স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫২
সানজিদা আক্তার মুন্নী
হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে নাজহাকে। ওর মাথা ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরছিল এক লাল রঙের বিষাদ ছুঁয়ে যাচ্ছিল চারপাশ এমন রুপে ঝরছিল। তৌসির নাজহার ওড়না দিয়ে কোনোমতে নাজহার মাথা শক্ত করে বেঁধে তাকে কোলে তুলে পাগলের মতো ছুটে এসেছে হাসপাতালে। নাজহা এখন পুরোপুরি জ্ঞানহীন। ডাক্তাররা দ্রুত তার মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছেন।
খবর পাওয়া মাত্রই হাসপাতালে ছুটে আসেন নাজহার বাবা সিদ্দিক সাহেব, সাথে লাল চাচ্চু, মাস্টার চাচ্চু আর ছোট চাচ্চু। এসেই তো তারা বরাবরের মতোই তৌসিরের দিকে অভিযোগের আঙুল তোছেন। তাদের সরাসরি অভিযোগ তৌসিরই নাজহাকে মেরে এই অবস্থা করেছে! যদিও তারা মনে মনে খুব ভালো করেই জানেন, তৌসির অন্তত এই কাজটা জীবনেও করবে না। কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো মূল্যে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওদের ডিভোর্স করানো। পরিস্থিতি আর সহ্য করতে না পেরে তৌসির এবার রাগে ফেটে পড়ে। তীব্র এক ধমক দিয়ে সে বলে ওঠে, “ওকে আগে জ্ঞান আসতে দে বাপেরা, তারপর তোদের সাউয়ার দোষ তোদের সাউয়ায় ভরিস।”
কিছুক্ষণ পর নার্স কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে জানান পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে। খবরটা শোনা মাত্রই নাজহার বাবা আর মাস্টার চাচ্চু হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে প্রবেশ করেন। নাজহা তখন বেডের ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করছে। তৌসির ভেতরে যেতে চাইলেও সিদ্দিক সাহেব তাকে আটকে দেন। তাদের সাফ কথা, আগে তারা তাদের মেয়েকে দেখবেন, তৌসির পরে যাবে।
কিন্তু কেবিনে ঢোকার পর এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য তাদের হতবাক করে দেয় কারণ বাপ-চাচাদের দেখে তাদের নাজহার মুখে কোনো স্বস্তির রেখা ফোটে না, বরং সে চাতক পাখির মতো ব্যাকুল হয়ে বলে ওঠে, “আব্বা, মাস্টার চাচ্চু, তৌসির কোথায়? তৌসির কোথায়?”
গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসে তার, ঢোক গিলে সে আবারও অস্থির কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “উনি কোথায়?”
নাজহার কথা শুনে সিদ্দিক সাহেব আর মাস্টার চাচ্চু থমকে যান! যে মেয়ে আগে তার বাপ-চাচা ছাড়া দুনিয়ার আর কিচ্ছু বুঝত না, সে আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু তৌসিরকেই খুঁজছে! এদিকে বাইরে তৌসিরকে আর আটকে রাখা সম্ভব হয় না। সজোরে দরজা খুলে সে সপাট করে কেবিনে প্রবেশ করে। তৌসিরকে দেখামাত্রই নাজহা তার হারিয়ে যাওয়া প্রাণ ফিরে পায়। দু’হাত বাড়িয়ে দিয়ে সে অবুঝ বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তৌসির দ্রুত পা চালিয়ে তার বেডের পাশে গিয়ে বসে। তৌসির পাশে বসা মাত্রই নাজহা তার বাবা-চাচাদের উপস্থিতির তোয়াক্কা না করেই তৌসিরের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ওর তো মনে হচ্ছিল ঐসময়ই বুঝি ওর শেষ সময়।আর সে এই দুনিয়া কে দেখতে পাবে না। নাজহা তৌসির কে আঁকড়ে ধরে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলে, “আপনি কই ছিলেন?”
তৌসির মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ে যায়। সে কি এখন ওকে নিজের থেকে সরিয়ে দেবে, নাকি বুকের সাথে লেপ্টে রাখবে? ওর সামনে ওর বাপ চাচা দাঁড়ানো চোখেরও তো একটা লাজ আছে। কিন্তু নাজহার এমন আকুলতা দেখে সে নিজেকে সামলে নেয়। আলতো হাতে নাজহার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে কোমল স্বরে বলে, “এই তো, এখানেই ছিলাম। কান্না করো না।”
নাজহা তৌসিরের গলা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ওঠে, “আমি তো ভেবেছিলাম, আমি আর আপনাকে দেখতেই পারব না!”
