হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৯
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
রাতের প্রথম প্রহর, আশেপাশে সোডিয়ামের আলোতে আলোকিত হয়ে আছে চারিপাশ। যানবাহনের যান্ত্রিক আলোতে ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন রঙে রঙিন হচ্ছে রাস্তাঘাট। ছোট ছোট চায়ের টঙ গুলোতে আড্ডা জমেছে বেশ কিছু বেকার যুবকদের। গরম চায়ের সাথে জুড়ে বসেছে কথার ঝুলি।
কাঙ্ক্ষিত চায়ের টঙে এসে থামল কৃশানের ছুটন্ত পদযুগল। সেখানে আগে থেকেই বাকি তিন বন্ধু উপস্থিত। কৃশানকে দেখতেই তিন জোড়া সন্দিহান চোখ পড়ল তার উপর। অভি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“ মামা, আজকাল তোর মধ্যে কেমন যেন ঘাবলা ঘাবলা লাগতাছে! ব্যাপার কী বলতো? ”
“ ঘাবলা আমার মধ্যে না, তোদের মাইন্ডের মধ্যে। ”
নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিয়ে কাঠের বেঞ্চটায় বসল কৃশান।
“ মামা, এক কাপ চা দাও তো। ”
পরপর লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে দোকানদারের উদ্দেশ্যে বলল কৃশান। এর মাঝেই শুনা গেল রবির কণ্ঠ,
“ তা ঘাবলা না থাকলে তখন ফোনে সংসারের কথা বললি যে? ”
প্রশ্নটা শুনে কিছুটা ভরকে গেলো কৃশান। মনে পড়ল দুপুরে বলা কথাগুলো। তখন রাগের মাথায় কী আবোল তাবোল বলে ফেলেছে নিজেরই ঠিকমত খেয়াল নেই। তবে এখন যেভাবেই হোক পরিবেশ সামলাতে হবে।
“ ওহ, ওটার কথা বলছিস! আরে আজকে ইকরাকে দেখতে এসেছিল। ঐদিকে আমার বোনের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আর এইদিকে তুই কল দিয়ে আড্ডার কথা বলছিস- তাই ওসব বলেছিলাম। পরিবারে সকল সদস্যকে নিয়েই তো সংসার তাই না! ”
তৎক্ষনাৎ মাথায় যা আসলো তাই বলে দিল কৃশান। সামনের ব্যাক্তিদের সন্দিহান দৃষ্টি খানিক স্বাভাবিক হলো বোধ হয়। তবে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হলো না। রবি তার উপর পুর্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“ সবই বুঝলাম। তবে আমার কেমন যেন তোকে চেঞ্জ চেঞ্জ লাগছে। কারও প্রেমে ট্রেমে পড়েছিস নাকি? ”
প্রেম শব্দটা শুনতেই কৃশানের মানস্পটে ভেসে উঠলো একটা মায়াবী মুখ।
“ প্রেমে পড়েছি কিনা জানা নেই, তবে আজকাল হৃদ কোটরে এক মায়াবিনীর অবাধ্য বিচরণ চলে। তার একটু খানি সান্নিধ্যে সুপ্ত অনুভূতিরা বেনামী ঝড় তুলে! ”
মনে মনে আওড়ালো কৃশান। মুখে বলল,
“ ধুর এসব প্রেম-ভালোবাসার মতো প্যারাময় জিনিসে এই কৃশান মির্জা নেই। ”
একেবারে হাওয়ায় উড়নোর মতো কথাটা বলল সে। বন্ধুর কথায় বিশ্বস্ত চিত্তে হাসল বাকিরা।
