বাকি জীবনটুকু আলোয় ভরে হাঁটতে পারে- এই দোয়া করে চোখ বুঁজলেন।
এদিকে কাজল ঢুকেই ঘোষণা দিল, ‘ডেলিভারি ম্যান আমি! যত দৌড়ের কাজ—আমার!’
তার মুখে এমন আত্মবিশ্বাস যে দীক্ষার হাসি থেমেই থাকল না।
এর মধ্যেই শান্ত এসে হাজির। দীক্ষা জানে না,
‘স্বপ্নের রাজকুমার’ নামের ভুয়া এক আইডি থেকে সে কতদিন ধরেই চুপচাপ তাকে ফলো করছে।
তার চোখেও পড়েছে দীক্ষার ভাইরাল হওয়া পোস্টটা- আর সেই টানেই সে ছুটে এসেছে।
সব মিলিয়ে বাড়ির ভেতরটা এক গরম দুপুরে রঙিন কাগজ উড়ানোর মতো আনন্দে ভরপুর। হাওয়া যেন ফিসফিস করে বলছিল, তোমার দিন ফিরছে দীক্ষা…
কিন্তু দুপুর গড়াতে না গড়াতেই সেই উচ্ছ্বাস মিলিয়ে গেল হঠাৎ জমে ওঠা মেঘের মতো। মাঝদুপুরের আলোটা যেন নিজেদের গুটিয়ে নিল, ঘরের ভেতর নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল এক শীতলতা।
দরজায় দাঁড়িয়েছে একটি ছায়া।
নীরব, স্থির… অথচ ভীষণ ভারী।
খালেদা বেগম প্রথম দেখলেন তাকে। তার চোখ বিস্ফোরিত, মুখ বিবর্ণ।
‘ইয়া আল্লাহ…’ নিজের অজান্তেই বলে উঠলেন তিনি।
দীক্ষার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মনে হলো কেউ তার সুখের উঠোনে এক গাদা কালো ছাই ঢেলে দিয়েছে।
বুকের ভেতরটা খচখচে আশঙ্কায় ভরে উঠল মুহূর্তে।
সোনাডিঙি নৌকো পর্ব ১৮
ও এখানে কেন?
এই সময়ে কেন?
আজই বা কেন?
ছায়ামূর্তিটা ধীরে ধীরে ভিতরে পা রাখতেই বাড়ির সব উচ্ছ্বাস, হাসি, আলো এক মুহূর্তে যেন গিলে ফেলল তার উপস্থিতি। বাতাস জমে গেল।
নিশ্বাস আটকে এলো দীক্ষার। দূরে কোথাও কি যেন বেজে উঠছে শব্দ করে। কি?— আবার নতুন কোন অশনিসংকেত?