নাজহার এই কথাগুলো তৌসিরের ভেতরের পুরোনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে খুঁচিয়ে দেয়। নিজের অতীত আর বর্তমানের এই তীব্র সংঘাতে সে কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারে না। চোখের সামনে এই দৃশ্য দেখে মাস্টার চাচ্চু সিদ্দিক সাহেবকে ইশারা করে বলেন, “চলো এখন, আমরা পরে আসব।” সিদ্দিক সাহেবও কোনো কথা বাড়ান না। অতি বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে তারা কেবিন থেকে বেরিয়ে যান। তৌসিরের সাথে নাজহার এই নৈকট্য তাদের পক্ষে এখন সহ্য করা ভীষণ কঠিন। তারা কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই তৌসির নাজহার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে তাকে আরো গভীরভাবে নিজের কাছে টেনে নিয়ে অবাধ্য চুলগুলো সযত্নে কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় তার চোখের পানি মুছে দেয়। তারপর নাজহার কপালে দীর্ঘ একটা চুমু এঁকে দিয়ে সে ফিসফিস করে বলে, “তুই এমনে পড়লি কেমনে? জানস, আমার মনে হইতেছিল তুই বুঝি চলে যাবি! আমার খুব ভয় হইতাছিল তুই বিশ্বাস করবি? এই তৌসির শিকদারেরও ভয় হয়! বুঝতে পারছস?”
নাজহা অপলক দৃষ্টিতে তৌসিরের ফ্যাকাশে হয়ে আসা মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরেসুস্থে তৌসিরের বুকে মাথা রেখে মিনমিন করে বলে, “আমি আমি আসলে নিতে পারিনি তৌসির! আমার বুকের ভেতরটা এখনো কাঁপছে, এই দেখুন।”
এই বলে নাজহা তৌসিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিজের কাপতে থাকা বুকের ওপর রাখে। তৌসির খুব স্পষ্টভাবেই নাজহার বুকের ভেতরের দ্রুত ধুকপুকানি টের পায়। অন্য হাতে তাকে শক্ত করে আগলে ধরে তৌসির বলে ওঠে, “ক্ষত তো আমার, পুড়স তুই ক্যান?”
নাজহা এর কোনো সরাসরি জবাব দেয় না, শুধু ছোট্ট করে আবদারের সুরে বলে, “আমি বাড়ি যাব, আমায় নিয়ে যান।”
তৌসির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে, “বাপ-চাচার সাথে কথা কবি না?”
নাজহা ক্লান্ত কণ্ঠে নিরুত্তাপভাবে বলে, “ইচ্ছে নেই।”
তৌসির নাজহার মানসিক অবস্থা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। তাই আর কোনো ভনিতা না করে তাকে সাবধানে দুই হাতে কোলে তুলে নিতে নিতে স্বভাবসুলভ খুনসুটির সুরে বলে, “এরপর থেকে সাবধানে থাকবি। তুই যদি এমনে বারবার হাসপাতালে আসতে থাকস, তাইলে কিন্তু শুধু শুধু আমার পয়সা লস হইবো!”