রাত তখন এগারোটার কাছাকাছি, বাড়ির মূল ফটক পেড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো কৃশান। তালমাতাল হয়ে নয়, স্বাভাবিক ভাবেই ফিরেছে। এমন নয় যে নেশা করেনি। যতটুক করেছে তা একেবারে সীমার মধ্যে। ঐদিন হুমায়রার গলায় কাটা দাগ দেখার পর আর অত্যধিক নেশা করে বাড়ি ফেরে না সে। যতটা করে নিজেকে ব্যালেন্সে রাখার মতো।
রুমের সামনে এসে বাইরে থেকে দরজা লাগানো দেখতেই ভ্রু কুঁচকে গেলো কৃশানের। তৎক্ষনাৎ ছিটকিনি খুলে রুমে প্রবেশ করলো সে। দেখলো মানবশূন্য কক্ষ খানা। পরপর কোনোদিক না তাকিয়েই হাঁটা দিলো পাশের রুমের উদ্দেশ্যে।
দরজায় অনবরত করাঘাত এর শব্দে কাঁচা ঘুমটা ছুটে গেলো ইকরার। বিরক্তিতে “চ” সূচক শব্দ বেরিয়ে আসলো মুখ দিয়ে। দরজা খুলে সম্মুখ্যে কৃশানকে দেখতেই মেজাজ তুঙ্গে উঠল। ইদানিং তার রাতের ঘুম হারাম করে ছাড়ছে সামনের অসহ্য মানব। প্রতিদিন তার দরজায় করাঘাত নাড়া যেন স্বভাবে পরিণত হয়েছে কৃশানের। মেয়েটা নাক মুখ সিঁটকে জিজ্ঞেস করল,
“ আজকে আবার কী হয়েছে? ”
“ তোর বান্ধবী কই? ”
“ মামা বাড়িতে চলে গেছে। ”
“ ফাজলামো করছিস আমার সাথে? এইটুকু সময়ের মধ্যে মামা বাড়িতে চলে গেছে? ”
“ ফাজলামো কেন করতে যাবো? আন্টির নাকি শরীর খারাপ তাই সন্ধ্যার পর আঙ্কেল এসে ওঁকে নিয়ে গেছে। আর আঙ্কেল তো তোমাকে কল করেছিলই তুমিই তো রিসিভ করো নি। ”
ভ্রু জোড়া টানটান হলো কৃশানের। কোনোরূপ বাক্য ব্যায় না করেই হাঁটা দিল রুমের উদ্দেশ্যে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল হুমায়রার মামার নাম্বার থেকে সাতটা কল এসেছে। মায়ের ফোনের জন্যে মোবাইলটা সাইলেন্ট করে রেখেছিল যার দরুণ বুঝতে পারে নি সে।
“ এখন কী কল ব্যাক করবে? নাহ, এখন ফোন করলে হুমায়রার মামা/মামি কল ধরবে। ঐ মেয়ের কাছে তো আর ফোন থাকে না। আর তার এতসব ভেবে লাভ কী! ঐ মেয়ে নেই ভালোই হয়েছে শান্তিমত সিগারেটে টানা যাবে আজ। ”
ভেবেই ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে বারান্দায় গিয়ে সিগারেটে ধরালো। আকাশের পানে তাকিয়ে উড়াতে লাগলো বিষাক্ত ধোঁয়া।
অনেক দিন বাদে নিজের রুমটায় এসে ঠিকমতো একটু শ্বাসও নিতে পারছে না হুমায়রা। ক্ষুধায় পেট জ্বালা করে উঠছে বারংবার। সেই সকালে যে একটু নুডুলস খেয়েছিল। এই অব্দি পেটে এক দানা ভাত পড়েনি। ইয়াসমিন বেগম বারবার খাওয়ার কথা বললেও শুনে নি মেয়েটা। বলেছিল হাতের কাজগুলো সেরে একেবারে খাবে। কিন্তু তা আর হলো কই? কাজ শেষ করে ইকরার রুমে চলে গেলো। তারপর নামাজ শেষ করে খেতে যাবে এর আগেই উপস্থিত হলো তার মামা। মামির অসুস্থতার কথা শুনে খাওয়া দাওয়ার কথা ভুলে তৎক্ষনাৎ চলে আসলো। অথচ এখানে এসে যা দেখলো আর শুনলো মনে পড়তেই চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
