অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৯
তোনিমা খান
বিশাল এই শহরে একা পথচলার ভয়ার্ত অনুভূতি সামলে উঠতে ব্যর্থ হয় রূপকথা। মানুষটার উপর অগাধ অভিমান নিয়ে রূপকথা এসেছে থেকে একটা কথাও বলেনি আর না চোখ তুলে তাকিয়েছে।
বিকাল পাঁচটা। তানশান মাত্র বায়োলজি কোচিং থেকে ফিরেছে। সাইকেল রেখে ঘরে ঢুকেই ব্যাগটা ছুড়ে মারে সোফায়। ক্লান্ত স্বরে জোরে জোরে ডাকে,
–”মেজো মা? মেজো মা?”
শাশুড়ির তলবে সদ্যই তার ঘরে ঢোকা মৌনতা আর রূপকথার গতিরোধ হলো তানশানের ডাকে। মৌনতা গলা উঁচিয়ে বলল,
–”তানশান আব্বু, তোমার দাদুমনির ঘরে আমি।”
তানশান সোজা দাদুমনির ঘরে গিয়ে একগাল হাসলো দাদুকে দেখে। মৌনতার কাছে গিয়ে তাকে পেছন থেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে আহ্লাদি গলায় বললো,
–”মেজো মা, খিদে পেয়েছে। স্যান্ডউইচ বানিয়ে দাও।”
মৌনতা স্নেহের হাসি দিয়ে বলল,
–”খিদে পাবে না? সারাদিন এত ছোটাছুটি,দুপুরে এতটুকু খেয়েই দৌড় দিয়েছো কোচিং এ। চলো আমি দিচ্ছি।”
তানশান আর মৌনতা ঘরের বাইরে পা বাড়াতে নিলেই নির্জনা বেগম পিছু ডাকলো। নম্র কন্ঠে বলল,
–”তোমার মেজো মা অসুস্থ, তানশান। পায়ে ব্যথা। তাকে রেস্ট নিতে দাও। এখন তোমার মা আছে, যা দরকার তাকে বলবে। সে তো ভুলেই বসেছে তার একজন ছেলে আছে। বড় বউমা যাও , তানশান কি চায় বানিয়ে দাও। এরপর থেকে সব বিষয়ে মৌনতাকে ডাকা বন্ধ করো। তার শরীর খারাপ থাকে।”
মেজো মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে, তানশান চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–”তোমার পা এখনো ভালো হয়নি? আচ্ছা দরকার নেই। কাউকে কিছু করার দরকার নেই। আমি নাহয় অন্যকিছু খেয়ে নেবো।”
–“অন্য কিছু খাওয়ার দরকার নেই। আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”, তানশানকে বলেই মৌনতা পরপরই শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বলল,
–”আমার পায়ের ব্যথা কম, আম্মা। কথা এটা বানাতে পারে না। আমি বরং আজ যাই। পরে নাহয় ওকে শিখিয়ে দেবো।”
–”কোনকিছু কালকের জন্য ফেলে রাখতে নেই। যা শেখার তৎক্ষণাৎ শিখতে হয়। তাকে বলে দাও কিভাবে বানাতে হবে, সে বানিয়ে দেবে।”, নির্জনা বেগম বললো। তানশান পুনরায় দ্বিরুক্তি করতে গেলেই সুশ্রাব্য নারী কণ্ঠ ভেসে আসলো,
–”আমি বানাতে পারব, ভাবি। আপনি বলেদিন কিভাবে বানাতে হবে, আমি বানাচ্ছি।”
রূপকথার কথায় মৌনতা স্মিত হেসে তাকে পদ্ধতি বলে দিলো। রূপকথা সেটা শুনে সোজা রান্নাঘরে চলে যায়। মৌনতার কথামতো স্যান্ডউইচ বানাতে লাগলো। খাবার ঘরের টেবিলে বসে অপেক্ষা করছে তানশান। তার খুব খিদে পেয়েছে। এই সময়টাতে তার খিদে পায়। ভারী কিছু খেতেই হবে। আর সেটা মৌনতার হাতের স্যান্ডউইচ। তপোবনের পর মৌনতা আর নির্জনা বেগম-ই তানশানের সকল খেয়াল রাখে। রূপকথা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে ক্ষুদায় অস্থির তানশানকে।
ছেলেটার সাথে কথা বলতে তার ইতস্তত বোধ করে, নিজেকে কেমন ঘৃণ্য লাগে। তানশান কি তাকে খুব খারাপ ভাবে? সে কিছু করলে তা ভালো চোখে দেখবে তো? সে কাজের গতি বাড়িয়ে দ্রুত স্যান্ডউইচ বানিয়ে তানশানের সামনে দেয়। তানশান প্রতিক্রিয়াহীন সেটি খেতে লাগলো। রূপকথা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে তানশানের মুখের দিকে। সে বোঝার চেষ্টা করছে তানশানের ভালো লাগছে নাকি! অর্ধেকটা খাওয়া হয়ে গেলে সে কিছুটা ইতস্তত, মিহি কণ্ঠে শুধায়,
–”কেমন হয়েছে?”
গোগ্রাসে খেতে থাকা তানশানের খাওয়া রোধ হলো রূপকথার প্রশ্নে। উৎসুক দৃষ্টি উপেক্ষা করে থমথমে মুখে বলল,
–”খারাপ না।”
রূপকথার মাথা থেকে একরাশ চিন্তা মিলিয়ে গিয়ে ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। তানশানকে পানি দিয়ে সে আবার রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালে তানশান পিছু ডেকে উঠল।
–“শুনুন।”
রূপকথা ফিরে আসে। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আর একটা খাবে?”