তৌসিরের এই কথায় নাজহা আজ আর কোনো অভিমান করে না। বরং ঠোঁটের কোণে একটা মলিন হাসি ফুটিয়ে সে তৌসিরের প্রশস্ত বুকে আরো গভীরভাবে লেপ্টে যায়। সবকিছু এখনো তার ভ্রম লাগছে সপ্ন লাগছে বেঁচে যে আছে এটাই অনেক আর তৌসিরের সাথে তো আছে আর কি চাই। নাহ আর কিচ্ছু চাই না।
তৃষ্ণা শুয়ে আছে নিচে পাটিতে আর তার পাশ ঘেষে শুয়ে আছে ওয়াসেম। কখনোই সে তৃষ্ণা পাশে শুয় না কিন্তু আজ শুতে বাধ্য হয়েছে কারণ আজ তৃষ্ণা তালাক চেয়েছে আর যখন থেকে তৃষ্ণার মুখে এ কথা শুনেছে সে থেকে তার ভেতরে বইছে তুফান তৃষ্ণা কে হারিয়ে ফেলার ভয়াবহ ভয় তীব্র এক যন্ত্রণা সে তৃষ্ণা কে নিজের সাথে রাখতে চায় নিজের পাশে রাখতে চায় তৃষ্ণা ঘুমিয়ে গিয়েছে কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই বুকটা শুধু ধকধক করছিল তাই কোনো উপায় না পেয়ে সে নিজের অশান্ত বুকটা কে শান্তি দিতে ঘুমন্ত তৃষ্ণার পাশ ঘেষে শুয়েছে। ওয়াসেম দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে তৃষ্ণা কে ধীরে ধীরে তৃষ্ণার শরীর সাথে নিজের শরীর ঘেষে তৃষ্ণার পেঠে নিজের কাপা কাপা হাত ধীরে ধীরে রাখে তারপরি এক টানে তাকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে তৃষ্ণার পিট ঠেকায় কিছুক্ষণ এভাবে থেকেই মুখ একটু বালিশ থেকে নামিয়ে এনে তৃষ্ণার উন্মুক্ত ঘাড়ে গুজে দিয়ে হুস করে উষ্ণ শ্বাস ছাড়ে। তৃষ্ণার চোখ খুলে যায়। চোখ খোলে ওয়াসেম কে নিজের এত নিকট দেখে আর এমন অবস্থা দেখে তৃষ্ণা একপ্রকার চিৎকার করে ওঠে বসতে চায় কিন্তু ওয়াসেমের শক্ত বাধন থেকে নিজেকে ছাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব হয় না।
ওয়াসেম খুবি স্বাভাবিক আর শান্ত গলায় বলে, চুপচাপ শুয়ে থাক
তৃষ্ণার এতটা কাছে এই প্রথম কেউ এসেছে অসুস্তি আর ভয়ে তার ভেতরে বমি বমি ভাব হচ্ছে। তৃষ্ণা ওয়াসেমের থেকে সরে যেতে চেয়ে জিজ্ঞেস করে, ” কি ক কি হয়েছে আপনি হঠাৎ আমার পাশে কেন
ওয়াসেম তৃষ্ণা কে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আর বলে, ” আমার শার্ট আর লুঙ্গির বাধন টাইট আছে তুই ফস করতে না চাইলে চুপচাপ শুয়ে থাক আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই তোরে পাশে এসেছি
তৃষ্ণার দম বন্ধ লাগছে ও ওয়াসেম কে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বলে, ” আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে একটু সরুন না এভাবে চেপে ধরেছেন কেন
ওয়াসেম তৃষ্ণার কোনো কথা শুনে না সে এভাবেই ওকে বুকে জড়িয়ে জোরে শ্বাস ছেড়ে চোখ বুজে নেয় তার আর জেগে থাকা ঠিক হবে না তার পুরুষ সত্তা উন্মাদ হয়ে পড়বে নিজেকে সামলিয়ে নেওয়া দায় হয়ে যাচ্ছে এখন অঘটন ঘটে যেতেও পারে তাই শান্ত থাকা উচিত তার। তৃষ্ণা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে না অনেক চেষ্টা করে কিন্তু পারে না ওয়াসেমের হয়েছে টা কি? সে ভেবে পাচ্ছে না কি হয়েছে তার? ওয়াসেমের হুট হাট এমন অদ্ভুত আচরণ কবে না তৃষ্ণার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়ায়।
