Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১
সাঞ্জেনা শাজ

রোজা’দের আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল হয়ে গিয়েছে। তারা এসে সোহানা, শান্তা, শুভ্রতাকে পায়নি। ওরা কলেজ,ভার্সিটিতে ছিল। সকলে একসাথে বসেছে সন্ধ্যার আড্ডায়। সময় গড়িয়ে এখন প্রায় আটটা বেজে গিয়েছে।
তালুকদার বাড়িতে যেন কোন উৎসব লেগে গিয়েছে। হাসা হাসির শব্দ তিন বোনের, সেই সাথে শাফি’র একটু পর পর এটা সেটা কৌতক করা। বেশ জমে গেছে তাদের আড্ডার মজলিস। সেই মজলিস আরও গরম করতে দু হাত ভর্তি ফাস্টফুড নিয়ে আসলো জাবির। চটপটি, ফুচকা, বেলপুরি কিছু বাদ নেই বোধহয়! তার সাথে সাথে নিয়ে এসেছে মেহরাদ আর আদনান কে। বলা যায়, তিন বন্ধু অনেক দিন পর একসাথে হলো।

“জাবির ভাইয়ায়ায়া। কি করেছেন আপনি? এতো ভালো কাজটা কিভাবে করলেন ভাই! খুব ভালো করেছেন। ” উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে চার লাফে জাবিরের হাত থেকে প্যাকেট গুলো নিয়ে নিল সোহানা। মেয়েটা এতো উড়নচণ্ডী! সকলে হাসলো সোহানার বাচ্চামো দেখে। শুধু আদনান ভেঙিয়ে বললো,,
“হয়েছে, ব্যাঙের মতো লাফানো শুরু হয়ে গিয়েছে তোর বোনের মেহরাদ। এটাকে মিউজিয়ামে রেখে আসিস না কেন? মানুষ রুপি ব্যাঙ। খুব ভালো নিদর্শন। ”
আদনানের কথা শুনে আরও এক চোট হাসির রোল পড়লো ড্রয়িং রুমে। সোহানা আদনানের দিকে ভেঙচি কেটে বললো,,

“আপনায় রেখে আসবো মিউজিয়ামে। উজবুক লোক একটা! ভাইয়া এনাকে কেন এনেছো আমাদের বাড়িতে?” মেহরাদের দিকে তাকিয়ে বললো সোহানা।
মেহরাদ মাথা নাড়িয়ে হাসলো শুধু, হালকা করে। সে টাই’টা খুলে, সাদা শার্টের দুটো বোতাম খুলে সোফায় গিয়ে বসলো,গা এলিয়ে । শুভ্রতার পাশে। শুভ্রতা নড়েচড়ে বসলো একটু। আরেকটু চাপলো অন্যদিকে, মেহরাদ থেকে দূরত্ব বাড়াতে।
“সোহানা, এগুলো কিচেনে দিয়ে আয়। বলবি রেডি করে পাঠাতে। ” রোজা বললো।
“যাচ্ছি, যাচ্ছি। তোমরা সবাই বসে থাকো, আমায় দিয়েই শুধু কাজ করাও। ” বলতে বলতে সে তিড়িং বিড়িং করে চলে গেল কিচিন রুমে।
সোহানার যাওয়া দেখে, আরও একদফা হাসলো আদনান। মেহরাদের বরাবর কাউচে জাবির কে নিয়ে বসতে বসতে মেহরাদের উদ্দেশ্যে বললো,,
“ভাই আমি সত্যি বলছি। ওর বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখিস। খুব আশ্চর্য নিদর্শন -ই আছে তোদের তালুকদার বাড়িতে। ”

“থামলি তুই? বাড়িতে আসলেই ওর পিছনে কেন পরিস, বুঝতে পারিনা আমি। ”
“তোর বুঝে কি কাজ! আমি যা বলছি তাই কর। না পাড়লে, আমায় বল। আমি রেখে আসি। ”
“এই, আপনি কি আমায় নিয়ে কিছু বলছেন আবার? “আদনানের দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বললো সোহানা।
আদনান কিছু বলতে যাবে আবার,তার আগেই সোহানার এক হাত টেনে নিয়ে নিজের পাশে বসালো রোজা। আদনানের উদ্দেশ্যে বললো,
” থামুন ভাইয়া। ওকে রাগিয়ে লাভ নেই আপনার। ”

আদনান সোহানার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসলো। আর কিছুই বললো না। কিন্তু সোহানা ফোস ফোস করে উঠলো। তাকে ইচ্ছে করে রাগেচ্ছে পাজি লোকটা! এ কারণেই সে এটাকে দেখতে পারেনা।
“কি ব্যাপার শালি সাহেবা! এতো এতো চুপচাপ কেন? পা ঠিক হয়েছে?” শুভ্র‍তার উদ্দেশ্যে বললো জাবির।
মৃদু হেসে মাথা নাড়াল শুভ্রতা। তার সকলের সামনে মেহরাদ ভাইয়ের সাথে বসতে অস্বস্তি হচ্ছে কিছুটা। লোকটা ইচ্ছে করে বসেছে তার পাশে। সে শতভাগ নিশ্চিত।
তাদের আলাপ আলোচনার মধ্যেই কিচেন থেকে ট্রে হাতে স্বপ্না এসে সকলের সামনে বাহির থেকে আনা খাবার গুলো পরিবেশন করলো। একে একে সবাই খাবার হাতে তুলে নিল। শুভ্রতা এগিয়ে গিয়ে টি টেবিল থেকে দুটো পিরিচ নিয়ে আসলো। তার হাতে একটা রেখে মেহরাদের দিকে একটা বাড়িয়ে দিল,আলতো হাতে। তাকালো না মেহরাদের দিকে।