অজানা ইতস্ততায় গুটিয়ে আসা তানশান না বোধক মাথা নাড়লো।
–“তবে?”
ভেতরকার ইতস্ততা এতই তীব্র যে তানশান বলতে চাওয়া কথাগুলো বলতেই পারলো না। সে না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“কিছু না।”
বলেই চলে যায় সে। রূপকথা তাকিয়ে রইল তার গমনের পথে।
সন্ধ্যা নামতেই তপোবন ত্রস্ত পায়ে বাড়িতে ঢুকে তানশানের ঘরে উঁকি দিলো। গভীর দুশ্চিন্তায় মগ্ন তানশান এই ভর সন্ধ্যায় বাবাকে বাড়িতে দেখে শুধায়,
–“পাপা, তুমি এখন বাড়িতে কেন?”
তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“কাজ ছিল না, আব্বু। ভাবলাম তোমার সাথে এসে নামাজ পড়ি। ওজু করে নিচে এসো, পাপা অপেক্ষা করছি। নামাজ পড়ে সবার জন্য নাস্তা নিয়ে আসব।”
–“চাপ আর নান আনবে?”, তানশানের উৎসুক কণ্ঠে তপোবন নাকোচ করে বলল,
–“উহু, স্যুপ আর অনথন আনব। নায়েল স্যুপি খাবার পছন্দ করে।”
–“ওহ্!”, তানশান নিভে যাওয়া স্বরে বলল। তপোবন তার নিভে যাওয়া আদল দেখে মৃদু হাসল। বলল,
–“তুমি চাইলে চাপ আর স্যুপ দুটোই আনতে পারি।”
সহসা ছেলেটির গম্ভীর মুখশ্রী ঠিকরে এক ফালি হাসি ফুটে উঠল। চঞ্চলতার সাথে পোশাক বদলাতে বদলাতে বলল,
–“ওয়েট করো, আমি আসছি।”
তপোবন ডানে বামে মাথা নেড়ে নিচে নেমে যায়। ছেলে তার, ভাজাপোড়া টেস্টি টেস্টি খাবার বেশি পছন্দ করে। বার্গার, পিৎজা হলে তো কথাই নেই।
বাবা ছেলে নামাজ পড়ে সকলের জন্য নাস্তা নিয়ে আসে।
রূপকথা নামাজ পড়ে সদ্যই জায়নামাজ গুছিয়ে উঠল। তন্মধ্যেই কেউ দরজা ঠেলে ঢুকলে তার মুখশ্রী পাণ্ডুর বর্ণের ধারণ করল। তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে অভিমানী দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়াস করলেও মেয়েটি গম্ভীর মুখে তা এড়িয়ে চলে গেল।
দুপুরের ঐ ঘটনার পর থেকে একবারও যেই মানুষটা একটা কথা বলেনি, জিজ্ঞাসা করেনি তার কি অবস্থা হয়েছিল ঐ একাকী বিশাল ব্যস্ত শহরের মাঝে—তার সাথে কেন কথা বলবে? কেউ একটাবার জিজ্ঞেস করেনি সে ভয় পেয়েছিল কি-না! অভিমানে চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। সে চেঞ্জিং রুমে জায়নামাজ রেখে ফিরতেই চোখের সামনে একটা বিশাল লাল গোলাপের তোড়া ভেসে উঠল। রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায়। সম্পর্কের মারপ্যাঁচে জড়তা হানা দিলেও তপোবন তা উপেক্ষা করল। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে দুইটা বড় বড় চকলেটের প্যাকেট বের করে সেটিও এগিয়ে দিলো রূপকথার দিকে। অনুতাপের সুরে বলল,
–“আর কখনো এমন হবে না,কথা। স্যরি! এরপর থেকে আর কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না তোমায়। আর কারোর ভরসায় কখনো ছাড়ব না।”
অতটুকু প্রয়াসে অভিমানে দৃঢ় চোয়াল আপনাআপনি নরম হয়ে আসে রূপকথার।
–“নেবে না?”
পুনশ্চঃ তলবে রূপকথা থমথমে মুখে ফুলের তোড়াটা আর চকলেট দুইটা নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল চেঞ্জিং রুম থেকে। তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এই মুহূর্তে এসে মনে হচ্ছে নারী অভিমান ভীষণ কঠিন!
সে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে শাল জড়িয়ে নিতে নিতে বেরিয়ে আসে চেঞ্জিং রুম থেকে। মিহি স্বরে শুধায়,
–“ক্ষমা করেছ?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে ফিরে তাকায়। থমথমে মুখে শুধায়,
–“না করলে কি করবেন?”
তপোবন নিরুদ্বেগ গলদেশে আতর ঘষতে ঘষতে বলল,
–“আবার ক্ষমা চাইব।”
রূপকথার দৃষ্টি নরম হয়। নরম সুরে বলল,
–“মা কখনো কোনোদিন আমায় মানুষের ভীড়ে একা ছাড়েনি। আমি মানুষের ভীড়ে একা চলতে ভয় পাই।”
তপোবনের হাত থেমে যায়। গভীর চাহনিতে তাকায় নারীটির পানে। মিহি স্বরেই বলল,
–“আর কখনো একা চলতে হবে না।”
–“ওয়াদা করছেন?”
