Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১২
সাঞ্জেনা শাজ

সন্ধ্যার সময়টা কেটে গেল এভাবেই। সকলের হাসি, মজা আড্ডাতে রাতের ডিনার সেড়ে সকলে সকলের রুমে চলে গিয়েছে। আদনান চলে গিয়েছে তাদের বাসায়।
দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে তাকালো শুভ্রতা। প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছে। তার কাছে মোবাইল নেই। এখন দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখেই সময় পার হচ্ছে তার। এভাবে কি মোবাইল ছাড়া থাকা যায়? উঁহু, একটুও না।
তাইতো সে এখন তার মোবাইল উদ্ধার করতে যাবে বাঘের গুহায়। তার ভাঙ্গাচোরা মোবাইল যা-ই হোক, সে ঠিক করাবে এটা। বাবা আসলে না-হয় আরেকটার কথা বলবে। এখন এটা উদ্ধার করা যাক আগে।
শুভ্রতা রুমের দরজাটা খুলে মাথাটা হালকা বের করলো। বাহিরে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে তেমন কিছুই দেখতে পেলনা। চারপাশে অন্ধকার সেই সাথে নিস্তব্ধতা। তার মানে সকলেই শুয়ে পড়েছে।
দরজাটা ভালো করে খুলে এক দৌড়ে করিডর পেরিয়ে মেহরাদের রুমের সামনে দাড়ালো শুভ্র‍তা। বুক ডিপডিপ করছে তার। কেউ দেখলে রক্ষে থাকবেনা!

বড় বড় কয়েকটা শ্বাস টেনে দরজার নব টা হালকা ঘুরালো সে। নাহ! দরজা লক করা নেই। বেশ খুশিই হলো সে। নব ঘুরিয়ে এখানেও দরজাটা একটু ফাক করে আগে মাথা ঢুকিয়ে দেখলো রুমের ভিতরে।
রুম অন্ধকার, মৃদু ডিম লাইট জ্বালানো শুধু। সে ভালো ভাবে পরখ করেও মেহরাদ ভাইকে কোথাও দেখলো না। ভ্রু কুচকালো শুভ্রতা। এতো রাতে কোথায় গেল? ওয়াশরুমে নাকি?
পা বাড়িয়ে ভিতরে ঢুকলো শুভ্রতা। দরজাটা আটকে দিল। ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে দেখল লাইট অফ। দরজাও ভেজানো, এখানে নেই। কপালে ভাজ পড়লো শুভ্রতার। আরও কিছু চিন্তা করবে তার আগেই সামনে তাকিয়ে দেখলো বারান্দার দরজাটা খুলা। বুঝতে পাড়লো, সেখানেই তার মেহরাদ ভাই।
যত কদম বারান্দার দিকে এগুলো ততই একটা ভোটকা গন্ধ নাসারন্ধ্রে বারি খেতে থাকলো শুভ্রতার। ছোট ছোট কদমে বারান্দায় আবছা আলো অন্ধকারে মেহরাদ ভাইকে দেখলো জ্বলন্ত সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে। পড়নে শুধু ট্রাউজার বোধহয়! উন্মুক্ত গা টা কেমন জ্বলজ্বল করছে মৃদু আলোতেও। দৃষ্টি অদূরে, গুটগুটে অন্ধকারে।
কয়েক পল স্টেচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো শুভ্রতা। পুরো পুরি নাকে এসে ঠেকেছে সিগারেটের গন্ধ। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে খানিকটা। সেই সাথে বেশিই কষ্ট হচ্ছে মেহরাদ ভাইকে সিগারেট খেতে দেখে। মেহরাদ ভাই সিগারেট খায়? এটা তার অজানা ছিল। কখনোই দেখেনি সে।

কেন খায় এই মরন ব্যাধি? এখন কেন খাচ্ছে?
শুভ্রতার রাগ’ও হলো বেশ। সে এগিয়ে গিয়ে মেহরাদের সামনে দাড়িয়ে, মুখে ওড়না চেপে জিজ্ঞেস করলো,
“কি খাচ্ছেন এটা? আপনি সিগারেট খান কবে থেকে? ”
মেহরাদ ফিরেও তাকালো না। একই ভাবে বাহিরে তাকিয়ে রইলো।
শুভ্রতার রাগটা আরও বাড়ল। হাত উঁচিয়ে মেহরাদের উন্মুক্ত বাহুতে হাত ছোয়াল কিছু বলবে বলে। কিন্তু এর আগেই শুভ্রতাকে ছিটকে সড়িয়ে দেয়ালে চেপে ধরলো।
আর্তনাদ করে উঠলো শুভ্রতা। তার এক বাহুতে শক্ত করে চেপে ধরেছে মেহরাদ ভাই। খুব ব্যাথা লাগছে তার। মুখে ব্যাথাতুর ছাপ। সে আরেক হাতে মেহরাদের বাহু চেপে ধরা হাতটাকে ঠেলে সড়াতে চাইলো কিন্তু পাড়লো না।
“উমমম,ব্যাথা পাই তো মেহরাদ ভাই। ছাড়ুনননন। ”
হাতের চাপ আরও বাড়ল বাহুতে। শুভ্রতার চোখে তৎক্ষনাৎ জল জমলো। চোখ জোড়া বন্ধ করে ‘আহহ্’ বলে উঠলো। ব্যাথাতুর কন্ঠে বলে উঠলো,