বাড়ি ফেরার পর একসাথেই গোসলপর্ব সেরে নেয় নাজহা আর তৌসির। গায়ের চামড়ায় লেপ্টে থাকা রক্তের দাগগুলো ধুয়ে-মুছে সাফ করা বড্ড জরুরি। সারারাতের বিনিদ্র জাগরণ আর হাড়ভাঙা ক্লান্তি শেষে তৌসির এখন পুরোপুরি অবশ। সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। বাড়ির লোকজনের সাথে একবার দেখা করে এসে নাজহা অত্যন্ত আলতো পায়ে বিছানায় ফেরে। তৌসিরের অসাড় বাহুডোরের মাঝে নিজেকে সঁপে দিয়ে সে-ও লেপ্টে যায় তার প্রিয় সেই চেনা, প্রশস্ত বুকে।
এই মুহূর্তে নাজহার মনের গহীনে প্রশান্তি খেলা করছে নতুন জন্ম নেওয়া আশার প্রজাপতি উড়ছে। তার মনে জন্ম নিয়েছে এক নতুন উপলব্ধি। আর তা হলো কোনো দ্বিধা ছাড়া এখন থেকে সে সত্যি মন থেকে তৌসিরের হাতটা ধরতে চায় তাকে ভাসিয়ে দিতে চায় নিবিড় প্রণয়ের স্রোতে। জীবনের প্রতিটি বাঁকে যে মানুষটা যন্ত্রণার অনলে দগ্ধ হয়েছে, সে অন্তত এই সংসার জীবনে এসে আর একটুও পুড়ে ছাই না হোক। নাজহা ঠিক করেছে সে এবার সত্যি অর্থে সংসার বুনবে তৌসিরের সাথে।
বুকের ওপর থেকে আলতো করে মাথা তুলে তৌসিরের মুখের দিকে তাকায় নাজহা। ঘুমন্ত তৌসিরের রুক্ষ, ফ্যাকাসে চেহারার দিকে সে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে তারপর মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে, একটু ঝুঁকে তৌসিরের চওড়া কপালে নিজের তপ্ত ওষ্ঠের মৃদু ছোঁয়া এঁকে দেয়। মুগ্ধতাভরা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর অবাধ্য মনটা আনমনেই গুনগুনিয়ে ওঠে কোনো এক অজানা, অচেনা সুরে,
Rag rag wo samaya mere
Chhoo ke jo nikla mujhe
Uski hi chhaaya mein ab
Mera har saaya chale
Rooh meri pukaare use
Dhoondhe har dishaayein use
Jisne banaya mujhe
Mera sab kuch hai use
এতটুকু গেয়ে হঠাৎ কী এক ভাবনায় নাজহা বিছানা ছেড়ে উঠতে উদ্যত হয়। কিন্তু পরক্ষণেই থমকে যেতে হয় তাকে। তৌসির অবচেতন মনেই আচমকা তার হাতটা খপ করে চেপে ধরে, এক টানে মিশিয়ে নেয় নিজের বুকের অতলে। ঘুমের আবেশ জড়ানো, ভাঙা ভারী গলায় সে ফিসফিসিয়ে ওঠে,
“আমার বুকে থাক কোথাও যাইস না।”
নাজহা তৌসিরের জোরালো বাঁধন থেকে নিজেকে সামান্য আলগা করে নেয়। তারপর তৌসিরের কপালে এসে পড়া এলোমেলো চুলে আঙুল চালাতে চালাতে মৃদুস্বরে বলে
“আমি আপনার পাশেই আছি, কোথাও যাচ্ছি না। তৌসির শুনছেন আমার কথা?”
তৌসির চোখ খোলে না। আগের মতো নিমীলিত চোখেই নাজহাকে আরও কাছে, বালিশের একদম কাছাকাছি টেনে নিয়ে নাজহার উন্মুক্ত, শ্বেতশুভ্র গ্রীবায় নিজের ঠোঁটের উষ্ণ আর জিভের গভীর স্পর্শ লেপে দিয়ে তপ্তশ্বাসে ফিসফিস করে জবাব দেয়,
“শুনছি।”
তৌসিরের এই ব্যাকুলতা দেখে নাজহা এবার তাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে আসে এক বুক আকুতি,
“আমি সত্যি আপনার সাথে থাকতে চাই তৌসির। কোনো অভিনয় নয়, একদম সত্যিকারের, সারাজীবনের জন্য। আগলে রাখবেন তো আমায়?”
তৌসিরের নাসারন্ধ্র বেয়ে এক চিলতে শুকনো হাসি ঠিকরে বেরোয়। তৌসির মৃদুস্বরে টিপ্পনী কাটে,
“আমার আপত্তি করার সাধ্য এ জনমে আর কই বলুন? এতদিনকার এই সত্য-মিথ্যার দোলাচলে ভরা সংসারে আপনি কবেই বা আমার আপত্তির তোয়াক্কা করেছেন, যে আজ নতুন করে অনুমতি চাইছেন, ম্যাডাম?”