–“হু।”
ছোট্ট জবাবে রূপকথার বুকে জমা ভয় মিলিয়ে গেল। সে থমথমে মুখে গোলাপগুলোকে পানি ভরতি ফ্লাওয়ার ভাসে রাখতে লাগলো। কিছু জিনিস ভীষণ মূল্যবান হয়! তার অবুঝ যুবতী মনের কাছে তো এই ছোট্ট একটু প্রয়াস বিশাল এক প্রভাব ফেলছে। সে জানে না এটা কিসের প্রভাব তবে অন্তঃস্থল ভীষণ ভালোলাগায় টইটম্বুর হয়ে আছে।
তপোবন বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। আটটায় মিটিং রয়েছে, অফিসে যেতে হবে তাকে।
সে কড়িডর পেরিয়ে নিচে নামতেই দেখল তানশান উপরে উঠছে। সে ছেলের কাঁধ জড়িয়ে বলল,
–“খাওয়া শেষ?”
–“নো পাপা, তুমি যাও আমি আসছি।”
–“আমায় অফিসে যেতে সবে। তুমি খেয়ে পড়তে বসবে, আর আমি এসে তোমাদের পড়াতে বসবো।”
–“ওকে।”
তপোবন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। তানশান ছুটে আসে নিজের ঘরে। বিকাল থেকে করা দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে নিজের ঘরে রাখা ফুলের তোড়াটা হাতে নেয়। বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে ঠিক নিজের পাশের ঘরের দরজায় টোকা দিলো।
রূপকথা গলা উঁচিয়ে বলল,
–“ভেতরে আসুন।”
তানশান দরজা খুলে উঁকি দেয়। তানশানের গম্ভীর মুখটি ভেসে উঠতেই রূপকথা হাতের কাজ ফেলে ব্যস্ত কণ্ঠে শুধায়,
–“কিছু বলবে? কিছু লাগবে তোমার?”
তানশান হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো।
–“ভেতরে এসো।”, রূপকথার কথায় তানশান ইতস্ততা নিয়ে ঘরে ঢুকলো।
নিজের এই ছোট্ট জীবদ্দশায় সে বাবার কথা অমান্য করেছে এমন খুব কম হয়েছে। সে জানে, সে কাউকে কষ্ট দিলে বা খারাপ কাজ করলে তার মা কষ্ট পাবে। ইতস্ততা ভুলে যায় তানশান। সে নত শির হাত সাথে করে আনা সাদা গোলাপ আর জিপসামের তৈরি স্নিগ্ধ ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“স্যরি।”
হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকা রূপকথা অবুঝের ন্যায় ফুলের গোছাটা হাতে নেয়। সেটি নিতেই তানশান পকেট থেকে দুইটা বড় বড় চকলেট ও বের করে এগিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঐ স্নিগ্ধ মুহুর্তটির পুনরাবৃত্তিতে হতবাক রূপকথা সেটাও নিলো। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–”এগুলো কেন দিচ্ছো?”
তানশান নত শির কৈফিয়তের সুরে বলল,
–”পাপা যখনি কোনো ভুল করে তখনি আমায় ফুল আর চকলেট দিয়ে স্যরি বলে। আর আমি খুশি হয়ে যাই এবং তার স্যরি একসেপ্ট করে নেই। তাই স্যরি!”
সে কি অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া কৈফিয়ত। রূপকথা বিমুগ্ধ হয়ে শুনলো। শুধায়,
–“কিন্তু তুমি কেন আমায় স্যরি বলছো?”
–“আজ আমার জন্য আপনার বিপদ হতে পারতো। আমার উচিৎ ছিল আপনার খোঁজ নেয়া।”
রূপকথার মলিন মুখশ্রী ঠিকরে উজ্জ্বল হাসির রেখা ফুটে উঠল। প্রসন্ন হয় তানশান কোনো প্রকার ঘৃণাভরা চাহনি ছাড়া স্বাভাবিক ভাবে কথা বলায়। সে মিহি স্বরে বলল,
–”সমস্যা নেই। তুমি ইচ্ছে করে করোনি। আর ভাগ্যে যা আছে তা হবেই, তাতে তুমি যত খোঁজ খবর-ই নাও না কেন! তাই দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম। তোমার কথা অনেক মনে পড়েছিল।”
কথাটি শেষ হতেই দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলে। তানশান দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। নম্র কণ্ঠে বলল,
–”আর কখনো এমন হবে না।”
যেখানে গোটা জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কেউ তার মনের চিন্তা করেনি, সেখানে এমন একজনের থেকে স্যরি পেয়ে রূপকথা বিমুগ্ধ হয়। এই মানুষটার থেকে এমন ব্যবহার স্বপ্নতুল্য তার জন্য! তার চেয়েও মুগ্ধ হয়ে এই ভেবে যে তপোবন সিকদার ঠিক নিজের অবিকল এক চমৎকার সন্তানের বাবা এই ভেবে। সে মৃদু হেসে বলল,
–“তুমি অনেক ভালো।”
তানশান থতমত খাওয়া দৃষ্টি লুকিয়ে আসছি বলে দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে।
তানশান চলে যেতেই রূপকথা ফুলের তোড়া আর চকলেট গুলোর দিকে তাকিয়ে গাল ভরে হাসলো। অভিমান তো সেই কবেই বাবা ছেলের বিমুগ্ধকর কার্যে মুখ লুকিয়ে পালিয়েছে।
রোজকার মতোন আজ ও তপোবন বাড়ি ফিরে তানশানকে আর রূপকথাকে নিয়ে পড়তে বসলো। এবং রোজকার ন্যায়-ই ঘুমের ঘোরে রূপকথার ধুপধাপ নড়চড়ায় তপোবনের ঘুমে বিঘ্ন ঘটল।
পায়ের উপর আরামে ঘুমিয়ে থাকা এলোমেলো মেয়েটিকে দেখে তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মাথা কোথায়, শাড়ি কোথায়, মেয়েটা কোথায়। পায়ের কাছে গেল কি করে? এমন সব প্রশ্ন নিয়েই তপোবন রূপকথাকে ঠিক করে শুইয়ে দিলো। রূপকথাকে শুইয়ে নিজে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিতেই ধুপ করে একটা হাত পড়ল পেট বরাবর। তপোবন ডানে বামে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
–“একটা মানুষের ঘুম এত খারাপ হয় কি করে?”