হুমায়রা বাড়িতে ঢুকা মাত্রই রেখা বেগমকে একেবারে সুস্থ সবল দেখতে পেলো। চোখে মুখে প্রশ্ন নিয়ে মামনির শরীর সম্পর্কে জানতে চাইল। রেখা বেগম প্রথমে বেশ মিষ্টি স্বরেই কথা বললেন। হুমায়রা ভাবলো তার দূরত্বে হয়তো তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে তার মামনি। সেদিন ফোনেও তো কতো মিষ্টি করে কথা বলল। কিন্তু তার সকল চিন্তা ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে কিছুক্ষণ পর রেখা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“ তা টাকা পয়সা কত এনেছিস দেখি। ”
মামনির এহেন প্রশ্নে হকচকাল হুমায়রা। নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,
“ কিসের টাকার কথা বলছেন মামনি? আমি তো কোনো টাকা আনি নি। ”
সাথে সাথেই নিজের আগের রূপে ফিরে এলেন ভদ্রমহিলা। কর্কশ কন্ঠে বললেন,
“ মামনির শরীর খারাপের কথা শুনেও শ্বশুড় বাড়ি থেকে একটা টাকাও আনলি না তুই! এই দিলি এতদিন পেলে পোষে বড়ো করার প্রতিদান! সেই ছোট থেকে আমার ঘাড়ে বসে বসে খেয়েছিস অথচ বিন্দুমাত্র কৃতজ্ঞতাবোধ নেই তোর? ”
বিমোহিত চিত্তে পুরোটা সময় সামনের মহিলাটির দিক তাকিয়ে রইলো হুমায়রা। এইযে শুরু হলো তার ননস্টপ বয়ান, শেষ হলো খানেক আগে ঘুমানোর পর। রাতে খাওয়ার সময় হুমায়রার সাত বছরের মামাতো বোন অর্না তাকে ডাকতে আসায় মেয়েকেও ইচ্ছেমতো বকা ঝকা করেছেন রেখা বেগম। অতঃপর বরাবরের মতোই খেতে দেওয়া হয়নি হুমায়রাকে। এই সতেরো বছরে এসবে পরিপূর্ণ অভ্যস্ত সে। খাওয়া যে কালকেও জুটবে না তার কপালে- তাও ভালো করেই জানে।
খাটের সাথে হেলান দিয়ে মাথার উপর সিলিং ফ্যানের দিক তাকিয়ে আছে হুমায়রা। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। হঠাৎই মনে পড়ল ছোটবেলা লোকমুখে শুনা কিছু কথা,
“ যে মেয়ে বাপের আদর পায় সে স্বামীর আদর পায় না আর যে বাপের আদর পায় না সে স্বামীর আদর বেশি পায়! ”
তবে তার বেলায় কেন দুই ক্ষেত্রেই অবহেলা মিলল। আচ্ছা এইযে সে এখানে চলে এসেছে মানুষটার কী তার কথা মনে পড়ছে? ক্ষণে ক্ষণে কী তার মতো ব্যাকুল হয়ে উঠছে হৃদয়? কৃশান কবে একটু ভালোবাসবে তাকে? অনিশ্চিত যাত্রার নিশ্চয়তা কবে দিবেন সৃষ্টিকর্তা? আর কতো ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে তাকে? মাঝে মাঝে যে বড্ডো ভেঙে পড়ে সে! মন বলে সব আশা বুঝি এবারও বিফলে যাবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার উপর হতে বিশ্বাস হারায় না। প্রতিবেলায় মনে পড়ে কোরআনের একটি আয়াত,