নাজহা তো আর দমবার পাত্রী নয়। সে নাছোড়বান্দার মতো তৌসিরের বুকে আঙুল ঠুকে বলে,
“কথার মোড় ঘোরাবেন না। আপনি সোজা উত্তর দিন আমায় চান কি না?”
তৌসির এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না। নাজহাকে সজোরে নিজের বুকের পাঁজরে পিষে ফেলে, মনে হয় সে নিজের কৈতরী কে হাড়ের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চায়। ঘুমজড়ানো ভাঙা গলায় এক তীব্র আকুলতা ঢেলে ও বলে ওঠে,
“চাই রে ভীষণ করে চাই! তুই যদি সত্যি থাকতে চাস তাও চাই, আর যদি ছদ্মবেশে মিথ্যা করে থাকতে চাস তাও তোর সাথে আমার একটা সংসার চাই।”
তৌসিরের এই নিঃশর্ত সমর্পণে নাজহার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। তৌসিরের চওড়া পিঠে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে সে বিশ্বাস নিয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে,
“আমি সত্যিই থাকতে চাই তৌসির, কোনো মিথ্যা নেই এতে।”
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তৌসিরের শান্ত, সমাহিত কণ্ঠস্বরটা আচমকা বদলে যায়। বড্ড কাতর গলায়, শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে চেয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে
“আমি বড়ই হতভাগারে নাজহা! আমার কপালে সুখ আসে ঠিকই, কিন্তু ক্যান জানি তা কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ”
তালুকদার বাড়ির বড় ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকছেন সিদ্দিক সাহেবরা। প্রত্যেকের মুখে চাপা ক্রোধ, চোখে আগুনের ফুলকি ঝড়ছে। নাজহার সাথে কথা বলতে না পারার আক্রোশে তাদের ভেতরটা রাগে ফেটে পড়ছে। দাঁতে দাঁত চেপে, মুঠো শক্ত করে তাঁরা একে একে বৈঠকখানায় প্রবেশ করেন।
সিদ্দিক সাহেব ভারী পায়ে হেঁটে এসে সোফায় ধপ করে বসে পড়েন। তার কপালের শিরা দপদপ করছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ভেতরের ক্ষোভ এখনো একটুও কমেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে তা আরও দাউদাউ করে জ্বলছে।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থেকে তিনি নওমির দিকে তাকান। কণ্ঠে চাপা গর্জন নিয়ে বলে ওঠেন, “ব্যাবস্থা কর, আজই সত্যিটা ওরে কইয়া দিমু। অনেক তামাশা চুদাইছি, আর না! আমার মাইয়া আমার লগেই কথা কয় না!”
সিদ্দিকের কথা শুনে নওমির ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে একটা বাঁকা হাসি। তিনি ধীরে ধীরে পকেট থেকে ফোন বের করে, আঙুলের ডগায় একটা পরিচিত নম্বরে ডায়াল করেন তারপর কানের কাছে ফোন ধরতে ধরতে গলায় তীব্র বিদ্রূপ মিশিয়ে বলেন, “আমি তো আগেই কইছিলাম কাম তাড়াতাড়ি সারতে তুমিই না করলা!”
সিদ্দিক সাহেব মাথায় হাত বুলিয়ে নিজের ভেতরের গর্জমান রাগটাকে দমানোর চেষ্টা করেন। কয়েকবার লম্বা শ্বাস নিয়ে, দাঁত পিষে আদেশের সুরে বলেন, “ক ছিঁড়িয়া নিতে ওরে ধইরা!”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫১
তখন দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকেন মাস্টার চাচ্চু। ভেতরের ভয়ংকর পরিস্থিতি দেখে তিনি থমকে দাঁড়ান। শুকনো গলায়, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ধীরেসুস্থে বলেন, “ভাইজান, থাক না এইটা ঠিক না। তৌসিরের সাথে এমন করা উচিত না…
কথাটা শেষ হতে না হতেই নওমির ভ্রু কুঁচকে যায়। উনার চোখে দপ করে জ্বলে ওঠে আগুন। এক লাফে জায়গা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, পুরো শরীরের জোর একত্র করে ঠাস! মাস্টার চাচ্চুর গালে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দেন তিনি। আর দাঁত কিড়মিড় করে হিংস্রভাবে চিৎকার করে ওঠেন, “তুই বালপাকনামি কম কর! তোর জ্ঞান শুনতে দাঁড়াই নাই এখানে আমি!”