রোজ সকালের মতো আজও ঘুম থেকে উঠে রূপকথা নিজেকে একদম পরিপাটি পায়। শাড়ি একটুও নড়েচড়ে না। তার বুঝে আসে না তার ঘুম এত সুন্দর কি করে হলো? শাড়ি পরে ঘুমানো নিয়ে প্রথম প্রথম কতই না চিন্তায় ভুগছিল— অথচ তার শাড়ি তো নড়েই না! প্রসন্ন মনে রূপকথা নতুন দিনের প্রারম্ভ করে।
মান অভিমানের পাল্লা চুকিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রার জন্য একে অপরের সঙ্গী হতে হবে। এই প্রকল্পে পরদিন বিকালে সারাদিন পর তপোবন বাড়ি ফিরলো। নিজের ঘরে ঢুকতেই দেখলো রূপকথা আছরের নামাজ পড়তে বসেছে। সে আজ আর জামায়াতে গেল না। ওজু করে এসে রূপকথার পাশে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু’জনে একসাথে নামাজ শেষ করে।
গতকাল থেকে রূপকথা কেমন চুপসে আছে। নারী অভিমান ভাঙাতে দক্ষ তপোবন, আজ পুরানো এক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাবার্ড ঘেঁটে একটি শাড়ি বের করলো। ডার্ক মেরুন রঙা একটি শাড়ি। ঘর থেকে বের হতে নেওয়া অভিমানী মেয়েটিকে গম্ভীর গলায় ডাকলে রূপকথা ফিরে তাকায়। তপোবন এগিয়ে এসে তার হাতে শাড়িটি ধরিয়ে দিয়ে আদেশের সুরে বলল,
–”এটা পরে আসো। তোমার কাছে দশ মিনিট সময়। আমি নিচে অপেক্ষা করছি।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। তপোবন সেন্টার টেবিলের সামনে গিয়ে ছোট্ট আতরের বোতলটি গলদেশে ঘষতে ঘষতে বলল,
–”তোমার হাতে নয় মিনিট সময় রয়েছে। এর মধ্যে তৈরি না হলে এভাবেই নিয়ে যাব।”
তপোবন সরোবরের গেটের বাইরে এসে দাঁড়ায়। সাথে মেরুন রঙা শাড়ির সাথে হিজাব পড়া রূপকথা। তপোবন গেটের দিকে মুখ করে রূপকথাকে বলল,
–”এদিকে তাকাও।”
তপোবনের নির্দেশনা অনুসরণ করে রূপকথা সরোবর নেইম প্লেটের দিকে তাকাতেই তপোবন সেদিকে আঙুল তাক করে বলল,
–”সরোবর! এটা তোমার বাড়ি।”
‘তোমার বাড়ি’ ভীষণ অদ্ভুত কথা! অভিমানী থমথমে মুখের আদলে রাজ্যের কৌতুহল দেখাগেলো তপোবনের এহেন কথায়। রূপকথা অবুঝ নয়নে তাকিয়ে রইল। তপোবন সেই অবুঝ দৃষ্টি উপেক্ষা করে। দুই পা এগিয়ে গিয়ে হাঁক ছেড়ে একটা রিকশা ডাকলো। রিকশাটি থামতেই, তপোবন তাকে ওঠার জন্য ইশারা করে। রূপকথা নিরুত্তর উঠে বসে রিকশায়। তপোবন ও তার পাশে উঠে বসে। একহাত মেয়েটির পিঠ আগলে ঠিক অপরপাশে হাতলে হাত রাখে। রিকশা চলতে শুরু করলে তপোবন সম্মুখে দৃষ্টি রেখে বলতে শুরু করে,
–”এই রোডের নাম হাজী মহসিন রোড। এখান থেকে তোমার কলেজে রিকশায় যেতে বিশ মিনিট এবং গাড়িতে যেতে পনেরো মিনিটের মতো লাগে। রিকশা ভাড়া চল্লিশ টাকা নিবে। আসার পথেও একই ভাড়া। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বেশি নিতে পারে। এর জন্যই বলছি কখনো টাকা ছাড়া বের হবে না। কলেজ থেকে বাড়িতে ফেরার সময় হাজী মহসিন রোড, আবু খান লেন এর সাথে সরোবর বাড়িটির নাম বললেই তোমায় একদম গেটের সামনে নামিয়ে দেবে।”
এতোক্ষণে রূপকথা বুঝতে পারলো নিখুঁতভাবে সবকিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কারণ। যেতে যেতে তপোবন খুঁটিনাটি সব দেখালো রূপকথাকে। রূপকথার অভিমান আরো দৃঢ় থেকে দৃঢ় হলো। না চাইতেও কারোর জীবনে জড়িয়ে যাওয়া, তার নিত্যনতুন কর্মে মুগ্ধ হওয়া, তার জন্য করা সবকিছুর পেছনে শুধু দায়িত্ববোধ রয়েছে। তার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা নেই। তাই তো দায়িত্ব পালন করেই খালাস!