“কেন এমন করছেন? কি করেছি আমি? কথা বলছেন না কেন?”
দাতে দাত চেপে হিসহিসিয়ে উঠলো মেহরাদ। নাকের পাটা ফুলিয়ে, হিসহিসিয়ে বললো,
“আমার রুমে এসেছিস কেন? আমায় ছুঁয়েছিস কেন? নিচে কি করেছিস ভুলে গিয়েছিস? ”
“কি করেছি আমি নিচে?”
“ভুলে গিয়েছিস? এখনিই ভুলে গিয়েছিস? অবশ্য, দু দিন পর আমায়’ও ভুলে যেতে পারবি তুই। ”
শুভ্রতার ছোট্ট চিবুকটা তিরতির করে কেপে উঠলো। সে কি করেছে? এতো ভারি ভারি কথা গুলো কেন শুনাচ্ছে তাকে?

“আপনি এগুলো কেন বলছেন, হে? আপনায় আমি ভুলে যাবো? ”
“একশো বার যাবি। তোর দ্বারা সম্ভব।তোর মা’কে দেখে, আমার থেকে আজ যেভাবে দূরে চলে গিয়েছিস, ঠিক এভাবেই একদিন আমায় ভুলে যাবি। সত্যি করে বলতো ভালোবাসিস তো? নাকি কিশোরী বয়সী আবেগ? ”
শুভ্রতার মনে হলো তার বুকে রক্ত ক্ষরণ শুরু হয়ে গিয়েছে হটাৎ। অনর্গল চোখের জল গড়িয়ে পড়লো। ভিতর থেকে কুকড়ে উঠা শব্দ বের হতে চাইলো,কিন্তু অধর কামড়ে ধরলো সে। একটা শব্দ’ও বের হলো না ঠোঁট ফোরে।
_সে ভালোবাসে না? আবেগ এটা? আবেগের বসে কেউ বিয়ে করে ফেলে সকলের অজান্তেই? সে মানে, সে প্রচুর ভয় পায়। এ সম্পর্ক সকলের সামনে যখন আসবে তখন কি হবে তা ভেবে। তাই চেষ্টা করে যত আড়ালে রাখা যায়। তাই সে দূরে চলে গিয়েছিল তখন। দূরে চলে গিয়েছিল শুধু! তাই বলে কি সে ভুলে যেতে পাড়বে? কা কে? তার মেহরাদ ভাই কে? যে মানুষটা তাকে দু হাতে আগলে রেখেছে এতটা বছর। যে তাকে সব সময় তাকে বাচতে শিখিয়েছে! যে মানুষটা কোনটা তার দোষ, কোনটা এক্সিডেন্ট তা বুঝিয়েছে? যে তাকে সব সময় সকল ঝর ঝাপটা থেকে আগলে রেখেছে?

“কি হলো? জবাব নেই তো? জানতাম আমি। কোন জবাব থাকবে না তোর। যদি থাকতো, আমার কথায় বিয়ে করলেও বিয়েটাকে স্বীকৃতি দিতে চাইতি। অথচ,এর বেলায় তোর যত তাল বাহানা। বিবাহিত হয়েও, আগের বাগদত্তার সাথে হেসে খেলে কথা বলিস।আমায় নিয়ে, আমাদের বিয়ে নিয়ে নুন্যতম কোন টান কাজ করেতো শুভ্রতা? নাকি কাছে গেলেয় ফ্যান্টাসিতে ভুগিস?”
ফিরতি কোন জবাব আসলো না শুভ্রতার দিক থেকে। মেহরাদের রাগের পারদ যেন টগবগিয়ে বাড়ল। ধাড়াল হলো গলার স্বর আরও।