মেহরাদ সোফায় গা এলিয়ে বসে, চিকন শুভ্র হাত খানা দেখলো। যে তার সামনে খাবার পরিবেশন করলো। সে গা ছাড়া দিয়ে উঠে বসলো ভালো করে। সামনের পিরিচ খানা থেকে বেছে বেছে মরিচের টুকরো গুলো সড়িয়ে সেটা এগিয়ে দিল শুভ্রতার দিকে। শুভ্রতার হাতের টা রেখে দিল টেবিলে। শুভ্রতা নির্বাক, বিমূঢ় হয়ে শুধু দেখলো তার পাশে বসা আদুরে মেহরাদ ভাইকে।
সামনে বসা সকলের দৃষ্টি’ই মেহরাদ আর শুভ্রতার দিকে পরে গিয়েছে ইতিমধ্যে। মেহরাদের সে সবে পাত্তা নেই। জাবির ভ্রু উচিয়ে তাকালো পাশে বসা আদনানের দিকে। আদনান ভোলা ভালাদের মতো কাধ উঁচালো। তাদের বন্ধুদের মধ্যে শুধু সে-ই জানে মেহরাদ আর শুভ্রতার বিয়ের বিষয়ে। আর কেউ না। এমনকি জাবির’ও না।
“তুমি খাবে না ভাই?” রোজা জিজ্ঞেস করলো।
“উঁহু। ফ্রেস না হয়ে খেতে পারবো না। ”

মাথা নাড়াল রোজা। কিছু বলতে চেয়েও বললো না আর। তার চোখ দুটো ঘুরপাক খেতে থাকলো পাশাপাশি বসে থাকা শুভ্রতা আর মেহরাদের দিকে। শুভ্রতার শুভ্র মুখ খানায় লজ্জার আভাস। যাতে লালিমায় ছেয়ে গিয়েছে। দুটোকে একসাথে কাজিন কম রাজ জুটক মনে হচ্ছে বেশি। সে একবার ওদের দিকে তাকালো আরেক বার চামিচ মুখে পুড়ল। তার অবস্থা দেখে শান্তা মনে মনে হেসে হেসে খুন।
আবারও হাতে পানি নিয়ে আসলো স্বপ্না, সকলের জন্য। পানি রেখে চলে যাবে তার আগে মেহরাদ থামিয়ে বললো,
“ফ্রিজে আইস্ক্রিম আছে। একটু কষ্ট করে রেখে যেয়েন। ”
স্বপ্না হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। সব জায়গায় বেশি কথা বললেও, মেহরাদের সামনে কম-ই তার মুখ চলে। ছেলেটা সারাক্ষন কেমন গম্ভীর গম্ভীর হয়ে থাকে।মেপে মেপে কথা বলে যেন! কথা আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে যায় তার।

“আইস্ক্রিম কে খাবে ভাই?” রোজা জিজ্ঞেস করলো। সে জানে কার জন্য আইস্ক্রিম। তাও জিজ্ঞেস করলো।
তাদের বাড়িতে সকলেরই জানা শুভ্রতা ঝাল খেতে পারেনা ছোট্ট থেকেই।
“শুভ্রার ঝালে সমস্যা আছে, ও খাবে। চাইলে তোরা’ও খাবি। ”
“ওকে এখনো শুভ্রা কেন ডাকো ভাই? বিয়ের পর বেচারির স্বামী রাগ করলেও করতে পারে, তার বউকে তার আগেই ছোট্ট নিক নেমে ডাকো বলে। ”
আবারও সোফায় গা এলিয়ে দিল মেহরাদ। এক হাতে উচিয়ে সোফার হাতলে রাখলো। সেকেন্ড ব্যায়ে তা ধীরে ধীরে শুভ্রতার কাধ ছুঁয়ে পিঠ বেয়ে নিচে নামলো। সাড়া পিঠময়ে পুরুষালি হাতের মৃদু ছোয়ায় শিউরে উঠছে ক্ষনে ক্ষনে শুভ্রতা। শরীরের পশম গুলো কাটাকাটা দিয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে। হাতে থাকা পিরিচটা শক্ত করে হাতে চেপে রেখেছে।
“এরকম টা কক্ষনো হবেনা, রোজা। এর কোন ওয়েই রাখবো না আমি। নেভার । ”