গতকালকের ওয়াদা তবে ঠুনকো? অভিমান যেন আরো দৃঢ় হলো!
রিকশাটি চলতে চলতে থামলো ঠিক রূপকথা’র কলেজের সামনে। পাঞ্জাবি ঝাড়া দিয়ে তপোবন রিকশা থেকে নামে। আলতো ঘাড় নেড়ে শুধায়,
–”চিনতে পারছো সবকিছু? মনে থাকবে, যা যা বলেছি?”
–”মনে না থাকলেও সমস্যা নেই। একা চলতে চলতে সব চিনে যাব। আপনার চিন্তা করতে হবে না। যার চলার পথে একাকীত্বতা সঙ্গি! সে ধীরে ধীরে সব শিখে যায়।”, রূপকথা অভিমানী কণ্ঠে তপোবন মৃদু অবাকের সুরে শুধায়,
–”একা? এতো বড় হাট্টাগাট্টা মানুষটাকে চোখে পড়ছে না?”
তপোবন নিজেকে দেখিয়ে বলল। রূপকথা থমথমে মুখে বলে,
–”আপনি তো আর সবসময় থাকবেন না। ”
–”তুমি কি চাও, আমি সবসময় থাকি?”, আচমকা তপোবনের প্রশ্নে রূপকথা থতমত খেয়ে গেল। সে কোনা চোখে তাকায়। তপোবন সরু চোখে তাকেই দেখছে, ওষ্ঠকোনে অপ্রকাশিত হাসির উজ্জ্বলতা তার!
রূপকথা নিভু স্বরে বলে,
–”চাইলেই তো আর সবসময় সব পাওয়া যায় না।”
–”চেয়েই দেখো না!”
পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে তপোবন মিহি স্বরে বলল। হঠাৎ করেই জেঁকে বসা লাজ সামলাতে হয়ে হলো সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটি। কুড়ি বছরের এই জীবনের পরিধিতে পুরুষ মানুষের সান্নিধ্যে না আসা মেয়েটির বুক ধড়ফড় করে, লোকটির সান্নিধ্যে আসলে। এই যে লোকটি তার স্বামী! অর্থ ঘাঁটলে মৃত্যু পর্যন্ত হিসাব নিকাশ মস্তিষ্কে এঁটে যায়। লোকটি যখন নিজের স্ত্রী বলে সম্বোধন করে তখন মনে হয় তার জীবনের পরিধি এই লোকটির মাঝেই সীমাবদ্ধ। তাকে বাঁচতে হবে লোকটির একান্ত কেউ হয়ে। মানুষটার সম্পুর্ণ অধিকার রয়েছে তার উপর। এই অচেনা শহরে ভরসা আর কম্ফোর্ট জোন এই মানুষটাই।
অচিরেই যে রূপকথার নবযৌবন জুড়ে তপোবন নামক মানুষটির আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে তা বুঝেও বুঝতে চাইলো না মেয়েটি। অস্থিরতা মুখশ্রীতে সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো রূপকথার। এ কেমন অনুভূতি!! অন্তঃস্থলে শিরশির করে ওঠে মিষ্টি ঐ আতরের সুগন্ধ সন্নিকটে থাকলেই। রূপকথার অস্থিরতা এড়ালো না বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকা লোকটির থেকেও। সে স্মিত হেসে মেয়েটিকে স্বাভাবিক করার প্রয়াসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
–”নেমে এসো। এখানকার ফুচকা অনেক সুস্বাদু আর বেশ স্বনামধন্য ও। মেয়েদের পাহাড় সমান অভিমান না-কি এই অপদার্থ ফুচকা এক চুটকিতে ভাঙিয়ে দেয়। তাই এখানে নিয়ে আসলাম, ভাবলাম কলেজের পথঘাট ও চেনা হয়ে যাবে।”
রূপকথা বোকা বনে গেল। লোকটা এর জন্য এখানে এনেছে? আর সে কি-না কি গম্ভীর গুরুতর কথা শুনিয়ে দিল? নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে, মিহি অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–”ফুচকা খেলে মেয়েদের রাগ ভেঙে যায়, কে বলেছে?”
তপোবন চারিপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে খুবই স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
–”অভিজ্ঞতা আছে।”
জবাবটি দিতেই তপোবন মৃদু থমকালো। সরব দু’জনের মাঝেই হানা দেয় জবাবটির অর্থ। রূপকথার তৎক্ষণাৎ মনে পড়লো মানুষটার জীবনের দ্বিতীয় নারী সে। এর আগেও সে এক নারীর সান্নিধ্যে ছিল, তাকে ভালোবেসেছিল, সুখে ঘর করেছিল। তপোবন তড়াক চাহনিতে রূপকথার নুইয়ে পড়া মুখটির দিকে তাকায়।
একবার পলক ঝাপটে তপোবন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার প্রয়াসে স্বউদ্যোগে আঁকড়ে ধরে কোলের মাঝে থাকা পাটকাঠির মতো শুকনো হাতটি। এই হাত ধরার মতো সহজ সম্পর্ক তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে শপিং করার দিন থেকে। যখন মেয়েটি নিজেই আঁকড়ে ধরেছিলা তপোবনের হাত। রিকশা থেকে নেমে ফুচকার দোকানের দিকে পা চালিয়ে, তপোবন জিজ্ঞাসা করে,
–”তুমি ফুচকা খাও না?”