“আন্সার মি, শুভ্রতা। আন্সার মি! ”
শুভ্রতা চেয়েও কোন শব্দ বের করতে পাড়লো না গলা দিয়ে। গলা চেপে ধরেছে কেউ যেন। মেহরাদ ভাই তাকে শুভ্রতা বলে ডাকছে! তার ভিতর তার বিয়ে নিয়ে, স্বামী নিয়ে কোন অনুভূতি নেই? তার বাগদত্তার সাথে সে হেসে খেলে কথা বলে? এ বাগদত্তাটাও তো তার ভাই হয়। এটা ভুলে গিয়েছে?
অনেক কষ্টে শুভ্রতা কম্পিত ঠোঁট ফোরে বের হলো,
“জানতেন ই তো অন্যের বাগদত্তা। বিয়ে করলেন কেন তাহলে? বাগদত্তা তো আমার ভাই’ও হয়।”
“হ্যাঁ, যে ভাইকে তোর মা নিজেদের পুরনো ভুল শুধ্রাবার জন্য তোর বাগদত্তা বানিয়েছে। তোকে সওদা করছে।”
“কোন সওদা করছে না আমার মা। মা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করছে শুধু। ”
“হ্যাঁ, সে মেয়ের দায়িত্ব ;যাকে দশ বছর বয়সে বিনা অপরাধে অপরাধী করে ছেড়ে চলে গিয়েছিল।”
শুভ্রতার বুকে আরেকটা পেড়েক বিধলো বোধহয়। ইশশশ! কি সুন্দর পুরনো ক্ষত গুলো তড়তাজা হচ্ছে!যেগুলোর জন্য সে এখনো ঘুমাতে পাড়েনা। ট্রমা,ডিজরডার,হ্যালুসিনেশনে ভুগে। অবচেতন মনে এখনো তার ছোট্ট ভাইটাকে দেখে। খুব কাছে দেখে।

শুভ্রতার বুক ভেঙে কান্না আসছে। চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছে করছে। তার জীবনটা এতো বিভিষিকাময় কেন? সেই ছোট্ট থেকে সে কেন, সকলের অবিশ্বাসের কারণ? দায় বদ্ধতার কারণ? তাকে কি বিশ্বাস করা যায়না?
শুভ্রতা মুখ চেপে কান্না আটকে রাখলো। কোন শব্দ বের হতে দিলনা ভিতর থেকে। এই ক্ষত গুলো তার নিজেকেই সাড়াতে হবে। এদের বাহিরে জাহির করবে না সে। যখন ছোট ছিল,তার জন্মদাত্রীর দেওয়া ক্ষত গুলো সে সাড়াতে পাড়েনি নিজে থেকে, ছোট ছিল। এ মানুষটা সাড়িয়েছে। আজ আবার সে-ই সেগুলোর সাথে নতুন ক্ষত করলো। ক্ষতবিক্ষত করে দিল এ ছোট্ট হৃদয়টাকে।
এখন তো সে বড়! এখন আর কারো সাহায্য লাগবেনা তার। কাউকে লাগবে না তার।
শুভ্রতাকে চুপ দেখে মেহরাদের মুখে ব্যাথাতুর হাসি ফুটে উঠলো। নিজের উপর নিজের তাচ্ছিল্যের হাসি। এই মেয়েটাকে নিজের কাছে শেলটার দিতে দিতে কখন নিজের আত্না বানিয়ে ফেলেছে সে নিজেও জানে না। আর এখন কি বলছে…!

“বেঈমান!” অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো মেহরাদ। বলেই শুভ্রতার বাহু ছেড়ে দিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে গেল। হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা সেই কখনিই মুঠোয় চেপে পিষে ফেলেছে। হাতের তালু ঝলসে গিয়েছে।
মেহরাদের অস্ফুট শব্দটা শুনলো শুভ্রতা। ভেতর থেকে ঠেলে হাজারো চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু সে দিলনা। এবার দু হাতে মুখ চেপে ধরে দৌড়ে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কোন দিক তাকালো না। দেখলো না ড্রয়িং রুমে কেউ দেখেছে তাকে মেহরাদের রুম থেকে নের হতে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১১

দেখলো না নিজের মা’য়ের চোখে নিজের জন্য ঘৃণ্য দৃষ্টি।
সপাটে দরজা লক করে নিজের ভিতরের দলা পাকানো চিৎকার গুলোকে মুক্তি দিল শুভ্রতা। আহাজারি করতে থাকলো রবের কাছে। তাকে কেন সেদিন বাচিঁয়ে রাখলো!তার ভাইটার সাথে তাকে-ও নিয়ে যেতো! সে তো রবের’ও প্রিও হলো না, এ দুনিয়ার কারোই প্রিয় হলো না। বিশ্বাস যোগ্যও না! তার বেচে থেকে লাভটা হলো কি? সে তো দোষি। বেঈমান। অপয়া। অলুক্ষনে।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৩