ভাইয়ের কথায় কপালে ভারী ভাজ পড়লো রোজার। অবচেতন মন ভিন্ন কিছুর সংকেত দিচ্ছে। সেই সাথে শুভ্রতার লজ্জালু নেতানো পান পাতার মতো ছোট্ট আদল খানা দেখে তা শতভাগ নিশ্চিত ধরে নিতে চাচ্ছে মন। কি মনে করে পরক্ষণেই তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো রোজা। সামনে বসা জাবিরের দিকে তাকালো, যে এক সময় ভাইয়ের বন্ধু ছিল,এখন তার স্বামী।
এমন না তাদের প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল বিয়ের আগে। তবে পছন্দ ছিল এটা রোজা বুঝতো। মাস্টার্স করতো সে তখন, যখন জাবিরের বাড় থেকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলো। সকলের চেনা জানা সুনামধন্য পরিবারের ছেলে জাবির ইমতিয়াজ। তার উপর মেহরাদ ভাইয়ের বন্ধু। রিজেকশনের কোন প্রশ্নেই থাকে না। তারপরেই চার হাত এক করে দিল সকলে। এর কিছুদিন পরেই দু’জনে এক সাথে কানাডা পারি দিল। সেই পারিতেই বছর ঘুরিয়ে দেশে আসা তাদের।
তার ধারণা, ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে আদনান ভাই আর জাবির খুব ভালো বন্ধু। ভাইয়ের মনে শুভ্রাকে নিয়ে কোন আলাদা ফিলিংস থাকলে জাবির আর আদনান ভাই নিশ্চিত জানতো। জাবির জানলে সে জানতে পাড়তো। তার মানে সেরকম কিছুই নেই।
কিন্তু বচারি রোজা তো আর জানেনা, সে জেনে যেতে পারে আশংকায়-ই জাবির কে জানায়নি মেহরাদ। তারউপর যখন তারা বিয়ে করলো তখন জাবির আর রোজা ছিলো কানাডা।

মেহরাদের মৃদু তালে হাত ভুলানো কেমন অন্যরকম এক স্বস্তির ছোঁয়া খেলে গেল অন্তকরনে শুভ্রতার। এ ছোঁয়ায় অধিকার প্রবল। স্নেহের পরশ। আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ। পিঠময়ে হাত ভুলানোর সাথে সাথে কেউ যেন কানে কানে বলে যাচ্ছে, ‘আমি আছি তো। আমি সব সময় তোকে আমার করে রাখবো। দু হাতে আগলে রাখবো, যেভাবে রেখেছি এতটা বছর।’
উপর থেকে কেউ একজন খেয়াল করলো মেহরাদের স্থির বলিষ্ঠ হাত খানা শুভ্রতার বাকানো অবয়বে। সেই সাথে সেই ব্যাক্তিও কেমন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিয়ৎক্ষন।
স্তব্দ, বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো রিমা বেগম। চোখের তারায় সন্দেহের বান। একজন বড় ভাই হিসেবে চাচাতো বোনকে এভাবে ছোঁয়া বেমানান, অশুভন। এ দৃশ্য আর পাঁচটা মানুষ দেখলে যা বলবে, সেও ঠিক সবার আগেই তা চিন্তা করলো।

মাথাটা একটু ধরে থাকায় তিনি সন্ধ্যার পর রুমেই ছিলেন। এরপর তিন তলায় গিয়েছেন রোজাদের জন্য রুম গুছানো হয়েছে কি-না তা দেখতে। নিচে কদম বাড়াতে বাড়াতে এ দৃশ্য তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
তিনি অচল পা দুটো টেনে সিড়ি ভেঙে নিচে নামলেন। তাকে সবার আগে দেখলো রোজা। সে হেসে ছোট চাচির মাথা ব্যাথা কমেছে কি-না জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু রিমা বেগম তাতে খেয়াল দেননি। তার স্থীর দৃষ্টি এখনো শুভ্রতার দিকে।
রোজার প্রশ্ন শুনে ঘার ঘুরিয়ে মা’য়ের দিকে তাকাতেই শীড় দ্বারা বেয়ে শীতল স্রুত ভয়ে গেল শুভ্রতার। ঝড়ের বেগে ছিটকে সড়ে গেল মেহরাদ থেকে আরও দূরে, যতটুকু যাওয়া যায়।
চোখে চোখ রাখতে পারলো না মা’য়ের সাথে। মাথা নুয়িয়ে রাখলো নিচের দিকে। সোফার উপরে হেলায় পরে থাকা হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে উঠে দাড়ালো মেহরাদ।পরিস্থিতি তার আচ করা হয়ে গেছে। সে উঠেই সকলের দিকে তাকিয়ে বললো,

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০ (২)

“ইউ গাইজ ক্যারি অন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। ”
এরপর কিছুটা কঠিন চোয়ালে শুভ্রতা আর তার মা’য়ের দিকে চেয়ে সিড়ির দিকে এগুলো। রিমা বেগম মেহরাদের শক্ত কঠিন চোয়াল দেখলেন না। তিনি শুধু স্থীর দৃষ্টিতে সোফায় গুটিয়ে বসে থাকা শুভ্রতার দিকেই তাকিয়ে রইলেন।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২