“ ফা-ইন্না মা‘আল উসরি ইউসরা- নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি। (সূরা আল- ইনশিরাহ) ”
এভাবেই নিজেকে আবারও গড়ে তুলে। বাঁচিয়ে রাখে সব অপূর্ণ আশা।
গুনে গুনে দুটো সিগারেটের প্যাকেট শেষ করে রুমে এসেছে কৃশান। তখন থেকে বিছানার এপাশ ওপাশ করেও চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। মস্তিষ্ক জুড়ে শুধু ভাসছে একটি মুখ। সোফার দিক তাকালে মনে পড়ছে সেদিন হুমায়রার চুল টেনে দেয়ার দৃশ্য। খাটের দিক তাকালে মনে পড়ছে সেদিন একসাথে চা খাওয়ার মুহূর্ত। আর বারান্দায় যখন ছিল পুরোটা সময় শুধু ঐদিন তাকে বুঝানোর মুহূর্ত- ঘর ভর্তি শুধু হুমায়রার প্রতিচ্ছবি। কোনো ভাবেই মস্তিষ্ক থেকে সরানো যাচ্ছে না মেয়েটাকে। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হচ্ছে কৃশান।
“ কী অসহ্য! ঐ মেয়ের কথা এভাবে মনে পড়ার কী আছে? যেখানে যাচ্ছে সেখানেই ঐ মেয়ের চিত্র চোখে ভাসছে। মেয়েটা কী পাগল করে ছাড়বে নাকি তাকে! ”
এভাবেই কেটে গেলো একটি যন্ত্রণাদায়ক রাত্রি। অজান্তেই একসাথে নির্ঘুম রাত পার করলো দুপাশের দুজন মানব-মানবী।
রজনীর শান্ত ভাব কাটিয়ে ধরণীতে আগমন ঘটলো এক নতুন দিনের। শুরু হলো প্রাণী জাতির ছুটাছুটি। ব্যাস্ততায় মুখরিত হলো জগৎ।
নিত্যদিনের নিয়মানুসারেই ঘুম থেকে উঠে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হলো কৃশান। ভার্সিটি শেষ করে আর বাসায় ফেরেনি আজ। কেন ফেরেনি তার কারণ নিজেরই জানা নেই। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মজেছে সে। তবে কোনোভাবেই ধ্যান দিতে পারছে না। পুরোটা দিন কেমন যেন শূন্য শূন্য অনুভব হচ্ছে। এতো কিছুর মাঝেও এই শূন্যতার কারণ খুঁজে পাচ্ছে না ছেলেটা।
আড্ডার মাঝেই হঠাৎ ফোনে নোটিফিকেশন এলো কৃশানের। বরাবরের মতোই তা উপেক্ষা করলো সে। অতঃপর মগ্ন থাকতে চাইল নিজের কাজে।
দেখতে দেখতে এভাবেই কেটে গেলো পুরো দিনটা। সন্ধ্যার দিক চায়ের দোকানে এসে কী ভেবে যেন ফোনটা হাতে নিলো কৃশান। সাথে সাথেই চোখ আটকালো স্ক্রিনে ভাসা মেসেজটির পানে,
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ১৮
“ ভাইয়া তুমি এসে তাড়াতাড়ি হুমায়রা আপুকে নিয়ে যাও। ”
“ ওফ শীট! ”
অস্ফুষ্ট স্বরে আউড়ালো কৃশান। মেসেজটা এসেছে বিকেলের দিকে। হুমায়রার মামার ইমু আইডি থেকে। আর বার্তা প্রেরণ করেছে হুমায়রার মামাতো বোন অর্না- সেটা মেসেজ পড়েই বুঝা যাচ্ছে। সাথে সাথেই বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। সবকিছু উপেক্ষা করে পা চালালো নিজ গন্তব্যে। পিছন থেকে ভেসে আসলো অগণিত ডাক, টেবিলে অবহেলায় পড়ে রইল চা ভর্তি কাপটা।