–”খাই, বছরে এক বা দুই বার। যেই টাকা দিয়ে ফুচকা খাবো, সেই টাকা দিয়ে এক কেজি আলু হয়ে যায়। কিংবা অন্য কোন সবজি। আর এক কেজি আলুতে আমাদের তিন চারদিন হয়ে যেতো। এক প্লেট ফুচকা খাওয়ার থেকে এক কেজি আলু কেনা ভালো। তাই কখনো তেমন খাওয়া হতো না।”, রূপকথা শহুরে জনজীবন দেখতে দেখতে বলল।
তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক তাকায় রূপকথার দিকে। বাস্তবতা মানুষকে কতোটা বুঝদার করতে তোলে মানুষকে! যেখানে তানশান এখনো জানে না ,সে কয় টাকা কেজির চাল খাচ্ছে। কে বলে, মানি ইজ নাথিং! মানি ইজ এভরিথিং! একটা শিশুর শৈশব কেমন হবে সেটা নির্ভর করে টাকার উপর।
তপোবন রূপকথার হাতে ফুচকার প্লেট এগিয়ে দিতেই নিয়ে শুধায়,
–”আপনি খাবেন না?”
তপোবন কপাল কুঁচকে না বোধক মাথা নেড়ে –বলে,
“এগুলো আনহাইজিনিক! আমি খাই না।”
–”তাহলে আমায় কেন খাওয়াচ্ছেন?”, রূপকথা ভ্রু কুঁচকে শুধায়।
–”মেয়েদের রাগ ভাঙানোর সহজ উপায় হলো ফুচকা। তোমাদের মেয়েদের রাগ তো সকল হাইজিন- আনহাইজিনের উর্ধ্বে!”
–”এত মজাদার খাবারের সামনে হাইজিন- আনহাইজিন বেমানান শব্দ। কিন্তু আপনাকে কে বলল, আমি রাগ করেছি?”, রূপকথা খেতে খেতে শুধায়।
–”করোনি বলছ?”, তপোবন মৃদু হেসে শুধায়। মেয়েটি জবাব দেয় না।
শেষ কবে ফুচকা খেয়েছিল, রূপকথার মনে নেই। সে মজা করে খেলো ফুচকা। প্লেট শেষ হওয়ার আগেই তপোবন জিজ্ঞাসা করে,
–”আরেক প্লেট বলব?”
কাজী লেবু, কাঁচা ঝাল, ধনিয়া পাতার সুগন্ধে মজাদার ফুচকার স্বাদে নিমগ্ন রূপকথা হুশ জ্ঞান হারিয়ে অনতিবিলম্বে ঘন ঘন মাথা নাড়ে। সংকোচহীন চঞ্চল কণ্ঠে বলে,
–”কাঁচা ঝাল বেশি করে দিতে বলবেন।”
তপোবন ঠিক তার উল্টোটা করলো। সে ফুচকা ওয়ালাকে বলল,
–”গুঁড়া ঝাল, কাঁচা ঝাল কোনো ঝাল-ই দেবেন না।”
রূপকথার মুখ ভোঁতা হয়ে গেল। সে চুপসে গিয়ে আবার খেতে শুরু করলো। খাওয়া হতেই তপোবন, রূপকথা পুনরায় রিকশায় উঠল।
–”এই যে বুড়ো, টাকলা, পেটমোটা, রাগি টিচারের কথা যত মনোযোগ সহকারে শুনছিস না? তার একটু মনোযোগ যদি আমার চেহারাটার দিকে দিতি তাহলে আজ আর আমায় সিঙ্গেল থাকতে হতো না। তোর ও এমন গোমড়া মুখ করে থাকতে হতো না। কি পাস এই সব পড়াশুনা করে? তোর এই পড়াশুনার চক্করে আমি যে বাজেভাবে আঁটকে গিয়েছি। না পারছি বের হতে আর না পারছি পিছু হাঁটতে।”
রোজকার মতো অদ্ভুত অদ্ভুত চিঠি পড়ে তানশান নিরবে সেটি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল। দুই মিনিট বাদ আবারো পেছনের সিটের ছেলেটা তার পিঠে গুঁতোগুতি করতে লাগলো। তানশান অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজের পেছনের ছেলেটির দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–”আর একবার যদি তুমি আমায় ডিস্টার্ব করো, তবে আমি টিচারকে বলে দেবো।”
ছেলেটি বোকাসোকা হেসে আবারো তার হাতে চিরকুট গুঁজে দিল। তানশান ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও ফেললো না। রুম নোংরা করা যাবে না, টিচার বকা দেবে। সে চুপ করে বসে রইল। পেছন থেকে লাগাতার সুনেহরার ফিসফিস আওয়াজ আসছে।
–”এই টমাটু, তোকে কি ওটা হাতে নিয়ে বসে থাকার জন্য দিয়েছি? পড় ওটা, বই পড়ে কোনো কিছু করতে পারবি না। কিন্তু আমার চিরকুট গুলো পড়তে পড়তে, তুই একদিন আমার বাচ্চার বাপ ঠিক-ই হয়ে যাবি। পড়! পড়!”
তানশান হতবাক হয়ে গেলো সুনেহরার লাগাম ছাড়া, অশ্লীল কথাবার্তায়। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা সকলে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নেয়। চিরকুটটি বেঞ্চের নিচে নিয়ে খুললো সে।
–”কাউকে ভালোবেসে, সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগ আমি করছি। প্রেম করার বয়সে পড়াশুনা করছি। তাও আবার সায়েন্স! যার সবকিছু আমার মাথার উপর থেকে যায়। তাও তোর আমার উপর দয়া হয় না, তানশান। এই বুড়ো স্যার কি বলছে? এ কোথায় ফাঁসিয়ে দিলি আমায়? পড়াশুনার থেকে প্রেম করা, বিয়ে করা, বাচ্চা উৎপাদন করা আরো সহজ! এই বই খাতা দেখলে ব্যাঙের মতো হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে থাকার মতো অবস্থা হয় আমার। প্লিজ আমায় বাঁচা!”
আজ রাগ দেখাতে গিয়েও রাগলো না তানশান। বরং চোখেমুখের গাম্ভীর্যতা ভেদ করে স্মিত হাসি ফুটে উঠলো,
“পড়াশুনার থেকে প্রেম করা, বিয়ে করা, বাচ্চা উৎপাদন করা আরো সহজ!” সুনেহরার কথার সাথে মায়ের এমনি এক কথার মিল পেয়ে। মায়ের ডায়রিতেও এমনি একটি বাক্য ছিল বাবার উদ্দেশ্যে। আর এত বছর ধরে সে যদি নিরবে সুনেহরাকে সহ্য করে যাচ্ছে, তার একটাই কারণ সেটা হলো সুনেহরার মাঝে সে মাকে খুঁজে পায় সে। তার কার্যক্রমে সে মাকে আর বাবাকে অনুভব করে। সে এবারের চিরকুটটিও ব্যাগের ঢুকিয়ে রেখে দেয়। তানশানের নিরাবতায় সুনেহরা পুনরায় হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে টেবিলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল।
তপোবন তানশানের কোচিং রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়।
তানশান পড়তে পড়তেই দরজায় বাবাকে দেখে স্মিত হাসল। তানশানের টিচারের কাছে বলে তপোবন ছেলেকে নিয়ে আসল। তানাশান বাবার হাত ধরে বেরিয়ে আসে। কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–”এখানে কেন আসলে পাপা? আর আমরা যাচ্ছি কোথায়?”
তপোবন ছেলের কাঁধ থেকে ব্যাগ নিতে নিতে বলল,
–”রূপকথাকে নিয়ে বের হয়েছিলাম। ও তো একা চলাফেরা করতে পারে না। সবকিছু চেনাও হয়ে যাবে, ঘোরাও হয়ে যাবে। তুমি জাতিসংঘ পার্কে যেতে চেয়েছিলে ভাবলাম এখন নিয়ে যাই। রূপকথার ও মেলা দেখা হয়ে যাবে।”
তানশান জবাব দিল না। সে বাবার হাত ধরে চলতে শুরু করে। জাতিসংঘ পার্ক তাদের বাসা থেকে পাঁচ সাত মিনিট দূরত্বের। সেখানে মেলা হচ্ছে। সেটাই দেখতে চেয়েছিল। তানশানের গাড়ি কোচিংয়ের টিচারের তত্ত্বাবধায়নে রেখে, তপোবন ইজি বাইকে করে স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে জাতিসংঘ পার্কে যায়। বাচ্চা, বয়স্ক, কপোত কপোতি, পরিবার সব ধরনের মানুষ জড়ো হয়েছে সেখানে। বিভিন্ন ধরনের রাইড, নারীদের সরঞ্জাম, সংসারের সরঞ্জাম, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। বাবা ছেলের পাশে রূপকথা মন্থর গতিতে হাঁটছে আর সবকিছু দেখছে।
নাগরদোলায় যারা চড়ছে তাদের চিৎকার ভেসে আসছে। দেখতে দেখতেই রূপকথার চোখ যায় এক ঝাঁক ঝিকিমিকি করতে থাকা বেলুনের দিকে। যেখানে কপোত কপোতীর ভীড় জমে আছে। তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো এক যুবককে তার প্রিয় নারীটির দিকে বেলুন এগিয়ে দিতে দেখে। তাদের দেখতে দেখতেই লজ্জামাখা এক হাসি নিয়ে রূপকথা তপোবনের দিকে তাকায়। মানুষটাও তো তার স্বামী! এমন সুন্দর সম্পর্ক কি কখনো তাদের মাঝেও হবে? আকাঙ্ক্ষা ভরা চোখে মাথা তুলে তাকাতেই, মাথাটি নুইয়ে এলো তার মুখের ওপর। সরব রূপকথা ভড়কে গেল তপোবনকে নিজের দিকে নুইয়ে আসতে দেখে। উচ্চতায় বিস্তর ফারাক! মাস্কের আড়ালে থাকা ওষ্ঠদ্বয় নেড়ে তপোবন শুধায়,
–”কি, ঝিলিমিলি বেলুন চাই?”
রূপকথা অবাক পানে তাকায় ধূসর বর্নের কুঁচকানো আঁখিদ্বয়ের দিকে। মুখ দৃশ্যমান না হলেও, মাস্কের আড়ালে হাসিমাখা মুখের রেশ আঁখিদ্বয়ে সুস্পষ্ট! চোখেও হাসা যায়? রূপকথা হতবুদ্ধি’র ন্যায় ঘন ঘন না বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন মাথা নেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দু’হাতে আঁকড়ে ধরা স্ত্রী এবং সন্তানের হাত। যেই হাত দু’টো নিজে ছেড়ে দিয়ে, তানশানের হাতের মাঝে রূপকথার হাত রেখে তপোবন ছেলেকে বলল,
–”আব্বু! তোমরা এখানে থাকো। তাকে দেখে রেখো, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।”
তানশান নিজের হাতের মাঝে থাকা হাতটি হালকা হাতে ধরে মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবন দ্রুত পায়ে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে গেল। রূপকথা জড়তা নিয়ে তাকায় তানশানের হাতের মাঝে থাকা নিজের হাতের দিকে। সে হাতটি সরিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তানশান আঁকড়ে ধরে। রূপকথা ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
–“চিন্তা করোনা, আমি হারিয়ে যাবো না। তোমার সাথেই থাকব।”
তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে গম্ভীর মুখে তাকায় রূপকথার দিকে। অতঃপর হাতটি ছেড়ে দেয়। তারা সেখানেই ভীড়ের মাঝে অপেক্ষা করে। সন্ধ্যা হয়ে আসায় হুট করেই ভীড় বাড়তে লাগলো। ভীড়ের মাঝে তখন ধাক্কাধাক্কি বাড়তেও লাগলো। রূপকথার রুগ্ন দেহের অবস্থান বারংবার মানুষের ধাক্কায় নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। পরেরবার এক সজোরে ধাক্কা এসে তাকে ছিটকেই ফেলতে নিলো কিন্তু ততক্ষণে দায়িত্ববানের ন্যায় দু’টো হাত তার বাহু ধরে ফেললো। তানশান কপাল কুঁচকে তাকায়।
রূপকথার শিক্ষা হয়ে যেতেই সে বোকাসোকা হেসে নিজ উদ্যোগে তানশানের হাত আঁকড়ে ধরে। তানশান নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। অনতিদূরে থাকা তপোবনের অন্তঃস্থল থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো। এতোটুকু ঠিক বুঝতে পারলো আজকের পর থেকে রূপকথার সুরক্ষায় সে একা নয়, তার ছেলেও থাকবে। এর জন্যই শুরুটা এমনভাবে করেছে যেন ছেলের মনে কখনো ঘৃণা তৈরি না হয়। তার অবর্তমানে তানশান দেখে রাখবে তার এই পরিবারটিকে। মানুষ যে ক্ষনকাল! তার জীবনের এই পর্যায়ে এসে এমন একজন মানুষ জুড়ে গিয়েছে যার জন্য এখন তার চিন্তা হয়। সে না থাকলে রূপকথার কি হবে? কে দেখবে? কিভাবে সমাজে বাঁচবে? সে চায় না মেয়েটির জীবন কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী, কারোর সৎ মা এই সবকিছুর মাঝে থমকে যাক! দেখতে গেলে মেয়েটির বয়সের সাথে তার এক প্রজন্মের ফারাক!
তপোবন ফিরে আসে পাঁচটি ঝিলিমিলি বেলুন হাতে। রূপকথার দৃষ্টি চকচক করে উঠল। তপোবন সেগুলো রূপকথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলল,
–”নাও তোমার ঝিলিমিলি বেলুন।”
–”এতো গুলো দিয়ে কি করব?”, রূপকথা মুগ্ধ নয়নে সেগুলো দেখতে দেখতে বলল।
–”রোজ, নায়েল, মৌনতা আছে তাদের দেবে।”, তপোবন বলল। রূপকথা হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল,
–”আচ্ছা।”
তানশান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নাগরদোলা’র দিকে। তপোবন তা দেখে শুধায়,
–”আব্বু, উঠবে?”
তানশান মিহি স্বরে বলে,
–”পড়ে যাবো পাপা!”
তপোবন স্মিত হাসলো ছেলের কথায়। ছেলে একদম তার-ই প্রতিরূপ। লাফালাফি, চঞ্চলতা বিমুখ! মায়ের মতো মন পেলেও স্বভাব, বাচনভঙ্গি একদম তার মতো। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–”পড়বে না! চলো পাপার সাথে উঠবে।”
–”নো পাপা।”, তানশান নাকমুখ কুঁচকে বলল।
–”পড়বে না তানশান। পাপা আছি না! রূপকথা তুমি ও কি ভয় পাও?”, তপোবন প্রশ্নে রূপকথা এক পলক তাকায় নাগরদোলার দিকে।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৮
ছোটবেলায় হয়তো একবার উঠেছিল বাবার সাথে, আবছা মনে পড়ে। কেমন অনুভূতি ভুলে গিয়েছে সে! দু’জনের ইতি-উতি দেখে তপোবন জোরপূর্বক দুজনকে নিয়ে নাগরদোলায় উঠল। তানশান উঠেই বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে। তপোবন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে রূপকথার এক হাত আঁকড়ে ধরে বসে। শুরুতে দু’জনের মাঝে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও কয় পাক ঘুরতেই, ভরশূন্য অনুভূতি সামলাতে না পেরে রূপকথা আ’ত’ঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে উঠল। তপোবন হেসে উঠে রূপকথার চিৎকারে। সে আরেকহাতে রূপকথাকেও বুকে জড়িয়ে নিলো। তানশান যতোটা সম্ভব শক্ত করে বাবার পেট জড়িয়ে ধরে বসে আছে। এভাবেই শক্ত বুকের আশ্রয়ে রূপকথা আর তানশান একটাসময় নাগরদোলার ভয়কে জয় করে নেয়।
